ওট কি, কোথায় পাওয়া এবং কিভাবে খাওয়া যায়

ওট হল একটি খাদ্যশস্য যা মূলত ঠান্ডা আবহাওয়ায় ভাল ফলন হয়। এটা পশুখাদ্য হিসেবে ব্যাপক ব্যবহৃত হলেও মানুষের সাস্থ্যের জন্যও যথেষ্ট উপকারী একটা শস্য। ওটস দিয়ে বিভিন্ন ধরনের স্বুস্বাদু এবং পুষ্টিকর বিস্কুট, ব্রেড এবং কেক তৈরি হয়। এটি গম, যব এবং পায়রা জাতীয় উদ্ভিদ শস্য।

 ওট বা ওটস কি ?

ইংলিশে বলে ওট (Avena sativa)। প্রায় ৪০০০ বছর ধরে মানুষ ধান/গম পরিবারের অর্ন্তভুক্ত এ শস্যটি  চাষ করে আসছে । ওটস স্বাস্থ্যকর খাবার হিসাবে সমজাতীয় খাদ্য তালিকার প্রায় উপরের দিকে অবস্থান করে। ওটে অন্যান্য খাদ্যশস্যের তুলনায় অনেক পরিমানে দ্রবিভুত আশ জাতীয় অংশ থাকায় এটি তুলনামূলক ধীরে হজম হয়।  গবেষনা থেকে দেখা গিয়েছে যে এতে রয়েছে অতি  উচ্চ মাত্রায় সহজে দ্রবণীয় বেটা-গ্লুকান, যা ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে উল্লেখযোগ্য ভুমিকা পালন করে। এবং ধারনা করা হয় হৃদরোগ কমাতেও সহায়ক হিসেবে ভূমিকা রাখে । এ ছাড়া ও আরো কিছু কিছু উপকারী উপাদান আছে যেমন আলফা-টোকোটেরিওনল এবং আলফা-টোকোফেরল, যে উপাদানগুলো এন্টি-অক্সিডেন্ট হিসাবে কাজ করে এবং হৃদযন্ত্র কে সুস্থ রাখতে, আলজেইমার রোগ, গ্লোকোমা এবং প্রোস্টেট ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

ওটস

ওটসের উপকারিতা

ওটস একটি খুব উপকারী শস্য। ওটস এ প্রচুর পরিমাণ ফাইবার বিদ্যমান থাকে। এই ফাইবার আমাদের শরীরে নানা উপকারে আসে। চলুন সংক্ষেপে ওটস আমাদের কি কি ক্ষেত্রে উপকারী শস্য হিসেবে কাজে দেখে নেওয়া যাক।

কোলেস্টেরল কমায়: ওটস এ বিদ্যমান ফাইবার লিপিড বা চর্বি কমায়। ওটসে রয়েছে অতি  উচ্চ মাত্রায় সহজে দ্রবণীয় বেটা-গ্লুকান যা  শরীরের  জন্যে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কমাতে বেশ সহায়ক ভুমিকা পালন করে। ওটসের ডায়েটারিফাইবার কোলেস্টরেলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে, খিদে কমায় এবং পেট পরিষ্কার রাখে।

ওজন কমায়: যারা ওজন কমাতে ও শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান তাদের জন্য প্রতিদিন সকালে এক বাটি ওটস নাশতা হিসেবে খুবই কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। ওটস প্রোটিন ও ফাইবারে সমৃদ্ধ ফলে এটি  দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সাহায্য করে।
২০১৩ সালের Journal of the American College of Nutrition একটি জরিপে বলা হয়েছে “অন্য যেকোনো খাদ্যশস্যের তুলনায় ওটমিল বেশিক্ষণ পেট ভরা রাখে ।”  গবেষকরা আর বলেন যে, স্বাদবিহীন ইনস্ট্যান্ট ওটমিল ও অন্যান্য খাদ্যশস্যের মধ্যে স্বাদবিহীন ওটস অনেকক্ষণ পেট ভরা রাখে। কারণ এতে রয়েছে উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন বেটা গ্লুকোন ও পেপটাইডের বন্ধন। এ উভয় উপাদানই হল ক্ষুদা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোন ।

হৃদরোগের ঝুঁকি কমায়: ওটস এ উচ্চ মাত্রার অ্যান্টি অক্সিডেন্ট ফ্রি রেডিকেল ও প্রদাহের বিরুদ্ধে কাজ করে। ওটস্ এর এন্টিঅক্সিডেন্ট খুবই অনন্য যাকে এভেনানথ্রামাইডস বলা হয়।এটি ফ্রি-রেডিকেল কর্তৃক এল ডি এল কোলষ্টেরল এর ক্ষতি হওয়া থেকে রক্ষা করে ফলে হৃদ রোগ হবার সম্ভাবনা  কমিয়ে দেয়। ওটের লিগ্নান্স হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়  ও বেটা গ্লুকোন হার্টের সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।ইউরোপিয়ান ক্লিনিক্যাল নিউট্রেশন জার্নালে প্রকাশিত একটি কানাডিয়ান গভেষণা মতে ওটস লো ডেনসিটি লিপোপ্রোটিন বা এলডিএল এবং কলেস্টেরলের মাত্রা কমায়।  ওটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের জে টি ব্রাটেন এর গভেষণা মতে ওটসে থাকা দ্রবনীয় ফাইবারের প্রধান উপাদান বেটা গ্লুকেনের কারনে হৃদ রোগের ঝুঁকি কমে। OZ এবং Roizen এর মতে ওটস হৃদ রোগের জন্যে হুমকিদায়ক রক্তের ক্লোটস কমাতে সাহায্য করে একই সাথে আর্টারিকে স্বাভাবিক রাখে।  হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির গবেষণায় দেখা গেছে, যারা নিয়মিত ওটস খান তাদের হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা অন্যদের তুলনায় ২৯ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়।

রক্তের সুগারের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখে: ওটসে আছে উচ্চ মাত্রার শর্করা। তাই সকালের বা বিকেলের নাশতা হিসেবে এটি শরীরে শক্তি যোগাতে  কাজ করে। আবার এতে রয়েছে অধিক পরিমাণে ফাইবার ফলে এটি ধীরে ধীর হজম হয় এবং রক্তে গ্লুকোজের পরিমাণকে সীমিত রাখে। ওটমিল খুব সহজেই টাইপ ২ ডায়াবেটিস এর ঝুঁকি কমাতে পারে বলে জানা যায়।

ত্বকের যত্নে ওটের ব্যবহারঃ   কলোইডাল ওট এক্সট্রাক্ট ত্বকের মসৃনতা বৃদ্ধিতে, ত্বকের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, রুক্ষতা দূরে করে এবং ত্বকের প্রদাহ দূর করতে সহায়তা করে। ওটমিল খাওয়ার সাথে সাথে আপনি এটি মুখে বা শরীরের ত্বকে লাগাতে পারেন। এটি ত্বককে আর্দ্রতা প্রদান করে ও ত্বককে করে তুলে নরম ও কোমল।  ওট অনেক প্রসাধন সামগ্রিতে যেমনঃ ক্লিঞ্জার, মাস্ক, ফেসিয়াল ক্রিমে ব্যবহার করা হয়।

ত্বকের  শুষ্কতা, বিভিন্ন ধরণের র‍্যাশ, কালো দাগ, একজিমা, সানবার্ণ ইত্যাদি থেকে রক্ষা পেতে ওট খুব সহায়ক ভুমিকা পালন করে।সাধারনত এ সব ক্ষেত্রে পিএইচ (Ph) এর মাত্র বেড়ে গিয়ে ত্বককে রুক্ষ করে তোলে। ওট ত্বকের পিএইচ লেভেল স্বাভাবিক করে ফলে  তকে  এনে ত্বকের সুদিং ভাব টা এনে দেয় এবং এতে রয়েছে এভাসিন নামে একটি যৌগিক পদার্থ যেটা ছত্রাকনাশক হিসাবে কাজ করে, আর আছে স্যাপোনিন, যেটি ক্লিঞ্জিং উপাদন হিসেবে কাজ করে এবং আরো আছে ফ্ল্যাভোনয়েড কমপাউন্ড যা সূর্যের ক্ষতিকারক UV  রশ্মিকে শোষন করে ত্বককে রক্ষা করে।তাছাড়া, গোসলের পানিতে এটি মিশিয়ে গোসল করলে চুলকানি, অ্যালার্জি ও লালচে ভাব দূর হয়।

উচ্চ রক্তচাপ নিরাময় করে:  উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে ওটসের সহায়ক হিসেবে কাজ করে। দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় ওটমিল  রাখলে এটি সিস্টোলিক ও ডায়াস্টোলিক রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে। ওটসে বিদ্যমান ম্যাগনেসিয়াম ও ফাইবার রক্ত চলাচল স্বাভাবিক রাখে ও রোগ ব্যাধির ফরমেশন কে স্থির রাখে।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়: এটি খাবারটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে । ওটসে রয়েছে শহক্তিশালী ফাইবার ।এ ফাইবার রোগ প্রতিরোধক কোষ সৃষ্টি করে ও শরীরকে আরো বেশি  রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা সম্পন্ন করে তুলে । ওটের বেটা গ্লুকোনের অ্যান্টি মাইক্রোবাইয়াল ও অ্যান্টি অক্সিডেন্ট উপাদান রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে ব্যাকটেরিয়াল ইনফেকশন থেকে শরীরকে মুক্ত রাখতে সহায়তা করে।

ব্রেস্ট ক্যান্সার প্রতিরোধ করে:টমিল কিছু কিছু হরমোনের ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যে সব হরমোনের অতিরিক্ত ক্ষরণে স্তন ক্যান্সার হতে পারে। ওটমিলের হোল গ্রেইন্স পোষ্ট-মেনোপজাল মহিলাদের স্তন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে।ওটসে রয়েছে ফাইটো নিউট্রিয়েন্ট উপাদান যা ক্যান্সারের বিরুদ্ধে কাজ করে। এটি কার্যকর ভাবে ব্রেস্ট ও অন্যান্য হরমোন সম্পৃক্ত ক্যান্সার কে ধ্বংস করতে পারে। প্রতিদিন এক বাটি ওটমিল মহিলাদের ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি প্রায় ৪১% পর্যন্ত কমাতে পারে বলে জানা যায়।

কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায়: ওটসের উচ্চ মাত্রার ফাইবার কোলন ও ইন্টেস্টাইনালের সুস্বাস্থ্য বজায় রাখে। এটি কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি কমায় ও কোষ্ঠকাঠিন্য উপশম করে।

চিন্তা দূর করে: এটি মস্তিষ্কে সেরোটোনিনের মাত্রা বৃদ্ধি করে। সেরোটোনিন হল এমন একটি হরমোন যা ক্ষুধা, ঘুম ও মেজাজ নিয়ন্ত্রণ করে। সেরোটোনিন থাকার  ফলে ওটস চিন্তা বা দুঃখ দূর কমাতে সাহায্য করে। ম্যাগনেসিয়াম গভীর ঘুমের জন্য দায়ী। ওটসে রয়েছে ম্যাগনেশিয়াম তাই  এটি মনকে শান্ত ও প্রফুল্ল রাখতে সহায়ক ভুমিকা পালন করে।

ওটস কখন ও কিভাবে খাবেন

এখন পর্যন্ত আমাদের দেশে ওটস জনপ্রিয় খাদ্য না হলেও পশ্চিমা বিশ্বে এটি একটি বহুল পরিচিত একটি খাবার। তারা ব্রেকফাস্টে ওটস খেতে পছন্দ করে করে। ইদানিং ওটসমিল আমাদের দেশেও জনপ্রিয় হচ্ছে। ওটস আর ওটস মিলের পার্থক্য হলে ওটস থেকে যখন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য বানানো হয় তখন একে ওটসমিল বলে। যারা ওজন নিয়ন্ত্রণ করতে চান তারা চাইলে সকাল ও রাতে ওটস খেতে পারেন। ওটস খেলে ক্ষিদা তো মিটবেই সেই সাথে আপনার ওজন বেড়ে যাবার ভয় নেই। বরং ওজন বাড়ার বদলে কমতে থাকতে।ওটে থাকা বিটা গ্লুকেন ফাইবার হাইলি ভিসকাস হয়‚ যে কারণে স্লো ডাইজেস্ট হয় আর অনেক সময় পেট ভর্তি রাখে|

ভোজন রসিকদের জন্যে ব্যাপারটা মজার না  যে আপনি ভর পেট খাবেন কিন্ত আপনার ওজন না বেড়ে বরং কমতে থাকবে ?  লুসিয়ানা স্টেট ইউনিভার্সিটির পেনিংটন বায়োমেডিকাল রিসার্চ সেন্টারের এক  গবেষনা থেকে জানা যায় যে, ‘ ওটের মধ্যে এমন একধরনের পদার্থ থাকে যা ক্যালোরি ধরে রাখার পাশাপাশি খিদেও মিটিয়ে দেয়।’ এই গবেষনা করে জানা গিয়েছে অন্যান্য শষ্যদানায় ফ্যাট কম থাকলেও খিদে মেটে না এবং প্রয়োজনীয় পুষ্টি দেহে যায় না। অন্যদিকে ব্রেকফাস্টে ভারি কোনও খাবার খেলে পেট ভরলেও ক্যালোরি বেড়ে যায় কিন্তু সম্পূর্ণ পুষ্টি হয়না। গবেষনাটি ১০০জন পুরুষ ও মহিলাকে নিয়ে করা হয়েছিল। যেখানে দেখা গিয়েছে ওটমিল খাওয়ার পর পেট ভরার পাশাপাশি দেহ  সঠিক পুষ্টিও পাচ্ছে।

এখন প্রশ্ন হল ওটস খাবেন কি ভাবে?

ওটস আপনি অনেক ভাবেই  খেতে পারেন।  এখানে কয়েকটি উপায় বাতলে দেওয়া হলঃ

১। সকালের নাস্তায় দুধ দিয়ে ওটস খেতে পারেন| এর  মধ্যে কুচি করে পছন্দ মত ড্রাই ফ্রুট্স দিতে পারেন ।

২।  সকালের নাস্তায় টক দৈ দিয়েও ওটস খেতে পারেন| সাথে  ছোট ছোট কুচি করে আপেল বা খেজুর দেওয়া যেতে পারে । এ ছাড়াও স্ট্রবেরি বা ব্লু বেরিও দিতে পারেন।

৩। চাইলে দুপুরের প্রধান মিলে ভাতের বদলে ওটস সেদ্ধ করে নিতে পারেন  | এবার ভাতের মত ডাল‚ তরকারি‚ মাছের ঝোলের সাথে খেয়ে ফেলুন|

৪। ওটস দিয়ে খিচুরি বানিয়েও খাওয়া যেতে পারে।

৫। স্ন্যাকস হিসেবে বিকেলে চা বা কফির সাথে ওটসের বিস্কিট খেতে পারেন।

বোনাস হিসেবে আমরা ওটসে কয়েকটি রেসিপ দেখতে পারি ।

ওটসের খিচুড়ি

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ ওটস দেড় কাপ, মসুর ডাল ৩ টেবিল-চামচ, মুগডাল ৩ টেবিল-চামচ,   মুরগির মাংস টুকরা করা (হাড় ছাড়া আর পরিমাণ মত )।

সবজিঃ ছোট আলু,গাজর, বরবটি,  টমেটো কুচি বাঁধাকপি, ফুলকপি, ক্যাপসিকাম সব মিলিয়ে ১ কাপ অথবা ইচ্ছামতো যে কোনো সবজি নিতে পারেন।

মসলাঃ   ঝাল অনুযায়ী কাঁচামরিচের কুচি ইচ্ছা মতো, পেঁয়াজকুচি ১টি,  ছোট রসুনকুচি ২ কোয়া, ধনেপাতার কুচি ইচ্ছা মতো, সামান্য জিরাগুঁড়া,  সামান্য হলুদগুঁড়া , সামান্য ধনেগুঁড়া,  লবণ স্বাদমতো,  তেল ১ টেবিল-চামচ,  পানি ২ কাপ অথবা প্রয়োজন মতো।

পদ্ধতিঃ প্রথমেই ওটস ভেজে নিন। প্যানে তেল দিয়ে মুরগির মাংস ভাজা ভাজা করে তাতে পেঁয়াজকুচি ও রসুনকুচি দিয়ে ভাজুন। মাংস একটু নরম হলে সবগুলো সবজি দিয়ে  বাকি মসলাগুলো আর লবণ দিয়ে ভাজুন।

এতে এবার ডাল দিয়ে পানিসহ ঢেকে রান্না করতে থাকুন। সবকিছু আধা সিদ্ধ হলে ভাজা ওটস আর কাঁচামরিচ দিয়ে ভালো করে নেড়ে মিশিয়ে দিন। পুনরায় ঢাকনা দিয়ে রান্না হতে দিন। পানি শুকিয়ে ভাজা ভাজা হলে ধনেপাতার কুচি ছিটিয়ে নামিয়ে ফেলুন। তৈরি হয়ে গেলে ওটসের খিচুড়ি।

ওটসের পায়েস

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ ওটস ২ টেবিল-চামচ, নন ফ্যাট দই ১ টেবিল চামচ, তোকমা ১ চা-চামচ,  তরল দুধ ১ কাপ,  পাকা আম ও স্ট্রবেরি কুচি করা আধা কাপ, চিনি ১ চা-চামচ (চিনির বদলে মধু অথবা লো ক্যালোরিযুক্ত চিনিও দেওয়া যেতে পারে) বাদাম, শুকনা ফল ও কিশমিশ।

প্রনালীঃ সবগুলো উপকরণ একসঙ্গে মিশিয়ে ফ্রিজে রাখুন। অন্তত তিন ঘণ্টা অথবা সারারাত রেখে সকালে খেতে পারেন বা যে কোনো সময় ঠাণ্ডা হলে খাবেন।

ওটস পরিজ

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ দুধ, ওটস, চিনি/মধু, ফলমূল।

প্রণালীঃ এটি একটি সহজ রেসিপি। দুধ গরম করতে দিয়ে তাতে স্বাদমত চিনি মিশিয়ে নিন ।দুধ হাল্কা গরম হলে তাতে ওটস দিয়ে ভাল  করে মিশিয়ে ২/৩ মিনিট ফোটালেই তৈরি হয়ে যাবে পায়েসের মত দেখতে  ওটস পরিজ। রান্না করার পরে  ওটস চালের মতই পরিমাণে বেশ বেড়ে যায় তাই সেই অনুযায়ী দুধ দিতে হবে তা  না হলে দুধ শুকিয়ে পাত্রের তলাতে লেগে যেতে পারে । ইচ্ছেমত শুকনো মেওয়া অথবা তাজা ফল ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে ওটসের উপর। আর যদি  মাইক্রোওভেনে করতে চান সে ক্ষেত্রে হাল্কা গরম দুধে চিনি আর ওটস ভালো করে মিশিয়ে মিডিয়াম পাওয়ারে ৩ মিনিট মাইক্রো করে নিতে পারেন । আপনি চাইলে চিনির বদলে মধু ব্যবহার করতে পারেন।

ওটস উপমা

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ ওটস, তেল, সরিষা, জিরা , লবণ প্রয়োজন মত,  চিনি , পিঁয়াজ, টমেটো এবং ইচ্ছামত অন্যান্য সবজি  যেমন  লাউ, কুমড়ো ইত্যাদি ।

প্রনালীঃ পিঁয়াজ, টমেটো, বিন, গাজর, ফুলকপি, পিয়াজ  ইত্যাদি ছোট করে কেটে রাখুন, কড়াইশুঁটি ছাড়িয়ে রাখতে হবে। সমস্ত সবজি কেটে ধুয়ে নিন। শুকনো  কড়াইয়ে ওটস ভাজতে থাকুন যখন  রঙ খয়েরি মতন হবে তখন উঠিয়ে নিয়ে ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করে রাখন।
এবার কড়াই বা ফ্রাইং প্যানে তেল গরম করতে দিয়ে তাতে সর্ষে আর জিরার ফোড়ন দিতে হবে। ভেজে গন্ধ উঠলে প্রথমে পিঁয়াজ এবং একটু পরে টমেটো ভেজে নিতে হবে।  এগুলি একটু রস রস মত হয়ে এলে, বাকি সবজিগুলো দিয়ে মিডিয়াম আঁচে ৪/৫ মিনিট  ভাজতে হবে। এবার লবন ও চিনি  দিয়ে ব্লেন্ড করা ওটস মিশিয়ে পানি  দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন। দু-তিন মিনিট ঢাকা দিয়ে মিডিয়াম আঁচে রাখলেই তৈরি হয়ে যাবে  আমাদের ওটস উপমা।

ওটস প্যানকেক

প্রয়োজনীয় উপকরণঃ ওটস, লবন, চিনি,  মশলা, টমেটো সস, পানি ও  তেল।

প্রণালীঃ তেল ছাড়া বাকি উপকরণ গুলি ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে ব্যাটার বানিয়ে নিন। প্রথম দিকে পানির পরিমান একটু কমিয়ে দিন।খুব বেশি পাতলা  হয়ে গেলে প্যানকেক মন্ড পাকিয়ে যাবে, মুচমুচে হবে না : আর খুব বেশি ঘন হয়ে গেলে প্যানকেকের ভিতরটা ভালো ভাবে সিদ্ধ হবে না। ঘনত্বটা একটু  এমন হবে যে,  ঢালতে গেলে হুট করে গড়িয়ে পড়বে না, আবার আটকেও থাকবে না।

এবার ফ্রাইং প্যানে তেল দিয়ে ভালো করে মাখিয়ে নিন, তেল গরম হলে ব্যাটারটা দিয়ে বেশি আঁচে ভেজে নিন, এক পিঠ ভাজা হয়ে এলে উলটে দিয়ে অন্য পিঠটাও ভাজা ভাজা করে নিন, মাঝের সময়টাতে আঁচ কমিয়ে মিডিয়াম করতে হবে, না হলে ভেতরটা কাঁচা কাঁচা থেকে যাবে। ব্যাটারটা দেওয়ার সময় একটু সমান ভাবে ছড়িয়ে দিন, আর একটু পাতলা করে ছড়ান। ভাজা হয়ে গেলে গরম গরম পরিবেশন করুন। ওটস দিয়ে বানানো খাবার ঠান্ডা করে করে খেলে তেমন স্বাদ পাওয়া যায় না।

ওটস-গাজর প্যানকেক

প্রয়োজনীয় উপকরনঃ  ওটসের প্যান ক্যাক  রেসিপির মতই উপাদান লাগে, টমেটো সসের দরকার পড়ে না, আর অতিরিক্ত লাগবে গাজর।

পদ্ধতিঃ এ রেসিপির সব থেকে বিরক্তিকর নেওয়া কাজটা হল গাজর গ্রেট করা বা ছেলা।  ক্রাশারে করে গাজর ছিলে নিতে পারেন । যাদের ফুড প্রসেসর আছে, তাদের অসুবিধা নেই, না হলে গাজর কে বড় বড় টুকরো করে সাধারন মিক্সিতে মিনিমাম স্পিডে ২০/৩০ সেকন্ড মত চালিয়ে নিলেই গাজর ছিলা তৈরি হয়ে যায় । মিক্সিতে ওটস, নুন, চিনি, চাট মশালা, পানি দিয়ে ব্লেন্ড করে নিয়ে ছিলে রাখা গাজরের সাথে মিশিয়ে নিলেই তৈরি হয়ে যাবে ব্যাটার। এবার আগের রেসিপির মতই ভেজে নিলেই তৈরি ওটস-গাজরের গোলারুটি।

ওটসের হোয়াইট সস

প্রয়োজনীয় উপকরনঃ ওটস, মাখন, লবণ, গোলমরিচের গুঁড়ো, দুধ, চিজ (ঐচ্ছিক)

প্রস্তুত প্রণালীঃ  ছোট সসপ্যানে কম থেকে মাঝারি আঁচে মাখন দিয়ে গরম করতে থাকুন, মাখন গলে গেলে তাতে লবণ, গোলমরিচ গুঁড়ো এবং মিক্সিতে ব্লেন্ড করে রাখা গুঁড়ো ওটস মিশিয়ে দ্রুত নাড়তে থাকুন, দ্রুত নাড়তে হয় যাতে মণ্ড পাকিয়ে না যায়। তৈরি হওয়া লেই এক মিনিট হালকা আঁচে রেখে নাড়তে হবে। এবার এর সাথে  গরম করে রাখা দুধ  ধীরে ধীরে মিশিয়ে নাড়তে হবে থাকুন।  ধীরে ধীরে মিশ্রণটি ঘন হয়ে এলে, নামিয়ে গ্রেট করা চিজ এবং গোলমরিচ গুঁড়ো ছড়িয়ে ওটসের হোয়াইট সস পরিবেশন করতে হবে । কেউ বেশি মাখন খেতে না চাইলে মাখনের সাথে অল্প সাদা তেল মিশিয়ে ব্যবহার করা যেতে পারে; তবে স্বাদের পরিবর্তন হবে।

ওটস বাটারমিল্ক বা ওটসের ঘোল

উপকরণঃ ওটস, দই, চিনি, লবণ, ভাজা মশলা (জিরা গুড়া এবং শুকনো লঙ্কা ভেঁজে ভেজে গুঁড়ো করা),  পানি  পরিমান মত।

প্রনালিঃ  উপরের সব উপকরণ ব্লেন্ডারে দিয়ে ভালো করে ব্লেন্ড করে নিলেই তৈরি ওটসের ঘোল। উপরে ভাজা মশলা ছড়িয়ে ঢকঢকিয়ে খেয়ে ফেলুন । দৈ’ইয়ের  সাথে সাথে ওটসের পুষ্টিও গরমের দিনে আপনার শরীরের প্রবেশ করবে।

লেবু ওটস (লেমন ওটস)

প্রয়োজনীয়  উপকরনঃ ওটস( কড়াই বা খোলাতে হাল্কা খয়েরি করে ভেজে নেওয়া ,হলুদ, লবণ, লেবুর রস, বাদাম (ভাজা বাদাদ্ম), তেল, শর্ষে, শুকনো লঙ্কা, কাঁচা লঙ্কা, হিং, বিউলি ডাল, কারিপাতা (বাসায় হিং, বিউলিডাল না থাকলে বাদ দিয়ে  দিতে পারেন) ।

প্রস্তুত প্রনালিঃ  কড়াইতে তেল গরম করে তাতে সর্ষে, শুকনো লঙ্কা, ডাল  দিন, গন্ধ বের হলে কাঁচা লঙ্কা, কারিপাতা এবং হিং দিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন। এবার  হলুদ,লবণ এবং পানি দিয়ে ভালো করে ফুটিয়ে নিন। অতঃপর ওটস দিয়ে অল্প আঁচে ডেকে রেখে  ৪/৫ মিনিট রান্না  করুন।  রান্না হয়ে গেলে লেবুর রস মিশিয়ে ভালো করে নাড়তে থাকুন।উপরে বাদাম, কারিপাতা ছড়িয়ে পরিবেশন করুন।

এ ছাড়াও  চুলায় ফুটানো গরম পানিতে পরিমাণ মতো ওটমিল নিয়ে ৫-১০ ফুটান। ঘন হয়ে এলে নামিয়ে নিন। স্বাদের জন্য এতে সামান্য লবণ যোগ করতে পারেন। এভাবেই একে খেয়ে ফেলতে পারেন।

ওটস কোথায় পাওয়া যায় এবং ওটসের দাম কেমন ?

কোয়েকার ওটস সুপার শপগুলোতে পাওয়া যায় শুধু খেয়াল রাখবেন অতিরিক্ত উৎসাহে আবার মসলা দেয়া ওটমিলের প্যাক কিনে আনবেন না যেন! ভালোভাবে প্যাকের গায়ের লেখা পরে পিওর ওটমিল কিনবেন।।ওটসের দাম সাধারনত  ১২০-৩৫০ টাকার মধ্যে ।  এছাড়া প্যাকেট জাত প্রক্রিয়া বিহীন ওটস পাওয়া যায় সেটি আরো ভাল কিন্তু দাম একটু বেশি । এটি আগোরা ,মিনাবাজার ,নন্দন , স্বপ্ন সহ প্রায় সব সুপার শপেই কিনতে পাবেন।

 

শেষ কথা

ওট আমাদের কাছে নতুন মনে হলেও হাজার বছর ধরে এই শস্যটি খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।ওটসের ছবি দেখে অনেকে একে গম বলে ভুল করতে পারেন।  ভীষণরকম উপকারী এই খাদ্যটি হর-হামেশাই সারা বিশ্বের মানুষ খাচ্ছেন ।এক কাপ ওটস এ ১৪০ ক্যালরি, তাতে ২দশমিক ৫ গ্রাম ফ্যট, ২৫ গ্রাম কার্বো হাইড্রেট, আর ৫ গ্রাম প্রোটিন আছে।  এর বীজের খোসা দিয়ে তৈরি হয় ঔষধ। ত্বকের সমস্যা , হৃদ রোগের ঝুঁকি হ্রাস, উচ্চ রক্ত চাপ নিয়ন্ত্র, ব্রেস্ট ক্যান্সারের ঝুঁকি হ্রাস সহ নানাবিধ রোগের বিরুদ্ধে  ওট কার্যকর। তাই দৈনিক খাদ্য তালিকায় একে রাখা যেতে পারে।

তথ্য সূত্রঃ নানা ব্লগ ও ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক