সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি ও পদ্মাবতী বিতর্ক !

উপমহাদেশের ইতিহাস নিয়ে আলোচনা করলে যে কজন সম্রাটের নামে উঠে আসে তার মধ্যে আলাউদ্দিন খিলজি অন্যতম। ইতিহাস থেকে জানা যায় খিলজি বংশের শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হলেন সুলতান জালাল উদ্দিন। খিলজি শাসককের মধ্যে আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন দ্বিতীয় ও সবচেয়ে ক্ষমতাধর শাসক।

আলাউদ্দিন খিলজি’র  ব্যক্তিগত পরিচয়

আলাউদ্দিন খিলজী ছিলেন খিলজী বংশের প্রতিষ্ঠাতা সুলতান জালালউদ্দিনের ছোট ভাই শিহাবউদ্দিনের পুত্র । সুলতান  আলাউদ্দিন ১২৫০ সালে জন্ম গ্রহণ করেন। তিনি জুনা মোহাম্মদ খিলজি নামে বড় হতে থাকেন। পিতার মৃত্যুর পরে চাচা জালাল উদ্দিনের কাছেই মানুষ হতে থাকেন। এক সময় জালাল উদ্দিনের এক কন্যাকে বিয়ে করেন। জালাল উদ্দিন আলাউদ্দিনকে কারা রাজ্যের শাসক হিসেবে নিয়োগ দান করেন।
পরবর্তিতে জুনা মোহাম্মদ হতে আলাউদ্দিন খিলজি নাম ধারন করেন।

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি

সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি

ক্ষমতা অধিগ্রহন

আলাউদ্দিন খিলজি ছিলেন প্রচন্ড উচ্চাকাংখী একজন লোক। ক্ষমতার প্রতি তার ছিল প্রচন্ড লোভ। ধারনা করা হয় শুধু মাত্র ক্ষমতা দখল করার জন্যেই তিনি জালালউদ্দিনের কন্যাকে বিয়ে করেন। ১২৯১ সালে তিনি কারা রাজ্যের শাসক হিসেবে নিয়োগ প্রাপ্ত হন। ক্ষমতা দখলের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে তিনি প্রথমে আশে পাশের হিন্দু রাজ্যগুলোর উপর আক্রমন করতে থাকেন।

তার  আক্রমনের মূল উদ্দেশ্য ছিল প্রচুর ধন সম্পদ লুট করা। যা দিয়ে নিজের সেনাদল শক্তিশালী করা যায়। এ দিকে সম্রাট জালাল উদ্দিন মনে করেন আলাউদ্দিন এসব ধন-সম্পদ অর্জন করছে জালাল উদ্দিনের জন্যে। আলাউদ্দিনের এত সব সাফল্য উপলক্ষে জালাল উদ্দিন ১২৯৬ সালে গোয়ালিয়র আসেন তার সাথে দেখা করতে। চতুর আলাউদ্দিন সম্রাটকে অভ্যর্থনার বদলে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করে।

রাজ্য বিস্তার ও যুদ্ধ অভিযান

উচ্চাকাংখী আলাউদ্দিনের পরিচয় পাওয়া যায় তার রাজ্য বিস্তারের মানসিকতাতে। তিনি গ্রীক বীর আলেকজেন্ডারের  ন্যায় বিশ্ব বিজয়ের স্বপ্ন দেখতেন । এই উদ্দেশ্যে নাম ধারন করে সিকান্দার সানি , দ্বিতীয় আলেকজেন্ডার। তিনি স্বপ্ন দেখতেন আলেকজেন্ডার বা চেঙ্গিস খানের মত তারও এত বড় উত্তরাধিকার থাকবে। এই উদ্দেশ্যে তিনি তার বাহিনী তৈরি করেন। তার আগে কেউ ভারত উপমহাদেশে স্থায়ী সেনা বাহিনী গড়ে তুলে নি।

তিনি প্রথম ভারত উপমহাদেশে বেতনধারী স্থায়ী সেনা বাহিনী গড়ে তুলেন। বিশ্ব জয়ের উদ্দেশ্য তিনি এই সেনা বাহিনী গড়ে তুললেও পরবর্তিতে কাজি আলা-উল-মূলকের পরামর্শে এই অসম্ভব পরিকল্পনা ত্যাগ করেন। এই পরিকল্পনা ত্যাগ করলেও তিনি ভারত জুড়ে বিশাল সাম্রাজ্য স্থাপনের নীতি গ্রহণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি প্রথম ১২৯৯ সালে ভারতের গুজরাট আক্রমন করনে। রাজা কর্ণদেব পরাজয় বরন করেন । সেখান থেকেই মালিক কাফুরকে মুক্ত করেন যিনি পরবর্তিতে আলাউদ্দিনের প্রধান সেনাপতি হয়েছিল।

১৩০১ সালে রাজপুর দুর্গ  রণ-থাম্বার আক্রমন করেন। প্রথমে পরাজিত হলেও দ্বিতীয় আক্রমণে  রাজপুত নেতা হামিম দেব পরাজয় বরন করেন এবং মৃত্যুর বরন করেন।

১৩০৩ সালে খিলজি বাহিনী ওয়ারাংগাল আক্রমন করলেও খিলজি বাহিনী কাকাতিয়া শাসকদের বাহিনীর কাছে পরাজিত হয়।

১৩০৬ সালে খিলজি বাহিনী সমৃদ্ধ  বাগ্লানা রাজ্য আক্রমন করে। এটি ছিল গুজরাট থেকে বিতারিত রাজা রাই কারানের অধীনে। রাই কারান পরাজিত হন এবং তার মেয়ে দেবালা দেবিকে দিল্লিতে নিয়ে আসা হয় যাকে পরবর্তিতে আলাউদ্দিনের বড় ছেলে খিজির খানের সাথে বিয়ে দেওয়া হয়।

সেনাপতি মালিক কামালুদ্দিন ১৩০৮ সালে মারওয়ার সিওয়ানা দুর্গ আক্রমন করেন। রাজা সাতাল দেব প্রচন্ড রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে বন্দি  হন।

১৩০৮ সালে আলা উদ্দিন তার সেনা বাহিনীকে মোঙ্গল  অধিকৃত আফগানিস্থানে প্রেরণ করেন। গাজি মালিকের অধিনে মোঙ্গল অধিকৃত কান্দাহার, গজনী এবং কাবুলে সেনা প্রেরণ করা হয়। মোঙ্গল  বাহিনী পরাজয় বরন করে।

অতঃপর আলাউদ্দিন ১৩১০ সালে কৃষনা (Krishan) নদীর দক্ষিনে  হইসালা (Hoysala) অভিযান চালান। হইসালার রাজা ভিরা বাল্লালা যুদ্ধ ছাড়াই আত্মসমর্পন করে এবং বাৎষরিক কর প্রদানে সম্মত হয়। মালিক কাফুরের নেতৃত্বে আলাউলদ্দিন ১৩১১ সালে মেবারের রাজা রতন সিং ও মালবের রাজা মহলক দেবকে পরাজিত করেন।

অতঃপর তিনি তার সেনাপতি মালিক কাফুরকে দক্ষিন ভারতে অভিজানে পাঠান। সেনাপতি কাফুর দেবগিরির রাজা রামচন্দ্র, বরঙ্গলের কাকতীয়রাজ প্রতাপ রুদ্র, দোরসমুদ্রের হোয়্সলরাজ তৃতীয় বল্লালকে পরাজিত করবার পর ভাতৃবিরোধের সুযোগ নিয়ে পান্ড্য রাজ্য দখল করেন।

জানা যায় এর পরে আলাউদ্দিন রামেশ্বরের দিকে মনোনিবেশ করেন। তবে তিনি দক্ষিন ভারতের রাজ্যগুলো সরাসরি অধিগ্রহন না করে সেখানকার রাজাদের আনুগত্য ও করদানের প্রতিশ্রুতি নিয়ে করদ রাজ্যে (কর ডাকে স্বীকৃত) পরিনত করেন। বিজেতা হিসেবে আলাউদ্দিন ছিলেন খিলজি বংশের রাজাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ।

উল্লেখ্য আলাউদ্দিনের খিলজির আমলে মোঙ্গলরা একাধিকবার দিল্লী আক্রমণ করে। ততকালীন মোঙ্গলদের ভয়ে ভারতীয় রাজারা তটস্থ থাকত। মোঙ্গল্রা ১২৯৬ থেকে ১৩০৮ সাল পর্যন্ত একাধিক সময়ে একাধিক রাজার অধিনে আক্রমণ করলেও সুবিধা করতে পারে নি। এর মদ্ধে উল্লেখযোগ্য জালান্ধার যুদ্ধে ১২৯৮ সালে ( Jalandhar ) , কিলি যুদ্ধে ১২৯৯ সালে ( Kili) পরাজিত হয়।

স্যার উলসলে হেগের মতে, তার আমলেই সুলতানী শাসনের সূত্রাপাত ঘটে এবং প্রথম দক্ষিন ভারতে সুলতানি বাহিনীর প্রবেশ ঘটে। সুলতান আলাউদ্দিন খিলজিকে অনেকে মুঘল সম্রাট আকব্রের সাথে তুলনা করলেও অনেকে আবার দ্বীমত পোষন করেন। কারন আকবরের রাজ্য বিস্তার নীতি আর আলাউদ্দিনের রাজ্যবিস্তার নীতি সম্পূর্ন আলাদা। আকবরের রাজ্য বিস্তার ছিল মহত নীতির অধিনে পক্ষান্তরে আলাউদ্দিনের এই রুপ নীতির বালাই ছিল না।

রাজ্য পরিচালনা

আলাউদ্দিনের রাজ্য পরিচালনাকে আমরা কয়েকটি আগে তুলে ধরতে পারি।

শক্তিশালী শাসন ব্যবস্থা

সাম্রাজ্যবাদি আলাউদ্দিন খিলজি  রাজ্য বিস্তারের সাথে সাথে প্রশাসনিক সংস্কারের দিকেও মনোনিবেশ করেন। অনেকেই তাকে স্বৈরশাসক হিসেবে অভিহিত করেন। তার শাসনকে শক্তিশালি করে তুলতে ক্ষমতাধর এক বিশাল সেনাবাহিনী গড়ে তুলেন।  তার পূর্বে কেউ ভারতীয় উপমহাদেশে এরুপ স্থায়ী সেনাবাহিনী গড়ে তুলে নি। তার ক্ষমতার দম্ভ প্রকাশ পায় তার উক্তিতে

” আমিই সেই সব নির্দেশ জারি করি, যা রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করে এবং জনগণের মঙ্গল সাধন হয় । আমি জানি না কোনটা বৈধ আর কোনটা অবৈধ । রাষ্ট্রের পক্ষে যা মঙ্গলজনক আমি তাই করি ।”

ফ্রান্সের রাজা চতুর্দশ লুইয়ের মতো তিনিও বলতে পারতেন, “রাষ্ট্র কী ? আমিই রাষ্ট্র ।” যা তিনি মুঘুসউদ্দিনকে বলেছিলেন। মুসলিম শাসক হলেও তিনি আলেম উলামাদের কোন পাত্তাই দিতেন না। তিনি অভিজাতদের সম্পদে আক্রমণ করে তাদের সমস্ত ভাতা বন্ধ করে দেন। আর যে সব জমি লিজ বা জায়গির দেওয়া ছিল সব বাজেয়াপ্ত করে রাজদরবারের খাস জমিতে পরিণত করেন।

বাজার নিয়ন্ত্রণ

আলাউদ্দিন খিলজি সিদ্ধ হস্তে বাজার ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করেন। তার বিশাল সেনাবাহিনীকে তিনি অল্প বেতনে দিতেন যদিও রেশনিং ব্যবস্থা চালু ছিল তার পরেও সৈনিকরা যাতে স্বল্প দামে ব্যবহার্য জিনিস পত্র কিন্তে পারে তার উদ্দেশেই ছিল এই বাজার ব্যবস্থা। ব্যবসায়ীরা যাতে বেশি মূল্যে দ্রব্য সামগ্রী বিক্রয় না করতে পারে সে উদ্দেশ্যে তিনি কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিলেন। এই দায়িত্ব প্রদান করা হয় “শাহানা-ই-মান্ডি  ও দেওয়ান-ই-রিসালাতের উপর। যদিও মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে তখনকার সমাজে ধারনা ছিল না তথাপি ধারনা করা হয় আলাউদ্দিনের বাজার নিয়ন্ত্রনের লক্ষ্য ছিল মূলত মুদ্রাস্ফীতি রোধ করা যাতে স্বল্প বেতনধারী সৈনিকেরা স্বল্প দামে দ্রব্য সামগ্রী ক্রয় করতে পারে এবং ব্যবসায়ীরা যাতে অতিরিক্ত মুনাফা অর্জন করতে না পারে।  আলাউদ্দিনের বাজার নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা সফল হয়েছিল এরফলে সৈনিকদের পাশাপাশি সাধারন মানুষও এর সুফল ভোগ করেছিল।

রাজস্ব সংস্কার

ভারত উপমহাদেশের সুলতানদের মধ্য থেকে তিনিই প্রথম ভুমি কর চালু করে রাজস্ব সংস্কার  করেন। অন্য দিকে তিনি জিজিয়া কর চালুন করেন বলে জানা যায়। জিজিয়া কর হল অমুসলিমদের উপর ধার্য্যকৃত ভুমি কর। জিজিয়া কর হিসেবে উনি  ৫০ % কর ধার্য্য করেন !

আইন-শৃংখলা

রাজ্যের শান্তি শৃংখলা দিকে তিনি মনোযোগ দেন। তার আমলে অপরাধীদের কঠোর সাজা প্রদান করা হত। দেশের শান্তি শৃংখলারোধে তিনি গুপ্তচর নিয়োগের মাধ্যমে সমস্ত খবর জোগাড় করতেন।

পদ্মাবতী ও আলাউদ্দিন বতর্ক

সঞ্জয় লীলা বানশালি নির্মিত ও দীপিকা পাড়ুকোন অভিনীত হিন্দি সিনেমা পদ্মাবতী নিয়ে  ভারতে চলছে তীব্র বিতর্ক।  রাজস্থান প্রদেশের রাজপুতানার হিন্দুত্ববাদী সংগঠন শ্রী রাজপুত কর্নি সেনা হুমকি দিয়েছে দীপিকা পাড়ুকোনের নাক কেটে নেওয়া হবে। এমনকি নির্মাতা বনশালীকে শারিরিকভাবে অপদস্ত করা হয়েছে বলে জানা যায়।

হিন্দু ধর্মীয় অনুভুতিতে আঘাত আনার অভিযোগে  ভারতের বর্তমান  ক্ষমতাসীন হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি এবং বিরোধী রাজনৈতিক দল কংগ্রেসও কর্ণি সেনার দাবির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করছে। রাজস্থান, বিহার এবং উত্তর প্রদেশের বেশ কয়েকটি সংগঠনও ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে এই বিষয়ে হস্তক্ষেপ গ্রহণের আহবান জানিয়েছে। তাদের অভিযোগ সিনেমাটি বিশেষভাবে রাজপুত সম্প্রদায়ের এবং সাধারণভাবে হিন্দুদের ধর্মীয় ভাবাবেগে আঘাত হেনেছে।

পদ্মাবতী

পদ্মাবতী সিনেমা

পদ্মাবতী সিনেমার  পেছনের ইতিহাস

পদ্মাবতী সিনেমাটি  তৈরি করা হয়েছে  হয়েছে মধ্যযুগের সুফি কবি মালিক মোহাম্মদ জায়সীর (জয়সী)  মহাকাব্য পদুমাবৎ এর গল্প অবলম্বনে। যে সময়টাতে পদ্মাবত সৃষ্টি করা হয় তখন  ভারতজুড়ে চলছিল ভক্তি আন্দোলনের জোয়ার। যে আন্দোলনের ফসল ছিল তুলসীদাস, সুরদাস এবং কবিরের মতো আরো শতশত সাধু-সন্তুদের আবির্ভাব।

পদুমাবৎ লোককাহিনীকে অনেকে ঐতিহাসিক খুব বেশি মূল্য দেন না  এই কারনে যে তাদের মতে এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট ও কাল্পনিক।  আলাউদ্দিন খিলজি চিতোর দুর্গে আক্রমণ করেন ১৩০৬ সালে এবং তার মৃ্ত্যু হয় ১৩১৬ সালে। আর  জায়সী তার পদ্মাবত মহাকাব্য রচনা করেছিলেন ১৫৪০ সালে। প্রায় ২২৪ বছর পরে  দিল্লি থেকে ৬৫০ কিলোমিটার দূরে অযোধ্যায় বসে যে লোক পদুমাবৎ  রচনাকরে  তার গল্প ইতিহাসবিধেরা কতটুকু বিশ্বাস করতে পারে তা অবশ্য পাঠকের কাছে প্রশ্ন রইল।

চলুন দেখে আসি কি ছিল সেই জয়সীর কাব্যে –

দক্ষিনের গুজরাট এবং মধ্যপ্রদেশ রাজ্যের সীমানায় রাজস্থানের মেওয়ার রাজ্য।  রাজা রাজপূত বংশের রাওয়াল রতন সিং। রাজার প্রথম  স্ত্রী  রানী নাগমতি। পার্শ্ববর্তি সিংঘাল রাজ্যের রাজকুমারী পদ্মাবতির  সৌন্দর্য্য দূর দূরান্তের রাজ্যে ছড়িয়ে কিংবদন্তী আকার ধারন করে। রাজকন্যা পদ্মাবতী  তখনকার  হিন্দু রাজবংশের ধারা অনুযায়ী স্বয়ংবরা পদ্ধতিতে বিবাহ করবেন  বলে ঘোষনা করেন । ( যে নারী নিজেই নিজের বর পছন্দ করে নেয় তাকে বলে স্বয়ংবরা)  স্বয়ংবরা পদ্ধতিতে রাজ্যের  রাজা রাজকুমারীর  বিয়ের ঘোষনা দিতেন,   তারপর  রীতিমত প্রতিযোগীতার মাধ্যমে রাজকুমারীর কাছে নিজ যোগ্যতা প্রমান করতে হত সম্ভাব্য  প্রতিযোগী রাজপুত্র ও রাজাদের । তার ভিত্তিতে রাজকুমারী নিজেই তার বর বেছে নিতেন। প্রথম রানী নাগমতি এবং নিজ মায়ের আপত্তি সত্ত্বেও রতন সিং স্বয়ংবরা প্রতিযোগীতায় আরেক রাজাকে পরাজিত করে রাজকুমারী পদ্মাবতিকে জিতে নেন, রানী হবার পর পদ্মাবতীর নাম হয় পদ্মিনী।

রাজা রতন সিং গুনের কদর করতেন, তাই  তার রাজসভায় স্থান পেয়েছিল বহু জ্ঞানী গুন সভাসদ। তাদের একজন বংশীবাদক রাঘব চেতন। সেই রাঘব চেতনের বিরুদ্ধে অভিযোগ পাওয়া গেল গোপন তন্ত্র সাধনার মাধ্যমে লোকজনের অনিষ্ঠ করার; অভিযোগের সত্যতাও পাওয়া গেল।  রাজা শাস্তি হিসেবে তাকে চুনকালি মাখিয়ে গাধার পিঠে করে রাজ্য থেকে বের করে দিলেন। আবার কেউ কেউ বলেন   পদ্মাবতির সাথে তার ঘনিষ্টতা দেখা যায় আর তা জানতে পেরে রাঘবকে হত্যার আদেশ দেন। কিন্তু রাঘব গোপনে পালিয়ে যায়।   এখান থেকেই শুরু হল এক অবিস্মরনীয় ঘটনার।

যে কারনেই রাঘবকে বিতারিত করা  হোক না কেন  রাঘব সেই অপমান সহজভাবে নিতে পারেনি, সে মনে মনে  পন করে বসল নির্মম প্রতিশোধ নেবার।  তার কুটিল মনে   এক ভয়াবহ পরিকল্পনা বাসা বাধে তাই  সে রওনা দিল দিল্লী অভিমুখে; বাঘের ওপর যেমন সিংহ  আছে তেমনি রাজার বড়ও বাদশাহ আছে। আলাউদ্দিন খিলজি তখন সেই রাজার উপর বাদশা।  দিল্লীর উপকন্ঠে এক  জংগলে তখন সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী দলবল সমেত শিকারে এসেছেন বলে রাঘব জনাতে পারে । রাঘব সুযোগ বুঝে জংগলের ভেতর কাছাকাছি মায়াবী সুরে বাঁশি বাজাতে থাকলো। তার পরিকল্পনাতে  ভুল হয়নি; সুলতান নিজেও গান বাজনা ভক্ত, তাই রাঘব চেতনের ডাক পড়ল সুলতানের তাবুতে। আলাউদ্দিন তার গুনে মুগ্ধ হয়ে তাকে রাজ দরবারে যোগ দিতে আহবান জানালেন। এটাই ছিল রাঘবের মূল উদ্দেশ্য ।

পালানোর সময় রাঘবকে নিজের একটি চুড়ি উপহার দিয়েছিলেন পদ্মাবতী। আলাউদ্দিন খিলজি ওই সুন্দর চুড়ি দেখে রাঘবকে সে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সুযোগ বুঝে সুলতানের কাছে রং চং চড়িয়ে রানী পদ্মবতীর ওই চুড়ির কথা বলতে গিয়েই রাঘব পদ্মাবতীর অসাধারণ রুপের বর্ণনা করে  যে  শুধু এমন রূপবতি মহিলা কেবল সুলতানের হেরেমেই সাজে।  আর তা শুনে আলাউদ্দিন খিলজি পদ্মাবতীকে পাওয়ার জন্য লালায়িত হয়ে ওঠেন । রাঘবের হিসেবে কোন  ভুল হয়নি, সুলতান আলাউদ্দিন সিদ্ধান্ত নিলেন মেওয়ার অভিযানের, বিশাল সৈন্যবাহিনী নিয়ে যাত্রা শুরু করলেন মেওয়ারের রাজধানী চিতোর অভিমুখে।

কিন্তু আলাউদ্দিন  চিতোরের কাছে এসে বুঝতে পারলেন কাজটা যতটা সহজ হবে ভেবেছিলেন  আসলে কাজটা  ততটা সহজ নয়। ছোটখাট পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ৭ম শতকে নির্মিত  চিতোর গড়ের কেল্লা এক দূর্ভেদ্য দূর্গ, সেটা বাইরে থেকে আক্রমন করে ধ্বংস করা সোজা কথা নয়। সুলতান খিলজি  আশ্রয় নিলেন এক কুট  কৌশলের।

রাজা রতন সিং এর কাছে দূত পাঠালেন। তার দূর্গ দখল কিংবা রাজ্যহরনের কোন মতলব নেই; তিনি কেবল রানী পদ্মিনী্কে বোনের মত দেখেন, তাকে এক পলক দেখেই চলে যাবেন। একজন রাজপুত নারীর জন্য এই প্রস্তাব ছিল অসম্মানজনক। তাদের প্রথা অনুযায়ী অচেনা ব্যক্তির সাথে দেখা করা নারীদের জন্য বারণ ছিল। রতন  সিং পড়ে গেলেন মহা চিন্তায় ; একদিকে মান ইজ্জতের প্রশ্ন, অন্যদিকে সুলতান আলাউদ্দিনের  বিশাল বাহিনীর হুমকি ও  রাজ্যের লোকজনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ।  চিতোরগড় দূর্ভেদ্য হলেও দূর্গ অবরোধ করে বসে থাকলে এক সময় না এক সময় সরাসরি লড়াই এ যেতেই হবে, বিশাল সুলতানি বাহিনীর সাথে  রতন সিং পারবে না । তাই রতন সিং  অনিচ্ছা সত্ত্বেও রাজী হল , এতে করে যদি প্রজাদের প্রানরক্ষা করা যায়। তবে  রানী পদ্মিনী বা পদ্মাবতি  শর্ত দিলেন যে তিনি সরাসরি সুলতানকে দেখা দেবেন না, সুলতান আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখবেন।

রাজ মহলে একটি রাজ কক্ষে কিছু আয়না এমনভাবে স্তাপন করা হল  যাতে সরাসরি সাক্ষাৎ না করেও  দূর থেকেই রানী নিজের প্রতিবিম্ব দেখাতে পারেন। পরিকল্পনা মত  রানী পদ্মিনীও তার মহলে আয়নায় দেখা দিলেন। সেই দেখাই হল চিতোরগড়ের জন্যে  কাল। এ যে কল্পনারও অতীত, সুলতান যা বর্ননা শুনে এসেছেন বাস্তবের রানী পদ্মিনী আর অনেক রুপবতি। একে ছাড়া সুলতানের চলবে না। কিন্তু এভাবে  রানীকে চাক্ষুস দেখার পর সুলতানের  বদ অভিপ্রায় আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে। যে করেই হোক পদ্মাবতীকে তার পেতেই হবে!

কেল্লা থেকে অতিথিদের বিদায় দিতে রাজা রতন সিং সৌজন্য বশতঃ সুলতানের সাথে কিছু পথ এগিয়ে দিতে এলেন।  সুলতান খিলজি  এটাকেই সুযোগ হিসেবে গ্রহন করে আচমকা রতন সিংকে বন্দী করে শিবিরে নিয়ে গেলেন। এবার  কেল্লায় খবর পাঠালেন কাল সকালের মধ্যে রানী পদ্মিনীকে তার শিবিরে পাঠাতে হবে এবং  পাঠিয়ে দিলে তিনি রাজা রতন সিংকে মুক্তি দেবেন এবং আর কারো কোন ক্ষতি না করে দিল্লী ফেরত যাবেন।

চিতোরগড় পড়ল মহাসংকটে। একদিকে রাজার প্রান অন্য দিকে অসম্মানজনক কু প্রস্থাব ! এই  সংকটে এগিয়ে এলেন রাজা রতন সিং এর দুই বীর সেনাপতি চাচা-ভাতিজা বাদল এবং গোরা। তারা একটি পরিকল্পনা করলেন , দূত মারফত সুলতানের শিবিরে খবর পাঠালেন যে তারা সুলতানের প্রস্তাবে রাজী, রানী পদ্মিনী পরদিন ভোরেই সুলতানের শিবিরে হাজির হবেন, কিন্তু রাজরানী বলে কথা, তিনি একা যেতে পারেন না, তার সাথে থাকবে আর দেড়শো সখী!

পরদিন ভোরে চিতোরগড়  কেল্লা থেকে রওনা হল পঞ্চাশ পালকীর বহর। দেড়শো সখী সহ  রানী পদ্মাবতি  চলেছেন সুলতানের শিবিরে নিজকে সমর্পন করে রাজা সিং এর জীবন রক্ষা করতে। আসলে সেসব পালকির ভেতর রানী বা সখী কেউই নেই; আছে সেনাপতি গোরা ও বাদলের নের্তৃত্বে বাছা বাছা সবচেয়ে দূর্ধষ দেড়শো রাজপূত যোদ্ধা। সুলতান খুশিতে এতটাই আত্মমগ্ন ছিলেন যেন  সুলতান শিবিরে পৌছে তারা অপ্রস্তুত সুলতান বাহিনীকে চমকে  ওঠারও  সময় দিল না, দ্রুততার সাথে সুলতানের দেহরক্ষীদের কচুকাটা করে হতবিহবল রাজা রতং সিংকে দ্রুত মুক্ত করে ফেলল।

এই অবস্থায় সুলতান প্রচন্ড ক্রোধ অনুভব করেন। তবে দুর্ভেদ্য চিতোরগড় হামলা করে দখল করা সম্ভব নয় বলে তারা অবরোধ করে রাখল। এক সময়  দূর্গের ভেতরের সরবরাহ ফুরিয়ে এলো, সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধ  ছাড়া আর গতি নেই। , যার ফলাফল অত্যন্ত পরিষ্কার, পুরুষরা সব হয় নিহত এবং বন্দী হয়ে দাসত্ব বরন; এবং মহিলাদের হতে হবে দাসী।

তখন  রাজপূত রাজপরিবারে্র মহিলাদের জন্য এ অবস্থায় জওহর নামক এক প্রথা প্রচলিত ছিল।  এই  প্রথা  অনুসারে মহিলারা শত্রুর  হাতে বেইজ্জত হবার চাইতে আত্মহনন করা শ্রেয় মনে করতেন। রাতের বেলা দূর্গের ভেতর বিশাল এক অগ্নিকুন্ড তৈরী করা হল। রাজপরিবারের সব মহিলারারা ধর্মীয় সঙ্গীত গেয়ে গেয়ে রানী পদ্মিনীর নের্তৃত্বে তাদের বিয়ের পোষাক ও গয়না পরে আগুনের দিকে এগিয়ে গেলেন  তবে সবার আগে ঝাঁপ দিলেন রানী পদ্মাবতী, এরপর একে একে  অন্য নারীরাও  শিশু সন্তানদের সহ সেই অগ্নিকুন্ডে ঝাঁপিয়ে আত্মহুতি দিলেন।   তাদের ভয়াবহ আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারি হয়ে ওঠল। চিতোরগড় দুর্গের ইতিহাসে এটাই প্রথম জওহরের ঘটনা।

জওহরব্রত

স্বজনহারা রাজপূত সৈনিককেরা এর পরে  আর বেঁচে থাকার তেমন মানে  খুজে পেল  না।  অবশেষে তারাও সাকা প্রথা (যুদ্ধ করতে করতে জীবন দেওয়া) পালনের জন্য তৈরী হয়ে গেল। পরদিন সকালে  রনসাজে সজ্জিত হয়ে তারা দূর্গ থেকে বের হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল সুলতানের বিশাল বাহিনীর সাথে সম্মুখ  যুদ্ধে ।  সুলতান আলাউদ্দিন খিলজী অবশেষে বিজয়ীর বেশে কেল্লায় প্রবেশ করলেন। কিন্তু যার মোহে পড়ে  তিনি এত লোকের হত্যার কারন হলেন  সে আগেই  মৃত্যুর কুলে  চলে গেছে। সুলতান বাহিনী কেল্লার ভেতর প্রবেশের পর তখনো জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ডে মহিলাদের পোড়া হাঁড়গোড় দেখতে পায়। কথিত আছে আলাউদ্দিন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে কেল্লায় আশ্রয় নেওয়া ৩০ হাজার রাজপূতকে হত্যা করে !

পদ্মাবতী উপাখ্যান বা মিথ ?

আলাউদ্দিনের মৃত্যুর পরে  ২২৪ বছর পরে ১৫৪০ খ্রিস্টাব্দে অযোধ্যায় বসে মালিক মোহম্মদ জয়সী (জায়সী) লেখেন পদ্মাবত বা পদুমাবৎ  ।  কেন এত বিতর্ক পদ্মাবৎকে নিয়ে ? আসুন একটু ইতিহাস  থেকে ঘুরে আসি।

পদ্মাবতকে নিয়ে লেখক জয়সী নিজেই বলেছেন ” আমি এই কাহিনী বানিয়েছি…’ এই কথা বলেই সুফী কবি জয়সী তার উপখ্যানের ইতি টেনেছেন । তাহলে কি এটি সরাসরি ইতিহাস নয়  ?  কারন তাহলে জয়সী কেন একে তার সৃষ্টি বলে অবিহিত করেছেন ?

আলাউদ্দিন খিলজির বিরুদ্ধে চিতোরগড়ে তাঁর যে  লড়াই পরিণত হয়েছিল লোককথায়  সেই কিংবদন্তিকে আশ্রয় করে মহাকাব্য লেখা হয় পদুমাবৎ !

আরো ১০০ বছর পরে আরাকানের রাজকবি আলাওল সেই উপাখ্যানকে  পদ্মাবতি নামে অনুবাদ করেন বিখ্যাত হয়েছিলেন ।

নোটঃ  আমি নিজে পদুমাবৎ পড়ি নি এবং আলাউদ্দিন খিলজি নিয়ে তেমন কোন অনলাইন রেফারেন্স খুজে পাই নি । তাই নানা ব্লগ , নিউজ সাইট, ইউটিউবের সাহায্যে এই আর্টিকেলের সৃষ্টি। একদম সত্য ইতিহাস কি সেটিও আমিও তুলে ধরতে পারছি না।

তথ্য সূত্রঃ  www.thefamouspeople.com/profiles/alauddin-khilji-6242.php, উইকিপিডিয়া,  বিভিন্ন ব্লগ ও নিউজ সাইট।

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক