অং সান সু চির ইসলাম গ্রহণ ডাহা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর খবর

২০১৭ সালের শেষের দিকে মিয়ানমারে রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চালানোর কথা অস্বীকার করেছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী অং সান সু চি।

সম্প্রতি বিবিসিকে দেয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে মিয়ানমারের ফার্স্ট স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী  সু চি রাখাইন প্রদেশে সংখ্যালঘু মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ডের কথা অস্বীকার করেন। তবে সেই সাথে  তিনি স্বীকার করেন যে, সেখানে কিছু সমস্যা রয়েছে।

অং সান বলেন,

রাখাইনে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চলছে এটি সঠিক নয়। সেখানে নানারকম শত্রুতা ও বিদ্বেষ চলছে। মুসলমানরা মুসলমানদেরকে হত্যা করছে।গণমাধ্যমে প্রকাশিত রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর সঠিক নয়। সেখানে জাতিগত শুদ্ধি অভিযান চলছে না। সেখানে তাদের নিজেদের মধ্যেই বিভাজন রয়েছে। সরকার বরং সেই বিভাজনের সমাধানে চেষ্টা করে যাচ্ছে।

অং সান সুচির নিয়ে কথা বলার পূর্বে তিনি কে সে সম্পর্কে আলোকপাত করা উচিত।

অং সান সু চি কে ?

অং সান সু চি ১৯৪৫ সালের ১৯শে জুন তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (মায়ানমার) রেঙ্গুনের (বর্তমানে যা  ইয়াঙ্গুন) হামওয়ে সাউং নামক একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার বাবা ছিল  নাম  অং সান। অং সান’কে  আধুনিক বার্মার প্রতিষ্ঠা বলা হয়ে থাকে।  তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের জন্য একটি জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন,  আধুনিক বর্মী সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেন।

অং সান সু চি তাঁর পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর জন্মের তিন বছর পর ১৯৪৮ সালে তাঁর পিতাকে গুপ্তঘাতকেরা হত্যা করে। সু চির মা খিন চি ছিলেন নবগঠিত বার্মা রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পিতার রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সংগ্রামী জীবনের প্রতি  অং-সান আগ্রহ ছিল। এই কারনে তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন যে, তিনি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন।

সু চি পড়াশোনা শুরু হয় ইন্ডিয়াতে ।সেখান থেকে সে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের ভক্ত হয়ে পড়ে । পরবর্তিতে উচ্চ শিক্ষার জন্যে অর্ক্সফোর্ডে গমন করেন। ১৯৮৮ সালের দিকে অসুস্থ মা’কে মায়ানমারে দেখতে এসে রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন এবং গৃহবন্দী হয়ে পড়েন। এর পরে দীর্ঘ প্রায় ২১ বছর বন্দি জীবন যাবন করেন। ২০১০ সালে মুক্তি পেয়ে পূর্ণ উদ্যমে রাজনীতিতে নেমে পড়েন । ২০১৫ সালে নির্বাচনে জয় লাভ করেন বর্তমানে মিয়ানমারের ফার্স্ট স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে দায়িত্ব রত আছেন। অং সান সু চি নিয়ে আরো বিস্তারিত চানতে চাইলে এই আর্টিকেলটি পড়ে দেখতে পারেন।

অং সান সু চি কি ইসলাম গ্রহন করেছেন  ?

২০১২ সালের দিকে অং সান সু চির মুসলিম হবার এই ছবিটি নানা জায়গায় ঢালাও ভাবে ছড়িয়ে পড়ে। মোট কথা বছর কয়েক আগে সোস্যাল মিডিয়া সহ নানা জায়গায় এই গুজব খুব ভাল ছড়িয়েছে যে,  মিয়ানমারের ফার্স্ট স্টেট কাউন্সিলর ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী  অং সান সু চি ইসলাম গ্রহণ করেছে। আদৌ কি সেটি সঠিক ?

এই তথ্যের সত্যতা খুজতে চষে বেড়িয়েছি ইন্টারেট জগত। প্রথমেই বিবিসতে খুজেছি এই সম্পর্কিত কিছু আছে কিনা। এ পরে অন্য সব মিডিয়াতে খুজা শুরু করি।  কোথাও এই সম্পর্কিত কোন সলিড তথ্য পাইনি।উইকিপিডিয়া থেকে শুরু করে বাঘা বাঘা সব মিডিয়া যারা অং সান সু চি কে নিয়ে তথ্য প্রকাশ করেছে কোথাও উল্লেখ নেই তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুসলিম হয়েছেন। তার মানে   অং সান সু চির ইসলাম গ্রহণ ডাহা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর  একটি খবর।

শুধুমাত্র কাটতির আশায় কেউ কেউ এই ক্লিক বেট টাইপ খবরটি ছড়িয়েছে। সম্প্রতি পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে বিষয়টি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠে। গণতন্ত্রের মানসকন্যা হিসবে পরিচিত শান্তিতে নোবেল জয়ী অং সান সু চির যখন মায়ানমারের ক্ষমতাসীন তখন তার নেতৃত্বে চলছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উপর অকথ্য নির্যাতন, হত্যা, ধর্ষণ। তিনি এদিকে কোন ভ্রুক্ষেপ করছেন না। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী লোকেরা মুসলিম রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নিধন অভিযান চালাচ্ছে। মায়ানমারের সেনাবাহিনীও তাদের উপর বর্বর ভূমিকা পালন করছে। এমনি তাদের বাংলাদেশে প্রবেশেও বাধা প্রদান করা হচ্ছে। সীমান্ত জুড়ে বসানো হয়েছে স্থল মাইন !

আদৌও কি এটি সম্ভব হত সে যদি মুসলিম হত ?  কারন শুধুমাত্র মুসলিম হবার সুবাধে জাতিগত দাঙ্গাতে মুসলিমদেরকে নির্বিচারে হত্যা করয়া হচ্ছে।

অং সান সু চির  মুসলিমদের প্রতি এই বিদ্বেষপূরণ আচরনের পিছনে একটি ঘটনা প্রচলিত আছে।

অনেকেই বলছেন, ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তারেক হায়দার নামে এক পাকিস্তানি ছাত্রের প্রেমে পড়েছিলেন অং সান সু চি। দর্শন নিয়ে পড়ার সময়ে সেখানেই পরিচিতি হয় পাকিস্থানি তারেকের সঙ্গে। তখন তারেক ছিলেন  পাকিস্তানের কূটনীতিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়তে এসেছিলেন তারেক। সু চির মা’ও ছিলেন কূটনীতিক। রতন চিনতে তাই সুচির সময় লেগে নি।

সু চির জীবনী লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম ও বলেছেন,

‘সংস্কৃতিগতভাবে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সু চি এবং তারেক গভীর প্রেমে পড়েছিলেন।’

জানা যায়,  ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় শুধুমাত্র তারেককে খুশি করতে সু চি ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ  করে দিয়েছিলেন। তারেক আর প্রেম নিয়ে সু চি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে,  কোনো রকমে পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অক্সফোর্ডের পরীক্ষা শেষ হলে তারেক পাকিস্তানে ফিরে যান। সু চি তারেককে বিয়ে করতে চেয়েছিল।  তারেক তখন তাকে বিয়ে করে নি।

পরে শোকে বিমর্ষ হয়ে পড়েন মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির এই নেত্রী। সেই সময় থেকেই তিনি নাকি ধীরে ধীরে মুসলিমবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন।

জীবনী লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম বলেছেন,

‘সু চি প্রায় বছরখানেক বিরহে বিমর্ষ ছিলেন। এই সময়ে ইংল্যান্ডে পুরনো পারিবারিক বন্ধু স্যার পল গর বুথ ও তার স্ত্রী, ছেলে ক্রিস্টোফার সু চির প্রয়াত স্বামী মাইকেল অ্যারিসের সঙ্গে পরিচয় হয় মিয়ানমারের এই নেত্রীর। অতঃপর ১৯৭২ সালে তারা বিয়ে করেন।’

পপহ্যাম ‘দ্য লেডি অ্যান্ড পিকে’ তে লিখেছেন, সু চির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই জটিলতায় পূর্ণ এবং বৈপরীত্যে ভরা। আর এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের পেছনে সু চির ব্যর্থ প্রেমের কাহিনীকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।

শেষ কথা

অন সান সু চির ইসলাম গ্রহন নিয়ে যে গুজব ছড়িয়েছে তার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। ইসলাম গ্রহণের খবরটি  ডাহা মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর । বিশ্ব মিডিয়া সহ এমন কোন বিশ্বাসযোগ্য নিউজ সাইটে এ নিয়ে কোন সংবাদ হয় নি। এ ছাড়া রোহিংগাদের উপর  অত্যাচারের কথা  অং সান সু চি অস্বীকার করার মধ্য প্রকারান্তে তার ইসলাম বিদ্বেশ প্রকাশ পাচ্ছে । এটিও প্রমাণ করে অং সান সু কি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নি। প্রচারিত খবরটি বানোয়াট ও ভিত্তিহীন।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক