2

ফ্রিল্যান্সিং কি এবং কেন?

[youtube https://youtu.be/L2v2CxmZHMU]

দীর্ঘদিন ইন্টারনেট ব্যবহার করে থাকলে ইতোমধ্যেই “ফ্রিল্যান্সিং”, “ফ্রিল্যান্সার” শব্দগুলো বেশ অনেকবার শুনে থাকবেন আশা করি। যদি শুনে নাও থাকেন তাহলে টিভিতে, খবরে, অনলাইনে ডুল্যান্সারের  মতো ব্যাঙ্গের ছাতার কথা নিশ্চয়ই শুনেছেন যারা রীতিমত খোলামেলা ভাবে ডাকাতি করে মানুষের কষ্টার্জিত টাকা হাতিয়ে নিয়েছিল। ডুল্যান্সারের মতো কোম্পানিগুলোর কারণে ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে অনেকের মধ্যেই ভ্রান্ত ধারণা সৃষ্টি হয়েছে। সেই ধারণা ভাঙ্গানোর জন্যেই মূলত এই পোস্ট।

ফ্রিল্যান্সিং সম্পর্কে মানুষের ধারণা যে কতটা অস্পষ্ট তা জানার জন্যে হারিকেন হাতে নিয়ে খুঁজতে হবেনা। চারপাশেই অনেককে পেয়ে যাবেন যাদের ধারণা রীতিমত হাস্যকর। কম্পিউটার-ইন্টারনেট সম্পর্কে ধারণা রাখে এমন অনেকেই হাস্যকর উত্তর দিয়ে আপনার পেট ফাটিয়ে দিবে। ৭-৮ পড়ুয়া আমার এক ভাগিনার ধারণা ছিলো ফ্রিল্যান্সিং খুব সোজা। ঘরে কম্পিউটারের বসে বসে কেবল কিছু নির্ধারিত স্থানে ক্লিক করলেই নাকি টাকা পাওয়া যায় ! কারো কাছ থেকে হয়তো পিটিসির ব্যাপারটা শুনেছিলো। আর সেটাকেই সে ফ্রিল্যান্সিং হিসেবে ধরে নিয়েছে। এমন ধারণা যারা রাখে তারা কি এইটুকু ভেবে দেখে না যে, বিনা পরিশ্রমে কি কেউ কাউকে দিনের পর দিন টাকা দিয়ে যাবে? বিদেশীদের টাকার কি কোন মূল্য নেই নাকি? 😉

ফ্রিল্যান্সিং কি?

ফ্রিল্যান্সিং কি সে সম্পর্কে এক কথায় পুরো ধারণা দিয়ে দেয়াটা মুশকিল। ঘরে বসে স্বাধীনভাবে টাকার বিনিময়ে অন্যের কাজ করে দেয়াটাকে আমরা ফ্রিল্যান্সিং বলতে পারি। সেই কাজ বিদেশী কোন কোম্পানী বা ব্যক্তির জন্যেও যেমন হতে পারে তা দেশের কোন ব্যক্তি বা কোম্পানীর জন্যেও হতে পারে। যে ব্যক্তি ফ্রিল্যান্সিং করবেন তিনি কোন কোম্পানী বা প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী হিসেবে থাকেন না। তিনি নিজেই নিজের বস। যখন খুশি কাজ করবেন যখন খুশি কাজ করবেন না। যেসব বিষয়ে তার পারদর্শিতা আছে সেসব কাজের জন্যে বিভিন্ন ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসে পছন্দ অনুযায়ী কাজে আবেদন করবেন। যদি কাজের জন্যে নির্বাচিত হন তাহলে ক্লায়েন্টের দেয়া নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাহিদামত কাজ করে দেন। আর এই কাজের বিনিময়ে তিনি টাকা আয় করতে পারবেন।

তবে চাকরি, ব্যবসা, পড়াশোনার পাশাপাশিও অনেকে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে। সেক্ষেত্রে তাদেরকে পার্ট-টাইম ফ্রিল্যান্সার হিসেবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। ফ্রিল্যান্সিং আসলে একটা বড় ধরণের স্বাধীনতা। তবে ফ্রিল্যান্সিং এর উপরে দেশের সম্মানও অনেকাংশে নির্ভর করে। কোন যোগ্যতা ছাড়া ফ্রিল্যান্সিং করতে আসা দেশের মান-সম্মান ধুলিস্যাৎ করে দেয়ার সামিল ! ফ্রিল্যান্সিং করতে চাইলে অবশ্যই যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে !

ফ্রিল্যান্সিং কেন?

ফ্রিল্যান্সিং কেন করা হয় এটার উত্তরও ঠিক এক কথায় দিয়ে দেয়া অসম্ভব। একজন মানুষ বিভিন্ন কারণে ফ্রিল্যান্সিং করতে পারে। কেউ হয়তো ফ্রিল্যান্সিং কে তার প্রধান আয়ের মাধ্যম বানিয়ে নিয়েছে। আবার কারও কাছে এটা শুধু পকেট মানি আয়ের জন্যে। কেউ ফ্রিল্যান্সিং কেন করে সেটা পয়েন্ট আকারে তুলে দেয়াটাই বোধহয় ভালো হবে ।

মানুষ কেন ফ্রিল্যান্সিং করে?

  • গতানুগতিক চাকরি/ব্যবসার বাহিরে স্বাধীনভাবে কাজের ইচ্ছা  – ফ্রিল্যান্সিং এ আসার পিছনে এটা অনেক বড় একটা কারণ হতে পারে। অনেকেই স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দমতো বিষয়ে কাজ করতে আগ্রহী। সে হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং-ই থাকে তাদের পছন্দের শীর্ষে। নিজের ঘরে কাজ করতে পারার মতো স্বাচ্ছন্দ্যবোধ আর কোথাও হওয়ার কথা না। ফ্রিল্যান্সিং একজনকে তার নিজের ঘরে বসে এমনকি যেকোনো জায়গা থেকেই কাজ করার সুযোগ দেয়। আপনি যদি টয়লেটে বসেও ফ্রিল্যান্সিং করতে চান কেউ আপনাকে শাসাতে আসবেনা যে কেন অফিসের রুম ছেড়ে এখানে বসে আছেন! 😉
  • টাকা আয়ের জন্যে – যেকোনো ফ্রিল্যান্সারের ফ্রিল্যান্সিং করার মূল কারণের একটি টাকা আয়। আপনি যে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন, সেই কাজের জন্যেই যদি আপনি টাকা আয় করতে পারেন; নিজের সংসার চালাতে পারেন তাহলে মন্দ কি? তাছাড়া ফ্রিল্যান্সিং করে আয় করা টাকার পরিমাণ নিছকই কম হবেনা যদি কেউ যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন হয়ে থাকে। তাছাড়া আপনার কাজের জন্যে আপনি কত টাকা চাচ্ছেন সেটা আপনি আপনার মতো করে নির্ধারণ করবেন। যদি ক্লায়েন্ট তার মতো করে কম বাজেট দেয় আর তা আপনার পছন্দ না হয় তাহলে সে কাজ করবেন না ! সিম্পল ! কেউ আপনাকে আটকাবেনা এর জন্যে ! কাজ আপনার, যোগ্যতা আপনার, বাজেটও আপনার !
  • যোগ্যতা থাকার পরেও উপযুক্ত কাজ/স্যালারি না পাওয়া – অনেকেরই অনেক রকমের যোগ্যতা আছে। তবে অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন হওয়ার পরেও তার কাজের তেমন মূল্যায়ন হচ্ছেনা। তিনি তার যোগ্যতা অনুযায়ী স্যালারি পাচ্ছেন না। তাহলে তিনি ফ্রিল্যান্সিং এর দিকে ঝুকতে পারেন। তিনি যা পারেন, দেশে হয়তো তার চাহিদা নেই কিন্তু বহির্বিশ্বে তার ব্যাপক চাহিদা থাকতে পারে।  উদাহরণস্বরুপ – পটল মিয়া মনে করেন গেম ডেভেলপিং এ তার অসাধারণ প্রতিভা আছে। তিনি এই লাইনে কাজ করতে পারলে রীতিমত ফাটিয়ে ফেলবেন। কিন্তু আমাদের দেশে এখনো গেম ডেভেলপমেন্ট সেক্টর তেমনভাবে গড়ে উঠেনি। তাই তিনি যোগ্যতা থাকার পরেও বেকার হয়ে থাকবেন। অথচ বাহিরে প্রচুর চাহিদা রয়েছে গেম ডেভেলপারদের। তিনি ফ্রিল্যান্স গেম ডেভেলপার হিসেবে দেশে বসেই বাহিরের কাজ করে দিয়ে টাকা আয় করতে পারেন। ফ্রিল্যান্স গেম ডেভেলপারের চাহিদাও কিন্তু নিছক কম নয় !

তো আমরা বুঝতে পারলাম কেন কেউ ফ্রিল্যান্সিং এর দিকে ঝুকে। এবার তাহলে জানা যাক কেন ক্লায়েন্ট ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে কাজ দিয়ে থাকে –

মানুষ কেন কাজ করানোর জন্যে ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেস বেছে নেয় ?

  • খরচ কমানো – ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে কাজ করানোর পিছনে খরচ কমানো অনেক বড় একটা কারণ। উদাহরণস্বরুপ – আমেরিকায় একজন গ্রাফিক ডিজাইনারের গড় বেতন ৪,22০ ডলার যা বাংলাদেশী টাকায় প্রায় ৩ লাখ ১৭ হাজার টাকার মতো। এতো টাকা দিয়ে কেউ একজন গ্রাফিক ডিজাইনারকে বেতন দিয়ে না রেখে যদি তার সারা মাসের প্রয়োজনীয় গ্রাফিক ডিজাইনের কাজ ফ্রিল্যান্সারদের দিয়ে হাজার ডলারের মধ্যে ম্যানেজ করতে পারেন তাহলে তিনি ৩,১১০ ডলার বা ২ লাখ ৪০ হাজার টাকা বাঁচাতে পারবেন ! অনেকে ভাবতে পারেন যে এতে শুধু যারা কাজ করায় তাদেরই লাভ, যারা ফ্রিল্যান্সিং করে তাদের লস। তাদের ধারণাও ভুল। আমাদের দেশের একজন গ্রাফিক ডিজাইনার যিনি কোন কোম্পানীতে চাকরি করেন তাদের গড় আয় যদি আমরা ৪০ হাজার টাকা ধরি (যদিও বাস্তবে এর চেয়ে অনেক নিচে) । সেই একই ব্যক্তি যদি তার পছন্দমতো কাজ করে ১০০০ ডলার আয় করতে পারেন তাহলে তিনি তার বেতন থেকেও প্রায় ৩৭ হাজার টাকা বেশি আয় করতে পারবেন ! প্রায় দ্বিগুণ ! তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি একই কাজের মাধ্যমে দুই পক্ষই একটু আকটু না অনেকটাই লাভবান হচ্ছেন !
  • যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ পাওয়া – যে কেউ ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে তার কাজের যোগ্যতা রাখে এমন কাউকে খুঁজে, তার পূর্ববর্তী কাজ যাচাই করে, পূর্বে যাদের কাজ সে করেছে তাদের রিভিউ দেখে তার কাজ করাতে পারবেন। মানে তিনি কাজের পূর্বেই অনেক যাচাই বাছাই করে জেনে নিতে পারছেন যে কে তার কাজের জন্যে বেশি যোগ্যতাসম্পন্ন। তাছাড়া অনেক কাজের জন্যে নির্দিষ্ট অঞ্চলের যোগ্যতা সম্পন্ন মানুষ প্রয়োজন হতে পারে। ধরা যাক আপনি কোন ম্যাগাজিনের জন্যে কোন আর্টিকেল লিখছেন। সেখানে চায়নার কোন অঞ্চলের কোন ঐতিহ্যবাহী জিনিস সম্পর্কে লিখছেন। আপনার লেখার সাথে সেই জিনিসের ছবি জুড়ে দেয়া প্রয়োজন। অথচ নেটে আপনি তেমন কিছু পান নি। এক্ষেত্রে আপনি চায়নার কোন  ফ্রিল্যান্স ফটোগ্রাফারকে হায়ার করতে পারেন উক্ত কাজের জন্যে। ছবি আপনি আপনার পছন্দমতো ঠিকই পাচ্ছেন, তাও আবার ঘরে বসে। আপনাকে প্লেন ভাড়া করে চায়নায় যেতে হচ্ছেনা, কোন কষ্ট করতে হচ্ছেনা। শান্তি !
  • কাজের চাপ কমানো – কাজের চাপ কমানোর জন্যেও অনেকে ফ্রিল্যান্সারদের বেছে নেন। যেমন কেউ একজন ওয়েবসাইট তৈরী করছেন। তিনি সংশ্লিষ্ট সব কাজ করারই যোগ্যতা রাখেন। কিন্তু কাজটা তার একটা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করতে হবে। সেক্ষেত্রে তিনি চাইলে একজন ফ্রিল্যান্সার হায়ার করে তাকে দিয়ে কাজটা করাতে পারেন। অনেক সময় ফ্রিল্যান্সাররাও তাদের কাজের চাপ কমাতে অন্যদের হায়ার করে কিছু চাপ কমানোর চেষ্টা করেন।

কি কি বিষয়ে ফ্রিল্যান্সিং করা যায়?

ফ্রিল্যান্সিং কোন নির্দিষ্ট বিষয়ের গন্ডিতে আটকে নেই। নানা-রকম বিষয়ের কাজ পাওয়া যায় ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে। ওয়েব ডিজাইন, গ্রাফিক ডিজাইন, আর্টিকেল রাইটিং, সার্চ ইঞ্জিন অপটিমাইজেশন , গেম ডেভেলপমেন্ট, প্রোগ্রামিং, ফটোগ্রাফি , ডাটা এন্ট্রি, মোবাইল অ্যাপলিকেশন তৈরি থেকে শুরু করে আরও নানা রকমের কাজ পাওয়া যায়। ফ্রিল্যান্স মার্কেটপ্লেসগুলোতে ঘুরলেই তা জানতে পারবেন।

ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে এই লেখাটাও আপনার ভালো লাগতে পারে –

লিখতে লিখতে এতো বড় হয়ে যাবে ভাবিনি। যাই হোক ধৈর্য্য নিয়ে পুরোটা পড়ার জন্যে ধন্যবাদ। ফ্রিল্যান্সিং নিয়ে পিপীলিকার আরও পোস্ট শীঘ্রই আসছে। আমাদের সাথেই থাকুন !

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

আরিফুল ইসলাম পলাশ
 

বর্তমানে ঢাকার এক স্বনামধন্য কলেজে অধ্যয়নরত। লেখালেখির ঝোক ছোটবেলা থেকেই। ব্লগিং এ হাতেখড়ি সেই সপ্তম শ্রেণীতে। তখন ঠিকমতো টাইপ করতে পারতাম না, খুব কষ্ট হতো লিখতে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখন কিবোর্ড চলে বুলেটের মতো। তাই ইচ্ছা আছে বাংলায় তথ্যসমৃদ্ধ ইন্টারনেট দেখার। সেই ভেবেই পিপীলিকাতে লেখা। :) ফেসবুকে আমি

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়