আগ্নেয়গিরি কি, প্রকারভেদ, এ সম্পর্কিত আরো কিছু তথ্য

গত নভেম্বরে ইন্দোনেশিয়ার বালিতে অবস্থিত মাউন্ট আগং আগ্নেয়গিরি থেকে ধুঁয়ো ও ছাই উদ্গিরণের পর,বেশ কিছু আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল করে দেয়া হয়। আগ্নেয়গিরিটি ৫৪ বছর পরে জেগে উঠেছে।  আগ্নেয়গিরি জীবিত হওয়ায় ধুঁয়ো ও ছাই আকাশে ছড়িয়ে পড়ে।  ১৯৬৩ সালে এতে সর্বশেষ অগ্ন্যুৎপাতে প্রায় ১ হাজার ৬০০ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। এই আগ্নেয়গিরি শব্দটির সাথে কম বেশি সবারই হয়ত পরিচয় আছে। চলুন আগ্নেয় গিরি সম্পর্কে আর একটু বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

আগ্নেয়গিরি কি ?

ইংরেজি ভলকানো (Volcano) শব্দের বাংলা প্রতিশব্দ হল আগ্নেয়গিরি।  যা এসেছে ইতালিয়ান শব্দ Vulcano থেকে। ইতালিয়ান শব্দটির মূলে রয়েছে ল্যাটিন শব্দ Vulcanus, যার অর্থ জলন্ত পর্বত। আবার অনেকের মতে, মিথলজির আগুনের দেবতার নাম হল ভলকান (Vulcan)। এই ভলকান শব্দ থেকেই  থেকেই ভলকানো  (volcano) শব্দের উৎপত্তি হয়েছে। পৃথিবী বা অন্যান্য গ্রহ সৃষ্টির শুরু অত্যন্ত উত্তপ্ত ছিল। প্রায় সাড়ে চার বিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীর সৃষ্টি হয়েছে বলে বিজ্ঞানীদের অভিমত ! কোটি কোটি বছর ধরে পৃথিবী শীতল হয়েছে। কিন্ত এখনও পৃথিবীর  অভ্যন্তর ভাগ উত্তপ্ত । অভ্যন্তর ভাগ উত্তপ্ত তরল হলেও পৃথিবীর উপরিতল একাধিক শক্ত স্তরে বিভক্ত। এই স্তরগুলোকে বলা হয়  টেকটনিক প্লেট। আগ্নেয়গিরি এই টেকটনিক প্লেটেই অবস্থান করে ।

পৃথিবীর গঠনকে তিনটি স্তরে ভাগ করা যায়। আমরা বসবাস করি সবচেয়ে বাইরের স্তরে । এই স্তরকে বলা হয়  ক্রাস্ট (crust)  যার  পুরত্ব হল প্রায় ১৮ মাইল। এরপরের স্তরকে বলা হয় মেন্টল (mantle) যা প্রায় ১৮০০ মাইল বিস্তৃত ।  সবচেয়ে ভেতরের দিকের স্তরের নাম হল কোর  (core)। মেন্টল ও ক্রাস্ট এর মধ্যবর্তী অঞ্চলে আছে  উত্তপ্ত ও গলিত পাথর, ছাই এবং গ্যাস। এই উপাদানগুলো কখনো কখনো  অতিরিক্ত তাপ ও চাপের ফলে পৃথিবীর ফাটল দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসতে চায়। একসময় কোন না কোন ফাটল বা ছিদ্রপথে গরম বাতাস, জলীয় বাষ্প, গলিত শিলা, কাদা, ছাই, গ্যাস প্রবল বেগে বেরিয়ে আসে। নির্গত এই সকল পদার্থ ভূপৃষ্ঠের ঠাণ্ডা বাতাসের সংস্পর্শে এসে দ্রুত ঠান্ডা হয়ে কঠিন আকার ধারণ করে এবং মোচাকৃতি লাভ করে। তখন একে আগ্নেয়গিরি বলে। আগ্নেয়গিরির বহিঃস্থ যে মুখ বা নির্গমনপথ দিয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে, তাকে জ্বালামুখ বলে।

অর্থাৎ আগ্নেয়গিরি হলো  মোচাকৃতির  একটি বিশেষ ধরনের পাহাড় যার ভেতর দিয়ে ভূ-অভ্যান্তরের উত্তপ্ত ও গলিত পাথর, ছাই এবং গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এটি একটি ভৌগোলিক প্রক্রিয়া।

এই গলিত শিলা, কাদা, ছাই পৃথিবীর অভ্যন্তরে যখন থাকে তখন তার নাম ম্যাগমা (Magma) আর বাইরে ভূপৃষ্ঠে এলেই নাম  হয়ে যায়  লাভা (Lava)।

লাভা বলতে কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে নিঃসৃত গলিত উত্তপ্ত তরল বা তা থেকে জমাট বাঁধা পাথরকে বোঝানো হয়। কোনো কোনো গ্রহ এবং উপগ্রহের ভূ-অভ্যন্তরে লাভা  আছে। কেন লাভ উদগিরণ হয় এর উত্তর হলো প্রচন্ড চাপ আর তাপ সহ্য করতে না পেরেই এই লাভা বের হয়ে আসে । লাভা যখন কোনো আগ্নেয়গিরি থেকে বেরিয়ে আসে তখন এর  তাপমাত্রা  থাকে সাধারনত  ৭০০° সেলসিয়াস থেকে ১২০০° সেলসিয়াস পর্যন্ত। আগ্নেয়গিরি থেকে বিস্ফোরণহীণভাবে উদগীরিত লাভা যখন ভূপৃষ্ঠে বয়ে যায় তখন তাকে লাভা প্রবাহ বলা হয়। এই লাভা জমাট বেঁধে আগ্নেয় শিলা গঠন করে। ধারনা করা হয়  লাভা  শব্দটি এসেছে  সম্ভবত ল্যাটিন শব্দ লাবেস (labes) থেকে এসেছে, যার অর্থ হল গড়িয়ে পড়া।  জানা যায় ১৭৩৭ খ্রিস্টাব্দের  মে থেকে জুন মাসের  মাঝামাঝি কোনো সময়ে ফ্র্যন্সিস্কো জেরাও নামের এক ব্যক্তি ভিসুভিয়াস পর্বতের আগ্নুত্পাত সম্পর্কে লিখতে গিয়ে এই লাভা শব্দটি প্রথম ব্যবহার করেন।

পৃথিবীতে  কতগুলো আগ্নেয়গিরি রয়েছে

পৃথিবীর শুরু থেকে বর্তমান পর্যন্ত ঠিক কতটি আগ্নেয়গিরির অস্তিত্ব দেখা গিয়েছে তার সঠিক হিসাব পাওয়া  যায় নি।  তবে ভূতাত্ত্বিকদের ধারণা  মতে পৃথিবীতে (সমূদ্রের নিচের আগ্নেয়গিরি ছাড়া) ১৩০০ থেকে ১৫০০ আগ্নেয়গিরির অস্থিত্ব রয়েছে। বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় অর্ধ সহস্র সক্রিয় বা জীবন্ত আগ্নেয়গিরি আছে যেগুলো গত ১০ বছরে কোনো না কোনো সময়ে সক্রিয় ছিল। যার ৫০ থেকে ৬০টি প্রতি বছরই লাভা উদগিরণ করে থাকে।

আগ্নেয়গিরি কত প্রকার/ প্রকারভেদ

আগ্নেয়গিরিকে কয়েকভাবে ভাগ করা যায়।  আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের উপর ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরিকে তিনটি ভাগে ভাগ করা যায় ।  সক্রিয় আগ্নেয়গিরি, সুপ্ত আগ্নেয়গিরি,  মৃত আগ্নেয়গিরি।

 সক্রিয় আগ্নেয়গিরি

যে সব আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত এখনও বন্ধ হয়নি অর্থাৎ তাদের লাভার উদগিরন এখনো হচ্ছে, তাদেরকে বলে সক্রিয় আগ্নেয়গিরি বলে। যেমন-হাওয়ায় দ্বীপ পুঞ্জের মনালোয়া আগ্নেয়গিরি।

সুপ্ত আগ্নেয়গিরি

যে সব আগ্নেয়গিরির  অগ্ন্যুৎপাত অনেক কাল আগে  বন্ধ হয়ে গেছে; কিন্তু যে কোন সময় আবার অগ্ন্যুৎপাত শুরু হতে পারে সে সব আগ্নেয়গিরিকে বলা হয় সুপ্ত আগ্নেয়গিরি। যেমন, ইটালির ভিসুভিয়াসকে সুপ্ত আগ্নেয়গিরি হিসেবে ধরা হয় ।

মৃত আগ্নেয়গিরি

যে সব আগ্নেয়গিরি দীর্ঘ সময় ধরে নিষ্ক্রিয় হয়ে আছে এবং ভবিষ্যতেও অগ্ন্যুৎপাতের সম্ভাবনা নেই সেগুলোকে বলা হয়  মৃত আগ্নেয়গিরি। যেমন, তাঞ্জানিয়ার মাউন্ট কিলিমাঞ্জারোকে মৃত আগ্নেয়গিরি ধরা হয়।

আকার  ও আকৃতির উপর ভিত্তি করে আগ্নেয়গিরি কে নিম্ন লিখিত ভাবে শ্রেণিবিন্যাস করা  যায়। যথাঃ শিল্ড আগ্নেয়গিরি, স্ট্রাটো আগ্নেয়গিরি ও সিন্ডার আগ্নেয়গিরি। 

শিল্ড আগ্নেয়গিরি

গম্বুজ আকৃতির শিল্ড আগ্নেয়গিরি গুলোর তলদেশ চওড়া ঢাল সামান্য আকারে বৃহৎ।  তরল লাভা ভেন্ট দিয়ে এই আগ্নেয়গিরি  সম্ভৃদ্ধ থাকে।

স্ট্রাটো আগ্নেয়গিরি

জ্বলন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে নির্গত ভস্ম ও লাভার সমন্বয়ে স্তরসমূহ দ্বারা এ জাতীয় আগ্নেয়গিরি গঠিত হয়। তরল লাভা আর পাথরের সমন্বয়ে কয়েক স্তরে এই আগ্নেয়গিরি গঠন হয়।

সিন্ডার আগ্নেয়গিরি

আকারে ছোট আগ্নেয়গিরিগুলোকে সিন্ডার আগ্নেয়গিরি বলে। এই আগ্নেয়গিরিতে কোন আনুভূমিক কোন লাভার স্তর থাকে না।  এই আগ্নেয়গিরিগুলোর গড় আকৃতি প্রায় ৮০০ মিটার চওড়া তল বিশিষ্ট এবং উচ্চতা হয় প্রায়  ১০০ মিটারের মত।

আগ্নেয়গিরির প্রকারভেদ

এ ছাড়াও আমরা বেশ কিছু আগ্নেয়গিরির প্রকারভেদ দেখা যায় । এগুলো হলঃ

যৌগিক আগ্নেয়গিরি 

এরা পার্শ্বযুক্ত খাড়া এবং মোচাকৃতির হয়ে থাকে। বিভিন্ন ধরনের লাভা, ছাই ও পাথর উদগিরণ করে থাকে এবং এদের চূঁড়ায় বিশাল খাঁদ দেখা যায়।

ঢাল বিশিষ্ট আগ্নেয়গিরি 

এটি প্রশস্ত কিন্তু আলতোভাবে লেগে থাকা ঢাল বিশিষ্ট আগ্নেয়গিরি। এর লাভা উদগিরণের পর বেশি দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে যায় না।

অঙ্গারের সমন্বয়ে গঠিত মোচাকৃতির আগ্নেয়গিরি

সাধারণত এটির উদগিরণ অল্প সময়ের মধ্যেই বন্ধ হয়ে যায়। এবং চূঁড়ায় গোলাকৃতি খাঁদের সৃষ্টি করে।

গম্ভুজাকৃতির লাভাবিশিষ্ট আগ্নেয়গিরি

এর লাভা বেশ চটচটে ধরনের হয়। তাই বেশি দূর পর্যন্ত প্রবাহিত হয় না এবং চূঁড়ার দিকে গম্বুজের মতো জমে থাকে।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের কারণ

১। ভূ-ত্বকের দুর্বল স্থান বা ফাটল দিয়ে ভূ অভ্যন্তরের গলিত ম্যাগমা,ভস্ম, ধাতু  প্রবল বেগে বের হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটায়।

২। কখনো কখনো ভূ-ত্বকের ফাটল দিয়ে নদী-নালা,খাল-বিল এবংসমুদ্রের পানি  ভূগর্ভে প্রবেশ করলে প্রচন্ড উত্তাপে বাষ্পীভূত হয়। ফলে আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে ভূত্বক ফাটিয়ে দেয়। তখন ঐ ফাটলের ভিতর দিয়ে পানি, বাষ্প, তপ্ত শিলা প্রভৃতি নির্গত হয়ে অগ্ন্যুৎপাত ঘটাতে পারে ।

৩। ভূ-আন্দোলনের সময় পার্শ্বচাপে ভূত্বকের দূর্বল অংশ ভেদ করে এ উত্তপ্ত তরল লাভা উপরে উত্থিত হয়।এভাবে ভূআন্দোলনের ফলে ও অগ্ন্যুৎপাত হতে পারে।

৪। ভূগর্ভে নানা রাসায়নিক ক্রিয়াও বিভিন্ন তেজস্ক্রিয় পদার্থের প্রভাবে প্রচুর তাপ বৃদ্ধি পেয়ে গ্যাসের সৃষ্টি হয়। তাতে ভূঅভ্যন্তরের চাপ বৃদ্ধি পায় এবং অগ্ন্যুৎপাত  ঘটে।

আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতের প্রকারভেদ

আগ্নেয়গিরি থেকে ভূগর্ভস্থ পদার্থের নির্গমনকে বলা হয় অগ্ন্যুৎপাত। গবেষকগন আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাত এর সময় নির্গত লাভা, ছাই, গ্যাস এর ধরণের উপর ভিত্তি করে  অগ্নুৎপাতকে কয়েক প্রকারে ভাগ করেছেন। এগুলোর নামকরণের ক্ষেত্রে সাধারণত পূর্বের কোন অগ্নেয়গিরির নাম অনুসরণ করা হয়েছে। ঐ আগ্নেয়গিরিতে  এ ধরনের অগ্নুৎপাত সংঘটিত হয়েছে বলেই এর নাম অনুসরন করা হয়েছে। । কিছু কিছু অগ্নেয়গিরিতে শুধুমাত্র একধরনের অগ্নুৎপাত সংঘটিত হয় পক্ষান্তরে কিছু কিছুতে সময়ের ক্রমানুসারে একাধিক ধরনের অগ্নুৎপাত সংঘটিত হয়। আগ্নেয়গিরি অগ্নুৎপাতকে ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। ম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাত, প্রিটোম্যাগমেটিক অগ্নুৎপাত ও প্রিয়াটিক অগ্নুৎপাত।

ম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাত

ভূগর্ভস্থ গ্যাসের চাপ কমে গ্যাস নির্গত হওয়ার মাধ্যমে ম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাত হয়। এ সময় সংকোচিত গ্যাস বিস্ফোরনের মাধ্যমে ম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাতে গলিত লাভা উদগীরন করে। ম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাতের অপেক্ষাকৃত ছোট উদগীরন এর প্রবলতা হয় প্রায় ৩০ কিঃমিঃ উচু হয়ে থাকে। এই উচ্চতা  খ্রিস্টপূর্ব ৭৯ সালে ইটালির  পম্পেই নগরী ধংসকারী মাউন্ট ভিসুভিয়াস এর উদগীরনের উচ্চতা থেকে বেশি। মাউন্ট ভিসুভিয়াস, মাউন্ট ইতনা,  মায়ন ভলকানো,মাউন্ট মিহারা  ইত্যাদিতে এই ধরনের অগ্নুৎপাত  দেখা যায়।

প্রিটোম্যাগমেটিক অগ্নুৎপাত

যে অগ্নুৎপাত পানি ও লাভার মধ্যকার পারস্পরিক ক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয় তাকে প্রিটোম্যাগমেটিক অগ্নুৎপাত বলে। তাপীয় সংকোচনের ফলে প্রিটোম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাত হয়। মাউন্ট তারাওয়েরাতে প্রিটম্যাগমাটিক অগ্নুৎপাত  হয়।

প্রিয়াটিক অগ্নুৎপাত

বাষ্প সম্প্রসারণের মাধ্যমে যে অগ্নুৎপাত সংঘঠিত হয় তাকে বলা হয় প্রিয়াটিক অগ্নুৎপাত ।  যখন ঠান্ডা বাতাস অথবা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তপ্ত শিলার সংস্পর্শে আসে তখন শিলা অত্যধিক উত্তপ্ত হয়ে বাষ্পে পরিনত হয় এবং পাশ্ববর্তি শিলাকে চূর্ণবিচূর্ণ করে পানি, আগ্নেয় গোলা, আগ্নেয় শিলা আকারে উদগীরন  করে।বাষ্পীয় উদগিরনের সময় নির্গত ধাতব কনার ফলে প্রিয়াটিক অগ্নুৎপাত হয়। মাউন্ট হেলেন্,  তাল ভলকানো,লা সোপরিয়ের, সোপরিয়েরি হিলস ইত্যাদিতে প্রিয়াটিক অগ্নুৎপাত হয়।

রিং অফ ফায়ার বা অগ্নিবলয়

তামু ম্যাসিফ (Tamu Massif ) হল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আগ্নেয়গিরি যেটি  জাপানের উপকূলীয় এলাকার কাছে সমুদ্রগর্ভে অবস্থিত , এই অগ্নেয়গিরির বিস্তৃতি প্রায় এক লাখ ২০ হাজার বর্গমাইলের মতো । যার  আনুমানিক বয়স হল প্রায় সাড়ে ১৪ কোটি বছর। এ দিকে ফিলিপাইনে একটি আগ্নেয়গিরি ফুঁসে ওঠার কারণে সেই স্থান পরিত্যাগ করেছে অনেক মানুষ। পৃথিবীর উপরিভাগ যে ভাসমান প্লেটগুলোর ওপর আছে, সেগুলোকে ডাকা হয় টেকটনিক প্লেট বলে। আর এই প্লেটগুলোর সংযোগস্থলগুলো মিলে গঠিত হয়েছে বলয়।  পৃথিবীর  ৯০ শতাংশ জীবন্ত আগ্নেয়গিরির অবস্থান দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে। এ কারনে এ এলাকাকে বলা হয় রিং অব ফায়ার বা অগ্নিবলয়।

এই বলয় ঘিরেই সংগঠিত হয় বিশ্বের বেশিরভাগ ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির উদগীরনের ঘটনা। সাম্প্রতি  বেশ কিছু  বড় অগ্নুৎপাত ও ভূমিকম্পের পর বিজ্ঞানীরা  প্রশ্ন তুলেছেন যে, এই রিং অব ফায়ার কি বেশি সক্রিয় হয়ে উঠছে? এবং এটার প্রভাবে আগামীতে আরও বড় ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাতের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে কি ?

ইন্দোনেশিয়া থেকে শুরু করে চিলির সমুদ্রকূল পর্যন্ত প্রায় ৪০ হাজার কিলোমিটার জুড়ে পৃথিবীর বেশিরভাগ সক্রিয় এবং সুপ্ত আগ্নেয়গিরি রয়েছে। আর এসব আগ্নেয়গিরির কাছাকাছিই নিয়মিত ভূমিকম্পের ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে।

রিং অফ ফায়ার বা অগ্নি বলয়

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে ফাটল ধরা এবং নিচ থেকে ক্রমাগত উত্তপ্ত পাথরের চাপে এমন সব ঘটনা ঘটছে ।  প্রায়ই এসব পাথর মাটি ভেদ করে উপরে উঠে আসছে, যে কারনে আগ্নেয়গিরির আশেপাশে ভূমিকম্পের সৃষ্টি হচ্ছে এবং তার ফলে আগ্নেয়গিরির ভেতরে থাকা লাভার উদগিরন হচ্ছে।

আগ্নেয়গিরি বিশেষজ্ঞ জেনিন ক্রিপনার এক টুইটে  বলেন,

 “এই স্থানকে ‘রিং অফ ফায়ার’ বলে এমনি এমনি ডাকা হয় না। ভয়ংকর মাত্রায় সক্রিয় থাকবে বলেই এটির এরকম নামকরন হয়েছে। এই ধরণের ঘটনা স্বাভাবিক”।

টোকিও ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইয়োসুকি আওকি জানান,

“প্রতিটি আগ্নেয়গিরির ভেতরের ঘটনা একটার সাথে অন্যটা সম্পর্কিত নয়। এগুলো সুপ্ত থাকে, সক্রিয় হয়, আবার সুপ্ত অবস্থায় ফিরে যায়।এভাবেই  আগ্নেয়গিরির স্বাভাবিক কর্মকান্ড চলে”।

অগ্ন্যুৎপাতের ফলাফল

অগ্নুৎপাতের ফলে মালভূমির সৃষ্টি হয়, দ্বীপের সৃষ্টি হয়, ভূপৃষ্টের কোনো অংশ ধ্বসে  গভীর গহ্বরের সৃষ্টি  হতে পারে, আগ্নেয় হ্রদের সৃষ্টি হয়,লাভা উদগিরনের ফলে পর্বতের সৃষ্টি হতে পারে , লাভা সঞ্চিত হতে হতে বিস্তৃত এলাকা নিন্ম সমভূমিতে পরিনত হতে পারে,  গ্রাম,নগর,কৃষিক্ষেত্র  ধবংস হয়ে যেতে পারে অনেক সময়  ভূমির উর্বতা বৃদ্ধি  পায়, ভু অভ্যন্তরে থাকা নানা খনিজ পদার্থ নির্গত হতে পারে।

হারিয়া যাওয়া নগরি ও ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরি

মাউন্ট ভিসুভিয়াস ইতালির নেপলস উপসাগরীয় অঞ্চলের একটি আগ্নেয়গিরি, নেপলস থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার পূর্বে সমূদ্র উপকুলের খুব কাছেই এর অবস্থান। এটি এমন এক আগ্নেয়গিরি যা বিগত কয়েক শতাব্দীতে কয়েকবার অগ্ন্যুৎপাত  বর্ষন করেছে। তবে বর্তমানে এটি থেকে কোন অগ্ন্যুৎপাত হচ্ছে না অর্থাৎ সুপ্ত অবস্থায় আছে।  কিন্তু যে কোন সময়  জেগে উঠার সম্ভাবনা আছে। ইটালিতে  মাউন্ট ভিসুভিয়াস ছাড়াও এতনা ও স্ট্রমবোলি নামে আরো দুইটি সক্রিয় আগ্নেয়গিরি রয়েছে।

খৃষ্টের জন্মের কিছু কাল আগে ইতালিতে  “পম্পেই” এবং “হারকিউলানিয়াম” নামে দুইটি শহর ছিলো। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দে যা মাউন্ট ভিসুভিয়াসের লাভার নিচে চাপা পড়ে ধ্বংস হয়ে যায়। সেই থেকেই মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির নাম সবার মুখে চলে আসে।  শহরগুলো লাভার নিচে  চাপা পড়ে  যাওয়ার কারনে তা আর পূর্নঃনির্মান করা হয়নি। ধারনা করা হয়, যেখানে সেই লাভার ধ্বংস্তুপ থেকে  কিছু মানুষ বেঁচে যায়। পরবর্তিতে লুটেরারা সেই শহরের মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। তবে কালের বিবর্তনে একসময় সেই শহরগুলোর কথা সকলেই ভুলে যায়।

মাউন্ট ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির একটা ঐতিহাসিক এবং সাহিত্যিক ঐতিহ্য আছে। খ্রিষ্টপূর্ব ৭৯ অব্দের অগ্ন্যুৎপাতের সময় এ  আগ্নেয়গিরিকে দৈত্যের মতন বিবেচনা করা হতো। পম্পেই শহরে টিকে যাওয়া অনেক গৃহ-মন্দিরের  ভেতরে ভিসুভিয়াস নামটি সাপ হিসেবে খোদাইকৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে। ক্যাপুরা থেকে পাওয়া একটি শিলালিপি থেকে জানা গেছে যে, এটিকে আগে জুপিটারের একটি শক্তি হিসেবে উপাসনা করা হতো; মানে “জুপিটার ভিসুভিয়াস”।

পৌরানিক কাহিনী অনুসারে,  হারকিউলিস তার দায়িত্বগুলো পালন করার জন্য সিসিলি যাবার সময় পাশের কিউমে দেশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং সেখানে একটি  পাহাড়ের দেখা পান  যার নাম হুল “The Phlegraean Plain” বা “Plain of Fire”. এই  পাহাড়টি  প্রাচীনকালে আগুন উগড়ে দিত। এখন এই পাহাড়টিকে আমরা মাউন্ট ভিসুভিয়াস হিসেবে চিনি। পৌরাণিক কাহিনী মতে, এই জায়গাটিতে তখন দস্যুদের বসবাস  ছিলো। তারা মানুষের হলেও  দেখতে ছিল  দৈত্যাকৃতির। দেবতাদের সহায়তায় হারকিউলিস এই এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।

পরিকল্পিত এই পাম্পেই নগরীতে ছিল প্রধান দুটি সড়ক। রাস্তাকে ল্যাটিন ভাষায় বলে ভিয়া, একটার নাম ভিয়া স্ট্যবিয়ানা আরেকটার নাম ছিল  ভিয়া আব্বনডানজা। প্রতিটি রাস্তাই আগ্নেয় পাথরে তৈরি ছিল এবং রাস্তার দুপাশেই ছিল ফুটপাথ। আর একটু পর পর চার কোনা পাকা করা হাউসের মধ্যে পাইপের সাহায্যে পানীয়জল সরবরাহের ব্যবস্থা। অর্থাৎ  হাজার বছর আগেই পাইপের মাধ্যমে শহরের রাস্তায় পথিকদের জন্য পানীয় জল সরবরাহের ব্যবস্থা ছিল এই নগরিতে !

প্রায় ১৬০০ বছর ধরে লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকার পর ১৫৯২ খ্রিস্টাব্দে আকস্মিকভাবে এই দুটি নগরী আবিস্কৃত হয় যা সমগ্র বিশ্বে এক তুমুল আলোড়ন তোলে। পরবর্তীতে ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভুক্ত করে এই নগরীকে। বর্তমানে প্রতিদিন হাজার হাজার পর্যটকের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে পম্পেই।

ভিসুভিয়াসকে  বিশ্বের অন্যতম ভয়ংকর আগ্নেয়গিরিগুলোর মধ্যে একটি হিসাবে গণ্য করা হয় কেননা এর আশপাশের এলাকায় ৩,০০০,০০০ মানুষ বসবাস করে এবং এটির বিস্ফোরণের মত অগ্ন্যুৎপাতের প্রবণতা রয়েছে । এটি পৃথিবীর সবচেয়ে জনবহুল অগ্নুৎপাতপ্রবণ এলাকা ।

আগ্নেয়গির অগ্নুৎপাতের অসংখ্য ঘটনা রয়েছে । এর  মধ্যে  সম্ভবত সবচেয়ে ভয়ংকর হল  ১৮১৫ সালে ইন্দোনেশিয়ায় তাম্বরা পর্বতে ঘটে যাওয়া অগ্নুপাতটি ! এর ফলে লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ মারা যায় ! আর আগ্নেয়গিরি যে শুধু আমাদের ক্ষতিই করে তা কিন্তু নয়  এর ফলে লাভার মাধ্যমে অনেক খনিজ পদার্থ বাইরে বের হয়ে আসে যা  পরবর্তিতে মানুষেরই কাজে আসে !

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক