সঠিক নিয়মে ইনহেলার ব্যবহার করছি কি?

অ্যাজমা বা হাঁপানি মূলত শ্বাসনালির প্রদাহজনিত একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ। হাঁপানি বলতে আমরা বুঝি শ্বাসনালিতে বায়ু চলাচলে বাধা সৃষ্টির জন্য হয় শ্বাসকষ্ট। সারা বিশ্বের প্রায় ১৫ কোটিরও বেশি মানুষ অ্যাজমা বা হাঁপানিতে আক্রান্ত হন। বাংলাদেশে প্রতি বছর ৫০ হাজার লোক এই রোগে আক্রান্ত হয়। মাত্র পাঁচ শতাংশ রোগী চিকিৎসা লাভ করে।

এই প্রদাহজনিত কারনে শ্বাসনালি ফুলে যায় এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে হাঁপানির বিভিন্ন উপসর্গ (যেমন— শ্বাস-কষ্ট, কাশি, বুকের মধ্যে শোঁ শোঁ শব্দ, বুকে চাপ অনুভূত হওয়া ইত্যাদি) দেখা যায়। সঠিক সময়ে ও নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহনের মাধ্যমে এসকল উপসর্গগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

হাঁপানি সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রন না করতে পারলে তা মারাত্মক হতে পারে এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। হাঁপানি নিয়ন্ত্রণে কোন কোন উপসর্গে রোগীর শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায় সে ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ সব রোগীর রোগের উপসর্গ কমা বা বাড়ার ব্যাপারে একই উত্তেজক দায়ী নয়।

অ্যাজমা একটি জটিল সমস্যা। হাঁপানি নিয়ে বিস্তারিত জানতে চাইলে এখানে ঢু মারতে পারেন। হাঁপানি বা অ্যাজমা পুরোপুরি নিরাময় হয় না, একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হয়। হাঁপানির চিকিৎসার বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহূত করা হয়, যেমন—রোগ নিরাময় ওষুধ, রোগ প্রতিরোধ বা বাধা দানকারী ওষুধ, ইনহেলার ইত্যাদি।  অ্যাজমা বা শ্বাসকষ্টের চিকিৎসায় ইনহেলার বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  এই আর্টিকেলে আমরা ধারাবাহিকভাবে ইনহেলার সংক্রান্ত নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করব।

সঠিকভাবে ইনহেলারের ব্যবহার

ইনহেলার এ্যাজমা রোগীর এমন একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যা কিনা রোগী শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে টেনে নেয় এবং ঔষুধ শ্বাসনালীতে পৌঁছায়,হাঁপানি রোগীদের অনেকেই মনে করেন, ইনহেলার হাঁপানির সর্বশেষ চিকিৎসা। ইনহেলার একবার ব্যবহার করলে পরে শ্বাসকষ্টের পরিমাণ কমানোর জন্য আর অন্য কোনো ওষুধ কাজে আসবে না।

জেনে রাখা ভালো, হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের প্রথম চিকিৎসা হচ্ছে ইনহেলার। ইনহেলার দিয়েই প্রথমে চিকিৎসা শুরু হয়। কারন ইনহেলার দেওয়ার দু-তিন মিনিটের মধ্যেই শ্বাসকষ্ট আর থাকে না। যদিও অনেকের ধারনা সর্বশেষ ওষুধ হিসেবে ইনহেলার ব্যাবহার করা হয় অর্থাৎ ট্যাবলেট, সিরাপ অথবা ক্যাপসুল সবই যখন ব্যর্থ তখন অ্যাজমার চিকিৎসায় ইনহেলার ব্যাবহার করা হয় কিন্তু কথাটা মোটেও সত্য নয়।

শ্বাসকষ্ট বিভিন্ন কারণে হতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা, সিওপিডি, কিডনি জনিত শ্বাসকষ্ট, হার্টের সমস্যার কারণে শ্বাসকষ্ট ইত্যাদি।  ইনহেলার সব শ্বাসকষ্টের মধ্যে ব্যবহার করা যাবে না। শুধু যদি ব্রঙ্কিয়াল অ্যাজমা হয়, তাহলে  ইনহেলার ব্যবহার করা হয় অথবা সিওপিডি যদি থাকে, সেখানেও ইনহেলার ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

আমাদের দেশে সাধারণত ৩ ধরনের শ্বাসের ওষুধ পাওয়া যায়-

মিটার ডোজ ইনহেলার বা পাফার

ড্রাই পাউডার ইনহেলার

নেবুলাইজার।

নানা রকমের ইনহেলারের মধ্যে একেকটির ব্যবহারবিধি একেক রকম। সঠিক নিয়মে ব্যবহার না করলে ইনহেলারের ওষুধ ঠিকমতো ফুসফুসে পৌঁছায় না এবং কাজও হয় না।

বেশির ভাগ মানুষ এখনো মিটার ডোজ ইনহেলার ব্যবহার করেন। মিটার ডোজ ইনহেলার বা পাফার জাতীয় ইনহেলারে ওষুধ উচ্চচাপে একটি ধাতব পাত্রে সংরক্ষণ করে রাখা হয়। এই জাতীয় ইনহেলারে চাপ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে হালকা কুয়াশার মতো ওষুধ তৈরি হয় যা রোগী নিঃশ্বাসের সঙ্গে ফুসফুসে টেনে নেয়।

প্রথমে ইনহেলারটি উল্টা করে ধরে ভালোভাবে ঝাঁকিয়ে নিন। তারপর মুখ বা ক্যাপটা খুলুন। আপনার চিবুকটি উঁচু করে সোজা সামনে তাকান।  ইনহেলার মুখে দেওয়ার আগে বড় একটা শ্বাস ছেড়ে দিন। ইনহেলারের সামনের অংশ মুখে পুরে নিয়ে ধীরে ধীরে শ্বাস নিতে শুরু করে একবার চাপ দিন। ইনহেলারের মাউথপিস দুই পাটি দাঁতের ভেতর স্থাপন করে ঠোঁট দিয়ে এমনভাবে চেপে ধরুন যাতে বাতাস বের হওয়ার জন্য কোনো ছিদ্র না থাকে।

গভীরভাবে শ্বাস টেনে স্প্রে করা ওষুধ পুরোটা ফুসফুসের মধ্যে টেনে নিন। খেয়ে ফেলবেন না। এবার ইনহেলার মুখ থেকে বের করে শ্বাসটা বুকে আটকে রাখুন ১০ সেকেন্ড, তারপর ছেড়ে দিন। ৩০ সেকেন্ড পর একই নিয়মে পরের পাফ বা স্প্রেটা নিন।  শ্বাস নেয়ার সময় মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়া জরুরি। শ্বাস যেভাবেই ফেলুন নাক, মুখ দিয়ে কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু একটা সমস্যা হল, সঠিক ভাবে ওষুধ শ্বাসের সঙ্গে নিতে না পারলে, কোন ধরণের উপকার তো হবেই না বরং ধীরে ধীরে আরও শ্বাসকষ্ট বেড়ে যাবে।

  • ইনহেলার ব্যবহার নিয়ে কোনও ভুল ধারণা, ভয় থাকলে ডাক্তারের সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন।

ড্রাই পাউডার ইনহেলার চাকতির মতো। জোরে শ্বাস ছেড়ে বুক খালি করে তারপর ইনহেলার মুখে পুরে পাউডারটা টেনে নিন। এ ক্ষেত্রে শ্বাস টেনে নিতে হবে জোরে আর দ্রুত। তারপর ইনহেলার বের করে মুখ বন্ধ অবস্থায় শ্বাসটা ধরে রাখুন ১০ সেকেন্ড।

নেবুলাইজার  হল একটি বিশেষ মেশিন যার ভেতর চাপযুক্ত বাতাস তরল ওষুধের ভেতর দিয়ে শিশির কণার মতো প্রবাহিত হয় । এ বাতাসের চাপে সূক্ষ্ম শিশির কণার মতো ওষুধের কুয়াশা তৈরি হয়- যা রোগী শ্বাসে টেনে নেয়। এই মেশিনগুলো সাধারণত ইলেকট্রিসিটি দিয়ে চলে, কিছু ক্ষেত্রে ব্যাটারি দ্বারা পরিচালিত হয়।

তবে মনে রাখা ভাল মেশিন একাধিক রোগী ব্যবহার করা উচিত নয়। সাধারণত আমাদের দেশে একই মেশিন একাধিক মানুষ ব্যবহার করে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই যেন মেশিন পরিষ্কার করে জীবাণুমুক্ত করে ব্যবহার করা হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে।

পরিষ্কার রাখা

ইনহেলার ব্যবহারের পর মাউথপিস পরিষ্কার কাপড় দিয়ে মুছে  ফেলতে হবে। পাফার থেকে ঠিকমতো ওষুধ বের হলে আর কোনো কিছু করার দরকার নেই। পাফারের মুখ বন্ধ হয়ে গেলে প্লাস্টিকের বাইরের আবরণটি ধাতব ক্যানিস্টার থেকে আলাদা করে পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে নিতে হবে। এরপর ঝেড়ে বাড়তি পানি ফেলে দিয়ে শুকিয়ে নিন। ধাতব ক্যানিস্টারটি কখনও ধুতে হবে না।

ইনহেলার ব্যবহারের করার সময় নিয়মিত বিরতিতে মাসে অন্তত ১ বার স্পেসারের অংশগুলো খুলে ফেলুন। এবার পানির সাথে হালকা গুড়া সাবান বা ডিটারজেন্ট পাউডার মিশিয়ে স্পেসারের অংশগুলো ধুয়ে ফেলুন।  কখনও ডিটারজেন্ট দিয়ে ধোয়ার পর শুকনা কাপড় দিয়ে স্পেসার মুছবেন না অথবা স্বাভাবিক পানি দিয়ে ধুয়ার প্রয়োজন নেই।

আবার যখন নেবুলাইজার ব্যবহার করা হয় তখন  প্রতিবার নেবুলাইজার ব্যবহারের পর মাউথপিস, ফেসমাস্ক এবং ওষুধ ধারন করা পাত্রটি ভালোভাবে ধুয়ে ফেলতে হবে। মেশিনটি সংরক্ষনের পূর্বে ধুয়ে ফেলা প্রতিটি অংশ যেন শুকানো হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।

কারন ভেজা বা পানিযুক্ত কোনো অংশ সংরক্ষণ করলে সেই পানির ভেতর রোগ জীবাণু বাসা বাঁধতে পারে।  এর ফলে  নেবুলাইজার ব্যবহার করার সময় শ্বাসে ওষুধ নেয়ার পর শ্বাসনালীতে বা ফুসফুসে নিউমোনিয়া বা ব্রংকাইটিস দেখা দিতে পারে।

এক্ষেত্রে জানা প্রয়োজন নেবুলাইজারের টিউবগুলো পানি দিয়ে পরিষ্কার করার প্রয়োজন নেই।  টিউবটি নেবুলাইজারে লাগিয়ে কিছুক্ষণ নেবুলাইজার মেশিন চালালে টিউবের ভেতর কোনো জলীয় বাষ্পের কণা বা ওষুধের কণা থাকলে বাতাসের প্রবাহে পরিষ্কার হয়ে যাবে। টিউবের রং পরিবর্তন হলে টিউব বদলে ফেলতে হবে।

আর  প্রতি সপ্তাহে অন্তত ১ বার নেবুলাইজারের ওষুধ পাত্রটি, মাউথপিস, ফেস মাস্ক একটা গামলা জাতীয় পাত্রে নিন। এরপর এই পাত্রে ১/২ পরিমাণ ভিনেগার ১/২ পানি দিয়ে কিছু সময় ভিজিয়ে রাখুন (১৫ মিনিট থেকে ৩০ মিনিট) তারপর ট্যাপের পানি দিয়ে ধুয়ে শুকিয়ে নিন।

নিয়মিত ব্যবহার করলে ৩ মাস পরপর নেবুলাইজার টিউব, নেবুলাইজারের ওষুধের পাত্র, ফেস মাস্ক বা মাউথ পিস বদলাতেহবে।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক