হুমায়ূন আহমেদ

যার মৃত্যুতে পুরো দেশ কাঁদে তাঁর সম্পর্কে বলাটা সহজ নয়। ইতিমধ্যে শিরোনামে তাঁর নামটা আপনাদের দেখা হয়ে গেছে। তাঁর কলমটাকে আমরা কম/বেশি সবাই মনে করি। তাঁর প্রতিটি কথা যেন নিজের মধ্যে ধারণ করি। অজানা উদ্দেশ্যে গমন আর খালি পায়ে হাঁটা যেন তাঁর কাছেই জানা। আমাদের ছোট বড় সকল অনুভূতির প্রকাশ যেন তাঁর বই এর পাতায়। সীমানা পেরিয়েও আছেন তিনি সকলের হৃদয়ে। একটা নাম যার হাজারো ছায়া – হুমায়ূন আহমেদ।

 পাখি উড়ে গেলেও

পলক ফেলে যায়

আর মানুষ চলে গেলে

ফেলে রেখে যায় স্মৃতি ।

হুমায়ূন আহমেদ

 ১৯৭১সালে অলৌকিকভাবে বেঁচে যাওয়া জনপ্রিয় এই লেখকের জন্ম ১৯৪৮সালের ১৩ই নভেম্বর নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়া উপজেলার কুতুবপুরে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে। তাঁর পিতা ফয়জুর রহমান আহমদ এবং মাতা আয়েশা আখতার খাতুন। পিতা তৎকালীন পুলিশ অফিসার ছিলেন এবং কর্তব্যরত অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন।

ছয় ভাইবোনের সবাই ভালো ছবি আঁকতেন। তাঁর ছোট দুই ভাই – মুহম্মদ জাফর ইকবাল এবং আহসান হাবীব। আর তিন বোন – সুফিয়া হায়দার, মমতাজ শহিদ ও রোকসানা আহমেদ। ছেলেবেলায় পিতার নামের সাথে মিল রেখে তাঁর নাম রাখা হয়েছিল – শামসুর রহমান; ডাক নাম কাজল। পরবর্তীতে পরিবর্তন করে রাখা হয় – হুমায়ূন আহমেদ।

পিতার চাকরির সুত্রে সিলেট, কুমিল্লা, চট্রগ্রাম, দিনাজপুর, বগুড়া – এভাবেই ঘুরে ঘুরে নানা স্কুলে পড়তে হয়েছে তাঁকে। শেষে বগুড়া জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পরীক্ষা দেন এবং রাজশাহী বোর্ড-এ মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হন। এরপর ১৯৬৭সালে ঢাকা কলেজ থেকে বিজ্ঞান শাখায় ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়-এ রসায়ন শাস্ত্রে অধ্যয়ন করে প্রথম শ্রেণীতে বিএসসি (সম্মান) ও এমএসসি ডিগ্রি লাভ করেন।

ডিগ্রি লাভের পর তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন এবং ছয় মাস পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োজিত হন। পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে ‘পলিমার রসায়ন’ বিষয়ে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেন এবং দেশে ফিরে আবার শিক্ষকতায় নিয়োজিত হন। লেখালেখিতে ব্যস্ত হয়ে পরায় পরবর্তীতে অধ্যাপনা ছেঁড়ে দেন।

১৯৭৩সালে গুলতেকিন আহমেদকে বিয়ে করেন এবং তিন কন্যা – বিপাশা আহমেদ, নোভা আহমেদ, শীলা আহমেদ ও এক পুত্র – নুহাশ আহমেদ এর জনক হন। অন্য আরেকটি ছেলে অকালে মারা যায়। ১৯৯০ এর মধ্যভাগে শীলার বান্ধবী মেহের আফরোজ শাওন এর সাথে তিনি ঘনিষ্ঠতায় জরিয়ে পরেন। ফলে ২০০৩সালে গুলতেকিনের সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদ হয় এবং ২০০৫সালে তিনি শাওনকে বিয়ে করেন। দ্বিতীয় ঘরে তিনি তিন ছেলে-মেয়ের জনক হন। কিন্তু তাঁর তাদের প্রথম কন্যা মারা যায়। ছেলেদের নাম নিষাদ হুমায়ূন ও নিনিত হুমায়ূন।

নন্দিত নরকে’ উপন্যাস এর মধ্য দিয়ে তাঁর সাহিত্য-জীবন শুরু হয়। এরপর একে একে দুই শতাধিক গল্পগ্রন্থ ও উপন্যাস লেখেন তিনি। তাঁর লেখা ‘জোছনা ও জননীর গল্প’  ও ‘মধ্যাহ্ন’ অন্যতম সেরা রচনা। তিনি সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ সব চরিত্র। তাঁর লেখা শুধু বই পাতায় নয়, আছে সকলের হৃদয়ে।

এইসব দিন রাত্রি’ – নাটকটি দিয়ে তিনি ১৯৮০সালে পরিচালনায় পা রাখেন। এরপর ‘বহুব্রীহি’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘নক্ষত্রের রাত’, ‘অয়োময়’, ‘আজ রবিবার’, ‘তারা তিনজন’, ‘আমরা তিনজন’ ও ‘মন্ত্রী মহোদয়ের আগমন শুভেচ্ছার স্বাগতম’ এর মতো জনপ্রিয় সব নাটক তৈরি করেন।

১৯৯৪সালে তাঁর পরিচালিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘আগুনের পরশমণি’ মুক্তি পায় এবং ৮টি বিভাগে জাতীয় পুরষ্কার জিতে নেয়। ২০০০ সালে ‘শ্রাবণ মেঘের দিন’ ও ২০০১ সালেই নির্মাণ করেন ‘দুই দুয়ারী’ নামক চলচ্চিত্র। এরপর ২০০৩সালে ‘চন্দ্রকথা’ ও ২০০৪সালে নির্মাণ করেন ‘শ্যামল ছায়া’। ২০০৬ এ ‘৯নং বিপদ সংকেত’, ২০০৮ এ ‘আমার আছে জল’ ও ২০১২ এ নির্মাণ করেন তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ‘ঘেটুপুত্র কমলা’।

 তাঁর কিছু প্রাপ্তিঃ

  • বাংলা একাডেমী পুরস্কার (১৯৮১)
  • শিশু একাডেমী পুরস্কার
  • একুশে পদক (১৯৯৪)
  • জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার (১৯৯৪)
  • লেখক শিবির পুরস্কার ১৯৭৩)
  • মাইকেল মধুসুদন পদক (১৯৮৭)
  • বাচশাস পুরস্কার (১৯৮৮)
  • হুমায়ূন কাদির স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০)
  • জয়নুল আবেদীন স্বর্ণপদক

হুমায়ূন আহমেদ ২

১৯৮৭সালে গাজীপুর এর পিজুলিয়া গ্রামে গড়ে তোলেন তাঁর বাগান বাড়ি। নাম – ‘নুহাশ পল্লী’। ৪০বিঘার এ জায়গায় ঔষুধি গাছের সংখ্যাই বেশি। নিজের মতো করে গড়া এ জায়গাতেই ঘুমিয়ে আছেন নিশ্চিন্তে। ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘ নয় মাস চিকিৎসাধীন থাকার পর ১৯ জুলাই ২০১২ তারিখে স্থানীয় সময় ১১:২০ মিনিটে নিউ ইয়র্কের বেলেভ্যু হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস তাগ করেন – হুমায়ূন আহমেদ।।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

অচ্যুত সাহা জয়
 

"কখনো কোনো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা বলতে হয় না। আমরা বলি না। আপনি বলেছেন। এর দায়দায়িত্ব কিন্তু আর আমার না - আপনার!"

চুলের সমস্যায় ভুগছেন? জেনে নিন মাথায় নতুন চুল গজানোর উপায়