কিংবদন্তি হিসেবে পরিচিত একজন অং সান সু চি! সত্যিই কি তাই ?

সম্প্রতি মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হচ্ছে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠি। রাখাইনে রোহিঙ্গা নিপীড়ন নিয়ে বিশ্বজুড়ে গনমাধ্যমে তোলপাড় হয়েছে। রাখাইনের রোহিঙ্গা গনহত্যা নিয়ে সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তিত্ব হল অং সান সু চি।  গণতান্ত্রিক সরকারের শীর্ষ পদে থেকেও কেন তিনি  থামাতে পারছেন না রোহিঙ্গা নির্যাতন ? এ প্রশ্ন সর্বত্রই। পশ্চিমা বিশ্লেষকদের মতে, সেনাবাহিনীর সংশোধিত সংবিধানের আলোকে এখন মিয়ানমার চলছে । সুচির ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্র্যাসি বা  এনএলডি সরকার পরিচালনায় থাকলেও, প্রতিরক্ষা-স্বরাষ্ট্রের মত গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় মূলত রয়েছে সেনাবাহিনীর হাতে। বিশেষজ্ঞরা  মনে করছেন, অং সান সুচি মূলত ‘মিলিটারি পাপেটে’ পরিণত হয়েছেন। এছাড়াও সেদেশের কট্টর বৌদ্ধদেরও চাপের মুখে আছেন শান্তিতে নোবেলজয়ী নেত্রী। বিংশ শতাব্দীতে যে বিদুষী নারী স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করে নারী ও মানবাধিকারের জন্য সংগ্রাম করে নোবেল শান্তি পুরুস্কার পান তাঁর নাম অং সান সু চি (Aung-Sun Suu-kyi)। সংক্ষিপ্ত পরিসরে আমরা আজকে সুচি’র জীবনী নিয়ে আলোকপাত করার চেষ্টা করব।

সুচির পরিচয়

অং সান সু চি ১৯৪৫ সালের ১৯শে জুন তৎকালীন ব্রিটিশ বার্মার (মায়ানমার) রেঙ্গুনের (বর্তমানে যা  ইয়াঙ্গুন) হামওয়ে সাউং নামক একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।তার বাবা নাম  অং সান।তাঁর পিতাকে আধুনিক বার্মার প্রতিষ্ঠা বলা হয়। কারন তিনি ১৯৪০ সালে ব্রিটিশ শাসনের অবসানের জন্য একটি জাতীয় আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন।বহুদিন মায়ানমার স্বৈরাচারী ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল এবং মায়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনে খিন-চি নেতৃত্ব দেন। অং সাং  বিট্রিশ আমলে  আধুনিক বর্মী সেনাবাহিনী গঠন করেন এবং  ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের থেকে বার্মাকে স্বাধীন করেন।  কিন্ত অং সাং ঐ বছরই তিনি বিপক্ষদের গুপ্তহত্যার শিকার হন।

অং সান সু চি তাঁর পিতামাতার তৃতীয় সন্তান। তাঁর জন্মের তিন বছর পর ১৯৪৮ সালে তাঁর পিতাকে হত্যা করা হয়। সু চির মা খিন চি ছিল নবগঠিত বার্মা রাষ্ট্রের একজন গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সু চি তার মা খিন চি এবং দুই ভাই অং সান লিন ও অং সান ও-এর সাথে রেঙ্গুনে বড় হতে থাকেন। পিতার রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং সংগ্রামী জীবনের প্রতি  অং-সান আগ্রহ ছিল। এই কারনে তিনি দৃঢ় সংকল্প করলেন যে, তিনি পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করবেন। তিনি তাঁর পিতার মতো দেশপ্রেমিক এবং কূটনীতিবিদ হবেন।

নামকরণ

অং সান সু চি নিজ পরিবারের তিনজন সদস্যের কাছ থেকে তার নামের পদবি গ্রহণ করেন। তিনি তার পিতার কাছ থেকে ‘অং সান’, তার পিতার নানী থেকে ‘সু’ এবং তার মা খিন চির থেকে ‘চি’ অংশ নেন। তাকে প্রায়ই ডাউ অং সান সু চি নামে ডাকা হয়। তবে উচ্চারণের ক্ষেত্রে কেউ কেউ অং সান সুচির বদলে   অং সান সু কিও বলে থাকেন। এ ছাড়া তার রাজনৈতিক ত্যাগের জন্য তাকে এশিয়ার ম্যান্ডেলা নামে ডাকা হয়।

সুচির শিক্ষা জীবন

সুচির বার্মায় শিক্ষা জীবনের বেশিরভাগ সময় কাটে মেথডিস্ট ইংলিশ হাইস্কুলেই।  সেখানে তিনি পরিচিত লাভ করেন বিভিন্ন ভাষার উপর দক্ষতার কারনে। তিনি চারটি ভাষায় কথা বলতে পারেন: বর্মী, ইংরেজি, ফরাসী ও জাপানি । নবগঠিত বার্মা রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদুত হিসেবে তার মা ভারতে গমন করলে সুচিও ভারতে চলে আসে।

নয়াদিল্লিতে কনভেন্ট অফ জেসাস অ্যান্ড মেরি স্কুলে সুচি পড়াশোনা করেন, পরে ১৯৬৪ সালে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে লেডী শ্রী রাম কলেজ থেকে রাজনীতি বিষয়ে ডিগ্রি পাশ করেন। ভারতে অবস্থানকালে তিনি মহাত্মা গান্ধীর ভাবাদর্শে উদ্বুদ্ধ হন। মহাত্মা গান্ধী অহিংসা দ্বারা রাজনৈতিক আন্দোলন পরিচালনায় অগ্রদুত ছিলেন। তিনি গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের দ্বারা অনুপ্রাণিত হন।  ইংরেজি এবং বনবিদ্যা নিয়ে পড়ার ইচ্ছায় অক্সফোর্ডে যান তিনি। কিন্তু পছন্দের বিষয় নিয়ে পড়ার সুযোগ হয়নি তার।এর পরে তিনি পরে ভর্তি হন দর্শন বিদ্যায়।  ১৯৬৭-তে অক্সফোর্ডের সেন্ট হাগস কলেজ থেকে দর্শন, রাজনীতি ও অর্থনীতি বিষয়ে বি.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন। এর পরে রাজনীতি বিষয়ে  এম.এ. ডিগ্রি অর্জন করেন ।

স্নাতক পাশের পর তিনি আমেরিকা চলেন যান সেখানে নিউ ইয়র্কে তাদের পারিবারিক বন্ধু ও একসময়ের জনপ্রিয় বর্মী পপ-গায়িকা মা থান ইয়ের সাথে বসবাস করতে থাকেন। তিনি পুররায় ১৯৮৫ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে সুচি বর্মী সাহিত্য বিষয়ে এমফিল ডিগ্রি নেয়ার জন্য লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজে (সোয়াস) গবেষণা শিক্ষার্থী হিসেবে পড়াশোনা করছিলেন। ১৯৯০ সালে তিনি সোয়াস-এর একজন অনারারি ফেলো হিসেবে নির্বাচিত হন। তিনি  দুবছরের জন্য ভারতের শিমলায় অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ অ্যাডভান্সড স্টাডিজের ফেলোও ছিলেন।

ব্যক্তিগত জীবন

সাধারণ গৃহবধূ হিসেবেই জীবন শুরু করেছিলেন সু চি। ১৯৭১ সালে সুচি ব্রিটিশ নাগরিক মাইকেল অ্যারিসকে বিয়ে করেন । প্রথম জীবনে তিনি বার্মা ও জাপানে বাস করেন এবং পরবর্তী পর্যায়ে ইংল্যান্ডে স্বামীর সাথে বসবাস করেন। বিয়ের এক বছর পরই তাদের প্রথম সন্তান আলেক্সান্ডারের জন্ম। দ্বিতীয় সন্তান কিমের জন্ম হয় ১৯৭৭ সালে।

 

১৯৮৮ সালে তার মা গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে দেখতে ছুটে আসেন দেশে। এসেই গৃহবন্দি হয়ে পড়েন উনি। ১৯৮৯ সালে গৃহবন্দী করা হলো তাঁকে এবং বহুদিন তিনি এই অবস্থায় ছিলেন। তাঁর গৃহের চারদিকে কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া হয়। পারিবারিক জীবনেরও সমাপ্তি ঘটল সেখানেই। এরপর প্রায় দুই দশক গৃহবন্দী ও কারাগারে কাটালেন তিনি। স্বামীর সঙ্গে শেষ দেখা ১৯৯৫ সালের বড়দিনে হলেও ছেলেদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। এর চার বছর পর স্বামী মারা যান।

২০১০ সালে ১২ বছরের মধ্যে প্রথম ছোট ছেলে কিমের সাক্ষাৎ পান। চাইলেই তিনি মুক্তি পেতে পারতেন। কিন্তু স্বামী-সন্তানকে দেখতে একবার দেশ ছাড়লে আর কখনোই তাঁকে দেশে ঢুকতে দেয়া হবে না। তাই দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে বন্দীজীবনকেই বেছে নিলেন। বিয়ের আগে স্বামী মাইকেলকেও বলে রেখেছিলেন সবকিছুর আগে তাঁর দেশ।

মৃত্যুপথযাত্রী মাকে শেষবারের মতো দেখতে আসাই তার জীবনের টার্নিং পয়েন্টে জড়িয়ে পড়লেন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে। মাইকেল এরিস আর অং সান সু চি তখন কল্পনাই করেননি যে এই যাওয়াই তাদের স্বাভাবিক দাম্পত্যজীবনের অবসান ঘটাবে, ইতি টানবে তাদের শান্তি-সুখের জীবনের। সু চি সেখানে আটকে পড়লেন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার নেশায়। এরপর ১৯৮৯ সালে গৃহবন্দী করা হলো তাকে। পারিবারিক জীবনেরও সমাপ্তি ঘটল সেখানেই। এরপর প্রায় দুই দশক গৃহবন্দী ও কারাগারে কাটালেন তিনি।

১৯৯৫-এর ক্রিসমাসে অ্যারিস বার্মায় গেলে তাদের শেষবারের মতো দেখা হয়, কারণ সু চি বার্মাতেই থেকে যান কিন্তু বর্মী স্বৈরশাসকেরা অ্যারিসকে আর কখনো বার্মায় প্রবেশের ভিসা দেয়নি। স্বামীর সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হলেও তাকে ছেলেদের সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হয়নি।১৯৯৭ সালে অ্যারিসের প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে।তখ যুক্তরাষ্ট্র, জাতিসংঘের মহাসচিব কফি আনান এবং পোপ দ্বিতীয় জন পলসহবহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সংস্থার আবেদন ও অনুরোধের পরও বর্মী সরকার অ্যারিসকে ভিসা দেয়নি। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ বলে, অ্যারিসকে নিয়ে চিন্তিত হবার দায় সরকারের নয়, বরং অং সান সু চিরই তার স্বামীকে দেখতে বিদেশে যাওয়া উচিত। ঐসময় সু চি গৃহবন্দিত্ব থেকে সাময়িক ছাড়া পান তবে তিনি দেশত্যাগ করতে রাজি হননি,  কারণ  তার ধারনা ছিল একবার দেশ ছেড়ে গেলে সামরিক জান্তা তাকে আর ফিরতে দেবে না।

এরিসের সাথে সু চি

১৯৯৯ সালের অ্যারিস তার ৫৩তম জন্মদিনে মৃত্যুবরণ করেন।সুচি ১৯৮৯ সালে গৃহবন্দী হবার পর থেকে তাদের মাত্র পাঁচবার দেখা হয়েছে, শেষবার ১৯৯৫-এর ক্রিসমাসে। সু চি তার সন্তানদের থেকেও বিচ্ছিন্ন হয়ে যান।  তবে ২০১১ সাল থেকে তারা মায়ানমারে এসে মায়ের সাথে দেখা করে যায়। তবে চাইলেই তিনি মুক্তি পেতে পারতেন। কিন্তু স্বামী-সন্তানকে দেখতে একবার দেশ ছাড়লে আর কখনোই তাকে দেশে ঢুকতে দেওয়া হবে না এই আশংকায় তিনি  তাই দেশ ও দেশের মানুষের স্বার্থে বন্দী জীবনকেই বেছে  নিয়েছিলেন। জানা যায় বিয়ের আগে স্বামী মাইকেলকেও বলে রেখেছিলেন সবকিছুর আগে তার দেশ।

অন্যরকম একটি ভালোবাসার গল্প ও মুসলিম বিদ্বেষ

অনেকেই বলছেন, ১৯৬৪ সালে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তারেক হায়দার নামে এক পাকিস্তানি ছাত্রের প্রেমে পড়েছিলেন সু চি। দর্শন নিয়ে পড়ার সময়ে সেখানেই পরিচিতি হয় তারেকের সঙ্গে। তখন তারেক ছিলেন  পাকিস্তানের কূটনীতিক। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়ে অক্সফোর্ডে পড়তে এসেছিলেন তারেক। সু চির মা’ও ছিলেন কূটনীতিক।

সু চির জীবনী লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম ও বলেছেন,

‘সংস্কৃতিগতভাবে অনেক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সু চি এবং তারেক গভীর প্রেমে পড়েছিলেন।’

জানা যায়,  ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় শুধুমাত্র তারেককে খুশি করতে সু চি ভারতীয় ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে কথা বলাও বন্ধ  করে দিয়েছিলেন। তারেক আর প্রেম নিয়ে সু চি এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়েন যে,  কোনো রকমে পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগে উত্তীর্ণ হন। অক্সফোর্ডের পরীক্ষা শেষ হলে তারেক পাকিস্তানে ফিরে যান। সু চি চাইলেও তারেক তখন তাকে বিয়ে করে নি।

পরে শোকে বিমর্ষ হয়ে পড়েন মিয়ানমারের বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির এই নেত্রী। সেই সময় থেকেই তিনি নাকি ধীরে ধীরে মুসলিমবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন।

জীবনী লেখক ও সাংবাদিক পিটার পপহ্যাম বলেছেন,

‘সু চি প্রায় বছরখানেক বিরহে বিমর্ষ ছিলেন। এই সময়ে ইংল্যান্ডে পুরনো পারিবারিক বন্ধু স্যার পল গর বুথ ও তার স্ত্রী, ছেলে ক্রিস্টোফার সু চির প্রয়াত স্বামী মাইকেল অ্যারিসের সঙ্গে পরিচয় হয় মিয়ানমারের এই নেত্রীর। অতঃপর ১৯৭২ সালে তারা বিয়ে করেন।’

পপহ্যাম ‘দ্য লেডি অ্যান্ড পিকে’ তে লিখেছেন, সু চির ব্যক্তিগত জীবনের অনেক কিছুই জটিলতায় পূর্ণ এবং বৈপরীত্যে ভরা। আর এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে রোহিঙ্গা নির্যাতনের পেছনে সু চির ব্যর্থ প্রেমের কাহিনীকেও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অনেকে।

রাজনীতি আর বন্দিত্ব

অসুস্থ মাকে দেখতে জন্মভূমি মিয়ানমারে আসার পরই পাল্টে যায় সু চির জীবনধারা। অং সান সু চি রাজনৈতিক আঙিনায় পা রাখেন ১৯৮৮ সালে। ব্যক্তিগতভাবে তিনি মহাত্ত্বা গান্ধীর আদর্শে বিশ্বাসী। তার রাজনৈতিক জীবনেও  মহাত্মা গান্ধীর সেই অসহিংস আন্দোলনের ছাপ স্পষ্ট। প্রিয় জন্মভুমি আর বাবার স্বপ্নের দেশ মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য গঠন করেন রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি। আর একারনে সামরিক জান্তার চক্ষুশূলে পরিণত হন সু চি।

প্রথম দিকে সামরিক বাহিনীর সাথে সমঝোতার ভিত্তিতে আন্দোলন পরিচালনা করতে চান। তিনি এগারো মাস ধরে সমগ্র মায়ানমারের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ভ্রমণ করে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেন এবং সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের চেষ্টা করেন। তাঁর এই আন্দোলনে শঙ্কিত হয়ে ডিক্টেটর Ne Win অং-সান সুচিকে হত্যার জন্য ছয়জন সৈন্যকে নির্দেশ দেন কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। তিনমাস পর তাঁকে রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করায় গ্রেপ্তার করা হয়। সু চিকে সামরিক জান্তা গৃহবন্দী করে।

১৯৮৯ সালের জুলাই মাসে সু চির দলের নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন দমন করার জন্যই গৃহবন্দী করা হয় তাকে।নির্বাসিত জীবনযাপনের শর্তে মুক্তি দেওয়া হবে বলা হলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। ১৯৯০ সালের সাধারণ নির্বাচনে সু চির দল  ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি বা এনএলডি ৮২ শতাংশ ভোট পেয়ে বিজয়ী হয়। ২৮ বছরের সামরিক শাসনের অবসানের সম্ভাবনায় মানুষের মধ্যে জাগে দেশ গড়ার আশা। কিন্তু জেনারেল থান শুয়ে সু চির হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। ওই বছরই  সু চি কে গৃহবন্দী করা করা হয়।কিন্তু আন্দোলন চালিয়ে জান সু চি, পরিচিতি পান আপসহীন গণতন্ত্রকামী নেত্রি  হিসেবে। যা আরও দৃঢ় হয় ১৯৯১ সালে শান্তিতে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হওয়ার মাধ্যমে।

ইনিয়া লেকের  কোলঘেঁষা ইয়াঙ্গুন শহরের অভিজাত এলাকার লেকের পাড়ে ইউনিভার্সিটি এভিনিউয়ের ৫৪ নম্বর একটা ছিমছাম বাড়ি।  এই বাড়িতেই কেটেছে অং সান সু চির নিঃসঙ্গ গৃহবন্দী জীবনের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি বছর। গৃহবন্দী থাকা অবস্থায় আত্মীয়স্বজন তো দূরের কথা , তাকে নিজ স্বামী বা সন্তানের সঙ্গেও ঠিক মত দেখা করতে দেওয়া  হয়নি । কিন্তু চার দেয়ালে আটকে রেখেও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলন থেকে সামরিক সরকার তাকে দমাতে পারেনি।  একজন গৃহপরিচারিকা ছাড়া তার একাকিত্বের জীবনে আপনজন বলতে কেউ ছিল না।

বন্দিত্ব থেকে মুক্তি

অন্ধকারের পরেই সুর্যোদয় ঘটে। দেখা মিলে আলোর ।  অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। ঘড়িতে সময় বিকাল ৫টা, ১৪ নভেম্বর ২০১০, লেকের পাড়ে ইউনিভার্সিটি এভিনিউয়ের ৫৪ নম্বর বাড়ির গেট খুলে গেল।বর্মি পোশাক আর মুখে সেই অমলিন হাসিতে উদ্ভাসিত অং সান সু চিকে গেটের পাশে দেখা গেল। দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বের শেষে অবশেষে মুক্তি পেলেন গণতন্ত্রের মানসকন্যা।প্রিয় নেত্রীকে দেখতে পেয়ে চার দিকে শুধুই হাততালি আর জয়ধ্বনিতে মেতে উঠল তার সমর্থকরা। ভিড়ের মধ্য থেকেই একজন একটি ফুল তুলে দিলেন প্রিয় নেত্রীর হাতে। সেই ফুল চুলে গুঁজে নিলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত বন্দিত্বের অবসান !

নির্বাচনও জয় লাভ

২০১০ সালে বন্দিত্ব থেকে মুক্তি লাভের পরে অং সান ২০১৫  সালের নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন।  ১৫’র নির্বাচনে, তার দল-ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি- এনএলডির নিরঙ্কুশ জয়।সবার ধারনা ছিলো, এই বুঝি গণতন্ত্রের পথে ফিরলো, মিয়ানমার। অবশ্য, রাখাইনে নিরাপত্তা বাহিনীর  রোহিঙ্গা নিধনে এবার প্রশ্ন উঠেছে গনতন্ত্রের আসলে মুক্তি হয়েছে ?

সু চি’র নোবেল পুরষ্কার লাভ এবং তা নিয়ে বিতর্ক

১৯৯১ সালে মিয়ানমারের অং সান সু চি  দেশটিতে গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় নোবেল পুরস্কার পান। নোবেল কমিটি তাদের বিবৃতিতে সু চিকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার তিনটি কারণ উল্লেখ করে।১৯৯১ সালে অং সান সু চিকে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার প্রদানের সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে নোবেল কমিটির প্রেস রিলিজে   বলা হয়-

১. নরওয়ের নোবেল কমিটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১৯৯১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার অং সান সু চিকে (মিয়ানমার) দেওয়া হবে। এটি  তাকে দেওয়া হচ্ছে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য  অহিংস সংগ্রামের জন্য ।

২. তিনি নিপীড়নের বিরুদ্ধে একজন আদর্শ হিসেবে পরিণত হয়েছেন।

৩. ১৯৯১ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি নোবেল কমিটি অং সান সু চিকে সম্মান জানাতে চায় বিশ্বের বহু মানুষের গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম মানবাধিকার ও জাতিগত শান্তি বজায় রাখায় তার শান্তিপূর্ণ সমর্থন ও অবিরত প্রচেষ্টার জন্য।

সু চি বহু বছর ধরে নির্যাতিত মানুষের প্রতীক হিসেবে ছিলেনরোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০১৬ সালেই সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। সে সময় অনলাইনে তার নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেয়ার জন্য লক্ষাধিক মানুষ এক আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন। চেঞ্জ ডট অর্গে এই আবেদনটি করা হয়।আবেদনে বলা হয়,

‘আন্তর্জাতিক শান্তি এবং ভ্রাতৃত্ববোধ রক্ষায় যারা কাজ করেন, তাদেরকেই নোবেল শান্তি পুরস্কারের মতো সর্বোচ্চ পুরস্কার দেয়া হয়। সু চির মতো যারা এই পুরস্কার পান, তারা শেষ দিন পর্যন্ত এই মূল্যবোধ রক্ষা করবেন, এটাই আশা করা হয়। যখন একজন নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী শান্তি রক্ষায় ব্যর্থ হন, তখন শান্তির স্বার্থেই নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির উচিত এই পুরস্কার হয় জব্দ করা নয়তো ফিরিয়ে নেয়া।’

পুরস্কার

অং সান সু চি জীবনে অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন । তার এসব পুরস্কারের মধ্যে উলে­খযোগ্য হচ্ছে থোরোলফ রাফটো স্মৃতি পুরস্কার (১৯৯০), শাখারভ পুরস্কার (১৯৯১), নোবেল শান্তি পুরস্কার (১৯৯১), সিমন বলিভার আন্তর্জাতিক পুরস্কার (১৯৯২), জওহরলাল নেহরু পদক (১৯৯৩), লিবারাল ইন্টারন্যাশনালের দেওয়া স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৯৫), রিপাবলিক অব আয়ারল্যান্ড (১৯৯৯), যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘প্রেসিডেনসিয়াল মেডাল অব ফ্রিডম’ (২০০০), ওলফ পামে পুরস্কার, অস্ট্রেলিয়ার সর্বোচ্চ বেসামরিক খেতাব ‘সম্মাননাসূচক অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ (১৯৯৬), সহনক্ষমতা ও অহিংসা প্রচারের জন্য ইউনেস্কো মদনজিৎ সিং পুরস্কার (২০০২), কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের মেমোরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টর অব ল’স, ভয় থেকে মুক্তি পদক (২০০৩) ইতিহাসে মাত্র চতুর্থ ব্যক্তি হিসেবে কানাডার সম্মাননাসূচক নাগরিকত্ব (২০০৭), এলএসইএসইউ (লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকস স্টুডেন্টস ইউনিয়ন)-এর সম্মাননাসূচক সভাপতি কংগ্রেসীয় স্বর্ণপদক (২০০৮), প্রেমি ইন্টারকন্টিনেন্টাল ক্যাটালুনা (২০০৮), গ্লাসগো স্বাধীনতা পুরস্কার (২০০৯) ইত্যাদি।

বই

অং সান সু চি অনেকগুলো বই লিখেছেন।এগুলো হলঃ   লেটারস ফ্রম বার্মা (বার্মার চিঠি),  ডের ওয়েগ জুর ফ্রেইহেইট, বার্মাস রেভলুশন অব দ্য  স্পিরিট : দি স্ট্রাগল ফর ডেমোক্রেটিভ ফ্রিডম অ্যান্ড ডিগনিটি, অং সান অব বার্মা : আ বায়োগ্রাফিকাল পোট্রেইট বাই হিজ ডটার,ফ্রিডম ফ্রম ফিয়ার অ্যান্ড আদারস (ভয় থেকে মুক্তি ও অন্যান্য),  অং সান, বার্মা অ্যান্ড ইন্ডিয়া : সাম আসপেক্টস অব ইন্টেলেকচুয়াল লাইফ আন্ডার কলোনিয়ালিজম।  তবে বইগুলোতে তার সাথে একাধিক সহলেখক কাজ করেছেন।

শেষ কথা

মুখে সারাক্ষণই মৃদু হাসি লেগে থাকায় বোঝার উপায় নেই অং সান সু চি  কেমন মানুষ। । শরীরের গড়নও মিয়ানমারের অন্য আট-দশজন সাধারণ নারীর মতো। কিন্তু দেখতে তিনি সাধারন মনে হলেও মোটেও তিনি সাধারণ কেউ নন। মনের ভিতর আছে বজ্রকঠিন শপথ। তাই  সম্মান করে অনেকেই  সম্বোধন করেন ‘দ্য লেডি’। রাজনৈতিক জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কেটেছে নানা দূর্যোগে ;কখনো গৃহবন্দী  হয়ে বা  কখনো কারাগারে। এর বাইরেও যন্ত্রণা আর বঞ্চনার শেষ ছিল না।  রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের ২০ বছরের মধ্যে ১৫ বছরই কেটেছে বন্দীদশায়  । কিন্তু তিনি তবুও অবিচল থেকেছেন। নিজের শপথ থেকে একচুলও নড়েননি । জীবনের বিনিময়ে হলেও দেশে গণতন্ত্রের পতাকা ওড়ানোর শপথটা তার মধ্যে ছিল অবিচ্ছেদ্যভাবে। এত কিছু পরও আরাকানের রোহিজ্ঞাদের উপর হামলায় নিরব থাকায় অং সান সু চি’র সব অর্জন ম্লান হয়ে গিয়েছে।বিগত প্রায় পঁচিশ বছর ধরে বাংলাদেশকে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের স্রোত সামলাতে হচ্ছে, এবং গত ক বছর  সেই সঙ্কট আরও জটিল আকার নিয়েছে। গত বছরের ২৫ আগস্ট থেকে রাখাইনে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থী রাখাইন বৌদ্ধদের হামলা ও জ্বালাও-পোড়াও শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১০  লাখ রোহিঙ্গা ! সংখ্যাটা অবিশ্বাস্য হলেও সত্য।

এক বৃদ্ধমাতাকে নিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ। :'(

উপরের ছবিটি রোহিংগাদের অসহায়ত্ব তুলে ধরছে।  জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মায়ানমারের  এ সামরিক  অভিযানকে জাতিগত নির্মূল বলে আখ্যায়িত করেছে। মানবাধিকারকর্মীরাও বলেছেন, পদ্ধতিগতভাবে রোহিঙ্গাদের শত শত গ্রাম, মসজিদ ও সম্পত্তি ধ্বংস করার ঘটনা কার্যকর অর্থেই তাঁদের পূর্বপুরুষদের ভিটামাটি থেকে উৎখাত করার পদক্ষেপ। মিয়ানমারের সরকার সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের কোনো জাতিগোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। দশকের পর দশক তারা নানা বঞ্চনা-নিপীড়নের শিকার। একজন নোবেল বিজয়ী ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে অং সান সু চি’র ভুমিকার প্রতি বিশ্ববাসী তাকিয়ে ছিল। সু চি নির্লজ্জের মত রোহিজ্ঞাদের উপর অত্যাচারের কথা অস্বীকার করে। বিশ্ব সম্প্রদায় তার এই মিথ্যা আচরনে হত বাক হয়ে যায়। সারা বিশ্বে সু চির সৃষ্টি হওয়া ইমেজের উপর সু চি নিজেই কালিমা লেপন করে। বিশ্বাসী তার নোবেল কেড়ে নেওয়ার প্রতি নোবেল কমিটিকে আহ্বান জানায়। আং সান সুচির সমালোচনায় যারা মুখর হয়েছেন তাদের মধ্যে রয়েছেন অনেক নোবেল পুরস্কার বিজয়ী।

এ দিকে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের স্টুডেন্টস ইউনিয়নও জানিয়েছে যে তারা সু চির সম্মানিত প্রেসিডেন্ট পদ প্রত্যাহার করে নেবে। ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মাহাতির পাশা বলেন, ‘রোহিঙ্গা নির্যাতনে অং সান সুচির বর্তমান অবস্থান ও গণহত্যার পরও নিষ্ক্রিয় থাকায় আমরা তার সম্মানিত প্রেসিডেন্ট পদ ফিরিয়ে নেব।’৩০ বছর ধরে অং সান সু চি যুক্তরাজ্যের গ্লাসগো, বাথ, কেমব্রিজসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডিগ্রি পেয়েছেন।  সু চির মানবতা বিরোধী কর্মকান্ডে অনেকেই তার অর্জিত অনেক ডিগ্রি ও পুরুষ্কার কেড়ে নেওয়ার পক্ষে।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক