অসহযোগ আন্দোলনঃ বিশ্ব পরিচিত হল নতুন ধারার এক আন্দোলনের সাথে

অসহযোগ শব্দটির সাথে এক সময় উপমহাদেশের মানুষের কোন পরিচয় ছিল না। এই শব্দটির সাথে ১৯২০ সালে উপমহাদেশের মানুষের সাথে প্রথম পরিচয় হয় । উপমহাদেশে সে সময় ব্রিটিশরা শাসন করত। ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ১৯২০ সালের ৩১ আগস্ট মহাত্মা গান্ধী অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। মূলত রাউলাট আইন এবং জানিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদস্বরুপ এই আন্দোলন শুরু হয়।

ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে অসহযোগ আন্দোলন প্রথম একটি বৃহত্তম গণআন্দোলন ছিল । সম্পূর্ণ অহিংস পদ্ধতিতে সরকারের সঙ্গে অসহযোগিতা করে ভারতের ব্রিটিশ শাসনকে ব্যর্থ করে দেওয়াই ছিল গান্ধিজির অসহযোগ আন্দোলনের মূল লক্ষ্য ।

অসহযোগ আন্দোলনের ইতিহাস

অসহযোগ আন্দোলনে শুরু হয় রাউলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে। গনতান্ত্রিক আন্দোলন আর সন্ত্রাসবাদ দমনের নামে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্ব যুদ্ধের পরে রাওলাট আইন প্রবর্তন করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ উদ্দেশ্য ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ বিচারপতি রাউলাটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের ‘সিডিশন কমিশন' গঠন করে। ভারতীয়দের হিংসাত্মক আন্দোলন থেকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যকে রক্ষা করতে কমিশন কতকগুলি সুপারিশ করেন । 

১৯১৯ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে বৃটিশ সরকার রাউলাট আইন জারী করে। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দের ১৮ই মার্চ সেই সুপারিশ গুলোর উপর ভর করে ব্রিটিশ সরকার এক সন্ত্রাসবাদ বিরোধী এবং দমনমূলক আইন প্রণয়ন করেন । এই আইনই সাধারণভাবে কুখ্যাত ‘রাউলাট আইন’ নামে পরিচিত ।

রাওলাট এ্যাক্টের প্রধান লক্ষ্য ছিলো ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে দমন করা। জনগণের স্বাধীনতা ও অধিকার হরণ করা । সরকার বিরোধী যে-কোনো প্রচারকার্যকে দন্ডনীয় অপরাধ বলে চিহ্নিত করা এবং কোনো রকম সাক্ষ্য ও প্রমাণ ছাড়াই যেকোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে বিনা পরোয়ানায়  গ্রেফতার, যতদিন খুশি আটক রাখার অবাধ ক্ষমতা ও ঘরবাড়ি তল্লাশির অধিকার সরকারকে দেওয়া হয় ।এই আইনের আসল উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয়দের ন্যায়বিচার লাভের অধিকার সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া। তাই রাওলাট আইনকে কালাকানুন বলা হয়।

সংবাদপত্রের স্বাধীনতা হরণ করা হয় এবং সরকার সাধারণ আইনের প্রয়োগ স্থগিত রেখে জনসাধারণকে চরম পুলিশি ও প্রশাসনিক অত্যাচার ও নির্যাতনের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় । জনমনে যথারীতি এই আইনের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় । ভারতীয়দের জাতীয় স্বার্থবিরোধী এই আইনের বিরুদ্ধে চারিদিকে তীব্র প্রতিবাদ গড়ে ওঠে । কেন্দ্রীয় আইন সভার সমস্ত ভারতীয় সদস্য প্রতিবাদে গর্জে ওঠেন ।  ক্ষুব্ধ কংগ্রেস নেতারা বুঝলেন যে মন্টেগু চেমস ফোর্ডের রিপোর্টে ভারতীয়দের আশা আকাঙ্ক্ষাকে ন্যূনতম মূল্য দেয়া হয় নি। ভারতীয়দের হাতে সামান্যতম ক্ষমতাও রইল না। কংগ্রেসের নেতারা ১৯১৮ সালে বোম্বাইয়ের অধিবেশনে চেমস ফোর্ডের রিপোর্ট প্রত্যাখান করলেন।

১৯১৯ সালের শুরুতেই  সমস্ত ভারতীয়দের মতামত উপক্ষো করে রাওলাট কমিটির সুপারিশ পাশ করে পুলিশের হাতে বেপরোয়া ক্ষমতা দেয়া হলো। এই আইনের ক্ষমতা বলে ভারতীয়দের ওপর দমন-পীড়ন শুরু হয়। ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় সাধারণ মানুষ। কোনো প্রমাণ ছাড়াই ব্রিটিশ পুলিশ ভারতীয়দের গ্রেপ্তার করতে শুরু করে। বাজেয়াপ্ত করে তাদের সম্পত্তি। ১৯১৯ খ্রিস্টাব্দে ৩০শে মার্চ এবং ৬ই এপ্রিল গান্ধিজির ডাকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ হরতাল পালিত হয় ও জনসভা অনুষ্ঠিত হয় । গান্ধিজি সত্যাগ্রহের হুমকি দেন ।

১৩ই এপ্রিল, ১৯১৯ সাল, রবিবার। দিনটি ছিল শিখদের নববর্ষ উৎসব। ঐদিন পাঞ্জাবের অমৃতসরে স্বর্নালী মন্দিনের নিকট জালিয়ানওয়ালবাগ নামক স্থানে এক বৈশাখী জমায়েত অনুষ্ঠিত হয়। মাঠটি ছিল দেয়াল দিয়ে ঘেরা, যার পাঁচটি প্রবেশ পথ ছিল। একই সাথে এদিনটি ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসের একটি কলঙ্কময় দিন। 

মুসলিম হিন্দু একাত্মা ছবিঃ বাংলাপিডিয়া

শহরে তখন চলছে সামরিক আইন রাউলাট অ্যাক্টের বিরুদ্ধে আন্দোলন।আন্দোলন থামাতে ব্রিটিশ সরকার জারি করেছে ১৪৪ ধারা। সে ধারা ভঙ্গ করেই নববর্ষ উৎসব পালনের জন্য নানা ধর্মের সবাই সমবেত হয়েছে জালিয়ানওয়ালাবাগের ঐতিহাসিক ময়দানে। ময়দানের চারপাশ দেয়াল দিয়ে ঘেরা। প্রবেশদ্বারও ছোট। ব্রিটিশ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডায়ারের কানে পৌঁছে যায় এই জমায়েতের কথা। তৎক্ষণাৎ ডায়ার ৫০ জন রাইফেলধারী সেনা নিয়ে হাজির জালিয়ানওয়ালাবাগের সেই প্রার্থনাসভায়।

বিগ্রেডিয়ার জেনালারেল ডায়ার মূল ফটক বন্ধ করে নিরীহ ও নিরস্ত্র জনতার ওপর গুলিবর্ষণের নির্দেশ দেন। এই ময়দানের পাশেই ছিল একটি কুয়ো। গুলিবর্ষণের ঘটনায় স্তম্ভিত হয়ে যায় উপস্থিত লোকজন। গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়ে একেএকে। চলে ছোটাছুটি। পাশের কুয়োয় ঝাঁপ দিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষ-শিশু। একটানা ১০ মিনিট ধরে চলে গুলিবর্ষণ। এক হাজার ৬৫০টি গুলি কেড়ে নেয় প্রায় দেড় হাজার মানুষের প্রাণ।

ঐ ঘটনা সম্পর্কে বিগ্রেডিয়ার জেনারেল ডায়ার যে রিপোর্ট তিনি ব্রিটিশ সরকারকে দিয়েছিলেন তার বর্ণনা ছিল এরকম:

"সরু একটি গলির ভেতর দিয়ে আমি উদ্যানে ঢুকলাম। রাস্তা সরু হওয়ায় আমাকে আমার সাঁজোয়া গাড়ি রেখে আসতে হয়েছিল। পার্কে ঢুকে দেখলাম হাজার পাঁচেক মানুষ। একজন মানুষ একটি উঁচু বেদিতে দাঁড়িয়ে হাত নেড়ে নেড়ে ভাষণ দিচ্ছে। আমি সাথে সাথে বুঝলাম মানুষের তুলনায় আমার সাথে সৈন্যদের সংখ্যা অনেক কম। আমি গুলির নির্দেশ দিলাম। দু’শ থেকে তিনশ লোক মারা যায়। এক হাজার ছশ পঞ্চাশ রাউন্ড গুলি চালানো হয়। সন্ধ্যে ছয়টার দিকে আমি সেনা সদর দপ্তরে ফিরে যাই।"

ব্রিটিশদের জন্য ভারতে সময়টা তখন খুবই নাজুক ছিল, এবং বিক্ষোভ সহিংসতার অন্যতম কেন্দ্র ছিল অমৃতসর। ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের জীবনী-গ্রন্থ বুচার অব দি অমৃতসর লিখেছেন নাইজেল কলেট। তিনি স্থানীয় দুজন রাজনীতিবিদ গ্রেফতার শহরে দাঙ্গা হবার কথা উল্লেখ করেছিলেন। বেশ কিছু লোক ঐ দাঙ্গায় মারা যায়।

"ব্রিটিশ শাসকদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল মহাত্মা গান্ধির নেতৃত্বে ভারতে যে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জন্ম নিয়েছে তা ৬০ বছরে আগের সিপাহী বিদ্রোহের মত কোনো বিদ্রোহী তৎপরতার জন্ম দিতে পারে। গণহত্যার ঐ ঘটনার আগ থেকেই অনেক মানুষ বালিশের নীচে পিস্তল রেখে ঘুমোতে শুরু করেছিলো। তাদের ভেতর ভয় ঢুকেছিলো খারাপ কিছু হতে যাচ্ছে। তারা ভয় পাচ্ছিলো ভারতীয়রা তাদের অজান্তেই বিদ্রোহ শুরু করবে এবং ব্রিটিশ পরিবারগুলো হুমকিতে পড়বে, ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যও ধসে পড়তে পারে। এবং সে সময়েই গান্ধী দেশে এসে অসহযোগ আন্দোলন শুরু করলেন। ব্রিটিশরা এই ধরণের প্রতিবাদের ব্যাপারে অভ্যস্ত ছিলনা। পরিস্থিতি তাদের আয়ত্বের বাইরে চলে যেতে থাকে। তারা এটাকে আর রাজনীতি ভাবতে পারছিলো না। তাদের মনে আরেকটি বিদ্রোহের ভয় ঢুকে গিয়েছিলো।"

দাঙ্গা পরিস্থিতি সামাল দিতেই অমৃতসরের ব্রিগেডিয়ার ডায়ারকে নিয়ে আসা হয়েছিল। ডায়ার শহরে এসেই যে কোন ধরণের সমাবেশ নিষিদ্ধ করে দিলেন। কিন্তু অনেক মানুষ এই সিদ্ধান্তের কথা জানতো না।

নেহেরু , গান্ধী ও অসহযোগ আন্দোলন ছবিঃ ডেইলি হান্ট

হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য কংগ্রেস বিশিষ্ট নেতৃবৃন্দকে নিয়ে এক তদন্ত কমিটি গঠন করে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ‘নাইট’ উপাধি বর্জন করেন।​

নাইজেল কলেট লিখেছিলেন,

"ঘটনার পুরো চিত্র যখন পরিষ্কার হলো, ভারতে প্রচণ্ড ক্ষোভ তৈরি হলো। ডায়ারের বিচার দাবি শুরু হলো। কিন্তু ইংল্যান্ডে এই সেনা কর্মকর্তা জোরালো সমর্থন পাচ্ছিলেন। ইংল্যান্ডের মানুষজন এটা দেখছিলো এভাবে যে ডায়ার তার দায়িত্ব পালন করেছেন। অনেক বলছিলেন ডায়ার পরিস্থিতির শিকার।"

ডায়ারের সমর্থনে তহবিল সংগ্রহ শুরু হয়েছিলো। ২৬ হাজার পাউন্ড সংগ্রহ করা হয়েছিলো। ব্রিটেনে ফিরে আসার তাকে দামি পাথর খচিত তরবারি উপহার দেয়া হয়েছিলো যাতে খোদাই করা ছিল – Saviour of Punjab অর্থাৎ পাঞ্জাবের রক্ষাকর্তা।

কারো কাছে হিরো আর কারো কাছে ভিলেন হতে হয়। ডায়ার ছিল ভারতীয়দের কাছে ভিলেন স্বরুপ। ব্রিটিশ সরকার ডায়ারের ঘটনার জন্যে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করেছিলো। কমিশন ব্রিগেডিয়ার ডায়ারের সাথে কথা বলে। কমিশনকে তিনি বলেছিলেন, সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা ভাঙ্গার শিক্ষা দিতে চেয়েছিলেন তিনি। ডায়ার কমিশনকে বলেঃ

"আমি মনে করি যা করেছি ভালো করেছি। দ্বিতীয়বার স্পর্ধা দেখানোর আগে তারা একবার ভাববে​​​​।"

জালিয়ানওয়ালাবাগের ভয়ানক ও মর্মান্তিক হত্যাকান্ডের ঘটনায় ব্রিটিশ শাসনের প্রকৃত নগ্ন রূপের প্রকাশ হয়ে পড়ে। সরকার জেনারেল ডায়ারের কাজকে সমার্থন করে. কিন্তু এই হত্যাকান্ডের ঘটনায় গোটা বিশ্ব শিহরিত হয়. দেশে-বিদেশে সর্বত্র সরকারের নগ্ন স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে।

জালিয়ানওয়ালাবাগের ঐ গণহত্যা ভারতের জাতীয়তাবাদকে আরো কঠোর করে তুললো। গান্ধি লিখেছিলেন আমরা ডায়ারের শাস্তি চাইনা, যে ব্যবস্থা ডায়ারের মত মানুষ তৈরি করে, আমরা তার পরিবর্তন চাই।

জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকান্ডের ঘটনার প্রতিবাদে দেশের সর্বত্র ঘৃণা ও ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। সুরেন্দ্রনাথ বন্দোপাধযায় বলেছেন যে,

 "এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ভারতে যে মহাযুদ্ধের আগুন জ্বালিয়ে দেয় তা উত্তর, দক্ষিণ,পূর্ব ও পশ্চিমে ছড়িয়ে পড়ে সবার হৃদয়কে আন্দোলিত করে।" 

দুই দিন পরে, ১৫ ই এপ্রিল, গুজরাওয়ায় বিক্ষোভ সংঘটিত হয় অমৃতসরের হত্যা কান্ডের প্রতিবাদে। বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশ ও বিমান ব্যবহার করা হয়, এর ফলে ১২ জন মারা যায় এবং ২৭ জন আহত হয়।

জানিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ছবিঃ ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

রাওলাট আইন ও জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় মহাত্মা গান্ধী ও ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস ১৯২০ সালে এক আন্দোলনের ডাক দেয়, ইতিহাসে যা অসহযোগ আন্দোলন নামে পরিচিত। অসহযোগ আন্দোলন হলো মূলত একটি গণআন্দোলন যার উদ্দেশ্য হলো শাসক সরকারের উপর থেকে সকল ধরনের সহযোগিতা প্রত্যাহার করা ও এর মাধ্যমে তাকে গণদাবি মেনে নিতে বাধ্য করা। এর সূত্র ধরে সব অফিস ও কল-কারখানা বন্ধ হয়ে যায়। ভারতীয়রা সরকারি স্কুল, পুলিশ বিভাগ, সেনাবাহিনী থেকে সরকারি চাকরি ত্যাগ করেন। আইনজীবীরা সরকারি আদালত বর্জন করেন। এ ছাড়া গণপরিবহন, ব্রিটিশ দ্রব্যসামগ্রী, বিশেষ করে কাপড় বর্জন করা হয়।

উক্ত আহ্বান গুলো ছাড়াও সমগ্র ভারতে জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও জাতীয় বিচারিক সংস্থা গড়ে তোলা এবং হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভ্রাতৃপ্রতিম সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রথমবারের মতো ব্যাপক জনগণের অংশগ্রহণের ভিত্তিতে এই আন্দোলন পরিচালিত হয়। গুজরাট বিদ্যাপীঠ, বিহার বিদ্যাপীঠ, তিলক মহারাষ্ট্র বিদ্যাপীঠ, কাশি বিদ্যাপীঠ, বেঙ্গল ন্যাশন্যাল ইউনিভার্সিটি এবং দিল্লি জামিয়া মিলিয়া ইত্যাদি স্বজাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়।

অসংখ্য ছাত্র স্কুল, কলেজ বর্জন করে আন্দোলনে যোগ দেয়। দেশবাসীর উদ্যোগে ছাত্রছাত্রীদের বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা হিসাবে কাশী বিদ্যাপীঠ, বারাণসী বিদ্যাপীঠ, গুজরাট বিদ্যাপীঠ, জামিয়া মিলিয়া ইসলামিয়া প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয় । ডক্টর জাকির হোসেন, আচার্য নরেন্দ্র দেব, লালা লাজপত রায় প্রমুখ শিক্ষাবিদগণ এই সব নব প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন । মতিলাল নেহরু, ডঃ রাজেন্দ্রপ্রসাদ, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস প্রমুখ আইনজীবীগণ আইন ব্যবসা ত্যাগ করে অসহযোগ আন্দোলনে অংশ নেন । 

সুভাষচন্দ্র বসু সিভিল সার্ভিস থেকে পদত্যাগ করে এবং জওহরলাল নেহরু এলাহাবাদ হাইকোর্ট ছেড়ে অসহযোগ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন । মহাত্মা গান্ধির ডাকে ডঃপ্রফুল্ল ঘোষ সরকারি উচ্চপদে ইস্তফা দিয়ে, প্রফুল্ল সেন, অজয়্ কুমার মুখার্জি উচ্চশিক্ষার মোহ বর্জন করে অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন । এভাবে একে একে মেদিনীপুরের যাদুগোপাল মুখোপাধ্যায়, নদিয়ার হেমন্ত সরকার, বরিশালের যতীন সেন, ময়মনসিং -এর ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ আরও অনেকে তাঁদের সহকর্মিদের নিয়ে 

অসহযোগ আন্দোলন শুধু ছাত্র ও বুদ্ধিজীবী মহল নয় ছড়িয়ে পড়ে দেশের শ্রম জীবি মানুষের মধ্যেও। শ্রমিক শ্রেণি কলকারখানা ছেড়ে এবং কৃষক শ্রেণি ও গ্রামগঞ্জের সাধারণ মানুষও এই অসহযোগ আন্দোলনে সামিল হয়েছিলেন । সীমান্ত প্রদেশের পাঠান, মেদিনীপুরের কৃষক, মহারাষ্ট্রের শ্রমিক, উত্তরপ্রদেশের ক্ষেতমজুর, শিক্ষিত ও অশিক্ষিত সকলে এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করেছিলেন । আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে ঘরে ঘরে ত্যাগের প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। 

অন্য দিকে, ১৯১৯ সালের জানুয়ারীতে প্যারিসে অনুষ্ঠিত “শান্তি বৈঠকের” সিদ্ধান্ত অনুসারে মিত্র শক্তি তুরস্ককে ছিন্নভিন্ন করার ব্যবস্থা করে। বিশ্বযুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরেও বৃটিশের সহায়তায় গ্রীকরা ১৯১৯ সালের মে মাসে বিনা উস্কানিতে পর্যুদস্ত তুরস্কের উপরে হামলা চালিয়ে স্মার্ণা দখল করে নেয় এবং আনাতোলিয়ার অভ্যন্তরে প্রবেশ করে। তখন তুরস্ক রাজ্য ছিল মুসলিম ভারতের ধর্মীয় নেতৃত্বের আশা ভরসার স্থল তথা খেলাফতের প্রাণকেন্দ্র। এভাবে তুরস্ককে তছনছ করা ভারতের মুসলমানদের মনে গভীর রেখাপাত করে। 

খিলাফত আন্দোলন

উপমহাদেশের মুসলমানরা চিন্তা করলেন, তুরস্কের শক্তি ও স্বাধীনতা ব্যতিত ইসলামী খেলাফত টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। এই চিন্তা থেকে আলি ভ্রাতৃদ্বয় সহ মুসলিম নেতৃবৃন্দ  মিলে ভারতে একটি খেলাফত কমিটি গঠনের চিন্তা করেন। ড. আনসারীর নেতৃত্বে এ সময় খিলাফত কমিটি গঠিত হয়। ১৯১৯ সালের জুলাই মাসে লক্ষ্মৌতে ফজলুল হক এবং মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে বাংলা খিলাফত আন্দোলন গড়ে ওঠে।

খেলাফত কমিটির দাবি জানায় গোটা ‘জাযীরাতুল আরব’ অর্থাৎ আরব , ইরাক , সিরিয়িা ও ফিলিস্তিনের উপর তুরস্ক খলিফার শাসনাধিকার থাকতে হবে। মুসলমানদের পবিত্র স্থান সমূহের তত্ত্বাবধানের ভার তার উপরে ন্যস্ত করতে হবে। খিলাফত কমিটি কর্তৃক বৃটিশ পণ্য বয়কট ও অসহযোগ আন্দোলনের প্রস্তাব গৃহীত হওয়ায় কংগ্রেসের সাথে এর সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে। তাই অনেক হিন্দু নেতা খিলাফতের প্রশ্ন সমর্থন করেন। 

১৯১৯ সালেল ২৪ নভেম্বর দিল্লীতে হিন্দু-মুসলমান এক সাথে একটি সভা হয় । সে সভায় মহাত্মা গান্ধী ঘোষণা করেন যে , হিন্দুরাও খিলাফত আন্দোলনে সহায়তা করবে। যদিও মহাত্মা গান্ধীর উদ্দেশ্য ছিল উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন তরান্বিত করা। তখন তিনি বলেছিলেনঃ 

‘আমাদের দু’জনের পক্ষে খিলাফত একটা কেন্দ্রীয় ব্যাপার- মুহম্মদ আলীর নিকট এটা তাঁর ধর্ম;আর খিলাফতে আত্ম দান করলেও সেটা আমার ধর্মের স্বার্থে গোরক্ষার জন্যে আমি মুসলমানদের ছুরিকাঘাত হতে গো মাতাকে রক্ষা করছি।

মুহাম্মাদ আলীর খিলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনের মধ্য দিয়ে হিন্দু -মুসলিম ঐক্যের যে সুযোগ ঘটেছিল সেই সুযোগ হেলায় হারাননি। খিলাফত আন্দোলনের ফলে উপমহাদেশে বৃটিশের বিরুদ্ধে অসন্তোষ দানা বেঁধে উঠতে থাকে।

১৯২১ সালের জানুয়ারী - ফেব্রুয়ারী সংখ্যায় ‘অসহযোগিতা ও আমাদের কর্তব্য’শীর্ষক প্রবন্ধে মওলানা মনিরুজ্জামান বলেন, 

“ খিলাফত সমস্যা ও জালিওয়ানওয়ালা বাগের নৃশংস হত্যাকা- প্রসংগে ভারতবর্ষে এক তুমুল আন্দোলন সৃষ্টি হইয়াছে। এই আন্দোলনের নাম অসহযোগিতা। ইহার উদ্ভাবক মহাত্মা গান্ধী । মওলানা মুহম্মদ আলী ও শওকত আলী প্রভৃতি তাঁহার সহযোগী। ভারতের সর্বত্র লক্ষ লক্ষ লোক এই প্রস্তাবের সমর্থক ও অনুসারী।

এভাবে মুসলমানরাও অসহযোগ আন্দোলনের সাথে একাত্বা ঘোষণা করে। 

আন্দোলনের এক পর্যায়ে ১৯২২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারী চৌরী চেরা নামক স্থানে পুলিশের সাথে জনতার ব্যাপক সংঘর্ষ হয়। পুলিশের গুলিতে ঘটনাস্থলে ৩ জনের মৃত্যু হয়। বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় পুলিশ ফাড়িতে অগ্নিসংযোগ করলে ২২ জন পুলিশ দগ্ধ হয়ে মারা যায়। অহিংস আন্দোলন সহিংস রূপ ধারণ করার কারণে মহাত্মা গান্ধী অত্যন্ত বিচলিত হন এবং এক বিবৃতির মাধ্যমে অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। 

তথ্য সূত্রঃ বিবিসি, উইকিপিডিয়া, বেঙ্গলস্টুডেন্ট, সংগ্রাম 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক