ইরাক ইরান যুদ্ধ আরব ইতিহাসে এক জ্বলন্ত অধ্যায়

বিশ্ব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ সমুহের মধ্যে ইরাক-ইরান যুদ্ধ অন্যতম। ইরাকের সাবেক শাসক সাদ্দামকে দিয়ে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সংঘঠিত দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধগুলোর মধ্যে একটি।  আশ্বর্য্যের ব্যাপার  হল  বিশ্বের ২৬টি দেশের সরকার এ যুদ্ধে ইরানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিল।

যুদ্ধের নামকরণ

উপসাগরীয় যুদ্ধ হিসেবে আমরা ইরাকের কুয়েত দখলকে জানলেও এর আগে ইরান ইরাকের যুদ্ধকেও উপসাগরীয় যুদ্ধ বলা হত। আবার কেউ কেউ পরে একে প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধ হিসেবে নামকরন করেন। আবার যুদ্ধের প্রথম দিকে সাদ্দাম একে “ঘুর্ণিবায়ুর যুদ্ধ” হিসেবে উল্লেখ করতেন।

ইরাক ইরান যুদ্ধের কারণ

ইরাক, যুদ্ধ শুরুর কারণ হিসেবে দক্ষিণ ইরাকে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী তারিক আজিজের হত্যা প্রচেষ্টার কথা উল্লেখ করে। ইরাক দাবি করে তাদের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে হত্যার পিছনে ইরানি এজেন্ট রা’ইয়ের হাত  ছিল।  ১৯৮০ সালের মার্চ মাসের মধ্যে দু’দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে । অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে ইরান ইরাক থেকে তার রাষ্ট্রদূত প্রত্যাহার করে নেয়। অন্য দিকে একই সাথে ইরান ইরাকী রাষ্ট্রদুতকে প্রত্যাহারের দাবি জানায়।

পররাষ্ট্র মন্ত্রী তারিক আজিজকে হত্যা প্রচেষ্টার তিনদিন পরেই এক নিহত ছাত্রের শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে পুনরায় হামলার ঘটনা ঘটে । এতও ইরাক ইরানকে দোষারুপ করে।  উল্লেখ্য সীমান্ত বিরোধ এবং ইরাকের অভ্যন্তরে শিয়া জঙ্গিদের ইরানি মদদ দেয়ার অভিযোগে এনে সাদ্দাম সরকার ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই অবৈধভাবে ইরানি ভূ-খন্ড আক্রমণ এবং অনুপ্রবেশ চালায়।  ১৯৭৯ সালে ঘটে যাওয়া ইরানি ইসলামি বিপ্লবের নাজুক অবস্থাকে ব্যবহার করে সাদ্দাম ইরাক যুদ্ধে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনের চেষ্টা করে। ইরাক বেশ কিছু কারনে ইরানের উপর যুদ্ধে চাপিয়ে দেয়। কারনগুলো ছিল

শাতিল আরব জলাধারঃ শাতিলআরব জলপথের নিয়ন্ত্রনের মাধ্যমে পারস্য উপসাগরে কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়। এটি ছিল মূলত ইরানের দখলে। চতুর সাদ্দাম বুঝতে পারে পারস্য উপসাগরে আমেরিকার তাবেদার হিসেবে এত দিন ইরানের রাজা থাকলে এই পদটি খালি হয়ে গিয়েছে। তাই পারস্য উপসাগরের দখল নিতে ইরাকের পাশে যথেষ্ট পানি বা সামদ্রিক সীমা থাকা প্রয়োজন।

আবু মুসা, গ্রেটার টুনব ও লেসার টুনবঃ ইরাক  সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষ থেকে ইরানের তিনটি দ্বীপ আবু মুসা, গ্রেটার টুনব এবং লেসার টুনব দখল করে নেয়।

খুজেস্তান প্রদেশ দখলঃ ইরাক ইরানের খুজেস্থান প্রদেশ দখল করে তাদের বলে ঘোষনা করে ।

ইসলামী সরকারকে উতখাত  করাঃ সদ্য ইসলামী বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা ইসালামী সরকারকেও উতখাত করা ছিল অন্য তম একটি কারন।

ইসলামী বিপ্লব রোধঃ মধ্য প্রাচ্যে যেন ইরানের মত ইসলামী বিপ্লব ছড়িয়ে না পড়ে সে জন্যেও ইরান আক্রমন জরুরি হয়ে পড়ে !

ইরাকী আগ্রাসন

নানা অজুহাতে ইরাকের বিমান বাহিনী  ১৯৮০ সালের ২২ সেপ্টেম্বর  ইরানের ১০ টি বিমানবাহিনী ঘাঁটির উপর অতর্কিত পূর্ণমাত্রার আক্রমণ চালায়। এই অতর্কিত আক্রমনে ইরানের বিমানঘাটিগুলো যতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে ইরাক বিশ্বাস করেছিল ততটা হয় নি।শুধুমাত্র অবকাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। খুব বেশি বিমান এই হামলায় অকেজো হয় নি।

পরের দিন সাদ্দাম বাহিনী ৬৪৪ কিলোমিটার সীমান্ত ফ্রন্ট জুড়ে ত্রিমুখী স্থল আক্রমণ পরিচালনা শুরু করে। ইরাকের স্থলবাহিনীর ৬ টি ডিভিশন প্রাথমিক আক্রমণে অংশ নেয়। এর মাঝে চারটি ডিভিশন ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমের প্রদেশ খুজেস্থান আক্রমোনে অংশগ্রহণ করে । ইরানের তেল সমৃদ্ধ খুজেস্থান প্রদেশ দখল করে ইরাক ভাবে এতে করে ইরান চরম্ভাবে বিপর্যস্ত হবে এবং তেহরানের ইসলামী সরকারের দ্রুত পতন ঘটবে। ইরাকি বাহিনী এই ধারনার উপর বিশ্বাস করে তীব্র আক্রমণ করে খুজেস্থান দখল করে নেয়।

আক্রমণের  ফলে  জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ একটি অনানুষ্ঠানিক  বিবৃতি প্রকাশ করে । প্রকাশিত ঐ  বিবৃতিতে বলা হয় উভয়পক্ষ যেন সামরিক পদক্ষেপসহ এমন সব পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকে যা চলমান বিপজ্জনক পরিস্থিতিকে আরো শোচনীয় করে তুলতে পারে। ঐ বিবৃতিতে  আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তা লঙ্ঘন ও জাতিসংঘের আইন লঙ্ঘনের জন্য এবং ইরানের ভূখণ্ডে আগ্রাসন চালানোর  ইরাকের নিন্দা করা হয়নি !  এমনকি ইরাকি সেনাদেরকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সীমানায় ফিরিয়ে নেয়ার কথাও বলা হয়নি ওই বিবৃতিতে !

ইরাকের হঠাত করে এই তরিগরি আক্রমনে ইরান প্রস্থত ছিল না। ফলে প্রথম দিকে ইরাকী বাহিনী শুরুতে সাফল্য পেতে থাকে। পরে বিভিন্ন স্থানে ইরানের নিয়মিত ও আধাসামরিক বাহিনীগুলো ইরাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলার চেষ্টা করে ।

ইরানী বিমানবাহিনী ইরাকী লক্ষবস্তুতে পাল্টা আক্রমন করে। অল্প কিছু দিনের মধ্যেই ইরানী বিমানবাহিনী  তাদের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে থাকে।

ইরাকের প্রচন্ড হামলার প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ  ১৯৮০ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে  বল প্রয়োগ থেকে বিরত থাকতে ও শান্তিপূর্ণ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্যে উপর দেশের প্রতি আমন্ত্রণ জানায়। ইরাক সরকার এ প্রস্থাব সাথে সাথে মেনে নিবে বলে জানালেও ইরান  তাদের মাটিতে ইরাকী সেনাদের আগ্রাসী তৎপরতা বন্ধ হবার আগ পর্যন্ত জাতিসংঘের ওই প্রস্তাব তেহরান মেনে নেবে না বলে জানিয়ে দেয়।

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধ শুরু হয়েছে বলে জানালেও ইরানের দৃষ্টিতে  কে এই যুদ্ধ শুরু করেছে তা নির্ধারণ করা হয় নি  এবং কে আগ্রাসী ও কে আগ্রাসনের শিকার –এ তিনটি মৌলিক বিষয়ে কিছুই উল্লেখ করা হয় নি বলে দাবি জানায়।  এই প্রেক্ষিতে  ইরান জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রস্তাবটির বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানায়। কিন্তু ইরানের এই প্রতিবাদের  মুখে পুনরায় জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ আরো কয়েকটি প্রস্তাব উত্থাপন করে । কিন্ত পরিতাপের বিষয় এই  প্রস্তাবেও ওই তিনটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিতই থেকে যায়!

চতুর সাদ্দাম ইতিমধ্যে নির্লজ্জের মত ইরানে উপর হামলাকে তাদের প্রতিরক্ষা পদক্ষেপ বলে বিশ্ব দরবারে প্রচারের চেষ্টা করে। অপর দিকে ইরান তাদের ভু খন্ডে ইরানের হামলাকে আগ্রাসন হিসেবে আখ্যায়িত করে করে এবং এই হামলা মোকাবেলাকে ইরানের প্রতিরক্ষার বৈধ অধিকার বলে ঘোষণা দেয়।  কিন্তু   জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো ইরানের এই অধিকারের ব্যাপারে দীর্ঘ ২২ মাস পর্যন্ত নীরব থাকে। এই সুযোগে সাদ্দাম ইরানের অভ্যন্তরে জবর দখলের চেষ্টা চলিয়ে যায়। প্রথম দিকে ইরানীরা প্রতিরোধ করতে না পারলেও ধীর ধীরে মোজাহিদরা প্রতিরোধ করতে থাকে । এক সময় ইরাকের দখলকৃত খুররম শহর মুক্ত করে ফেলে। এই খুররম শহরের মুক্তি যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। জানা যায় খুররম যুদ্ধে নারীরাও যুদ্ধে অগ্রনী ভুমিকা পালন করে।

খুররম শহরকে মুক্ত করার ঘটনা ইরানের অবস্থানকে ইরাকের চেয়ে শক্তিশালী করে দেয়। ফলে আগ্রাসী সাদ্দাম সরকার মারাত্মক সংকটের মুখে পড়ে যায়। সাদ্দাম দেশ বাইরে নাজেহাল অবস্থায় পড়ে । এতদিন সাহায্য করা আরব রাজা -বাদশারা সাময়িক সাদ্দামকে অর্থ সহায়তা প্রদান বন্ধ করে দেয়।

১৯৮৪ সালে ইরাক পারস্য উপসাগরে ইরানি ট্যাংকারের উপরে  হামলা করে  এবং খারাগ দ্বিপে অবস্থিত ইরানের তেল টার্মিনালে আক্রমন করে । এত করে শুরু হয় ট্যাংকার যুদ্ধ। ইরানের ট্যাংকারে আক্রমণের প্রতিবাদে ইরান কুয়েত থেকে ছেড়ে আসা ইরাকি ট্যাংকারগুলোতে আক্রমণ শুরু করে। এছাড়াও অন্য যে সব দেশ ইরাককে সহায়তা দিয়ে আসছিল তাদের ট্যাংকারেও আক্রমণ চালায়। ইরাক  প্রকাশ্যে ঘোষণা দেয় ইরান অভিমুখি বা ইরান থেকে ছেড়ে আসা সব ট্যাংকার তাদের আক্রমনের লক্ষ্য বস্তু হবে। এই ঘোষণার পিছনে ছিল সাদ্দামের চতুর পরিকল্পনা। সাদ্দাম ভেবেছিল এর পরে ইরান হরমুজ প্রণালী  বন্ধ করে দিবে। যেখানে  মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দিয়েছিল , হরমুজ প্রণালী বন্ধ হলে তারা ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধে জড়াবে । এ কারণে  ইরান  হরমুজ প্রণালী বন্ধের সিদ্ধান্ত থেকে দূরে থেকে কেবলমাত্র ইরাকী জাহাজের উপর আক্রমণ চালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়।

ইরান এক  পর্যায়ে ইরাকের উপর উপসাগরে নৌ-অবরোধ আরোপ করে।ইরানি ফ্রিগেটগুলো ইরাকের স্বার্থসংশ্লিষ্ট যে কোন দেশের জাহাজ থামিয়ে তল্লাশী করতে শুরু করে।

দীর্ঘ মেয়াদে সাদ্দাম যুদ্ধ পরিচালনা ব্যয় বহন করতে সক্ষম ছিল না । এই সমস্যা সমাধানে যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স , অস্ট্রেলিয়া, রাশিয়া, বেলজিয়াম,  উত্তর কোরিয়া, মিশর, চীন সহ অনেক আরব দেশ এগিয়ে আসে।

ইরান ইরাক যুদ্ধ পর্যালোচনা করে  বলা যায় সাদ্দাম  মূলত  বিশ্বের সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলোর হয়েই ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল। আর এ জন্য যুক্তরাষ্ট্র, ফ্যান্স, রাশিয়া, ইটালি সহ অনেক দেশ ইরাককে বহু ক্ষেপণাস্ত্র ও রাসায়নিক অস্ত্র দিয়েছিল এবং পরমাণু অস্ত্র দেয়ারও উদ্যোগ নেয়। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের পরাশক্তিগুলোর দেয়া এইসব অস্ত্র ইরানের বেসামরিক নাগরিকদের ওপরও ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বেসামরিক জনগণের ওপর গণহত্যা চালিয়েও এই সাম্রাজ্যবাদী  পরাশক্তি যুদ্ধে জয়ী হতে পারেনি ও নতজানু করতে পারেনি বিপ্লবী ইরানি জাতিকে।

অবশেষে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় ১৯৮৮ সালের আগস্টে যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে  ইরাক ইরান যুদ্ধের  অবসান ঘটে।

ইরাক ইরান যুদ্ধের অবসান হলেও এর দীর্ঘ মেয়াদি প্রতিক্রিয়া হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের এর  সুদূর প্রসারী প্রভাব পড়ে। তেল অস্ত্রের নামে সাদ্দাম সরকারের পতনও এই যুদ্ধের দীর্ঘ মেয়াদী ফল !

ইরানের কাছে এ যুদ্ধ ছিল অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধ, অন্যদিকে ইরাকের সাদ্দাম হোসেন এ যুদ্ধকে ব্যাটল অব ক্বাদেসিইয়া নামে অভিহিত করতেন।

তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও নানা অনলাইন পোর্টাল।

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক