2

একটি আত্মহত্যার পোস্টমর্টেম… :(

আত্মহত্যা ! মানুষের নিজের প্রতি অবিচার করার সবচেয়ে ঘৃণ্যতম উপায়।  প্রতি বছর সারা বিশ্বে প্রায় ৮-১০ লাখ মানুষ নিজের প্রতি এই অবিচার করে মৃত্যুবরণ করে। আর আত্মহত্যার চেষ্টা করে প্রায় ১০-২০ লাখ মানুষ। সংখ্যাটা কিন্তু নেহায়েতই কম না ! এতোগুলো মানুষ প্রতি বছর নিজের জীবনটাকে ধ্বংস করে ফেলে ! 🙁

সম্প্রতি একটা আত্মহত্যার কথা শুনলাম। একটা মেয়ের; নাম নাবিলা (আসল নাম গোপন করা হল)। সবার ধারণা মায়ের সাথে ঝগড়ার কারণে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে ফ্যানের সাথে ঝুলে গিয়েছিলো। বয়েস বেশি হলে ১৬ কি ১৭ই হবে। মানুষ কি পরিমাণ হীনমন্যতায় ভুগলে বা জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণা চলে আসলে আত্মহত্যা করতে পারে এই বয়েসে?

আত্মহত্যা কি, কেন করে মানুষ, আর কিভাবে তা প্রতিরোধ করা যায় এমন কিছু নিয়েই লিখতে চেয়েছিলাম। কিন্তু একটা পোস্টেই সব শেষ না করে দিয়ে একাধিক লেখায় শেষ করাটাই ভালো হবে তাই আলাদা আলাদা করেই লিখবো। এই পোস্টে নাবিলার আত্মহত্যার সম্ভাব্য কারণ আর বাবা-মার কি করণীয় ছিল সেটা বের করার একটা ব্যর্থ প্রচেষ্টা করবো। নাবিলার কোন বান্ধবী এই লেখা পরে থাকলে যদি তাদের মনে খানিকটাও আঘাত লাগে, তাহলে আমি দুঃখিত।

যেসকল কারণে নাবিলা আত্মহত্যা করতে পারে –

  • বাবা-মার সাথে ঝগড়া –  যেদিন নাবিলা আত্মহত্যা করে সেদিন তার মায়ের সাথে তুমুল ঝগড়া হয়েছিলো। হয়তো সেই ঝগড়ার কারণে প্রবল মনঃকষ্টে সে আত্মহত্যা করেছে। তবে যতটুকু শুনেছি তাতে এমন ঝগড়া হরহামেশাই হতো তার বাবা মার সাথে। শারীরিকভাবে নির্যাতনের কথাও শোনা যায়। তো যেহেতু সে আগে থেকেই এমন পরিস্থিতির মোকাবেলা করে অভ্যস্ত তাই সেদিন শুধু ঝগড়ার কারণে আত্মহত্যা করাটা অনেকটাই ভাবিয়ে তোলে। হয়তো আরও অনেক কারণ পরোক্ষভাবে ছিল।
  • প্রেমিকের সাথে মনোমালিন্য –  বর্তমান সময়ে মেয়েদের আত্মহত্যা করার অন্যতম বড় কারণ প্রেমিকের সাথে মনোমালিন্য। কখনো কখনো সেটা মনোমালিন্যতেই  সীমাবদ্ধ থাকেনা, সেটাকেও ছাড়িয়ে যায়।  ব্ল্যাকমেইল, প্রেমে ধোঁকা, সবসময়েই মানসিক চাপের মধ্যে রাখা ইত্যাদি অনেক কারণেই আত্মহত্যা করতে পারে একটা মেয়ে। জানামতে নাবিলার প্রেমিক ছিল, আর তার সাথে সম্পর্ক খুব একটা মধুর ছিলোনা। সেই প্রেমিকের জন্যেও নাবিলা আত্মহত্য করে থাকতে পারে।
  • বাবা-মার অতিরিক্ত চাপ – নাবিলার বাবা-মা যথেষ্ট চাপে রাখতে। বাসা থেকে বের হতে দিতোনা,  বন্ধু-বান্ধবের সাথে মিশতে দিতো না । সারাদিনই ঘরে বন্দী অবস্থায় থাকতো সে। অনেকটা জেলখানার মতো অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে থাকলে যেকেউই হীনমন্যতায় ভুগবে, বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করে ফেলবে। আর এমন বন্দি  অবস্থায় যদি কেউ মানসিক ভারসাম্যহীনও হয়ে যায় তবে সেটাও অবাক করার মতো হবেনা। মানুষ সামাজিক জীব, তাকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে রাখার চেষ্টা করলে সে তার স্বাভাবিক জীবনযাপন কিভাবে করবে? “বেশি টানলে রশি ছিড়ে যায়” – এটা খাঁটি কথা !
  • মনের কথা বলার মতো মানুষ না পাওয়া – যেহেতু নাবিলা কলেজ-কোচিং বাদে দিনের বেশিরভাগ সময়েই বাসাতে বন্দী অবস্থায় থাকতো তাই নিজের মনের কথা মন খুলে বলার মতো যতেষ্ট সময়-সুযোগ পেতোনা হয়তো। UCLA এর মনোবিজ্ঞানীদের  মতে  আমাদের দুঃখ কষ্ট কে মনের মধ্যে চাপা না রেখে সেটাকে ভাষায় প্রকাশ করতে পারলে দুঃখ কষ্টের পরিমাণ অনেকাংশেই লাঘব হয়। যেহেতু নাবিলা মনের কথা প্রকাশ করার যথেষ্ট সুযোগ পেতনা তাই তার আত্মহত্যার পিছে এর পরোক্ষ প্রভাব থাকতে পারে

উপরের সবগুলো কারণ একসাথে নাবিলার মধ্যে কাজ করে বিষণ্ণতার সৃষ্টি করবে আর সেটাই স্বাভাবিক। আর সবগুলো কারণ তার মধ্যে একসাথে কাজ করে তাকে আত্মহত্যার মতো কাজের দিকে ধাবিত করেছে।

বাবা-মার কি করণীয় ছিল?

  • শুধু নাবিলা না, সব বাবা মারই উচিৎ নিজের সন্তানের সাথে ভালো ব্যবহার করা। যদি সন্তান কোন ভুল কাজ করে তবে তাকে সেটা ভালোভাবে বুঝিয়ে শুধরে দেয়া। সবসময়েই ছেলে-মেয়েকে শাসনের মধ্যে রাখা বাবা-মার সাথে সন্তানের অনেক দূরত্ব তৈরি করে। আমার ধারণা নাবিলার সাথে তার বাবা-মার অনেক দূরত্ব তৈরি হয়ে গিয়েছিলো।সবসময়েই তাকে শাসনের মধ্যে রাখা হয়তো উচিৎ হয়নি।
  • নাবিলার বাবামা সবসময়েই তাকে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে রাখতো। কিছু সময় তাকে তার মতো থাকার সুযোগও দেয়া উচিৎ ছিল।  তারা সন্তানকে একবারে ছেড়ে দিক সেটা বলছিনা, টাইট অবশ্যই দিবে, তবে সেটা পরিমিত। ঘোড়ার লাগাম আলতো করে ধরলে সে ছুটবে, আরেকটু শক্ত করে ধরলে সে ধীরে ছুটবে। খুব শক্ত করে ধরলে সে থেমে যাবে
  • যেহেতু নাবিলার বাবা-মা তাদের সন্তানের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ ছিল তাই মেয়েকে তার বন্ধুবান্ধবের সাথে মিশতে দেয়া রীতিমতো ফরজের কাতারে পড়ে যায়। মেয়েকে তার বন্ধুবান্ধবের সাথে মিশতে দিলে সে তাদের সাথে নিজের মনের কথা খুলে বলতে পারতো, হাসিঠাট্টা, আনন্দ সবই করতে পারতো। আর এগুলোর পর কারও মাথায় আত্মহত্যার মতো সিদ্ধান্ত নেয়া প্রায় অসম্ভবই বলা চলে।
  • নিজের জীবনের মূল্য বুঝতে শিখানোর দায়িত্ব্য বাবা-মার উপরেই বর্তায়। ছোটবেলা থেকে মেয়েকে তারা নিজের জীবনের গুরুত্ব আর লক্ষ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে পারলে আর জীবনের কঠিন সময়ের মোকাবেলা করতে শিখাতে পারলে হয়তো সে আত্মহত্যার মতো পথ বেছে নিতোনা।

আমি জানি লেখাটা কোনদিক দিয়েই মানসম্মত হয়নি, অনেক তাড়াহুড়ার মধ্যে লিখেছি। আর এই ধরণের লেখার অভিজ্ঞতা নেই আমার। এবারই প্রথম। ভুল ত্রুটি এড়িয়ে একে একটি সচেতনতামূলক লেখা হিসেবে দেখলেই খুশি হবো।

আপনি কি কখনো আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেছেন? করলে কেন করেছেন? কমেন্টে জানান।