সুচিত্রা সেন

পদার্পণ করিবো যেথা
সাফল্য থাকিবে না সেথা
সেও কি হতে পারে
নিশ্চুপ মন কেঁদে মরে।।

সাফল্য তাঁকে কখনও একা করে রাখেনি। ঘরে-বাইরে সকল ক্ষেত্রেই তিনি ছিলেন সমান সফল। ছেলেবেলায় বলেছিলেন, ‘দেখিস, আমি পৃথিবীতে অমর কীর্তি রেখে যাব’। সে কথা যে ভুল নয় তা আজ আমরা সবাই জানি। তিনি আজ নেই, তাঁর কাজগুলো আছে।  সাত পাকে বাঁধা, সপ্তপদী, শাপমোচন, হারানো সুর, দীপ জ্বেলে যাই – এসব চলচ্চিত্রের নাম শুনলেই যার মুখ সামনে ভেসে উঠে তিনি – সুচিত্রা সেন।

সুচিত্রা সেন

প্রথম থেকেই তাঁর জেদ ছিল অনেক বেশি। তিনি বলতেন, ‘জেদ না থাকলে জয়ী হওয়া যায় না। জেদ আমার গর্ব’। জেদি এই রমণীর জন্ম ১৯৩১ সালের ৬ই এপ্রিল পাবনা শহরে (তৎকালীন ব্রিটিশ ভারত, বর্তমান বাংলাদেশ)। তাঁর নাম রাখা হয় ‘কৃষ্ণা’। চার ভাই ও পাঁচ বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন পঞ্চম এবং বোনদের মধ্যে তৃতীয়। তাঁর পিতার নাম করুণাময় দাশগুপ্ত। তিনি ছিলেন স্থানীয় এক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। পাবনা শহরেই তাঁর লেখাপড়া শুরু হয়। তখন ভালো নাম রাখা হয় ‘রমা দাশগুপ্ত’। লেখাপড়ায় তেমন ভালো না হলেও নাচ-গানের প্রতি ছিল তাঁর দারুণ ঝোঁক। গ্লাস পেইন্টিং ও করতেন চমৎকার। পরবর্তীতে এই রমাই হয়ে ওঠেন বাংলার অদম্য নায়িকা মিসেস সেন – সুচিত্রা সেন।

সুচিত্রা সেন

১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সাথে তাঁর বিয়ে হয়। তিনি অন্য দশ জনের মত ছিলেন না তা তাঁর কথাবার্তায় বোঝা যেতো। বিয়ের দিন তিনি বলেন, ‘ঘোমটা দিয়ো না, আমি ঘোমটা ছাড়াই বিয়ে করবো’। তাঁর আচরণ সবাইকে অবাক করে দেয়। বিয়ের পর খুব বেশিদিন তিনি বিত্তবান পরিবারের মর্যাদা ভোগ করতে পারেননি। কেননা আদিনাথ সেন এর বেপরোয়া, মদ্যপ, বিলাসবহুল জীবনযাপন এবং কোনো ব্যবসাতেই সফল না হওয়ায় তাদের আর্থিক বিপর্যয় দেখা দেয়। তখন রমাকেই এগিয়ে আসতে হয়। পার্ক স্ট্রিট এর অডিও স্টুডিওতে প্রথমবার তিনি গানের অডিশন দেন। সেখানে ভালো করা সত্ত্বেও তাঁর আর গায়িকা হওয়া হয় না। তিনি সেখানেই অভিনয়ের প্রস্তাব পান। এর আগেও প্রস্তাব পেয়েছিলেন, তবে সাড়া দেননি। এবার স্বামীর উৎসাহে আর না করেননি। শ্বশুরমশাইকে জিজ্ঞেস করায় তিনি বলেন, ‘তোমার যদি ট্যালেন্ট থাকে, তাকে নষ্ট করার অধিকার আমার নেই বউমা। তোমার যদি ইচ্ছে থাকে তাহলে আমি আর বাধা দেব না।’

সুচিত্রা সেন

সে সময়ে চলচ্চিত্র ঠিক সবার পেশা ছিল না। বরং এর সাথে যুক্ত থাকাটাই ছিল নিম্ন রুচির বহিঃপ্রকাশ। চলচ্চিত্রে প্রবেশ মানেই তখন অভদ্র হয়ে যাওয়া। তার উপর তখনও ‘নিউ থিয়েটা‍রস’ এর অবসান বাংলা চলচ্চিত্রকে মুক্তি দেয়নি। তখন কি কারো জানা ছিল ডুবন্ত বাংলা চলচ্চিত্রকে বাঁচাতে রমা তথা সুচিত্রা সেনের আবির্ভাব ঘটবে? তাও আবার অত্যন্ত দাপটের সাথে?

১৯৫২সালে প্রথম অভিনয় করলেও সে চলচ্চিত্রটি (শেষ কোথায়) মুক্তি পায় না। তাই সুচিত্রা সেন এর প্রথম চলচ্চিত্র হিসেবে ধরা হয় ১৯৫৩সালের ‘সাত নম্বর কয়েদি’ কে। এরপর তাঁকে থামতে দেখা যায়নি। শুধু বাংলাতেই নয়, হিন্দি চলচ্চিত্রতেও তিনি অভিনয় করেন। সর্বমোট ৬০টি চলচ্চিত্রতে তাঁকে দেখা যায়। তবে বলা হয়ে থাকে আরও কয়েকটি চলচ্চিত্রে তিনি অভিনয় করেন যার হিসাব আমরা রাখিনি।

প্লেন, প্লেন, প্লেন,
পাইলট প্লেন,
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল
সুচিত্রা সেন
সুচিত্রাদি, সুচিত্রাদি
তোমার ব্যাগে কি?
উত্তমদার জন্য আমি
আপেল এনেছি।।

সংখ্যায় উত্তম কুমারের সাথে তাঁর চলচ্চিত্র ছিল বেশি। তবে অন্যদের সাথে অভিনয় করে তিনি এও বুঝিয়ে দেন যে নায়িকাও বক্স অফিসে ঝড় তুলতে পারে। এছাড়া বাস্তব জীবনে তাঁরা খুব ভালো বন্ধু ছিলেন। উত্তম কুমার কখনও তাঁর জন্মদিনে শুভেচ্ছা জানাতে ভোলেননি। উত্তম কুমারের মৃত্যুর দিন সুচিত্রা সেনও সারা রাত ঘুমাতে পারেননি। ভোরের দিকে মৃতদেহে ফুল দিয়ে স্রদ্ধা জানিয়ে আসেন। এরকমই ছিল তাদের সম্পর্ক।

সুচিত্রা সেন

স্টুডিও পাড়ায় সবাই তাঁকে ‘ম্যাডাম’ বলে ডাকতো। ম্যাডাম মানেই সুচিত্রা সেন। তাঁর জেদ কখনও কম হয়নি। তাঁর কথাই ছিল শেষ কথা। তাঁর কাছে যাওয়ারও কেউ সাহস করতো না। এমনকি তিনি পারিশ্রমিক নিতেন উত্তম কুমারের চেয়েও বেশি। সুচিত্রা সেনই ছিলেন প্রথম যিনি নিয়মিত ভাবে এক লক্ষ টাকা করে পারিশ্রমিক নেন যা ছিল তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে তিনগুন বেশি।

পারিবারিক জীবনে দিবানাথের সাথে তাঁর বেশিদিন থাকা হয়নি। তবে এজন্য কখনও তাদের মধ্যে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটেনি। তাঁরা আলাদা থাকতেন। দিবানাথ আমেরিকার বাল্টিমোরে মারা গেলে তাঁর মৃতদেহ সুচিত্রা সেন দেশে ফিরিয়ে আনেন এবং এয়ারপোর্টে গার্ড অফ অনার দিয়ে ডেড বডি নিয়ে এসে নিজেই মুখাগ্নি করেন। তাঁর প্রথম সন্তান (পুত্র) জন্মের পরেই মারা যায়। একক মা হিসেবে বড় করেন একমাত্র কন্যা মুনমুনকে।

সুচিত্রা সেনহঠাৎ করেই যেভাবে এসেছিলেন, ঠিক হঠাৎ করেই সেভাবে চলচ্চিত্র ছেড়ে দেন তিনি। ১৯৭৮সালে মুক্তি পায় তাঁর অভিনীত শেষ চলচ্চিত্র ‘প্রণয় পাশা’। এরপর আর কখনও ক্যামেরার সামনে আসেননি তিনি। এমনকি সেভাবে কারো সাথে দেখাও করেননি। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য মনোনীত হলেও, ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নিতে তিনি অস্বীকার করেন। ফলে তাঁকে সে পুরস্কার দেয়া হয় নি।

সুচিত্রা সেন প্রথম ভারতীয় অভিনেত্রী যিনি কোনো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কৃত হয়েছিলেন। ১৯৬৩ সালে ‘সাত পাকে বাঁধা’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে তিনি “সিলভার প্রাইজ ফর বেস্ট অ্যাকট্রেস” অর্জন করেন। ১৯৭২ সালে ভারত সরকার তাঁকে পদ্মশ্রী সম্মান প্রদান করে। এছারাও ২০১২ সালে তাঁকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সর্বোচ্চ সম্মাননা বঙ্গবিভূষণ প্রদান করা হয়।

তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হলঃ
সাত নম্বর কয়েদি, সাড়ে চুয়াত্তর, কাজরী, ভগবান শ্রীকৃষ্ণ চৈতন্য, অ্যাটম বোম, ওরা থাকে ওধারে, ঢুলি, মরণের পরে, সদানন্দের মেলা, অন্নপূর্ণার মন্দির, অগ্নিপরীক্ষা, গৃহপ্রবেশ, বলয়গ্রাস, সাঁঝের প্রদীপ, সাজঘর, শাপমোচন, মেজ বউ, ভালোবাসা, সবার উপরে, সাগরিকা, শুভরাত্রি, একটি রাত, ত্রিযামা, শিল্পী, আমার বউ, হারানো সুর, চন্দ্রনাথ, পথে হল দেরি, জীবন তৃষ্ণা, রাজলক্ষ্মী ও শ্রীকান্ত, ইন্দ্রাণী, সূর্যতোরণ, চাওয়া-পাওয়া, দীপ জ্বেলে যাই, হসপিটাল, স্মৃতিটুকু থাক, সপ্তপদী, বিপাশা, সাত পাকে বাঁধা, উত্তরফাল্গুনী, সন্ধ্যাদীপের শিখা, গৃহদাহ, কমললতা, মেঘ কালো, নবরাগ, ফরিয়াদ, আলো আমার আলো, হার মানা হার, শ্রাবণ সন্ধ্যা, দেবী চৌধুরীরাণী, প্রিয় বান্ধবী, দত্তা, প্রণয় পাশা।

রমার জন্ম ১৯৩১সালে হলেও সুচিত্রা সেনের জন্ম হয়েছিল ১৯৫৩সালের ৭ই ফেব্রুয়ারি ‘সাত নম্বর কয়েদি’র মধ্য দিয়ে। চলচ্চিত্র ছেড়ে অন্তরালে যাওয়ার সিধান্ত নিয়ে রমার অনুতাপ না থাকালেও সুচিত্রার সেনের অনুতাপ ছিল কিনা তা জানা যায়নি। ২০১৪সালের ১৭ই জানুয়ারী তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তিন সপ্তাহ আগে ফুসফুসে সংক্রমণের জন্য কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে তাঁকে ভর্তি করা হয়েছিল। সেখানে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে সকাল ৮টা ২৫ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সুচিত্রা সেন

সপ্তপদী চলচ্চিত্রের সংলাপে তিনি বলেছিলেন, ‘ও আমাকে টাচ করবে না!’ সত্যিই তিনি ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। বাংলা চলচ্চিত্রে তাঁর অবদান বলে শেষ করা যাবে না। ৩৫বছর ধরে পর্দার আড়ালে রইলেও যেটুকু সময় ছিলেন তাই অবিস্মরণীয় করে রাখবে তাঁর নাম – সুচিত্রা সেন।।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

অচ্যুত সাহা জয়
 

"কখনো কোনো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা বলতে হয় না। আমরা বলি না। আপনি বলেছেন। এর দায়দায়িত্ব কিন্তু আর আমার না - আপনার!"

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়