ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরঃ একজন সমাজ সংস্কারক ও সাহিত্যিক

বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর । বাংলালিপি প্রথম সংস্কার করেন তিনিই। ছিলেন বাঙালি শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও প্রাবন্ধিকও। ঈশ্বরচন্দ্রের নাম শুনেন নি এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর । এপার বাংলা ও ওপার বাংলা উভয় বাংলায় তিনি সমান জনপ্রিয় একজন ব্যক্তিত্ব।  তার শিক্ষা সম্পর্কিত উদ্দ্যোগগুলো তাকে জনপ্রিয়তার শিখরে পৌঁছে দেয়। রাজা রাম মোহন রায় উপমহাদেশে যে শিক্ষা সংস্কারের সূচনা করেছিলেন সেটির ধারাবাহিকতায় ঈশ্বর চন্দ্র সেটিকে অনেক দূরে এগিয়ে নিয়ে চলেন।

জন্ম  ও বংশ পরিচয়

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর (বাংলা ১২২৭ বঙ্গাব্দের ১২ আশ্বিন) পশ্চিমবঙ্গের মেদিনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামে।  তাঁর পিতার নাম ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও মাতার নাম ভগবতী দেবী । ঈশ্বরচন্দের নাম রাখেন তার পিতামহ রামজয় তর্কভূষণ। তিনি ছিলেন সুপণ্ডিত ও বলিষ্ঠ দৃঢ়চেতা একজন পুরুষ।

পণ্ডিত হিসাবে রামজয়ের সুনাম থাকলেও, তিনি ছিলেন অত্যন্ত দরিদ্র । ভাইদের সাথে  বনিবনা না হওয়ায়  রামজয় গৃহত্যাগ করেন, তাঁর স্ত্রী দুর্গাদেবী (বিদ্যাসাগরের পিতামহী) পুত্রকন্যা নিয়ে দুরবস্থায় পড়েন এবং তিনি তাঁর পিতার বাড়ি বীরসিংহ গ্রামে চলে আসেন। এই কারণে বীরসিংহ গ্রাম বিদ্যাসাগরের মামার বাড়ি হলেও পরে সেটাই তাঁর নিজ গ্রামে পরিণত হয়।

আর্থিক অসুবিধার কারণে ঠাকুরদাস কৈশোরেই উপার্জনের জন্য কলকাতায় চলে আসেন এবং সেখানে তিনি অতি সামান্য বেতনে চাকুরি গ্রহণ করেন । ঈশ্বর চন্দ্রের পিতা কলকাতা শহরে চাকরি করলেও পরিবার থাকত গ্রামেই। কারন শহরে পরিবার নিয়ে ব্যয়সংকুলান করা ছিল তার সাধ্যের বাইরে।

শিক্ষাজীবন

পাঁচ বছর বয়সে ঠাকুরদাস তার ছেলে  ঈশ্বরচন্দ্রকে গ্রামের সনাতন বিশ্বাসের পাঠশালায় ভর্তি করিয়ে দেন। কিন্ত দেখা গেল বিদ্যাসাগর সনাতন বিশ্বাস ছেলেদের উপর অতিরিক্ত শাস্তি প্রদান করতেন ফলে বিদ্যাসাগরের দাদার উদ্যোগে পার্শ্ববর্তি  গ্রামের কালীকান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালায় ভর্তি  করিয়ে দেওয়া হয়। তাঁর চোখে কালীকান্ত ছিলেন আদর্শ শিক্ষক।  এই পাঠশালায় তিনি সেকালের প্রচলিত বাংলা শিক্ষা লাভ করেছিলেন।

১৮২৮ খ্রিষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে কালী কান্ত চট্টোপাধ্যায়ের পাঠশালার পাঠ চুকিয়ে বিদ্যাসাগর উচ্চশিক্ষার জন্য তাঁর পিতার সঙ্গে কলকাতায়  চলে আসেন। কথিত আছে,  পায়ে হেটে মেদিনীপুর থেকে কলকাতায় আসার সময় পথের ধারে মাইলফলকে ইংরেজি সংখ্যাগুলি দেখে  খুব সহজেই সংখ্যাগুলো শিখে ফেলেন।

এই সময় ঠাকুরদাস এবং বিদ্যাসাগর কলকাতার বড়বাজার অঞ্চলের বিখ্যাত সিংহ পরিবারে আশ্রয় নেন। ১৮২৯ খ্রিষ্টাব্দের ১ জুন সোমবার ১৮২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত কলকাতা গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণের তৃতীয় শ্রেণীতে তিনি ভর্তি হন। এই কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন মুক্তারাম বিদ্যাবাগীশ ও নদিয়া নিবাসী মদনমোহন তর্কালঙ্কার।

ঈশ্বরচন্দ্র ১৮৩০ সালে একই কলেজের ইংরেজী শ্রেনীতেও ভর্তি হন।  অপরিসীম অধ্যবসায় ও নিষ্ঠার সঙ্গে পড়াশুনা করে ১৮৩১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য মাসিক পাঁচ টাকা হারে বৃত্তি পান এবং ‘আউট স্টুডেন্ট’ হিসেবে একটি ব্যাকরণ গ্রন্থ ও আট টাকা উপহার পান। তাঁর পাঠানুরাগের কাহিনী কিংবদন্তী হয়ে আছে। তেলের অভাবে ঘরে আলো জ্বালাতে পারতেন  না বলে পথের পাশে জ্বালানো গ্যাসের বাতির নিচে দাঁড়িয়ে পড়াশোনা করতেন। তিনি গভীর রাত পর্যন্ত এভাবেই পথের পাশে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে প্রতিদিন পড়া তৈরি করতেন। এমনি অবিরাম কষ্টের মধ্যেই তাঁকে স্কুলের পড়াশোনা চালাতে হয়েছিল।

সংস্কৃত কলেজে ব্যাকরণ শ্রেণীর পাঠ কৃতিত্বের সাথে শেষ করে ঈশ্বরচন্দ্র ইংরেজী শ্রেণীর পড়া শুরু করেন। ১৮৩৩ সালে ‘পে স্টুডেন্ট’ হিসেবেও ঈশ্বরচন্দ্র ২ টাকা পেয়েছিলেন। ১৮৩৪ সালে ইংরেজি ষষ্ঠশ্রেণীর ছাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বার্ষিক পরীক্ষায় কৃতিত্বের জন্য ৫ টাকা মূল্যের পুস্তক পারিতোষিক হিসেবে পান। এই বছরই ক্ষীরপাই নিবাসী শত্রুঘ্ন ভট্টাচার্যের কন্যা দীনময়ী দেবীর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়। ১৮৩৩ থেকে ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে সাহিত্য শ্রেণীর পাঠ সমাপ্ত করেন। এই সময় তিনি শিক্ষক হিসাবে পেয়েছিলেন বিশিষ্ট পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার। সংস্কৃত কলেজে বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অধিকার করে পুনরায় কৃতিত্বের পরিচয় দেন।

১৮৩৫ সালে বিদ্যাসাগর অলঙ্কার শ্রেণীতে ভর্তি হন।অলংকার শাস্ত্র একটি অত্যন্ত কঠিন বিষয়। কিন্তু এক বছরের মধ্যেই তিনি সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশ ও রসগঙ্গাধর প্রভৃতি অলংকার গ্রন্থে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। এই শ্রেণীতে তিনি এক বছর পড়াশুনা করেন।  এখানে তিনি শিক্ষক হিসাবে পান পণ্ডিত প্রেমচাঁদ তর্কবাগীশকে। ফাইনাল পরীক্ষায় প্রথম হয়ে প্রচুর সুনাম অর্জন ও পুরস্কার লাভ করেন।

এরপর তিনি বেদান্ত শ্রেণীতে ভর্তি হন। সেই শ্রেণীতেও তিনি কৃতিত্বের পরিচয় দেন। ১৯৩৫-৩৬ বৎসরের বাৎসরিক পরীক্ষায় তিনি সর্বোচ্চ সংখ্যক নম্বর পেয়ে উত্তীর্ণ হবার কারণে তিনি কলেজ থেকে রঘুবংশম্, সাহিত্য দর্পণ, কাব্যপ্রকাশ, রত্নাবলী, মালতী মাধব, উত্তর রামচরিত, মুদ্রারাক্ষস, বিক্রমোর্বশী ও মৃচ্ছকটিক গ্রন্থসমূহ উপহার পান।  ১৮৩৭ সালের মে মাসে তাঁর ও মদনমোহনের মাসিক বৃত্তি বেড়ে হয় আট টাকা।

তারপর ভর্তি হন স্মৃতি শ্রেণীতে।  সেই যুগে স্মৃতি পড়তে হলে আগে বেদান্ত ও ন্যায়দর্শন পড়তে হত। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্রের মেধায় সন্তুষ্ট কর্তৃপক্ষ তাঁকে সরাসরি স্মৃতি শ্রেণীতে ভর্তি নেন। এই শ্রেণীতেও তিনি অসাধারণ সাফল্য দেখান। সংস্কৃত কলেজে একাধিক্রমে বার বছর অধ্যয়ন করে ব্যাকরণ, কাব্য, অলঙ্কার, বেদান্ত, স্মৃতি, ন্যায় এবং জ্যোতিষ শাস্ত্রে পাণ্ডিত্য অর্জন করেন।

এসময়  ত্রিপুরায় জেলা জজ পণ্ডিতের পদ পেয়েও পিতার অনুরোধে, তা প্রত্যাখ্যান করে ভর্তি হন বেদান্ত শ্রেণীতে। ১৮৩৮ সালে সমাপ্ত করেন বেদান্ত পাঠ। ১৮৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ২২ এপ্রিল মাসে হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষা দেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই পরীক্ষাতেও যথারীতি কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হয়ে, ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি পান, তাতেই প্রথম তাঁর নামের সঙ্গে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিটি ব্যবহৃত হয়।

এই প্রশংসাপত্রটি ছিল নিম্নরূপ :

HINDOO LAW COMMITTEE OF EXAMINATION
We hereby certify that at an Examination held at the Presidency of Fort William on the 22nd Twenty-second April 1839 by the Committee appointed under the provisions of Regulation XI 1826 Issur Chandra Vidyasagar was found and declared to be qualified by his eminent knowledge of the Hindoo Law to hold the office of Hindoo Law officer in any of the Established Courts of Judicature.
H.T. Prinsep
President
J.W.J. Ousely
Member of the Committee of Examination

This Certificate has been granted to the said Issur Chandra Vidyasagar under the seal of the committee. This 16th Sixteenth day of May in the year 1839 Corresponding with the 3rd Third Joistha 1761 Shukavda.
J.C.C. Sutherland
Secy To the Committee

(পুরনো বানান অপরিবর্তিত)

সংস্কৃতে শ্রেষ্ঠ গদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা পুরস্কারও পেয়েছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র। ১৮৪০-৪১ সালে ন্যায় শ্রেণীতে পঠনপাঠন করেন ঈশ্বরচন্দ্র। এই শ্রেণীতে দ্বিতীয় বার্ষিক পরীক্ষায় একাধিক বিষয়ে তিনি পারিতোষিক পান। ন্যায় পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে ১০০ টাকা, পদ্য রচনার জন্য ১০০ টাকা, দেবনাগরী হস্তাক্ষরের জন্য ৮ টাকা ও বাংলায় কোম্পানির রেগুলেশন বিষয়ক পরীক্ষায় ২৫ টাকা – সর্বসাকুল্যে ২৩৩ টাকা পারিতোষিক পেয়েছিলেন।

সংস্কৃত কলেজে বারো বছর পাঁচ মাস অধ্যয়নের পর তিনি এই কলেজ থেকে অপর একটি প্রশংসাপত্র লাভ করেন। ১৮৪১ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রাপ্ত দেবনাগরী হরফে লিখিত এই সংস্কৃত প্রশংসাপত্রে কলেজের অধ্যাপকগণ ঈশ্বরচন্দ্রকে ‘বিদ্যাসাগর’ নামে অভিহিত করেন। প্রশংসাপত্রটি নিম্নরূপ:

অস্মাভিঃ শ্রীঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরায় প্রশংসাপত্রং দীয়তে। অসৌ কলকাতায়াং শ্রীযুত কোম্পানী সংস্থাপিত বিদ্যামন্দিরে ১২ দ্বাদশ বৎসরান্ ৫ পঞ্চমাসাংশ্চোপস্থায়াধোলিখিত শাস্ত্রান্য ধীতবান্
ব্যাকরণম্… শ্রীগঙ্গাধর শর্ম্মভিঃ
কাম্যশাস্ত্রম্… শ্রীজয়গোপাল শর্ম্মভিঃ
অলঙ্কারশাস্ত্রম্… শ্রীপ্রেমচন্দ্র শর্ম্মভিঃ
বেদান্তশাস্ত্রম্… শ্রীশম্ভুচন্দ্র শর্ম্মভিঃ
ন্যায়শাস্ত্রম্… শ্রীজয়নারায়ণ শর্ম্মভিঃ
জ্যোতিঃশাস্ত্রম্… শ্রীযোগধ্যান শর্ম্মভিঃ
ধর্মশাস্ত্রম্… শ্রীশম্ভুচন্দ্র শর্ম্মভিঃ
সুশীলতয়োপস্থিতস্বৈত স্বৈতেষু শাস্ত্রেষু সমীচীনা ব্যুৎপত্তিরজনিষ্ট।
১৭৬৩ এতচ্ছকাব্দীয় সৌরমার্গশীর্ষস্য বিংশতি দিবসীয়ম্।
Rasamoy Dutt. Secretary.
10 Decr 1841.

কর্মজীবন

১৮৪১ সালে পড়াশোনা শেষ করে  সেই বছরই ২৯ ডিসেম্বর মাত্র একুশ বছর বয়সে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান পণ্ডিত হিসেবে যোগ দেন। এ সময় তার বেতন নির্ধারিত হয় মাসিক ৫০ টাকা হারে। তিনি একই সাথে বিদ্যালয় পরিদর্শকের দায়িত্বও পালন করতেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পক্ষে এত অল্পবয়সে এমন গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করা সম্ভব ছিল না। ঐ কলেজের সেক্রেটারী মি. জি.টি মার্শাল এর ঐকান্তিক আগ্রহ, চেষ্টা ও বিশেষ সুপারিশে সেটা সম্ভব হয়েছিল। ১৮৪৬ সালের ৫ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি এই পদের দায়িত্বে ছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের রামমাণিক্য বিদ্যালঙ্কারের মৃত্যুতে একটি পদ শূন্য হলে, তিনি ১৮৪৬ খ্রিষ্টাব্দের ৬ এপ্রিল সংস্কৃত কলেজের সহকারী সম্পাদক হিসাবে যোগদান করেন। তখন তাঁর বয়স ছিল মাত্র পঁচিশ বছর।  সেই সময় ঐ কলেজের সেক্রেটারী ছিলেন রসময় দত্ত।  কিন্তু কলেজ পরিচালনার ব্যাপারে সেক্রেটারি রসময় দত্তের সঙ্গে মতান্তর হওয়ায় তিনি ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ জুলাই তারিখে সংস্কৃত কলেজের সম্পাদকের পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

এই মতবিরোধের কারণেই তিনি সংস্কৃত কলেজ থেকে পদত্যাগ করে ১৮৪৭ সালের ১৬ জুলাই ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে প্রত্যাবর্তন করেন।মাসিক ৮০ টাকা বেতনে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজে হেডরাইটার ও কোষাধ্যক্ষ পদে যোগদান করেন।

১৮৪৭ সালে সংস্কৃত প্রেস ডিপজিটরি নামে একটি বইয়ের দোকান স্থাপন করেন । এই বছরই এপ্রিল মাসে প্রকাশিত হয় হিন্দি বেতাল পচ্চিসী অবলম্বনে রচিত তাঁর প্রথম গ্রন্থ বেতাল পঞ্চবিংশতি। একদিকে বন্ধু মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সাথে মিলে  সংস্কৃত যন্ত্র নামে আর একটি একটি ছাপাখানাও স্থাপন করেন তিনি। বিদ্যাসাগর এই বছরই অন্নদামঙ্গল কাব্যের পান্ডুলিপি সংগ্রহের জন্য নদিয়ার কৃষ্ণনগরে আসেন । কৃষ্ণনগর রাজবাড়িতে সংরক্ষিত মূল গ্রন্থের পাঠ অনুসারে দুই খণ্ডে অন্নদামঙ্গল সম্পাদনা করেন। এই বইটিই সংস্কৃত যন্ত্র প্রেসের প্রথম মুদ্রিত গ্রন্থ।

১৮৪৯ সালে মার্শম্যানের হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল অবলম্বনে রচনা করেন বাঙ্গালার ইতিহাস দ্বিতীয় ভাগ বইটি ।

এদিকে, সংস্কৃত কলেজ কর্তৃপক্ষ কিছুদিনের মধ্যেই তাদের ভুল বুঝতে পারে। তারা আবার বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজে ফিরে যাবার অনুরোধ করেন। সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার ও কলেজের পুনর্গঠনের বিষয়ে তাঁকে অবাধ সুযোগ দেওয়া হবে এই শর্তে তিনি পুনরায় ১৮৫০ সালের ডিসেম্বর মাসে কলেজের সাহিত্য সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
১৮৫১ সালের ২২ জানুয়ারি তিনি নবসৃষ্ট অধ্যক্ষ পদে নিযুক্ত হন। এক সময় তার বেতন ধরা হয় ১৫০ টাকা।  এরপর তিনি সংস্কৃত কলেজের শিক্ষা ব্যবস্থার ব্যাপক  পরিবর্তন আনেন । ইংরেজী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করেন।

১৮৫৫ সালে ১ মে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ছাড়াও মাসিক অতিরিক্ত ২০০ টাকা বেতনে দক্ষিণবঙ্গে সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শকের পদে নিযুক্ত হন।

১৮৫৭ সালের ২৪ জানুয়ারি স্থাপিত হয় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনা সমিতির অন্যতম সদস্য তথা ফেলো মনোনীত হন বিদ্যাসাগর মহাশয়। উল্লেখ্য এই সমিতির ৩৯ জন সদস্যের মধ্যে মাত্র ছয় জন ছিলেন ভারতীয়।

১৮৫৮ সালের ৩ নভেম্বর শিক্ষা বিভাগের অধিকর্তার সঙ্গে মতবিরোধ হলে তিনি সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের পদ ত্যাগ করেন। প্রায় ৩৯ বছর বয়সে সরকারের সঙ্গে তাঁর সকল সম্পর্ক ছিন্ন হয়। যদিও নিজের কাজের জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনও রূপ স্বীকৃতি বা পেনসন তিনি পাননি।

১৮৬৩ খ্রিষ্টাব্দে সরকার তাঁকে ওয়ার্ডস ইনস্টিটিউশনের পরিদর্শক নিযুক্ত করেন।

সমাজ সংস্কার ও শিক্ষা বিস্তারে অবদান

সাহিত্যকর্ম ও সমাজসংস্কারের পাশাপাশি শিক্ষাবিস্তারেও তাঁর অশেষ অবদান রয়েছে। সংস্কৃত শিক্ষার সংস্কার, বাংলা শিক্ষার ভিত্তি  স্থাপন এবং স্ত্রীশিক্ষার পত্তন ও প্রসারে তাঁর প্রয়াস এক অক্ষয় কীর্তি। তিনি শিক্ষাবিস্তারে বহু স্কু-কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন।

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে বন্ধু ও হিতৈষীদের সহযোগিতায় সমাজ সংস্কার আন্দোলনের লক্ষ্যে স্থাপনা করেন ‘সর্ব্বশুভকরী সভা’। ১৮৫০ খ্রিষ্টাব্দের আগস্ট মাসে মদনমোহন তর্কালঙ্কারের সহযোগিতায় তিনি সর্ব্বশুভকরী নামক পত্রিকা প্রকাশ করেন। এর প্রথম সংখ্যায় বাল্যবিবাহের দোষ নামে একটি বাংলা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়।

১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দে দেশীয় কয়েকজন ধনী ও শিক্ষিত  লোকের সহায়তায় এবং বেথুন সাহেবের উদ্যোগে কোলকাতায় স্ত্রীশিক্ষা বিস্তারের সূত্রপাত হয়। ছোটলাট ফ্রেডারিক হ্যালিডে সাহেবের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি মেদিনীপুর, বর্ধমান, হুগলি এবং নদীয়া জেলায় নানাস্থানে অনেকগুলো বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করে স্ত্রীশিক্ষা প্রসারে অবদান রাখেন।

তিনি হিন্দু বালিকা বিদ্যালয় তৈরি করেন, যাকে পরবর্তীতে বেথুন কলেজ নামকরণ করা হয়। নারীদের শিক্ষার দিকে আনার জন্য তিনি একটি অর্থায়নের ব্যবস্থা করেন, যা নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠা ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত ছিল। এখান থেকে মেয়েদের শিক্ষার জন্য যাবতীয় অর্থের ব্যবস্থা করা হতো।

১৮৫৩ সালে জন্মভূমি বীরসিংহ গ্রামে স্থাপন করেন অবৈতনিক বিদ্যালয়। সেপ্টেম্বর মাসে বারাণসীর সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ জেমস আর ব্যালানটাইন সংস্কৃত কলেজ পরিদর্শন করে যে রিপোর্ট দেন, তার মতামত সমালোচনা করে শিক্ষা সংসদে একটি রিপোর্ট দেন বিদ্যাসাগর । বাংলার শিক্ষার ইতিহাসে এই রিপোর্ট এক যুগান্তকারী দলিল হিসেবে ধরা হয়।

১৮৫৪ সালের জানুয়ারি মাসে ইংরেজ সিভিলিয়ানদের প্রাচ্য ভাষা শিক্ষা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ ভেঙে বোর্ড অফ একজামিনার্স গঠিত হলে তার সদস্য মনোনীত হন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।

১৮৫৪ সালে চার্লস উডের শিক্ষা সনদ গৃহীত হওয়ার পর সরকার গ্রামীণ এলাকায় শিক্ষা সম্প্রসারণের সিদ্ধান্ত নেয়  । এ উদ্দেশ্যে ১৮৫৫ সালের মে মাসে বিদ্যাসাগরকে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ পদের অতিরিক্ত সহকারী স্কুল পরিদর্শকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। আর তখনই তিনি নদীয়া, বর্ধমান, হুগলি ও মেদিনীপুর জেলায় স্কুুল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। দুবছরের মধ্যে তিনি কুড়িটি স্কুুল স্থাপন করেন। এ ছাড়া তিনি এসব স্কুুলে পড়ানোর জন্য, শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য একটি নর্মাল স্কুুল স্থাপন করেন।

এই বছর নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে হুগলি জেলায় সাতটি ও বর্ধমান জেলায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন। পরের বছর জানুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে হুগলিতে আরও তেরোটি, বর্ধমানে দশটি, মেদিনীপুরে তিনটি ও নদিয়ায় একটি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেন।

১৮৫৭ সালের নভেম্বর মাস থেকে ১৮৫৮ সালের মে মাস অবধি সমগ্র দক্ষিণবঙ্গে বিদ্যাসাগর ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করেছিলেন।

সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্বে থাকাকালে তিনি কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার সাধন করেন।  সেই প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ থাকাকালীন তিনি সেখানকার প্রশাসন এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন আনেন সেগুলো তার আগে আর কেউ কখনও করেনি। সংস্কৃত কলেজে থাকাকালীন তিনি এমন একটি কাজ করেন যার জন্যে দরকার প্রচন্ড মানসিক শক্তি আর মানুষের সাথে যুক্তি খন্ডনের অদম্য ইচ্ছা। তিনি সংস্কৃত কলেজ সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেন, যেখানে পূর্বে শুধু হিন্দু ধর্মালম্বীরা পড়াশোনা করতে পারত। তিনি কোনো ধর্ম, জাতিবিদ্বেষ এবং কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় মতাদর্শের ব্যক্তিত্বের জন্য সেখানে পড়াশোনা  যাতে বাধা সৃষ্টি করতে না পারে সে ব্যবস্থা করে দেন।

১৮৫৯ সালে তিনি “ক্যালকাটা ট্রেনিং স্কুল” স্থাপনে বিশেষ ভুমিকা পালন করেন। ১৮৬৪ সালে এই প্রতিষ্ঠানের নাম রাখা হয় “হিন্দু মেট্রেপলিটন ইসস্টিটিউট”। বিদ্যাসাগর হন এর সেক্রেটারী। ১৮৭২ সালে এটিকে দ্বিতীয় শ্রেণীর এবং ১৮৭৯ সালে প্রথম শ্রেণীর কলেজে পরিণত করা হয়। বর্তমানে এর নাম “বিদ্যাসাগর কলেজ”।

১৮৫৮ সালের ১৫ নভেম্বর প্রকাশিত হয় সোমপ্রকাশ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা। এই পত্রিকা প্রকাশের পরিকল্পনার নেপথ্যে বিদ্যাসাগর মহাশয়ের যথেষ্ট অবদান ছিল। দেশীয় ভাষায় প্রকাশিত এটিই প্রথম পত্রিকা যাতে রাজনৈতিক বিষয় স্থান পেয়েছিল।

১৮৫৯ সালের ১ এপ্রিল পাইকপাড়ার রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় মুর্শিদাবাদের কান্দিতে বিদ্যাসাগর মহাশয় প্রতিষ্ঠা করেন ইংরেজি-বাংলা স্কুল। কিছুকাল এই প্রতিষ্ঠানের অবৈতনিক তত্ত্বাবধায়কও ছিলেন তিনি। ২৯ সেপ্টেম্বর গণশিক্ষার প্রসারে সরকারি অনুদানের জন্য বাংলার গভর্নরের নিকট আবেদন করেন।

১৮৬৭ সালের জুলাই মাসে জ্যেষ্ঠা কন্যা হেমলতার সঙ্গে গোপালচন্দ্র সমাজপতির বিবাহ হয়। এবছর অনাসৃষ্টির কারণে বাংলায় তীব্র অন্নসংকট দেখা দিলে তিনি বীরসিংহ গ্রামে নিজ ব্যয়ে একটি অন্নসত্র স্থাপন করেন। ছয় মাস দৈনিক চার-পাঁচশো নরনারী ও শিশু এই অন্নসত্র থেকে অন্ন, বস্ত্র ও চিকিৎসার সুযোগ পেয়েছিল।

১৮৭০ সালের জানুয়ারিতে ডা. মহেন্দ্রলাল সরকারের বিজ্ঞান সভায় এক হাজার টাকা দান করেন বিদ্যাসাগর। ১৮৭১-৭২ সাল নাগাদ তার স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। ১৮৭২ সালের ১৫ জুন হিন্দু বিধবাদের সাহায্যার্থে হিন্দু ফ্যামিলি অ্যানুয়িটি ফান্ড নামে একটি জনহিতকর অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। ১৮৭৪ সালে মাত্র এক বছরেই ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষায় মেট্রোপলিটান কলেজ গণনানুসারে দ্বি্বতীয় স্থান অধিকার করেছিল। ১৮৮০ সালের ১ জানুয়ারি বিদ্যাসাগর মহাশয় সিআইই উপাধি পান।

গণশিক্ষার প্রসারের জন্য ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর মাতৃভাষায় পঠন পাঠনের গুরুত্ব অনুভব করেন । এই জন্য তিনি সহজ-সরল পাঠ্যপুস্তক রচনায় আগ্রহী হন । শিক্ষাবিস্তারের জন্য তিনি বর্ণপরিচয়, কথামালা, ঋজুপাঠ, আখ্যানমঞ্জরী, বোধোদয় প্রভৃতি পুস্তক লেখেন । অন্যান্য সাহিত্য গ্রন্থের মধ্যে ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’, ‘শকুন্তলা’,  ‘সীতার বনবাস’, ‘ভ্রান্তিবিলাস’, প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বিধবা বিবাহ 

পরিশ্রম, সহিষ্ণুতা নিয়ে সনাতন ধর্মের বিভিন্ন শাস্ত্র ঘেঁটে তিনি রচনা করেন ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব’ গ্রন্থ। প্রকাশিত হয় ১৮৫৫ সালের জানুয়ারি মাসে। গ্রন্থটি দেখতে দেখতে বাজারে বিক্রি হয়ে যায়। সবার মুখে মুখে শুধু বিধবাবিবাহ। এর পক্ষে বিপক্ষে জনমত গড়ে ওঠে। বিপক্ষে অবস্থানকারীরাও বই লেখেন। চলতে থাকে তর্ক-বিতর্ক। একই বছর অক্টোবর মাসে বিদ্যাসাগরের বিধবাবিবাহ সম্পর্কিত আরও একটি গ্রন্থ প্রকাশ পায়। গ্রন্থটির নাম ‘বিধবাবিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব। দ্বিতীয় পুস্তক।’ বিদ্যাসাগর হয়ে ওঠেন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

১৮৫৫ সালের অক্টোবরে ৯৮৬ জন লোকের স্বাক্ষর করা একটি আবেদনপত্র বিদ্যাসাগর ভারত সরকারের কাছে পাঠান। বিধবাবিবাহ বিলের খসড়া কাউন্সিলে প্রথমবারের মত উত্থাপন করা হয় ১৮৫৫ সালের ১৭ নভেম্বর। দ্বিতীয়বার উত্থাপন করা হয় ১৮৫৬ সালের ৯ জানুয়ারি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হল, বিধবাবিবাহ আইন পাশের বিরুদ্ধে সমাজে জনমত গড়ে ওঠে।

ভারত সরকারের কাছে বিধবাবিবাহ আইন পাশের বিরুদ্ধে ১৮৫৬ সালের ১৭ মার্চ একটা আবেদনপত্র যায়। তাতে ৩৩,০০০ জন লোকের স্বাক্ষর পড়ে। শুধু তাই নয়, বিধবাবিবাহের পক্ষে বিপক্ষে সরকারের কাছে হাজার হাজার আবেদন আসতে থাকে। তবে বিধবাবিবাহের আইন পাশের পক্ষে যত আবেদন আসে তার চেয়ে বিপক্ষে আবেদন আসে বেশি।

যে সকল হিন্দু পন্ডিতগন বিদ্যাসাগরের চরম বিরোধিতা করেছিলেন তাদের মধ্যে ব্রজনাথ বিদ্যারত্ন, কাশীনাথ তর্কালঙ্কার, রমাতনু তর্কসিন্ধান্ত, গঙ্গাধর কবিরাজ, মহেশচন্দ্র চূড়ামনি, দীনবন্ধ ন্যায়রত্ন, ইষানচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ এদের মদ্যে অন্যতম। শুধুমাএ এ সকল পন্ডিতগনই যে তার বিরোধিতা করেছেন এমন নয়, বাংলা সাহিত্যের অন্যতম পন্ডিত ব্যক্তিত্ব বঙ্কিমচন্দ্রও রীতিমতো তার বিরোধিতা করেছেন। 

বঙ্কিমচন্দ্র তার ‘বিষবৃক্ষে’ সূর্যমুখীকে দিয়ে উক্তি করান যে,

“ যে বিধবা বিবাহের ব্যাবস্থা দেয়, সে যদি পন্ডিত হয় তবে মূর্খ কে?” 

এসকল পন্ডিত ব্যক্তিদের প্রচ্ন্ড বিরোধিতার পরও তিনি ( বিদ্যাসাগর ) একটুকুও পিছপা হননি। বিদ্যাসাগর তখন বলেছিলেন,

“ বিধবা বিবাহ প্রবর্তন আমার জীবনের সর্ববৃহৎ সৎকর্ম” 

শেষ পর্যন্ত সব জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে ১৮৫৬ সালের ১৯ জুলাইয়ে তৃতীয় বারেরর মত উত্থাপিত হয় বিধবাবিবাহ আইন পাস করার জন্য। একই সালের ২৬ জুলাই বিধবাবিবাহ আইন পাশ হয়।

১৮৫৬ সালের ৭ ডিসেম্বর। ১২ নম্বর সুকিয়া স্ট্রিটে রাজকৃষ্ণ বন্দোপাধ্যায়ের বাড়িতে প্রথম বিধবাবিবাহ হয় শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন ও কালীমতী দেবীর সাথে। পাত্রী ছিলেন বর্ধমান জেলার পলাশডাঙা গ্রামের অধিবাসী ব্রহ্মানন্দ মুখোপাধ্যায়ের দ্বাদশ বর্ষীয়া বিধবা কন্যা । বিয়ের যাবতীয় অর্থ বিদ্যাসাগরই দেন। এমনিভাবে বিভিন্ন জায়গায় বিধবাবিবাহ সম্পন্ন হতে থাকে। অর্থ জোগান দেন বিদ্যাসাগর।

এদিকে চারদিক থেকে বিধবাবিবাহ নিয়ে নানা রকম হুমকি আসতে থাকে। এমনকি গুণ্ডাপাণ্ডাও তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়া হয়। কোন কিছুতেই তিনি না দমে বিধবাবিবাহ চালিয়ে যেতে থাকেন।
১৮৭০ সালের ১১ আগস্ট নিজের ২২ বছরের ছেলে নারায়ণ বন্দোপাধ্যায়কে ১৪ বছর বয়সী বিধাবা ভবসুন্দরী দেবীর সাথে বিয়ে দেন।

বহু বিবাহ 

বিধবাবিবাহ হলে সমাজের মঙ্গল হবে। নারীর দুঃখ ঘুঁচবে এমনটিই আশা করেছিলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু বিধবাবিবাহের নামে সমাজে নতুন একটি সমস্যার সৃষ্টি হয়। শুরু হয় বহুবিবাহ। বিদ্যসাগর ধর্ম শাস্ত্র ঘেঁটে বহুবিবাহ নিয়ে অনেক পড়াশোনা করেন। জানেন অনেক কিছু। বহুবিবাহ বলতে সনাতন ধর্মে কিছু নেই। বহুবিবাহ প্রচলিত ছিল কুলীন ব্রাহ্মণদের মধ্যে। তাদের মধ্যে ছেলের বড় অভাব ছিল। কুলীন ছাড়া অন্য জাতির সাথে কুলীন ব্রাহ্মণদের মেয়ে বিয়ে দিলে তাকে আর ব্রাহ্মণ সমাজে স্থান দেয়া হত না। সমাজের এ দিকটাও ছিল কুসংস্কারে ভরা।

১৮৫৫ সালে বহুবিবাহ বন্ধের প্রথম আবেদন করে সুহৃদ সমিতি। এরপর রাজা দেব নারায়ণ সিংহ, রমাপ্রসাদ রায়, প্রাণনাথ চট্টপাধ্যায়, রাজা রাধাকান্তদেব এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্ধমানের মহারাজ, নদীয়ার মহারাজ, দিনাজপুরের রাজাসহ বিভিন্ন জেলার আবেদন সরকারের কাছে জমা পড়ে। পাশাপাশি বহুবিবাহের বিপক্ষেও জমা পড়ে আবেদন।

বহুবিবাহ রহিত করতে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগার প্রথম আবেদনপত্র পাঠান ১৮৫৫ সালের ২৭ ডিসেম্বর। রাজবিদ্রোহের কারণে তাঁর আবেদনপত্র টেবিলেই পড়ে থাকে। নিরাশ না হয়ে তিনি আবার আবেদনপত্র পাঠান ১৮৫৬ সালের ১ ফেব্রয়ারিতে।
বহুবিবাহ সম্পর্কে আরও তথ্য জানা যায়, তিন’শ স্বাক্ষর বিশিষ্ট একটি আবেদনপত্র সরকারের কাছে ১৮৬৬ সালের ২৪ মে জমা পড়ে। এ আবেদনপত্রে বহুবিবাহ রহিত আইন প্রণয়নের পাশাপাশি পণপ্রথা উচ্ছেদেরও দাবি জানানো হয়। সত্যিকার অর্থে বহুবিবাহ রহিত করার পাশাপাশি পণপ্রথা উচ্ছেদ আন্দোলনের এখান থেকেই শুরু হয়।

সরকারের পক্ষ থেকে বহুবিবাহ রহিত করতে নানাবিধ কর্মকাণ্ড চলতে থাকে। এরই মধ্যে বিদ্যাসাগরের ১৮৭১ সালে ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয় বিচার’ নামক গ্রন্থ প্রকাশ পায়। এরপর আরও তিনখানা গ্রন্থ ‘বহুবিবাহ রোধ’ সম্পর্কিত প্রকাশ পায়। বহুবিবাহ রোধ করতে আইন পাশ করার দাবি নিয়ে বিদ্যাসাগর লেফটেন্যান্ট গভর্ণর বিডন সাহেবের সাথে দেখাও করেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয় যে, তাঁর জীবদ্দশায় তিনি বহুবিবাহ রহিত আইন পাস করে যেতে পারেননি।

বিদ্যাসাগর রচিত গ্রন্থাবলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য শিক্ষামূলক গ্রন্থ :

‘বর্ণপরিচয়’ (১ম ও ২য় ভাগ, ১৮৫৫), ‘ঋজুপাঠ’ (১ম, ২য় ও ৩য় ভাগ, ১৮৫১-৫২), ‘সংস্কৃৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা’ (১৮৫১), ‘ব্যাকরণ কৌমুদী’ (১৮৫৩); অনুবাদ গ্রন্থ : হিন্দি থেকে বাংলা ‘বেতাল পঞ্চবিংশতি’ (১৮৪৭), সংস্কৃৃত থেকে বাংলা ‘শকুন্তলা’ (১৮৫৪), ‘সীতার বনবাস’ (১৮৬০), ‘মহাভারতের উপক্রমণিকা’ (১৮৬০), ‘বামনাখ্যানম্’ (১৮৭৩); ইংরেজি থেকে বাংলা ‘বাঙ্গালার ইতিহাস’ (১৮৪৮), ‘জীবনচরিত’ (১৮৪৯), ‘নীতিবোধ’ (১৮৫১), ‘বোধোদয়’ (১৮৫১), ‘কথামালা’ (১৮৫৬), ‘চরিতাবলী’ (১৮৫৭), ‘ভ্রান্তিবিলাস’ (১৮৬১); ইংরেজি গ্রন্থ : ‘পোয়েটিক্যাল সিলেকশনস্’, ‘সিলেকশনস্ ফ্রম গোল্ডস্মিথ’, ‘সিলেকশনস্ ফ্রম ইংলিশ লিটারেচার’; মৌলিক গ্রন্থ : ‘সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৫৩), ‘বিধবা বিবাহ চলিত হওয়া উচিত কিনা এতবিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৫৫), ‘বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতবিষয়ক প্রস্তাব’ (১৮৭১), ‘অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘আবার অতি অল্প হইল’ (১৮৭৩), ‘ব্রবিলাস’ (১৮৮৪), ‘রত্নপরীক্ষা’ (১৮৮৬) প্রভৃতি।

সাহিত্য কর্ম

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সর্ব প্রথম বাংলা লিপি সংস্কার করে তাকে যুক্তিবহ করে তোলেন এবং অপরবোধ্য করে তোলেন। বাংলা গদ্যের প্রথম সার্থক রূপকার তিনি। রচনা করেছেন জনপ্রিয় শিশুপাঠ্য বর্ণপরিচয় সহ একাধিক পাঠ্যপুস্তক ও সংস্কৃত ব্যাকরণ গ্রন্থ। সংস্কৃত হিন্দি ও ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করেছেন সাহিত্য এবং করেছেন জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বহু রচনা।

বিদ্যাসাগরের রচনাসমগ্র

১. বেতাল পঞ্চবিংশতি (১৮৪৭)। লল্লুলাল কৃত বেতাল পচ্চীসী’র অনুবাদ।
২. বাঙ্গালা ভাষার ইতিহাস, দ্বিতীয় ভাগ (১৮৪৮),  মার্শম্যানের হিস্ট্রি অফ বেঙ্গল– অবলনে রচিত।
৩. জীবনচরিত (১৮৪৯)। উইলিয়াম ও রবার্ট চেম্বার্স রচিত খ্যাতিমান ইংরেজ মণীষীদের জীবনী অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
৪. বোধদয়, শিশুশিক্ষা চতুর্থ ভাগ (১৮৫১)।  রুডিমেন্টস অফ নলেজ অবলম্বনে তাঁর রচিত গ্রন্থ।
৫.নীতিবোধ : প্রথম সাতটি প্রস্তাব (১৮৫১) । রবার্ট ও উইলিয়াম চেম্বার্সের মরাল ক্লাস বুক অবলম্বনে রচিত।
৬. সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমণিকা (১৮৫১)।
৭. ঋজুপাঠ : প্রথম ভাগ (১৮৫১), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫২), তৃতীয় ভাগ (১৮৫২)।
৮. ব্যাকরণ কৌমুদি : প্রথম ভাগ (১৮৫৩), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫৩), তৃতীয় ভাগ (১৮৫৪), চতুর্থ ভাগ (১৮৬২)।
৯. সংস্কৃত ভাষা ও সংস্কৃত সাহিত্য বিষয়ক প্রস্তাব (১৮৫৪)
১০. শকুন্তলা (১৮৫৪)। কালিদাসের অভিজ্ঞানম শকুন্তলম্ অবলম্বনে তাঁর রচিত গ্রন্থ।
১১. বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব – প্রথম পুস্তক (১৮৫৫)
১২. বর্ণপরিচয় : প্রথম ভাগ (১৮৫৫), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৫৫)
১৩. বিধবা বিবাহ প্রচলিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক প্রস্তাব – প্রথম পুস্তক (১৮৫৫)
১৪. কথামালা (১৮৫৬)। ঈশপের কাহিনি অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
১৫. চরিতাবলী (১৮৫৬)। স্বরচিত গ্রন্থ।
১৬. মহাভারত- উপক্রমণিকা ভাগ (১৮৬০)।
১৭. সীতার বনবাস (১৮৬০)। ভবভূতির উত্তর রামচরিত অবলম্বনে তাঁর রচিত বিখ্যাত গ্রন্থ।
১৮. আখ্যানমঞ্জরী (১৮৬৩)
১৯. শব্দমঞ্জরী (১৮৬৪)
২০. ভ্রান্তিবিলাস (১৮৬৯)। উইলিয়াম শেক্সপিয়র রচিত কমেডি অফ এররস্ অবলম্বনে রচিত গ্রন্থ।
২১. বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার (১৮৭১)
বামনাখ্যানম্ (১৮৭৩)। মধুসূদন তর্কপঞ্চানন রচিত ১১৭টি শ্লোকের অনুবাদ।
২২. বহুবিবাহ রহিত হওয়া উচিত কিনা এতদ্বিষয়ক বিচার -দ্বিতীয় পুস্তক। (১৮৭৩)
২৩. পদ্যসংগ্রহ : প্রথম ভাগ (১৮৮৮), দ্বিতীয় ভাগ (১৮৯০)
২৪. নিষ্কৃতিলাভ প্রয়াস (১৮৮৮)
২৫. সংস্কৃত রচনা (১৮৮৯)
২৬. শ্লোকমঞ্জরী (১৮৯০)
২৭. বিদ্যাসাগর চরিত [স্বরচিত] (১৮৯১)
২৮. ভূগোল খগোল বর্ণনম্ (১৮৯২)
২৯. অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৩০. আবার অতি অল্প হইল (১৮৭৩)
৩১. ব্রজবিলাস (১৮৮৪)। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোস্য’ ছদ্মনাম রচিত।
৩২.  বিধবা বিবাহ ও যশোহর হিন্দুধর্মরক্ষিণীসভা (১৮৮৪)। ‘কস্যচিৎ তত্ত্বান্বেষিণঃ’ ছদ্মনামে রচিত। দ্বিতীয় সংস্করণে তিনি এর নামকরণ করেন বিনয় পত্রিকা।
৩৩. রত্ন পরীক্ষা (১৮৮৬)। ‘কস্যচিৎ উপযুক্ত ভাইপোসহচরস্য’ ছদ্মনামে রচিত।

সম্পাদিত গ্রন্থ

অন্নদামঙ্গল (১৮৪৭)
কিরাতার্জ্জুনীয়ম্ (১৮৫৩)
সর্বদর্শনসংগ্রহ (১৮৫৩-৫৮)
শিশুপালবধ (১৮৫৩)
কুমারসম্ভবম্ (১৮৬২)
কাদম্বরী (১৮৬২)
বাল্মীকি রামায়ণ (১৮৬২)
রঘুবংশম্ (১৮৫৩)
মেঘদূতম্ (১৮৬৯)
উত্তরচরিতম্ (১৮৭২)
অভিজ্ঞানশকুন্তলম্ (১৮৭১)
হর্ষচরিতম্ (১৮৮৩)
পদ্যসংগ্রহ প্রথম ভাগ (১৮৮৮ ; কৃত্তিবাসি রামায়ণ থেকে সংকলিত)
পদ্যসংগ্রহ দ্বিতীয় ভাগ (১৮৯০ ; রায়গুণাকর ভারতচন্দ্র রচিত ।

মৃত্যুঃ

১৮৭১-৭২ সাল নাগাদ তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়। জলহাওয়া পরিবর্তনের জন্য এই সময় তিনি কার্মাটারে (বর্তমানে ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে অবস্থিত) একটি বাগানবাড়ি কেনেন। ১৮৯১ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ই জুলাই (১৩ শ্রাবণ, ১২৯৮ বঙ্গাব্দ) রাত্রি দুটো আঠারো মিনিটে তাঁর কলকাতার বাদুড়বাগানস্থ বাসভবনে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭০ বছর ১০ মাস ৩ দিন। মৃত্যুর কারণ, ডাক্তারের মতে, লিভারের ক্যানসার।

শেষ কথা

সমাজ সংস্কারক হিসেবে বিদ্যাসাগর ইতিহাসের পাতায় অবিস্মরণীয় হয়ে আছেন। সমাজের নানা অসঙ্গতি তিনি তুলে ধরেছেন মানুষের মঙ্গলার্থে। দয়া দাক্ষিণ্যেও তিনি ছিলেন উদার। তাঁকে যেমন বলা হত বিদ্যার সাগর তেমনি বলা হত দয়ার সাগর। বর্তমান সমাজের কাছে তাঁর কর্মময় বিচিত্র জীবন সত্যি বিস্ময়ের সৃষ্টি করে। তাঁর কর্মকাণ্ড হতে পারে নতুন প্রজন্মের দিক নির্দেশনা ও অনুপ্রেরণা।

বাঙালি জাতি সর্বপ্রথম বড় হবার, যোগ্য হবার, মানবিক হবার, আধুনিক প্রগতিশীল ও বিশ্বজনীন হবার সর্বপ্রথম দৃষ্টান্ত খুঁজে পেয়েছিল বিদ্যাসাগরের মধ্যে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর সম্বন্ধে বলেছেন “ তিনি হিন্দু ছিলেন না, বাঙ্গালী বা ব্রাহ্মণ ছিলেন না, ছিলেন ‘মানুষ’। এই মন্তব্যের তাৎপর্য অতলস্পর্শী। কারণ কারো যথার্থ “মানুষ” হওয়া অত সহজ কথা নয়।
ডঃ সুকুমার সেন বলেছেন “বিদ্যাসাগরের আগে বাংলা গদ্যের চল ছিল, চাল ছিল না।” 
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সম্পর্কে মহাত্মা গান্ধী বলেছেন “আমি যে দরিদ্র বাঙ্গালী ব্রাহ্মণকে শ্রদ্ধা করি তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর।”

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক