7

তবুও চলে, চলছে, চলে যাবে কোনো এক ভাবে…

আবির, ছোট বেলা থেকেই মেধাবী এক ছাত্র। অনেক ভদ্র ও ভালো মনের মানুষ হিসেবেও সে পরিচিত। তবে ছোটবেলা থেকেই তার বাবা-মার মাথায় তার ব্যাপারে একটা চিন্তা সবচেয়ে বেশী ঘুরতো, সেটা হচ্ছে আবিরের খাদ্যাভ্যাস। খাওয়া-দাওয়ায় একেবারেই মন ছিলো না তার। খাবার হিসেবে দিনভর চকোলেট, আইসক্রিম, চিপস্‌, বিস্কুট, বার্গার, পিজা; এ দিয়েই তার দিন পার হয়ে যেত অনায়াসে। ভাত বা অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের প্রতি রুচি আনার জন্য তার বাবা বাংলাদেশের প্রায় সব অ্যালোপ্যাথি, হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের দরজায় কড়া নেড়েছেন। সব ডাক্তারই আবিরকে নানা ওষুধ দিয়েছে, আবির নিয়মিত সে ওষুধ খেতোও, কিন্তু রুচির কোনো পরিবর্তন নেই। সে তার আগের মতই। সব জায়গায় ব্যর্থ হয়ে শেষে তাকে জোর করে ভাত খাওয়ানো শুরু হলো ঘরে। কিন্তু তাতে হিতে-বিপরীত। খাবার পেটে যেতে দেরী আছে, কিন্তু বমি করে ফেলে দিতে দেরী নেই। তার বমিতে বাসার একটা কার্পেট সুগন্ধের ঊর্ধ্বসীমা অতিক্রম করে অন্যদেরকেও বমি করতে বাধ্য করতো। এভাবেই খেয়ে, না-খেয়ে বড় হতে লাগলো আবির।

আবির

ছোটবেলায় লেখাপড়ার প্রতি বেজায় ঝোক ছিলো আবিরের। পড়ালেখা করতে তার অনেক ভালো লাগতো। বিশেষ করে তার পড়তে অনেক ভালো লাগতো, যেকোনো বইই। তবে বই পছন্দ করার মধ্যে আবিরের একটু ব্যতিক্রম ছিলো। সাধারণত সবাই অবসরে পড়ার বই হিসেবে গল্প বা উপন্যাস পড়তে পছন্দ করে। কিন্তু আবিরের পছন্দ ছিলো পাঠ্য বই; তাও নিজের না, বড়দের। তার লেখাপড়া শুরু হয় তার মায়ের কাছে, কিন্তু মূলত তার হাতেখড়ি হয় যশোরের একটা কলেজের অধ্যক্ষের কাছে। তার কাছ থেকেই তার হাতের লেখা শেখা, বানান না করে শব্দ পড়ার অভ্যাসও হয় তার কাছেই, নার্সারীতে ভর্তি হওয়ার আগেই সে শব্দ বানান না করেই পড়তে শিখে গিয়েছিলো। স্কুলে ভর্তির সময় স্কুলের প্রধান শিক্ষক ওর জ্ঞান দেখে রীতিমতো অভিভূত হন। প্রথম দিন প্রধান শিক্ষক আবিরকে সাথে নিয়ে নিজে শ্রেণীকক্ষে গিয়ে সহপাঠীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন, সেই সাথে শ্রেণীশিক্ষিকার কাছে আবিরের গুণগান করে গেলেন, বলে গেলেন একটু ভালো করে আবিরের খেয়াল রাখতে। প্রথম দিন আবিরের ভালোই লাগলো স্কুলে।

ভর্তির সময় শ্রেণীতে আবিরের ক্রমিক নং ছিলো ৪০, বছর শেষে শ্রেণী উত্তীর্ণের সময় তার ক্রমমান হলো ২। আবিরের বাবা-মা মোটামুটি খুশী, আর আবিরের এ ব্যাপারে তেমন মাথাব্যথাও নেই যে সে এত ভালো হলেও কেন তার ক্রমমান ২। ইংরেজী শিক্ষকের জোরাজুরিতে পরে তার মাথায় এ কথা ঢুকে। প্রথম যে হয়েছিল সে একটা মেয়ে, নাম নাদিয়া। আবির একদিন ওর খাতা নিয়ে দেখলো যে ওর হাতের লেখা অনেক সুন্দর। আবিরের খুব ভালো লাগলো হাতের লেখাটা। সে স্থির করলো তার হাতের লেখাও সুন্দর করতে হবে। চিন্তামতো সে শুরুও করলো, কিন্তু ওর মতো আর হয় না। ৪ নম্বরের জন্য পরবর্তী শ্রেণীতেও তার অবস্থান ২য় হলো, কিন্তু এর পরের বছর থেকে তার ক্রমমান ১।

৩য় শ্রেণীর পর ৪র্থ শ্রেণী তার আর ঐ স্কুলে পড়া হলো না, সে ভর্তি হলো ঢাকার প্রাণকেন্দ্রের এক স্বনামধন্য স্কুলে। নতুন স্কুলে তার প্রথম দিন মোটামুটি কাটলো। ২য় দিন প্রিয় নামের একটা ছেলের সাথে তার বন্ধুত্ব হলো। তারা দু’জন ছিলো শ্রেণীর “ব্যাকবেঞ্চার”। প্রতিদিন একবারে শেষের বেঞ্চই তাদের বসার স্থান।  প্রিয়র হাতের লেখা ছিলো ইটালিক ফর্মের। ওর ইংরেজী হাতের লেখা দেখে আবিরের খুব ভালো লাগে। আগের স্কুলে তার হাতের লেখার উন্নতি হলেও ততবেশী উন্নতি হয় নি, এখানে আসার পর আবিরের হাতের লেখার আমূল পরিবর্তন আসে।

৬ষ্ঠ শ্রেণী থেকে আবিরের স্থান আর শেষ বেঞ্চ থাকে না। উচ্চতা কম হওয়ায় তার নতুন শ্রেণীশিক্ষিকা তাকে প্রথম বেঞ্চে বসায়। সে বছর অন্য শাখা থেকে বেশ কিছু ছেলে আসে ওর শাখায়, যারা আসে তাদের মধ্যে দু’জন হয় ওদের শাখার ১ম ও ২য়। ভাগ্যক্রমে ওদের উচ্চতাও ছিলো কম, ফলে আবিরের স্থান হয় শ্রেণীর ফার্স্ট এবং সেকেন্ড বয়ের সাথে। প্রথমে ওরা একটু অস্বস্তি বোধ করলেও একটু পরে ঠিক হয়ে যায়, ওদের মাঝে বেশ ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠে।

৭ম শ্রেণীতে এসে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়। বন্ধুত্বের পরিসীমা বাড়ে, আরো অনেক জনের সাথে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠে আবির। ৮ম শ্রেণীতে চলতে থাকে সেরূপেই। ৯ম শ্রেণীতে এসে এই পরিসীমা আরো অনেক অনেক বৃদ্ধি পায়। শাখার সকল ছেলেরা বলতে গেলে দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়, একটা ব্রিলিয়ান্ট জোন, আরেকটা গ্যাং জোন। ১০ম শ্রেণীর শেষের দিকে আবিরকে শ্রেণীকক্ষে কম, বাইরে বেশী দেখা যেতো তার নতুন এক বন্ধুর সাথে। এক স্বনামধন্য কোচিং সেন্টারেও ভর্তি হয় আবির, তার গ্রুপের প্রায় সবাই ভর্তি হওয়ার কারণে। আবিরের কোচিংয়ের গ্রুপটা ছিলো আরো বড়, এখানে আরো কয়েকটা স্কুলের ছেলেমেয়ের সাথেও তার পরিচয় হয়। কোচিং শেষে আড্ডা, কোচিং ফাঁকি দিয়ে আড্ডা; দিনগুলো অনেক ভালোই কাটছিলো আবিরের।

এই ভালো দিনগুলোর মাঝে আবিরের চোখ রঙ্গীন ও কাঁধে পাখা গজায়। এসময় এক মেয়েকে তার অনেক পছন্দ হয়ে যায়, একটা দিন দেখে সে ওকে প্রপোজও করে ফেলে। সুপার ফাস্ট! সে মেয়েটা তাকে বললো যে তার জবাব পরে জানাবে সে।

মোটামুটিভাবে আবিরের দিন কেটে যাচ্ছিলো। এস.এস.সি শেষ হলো। আবির জিপিএ ৫ পেলো। ঢাকায় যাতায়াতের সমস্যার কারণে আবিরের বাবা আবিরকে তাদের এলাকার এক কলেজে ভর্তি করে। সেখানে সময় কাটতে চায় না আবিরের। ক্লাসে কোনো মনোযোগ নেই, খাতাটা বের করে মনের কথাগুলো লেখে যাচ্ছে। সারাটা ক্লাস বলতে গেলে সে রোজনামচা লেখেই কাটালো। কি যে সব লেখলো সে! কি যেন মিস করছে, কি যেন কি চাচ্ছে তার মন!

ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে উঠে গেছে আবির। এস.এস.সি-র আগে থেকে শুরু করে বর্তমান সময়ের মাঝে ঘটে গেছে অনেক ঘটনা। কলেজে এখন মোটামুটি সয়ে যায় আবিরের, তবে এক বছর পড়ার পরও এই কলেজে আবির কাউকে পায় নি যাকে সে বন্ধু বলবে, তার বন্ধু তার সেই স্কুলের সাথীগুলোই। তবে আবিরের মাঝে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আবির সিগারেটের ঘোর বিরোধী ছিলো, সেই আবির এখন হররোজ সিগারেট খায়। আবিরের অনুভুতিগুলোও অনেকটা ভোঁতা হয়ে গেছে।

একদিন সন্ধ্যার সময় আবির ওর দুই বন্ধুর সাথে আড্ডা দেয়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে এক বন্ধুর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আবির বাকী বন্ধুটাকে সঙ্গী করে বন্ধুটার বাসায় এগিয়ে দেয়ার জন্য পা বাড়ায়। কিন্তু তার সাথে আবিরের আড্ডা হয় রাত নয়টা পর্যন্ত! সেদিন ও আবিরকে জিজ্ঞাসা করে সে সিগারেট খায় কেন? সেদিন আবির ওর বন্ধুকে নিজের ব্যাপারে, নিজের চিন্তাধারার ব্যাপারে একটা ধারণা দেয় তাকে। এক নৃশংসতার, হিংস্র আনন্দের কথা বলে তাকে। ফলে আবির হালকা উত্তম-মধ্যম খায় তার কাছে। আর আবিরকে ভালো হয়ে যেতে বলে। পরদিন কলেজে ক্লাসের সময় আবির গতরাতের কথা ভাবছে, ভাবতে ভাবতে ওর খাতায় সে লিখতে শুরু করলো।
“‘মানুষ’, ‘মানুষের নাম হিসেবে ‘মানুষ’-কে চয়ন করার কারণ কি? এক্ষেত্রে নানা মুনির নানা মত। ‘মান’ ও ‘হুঁশ’ এদের সমন্বয়ে নাকি ‘মানুষ’। যার মান বা হুঁশ অথবা কোনোটিই নেই, সে মানুষের পর্যায়ে পড়ে না। তাহলে আমি?! আমি তো আমার মাঝে শুধু শুন্যতা অনুভব করি, শুধু শুন্যতা। তাহলে আমি কি? রহস্যের ঘন অন্ধকার? যে অন্ধকারে আমি নিজেকেও খুঁজে পাই না।।
কারো সান্নিধ্য দরকার, নিজেকে খুঁজে পাওয়ার জন্য; যে আমাকে অন্ধকারে পথ চলতে শেখাবে, যে আমার পাশে থাকবে, যার সঙ্গে আমি অন্ধকারে আলো দেখবো, আমার আলোর দিশারী। পাবো কি তার দেখা? আদৌ পাবো কি? নাকি হিংস্র আনন্দের হিংস্র নেশায় ডুবে যাবো আমি। ভুতপূর্বে নিভৃতে তাকালে যা শুধু আমায় যন্ত্রণা দিবে।
পাবো কি কাউকে যে আমায় রক্ষা করবে? আদৌ কি পাবো?”

কলেজ লাইফ শেষে একটা পাবলিক ভার্সিটিতে ভর্তি হলো আবির। লেখাপড়া চলছে মোটামুটি। আড়াই বছরে সে ভালোই পরিচিতি লাভ করেছে ভার্সিটিতে; শিক্ষক-শিক্ষিকা, সহপাঠী, চায়ের দোকানদার সবার সাথেই সে পরিচিত। ভাব নিয়ে ক্যাম্পাসে যায়, ক্লাস শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরে। আবিরের অবস্থা এখন বেশ ভালো, সবদিক দিয়েই অনেক দূর এগিয়েছে। অনেকটা রোবট হয়ে গেছে সে, অনুভুতিহীন। তবুও সে চলে, চলছে, চলে যাবে কোনো এক ভাবে…

আবির

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

আসাদুজ্জামান নূর অন্তর
 

"আসাদুজ্জামান নূর" শব্দ দু'টোর আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় "কালের সিংহ মানে সময়ের বীর, আলো/ আলোপ্রাপ্ত/ আলোকিত বা আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতের আলোয় আলোকিত"... জানি না আমি তেমন কিনা.. আশায় আছি, এক প্রানবন্ত ভবিষ্যতের.. ফেসবুকে, টুইটারে, গুগল প্লাসে আমি

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়