অলিম্পিক গেমস বিশ্বের সবচেয়ে বড় মর্যাদাপূর্ন খেলার আসর।

অলিম্পিক  গেমস   হল একটি আন্তর্জাতিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতা যেটি  বিশ্বের সর্ববৃহৎ এবং সর্বোচ্চ সম্মানজনক প্রতিযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে। অলিম্পিক গেমস প্রত্যেক চার বছর পর পর অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। তবে চার বছর বলা হলেও মজার ব্যাপার হল দুই বছর পর দুইটি নামে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। গ্রীষ্ম এবং শীতকালীন প্রতিযোগিতা  নামে প্রত্যেক দুই বছর পর পর হয়ে থাকে।  যার অর্থ দাঁড়ায় প্রায় প্রত্যেক দুই বছর পর পর অলিম্পিক গেমসের আসর অনুষ্ঠিত হয় গ্রীষ্মকালীন ও শীত কালীন প্রতিযোগীতা নামের দুইট আলাদা আসর  । অর্থাৎ শুধু    গ্রীষ্মকালীন এবং শীতকালীন আলাদাভাবে  ধরা হলে চার বছর পর অলিম্পিকের আসর বসে। অলিম্পিকের আসরে বিভিন্ন  দেশের প্রতিযোগীরা বিভিন্ন ধরনের খেলায় অংশগ্রহন করে। প্রায়  দুইশতাধিক দেশের অংশগ্রহণে মুখরিত এই অলিম্পিক গেমস ।

অলিম্পিক আসরের  ইতিহাস

প্রাচীন গ্রীসে খৃষ্টপূর্ব অষ্টম শতাব্দিতে অলিম্পিয়া থেকে  প্রাচীন অলিম্পিক গেমস  শুরু হয়। প্রাচীন অলিম্পিক গেমস  থেকেই মূলত আধুনিক অলিম্পিক আসর শুরু হয়।  ১৮৯৪ সালে ব্যারন পিয়ের দ্য কুবেরত্যাঁ সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) গঠন করেন।  আইওসি (OIC) অলিম্পিক গেমস সংক্রান্ত সকল কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

প্রাচীন গ্রিসে দেবতাদের বাসভূমি হিসেবে স্বীকৃত অলিম্পাস পাহাড়ের পাদদেশে গ্রিক দেবতাদের সম্মানার্থে যে খেলাধুলার প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হতো তা অলিম্পিক গেমস নামে পরিচিত । এই  অলিম্পিক গেমস প্রথম শুরু হয় প্রাচীন গ্রিসে ৭৭৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। ৩৯৪  খ্রিষ্টপূর্বাব্দে  ষষ্ঠ রোমান সম্রাট প্রথম থিওডোসিয়াস রাষ্ট্রীয় ধর্ম হিসাবে খৃষ্টীয় মতবাদ প্রবর্তন করতে চেয়ে পৌত্তলিকতার দোষ দিয়ে অলিম্পিক বন্ধ করে দেয়।

প্রাচীন গ্রিস  অনেক গুলো স্বাধীন নগররাস্ট্রে বিভক্ত ছিল। উল্লেখযোগ্য নগর রাস্ট্র গুলো হল  স্পার্টা, এথেন্স, ডেলফি,করিন্থ, থিবিস, আরগোস প্রভৃতি । ইতিহাস বলে ঐ সময়ে সে নগর গুলো একে পরের সাথে প্রায়ই যুদ্ধে লিপ্ত হত ।  তবে  অলিম্পিক চলাকালীন সময়ে শাসন কর্তারা  অলিম্পিক যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতেন  যাতে প্রতিযোগীরা নির্ভয়ে নিজ নিজ  দেশ থেকে এসে অলিম্পিক আসরে  অংশ গ্রহণ করতে  পারে।  প্রতিযোগীতায়  বিজয়ীদের  মাথায়  তখন লরেল পাতার মুকুট পরিয়ে দেওয়া হত ।  অলিম্পিক আসরের   মাধ্যমে তখন  গ্রীক সংস্কৃতিও ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে ব্যাপক প্রসার পায়। অলিম্পিক শুধু মাত্র ক্রীড়ার উৎসব ছিল না, এখানে একাধারে ধর্মীয় ও শিল্পকলার উৎসব হত বলেও  জানা যায়।

প্রতিযোগীতায় শুধুমাত্র যুবদের অংশ গ্রহণের অধিকার ছিল। এই নিয়ে একটি মজার ঘটনা প্রচলিত আছে। একবার একজন প্রতিযোগীর  বয়স বেশি মনে হওয়ায় প্রাথমিক ভাবে তার  অংশগ্রহণে নিষেধাজ্ঞা জারি  করা হয়। পরবর্তিতে  স্পার্টার রাজার কাছে ঐ প্রতিযোগীর  প্রেমিকা প্রতিযোগীর   যৌবনের সপক্ষে  সাক্ষ্য দিলে, স্পার্টার  রাজার অনুমতিতে ঐ ব্যক্তি প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় !

প্রাচীন অলিম্পিকে অংশগ্রহণের একটি অদ্ভুত নিয়ম ছিল। অংশগ্রহণের পূর্বে  সকল প্রতিযোগীকে জিউসের মূর্তির সামনে এই মর্মে শপথ গ্রহণ করতে হত যে তারা দশ মাস যাবৎ অনুশীলন করেছে !

আজকের অলিম্পিক  আর প্রাচীন অলিম্পিকে অনেক পার্থক্য রয়েছে। প্রাচীন অলিম্পিকে  অনেক কম বিভাগ ছিল, এবং শুধুমাত্র স্বাধীন, গ্রীকভাষী ও  পুরুষই এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারত; তবে  বিলিস্টিচ নামের এক মহিলার নাম বিজয়ী হিসাবে পাওয়া যায়। ঐ তিনটি  শর্তপূরণ হলে যে কোনো  প্রতিযোগী এই গেমসে অংশ নিতে পারত।  এখন যেমন অলিম্পিক এক বছর একেক স্থানে অনুষ্ঠিত হয় তখন   আজকের মত এক এক বছর এক এক স্থানে না হয়ে প্রতি চার বছর পর পর  অলিম্পিয়াতেই অনুষ্ঠিত হত।

প্রচীন অলিম্পিক আসর  প্রথমে একদিনের হলেও অচিরেই বেড়ে পাঁচদিনের প্রতিযোগিতায় রূপ নেয়। শুরুতে স্ট্যাডিয়ন (বা “স্ট্যাড”) দৌড় নামে  অলিম্পিক গেমসে একটি মাত্র প্রতিযোগিতা ছিল: , এটি একটি স্বল্পদৈর্ঘ্যের দৌড় প্রায় ১৮০ এবং ২৪০ মিটার (৫৯০ এবং ৭৯০ ফু),  এটি মূলত তখন  একটি স্টেডিয়ামের দৈর্ঘ্যের সমান।  তবে সঠিক  দৈর্ঘ্য আসলে কত এটি নিশ্চিত হওয়া যায় নি। স্ট্যাডিয়নে  দৌড়বীরদের পাঁচটি খুঁটি পেরোতে হত: শুরুতে ও শেষে একটি করে এবং মাঝে আরও তিনটি খুঁটি।

৭২৪ খৃষ্টপূর্বে  ১৪তম  অলিম্পিক আসরের  সময় ডায়াউলোস বা দ্বি-স্ট্যাড দৌড়ের প্রচলন হয়। দ্বি-স্ট্যাড দৌড় হল একটি   স্টেডিয়ামের দ্বিগুণ দূরত্ব যা  প্রায় ৪০০ মিটার  বা ১,৩০০ ফুট বলে জানা যায়। যে দৈর্ঘ্য মূলত  এক পাক নামে পরিচিত।

৭২০ খৃষ্টপূর্বে  ডোলিকোস  নামে তৃতীয় একটি দৌড় প্রতিযোগিতা শুরু করা হয়। যতটুকু জানা  যায় তাতে এই দৌড়ের দৈর্ঘ্য নিয়ে বিতর্ক আছে। কেউ বলেন  এই রেস প্রায় ১৮-২৪ পাকের হত  যা প্রায় তিন মাইল বা ৫  কিলোমিটারের সমান।  ডোলিকোস  অনেকটা  এখনকার ম্যারাথনের অনুরূপ ধরা যায়  – দৌড় শুরু ও শেষ স্টেডিয়ামে হলেও মাঝের পথটি আঁকা বাঁকা ভাবে পুরো অলিম্পিয়া জুড়েই বিস্তৃত  ছিল।

প্রাচীন অলিম্পিকে  সর্বশেষ যে দৌড় প্রতিযোগিতাটি যোগ  হয়, তার নাম  হপলিটোড্রোমোস, বা হপলাইট দৌড়।  ৫২০ খৃষ্টপূর্বে অলিম্পিক আসরে  এই দৌড় শুরু হয়েছিল।  প্রথাগতভাবে এটি অলিম্পিকের শেষ দৌড় প্রতিযোগিতা। এই প্রতিযোগীতায়  প্রতিযোগীরা পূর্ণ বা আংশিক বর্ম পরে, ঢাল হাতে, শিরস্ত্রাণ বা হাঁটুর নিজে বর্ম পরে, হয় একপাক  না হয়  দুই পাক ডায়াউলোস (প্রায় ৪০০ বা ৮০০ গজ) দৌড়াত বলে জানা যায়। এই মূল যুদ্ধের জন্যে প্রয়োজনীয় গতি ও মনোবল পরীক্ষার একটি প্রথা হয়ে উঠেছিল।   এই প্রতিযোগিতায় বর্মের ওজনই প্রায় ৫০ থেকে ৬০  পাউন্ড বা  ২৭ কেজির মত হত। আশ্চর্যজনক হল  এই প্রতিযোগিতার পথটি মাটির দিয়ে তৈরী করা হত  যার উপরে বালি ছড়িয়ে দেওয়া হত।

প্রাচীন অলিম্পিকে  প্রথমে শুধুমাত্র দৌড় থাকলেও পরবর্তিতে মুষ্টি যুদ্ধ (পিগমি), কুস্তি বা পেল ও প্যাংক্রাশন। প্যাংক্রাশন হল MMA বা মিক্স মার্শাল আর্টের প্রাচীন রুপ। যদিও আজকের মুষ্টি যুদ্ধ বা কুস্থির সাথে পূর্বের কুস্তি বা মুষ্টি যুদ্ধের কোন মিল নেই। আরো কিছু খেলা ছিল যেমন রথ চালনা, অনেক ধরনের দৌড়, দীর্ঘ লাফ, জ্যাভেলিন থ্রো, ডিস্ক থ্রো ইত্যাদি।

তবে প্রাচীন অলিম্পিকে এক সময়  পাশবিকতা শুরু ।  মুষ্টি যুদ্ধ ক্রমেই পাশবিক হয়ে উঠে। প্রথম দিকে নরম দাস্তানা ব্যবহার হলেও পরে শক্ত চামড়ার দাস্তানার ব্যবহার শুরু হয়। দেখা যেত অনেকে বিভিন্ন ধাতু দিয়ে দাস্তানাগুলো আরো ভারী করে নিত। লড়াইয়ে কোন বিরতি থাকত না। দেখা গেলে কোণ প্রতিযোগীর আঘাত পেয়ে পড়ে গেল এর পরেও একে মারত । কারন না মারার কোন নিয়ম ছিল না। এমনকি দেখা যেত মারা যাবার আগ পর্যন্ত লড়াই হচ্ছে।  তবে প্রতিপক্ষকে মেরে ফেলাটা কখনোই ভালো চোখে দেখা হত না, বরং কোনো মুষ্টিযোদ্ধা লড়াইয়ে মারা গেলে তাঁকেই বিজয়ী ঘোষণা করা হত!

আধুনিক অলিম্পিক

আধুনিক যুগে অলিম্পিক গেমস বলতে মুলত  ১৭শ শতাব্দীর দিকে শুরু হওয়া আধুনিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতাকেই  বুঝায় ।  এই ধরনের প্রথম অনুষ্ঠান ছিল ইংল্যান্ডে শুরু হওয়া কোটসউল্ড গেমস বা কোটসউল্ড অলিম্পিক গেমস। ১৬১২ থেকে ১৬৪২ সালের মধ্যে এই কোটসউল্ড গেমসের প্রধান আয়োজক ছিলেন রবার্ট ডোভার। লন্ডনে ২০১২ সালের অলিম্পিক গেমসের বিদায়ী অনুষ্ঠানে সপ্তদশ শতকের এই  কোটসউল্ড আয়োজনকে  বৃটেনের অলিম্পিকের সূচনার অভ্যূদয় হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

১৮৫০ সালের দিকে ইংল্যান্ডের শ্রপশায়ারের মাক ওয়েন অলিম্পিক গেমসের প্রচলন শুরু করেন ডঃ উইলিয়াম পেনি ব্রুকস। ডঃ পেনি ব্রুকস  এই ক্রিড়া আওজনের  নাম দেন ওয়েনলক অলিম্পিয়ান গেমস ।  ১৮৬০ সালের ১৫ নভেম্বর ডঃ ব্রুকস এই গেমের জন্য ওয়েনলক অলিম্পিয়ান সোসাইটির প্রতিষ্ঠা  করেন। 

১৮৬২ থেকে ১৮৬৭ সাল পর্যন্ত ইংল্যান্ডের লিভারপুলে জন হুলি এবং চার্লস মিলির তত্বাবধানে বার্ষিক অলিম্পিক উৎসব অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এই দুই আসরে  শুধুমাত্র ভদ্র সমাজের শৌখিন এবং অপেশাদার খেলোয়াড়রাই অংশগ্রহন করতে পেরেছিলেন।

১৮৭০ ও ১৮৭৫ সালে ইভাঞ্জেলোস জ্যাপ্পাসের স্টেডিয়ামে অলিম্পিক হয় যেখানে  ১৮৭০ সালে প্রায় ৩০০০০ দর্শক  খেলা দেখে  বলে জানা যায়। ১৮৯০ সালের অলিম্পিক গেমস দেখে পিয়েরে দ্যা কুবেরত্যা আন্তর্জাতিক অলিম্পিক গঠনের প্রেরণ পান। এ উদ্দেশ্য ব্রুকসের সাথে মিলে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি গঠনের পরিকল্পনা করেন । এই উদ্দেশ্য আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি গঠন হয়। OIC এর তত্ত্বাবধানে প্রথম অলিম্পিক গেমস অনুষ্ঠিত হয় ১৮৯৬ সালে গ্রীসের  এথেন্সের প্যানাথেনেইক স্টেডিয়ামে।   এই আসরে  ৪৩ টি প্রতিযোগীতায় ১৪ টি দেশের প্রায় ২৪১ জন ক্রীড়াবিদ অংশগ্রহণ করেছিল।

১৮৯৬ সালের আসরের সফলতার পর অলিম্পিক গেমস একটি স্থবির সময়ের মধ্য দিয়ে যায় যখন এর অস্তিত্বই সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। ১৯০০ ও ১৯০৪ সালের উভয় অলিম্পিক গেমসই যথাক্রমে ফ্রান্সের বিখ্যাত প্যারিস প্রদর্শনী ও যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট লুইস শহরের বিশ্বমেলার পাশে একটি অনুসারি তবে ১৯০৬ অধিবর্ষ অলিম্পিক থেকে অলিম্পিক গেমসটি আবার উজ্জীবিত হতে শুরু করে।

শীতকালীন বিভিন্ন খেলা    মূলত তুষার ও বরফের বিভিন্ন খেলাকে উৎসাহ দেওয়ার জন্য শীতকালীন আসরের চিন্তা করা হয়  যা গ্রীষ্মকালে আয়োজন করা প্রায় অসম্ভব। ১৯২১ সালের লুসানে অনুষ্ঠিত অলিম্পিক কংগ্রেসে অলিম্পিকের একটি শীতকালীন আসর যুক্ত  করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ফ্রান্সে প্যারিস গেমস অনুষ্ঠিত হওয়ার তিন মাস আগে ১৯২৪ সালে ফ্রান্সের চেমনিক্সে একটি শীতকালীন ক্রীড়া সপ্তাহ পালন করা হয় (আসলে ১১ দিন ধরে অনুষ্ঠিত হয়েছিল)। এই ক্রীড়া সপ্তাহটিই হল বিশ্বের প্রথম শীতকালীন অলিম্পিক গেমস।

তবে ১৯৯২ সালের ফ্রান্স অলিম্পিকের পর থেকে শীতকালীন অলিম্পিক প্রত্যেক চার বছর পর পর, কিন্তু গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের ২ বছর পর অনুষ্ঠিত হওয়া শুরু হয়।

প্রতীক

অলিম্পিক সনদ অনুযায়ী সকল  অলিম্পিকের  গেমসে অলিম্পিকের মূলনীতি বহনকারী প্রতীক ব্যবহার করার কথা  বলা হয়েছে।  অলিম্পিকের প্রতীক হল  মূলত পাঁচটি বলয় একে অপরকে জড়িয়ে থাকে। পতাকার এই পাঁচটি বলয় আফ্রিকা, আমেরিকা, এশিয়া, ওশেনিয়া এবং ইউরোপ মহাদেশকে নির্দেশ করে। পাঁচটি বলয়ের পাঁচটি রঙ নীল, হলুদ, কালো, সবুজ ও লাল  নির্বাচন  করার  কারণ হল এই পাঁচটি রঙের অন্তত যেকোন একটি বা একাধিক রঙ প্রত্যেক দেশের পতাকায়   ব্যবহার হয়।  অলিম্পিকের এই প্রতীকযুক্ত  পতাকাটি ১৯১৪ সালে সর্বপ্রথম গৃহীত হয়  এবং  বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্পে অনুষ্ঠিত ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে ওড়ানো হয়।

 

মাস্কট

১৯৬৮ সালে  মেক্সিকো অলিম্পিকে প্রথমবারের জন্য অলিম্পিক ম্যাস্কটের ব্যবহার করা হয়। এই ম্যাস্কট মূলতঃ আয়োজক দেশের কোনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বাহক বা মানুষের মূর্তি গ্রহণ করা হয়। ।  ধীরে ধীরে এই মাস্কট   সংশ্লিষ্ট অলিম্পিকের আসরের নিজস্ব বৈশিষ্টের প্রচারে প্রধান ভূমিকা হিসেবে কাজ করছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠান

 অলিম্পিক সনদে উল্লেখিত রীতি  অনুযায়ী অলিম্পিক  গেমস শুরু হবার আগে  একটি উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় ।  এই অনুষ্ঠানের রীতি-নীতিগুলি ১৯২০ সালের গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের মতই রয়ে গেছে।   অনুষ্ঠানটি সাধারণত আয়োজক দেশের পতাকা উত্তোলন এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। অতঃপর আয়োজক দেশ বিভিন্ন নান্দনিক প্রদর্শনীর মাধ্যমে দর্শকদের আনন্দ প্রদান করে।  এই অনুষ্ঠানের মাধ্যমে  স্বাগতিক দেশ প্রচুর অর্থ খরচ করে নিজেদের নিজের কৃষ্টি, কলা, ঐতিহ্য, ইতিহাস,  গৌরব ও সামর্থ সারা বিশ্বের কাছে তুলে ধরার চেষ্টা করে  যেমন  বেজিং অলিম্পিকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে চীন  প্রায় ১০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় করে নিজেদের  নিজের কৃষ্টি, কলা, ঐতিহ্য ও ইতিহাস তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
উদ্ধোধনী অনুষ্ঠানে  অলিম্পিক  মশাল স্টেডিয়ামে এনে বিভিন্ন হাত বদলের পর চূড়ান্ত মশাল বাহকের কাছে পৌঁছায় । সাধারণত আয়োজক দেশের কোনো প্রাক্তন অলিম্পিক বিজয়ীই অলিম্পিকের চূড়ান্ত মশাল বাহক হিসাবে অলিম্পিক শিখা প্রজ্বলন করে থাকেন।

সমাপনি অনুষ্ঠান

অলিম্পিক গেমসের সকল  প্রতিযোগিতা শেষ হয়ে যাওয়ার পর এই  আসরের  আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি টানার জন্য সমাপনী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানের শুরুতে বর্ণনানুক্রমে  নিজ নিজ দেশের পতাকা নিয়ে ক্রীড়াবিদরা মাঠে এসে উপস্থিত হন।  সমাপনী অনুষ্ঠানে তিনটি দেশের পতাকা উত্তোলন করা হয় এবং তাদের জাতীয় সংগীত বাজানো হয়। এই তিনটি দেশ হল বিদায়ী অলিম্পিক আসরের  আয়োজক দেশ, গ্রীস ও  পরবর্তী আসরের আয়োজক দেশ। অলিম্পিক আয়োজক কমিটির সভাপতি ও আইওসি সভাপতি একটি করে সমাপনী ভাষণ দেন এবং সেই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অলিম্পিকের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয় অলিম্পিক শিখা নিভিয়ে ফেলার মাধ্যমে সমাপনি ঘটে।

অলিম্পিক ক্রীড়াসমূহ

অলিম্পিক ক্রীড়া বলতে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অলিম্পিক গেমসের অন্তর্ভুক্ত সমস্ত ক্রীড়াকে বোঝায়। বর্তমানে গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন অলিম্পিক গেমস মিলিয়ে ৩৫টি ক্রীড়া, ৫৩টি ডিসিপ্লিন এবং ৪০০টিরও বেশি ইভেন্ট আছে।

সন্ত্রাসবাদ ও সহিংসতা

এ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের কারণে মোট তিনটি অলিম্পিক গেমস আয়োজন করা সম্ভব হয় নি এগুলো হল ১৯১৬, ১৯৪০ এবং ১৯৪৪। ১৯১৬ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, ১৯৪০ ও ১৯৪৪ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে অলিম্পিক অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়। 

১৯৭২ সালে জার্মানীর  মিউনিখে অনুষ্ঠিত গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিক গেমসে সরাসরি সন্ত্রাসবাদী হানা হয়। ব্ল্যাক সেপ্টেম্বর নামক একটি ফিলিস্তিনই জঙ্গি সংগঠন ১১ জন ইজরায়েলি ক্রীড়াবিদকে অপহরণ করে। ইতিহাসের এই নির্মমতম ঘটনাটি মিউনিখ হত্যাকান্ড নামে পরিচিত। জঙ্গিরা তাদের অপহরণের পরপরই দুইজন ক্রীড়াবিদকে হত্যা করে এবং পরে বন্দীদের পালানোর চেষ্টা ব্যর্থ হলে বাকী নয়জনকেও হত্যা করে। উক্ত ঘটনায় ৫ জন জঙ্গি সহ একজন জার্মান পুলিশ কর্মকর্তাও নিহত হন

অন্য দিকে  যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত গত দুটি অলিম্পিক আসরেই সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ দেখা যায়। ১৯৬৬ সালের আটলান্টায় গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকের সময় সেন্টেনিয়াল অলিম্পিক পার্কের পাশে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এতে দুই জন নিহত ও ১১১ জন আহত হয়।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক