5

লালবাগ কেল্লা – মোঘল সাম্রাজ্যের অসাধারণ নিদর্শন

লালবাগ কেল্লা

ফটো ক্রেডিট – অনুপম শুভ

লালবাগ কেল্লা, মোঘল আমলের বাংলাদেশের একমাত্র ঐতিহাসিক নিদর্শন যাতে একই সাথে ব্যবহার করা হয়েছে কষ্টি পাথর, মার্বেল পাথর আর নানান রঙবেরঙের টালি। লালবাগ কেল্লা ছাড়া আর বাংলাদেশের আর কোন ঐতিহাসিক নিদর্শনে এমন কিছুর সংমিশ্রণ পাওয়া যায় নি আজ পর্যন্ত। প্রায় প্রতিদিন হাজারো দেশি-বিদেশি দর্শনার্থীর পদচারণয় মুখরিত হয় ঢাকার লালবাগ এলাকার এই দুর্গটি।

ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার ঘুরে এসেছি, প্রথমবার যখন যাই তখন শুধু ঘুরেই এসেছি, এর বাইরে কিছু জানার চেষ্টা করি নি। পরে অবশ্য লেখার সুবিধার্থে যাওয়া হয়েছে। তখন চেষ্টা করেছি যতটুকু জানা যায় জেনে নেয়ার যাতে করে এ বিষয়ে মোটামোটি একটা লেখা সাজাতে পারি।

লালবাগ কেল্লা – নামকরণ

স্বাভাবিকভাবে যেকেউ যদি এর নামকরণের কারণ চিন্তা করে তাহলে স্বাভাবিকভাবে তার মাথায় আসবে যে লালবাগে থাকার কারণেই এর নাম লালবাগ কেল্লা রাখা হয়েছে। ধারণাটি মোটেও ভুল নয়, আসলেই এর নামকরণ করা হয়েছে এলাকার উপর ভিত্তি করে।

তবে প্রথমে এর নাম ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন, যাতে এলাকার কোন প্রভাব ছিলনা। একদম শুরুর দিকে এই কেল্লার নাম ছিল “কেল্লা আওরঙ্গবাদ”। নামটা শুনতে যদিও একটু অন্যরকম তবুও সম্রাটদের নামকরণ বলে কথা 😛 তারা এমনটাই পছন্দ করতেন হয়তো।

ইতিহাস

লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু হয় ১৬৭৮ সালে। তৎকালীন মুঘল সম্রাট আজম শাহ এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন। যদিও আজম শাহ খুব কম সময়ের জন্যেই মুঘল সম্রাট হিসেবে ছিলেন। তবুও তার অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি তার এই অসাধারণ কাজটি শুরু করেন। উল্লেখ্য আজম শাহ ছিলেন মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এর পুত্র আর সম্রাট শাহ জাহানের নাতি, যিনি তাজমহল তৈরির জন্যে বিশ্ব মহলে ব্যাপক সমাদৃত।

এই দুর্গ নির্মাণ কাজ শুরু হওয়ার প্রায় এক বছরের মাথায় তার বাবার ডাকে তাকে দিল্লিতে চলে যেতে হয় সেখানকার মারাঠা বিদ্রোহ দমন করবার জন্যে। সম্রাট আজম শাহ চলে যাওয়ার পর দুর্গ নির্মাণের কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যায়। তখন এই দুর্গ নির্মাণের কাজ আদৌ সম্পূর্ণ হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় দেখা দেয়। কিন্তু সকল জল্পনা কল্পনার অবসান ঘটিয়ে তৎকালীন নবাব শায়েস্তা খাঁ পুনরায় লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ শুরু করে দেন কাজ থেমে যাওয়ার প্রায় এক বছর পরে। পুরো উদ্যমে আবার কাজ চলতে থাকে দুর্গ নির্মাণের।

তবে শায়েস্তা খাঁ পুনরায় কাজ শুরু করার প্রায় চার বছরের মাথায় দুর্গের নির্মাণ কাজ আবার বন্ধ হয়ে যায়, এরপর দুর্গটি নির্মাণের কাজ আর শুরু করা হয়নি। নবাব শায়েস্তা খাঁ এর মেয়ে পরী বিবি মারা যাওয়ার কারণেই মূলত শায়েস্তা খাঁ লালবাগ কেল্লার নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেন। পরী বিবির মৃত্যুর পরে সবার মধ্যে দুর্গটি সম্পর্কে বিদ্রূপ ধারণা জন্ম নেয়, সবাই দুর্গটিকে অপয়া ভাবতে শুরু করে দেয়।

পরী বিবির মৃত্যুর পর তাকে লালবাগ দুর্গের মাঝেই সমাহিত করা হয়, আর এরপর থেকে একে পরী বিবির সমাধি নামে আখ্যায়িত করা হয়। পরী বিবির সমাধির যে গম্বুজটি আছে তা একসময় স্বর্ণখোচিত ছিল, কিন্তু এখন আর তেমনটি নেই, তামার পাত দিয়ে পুরো গম্বুজটিকে মুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

দেখার কি কি আছে?

লালবাগ কেল্লার তিনটি বিশাল দরজার মধ্যে যে দরজাটি বর্তমানে জনসাধারণের জন্যে উন্মুক্ত করে দেয়া সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে বরাবর সোজা চোখে পড়ে পরী বিবির সমাধি। সচরাচর টেলিভিশনে, খবরের কাগজে, ম্যাগাজিনে আমরা লালবাগ কেল্লার যে ছবিটি দেখি সেটা মূলত পরী বিবির সমাধির ছবি।

"Pari Bibir Mazar" (পরী বিবির মাজার)...

কেল্লাতে একটি মসজিদ আছে, আজম শাহ দিল্লি চলে যাওয়ার আগেই তিনি এই মসজিদটি তৈরি করে গিয়েছিলেন। তিন গম্বুজ বিশিষ্ট এই মসজিদটি যে কারো দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম। মসজিদটিতে জামায়াতে নামায আদায় করা হয়, সময়-সুযোগ হলে সেখানে থেকে নামায পরে আসতে পারেন আপনি। ঢাকায় এতো পুরনো মসজিদ খুব কমই আছে।

লালবাগ কেল্লাতে এখানে ওখানে বেশ কয়েকটি ফোয়ারার দেখা মিলবে, আমি যে কয়বার গিয়েছি তার কোনবারই ফোয়ারাগুলো চলতে দেখিনি, কখনো চালু করা হয় কিনা জানা নেই। কেল্লাতে সুরঙ্গ পথ ও আছে, শুনেছি আগে নাকি সুরঙ্গ পথগুলোতে যাওয়া যেতো, এখন যাওয়া যায়না। উল্লেখ্য সুরঙ্গ পথ এ যাওয়ার কথাটি নিতান্তই শোনা কথা, সত্যতা যাচাই করিনি। তবে এমনিতে আপনি দেখতে পারবেন সেগুলো, ভেতরে যেতে পারবেন না।

লালবাগ কেল্লায় সর্বসাধারণের দেখার জন্যে একটি জাদুঘর রয়েছে, যা পূর্বে নবাব শায়েস্তা খাঁ এর বাসভবন ছিল আর এখান থেকেই তিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করতেন। জাদুঘরটিতে দেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে। মুঘল আমলের বিভিন্ন হাতে আঁকা ছবির দেখা মিলবে সেখানে, যেগুলো দেখলে যে কেউ মুগ্ধ না হয়ে পারবে না। শায়েস্তা খাঁ এর ব্যবহার্য নানান জিনিসপত্র সেখানে সযত্নে রয়েছে। তাছাড়া তৎকালীন সময়ের বিভিন্ন যুদ্ধাস্ত্র, পোশাক, সেসময়কার প্রচলিত মুদ্রা ইত্যাদিও রয়েছে।

দেখার যোগ্য অনেক কিছুই সেখানে রয়েছে, সবই যদি বলে দেই তাহলে দেখে তো আর তেমন মজা থাকবেনা 😛 । তাই সবচেয়ে ভালো হয় নিজেই গিয়ে দেখে আসুন। আর সেই সাথে আপনি কি কি দেখলেন যা আমি এখানে উল্লেখ করিনি তা কমেন্টে জানিয়ে দিতে পারেন।

কিভাবে যাবেন লালবাগের কেল্লায়?

পুরোনো ঢাকার বিভিন্ন অলি-গলি পেরিয়ে আপনাকে যেতে হবে লালবাগের কেল্লায়। সেখানে যাওয়ার সবচেয়ে উপযোগী মাধ্যম রিকশা। আপনি এই এলাকার আশেপাশেই কোথাও থাকলে বা রিকশা যায় এমন দূরত্বে থাকলে রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারেন সেখানে। যেকোনো রিকশাওয়ালাকে লালবাগ কেল্লা বললেই চিনে ফেলার কথা।

বাসা যদি খুব দূরে হয় তাহলে আপনি সি এন জি নিয়ে আসতে পারেন এখানে। তবে যদি বাসে আসতে চান তাহলে গোলাপ শাহ্‌ মাজার এ নেমে সরাসরি সেখান থেকে রিকশা নিয়ে চলে যেতে পারেন। আপনি চাইলে গোলাপ শাহ্‌ মাজার এর সামনে থেকে টেম্পোতে করেও যেতে পারেন। টেম্পোতে গেলে অবশ্যই পকেট সাবধানে রাখবেন। গুগল ম্যাপস থেকে দেখে নিতে পারেন লালবাগ কেল্লার ঠিকানা।

View Larger Map

টিকেট কোথায় পাবো?

লালবাগ কেল্লার দরজার ঠিক ডান পাশেই রয়েছে টিকেট কাউন্টার, জনপ্রতি টিকেট এর দাম দশ টাকা করে, তবে পাঁচ বছরের কম কোন বাচ্চার জন্যে টিকেট এর দরকার পড়েনা। যেকোনো বিদেশি দর্শনার্থীর জন্যে টিকেট মূল্য একশো টাকা করে।

লালবাগ কেল্লার সময়সূচী

গ্রীষ্মকালে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত কেল্লা খোলা থাকে। মাঝখানে দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত আধ ঘণ্টার জন্যে বন্ধ থাকে। আর শীতকালে সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত খোলা থাকবে। শীতকালে দুপুর ১টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত বন্ধ থাকে। আর সবসময়ের জন্যেই শুক্রবারে জুম্মার নামাযের জন্যে সাড়ে বারোটা থেকে দুইটা পর্যন্ত বন্ধ থাকে।

😉 আরেকটা জিনিস, ভুল করেও কোন রবিবারে লালবাগের কেল্লায় যাবেন না। ইতোমধ্যেই আমি দুইবার রবিবারে গিয়ে ফিরে এসেছি। কেল্লা রবিবার বন্ধ থাকে। আর যেকোনো সরকারী ছুটির দিনেও কেল্লা বন্ধ থাকে।

শেষ কথা

মুঘল আমলের অনন্য এই কীর্তিটি একবার হলেও দেখে আসা কর্তব্য। সময় করে সপরিবারে অথবা সবান্ধব ঘুরে আসুন লালবাগ কেল্লা থেকে।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

আরিফুল ইসলাম পলাশ
 

বর্তমানে ঢাকার এক স্বনামধন্য কলেজে অধ্যয়নরত। লেখালেখির ঝোক ছোটবেলা থেকেই। ব্লগিং এ হাতেখড়ি সেই সপ্তম শ্রেণীতে। তখন ঠিকমতো টাইপ করতে পারতাম না, খুব কষ্ট হতো লিখতে। ধীরে ধীরে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। এখন কিবোর্ড চলে বুলেটের মতো। তাই ইচ্ছা আছে বাংলায় তথ্যসমৃদ্ধ ইন্টারনেট দেখার। সেই ভেবেই পিপীলিকাতে লেখা। :) ফেসবুকে আমি

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়