আইফোন টেন বা আইফোন এক্স – ফিচার, ছবি , দাম ও অন্যান্য তথ্য

আইফোন চিনে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। অ্যাপলের যাত্রা আশির দশকে হলেও আইফোন অ্যাপলের  একটি নবীন প্রোডাক্ট।  ২০০৭ সালের ২৯ জুন তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অ্যাপল প্রথম আইফোন এসেছিল। অ্যাপলের সহপ্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস ২০০৭ সালের ৭ জানুয়ারি সানফ্রান্সিসকোতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আইফোনের ঘোষণা দেন । ঘোষনণা দেওয়ার ছয় মাস পর বাজারে এসেছিল প্রথম আইফোন।

স্টিভ জবস তখন বলেছিলেন, তিনটি বৈপ্লবিক উদ্ভাবনী পণ্যের সমন্বয়ক হল আইফোন। একটি হল বৈপ্লবিক মোবাইল ফোন, প্রশস্ত পর্দার স্পর্শ নিয়ন্ত্রণযোগ্য আইপড ও তৃতীয়টি হল যুগান্তকারী ইন্টারনেট যোগাযোগের যন্ত্র যার মাধ্যমে ডেস্কটপের মতো মেইল আদান-প্রদান, ওয়েব ব্রাউজ, সার্চ ও ম্যাপ দেখা যাবে। গত একদশকে বিশ্বজুড়ে অ্যাপল-ভক্তদের কাছে বিশ্বস্ত পণ্যের নাম হয়ে উঠেছে আইফোন। প্রতিবার বিশ্ব জুড়ে নতুন আইফোন বাজারে আসা নিয়ে তৈরি হয় চরম উন্মাদনা।

প্রতিবছর সেপ্টেম্বর মাসে আই ফোন নতুন চমক নিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে হাজির হয়। সাধারনত অ্যাপল বছরে আইফোনের দু’টি মডেল উন্মোচন করে থাকে । বাজারে আইফোন ছাড়ার  দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যাপল আই ফোনের নতুন তিনটি মডেল উন্মোচন করে। গত সেপ্টেম্বরে উন্মোচন হওয়া আইফোনের তিনটি মডেল হল আই ফোন ৮ , আইফোন ৮ প্লাস এবং আইফোন ১০ বা এক্স। গতবছর চমক হিসেবে এসেছে আইফোন টেন (আইফোন এক্স)। আইফোন টেন নিয়ে জানার পূর্বে আইফোন সম্পর্কিত কিছু তথ্য জেনে নেই।

আইফোনের ঘোষণা দেন স্টিভ জবসঃ  আইফোনের ইতিহাস

আইফোনের ইতিহাসের সঙ্গে যে নামটি যুক্ত হয়ে আছে সেটি হল অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস। জবসের হাত ধরেই বাজারে এসেছে মোবাইল ফোনের যুগ পরিবর্তনকারী ‘আইফোন’। প্রযুক্তিবিষয়ক ওয়েবসাইট স্লেট ডটকম অনুযায়ী, আইফোন তৈরির আগে গান শোনার যন্ত্র হিসেবে অ্যাপল আইপড বাজারে এনেছিল । অ্যাপল প্রতিষ্ঠাতা  স্টিভ জবস মিউজিক প্লেয়ারের সমাপ্তি দেখতে চেয়েছিলেন।  অ্যাপল ধারনা করেছিল তারা যদি মিউজিক প্লেয়ারের বিকল্প তৈরি না করে, তবে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান হয়ত মুঠোফোনের মতো ফোন কল, ভিডিও দেখার প্রযুক্তি ও গান শোনার যন্ত্র একত্র করে নতুন কোন পণ্য বাজারজাত করবে । এজন্যে তাদের মনে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে  আইপডের বাজার দখল করতে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান নতুন পণ্য বাজারে ছাড়তে পারে। এরপর থেকেই আইফোন তৈরির জন্য প্রস্তুতি শুরু করে অ্যাপল।

জবসের নির্দেশ অনুসারে ২০০৫ সালে অ্যাপলের প্রকৌশলীরা টাচ স্ক্রীন নকশা শুরু করে। স্টিভ জবস ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে সানফ্রান্সিসকোতে প্রথম আইফোন বাজারে আনার ঘোষণা দেওয়ার সময় তিনি আইপডের একটি ছবি দেখান, যাতে ক্লিক হুইলের পরিবর্তে রোটারি ডায়াল বাটন দেখা গিয়েছিল।  তবে অ্যাপল যখন আইফোন বাজারজাত করে তখন  মুঠোফোনে রোটারি বাটন যুক্ত করেনি। কারণ, ওই সময় স্যামসাংয়ের এক্স৮১০ মডেলের মুঠোফোনটির মডেলে রোটেটিং হুইল ছিল।

তবে অ্যাপলের প্রথম আইপড নকশাকারী হিসেবে পরিচিত প্রকৌশলী টনি ফ্যাডেল রোটেটিং হুইল ধারণাকে বাদ দেন এবং ক্লিক হুইলের পরিবর্তে  তিনি মাল্টি টাচ প্রযুক্তি নিয়ে কাজ শুরু করার কথা জানান। টনি ফ্যাডেলের পরামর্শ মতে  স্টিভ জবস অ্যাপলের প্রকৌশলী দলকে দুই ভাগে ভাগ করে দেন। একটি দল সফটওয়্যার ও আরেকটি দল হার্ডওয়্যার নিয়ে কাজ শুরু করে। সফটওয়্যার দলটির মূল কাজ ছিল সুন্দর ইন্টারফেস তৈরি করা আর হার্ডওয়্যার দলটির কাজ ছিল মানুষের পছন্দসই একটি মুঠোফোনের নকশা তৈরি করা।

অ্যাপল ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এটিঅ্যান্ডটির সঙ্গে চুক্তি করে আইফোন বাজারে আনার ঘোষণা দেয়। ২৯ জুন ২০০৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রথম আইফোন বিক্রি শুরু হয়। পরবর্তীতে ২০০৮ সালের ১১ জুলাই আইফোন থ্রিজি, ২০০৯ সালের ১৯ জুন আইফোন থ্রিজি-এস। আইফোন ৪ আসে ২০১০ সালের ২৪ জুন, ২০১১ সালের ১৪ অক্টোবর আইফোন ৪এস। আই ফোন ৫ আসে ২০১২ সালের ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৩ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আইফোন ৫এস ও ৫সি। ২০১৪ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আইফোন ৬ ও ৬প্লাস আসে , ২০১৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর আইফোন ৬এস ও ৬এস প্লাস, ২০১৬ সালের ৩১ মার্চ আইফোন এসই এবং ২০১৬ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর আইফোনের আইফোন ৭ উন্মুক্ত হয়।সর্বশেষ সংস্করণ আই ফোন ৮ , আইফোন ৮ প্লাস ও আইফোন এক্স বা ১০ আসে ২০১৭ এর ১২ সেপ্টেম্বর।

আইফোন এক্সের ফিচার

ডিসপ্লে

আইফোন টেনের একটি মূল আকর্ষণ হল ৫.৮ ইঞ্চির রাউন্ডেড কর্ণারযুক্ত  মাল্টি টাচ ওএলইডি OLED ডিসপ্লে। ডিসপ্লেটি ২৪৩৬ X ১১২৫ পিক্সেল ৪৫৮ppi । এটি ৩ডি টাচ ডিসপ্লে। স্কীনটিতে আঙ্গুলের ছাপ রোধক কোটিং দেওয়া আছে।

পানির স্ল্যাশ বা ঝাপসা , পানি ও ময়লা প্রতিরোধক

আইফোন ৮ ও ৮প্লাসের মত আইফোন টেনও পানির স্ল্যাশ বা ঝাপসা প্রতিরোধক । এছাড়া পানি ও ময়লা প্রতিরোধক। আইফোন এক্স IEC Standard 60529 এর IP67 কোড অনুযায়ী নির্মিত।

ক্যামেরা

এই ফোনটির প্রতি গ্রাহক উন্মাদনার পিছনের একটি কারন হল এর উন্নত ক্যামেরা।  ফোনটিতে রয়েছে ১২ মেগাপিক্সেলের ব্যাক ক্যামেরা। যেটি টেলিফটো ফিচারযুক্ত। আর আপনি চাইলে ছবিকে ১০x জুম করতে পারবেন। সবচেয়ে বড় কথা হল এটি রয়েছে ডুয়েল অপটিকেল ইমেজ স্ট্যাবিলাইজেশন। ফলে হাত কাপার ফলে ছবি ঝাপসা আসবে না। রয়েছে প্যানেরোমা মোড, হাইব্রিড IR ফিল্টার। রয়েছে শরীর এবং ফেস ডিটেকশন ফিচার। চাইলেই আপনি ক্যামেরার এক্সপোজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন। ফ্রন্ট ক্যামেরা হিসেবে রয়েছে ৭ মেগাপিক্সেলের ক্যামেরা। খুব নিখুঁত সেলফি তুলতে উস্থাদ এই ফ্রন্ট ক্যামেরা।

হোম বাটন

আৎফোনের অন্য সংস্করণগুলোতে হোম বাট থাকলেও আইফোন এক্স হোম বাটন একদম গায়েব করে দেওয়া হয়েছে ! হোম বাটন ছাড়াই একে দিব্যি নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবহার করতে পারবে। হোম বাটনের বদলে স্কীনে একটি হোম ইন্ডিকেটর দেওয়া হয়েছে।

সেন্সর

আইফোন এক্স এর সেন্সরগুলোর জন্যেও খুব আলোচিত হয়েছে। আইফোন টেনের সেন্সরগুলো হল ফেস আইডি, ব্যারোমিটার, জাইরো, এক্সেলেরোমিটার, প্রক্সিমিটি সেন্সর ও লাইট সেন্সর।

সেলফি পোট্রেট

আইফোন টেনের সামনের ৭ মেগাপিক্সেল ক্যামেরা দিয়ে পোট্রেট মোডে ছবি তুলা যাবে। এছাড়াও আপনি ১০৮০পি ভিডিও করতে পারবেন।

ডাবল ট্যাপে অ্যাপল পে

আইফোন এক্সের ডান পাশের বাটনে ডাবল ট্যাপ করলে এটি সরাসরি আপনাকে অ্যাপলের পে অপশনে নিয়ে যাবে।  ফিচারটির কারনে পূর্বের তুলনায় সহজেই পে করতে পারবেন।

হোম ইন্ডিকেটরের মাধ্যমে এপ সুইচার খোলা

আইফোন টেনে সরাসরি কোন হোম বাটন নেই । তবে অ্যাপল স্ক্রীনের নীচে একটি হোম ইন্ডিকেটর রেখেছে। এ হোম ইন্ডিকেটরের মাধ্যমে ডিভাইসটি আনলক করা যায় এবং এপ সুইচার ওপেন করা যায়। এপ সুইচার অন করতে আপনাকে হোম ইন্ডিকেটর থেকে আঙ্গুল স্ক্রীনের ডান দিকে টেনে নিতে হবে।

ওয়্যারলেস চার্জিং

আইফোন টেনে আইফোন এইট ও এইট প্লাসের মত ওয়্যারলেস চার্জিং সুবিধা দেওয়া হয়েছে।

ফাস্ট চার্জিং ফিচার

আইফোন ১০ ফাস্ট চার্জিং সক্ষম এত মানে হল মাত্র ৩০ মিনিটে আপনি ফোনের ব্যাটারি ৫০ শতাংশ চার্জ করতে পারবেন। এক্ষেত্রে আপনাকে এপলের ২৯ ওয়াট, ৬১ ওয়াট বা ৮৭ ওয়াট ইউএসবি সি টাইপ পাওয়ার এডাপ্টার ব্যবহার করতে হবে। এগুলো অবশ্য আপনাকে আলাদা ভাবে কিনে নিতে হয়।

ব্লুটুথ ৫.০

আইফোন ১০ এ ব্লুটুথ ৫.০ প্রযুক্তির ব্যবহার করা হয়েছে। ব্লুটুথ ৫.০ ব্লুটুথ ৪.২ এর তুলনায় চারগুণ বেশি দূরত্ব কভার করে, দ্বিগুণ বেশি স্পীড, ৮ গুণ বেশি ম্যাসেজ সস্প্রচার করতে পারে।

ট্যাপ টু ওয়েক আপ ফিচার

ডিফল্টভাবেই আইফোন এক্সে ট্যাপ টু ওয়েক আপ অবশন অন করা থাকে। এর মানে হল স্ক্রীনে ট্যাপ করলে লক স্ক্রীন দৃষ্টিগোচর হবে। তবে আপনি চাইলে সেটিং এপ> জেনারেল> এক্সেসিবিলিট> টগল অফ “ট্যাপ টু ওয়েক” এ গিয়ে অপশনটি বন্ধ করে থাকতে পারেন।

আইফোন টেনের দাম

আইফোন  মানেই এর দাম একটু বেশি হবে বলে গ্রাহকের ধারনা। তবে আইফোন টেন পূর্বাপর সকল আইফোনের দামের রেকর্ড ভংগ করেছে। আইফোন টেনের দাম ধরা হয়েছে ৯৯৯ ডলার। যা তুলনামূলক একটু বেশি। বাংলাদেশে আইফোনের কোন নির্দিষ্ট দাম নেই। তবে ১ লাখ টাকার আশে পাশে বিক্রি হচ্ছে।

 শেষ কথা

আইফোন টেন বের হবার আগে এটি নিয় এ অনেক উদ্মাদনা দেখা গেছে। সেটটি দেখতে যেমন কিউট তেমনি বাস্তবিকভাবেও খুব স্পুথ। এ যাবত বের হওয়া সেরা ফোনের একটি হল আইফোন টেন। যদিও একটু দাম বেশি হয়ে গিয়েছে।

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক