অতঃপর বৃষ্টি

ছবিটা কিছুদিন হল দেয়ালে লাগানো। অনেক দিন ধরে আছে বলে তারা কিছু বলেনি। ছবির দিকে তাকিয়ে দিন কেটে যায়। জানালার পাশে খাট টা বেশ বড়। চাইলে দু’জন ঘুমানো যাবে দিব্যি। তার পাশেই একটা টেবিল, কত কিছু রাখা তাতে! সামনে পাশে একটা সোফাও রাখা। হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেলে অস্থির হয়ে উঠল বেলা। তার খুব খারাপ বোধ হচ্ছিল। কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিল। জানালার কাঁচ বেয়ে যাওয়া জল যেন ওর চোখেরই প্রতিরূপ। মুষল ধারে বৃষ্টি পরছিল তখন। মেঘের আচমকা শব্দ যেন কাঁদার ইচ্ছেটাকে আরও প্রবল করে দিল। ঘরটায় বসে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ভীষণ ইচ্ছে হল বৃষ্টিতে ভেজার।

ছায়া ‘প্রতিটি ফোঁটা বুঝে নেবার উপায় নেই। তবুও বসে স্বস্তি। শেষ বারের মত শান্তির নিঃশ্বাস। সব স্মৃতি একবার করে হাত বুলিয়ে যায়। তবুও ফিরে যাবার চেয়ে ঢের ভালো। ছোট্ট রাস্তার মাঝখানে এই ঠেলাগাড়িতে যেন পরম মায়া জরিয়ে আছে। বৃষ্টির জলে পুরো ভেজা হয়ে গেলেও অনুভুতি এখনও শুষ্ক। তার আরও জলের প্রয়োজন। অনেক দূরে চলে এসেছি। হয়তো ওরা এতক্ষণে জেনে গেছে। হয়তো আমায় খুঁজে বেড়াচ্ছে। অনেক সাবধানে এলেও অনেকেই তো দেখল। জানিয়েও দিয়েছে বোধ হয়। একটা ভয় হচ্ছে। শান্তির মাঝেও বোধ হয় ঘেমে যাচ্ছি। জল আর ভালো লাগছে না। অনুভব শক্তি ভোতা হয়ে উঠচ্ছে……যদি বাড়িতে ফোন দেয়।। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। ইচ্ছে করছে দূর দৌড়ে গিয়ে বলি “আমি ভাল আছি। একটু ভিজে আসি” দাদার বিয়ে যে। কত ভেবেছিলাম জানো। অনেক কিছু গুছিয়ে নেবার ছিল। সব আমায় করতে হত। ওতো বলেই শেষ। ওকে কত বলেছি- দেখিস সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকবে। বলবে- বেলার পছন্দ আছে বটে। সবাইকে সাজিয়ে দিতাম। নিজেরও তো গুছিয়ে নেবার ছিল। নতুন করে সাজাতাম। বৌদি আসতো। তার হাতে খেতাম। কতই না ভেবেছিলাম। সবই তো হত। দাদার পছন্দও হয়েছিল। আমার বন্ধও ছিল। কোথা থেকে কি হল সব গণ্ডগোল হয়ে গেল। আমায় নিয়েই সব পড়ে রইল। ভীষণ কষ্ট হত। আর দেখতে পারছিলাম না। কোথায় যেন সব গুলিয়ে এল। অপরাধি মনে হচ্ছিল নিজেকে। জেদ করলাম সবার সাথে। শেষে যেদিন কিছুই খেলাম না সেদিন গিয়ে সবাই রাজি হল। নেহাত বুদ্ধিটা এসেছিল মাথায়। দাদা অনেক কেঁদেছে, তবু নিঃশ্বাস… কথাটা শুনেছে। তারপরও আসতো। আজ সবাইকে আসতে মানা করেছি। রীতিমত হুমকি দিয়েছি। বিয়ে বলে কথা। ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। দূরে পালিয়ে যেতে পারলে ভালো হত। ছেলেটার কথা মনে পড়ছে। রোজ দাঁড়িয়ে রইত। এক পলক দেখার আশায় কতকিছুই না করত। আমি না যাওয়ায় এখানেও এসেছিল। বলে- ফোনও দিয়েছিল শতবার। আমি তাকিয়ে রইলাম। বলতে চেয়েছিলাম- অনেক কথা। দেখেছিলাম অনেক স্বপ্ন। না বলে, শুধুই চেয়ে রইলাম। অবাক করে দিয়ে বকে দিলাম নিষ্ঠুরভাবে। হয়তো অনেক লেগেছে ওর। কিইই বা করার ছিল আমার।। যাব যে বহুদূর। সঙ্গে নেব কি করে। বলারও তো কিছু নেই।  ভীষণ মনে পড়ছে আজ। বৃষ্টি আজ না থামাই ভালো। আলোর দেখা পাবো তো। এর সাথে যে আর দেখা হবে না। ঠেলাগাড়িতে আগে কখনও বসিনি। চারিদিকে ঘোর অন্ধকার। সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। বৃষ্টি যেন সবার স্বপ্ন নিয়ে এসেছে। আমারও তো ছিল…স্বপ্ন। কত শখ করেছিলাম জানো। অনেক বড় হব। সাদা পোশাকটা পড়ে পুরো বিশ্ব দেখবো। এই তো আর ক’টা দিন। এর পরেই তো সবাই বলতো- ডাঃ বেলা এসেছে…ডাঃ বেলা।। কেন এমন হল। আজ কেন কোন কিছুই কাজে দিচ্ছে না। আজ কেন আমায় বৃষ্টি ছুঁতে পালিয়ে আসতে হল। এতো আমি চাইনি কখনও। কেন??’

‘বৃষ্টি থেমে গেছে। সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। আমায় যেন অনেক বাজে দেখতে। একটু ভিজেছি। তো কি হয়েছে। ওমা…বৌদিও এখানে। আবার সবাই কষ্ট পেল। ছুটে এসেছে আমার জন্য। মা কাঁদছে। অনেক খারাপ লাগছে এবার। কেন যে ঘুমটা ভেঙেছিল। ডাক্তার, নার্স…সবাই কি যেন বলছে। কানে এসেও শুনতে পাচ্ছি না। সব মিশে যাচ্ছে।’

‘আমি গাড়িতে কেন? আবার ফিরবো সেই ঘরে? সবাই এখনও কেন তাকিয়ে? আমি তো অত বাজে নই। মা কাছে বসে আছে। এবার খারাপ লাগছে না। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। এখনও কাঁদছে। বলতে চাইলাম- মা, আর কেঁদো না। আমি আর ভিজবো না এভাবে। ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। মায়ের চোখের দিকে তাকিয়েই ঘুমাবো তবে? আর বৃষ্টি ছোঁয়া হবে না? মাকে বলার ছিল যে- আর যাব না তো মা। তুমি ভেবো না। কেঁদো না…প্লিজ। আমার কথা শুনবে না? আমি আবার না খেয়ে…’

বৃষ্টি

সূর্য উঠছে। সাইরেন এর শব্দ হয়তো সবার কানে যাবেও না। তবুও আজ ফিরে যাবে অনেক দূরে। বেলার আর ওই ঘরে থাকতে হবে না। শুধু থাকবে বেলার ঘুম ভাঙ্গা রাতের গল্প। ঠেলাগাড়িটাও হয়তো সরে যাবে। ঘুরবে নানান জায়গা। ছোট্ট সেই রাস্তায় বৃষ্টি আবার আসবে। আসবে না শুধু বেলা। তবে থেকে যাবে বেলার – শেষ নিঃশ্বাস।।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

অচ্যুত সাহা জয়
 

"কখনো কোনো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা বলতে হয় না। আমরা বলি না। আপনি বলেছেন। এর দায়দায়িত্ব কিন্তু আর আমার না - আপনার!"

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়