আখতারুজ্জামান ইলিয়াস : একজন সমাজমনস্ক কথাশিল্পী

“চিলে কোঠার ্সিপাই”  ও “খোয়াবনামা” , বাংলা সাহিত্য নিয়ে যাদের কিঞ্চিত জানাশোনা আছে তাদের সকলেই অন্তত এই দু’টি উপন্যাসের নাম শুনে থাকবেন। একজন লেখক মাত্র দু’টি উপন্যাস আর অল্প কিছু গল্প লিখে খ্যাতির আসনে আসিন হয়ে আছেন, ব্যাপারটি অবশ্যই অচিন্তনীয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে যে তার লেখা গল্প, উপন্যাস দিয়ে পরিমাপ করা দুঃসাধ্য ব্যপার, তা তিনি তার লেখা দিয়েই প্রমাণ করে গেছেন।

আধুনিক বাংলা গদ্য সাহিত্যের অন্যতম শক্তিশালী কথাসাহিত্যিক হলেন আখতারুজ্জামান ইলিয়াস। বাংলা কথাসাহিত্যে তাঁর অবস্থান  একদম প্রায় চূড়ার দিকে । তিনি শুধুমাত্র বাংলাদেশ নয় পুরু বাংলা সাহিত্য যেমন তিন বন্দ্যোপাধ্যায়ের (বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়) পর সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্র পাশাপাশি তাঁর নাম সর্বাগ্রে উচ্চারণ করতে হয়।

তার লেখা উপন্যাসের সংখ্যা মাত্র দুটি, গল্পের সংখ্যা সবমিলিয়ে ২৭/২৮টি। এর বাইরে ইলিয়াসের আছে একটি প্রবন্ধ সংকলন আর কিছু কবিতা। সবমিলিয়ে তাঁকে একজন সফল লেখকই বলা যায়। তিনি সংখ্যার বিচারে নয় বরং গুনের বিচারে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন।  উপন্যাস রচনায় সমকালে তাঁর সমতুল্য একজন লেখককেও খুঁজে পাওয়া যাবে না- কী বাংলাদেশে, কী পশ্চিমবঙ্গে। গল্প রচনাতেও তিনি প্রথাগত পথ পরিত্যাগ করে একেবারেই নিজস্ব একটি ঘরানা তৈরি করে নিয়েছিলেন।

ঢাকা কলেজের ছাত্র আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে স্বরণীয় করে রাখতে ঢাকা কলেজ “আখতারুজ্জামান ইলিয়াস” নামে একটি হলের নামকরণ করেছে। যেখানে তার চিলেকোঠার সেপাইয়ের সম্মানে একটি চিলেকোঠা রাখা হয়েছে !

সংক্ষিপ্ত জীবনী

আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস ১৯৪৩ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলার গোটিয়া গ্রামে মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম মঞ্জু। পুরো নাম আখতারুজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস। তাঁর পৈতৃক বাড়ি বগুড়া জেলায়। পিতার নাম বিএম ইলিয়াস। মায়ের নাম মরিয়ম। তিনি ছিলেন পিতামাতার প্রথম সন্তান। তাঁর ছোট তিন ভাইয়ের নাম শহীদুজ্জামান ইলিয়াস, নূরুজ্জামান ইলিয়াস ও খালেকুজ্জামান ইলিয়াস।

উল্লেখ্য, তাঁর পিতা বগুড়া জেলার সারিয়াকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তিনি রাজনীতি করতেন। ইলিয়াসের জন্মের সময়  তাঁর বাবা বদিউজ্জামান মোহাম্মদ ইলিয়াস পূর্ব বাংলা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য (১৯৪৭-১৯৫৩) এবং মুসলিম লীগের বগুড়া জেলার পার্লামেন্টারী সেক্রেটারী ছিলেন।

তাই ইলিয়াস তার রাজনীতির প্রথম পাঠ নিঃসন্দেহে তার বাবার কাছেই পেয়েছিলেন। দেশভাগের সেই উত্তপ্ত সময়টাতে তিনি বড় হয়েছেন, বুঝতে শিখেছেন। দেশভাগের ফলে সৃষ্ট লক্ষ-কোটি মানুষের কান্নার  শব্দ তার অন্তরেও বাসা বেঁধেছিল এই দৃশ্যপট পরবর্তীকালে তার রচনায় নানাভাবে ফুটে উঠেছে ।

ইলিয়াসের পূর্বপুরুষদের বাড়ি ছিল বগুড়ার সারিয়াকান্দি থানার চন্দনবাইশা গ্রামে। সেখান থেকে এসে ইলিয়াসের দাদা বাড়ি করেন বগুড়া শহরের উপকণ্ঠে করতোয়া নদীর তীরবর্তী নারুলি গ্রামে। এই নারুলি গ্রামেই ইলিয়াসের শৈশবের প্রথম চার বছর কাটে। ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনে ইলিয়াসের বাবা বঙ্গীয় প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। পাকভারত বিভাজনের পর, ১৯৪৮ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রাদেশিক আইন পরিষদের পার্লামেন্টারি সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। এ সময় ইলিয়াসের বাবা সপরিবারে ঢাকায় চলে আসেন।

সক্রিয় রাজনীতির সূত্রে ইলিয়াসের শৈশব কাটে একটি রাজনৈতিক পরিমন্ডলে ৷ ইলিয়াসের বাবা রাজনীতি করতেন বলে তাঁদের বাড়িতে অনেক লোকের আসা-যাওয়া ছিল । এদেরকে ইলিয়াসের সহোদররা চাচা বলে ডাকতেন । এ রকমই একজন ছিলেন সিদ্দিক চাচা। ১৯৪৯ সালে সেই সিদ্দিক চাচাকে দিয়েই ইলিয়াসদের দুই ভাইকে ঢাকার একটি স্কুলে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা করেন তাঁর মা।

সিদ্দিক চাচা তাঁদের ভর্তি করিয়েই খালাস৷ পরের দিন তাঁদেরকে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার ভার নিলেন আর এক চাচা। কিন্তু তিনি ভাল করে জানতেন না তাঁদেরকে কোন স্কুলে ভর্তি করানো হয়েছ। ওই এলাকায় তখন বহু স্কুল ছিল। নওয়াবপুর প্রিয়নাথ স্কুল ছাড়া অন্য সব স্কুলই লক্ষ্মীবাজার এলাকায়৷ সেই চাচা ইলিয়াসকে আর তাঁর ভাই শহীদুজ্জামানকে নিয়ে একটার পর একটা স্কুলে খোঁজ নিতে শুরু করলেন ।

১৯৪৯ খ্রিষ্টাব্দে আখতারুজ্জামান ইলিয়াস এবং  শহীদুজ্জামান ইলিয়াসকে ঢাকার সেন্ট ফ্র্যান্সিস জেভিয়ার্স স্কুলে স্কুলে ভর্তি করানো হয়।  ১৯৫০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এ স্কুল ছেড়ে ঢাকার কেএল জুবিলি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি হন। তৃতীয় শ্রেণির পাঠ শেষ না করেই, ১৯৫১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন।  ১৯৫৪ সালে তাঁর পরিবার ঢাকা থেকে বগুড়াতে চলে যায়৷ তখন আবার ইলিয়াসকে স্কুল পরিবর্তন করতে হয়। বগুড়াতে গিয়ে তিনি ভর্তি হন বগুড়া জেলা স্কুলে।

১৯৫৮ সালে বগুড়া জিলা স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাস করার পর আবার ঢাকায় চলে আসেন ইলিয়াস এবং ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। তখন পরিবারের সবাই বগুড়াতে থাকার কারণে ঢাকা কলেজের নর্থ ছাত্রাবাসে থাকতেন তিনি। ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন তিনি।

উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজতত্ত্বে পড়ার আগ্রহ ছিল ইলিয়াসের। কিন্তু সে বছর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তুপক্ষ সমাজতত্ত্বে কোনো ছাত্র ভর্তি করলেন না। ফলে বাধ্য হয়ে তাঁকে ভর্তি হতে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে। থাকতেন ফজলুল হক মুসলিম ছাত্রাবাসে। ১৯৬৪ সালে ইলিয়াস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ পাস করেন।

১৯৬১ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চিকেন পক্সে আক্রান্ত হয়ে বেশ কিছুদিন মিটফোর্ড হাসপাতালে ছিলেন। হাসপাতালের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে ‘অতন্দ্র’ নামের একটি গল্প লেখেন।

১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ইলিয়াস ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে এম এ পাস করেন। এই বৎসরে তিনি সাহিত্য বিষয়ক পত্রিকা ‘স্বাক্ষর’-এর সঙ্গে জড়িত হন। এ বছরই আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত ‘সাম্প্রতিক ধারার গল্প’ নামক একটি গ্রন্থে ইলিয়াসের ‘স্বগত মৃত্যুর পটভূমি’ নামে একটি গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৬৫ সালের আগস্ট মাসে ইলিয়াস প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন ঢাকার জগন্নাথ কলেজে যোগ দেন। এর আগে অবশ্য  করটিয়া সা’দত কলেজে শিক্ষকতা করেছিলেন।  কিন্ত কর্তুপক্ষের সঙ্গে মতের মিল না হওয়ায় দু, তিন দিন পর চাকরিটি ছেড়ে দেন তিনি ৷ ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমান বাকশাল গঠন করার পর সরকারি কলেজের শিক্ষক হিসেবে তাঁর উপরও বাকশালে যোগ দেয়ার চাপ পড়ে । কিন্তু তিনি বাকশালে যোগ দেননি।

১৯৮৪ সালে তিনি জগন্নাথ কলেজে সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৮৭ সালের জানুয়ারিতে ইলিয়াস প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হিসেবে যোগ দেন এবং ডিসেম্বরে সরকারি সঙ্গীত মহাবিদ্যালয়ের উপাধ্যক্ষ নিযুক্ত হন।এরপর ১৯৯৪ সালে তিনি ঢাকা কলেজের অধ্যাপক হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করে ।

তিনি বিয়ে করেন ১৯৭৩ সালে, স্ত্রীর নাম সুরাইয়া।  ডাকনাম তুতুল। স্ত্রী তুতুলও ছিলেন পেশায় একজন শিক্ষিকা।  বিয়ের পর তুতুল সিরাজগঞ্জের মহিলা কলেজ থেকে চাকরি ছেড়ে ইলিয়াসের কাছে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭৪ সালে জন্ম নেয় তাঁদের প্রথম সন্তান আন্দালিব।

শিক্ষক হিসেবে ইলিয়াস ছিলেন খুবই জনপ্রিয়৷ ছাত্রদের সঙ্গে শিক্ষকসুলভ দূরত্ব ছিল না তাঁর একটুও৷ ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুর মতো আচরণ করতেন তিনি। অসুস্থতার কারণে দীর্ঘদিন ক্লাস নিতে পারেননি, তাই কলকাতা থেকে ফিরে ক্রাচে ভর করেই সপ্তাহে দুই তিন দিন যেতেন ঢাকা কলেজে।  ক্রাচে ভর করে কলেজের উঁচুসিঁড়ি ভাঙতে গিয়ে রীতিমত ঘেমে যেতেন তিনি।

কলেজ কর্তৃপক্ষ তাঁর কথা ভেবে বাংলা বিভাগকে নিচের তলায় নিয়ে আসতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ইলিয়াস রাজি হননি তাতে, কারণ এতে নাকি খারাপ নজির সৃষ্টি হবে।  এরই মধ্যে একদিন বাথরুমে পড়ে গিয়ে ডান হাতটা কাঁধের কাছে স্থানচ্যুত হয়ে গেল, তখন আর ক্রাচে ভর করেও হাঁটতে পারতেন না ইলিয়াস।

তবুও ক্লাস নেয়া থেকে বিরত হননি তিনি।  তাঁর চাওয়া অনুযায়ী তখন বাসার মধ্যেই ক্লাস নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । ছাত্ররা তাঁর বাসায় যেতেন, তিনি হুইল চেয়ারে বসে ক্লাস নিতেন৷ ছাত্রদের উদ্দেশে উচ্চকন্ঠে দু’ তিন ঘন্টা লেকচার দিয়ে ক্লানত্ম হয়ে পড়তেন। কারো কথাই শুনতেন না তিনি। বলতেন, ‘ছাত্রদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে, বেশি বেশি ক্লাস নিয়ে তাদের এই ক্ষতি পুষিয়ে দিতে হবে’।

মুক্তিযুদ্ধের সময় পরিচিত মুক্তিযোদ্ধাদের আশ্রয় দেন, গোপনে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। তাঁর লেখা প্রতিশোধ, অন্য ঘরে অন্য স্বর, খোঁয়ারি, মিলির হাতে স্টেনগান, অপঘাত, জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল, রেইনকোট প্রভৃতি গল্পে পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ ও যুদ্ধপরবর্তী রাজনৈতিক এবং সামাজিক বাস্তবতা।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বাংলাদেশ লেখক শিবিরের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এদেশের প্রগতিশীল ও মানবতাবাদী সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রতিও তাঁর পরোক্ষ সমর্থন ছিল।

খুব কমই লিখতেন ইলিয়াস। কিন্তু যা লিখতেন তার সাহিত্যমান তাকে বাংলা সাহিত্যে অনন্য এক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। ইলিয়াস জীবনের গভীরের অতলস্পর্শী গল্প বলেছেন। তিনি পাঠককে নিয়ে গেছেন ব্যক্তিসত্তার অতল গভীরে। বাস্তবতার নিপুণ চিত্রণ, ইতিহাস ও রাজনৈতিক জ্ঞান, গভীর অন্তর্দৃষ্টি ও সূক্ষ্ম কৌতুকবোধ ইলিয়াসের রচনাকে দিয়েছে ব্যতিক্রমী সুষমা।

১৯৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে স্ত্রীর চিকিৎ‍সার জন্য সস্ত্রীক কলকাতায় যান এবং শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করেন। অক্টোবর মাসে তাঁর মায়ের মৃত্যু হয়। এরপর থেকে তিনি পায়ে ব্যথা অনুভব করতে থাকেন। প্রথম দিকে চিকিৎসকরা বাতের ব্যথা হিসেবে চিকিৎসা শুরু করেন। কিন্তু পরে তাঁর পায়ের হাড়ে ক্যান্সার ধরা পড়ে ।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস সারা জীবন লড়াই করেছেন ডায়াবেটিস, জন্ডিসসহ নানাবিধ রোগের সঙ্গে। ১৯৯৭ সালের ৪ জানুয়ারি আখতারুজ্জামান ইলিয়াস ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে ঢাকা কমিউনিটি হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন। প্রকৃতির কী আশ্চর্য খেয়াল, অর্ধশত বছর পূর্ণ হতে না হতেই লেখক পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেলেন পরপারে, মাত্র ৫৪ বছর বয়সে!

লেখালেখি

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস আধুনিক বাংলা সাহিত্যের নায়ক ছিলেন । বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের নবজাগরণের অসাধারণ সূচনা করেছিলো তার সাহিত্যকর্ম। বাঙালি জীবনের চিরন্তন বোধ ও মননের বৈচিত্রময় অনুভবকে তিনি গভীর দৃষ্টিতে নির্ণয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াস হচ্ছেন, বাংলাদেশের প্রথম সচেতন কথাশিল্পী রাজনৈতিক পটভূমিতে যার রচনায় উপজীব্য হয়েছে বৃহত্তর জনমানুষের জীবন। ১৯৬০-এর দশকে তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন, ততদিনে বাংলা উপন্যাস ও ছোটগল্প  পূর্ণতা অর্জন করে ফেলেছে। বাংলাদেশের প্রথম দিককার উপন্যাসগুলো লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্যে কিংবা তার ঠিক পরপর। ইতিমধ্যে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র পেরিয়ে আবির্ভাব ঘটে গেছে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় ও তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো তিন আধুনিক ঔপন্যাসিক ও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর।

উপন্যাস শুরুর প্রস্তুতিতে ইলিয়াস যে একটি বিষয় অভ্যাস করতেন, তা হলো পটভূমি সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা অর্জন। উপন্যাসের স্থান ও স্থানের ইতিহাস জানাটা তাঁর জন্য ছিল অপরিহার্য মহাকাব্যিক পরিসরে লেখা যেকোনো উপন্যাসের জন্যই এটি একটি প্রাথমিক শর্ত।

স্কুলে পড়ার সময় থেকেই প্রচুর পড়ার নেশা ছিল ইলিয়াসের । আর লেখালেখিতে হাতেখড়ি হয় স্কুলে পড়ার সময়ই। এসময় কলকাতা থেকে প্রকাশিত সত্যযুগও আজাদ পত্রিকায় ছোটদের পাতায় তাঁর লেখা ছাপা হতো। তিনি যখন দশম শ্রেণীতে পড়েন তখন সওগাত এ ইলিয়াসের প্রথম ছোটগল্প ছাপা হয়। ১৯৫৮ সালে ঢাকা কলেজে পড়ার সময় অবিরাম গল্প লিখতেন এবং বিভিন্ন পত্রিকায় পাঠাতেন। মাঝে মাঝে দুই একটা ছাপা হত।

১৯৬০ সালে সমকাল পত্রিকায় প্রকাশিত ‘স্বগত মৃত্যুর পটভূমি’ গল্পের মধ্য দিয়েই ইলিয়াস জানান দিয়েছিলেন, বাংলা সাহিত্যে নতুন যুগ আসছে। ১৯৬১ সালে চিকেন পক্সে আক্রান্ত হলে বেশ কিছুদিন তাঁকে থাকতে হয়েছিল মিডফোর্ড হাসপাতালে৷ হাসপাতালের অভিজ্ঞতা নিয়ে পরে অতন্দ্র নামের একটি গল্প লেখেন। ১৯৬৪ সালে তিনি সাহিত্যবিষয়ক পত্রিকা স্বাক্ষর এর সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এ বছরই আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ সম্পাদিত সাম্প্রতিক ধারার গল্পনামক একটি গ্রন্থে ইলিয়াসের স্বগত মৃত্যুর পটভূমি নামে একটি গল্প অন্তর্ভুক্ত হয়।

১৯৬৯ সালের মার্চ মাসে লিটল ম্যাগাজিন আসন্নতে চিলেকোঠায় নামে তাঁর একটি গল্প প্রকাশিত হয়।

১৯৭৫ সালে চিলেকোঠায় নামে তাঁর প্রথম উপন্যাস দৈনিক সংবাদ এর সাহিত্য পাতায় ধারাবাহিকভাবে ছাপা শুরু হয়। কিন্তু ওই সময় সরকার পরিবর্তন হওয়ায় সংবাদ কর্তৃপক্ষ উপন্যাসটি প্রকাশ বন্ধ করে দেয়। তখন ইলিয়াস সংবাদ কর্তৃপক্ষকে বলেছিলেন,

‘পাঠকরা এটাকে লেখকের দায়িত্বহীনতা ভাবতে পারে, আপনারা যে ছাপতে পারছেন না সেটা লিখে দিন।

দৈনিক সংবাদ যে ছাপতে পারছে না  তা লিখে দিয়েছিল।

ইলিয়াসের লেখালেখির শুরুর সময় থেকেই পূর্ব বাংলায় চলছিল অস্থির সময়। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ তার লেখনীতে বেশ ছাপ ফেলেছে। বেঁচে থাকতে ইলিয়াস ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন বাঙালি-জাতির হাজার যুগের শ্রেষ্ঠ অর্জন মহান মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে ঢাউস আকারের একটি উপন্যাস লিখবেন।

মৃত্যু তাকে পর্যাপ্ত সময় দেয় নি।  তারপরও ইলিয়াস বেশ কিছু গল্পের মাধ্যমে সে দায় কিছুটা হলেও মেটাতে পেরেছেন। তন্মধ্যে ‘জাল স্বপ্ন, অপঘাত, স্বপ্নের জাল’ ও ‘রেইনকোট’ উল্লেখ্যযোগ্য। ‘জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল’- গল্পে দেশের তিনটি ক্লান্তিকালীন মুহূর্তের গন্ধ পাওয়া যায়। যথাক্রমে স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী সময়, স্বাধীনতাযুদ্ধের চলমান প্রেক্ষাপট এবং স্বাধীনতা-উত্তর বিধ্বস্ত বাংলাদেশের জলছবি।

এর মাঝে ‘অপঘাত’ আর ‘রেইন কোট’ এই দুটো গল্পের বিষয় হলো আক্রান্ত মানুষের হারানো সাহস ফিরে পাওয়া। মিলির হাতে স্টেনগান’ আর ‘খোয়ারি’ গল্প দুটিতে বস্তুজগত শাসন করছে অস্ত্র আর রাজনৈতিক ক্ষমতা। এটা এমন একটা সময়কে উপজীব্য করে রচিত যখন পুরনো শাসন ভেঙে পড়েছে, নতুন শক্তি নিজের মত করে বাঁটোয়ারা করে নিচ্ছে চারপাশ।

‘রেইনকোট’ গল্পে ভদ্র, শিক্ষিত ও নিরীহ জাতিগোষ্ঠীর ওপর হানাদার বাহিনীর ভয়ঙ্কর নির্যাতনের করুণ চিত্রপট স্পষ্ট হয়েছে। তবে জাতির একজন শ্রেষ্ঠসন্তান মুক্তিযোদ্ধা শ্যালকের রেইনকোট পরিধান করে ভীরু প্রকৃতির এবং রাজনীতিবিমুখ ভগ্নিপতি দেশপ্রেমের যে দারুণ উদ্দামতা খুঁজে পেয়েছেন সে বর্ণনা অত্যন্ত চমৎকারভাবে তুলে ধরছেন লেখক। বাঙালি জাতিসত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার অপপ্রয়াসে শহীদ মিনারসহ প্রেরণাদায়ক সব স্থাপনাসৌধ গুঁড়িয়ে দেয়ার যে চক্রান্ত করা হয়েছিল সেটাও স্পষ্টভাবে প্রকাশ পেয়েছে ‘রেইনকোট’ গল্পে।

১৯৭৬ সালে প্রকাশিত হয় ইলিয়াসের প্রথম গল্পগ্রন্থ অন্য ঘরে অন্য স্বর তিনি গ্রন্থটির নামকরণ করেন ট্রুম্যান কেপোটের আদার রুম আদার ভয়েস্ নামে উপন্যাসটির নাম অবলম্বনে । প্রচুর প্রশংসা পায় বইটি।  ওই বছরের জুলাই মাসে রাজশাহী থেকে প্রকাশিত সংবত শীর্ষক একটি লিটল ম্যাগাজিনে গল্পকার হাসান আজিজুল হক গ্রন্থটির সমালোচনা লেখেন ।

এ গল্প  দিয়েই তিনি সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন। দেশবরণ্য কথাশিল্পী হাসান আজিজুল হক তাঁর ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ সম্পর্কে মন্তব্য করে বলেন-

‘ইলিয়াসের ‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ তীরের মতো ঋজু, ধানীলঙ্কার মতো বদমেজাজি এবং পরনারীর মতো আকর্ষণীয়। এই বইয়ের গদ্য শুকনো খটখটে, প্রায় সবটাই ডাঙা, ডাঙার ওপর কচি নরম সবুজ গাছপালা জন্মেছে এমনও মনে হয় না। কোথাও একটু দয়া নেই, জল দাঁড়ায় না- বাস্তব ঠিক যেমনি, তেমনি আঁকা, ক্যামেরাও এরচেয়ে নিখুঁত ছবি তুলতে পারে না।’

হাসান আজিজুল হকের এই মন্তব্যে স্পষ্ট হয়, লেখালেখির সূচনাপর্বেই ইলিয়াস কতোটা বুদ্ধিদীপ্ত এবং সমাজমনস্ক মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন।

১৯৮১ সালের জানুয়ারিতে সাপ্তাহিক রোববার পত্রিকায় তাঁর প্রথম উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই ধারাবাহিকভাবে ছাপা শুরু হয়। ১৯৮৩ সালের জানুয়ারিতে সাপ্তাহিক রোববার-এ চিলেকোঠার সেপাই ছাপা শেষ হয়।

১৯৮২ সালের সেপ্টেম্বরে রাজশাহীর তরঙ্গ প্রকাশনী হতে তার গল্পগ্রন্থ খোঁয়ারি প্রকাশিত হয় । ১৯৮৫ সালে দুধ ভাতে উত্‍পাত শিরোনামে তাঁর আরেকটি গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হয়।

১৯৮৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড  তাঁর প্রথম উপন্যাস চিলেকোঠার সেপাই  হতে বই আকারে প্রকাশিত হয়। বইটি প্রকাশিত হওয়ার পর পাঠক মহলে বেশ সাড়া পড়ে যায়  । তাঁর আরেকটি গল্পগ্রন্থ দোজখের ওম প্রকাশিত হয় ১৯৮৯ সালে।

১৯৯২ সালে এ বছরই ইলিয়াসকে নিয়ে চট্টগ্রাম থেকে এজাজ ইউসুফ সম্পাদিত লিরিক সাহিত্য পত্রিকার একটি বিশেষ সংখ্যা বের করে । ১৯৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে ইলিয়াসের জন্মের পঞ্চাশ বছরপূর্তি উপলক্ষে কলকাতার একুশে প্রকাশনী প্রকাশ করে তাঁর একটি গল্প সংগ্রহ গ্রন্থ। এপ্রিল মাসে কলকাতার বাংলাদেশ মিশন কর্তৃক আয়োজিত গ্রন্থমেলায় অনুষ্ঠিত একটি সেমিনারে অংশগ্রহণের জন্য বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের সদস্য হিসেবে তিনি কলকাতা সফর গিয়েছিলেন ।  এ বছর জুন মাসে কলকাতার প্রতিভাস প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয় চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসটি।

১৯৯৪ সালে দৈনিক জনকন্ঠ-এর সাহিত্যপাতায় ইলিয়াসের উপন্যাস খোয়াবনামা ধারাবাহিকভাবে ছাপা হতে শুরু হয়। যদিও পুরো উপন্যাস প্রকাশিত হওয়ার আগে জনকন্ঠকর্তৃপক্ষ রাজনৈতিক কারণে খোয়াবনামা ছাপা বন্ধ করে দেয়। এই উপন্যাসের জন্য ১৯৯৬ সালে তিনি আনন্দ পুরস্কারে ভূষিত হন।

রাজনীতি আমাদের জীবনের একটি প্রধান নিয়ামক হলেও আমাদের সাহিত্যে সরাসরি রাজনৈতিক প্রসঙ্গিক প্রসঙ্গ ব্যাপকভাবে বিবেচিত হয়নি। রাজনীতির সঙ্গে লেখকরা সবসময়ই নিরাপদ দুরত্ব বজায় রেখেছেন। ইলিয়াসই প্রথম এতটা সার্থক শিল্পসম্মতভাবে প্রধান দুটি আন্দোলনকে তার দুই উপন্যাসে ধারন করলেন।

চিলেকাঠার সেপাই উপন্যাসে তিনি উপজীব্য করেছেন এ দেশের রাজনীতির পাকিস্তান পর্বের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আন্দোলন ঊনসত্তরের গণআন্দোলনকে। এটি অবলম্বনে পরবর্তীতে চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে। তার শেষ ও শ্রেষ্ঠ উপন্যাস খোয়াবনামার মূল প্রসঙ্গ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের একটি জনপদে পাকিস্তান আন্দোলনের প্রভাব। এই উপন্যাসের জন্য তিনি পেয়েছেন আনন্দ পুরস্কার।

খোয়াবনামা প্রচ্ছদ

১৯৯৫ সালের ফেবু্রয়ারি মাসে স্ত্রীর চিকিত্‍সার উদ্দেশ্যে তিনি সস্ত্রীক কলকাতায় যান এবং শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করেন৷

অক্টোবরে মাকে হারানোর পরই ইলিয়াস অসুস্থ হয়ে পড়েন৷ পায়ের তীব্র ব্যথা উপেক্ষা করে তখন দিনরাত খোয়াবনামা লিখছিলেন। ক্যান্সারকে বাত ভেবে ডাক্তাররা তখন ভুল চিকিত্‍সা দিচ্ছিলেন ইলিয়াসকে। প্রচন্ড পায়ের ব্যথা নিয়েই তিনি খোয়াবনামা উপন্যাসটি লেখা শেষ করেন ৩১ ডিসেম্বর।

মধ্যবিত্ত, উচ্চবিত্ত ‘ভদ্রলোক’ ছাড়াও পুরান ঢাকা আর উত্তরবঙ্গের বগুড়া অঞ্চলের মানুষদের নিয়ে লিখেছেন ইলিয়াস। বাস্তবতার দাবি মেনে সংলাপে আঞ্চলিক ভাষা ব্যবহার করেছেন। তাতে সহজেই টের পাওয়া যায় কারিগরের নৈপুণ্য আর নিবিড় শ্রমের ওম। যেমন-
ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার নিদর্শন

‘বিয়ানে গেছিলাম তো। বুবুর কতা কইতে দেয় না, কী করুম? হাফিজুদ্দি ভাইজানরে অরা হাবিজাবি কী কইছে; মায়ে কয় তাবিজ করছে।’ (কীটনাশকের কীর্তি; দোজখের ওম)

পুরান ঢাকার আঞ্চলিক ভাষার নিদর্শন

‘কালাকুলা হইব ক্যালায়? মোমের লাহান পিছলা মুখ, টোকা দিলে রক্ত বারাইব।’ (জাল স্বপ্ন স্বপ্নের জাল)

বগুড়ার আঞ্চলিক

‘ত্যাল লিবু? খাড়া। ওটি থাক। বেজাতের মানষেক হামরাও ঘরোত ঢুকবার দেই না।’ (খোয়াবনামা)

জীবন ও বাস্তবতার খাতিরে ইলিয়াসের ভাষা হয়ে ওঠে চাঁছাছোলা, দুঃসাহসী। মধ্যবিত্ত রুচির মাপকঠিতে যা মনে হবে অশালীন-

‘ইস্টুডেন হালারা কি করব তুমি জানো না, না? কেলাব থাইকা, হোটেল থাইকা সাহেবরা বারাইব মাল টাইনা, অরা হেই গাড়িগুলা ধইরা মালপানি কামায়, মাগিউগি পছন্দ হইলে ময়দানের মইদ্যে লইয়া হেইগুলারে লাগায়।’ (উৎসব; অন্য ঘরে অন্য স্বর)

উল্লেখযোগ্য কিছু রচনার প্রেক্ষাপটঃ

চিলেকোঠার সেপাই

১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাস। ঊনসত্তর সালের প্রবল গণঅভ্যুত্থানের যারা প্রধান শক্তি ছিল, সেই শ্রমজীবী জনসাধারণ কীভাবে আন্দোলন-পরবর্তী সময়টিতে প্রতারিত এবং বঞ্চিত হলো, বামপন্থীদের দোদুল্যমানতা আর ভাঙনের ফলে, জাতীয় মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে যথাযথভাবে ধারণ করতে না পারার ফলে অজস্র রক্তপাতের পরও রাজনীতির ময়দান থেকে তাদের পশ্চাদপসরণ ঘটলো, আওয়ামী লীগ প্রধান শক্তি হয়ে উঠলো, উপন্যাসটির উপজীব্য সেই ঐতিহাসিক সময়টুকুই।

ঊনসত্তুরের সেই উত্তাল সময়ের সর্বব্যাপী মিছিল-মিটিং-সভা-সমাবেশ-পুলিশ ও সেনাবাহিনীর বেপরোয়া গুলিবর্ষণ – এই সবের সাথে সমান্তরালভাবে উঠে এসেছে একই সময়ে জমিদার-মহাজন-অত্যাচারী মালিক পক্ষের সাথে শোষিত শ্রমিক শ্রেণীর শ্রেণীসংঘর্ষের ব্যাপারটা। আবার কিছুক্ষেত্রে ছাত্র-নেতাদের পাকিস্তান ও সরকারবিরোধী আন্দোলনের সাথে সাধারণ চাষা-কৃষকদের শ্রেণীআন্দোলনের সংঘর্ষের ব্যাপারটাও বেশ বাস্তবিকভাবে প্রকাশ করতে পেরেছেন ইলিয়াস।

বৈরাগীর ভিটায় শোষিত সাধারণ কৃষকরা যখন নিজেদের হাতেই আইন তুলে নিয়ে শোষকশ্রেণীর লোকদের শাস্তি দিতে উদ্যত, তখন শোষকশ্রেণীর কিছু লোকদের রাতারাতি ভোল পাল্টিয়ে আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে যোগ দিয়ে ছাত্রদেরকে নিজ দলে টানার প্রচেষ্টা আমাদের অসুস্থ ও সুবিধাবাদী রাজনীতির প্রকৃত বিকৃত চেহারাটাকেই ফুটিয়ে তুলে।

বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষিত ছাত্ররা আইয়ুব সরকারের দমন-নিপীড়ন-বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও তারা সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের লাঞ্চনা-নিপীড়নের মূল কারণ বুঝতে ও তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে প্রায়ই ব্যর্থ হয়।

এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র রঞ্জু। অন্যান্য তিনটি প্রধান চরিত্র ওসমান, আনোয়ার এবং হাড্ডি খিজির।

খোয়াবনামা

ব্রিটিশ শাসনামল হলো খোয়াবনামার পটভূমি। ভারতবর্ষ থেকে ব্রিটিশ তাড়ানোর কথা এ উপন্যাসে এসেছে। এসেছে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদের কথাও।

এই উপন্যাস মূলত :দেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষ করে বগুড়া জেলার ইংরেজ শাসন আমলের শেষ দিক হতে ১৯৪৭ সাল এর দেশ বিভাগের কয়েক বছরের রাজনৈতিক ,সামাজিক এবং ধর্মীয় অবস্থাকে অপূর্ব জীবন-যাপনে লেখক অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে তুলে ধরেছেন ।

এই উপন্যাসে যেমন আছে উত্তরাঞ্চলের তেভাগা আন্দোলনের কথা ,জমিদার প্রথা প্রসংগ ,বিল-হাওর ইজারা প্রসংঙ্গ এবং তা হতে ইজারাদারদের সাথে জেলেদের গোলযোগের কথা ,দেশ বিভাগের পর হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা প্রসঙ্গ ,জমির বর্গা প্রথা ,কামার কুমার কুলুদের কথা ,মুসলিম লীগ আর কংগ্রেসের নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কুটচাল প্রসংঙ্গ ।

আবার ছোট ছোট ব্যাথা ,প্রেম ,ভালোবাসা ,বিচ্ছেদ ,কুসংস্কার ,কান্না-হাসি ,উৎসব ,নিপীড়ন-শোষণ ,সংসার ও বিভিন্ন ধর্মীয় বিধি ।পাশাপাশি এই উপন্যাসে লেখক মুনসী বয়তুল্লাহ ,চেরাগ আলী ,কুলসুম ,কেরামত ,তমিজের বাপ ,তমিজ এবং বৈকুণ্ঠী চরিত্রের মাধ্যমে এক আধ্যাত্মিক জগৎ উপস্থাপন করেছেন ।

দুধভাতে উৎপাত

দুধভাতে উৎপাত’ শীর্ষক গল্পে বিলাসবহুল মানুষের উল্লাসধ্বনি, ক্ষুধার্ত মানুষের আর্তরোল, সম্পদের অসম বণ্টন, অমানবিকতা, স্বার্থান্ধতা ও সমাজব্যবস্থার নিবিড় বৈষম্যদৃশ্য চিত্রিত হয়েছে। কষা হয়েছে আপন-পরের নৈতিক দায়-দায়িত্বের অঙ্কও।

নিম্নবিত্ত আর উচ্চবিত্ত মানুষের মধ্যে বিভেদের সমীকরণ হচ্ছে “দুধভাতে উৎপাত” গল্পে। জয়নবের মৃত্যুকালে সন্তানদের দুধ ভাত খাওয়ানোর শেষ ইচ্ছার মাধ্যমে বাংলার মানুষের দুর্দশাগ্রস্থ জীবন কাহিনীই ফুটে উঠেছে এ গল্পে। যেমন-অন্নদামঙ্গল কাব্যে ঈশ্বরী পাটনী বলেছে ” আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে”।

প্রতিশোধ

‘প্রতিশোধ’ গল্পে দেখা যায়, হঠাৎ আবদুল গনির অসুস্থতার খবর শুনে ছেলে ওসমান ঢাকায় ছুটে আসে চট্টগ্রাম থেকে। বাড়ি এসে দেখে আব্বা সত্যি সত্যিই অসুস্থ। ওসমানের আরেক ভাই আনিস, সে বীর মুক্তিযোদ্ধা আর বোন রোকেয়া। যাকে ভালোবেসে বিয়ে করে আবদুল হাশেম; কিন্তু রোকেয়াকে শান্তিতে সংসার করতে দেয়নি মানুষটা।

গাড়ি চালাচ্ছিল হাশেম, হঠাৎ অ্যাক্সিডেন্ট। গাড়ি থেকে ছিটকে পড়ে রাস্তার নিচে পানির মধ্যে পড়ে মারা যায় রোকেয়া। এভাবেই গল্পটা যতই সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা হোক না কেন, ওসমান-আনিসের এমনকি ওদের আব্বা আবদুল গনির তা বিশ্বাস হতে চায় না। প্রকৃতপক্ষে হাশেম একজন খুনি, নয়তো রোকেয়ার ছেলেবেলাকার বান্ধবী নার্গিসকে বিয়ে করতে পারত না, যে-নার্গিসের সঙ্গে ওসমানের হয়তো বিয়ে হওয়ার কথা ছিল; একটা চিঠি দিয়েছিল জীবনে নার্গিসকে। যদিও তাকে প্রেম বলা যায় না, তবু বউ মরতে-না-মরতে বউয়ের বান্ধবীকে বিয়ে করাটাকে আনিস সহ্য করতে পারে না।

ওসমানও সেভাবে না দেখলেও ভাইয়ের কথা শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। পরবর্তীকালে দেখা যায়, হাশেমকে খুন করতে মরিয়া সে। ছাদে ডেকে নিয়ে বড় রড দিয়ে সিনেমার মতো একেবারে শেষ করে দেবে, এভাবে কী হয়! তারপরও এমনই মনস্থির করে একটা ছক কষে।

তারাবিবির মরদ পোলা

‘ভেতর থেকে তারা বিবির একটানা সংলাপ কানের ফুটো দিয়ে মাথায় ঢুকে এলোমেলোভাবে আঁচড়াতে শুরু করলে গোলজার আলির সাজানো গোছানো রাত্রিবেলাটা একেবারে তছনছ হয়ে গেলো।’

-এরকম দীর্ঘ ও চমকপ্রদ একটি বাক্যের মাধ্যমে শুরু হয়েছে ইলিয়াসের ‘তারাবিবির মরদ পোলা’ গল্প।

এ গল্পে গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষের জীবনব্যবস্থার চালচিত্র, খেটেখাওয়া মানুষের জীবন ও সংসারের খুনসুটি, সামাজিক দ্ব›দ্ব, পারিবারিক কলহ, মানবিক বৈষম্য, নারী-পুরুষের জৈবিক প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি, পরচর্চা আর শেকড়ের টানের চিরন্তন তীব্রতার দৃশ্যপট দারুণভাবে ফুটে উঠেছে।

এই গল্পের মধ্যমায় তারাবিবির ছেলের অপ্রতিরোধ্য অপকর্ম এবং শেষাংশে দেখতে না পারা ছেলের পক্ষাবলম্বন করে তারাবিবি স্বামীর প্রতি যে কটাক্ষমিশ্রিত  বাক্য ছেড়েছে তা চূড়ান্তরূপে মাতৃত্বের পরিচয়ের চেয়ে নারীত্বের অপূর্ণ বাসনার ইঙ্গিতই মুখ্য হয়ে ওঠে- এই খেদ সর্বজনীন, বুকফাটানো শৈল্পিক আর্তনাদ।

নিরুদ্দেশ যাত্রা

জীবনের গোধূলিলগ্নে দাঁড়ানো হতশাগ্রস্ত এক যুবকের দুঃখবোধের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে বিখ্যাত কবি যতীন্দ্রমোহন বাগচীর কবিতার কালজয়ী নায়িকা ‘কাজলা দিদি’ ও কিংবদন্তি ঔপান্যাসিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পথের পাঁচালি’র বিখ্যাত ‘অপু-দুর্গা’ চরিত্রের কথা ইলিয়াস করুণভাবে শুনিয়ে গেছেন তাঁর ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পের ভেতরে। কী অসাধারণ উপস্থাপনশৈলী সেখানে! লেখালেখির তাগিদে কখনোবা মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বারস্থ হয়ে তিনি পাঠককে শুনিয়ে গেছেন পদ্মানদীর দীর্ঘশ্বাস, ভবিতব্যের রূঢ় বাস্তবতার শব্দতরঙ্গ।

স্মৃতিভ্রষ্ট-রোগা ও অসুস্থ ছেলে রঞ্জু। জীবনের অনেক রং তার ফুরিয়েছে; কিন্তু সে জানে না, জীবন প্রবহমান নদীর মতো। যতই ধ্বংস হোক আবার জীবনের উৎপত্তি, আবার বিকাশ পৃথিবীর লোকালয়ে। বৃষ্টির স্বর তাকে অন্যমনস্ক করলেও নিজেকে একটা বৃত্তের মধ্যে আটকে রাখতে চায় না। অপ্রকৃতিস্থ রঞ্জু তাই মাঝরাত্রে আব্বা-আম্মার ঘরে কী ফেলে এসেছে বলে ছুটে যায়। ‘নিরুদ্দেশ যাত্রা’ গল্পের বিষয়বস্তু এটুকুই।

অন্য ঘরে অন্য স্বর

‘অন্য ঘরে অন্য স্বর’ গল্পের পটভূমি ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ। ননীদা এখানে ধোপদুরস্ত নিরামিষ একটা হিন্দু চরিত্র। বাজারে আড়ত আছে। সেই গদিতে বসে ব্যবসা করেন তিনি একজন কর্মচারী নিয়ে। কিন্তু স্থানীয় মাস্তানদের যে-বাড়াবাড়ি বা দৌরাত্ম্য তা ক্রমে সহ্যের বাইরে গেলেও মুখ বুজে ছেলের বয়সী ওসব বখে যাওয়া পাতিনেতাকে চাঁদা দিতে হয়; বিভিন্ন সম্মেলন-অনুষ্ঠান তারপর এ-আসবে কখন ও-আসবে এমন বিভিন্ন কারণে চাঁদা দেওয়াটা একটা রেওয়াজে পরিণত হয়েছে।

এভাবে চাঁদা দিতে দিতে জেরবার হলেও মুখ বুজে তোয়াজ করতে হয়, নইলে ব্যবসাটা লাটে উঠবে।  তার সামনেই চাঁদাবাজদের ছবি ধরা পড়ে, অথচ এসব মাস্তানের কারণে ননীদার কলেজপড়ুয়া মেয়ে ইন্দিরা রাস্তায় বেরোতে পারে না। কলেজে ভর্তি হয়েও ঘরবন্দি।  ননীদার আরেক ছেলে অমিত ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষা দেবে। ক্রিকেট খেলে। প্রবীর-মন্দিরা স্কুলে পড়ে। আরেক ছোট মেয়ে মীনাক্ষী, আর ননীদার মা অর্থাৎ প্রদীপের পিসিমা, এই নিয়ে সংসার।

প্রকাশিত বিখ্যাত রচনাসমূহঃ

প্রকাশিত গল্প:  অন্য ঘরে অন্য স্বর,প্রেমের গপ্পো, রেইনকোট, খোঁয়ারি, জাল স্বপ্ন, স্বপ্নের জাল, ফোঁড়া, কান্না, নিরুদ্দেশ যাত্রা, যুগলবন্দি, ফেরারী, অপঘাত, পায়ের নিচে জল, দুধভাতে উৎপাত, সন্তু, ঈদ,  দোজখের ওম, মিলির হাতে স্টেনগান।

প্রবন্ধের বই: সংস্কৃতির ভাঙা সেতু (মৃত্যুর পরে প্রকাশিত)

উপন্যাস: চিলেকোঠার সেপাই, খোয়াবনামা

এক নজরের তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কার সমুহ

১৯৭৭ সাল ছিল ইলিয়াসের জন্য স্মরণীয়৷ কারণ জীবনের প্রথম পুরস্কার হুমায়ুন কবির স্মৃতি পুরস্কারে ভূষিত হন তিনি এই সালে৷ বাংলাদেশ লেখক শিবির সংঘ তাঁকে এই পুরস্কারে ভূষিত করেন ৷ এরপর ১৯৮৩ সালে ইলিয়াস বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন৷ ১৯৮৭ সালে তিনি আলাওল সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করেন৷ ১৯৯৬ সালের এপ্রিল মাসে খোয়াবনামার জন্য পান প্রফুল্ল কুমার সরকার স্মৃতি আনন্দ পুরস্কার এবং সাদাত আলী আকন্দ পুরস্কার৷ এব ছর কাজী মাহবুবউল্লাহ স্বর্ণপদক নামে আরেকটি পুরষ্কার পান তিনি । ১৯৯৯ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।

শেষ কথা

বহু রকম শৃঙ্খলের মধ্যেও অতীত থেকে ভবিষ্যতে প্রবাহিত মানুষের চৈতন্য অনুসন্ধান করতে করতেই ইলিয়াস নতুন নতুন প্রান্তরে হাজির হয়েছেন । এভাবেই বাস্তবতার ভেতরে পরাবাস্তব, চেতনের ভেতরে অচেতন, জাগরণের মধ্যে স্বপ্ন, বর্তমানের ভেতর অতীত মানুষকে এক থেকে অসংখ্য রুপে হাজির করতে থাকেন তাঁর লেখায়।

আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের  মধ্যে একজন বিশ্বমানের ঔপন্যাসিকের সব বৈশিষ্ট্যই বিদ্যমান। তার উপন্যাসের কালিক প্রেক্ষিত যেমন ব্যাপক, তেমনি তার ভৌগোলিক পরিপ্রেক্ষিত ও বেশ বড়।  তিনি একজন অসাধারণ শিল্পস্রষ্টাই কেবল নন, একই সঙ্গে একজন বিপ্লবী তাত্ত্বিকও বটে।

তথ্য সূত্রঃ সামু, বিডিনিউস, ভোরের কাগজ, বণিকবার্তা, দিসুলতান, রাইসিং বিডি, শুধুবাংলা ব্লগস্পট ও নানা ওয়েব পোর্টাল।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক