কাঞ্চনজঙ্ঘা বিশ্বে সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলোর মধ্যে একটি

কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমালয় হিমালয় পর্বতমালার পর্বতশৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট ও কে-টু র পরের অবস্থানে করছে। অর্থাৎ  এটি পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ, যার উচ্চতা ২৮ হাজার ১৬৯ ফুট বা ৮ হাজার ৫ শত ৮৬ মিটার। কাঞ্চনজঙ্ঘা নিয়ে আলোচনা করার পূর্বে আমাদের জানা দরকার পাহাড় আর পর্বতের পার্থক্য। আমাদের বেশিভাগ মানুষ এই শব্দ দু'টির  অর্থ বা মানে গুলিয়ে ফেলি।

পাহাড়ঃ সমভূমির চেয়ে উঁচু স্বল্পদূর বিস্তৃত ভূভাগকে পাহাড় বলে। পর্বতের তুলনায় পাহাড়গুলো নিচু ও কম আয়তন বিশিষ্ট। ভূগোলের ভাষায়- সমুদ্র সমতল হতে উচ্চে অবস্থিত ঢাল বিশিষ্ঠ্য শিলাস্তুপকে বলে পাহাড়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ছাড়াও বাংলাদেশের সিলেট, চট্টগ্রাম, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, বান্দরবানে বহু পাহাড় রয়েছে। সিলেটের পাথলিয়া, রাজকান্দি, বালিসারা ; রাঙ্গামাটির মৌদক মৌয়াল, রেংটিয়াং ; বান্দরবানের কেওক্রাডং, সাফা হাফং, মোদক মুয়াল; চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উদাহরণ।

পর্বতঃ ভূপৃষ্ঠের উপরে অতিশয় উঁচু বহুদূর বিস্তৃত শিলাস্তুপকে পর্বত (Mountain) বলা হয়। অর্থাৎ সমুদ্র সমতল হতে অতিউচ্চে অবস্থিত খাড়াঢাল বিশিষ্ঠ্য শিলাস্তুপকে বলা হয় পর্বত। 

পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশে পর্বত রয়েছে।  পাকিস্তানের সুলেমান, ভারতের হিমালয়, ইউরোপের আল্পস, পিরেনিজ, উল্লেখযোগ্য পর্বত।

পাহাড় এবং পর্বতের মধ্যে পার্থক্য কেবলমাত্র বিস্তৃতি ও উচ্চতার দিক দিয়ে। পাহাড় শব্দটি হলো বিশেষ্য আর পর্বত শব্দটি হলো বিশেষণ। এ ছাড়া পাহাড় ও পর্বত এই দুইয়ের মাঝে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। পাহাড়ে একটু কম ঝুঁকিপূর্ণ আর পর্বতে একটু বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ।

পাহাড় অপেক্ষাকৃত নিচু আর সবচেয়ে উঁচুগুলোকে বলে পর্বত। তাই মাউন্ট এভারেস্ট, কাঞ্চনজঙ্ঘা এগুলো পর্বত বা পর্বতশৃঙ্গ। আর পাহাড়ের চেয়ে নিচু জায়গাগুলোকে বলে টিলা। পৃথিবীতে অসংখ্য পাহাড়, পর্বত ও টিলা ছড়িয়ে রয়েছে। এগুলোর মধ্যে আবার কতগুলো বিখ্যাত স্বকীয় রূপে।

কাঞ্চনজঙ্ঘা 'র ভৌগলিক পরিচিতি 

পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি বরফের মজুদ হল উত্তর মেরু আর দক্ষিণ মেরুতে। এ  দুই মেরুর বাইরে সবচেয়ে বেশি বরফ ধারণ করে রেখেছে হিমালয় পর্বতমালা। আর হিমালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যাবেন মনে হবে, সূর্যের সব রঙ-ই যেন নিজের মধ্যে ধারণ করে রেখেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা নামে হিমালয়ের সর্বোচ্চ পর্বতের একটি । সূর্যের আলো বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্ষণে ক্ষণে পাল্টাতে থাকে হিমালয় ও কাঞ্চনজঙ্ঘার রূপ। প্রথমে টুকটুকে লাল, হঠাৎ সেই লাল পাল্টে হয়ে যায় কমলা রঙ, তারপর হলুদ, সবশেষে সাদা।

কাঞ্চনজঙ্ঘা শব্দটি শুনে তৎসম কাঞ্চন + জঙ্ঘা মনে হলেও আসলে নামটি সম্ভবতঃ স্থানীয় শব্দ "কাং চেং জেং গা" থেকে এসেছে, যার অর্থ তেঞ্জিং নোরকে তাঁর বই ম্যান অফ এভারেস্ট ( "Man of Everest")-এ লিখেছেন " তুষারের পাঁচ ধনদৌলত "। এটির পাঁচ চূড়া আছে তাদের চারটির উচ্চতা ৮, ৪৫০ মিটারের ওপরে। এ ধনদৌলত ঈশ্বরের পাঁচ ভান্ডারের প্রতিনিধিত্ব করে, স্বর্ণ, রূপা, রত্ন, শস্য, এবং পবিত্র পুস্তক।

ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত কাঞ্চনজঙ্ঘার রয়েছে চমকপ্রদ এক ইতিহাস! কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমালয় পর্বতমালার পর্বতশৃঙ্গ। মাউন্ট এভারেস্ট ও কে২ এর পরে এটি পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম পর্বতশৃঙ্গ যার উচ্চতা ৮,৫৮৬ মিটার (২৮,১৬৯ ফুট)।এটি ভারতের সিকিম রাজ্যের সঙ্গে নেপালের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তে অবস্থিত। হিমালয় পৰ্বতের এই অংশটিকে কাঞ্চনজঙ্ঘা হিমল বলা হয়। এর পশ্চিমে তামূর নদী, উত্তরে লহনাক চু নদী এবং জংসং লা শৃঙ্গ, এবং পূর্বদিকে তিস্তা নদী অবস্থিত।

কাঞ্চনজঙ্ঘা মাউন্ট এভারেস্টের ১২৫ কিঃমিঃ পূর্ব-দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অবস্থিত। এটা হিমালয়ের দ্বিতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ। এর পাঁচটি মূল শৃঙ্গের মধ্যে তিনটা – মুখ্য, কেন্দ্ৰীয় এবং দক্ষিণ – ভারতের উত্তর সিক্কিম জেলায়, এবং নেপাল সীমান্তে অবস্থিত।বাকী দুটি শৃঙ্গ নেপালের তাপ্লেজুং জেলায় অবস্থিত।

কাঞ্চনজঙ্ঘা-মুখ্য ভারতের সৰ্বোচ্চ শৃঙ্গ, এবং একদম পূর্বদিকের পর্বতের মধ্যে ৮,০০০ মিটার (২৬,০০০ ফুট) এর অধিক উচ্চ। পাঁচটি পর্বতচূড়ার কারণে একে “তুষারের পাঁচটি ঐশ্বৰ্য” বলা হয় এবং সিক্কিম এবং দার্জিলিংয়ের স্থানীয় লোকেরা একে পবিত্র মনে করে পূজা করে।

১৮৫২ সালের আগে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে পৃথিবীর সৰ্বোচ্চ শৃঙ্গ বলে ধারণা করা হত।কিন্তু ১৮৪৯ সালে ভারতের বৃহৎ ত্রিকোণমিত্রিক জরীপে বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর জানা গেল যে পিক XV বলে পরিচিত মাউন্ট এভারেস্টই হচ্ছে পৃথিবীর উচ্চতম পর্বত শৃঙ্গ।

জয়ী ব্রাউন আর জর্জ ব্যান্ড নামে দুইজন ব্রিটিশ পর্বত আরোহী সর্ব প্রথম ১৯৫৫ সালের ২৫ মে কাঞ্চনজংগা সামিট করেন। আরো কিছু পুনঃনিরীক্ষণ করার পর ১৮৫৬ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয় যে কাঞ্চনজঙ্ঘা পৃথিবীর তৃতীয় উচ্চতম শৃঙ্গ।

কাঞ্চনজঙ্ঘা দর্শন

কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিট করতে হলে আপনাকে যেতে হবে নেপাল কিংবা ভারতের সিকিম। ভারতের দার্জিলিং থেকে শুরু হয় এক্সপিডিশন। আপনি যদি কাঞ্চনজঙ্ঘার চূড়ায় আরোহন করতে চান সে ক্ষেত্রে আপনাকে পায় ২০০০০-২৫০০০০ ডলারের উপরে খরচ করতে হবে। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জন্যেও একটা বড় এমাউন্ট বের হয়ে যাবে। আপনি দার্জিলিং গেলে  দূর থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য দেখতে পারবেন।  

কাঞ্চনজঙ্ঘার পাঁচটি চূড়ার মধ্যে তিনটি চূড়া পড়েছে উত্তর সিকিমে আর দু’টি নেপালের মেচি জোনের তাপলেজাং জেলায়। কাঞ্চনজঙ্ঘার সুউচ্চ এই চুড়া কাছ থেকে দেখা যায় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দার্জিলিং জেলা শহর থেকে ১১ কিলোমিটার দুরে টাইগার হিলে দাঁড়িয়ে। যেখানকার উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে ২ হাজার ৫৯০ মিটার বা ৮ হাজার ৪৮২ ফুট।

 এই উচ্চতা থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘার সরাসরি দূরত্ব ৭৯.৮ কিমি। সূর্যোদয়ের সময় পাহাড়ের মাঝ দিয়ে সূর্য উদয় হয়ে আলো ছড়ায় বরফে আচ্ছাদিত রুপালি কাঞ্চনজঙ্ঘায়। অপরুপ সেই দৃশ্য দেখতে টাইগার হিলে ভিড় করেন বিভিন্ন দেশের হাজারও পর্যটক। আকাশে মেঘ থাকলে দৃশ্যটি দেখার সুযোগ কমে যায়। সেখান থেকে অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত দৃশ্যমান থাকে কাঞ্চনজঙ্ঘা।

আশা কথা হল আপনি পঞ্চগড়ের তেতুলিয়া থেকেও কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখে পেতে পারেন। পাসপোর্ট আর ভিসার মাধ্যমে যেতে না পারা ভ্রমণ পিপাসুরা প্রকৃতির এই সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে চলেন তেঁতুলিয়ায়।  পঞ্চগড় হলো বাংলাদেশের সর্বউত্তরের জেলা যেখান থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়, যার তিন দিকেই ভারতের প্রায় ২৮৮ কিলোমিটার সীমানা-প্রাচীর দিয়ে ঘেরা। এর উত্তর দিকেই ভারতের দার্জিলিং জেলা। 

পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলা সদরে একটি ঐতিহাসিক ডাকবাংলো আছে। এর নির্মাণ কৌশল অনেকটা ভিক্টোরিয়ান ধাঁচের। জানা যায়, কুচবিহারের রাজা এটি নির্মাণ করেছিলেন। ডাকবাংলোটি জেলা পরিষদ পরিচালনা করে। এর পাশাপাশি তেঁতুলিয়া উপজেলা পরিষদ একটি পিকনিক স্পট নির্মাণ করেছে। ওই স্থান দুটি পাশাপাশি অবস্থিত হওয়ায় সৌন্দর্যবর্ধনের বেশি ভূমিকা পালন করছে। সৌন্দর্যবর্ধনে এ স্থান দুটির সম্পর্ক যেন মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। মহানন্দা নদীর তীরঘেঁষা ভারতের সীমান্তসংলগ্ন (অর্থাৎ নদী পার হলেই ভারত) সুউচ্চ গড়ের ওপর সাধারণ ভূমি থেকে প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিটার উঁচুতে ডাকবাংলো ও পিকনিক স্পট অবস্থিত। 

তেতুলিয়া থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা ছবিঃ Abu Nayeem Lemon

ডাকবাংলোর বারান্দায় দাঁড়ালে আপনার চোখে পড়বে ভারত-বাংলাদেশের অবারিত সৌন্দর্য। ওই স্থান থেকে হেমন্ত ও শীতকালে কাঞ্চনজঙ্ঘার সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। 

তেঁতুলিয়া থেকে সারা বছর-তো আর কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়না! সাধারণতঃ অক্টোবরের মাঝামাঝি থেকে নভেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত আকাশে যখন মেঘ থাকেনা, আবার কুয়াশাও পড়া শুরু হয়নি । শুধুমাত্র তখনই তেঁতুলিয়া থেকে দেখা যায় বরফে ঢাকা ধবল পাহাড়ের চুড়া  মেঘমুক্ত আকাশে স্পষ্ট দেখা যায় বরফে ঢাকা পাহাড়ের চূড়া। রাতে দেখা যায় শিলিগুড়ির উজ্জ্বল আলো। পাহাড়েরই অপর ঢালে স্বপ্নপুরী দার্জিলিং। বরফে ঢাকা কাঞ্চনজঙ্ঘার ওপর দিনের প্রথম সূর্যোদয়ের সূর্যকিরণের ঝিকিমিকি দৃশ্য সত্যিই মুগ্ধতার মোহ ছড়ায়।

কিন্তু মাঝেমাঝে এই সময়টায় মেঘ এসে আপনার মন খারাপ করে দিতে পারে কাঞ্চনজঙ্ঘাকে আড়াল করে। তাই ছবির মত কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে হলে আবহাওয়া, মেঘ, কুয়াশার পাশাপাশি নিজের ভাগ্যটাকেও সুপ্রসন্ন থাকতে হবে!

আপনারা যারা ঢাকা থেকে শুধু ‘তেতুলিয়া’ আর ‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’ দেখতে আসবেন তারা চাইলে ১দিনের মধ্যে দেখে আবার চলে যেতে পারবেন। আর যারা সময় নিয়ে আসবেন পুরো পঞ্চগড় দেখার জন্য তাদের হিসেব আলাদা।

তথ্য ও ছবিঃ উইকিপিডিয়া, নানা ওয়েব পোর্টাল , ফ্লিকার , ফেসবুক

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক