3

আত্মউন্নয়ন – ঘুম সম্পর্কে যা যা জানা দরকার…

মানুষ তার জীবনের তিন ভাগের এক ভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু বর্তমানে যান্ত্রিক জীবনে হয়তো এই সত্যটাও মিথ্যে হতে বসেছে।  মোবাইল, কম্পিউটার, ট্যাব, ল্যাপটপ, টিভিসহ নানান যান্ত্রিকতায় ব্যতিব্যস্ত হয়ে আমরা আমাদের শরীরের জন্যে প্রয়োজনীয় ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছি। যেখানে ৭-৯ ঘন্টা ঘুম দরকার আমাদের, সেখানে হয়তো আমরা ৫ ঘন্টাও পাচ্ছিনা ঘুমানোর জন্যে। অনেকে আবার সারা সপ্তাহের কম ঘুমানোর ব্যাপারটা উসুল করতে বন্ধের দিনগুলোতে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে থাকেন। আর কারোই কোন নির্ধারিত টাইম-টেবিল নেই ঘুমানোর জন্যে। বিশেষ করে যারা ছাত্র, তারা অতিরিক্ত রাত জেগে একেকদিন একেকসময়ে ঘুমাচ্ছে আর পর্যাপ্ত ঘুম পাচ্ছেনা। নিজের অজান্তেই যে এসব করে আমরা আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি করে চলেছি তা বলার অপেক্ষা রাখেনা।

গত প্রায় দেড় বছর যাবত আমিও অনিয়মিতভাবে ঘুমাচ্ছিলাম। পড়ালেখাতো করিই না, হাবিজাবি করে করে অনেক রাতে ঘুমাতাম, আর সকাল সকাল উঠে পড়তাম। পর্যাপ্ত ঘুম হতোনা কখনোই, ফলাফল – সারাদিনই নিজেকে ক্লান্ত মনে হতো। কিন্ত সবসময় এভাবে থাকলে তো চলেনা। সারাদিনের ক্লান্তি আমার দৈনন্দিন জীবনে খারাপ প্রভাব ফেলতো। আর প্রচুর পরিমাণে চা-কফি খেয়েও শরীরের বারোটা বাজিয়েছি। সময় থাকতে নিজের পরিবর্তন দরকার, আর এখন সেই চেষ্টাতেই আছি। এই পোস্টে ঘুম সম্পর্কে যা যা জানা দরকার সেগুলোই তুলে ধরা হবে একে একে।

আগেই যেনে নেয়া যাক ঘুম ও ঘুমের স্তরগুলো সম্পর্কে।

ঘুমের স্তর

আমাদের ঘুম কে মূলত দুই স্তরে ভাগ করা যায়।

  • নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (নন-রেম)
  • র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (রেম)

এই দুইটা স্তরই আমাদের জন্যে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের প্রতিদিনকার ঘুমের ক্ষেত্রে এই দুইটা স্তরই পরিপূর্ণ হওয়াটা জরূরী। তবে যারা অল্প সময় করে বার বার ঘুমান, অর্থাৎ একটানা লম্বা ঘুম দেন না। তাদের রেম স্তর পাওয়ার সম্ভাবনা কম, পেলেও সেটা অল্প পরিমাণে। যা ক্ষতিকর আমাদের মস্তিষ্কের জন্যে।

নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (নন-রেম) – নন রেম ঘুম বলতে আমরা ঘুমাতে যাওয়ার পর থেকে গভীর ঘুমের চলে যাওয়ার সময় পর্যন্ত আমরা যে স্তরে থাকি সেটাকে বলা হয় নন র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট। একে আবার আরো তিনভাগে ভাগ করা যায়। যার প্রথমটাতে ব্যক্তি ঘুম এবং জাগ্রত হওয়ার মাঝামাঝিতে থাকবেন। পরবর্তী দু’টি স্তর ব্যক্তিকে গভীর ঘুমের দিকে পথ দেখাবে।

র‍্যাপিড আই মুভমেন্ট (রেম) – ঘুমের এ পর্যায়ে ব্যক্তির চোখ ঘুমন্ত অবস্থাতেই খুব দ্রুত নড়তে থাকবে।  পূর্ণবয়স্ক মানুষ তার মোট ঘুমে ২০-২৫% সময় রেম স্তরে কাটায়।

এবার আসা যাক নন রেম আর রেম এই দুস্তর মিলিয়ে ঘুমের প্রয়োজনীয়তা কি সেটায়।

ঘুম কেন প্রয়োজনীয়

অল্প ঘুমের জন্যে ক্লান্তি

  • সারাদিনের কর্মকাণ্ডে শরীরের উপর দিয়ে যে ধকল গেছে, সেটা সেরে উঠতে ঘুমের প্রয়োজন আছে। শরীরের বৃদ্ধি হরমোনগুলো এসময় শরীরে ক্ষয়প্রাপ্ত স্থানগুলো পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা করে, আর শরীরের বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।
  • দিনের সমস্ত অবসাদ দূর করে পরবর্তী দিনের জন্যে ব্যক্তিকে প্রস্তুত করে তুলে। ঘুম যথাযথ না হলে অবসাদ সম্পুর্ণ রূপে দূর হবেনা। এতে করে পরবর্তী দিনও ব্যক্তি দূর্বল ও ক্লান্ত অনুভব করবে। সারাদিনের সমস্ত কাজেই যা খারাপ প্রভাব ফেলবে।
  • সারাদিনের সব স্মৃতিগুলোকে গোছগাছ করে দীর্ঘসময় মনে রাখার মতো ব্যবস্থা করে।
  • ঘুমের পরিমাণ কম হলে ব্লাড প্রেসার আর কোলেস্টোরেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায়র সম্ভাবনা আছে। যা কিনা হৃদরোগের আর স্ট্রোকের ঝুকি বাড়িয়ে দিবে। অর্থাৎ এগুলো এড়িয়ে সুস্থ থাকতে চাইলে পর্যাপ্ত  ঘুমের প্রয়োজন।
  • ঘুমের পর পর শরীর একদম চাঙ্গা থাকে। যেকোনো রকম কাজ খুজ মনোযোগ সহকারে আর পুরো উদ্দমে করা যায়। যা আমাদেরকে আরো কর্মঠ বানাবে।
  • পর্যাপ্ত ঘুমের ফলে যেহেতু আমাদের সারাদিনে সংগৃহীত তথ্যগুলো সুন্দর ভাবে সাজানো হয় সেহেতু প্রয়োজনের সময় সেই তথ্যগুলোর সঠিক ব্যবহার সম্ভব হয়। একই সাথে চিন্তাশক্তিও ভালো হয়। যা দৈনন্দিন জীবনে আমাদেরকে আরো প্রোডাক্টিভ করে তুলবে।
  • মানসিক ভাবে চাঙ্গা রাখতেও ঘুমের জুড়ি নেই। অনেকেই হীনমন্যতায় ভুগে থাকে, যার অন্যতম কারণ অপর্যাপ্ত ও অনিয়মিত ঘুম। পরিমিত ঘুম হীনমন্যতা কাটিয়ে মানসিকভাবেও আমাদের ফুরফুরা করে দেয়।

ঘুমের উন্নতির জন্যে যা যা করা দরকার

ঘুমানোর জন্যে নির্ধারিত সময়

  • ঘুমের সময়সীমা নির্ধারণ – ঘুমানোর জন্যে একটা নির্দিষ্ট সময়সীমা তৈরি করে নেয়া বাঞ্ছনীয়। প্রতিদিন একই সময়ে ঘুমুতে যাওয়া আবার একই সময়ে ঘুম থেকে উঠার অভ্যেস গড়ে তুলতে হবে। সার্কাডিয়ান রিদম নামে আমাদের শরীরের নিজস্ব একটি ঘড়ি আছে। আপনি যদি নিয়মিত একই সময়ে ঘুমানোর এবং একই সময়ে ঘুম থেকে উঠার অভ্যেস করে তুলেন তাহলে সার্কাডিয়ান রিদম আপনার সময়ের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নিতে পারবে। অভ্যাস হয়ে গেলে দেখবেন প্রতিদিন ঐ একই সময়ে আপনার ঘুম আসছে, আবার একই সময়ে কোন প্রকার অ্যালার্ম ছাড়াই ঘুম থেকে উঠে পড়তে পারছেন। প্রতিদিন যদি রাত ১০.৩০-১১টায় ঘুমান এরপর ফজরের ওয়াক্তে নামায পড়ে পুনরায় ঘুমান তাহলেও আপনি সাড়ে সাত থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুম আপনার জন্যে নিশ্চিত করতে পারছেন প্রতিদিনই।  আর এই পরিমাণ ঘুম আপনাকে নতুন দিনের সুন্দর সুচনার জন্যে অসম্ভবরকম সহায়তা করবে।
  • শক্ত বিছানা ব্যবহার – সবসময় শক্ত বিছানায় ঘুমানোর চেষ্টা করা উচিৎ। তবে তাই বলে মাটিতে ঘুমানো যাবেনা। শক্ত ফোম বা সাধারণ যে তোষক আমরা ব্যবহার করি সেগুলোই যথেষ্ট।
  • শান্ত ঘরে ঘুমানো – কোলাহলপূর্ণস্থানে কখনোই ভালোভাবে ঘুমানো সম্ভব না। আপনার বাসা যদি এমন কোন স্থানে হয় যেখানে আশেপাশে খুব বেশি শব্দ তাহলে যদি পারা যায় সেই এলাকা ত্যাগ করুন নয়তো অন্য কোন ভাবে দরজা-জানালা লাগিয়ে শব্দ কমানোর চেষ্টা করুন। বিদেশে অনেকেই ঘুমের সুবিধার্থে এয়ারবাড ব্যবহার করে। আপনি চাইলে জীবাণুমুক্ত তুলাও ব্যবহার করতে পারেন শব্দ কমানোর জন্যে। তবে আমাদের এখানে কানে তুলা দিয়ে ঘুমানোটাও বিপজ্জনক। রাতে কোন দূর্ঘটনা ঘটলে দেখা যাবে সারা বাড়ি তোলপাড় হয়ে গেছে অথচ আপনি খোজই পাননি কোন। তবে শব্দের উৎস যদি আপনার পরিবারেই হয়ে থাকে,(যেমন টিভি দেখা, গান বাজানো) তাহলে পরিবারের সদস্যদের অনুরোধ করুন যেন তারা আপনার ঘুমের সময় এগুলো থেকে বিরত থাকে।
  • ঠাণ্ডা স্থানে ঘুমানো যদি সম্ভব হয় তাহলে ঠাণ্ডা রুমে ঘুমানো। বাসায় এসি থাকলে স্লিপ মোডে দিয়ে দিন, যদি এমন মোড না থাকে, তাহলে ঘুমানোর আগে কিছুক্ষণ এসি চালিয়ে রুম ঠাণ্ডা করে এসি বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন। ঘর ঠাণ্ডা থাকলে ঘুম ভালো হয়। শীতের দিনের কথাই একবার ভাবুন না। ঘুম বারবার ভাঙার পরেও কারো উঠতে ইচ্ছে করেনা। মনে হয় আরো একটু ঘুমাই। বাসায় যদি এসি না থাকে, তাহলে পুরো ঘরে অল্প পানি ছিটিয়ে ঘুমান। পানি স্বাভাবিক তাপমাত্রাতেও বাষ্পে পরিণত হয়। তাই ধীরে ধীরে সে পানি বাষ্প হয়ে আপনার ঘরের আবহাওয়ার সাথে মিশে খানিকটা হলেও ঘর ঠাণ্ডা করতে সহায়তা করবে। তাছাড়া আপনি নিজে ঠাণ্ডা পানি খেয়ে নিতে পারেন আর গোসলও করে নিতে পারেন 🙂
  • ঘর যথাসাধ্য অন্ধকার করুন – গ্রামে যেসকল স্থানে বিদ্যুৎ নেই, তাদের কেরোসিন বা হারিকেন নেভানো মাত্রই ঘরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। কিন্তু শহরে সেই সুযোগ নেই। আপনার ঘরের বাতি বন্ধ করলেও দেখা যাবে অন্য কোথাও থেকে আলো এসে পড়ছে আপনার ঘরে। তাই অনেক সময় চাইলেও আপনি বাতি বন্ধ করে অন্ধকার করতে পারছেন না ঘর। সেক্ষেত্রে ঘরে পর্দার ব্যবস্থা করুন। আপনার ঘরের বাতি নেভানোর পরে পর্দা টাঙিয়ে নিন। তাহলে অনেকাংশেই অন্ধকার করতে সমর্থ হবেন ঘরকে। অন্ধকার ঘরে ঘুম ভালো হয়। সকালের কথা মনে করুন, আপনি ঘুমাচ্ছেন এমন সময় সূর্যের আলো মুখে পড়লে নিঃসন্দেহেই ঘুম ভেঙ্গে যাবে !
  • ঘুমানোর আগে চা/কফি এড়িয়ে চলুন – ঘুমানোর অন্তত ৩-৪ ঘণ্টা আগে কোন চা-কফি পান করবেন না। ক্যাফেইন আমাদের শরীরে দীর্ঘসময় কাজ করে। যা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে সক্ষম। চেষ্টা করবেন ঘুমানোর আগে যে চা-কফি কিংবা অন্য কোন উত্তেজক কিছু না খাওয়া হয়।
  • ঘুমানোর আগে কোন ব্যায়াম করবেন নাঘুম থেকে উঠার পর করনীয় কাজগুলোর মধ্যে ব্যায়ামকে রাখাটা যুক্তিযুক্ত। কিন্তু ঘুমানোর আগে কোনভাবেই ব্যায়াম করা উচিৎ না। অন্তত ৩-৪ ঘন্টা পূর্বে তো কখনোই না। ব্যায়াম ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।
  • অন্তত ২ ঘন্টা আগে খাওয়া শেষ করা  – ঘুমানোর অন্তত ২ ঘন্টা আগে খাওয়া-দাওয়ার কাজ শেষ করে ফেলা উচিৎ। ভরপেট খাওয়ার পর ঘুমানো হৃদরোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে।
  • সিগারেট ত্যাগ করতে হবে – ভালোভাবে ঘুমানোর জন্যে অবশ্যই আপনাকে ধূমপান ত্যাগ করতে হবে। গবেষণায় দেখা গেছে যারা ধূমপায়ী তারা সাধারণ মানুষের চেয়ে অধিক সময় হালকা ঘুমে কাটায়। অর্থাৎ গভীর ঘুমে যাওয়ার জন্যে ধূমপায়ীদের বেশি সময় প্রয়োজন। পিপীলিকার লেখক জয়ের লেখা “দেশ বাঁচাতে ধোয়া” শীর্ষক আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।

মনে রাখবেন ঘুম আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুতেই ভূমিকা রাখতে পারে। সুস্থ-সবলভাবে বেঁচে থাকার জন্যে নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের দরকার আছে। সারাদিনের ক্লান্তি দূর করে পরবর্তী দিনের জন্যে নিজেকে প্রস্তুত করার জন্যে ঘুমের প্রয়োজন। প্রতিদিন অন্তত ৭-৮ ঘন্টা ঘুমান আর সুস্থ থাকুন। 🙂

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

আরিফুল ইসলাম পলাশ
 

বর্তমানে ঢাকার এক স্বনামধন্য কলেজে অধ্যয়নরত। লেখালেখির ঝোক ছোটবেলা থেকেই। ব্লগিং এ হাতেখড়ি সেই সপ্তম শ্রেণীতে। তখন ঠিকমতো টাইপ করতে পারতাম না, খুব কষ্ট হতো লিখতে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখন কিবোর্ড চলে বুলেটের মতো। তাই ইচ্ছা আছে বাংলায় তথ্যসমৃদ্ধ ইন্টারনেট দেখার। সেই ভেবেই পিপীলিকাতে লেখা। :) ফেসবুকে আমি

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়