অপরুপ সৌন্দর্য্যের আধার কাপ্তাই হ্রদ

বাংলাদেশের ভ্রমণ পিয়াসু মানুষের চেক লিস্টে সবার উপরের দিকে থাকা একটি নাম হল কাপ্তাই হ্রদ । কাপ্তাই হ্রদ ঘুরতে গিয়েে অনেকের ভ্রমণ জীবন শুরু হয়। আবার অনেকে হয়ত কাপ্তাই হ্রদের নাম শুনেছেন কিন্ত এখনো দেখা হয় নি বা যাব যাব করেও সময়ের অভাবে যাওয়া হয় নি।

আমাদের দেশটা যে সত্যিই অনেক সুন্দর কাপ্তাই হ্রদ দেখার পরে হয়ত আপনার উপলব্ধি হবে। শুধুমাত্র অবারিত মাঠ নয় আছে পাহাড় ঝর্ণা, আরো আছে অনেক কৃত্রিম স্থাপনা । সব দেখে নিজের অজান্তেই দেখবেন মনে পড়বে " এমন দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি সকল দেশের রানী সে যে আমার জন্মভূমি। 

কাপ্তাই হ্রদের স্বচ্ছ জলরাশি আর সবুজ পাহাড়ের অপরূপ সৌন্দর্য প্রবলভাবে পর্যটকদের কাছে টেনে নেয়। আছে লেকে নৌভ্রন আর কায়াক চালানো যা আপনাকে প্রকৃতির খুব কাছে পৌছে দেয়। প্রকৃতি এখানে অকৃপণ হাতে তার কতটা রূপ-সুধা ঢেলে দিয়েছে তা’ দূর থেকে কল্পনা করাও সম্ভব নয়। 

রাঙ্গামাটি ঝুলন্ত ব্রিজ

ঝুলন্ত ব্রিজ- রাঙ্গামাটি

নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। কাপ্তাই লেককে ঘিরেই মূলত রাঙামাটি জেলার পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে। কাপ্তাই লেক বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের রাঙামাটি জেলার একটি কৃত্রিম হ্রদ। কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলি নদীর উপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হলে রাঙামাটি জেলার ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় এবং এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। কৃত্রিম এ হ্রদের আয়তন ২৯২ বর্গমাইল। এ হ্রদের সাথে কর্ণফুলী, কাচালং আর মাইনী নদীর রয়েছে নিবিড় সংযোগ। 

হ্রদের ইতিহাস

কাপ্তাই হ্রদ মূলত কর্ণফুলী হ্রদের আঞ্চলিক নাম। ২৫৬ বর্গমাইল আয়তনের হ্রদ দেশি-বিদেশি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। এ হ্রদটি কিন্ত প্রাকৃতিক নয়। এটি মানুষের বানানো একটি কৃত্রিম হ্রদ। কর্ণফুলি নদীর পানি ধরে এ অঞ্চলে জল বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয় । এ উদ্দেশ্যে কর্ণফুলি পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের জন্য ১৯৫৬ সালে কর্ণফুলি নদীর উপর কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ করা হয় ।

বাঁধ নির্মানের কাজ পাকিস্থান আমলে ১৯৫৬ সালে শুরু হলেও ব্রিটিশ আমলে ১৯০৬ সালে প্রথম বাঁধ নির্মাণের জন্যে উদ্যোগ নেওয়াহয়। এ পরে ১৯২৩ সাল বাঁধ নির্মাণের জন্যে জরিপ ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়। বারকাল নামক স্থানে ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ প্রকৌশলী ই. এ. মুর বাঁধ নির্মানের প্রস্থাব করেন। এর পরেও বেশ কয়েকবার শ্তান পরিবর্তন করে ১৯৫১ সালে বাঁধের বর্তমান স্থান নির্ধারণ করা হয়। 

বাঁধ নির্মান করতে আমেরিকার সরকার অর্থ সহায়তা দিবে বলে জানায়।  বাঁধ নিমার্ণের জন্যে উটাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেশন নামক কোম্পানিকে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। 

বাঁধ নির্মাণের ফলে রাঙামাটি জেলার ৫৪ হাজার একর কৃষি জমি ডুবে যায় এবং এ হ্রদের সৃষ্টি হয়। 

কাপ্তাই লেক ভিউ

পাকিস্তান সরকার ১৯৫৬ সালে আমেরিকার অর্থায়নে কাপ্তাই বাঁধ নির্মাণ শুরু করে। এ বাঁধের নির্মাণ কাজ শেষ হয় ১৯৬২ সালে। ইন্টারন্যাশনাল ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং ইউতাহ ইন্টারন্যাশনাল ইনকর্পোরেট ৬৭০.৬ মিটার দীর্ঘ ও ৫৪.৭ মিটার উচ্চতার এ বাঁধটি নির্মাণ করে। এ বাঁধের পাশে ১৬টি জলকপাট সংযুক্ত ৭৪৫ ফুট দীর্ঘ একটি পানি নির্গমন পথ বা স্প্রিলওয়ে রাখা হয়েছে। এ স্প্রিলওয়ে প্রতি সেকেন্ডে ৫ লাখ ২৫ হাজার কিউসেক ফিট পানি নির্গমন করতে পারে। পানি ব্যবহার করে টার্বাইন ঘুরিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়। এ প্রকল্পের জন্য তখন প্রায় ২৫ কোটি ৪০ লাখ টাকা বাজেট নির্ধারণ করা হলেও পরে তা ৪৮ কোটি ছাড়িয়ে যায়।

কাপ্তাই হ্রদের কারনে ঐ এলাকার মোট কৃষি জমির প্রায় ৪০ শতাংশ পানির নীচে তলিয়ে যায়। একই সাথে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের প্রায় ২৯ বর্গমাইল ও অশ্রেনীভুক্ত ২৩৪ বর্গমাইল এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এ সময় প্রায় ১৮ হাজার পরিবারের মোট এক লাখ মানুষ তাদের বাড়ি ঘর ছেড়ে দিতে হয়। 

দুঃখজনক ব্যাপার হল, এই এক লক্ষ মানুষকে ঠিক মত পুনর্বাসন করা হয় নি। আদিবাসীদের মতমত, তাদের জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিকে কোন গুরুত্ব দেওয়া নি। বাঁধ নির্মানের জন্যে বরাদ্ধ দেওয়া হলেও পুনর্বাসনের জন্য তেমন বরাদ্ধ রাখা হয় নি। বাঁধ নির্মানের কাজ শুরু হলে অনেক মানুষকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় করে কাসালং উপত্যকায় নিয়ে আসা হয়। 

বাঁধ নির্মান যখন ১৯৬২ সালে শেষ হয় তখন সে এলাকাও প্লাবিত হয়ে যায় ! এর পরে আর পাকিস্থান সরকার পুনর্বাসনের জন্যে তেমন উদ্যোগ নেয় নি। অবশ্য তখন সরকারও আর্থিক সংকটের কারনে পারে নি। 

একই সাথে তাদের চাষযোগ্য জমি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও সেটি আর রক্ষা করা সম্ভব হয় নি। আর্থিক যে ক্ষতিপূরন দেওয়া হয় সেটি ছিল নাম মাত্র। বাঁধ এলাকায় যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে তাদেরকে হেক্টরপ্রতি পাঁচশত থেকে সাতশত টাকা দেওয়া হয়েছে, যেখানে একই পরিমাণ উর্বর জমি কিনতে খরচ করতে হয় প্রায় পাঁচ হাজার টাকা। ফলে ন্যায্য অধিকার থেকে আদিবাসীরা বঞ্চিত হয়। 

প্লাবিত হবার আশংকায় এদিকে,  বর্তমান বাঁধের আরো উজানে বিকল্প একটি স্থান বাঁধ নির্মাণের জন্য প্রস্তব করা হয়েছিল। কিন্তু প্রস্তাবিত সেই স্থানটি ভারতের সীমান্তরেখার কাছাকাছি হওয়ায় রাজনৈতিক সংবেদনশীলতার কথা ভেবেই তা বাদ দেওয়া হয়। 

নিজ আবাসভূমি থেকে বিতাড়িত হয়ে প্রায় চল্লিশ হাজার চাকমা ভারতের অরুণাচলে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে যাদের "পরিবেশগত কারণে সৃষ্ট শরণার্থী' হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। অরুণাচল প্রদেশে আশ্রয় নেওয়া এই চাকমারা এখনো রাষ্ট্রহীন, ভারত কিংবা বাংলাদেশ কোনো দেশেরই নাগরিকত্ব নেই এই ভুক্তভোগীদের। 

অপরুপ সৌন্দর্যের আধার এ হ্রদ

কর্ণফুলী নদীর উপর বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য নির্মিত বাঁধ নির্মাণ করা হলে এই লেকটি সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। আশেপাশে পাহাড় এবং লেকের পানির নীচ থেকে পাহাড় ও উঁচু ভূমি দেখা যাওয়ায় লেকের সৌন্দর্য বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়। 

কাপ্তাই লেক শুধুমাত্র বাংলাদেশের না এমন কি দক্ষিন পূর্ব এশিয়ায় মানুষের সৃষ্টি বৃহত্তম কৃত্রিম স্বাধু পানির হ্রদ। প্রথমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্যে হ্রদের তৈরি করা হলেও এ জলাধার প্রচুর পরিমাণে মিঠা পানির মাছের উৎপাদন হয়। একই সাথে নৌবিহার, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও কৃষি কাজেও এর অবদান উল্লেখযোগ্য। 

পার্বত্য চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে (২২°০৯´ উত্তর অক্ষাংশ ও ৯২°১৭´ পূর্ব দ্রাঘিমাংশ) কর্ণফুলি নদীতে  বাঁধ দেওয়ার কারণে হ্রদটি গড়ে ওঠে। হ্রদের মূল এলাকার আয়তন প্রায় ১৭২২ বর্গ কিলোমিটার হলেও বাঁধ দেওয়ার ফলে আশে পাশে আরো প্রায় ৭৭৭ বর্গ কিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়ে এর সাথে যুক্ত হয়। রাঙ্গামাটি জেলার রাঙ্গামাটি সদর, কাপ্তাই, নানিয়ারচর, লংগদু, বাঘাইছড়ি, বরকল, জুরাছড়ি ও বিলাইছড়ি উপজেলা জুড়ে এর বিস্তৃতি। 

লেকটি ইংরেজি বর্ণ এইচ (H) আকৃতির। লেকের দুটি বাহুর একটি সুভলং এর কাছে সংকীর্ণ গিরিসঙ্কট দ্বারা সংযুক্ত যা কর্ণফুলি নদীর গতিপথের একটি অংশ। হ্রদের ডান বাহু অর্থাৎ কাসালং দক্ষিণ দিকে দুটি অন্তঃপ্রবাহী নদী মাইনি ও কাসালং দ্বারা এবং পাশ দিয়ে কর্ণফুলি নদী দ্বারা পুষ্ট। রাঙ্গামাটি-কাপ্তাই, অর্থাৎ বাম বাহুটি দুটি নদী, উত্তরে চেঙ্গী (বা চিংগ্রী) ও দক্ষিণে রাইনখিয়াং দ্বারা পুষ্ট। কর্ণফুলি নদী তিনটি প্রধান শাখার জন্ম দিয়েছে- একটি রাঙ্গামাটিতে, একটি ধুলিয়াছড়িতে ও অপরটি কাপ্তাইয়ে। রাঙ্গামাটি ও ধুলিয়াছড়ি শাখাদ্বয় বর্তমানে কাপ্তাই বাঁধ দ্বারা সৃষ্ট জলাধারের অধীনে। 

এ হ্রদের মধ্যে কর্ণফুলি উপত্যকার প্রায় সব অংশ ও চেঙ্গী, কাসালং ও রাইনখিয়াং নদীর নিন্ম অববাহিকাসমূহ তলিয়ে আছে। এ হ্রদের তীর অনিয়মিত। হ্রদটির গড় গভীরতা ৯ মিটার, সর্বোচ্চ গভীরতা ৩২ মি। 

রিজার্ভ বাজার ঘাট - রাঙ্গামাটি

রিজার্ভ বাজার ঘাট - রাঙ্গামাটি

স্থানীয় লোকজন লেকের চারপাশে হ্রদের প্রতিরক্ষামূলক গাছপালা উজাড় করে ফেলায় বর্ষাকালে শিলাপাথর ক্ষয় হচ্ছে। একই সাথে তীর ন্যাড়া করে ফেলায় ভুমিধ্বস দেখা দিচ্ছে। এত দিন গাছ শিলাপাথর আর মাটি ধরে রাখলেও গাছ কেটে ফেলায় এসব আলগা শিলা ঢাল বেয়ে নদিতে পড়ে কাপ্তাই লেক ভরাট করে ফেলছে। নববইয়ের দশকের প্রথম দিকে যখন হ্রদটির বয়স ৩০ বছর, তখনই এর প্রায় ২৫% ভরাট হয়ে আসে। 

লেকটির মাধ্যমে একটি বৈচিত্রপূর্ণ ও দীর্ঘ জলপথের সৃষ্টি হয়েছে। লেক সৃষ্টি হবার আগে যেখানে অনেক জায়গায় যেতে সারাদিন বা তারও বেশি লেগে যেত, এখন সেখানে স্পিড বোট বা লঞ্চে যেতে লাগছে মাত্র কয়েক ঘন্টা সময়। 

হ্রদটির আনুমানিক আয়ুষ্কাল ৯০ বছর যার পর এর তলদেশ পলিপাথরের আস্তরণে সম্পূর্ণ মজে যাওয়ার কথা। সে পর্যন্ত হ্রদটি হ্যাচারী ও মৎস্য উৎপাদনের মূল্যবান আধার হিসেবে চালু থাকবে। জলাধারের উৎপাদিত মাছ স্থানীয় চাহিদা মিটিয়েও দেশের অন্যান্য এলাকায় চালান করা হয়।

কি দেখবেন ?

উঁচু-নিচু পাহাড়-পর্বত, পাহাড়ি ঝরনাধারা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা, অথৈ পানি আর সবুজের সমারোহ, গাঢ়-সবুজ বন, গাছ-গাছালি ফুল-ফল আর উপজাতিদের জীবনধারা কাপ্তাই লেকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

রাঙ্গামাটি এবং কাপ্তাইকে সংযোগকারী সড়কটি পাহাড়ের অভ্যন্তর দিয়ে চলে গিয়েছে এবং এই সড়কে রাঙ্গামাটির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ছাড়াও বন্যপ্রাণীর দেখা পাওয়া যায়। নৈসর্গিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি রাঙামাটি পার্বত্য জেলা। কাপ্তাই লেককে ঘিরেই মূলত রাঙামাটি জেলার পর্যটন শিল্প গড়ে উঠেছে। এই লেকের উপর রয়েছে বিখ্যাত ঝুলন্ত ব্রীজটি। লেকের দুই ধারই পাহাড়-টিলা দিয়ে ঘেরা। ট্রলার ভাড়া করে লেকে ভ্রমণ করা যায়, যাওয়া যায় শুভলং জলপ্রপাতে।

টি এন্ড টি পাহাড় থেকে দেখা শুভলং বাজার

ছোট ছোট কিছু দ্বীপ ও কাপ্তাই লেক এ রয়েছে, যাদের আছে মজার মজার কিছু নাম, যেমন পেদা টিং টিং, টুক টুক ইকো, চাং পাং ইত্যাদি। পেদা টিং টিং দ্বীপে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা আছে, এখানে বসে পূর্ণিমা রাতের অসাধরণ রূপ উপভোগ করা যায়, টুক টুক এ আছে ইকো পার্ক। এছাড়া শুভলং পাহাড়ি ঝর্ণার মন মাতানো রুপের পরশ আর সাথে সবুজের অবারিত দ্বারতো উন্মুক্ত রইলোই। এদের সবগুলোই উঁচু টিলা। আর এখান থেকে দেখলে, লেক-এর সৌন্দর্য আরো মনোরম, চোখ ফেরানো যায় না। 

কাপ্তাই গেলে আমরা অন্তত সবাই ঝুলন্ত ব্রিজে একবার হলেও যাই । সোস্যাল মিডিয়াতে জানান দিতে একটা ছবি তো অন্তত তুলতে হবে নাকি। 😛  যাই হোক রাঙ্গামাটি গেলে আমরা সাধারনত ঝুলন্ত ব্রিজ বা তবলছড়ি ঘাট থেকে নৌকা রিজার্ভ নিয়ে কাপ্তাই লেক ঘুরে দেখার পাশাপাশি রাঙ্গামাটির রাঙ্গামাটি শহর সহ আরও অনেক স্পট ঘুরে দেখতে পারবেন। সাধারনত আমরা কাপ্তাই লেক, শুভলং ঝর্ণা, বিজিবি ক্যাম্প,  জুম রেস্তোরা, চা-বাগান এগুলো ঘুরে দেখি। 

কাপ্তাইয়ের আসল রুপ উপভোগ করতে চাইলে স্থলপথে চলে যান কাপ্তাই জলবিদ্যুত কেন্দ্রের গেটে। কাপ্তাই পানি বিদ্যুৎ কেন্দ্র খুব সুন্দর তবে এটি খুবই রেস্ট্রিক্টেড এলাকা হওয়ায় এখানে ঢুকতে পার্মিশন নিয়ে যেতে হয়, জায়গাটি অসম্ভব সুন্দর তবে এখানে ছবি তুলা সম্পূর্ণ নিষেধ।এবার পায়ে হেটে চলে যান নৌকা ঘাট। ঘন্টা চুক্তিতে নৌকায় বা স্পীড বোটে উঠে পড়ুন। ঘুরে দেখতে থাকুন কাপ্তাই  লেকের নীল পানি আপনার পাশে পাবেন নীলাকাশ আর গাছের সবুজ সমারোহ। 

পাহাড় থেকে লেকের সৌন্দর্য উপভোগ করতে কাপ্তাই লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পট থেকে ঘুরে আসা যায়। বানৌজা শহীদ মোয়াজ্জম নৌ ঘাঁটি পরিচালিত লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পটটি বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থিত।এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে আছে নৌবাহিনী।পাহাড়ঘেরা লেকের মধ্যে এর অবস্থান।এখানে প্রায় ২০ টি বিনোদন কেন্দ্র রয়েছে।আছে খেলাধূলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা।লেক প্যারাডাইসের অন্যতম আকর্ষণ হলো পর্বতিয়া গ্রীণহল স্পটটি।

লেক প্যারাডাইসে এসে সুসজ্জিত আকর্ষণীয় সিঁড়ি ভেঙ্গে অনেক গভীরে নামলে ভাসমান রেস্টুরেন্টের দেখা পাওয়া যাবে। চারদিকে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশ থাকায় অনেক সিঁড়ি বেয়ে উঠানামা করলেও আপনি ক্লান্তি অনুভব করবেন না। দল বেঁধে নৌ বিহার কিংবা প্যাডেল বোটে চড়ে লেক ভ্রমণ করার সুযোগও রয়েছে এখানে। 

জীবতলী সেনানিবাসে লেকশোর পিকনিক স্পটের অবস্থান। কাপ্তাই লেকের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য দেখার জন্য এটি  খুব পরিচিত। পিকনিক স্পটের পাশে রয়েছে অসংখ্য গাছপালা সমৃদ্ধ পাহাড়।পাহাড় আর লেকের এ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেকোন মানুষের মনকে ছুঁয়ে যাবে। শিশুদের জন্য এখানে রয়েছে খেলাধুলার ব্যবস্থা।পাশেই  পাবেন সেনাবাহিনীর হেলিপ্যাড। ইচ্ছা করলে হেলিপ্যাড থেকেও ঘুরে আসতে পারেন।হেলিপ্যাডের চারপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ আপনাকে বিমোহিত করবেই।

যেতে পারেন জাতীয় উদ্যানে । মাথা নষ্ট সৌন্দর্য, না দেখলে বুঝতে পারবেন না। ১০ টাকা করে টিকেট কেটে পুরোটা ঘুরে বেড়াতে হয়ত ঘণ্টা দেড়েক লাগবে না। কিন্তু সমস্যা আছে... সমস্যা হল এই সৌন্দর্য দেড় ঘণ্টায় দেখার না, এমন প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্যের মাঝে সারা দিন বসে থাকতে মন চাইবে। 

এছাড়া কাপ্তাইয়ের কাছেই কর্ণফুলি নদীতে কায়াকিং করার ব্যবস্থা আছে। চাইলে সেই অভিজ্ঞতাও নিতে পারবেন। ক্যাবল কারের চড়ার মজা নিতে চাইলে যাবেন শেখ রাসেল ইকোপার্কে।

কিভাবে যাবেন রাঙ্গামাটি

রাঙ্গামাটিতে আপনি বিভিন্নভাবে পৌছাতে পারেন। রাঙ্গামাটিতে চলাচলকারী বাসগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ হানিফ, ইউনিক, সাউদিয়া, এস আলম, শ্যামলী ইত্যাদি। প্রায় ৬০০/- টাকা ভাড়ায় ৭ ঘণ্টা থেকে ৮ ঘণ্টায় আপনি ঢাকা থেকে রাঙ্গামাটিতে পৌঁছে যাবেন। শ্যামলী পরিবহনের একটিমাত্র এসি বাস ছাড়া রাঙ্গামাটিতে কোন এসি বাস চলাচল করেনা। এছাড়া আপনি ঢাকা থেকে চট্রগ্রামে বাসে যেতে পারেন এবং সেখান থেকে বাসে করে রাঙ্গামাটিতে পৌছাতে পারেন। 

আবার চাইলে আপনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে ট্রেনে গিয়ে সেখান থেকে বাসে করে রাঙ্গামাটি পৌঁছাতে পারে। তবে, ঢাকা থেকে বাসে করে সরাসরি রাঙ্গামাটিতে যাওয়াই সহজ এবং ভাল হয়। 

কোথায় থাকবেন ?

আপনি যদি রাঙ্গামাটিতে কক্সবাজারের মত হোটেল মোটেল প্রত্যাশা করেন তাহলে আপনাকে হতাশ হতে হবে। কাপ্তাইয়ে এখনো তেমন ভাল  মানের বাণিজ্যিক হোটেল-মোটেল গড়ে উঠে নি। যদি এখানে রাত কাটাতে চান তাহলে আগে থেকেই কাপ্তাইয়ের সরকারী রেস্ট হাউজে যোগাযোগ করে আসতে পারেন। এছাড়াও অনুমতি সাপেক্ষে  সেনাবাহিনী, পিডিবি, পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং বন বিভাগের রেস্ট হাউসগুলোতে কম খরচে রাত্রি যাপন করা যায়। লেক প্যারাডাইস পিকনিক স্পটেও রাত্রী যাপনের সুযোগ রয়েছে তবে এজন্য বাড়তি অর্থ গুনতে হতে পারে।

কিছু হোটেলের নাম ও ফোন নাম্বার দেওয়া হলঃ হোটেল গোল্ডেন হিল : রিজার্ভ বাজার, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ 01820-304714, হোটেল গ্রিন ক্যাসেল : রিজার্ভ বাজার, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ 61200, হোটেল সুফিয়া : কাঁঠালতলী, রাঙ্গামাটি, ফোনঃ 62145। 

সতর্কতাঃ অনুগ্রহপূর্বক প্রকৃতির ক্ষতি হয় এমন কিছু করা থেকে বিরত থাকুন ।দয়াকরে আপনারা যারা ঘুরতে যাবেন কেউ পানিতে চিপস্ প্যাকেট,প্লাস্টিক বোতল এই ধরনের কিছু ফেলবেন না। আপনার ফেলে দেওয়া পলিথিন জাতীয় পদার্থগুলো লেকের সৌন্দর্য নষ্ট করবে একই সাথে লেকের পরিবেশ দূষিত করবে। 

শেষ কথা

কাপ্তাই বাংলাদেশের অন্যতম একটি সুন্দর পর্যটক এলাকা। বাংলাদেশ সরকারের পর্যটন কর্পোরেশনসহ বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা কাপ্তাই ভ্রমনের জন্য আকর্ষণীয় প্যাকেজ দিয়ে থাকে। কাপ্তাই লেকে নৌকা ভ্রমন করে আপনি এখানকার পিকনিক স্পট, বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, ঐতিহাসিক স্থাপনা দেখার পাশাপাশি এখানকার ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।

তথ্যের জন্যে উইকিপিডিয়া, ভ্রমন গাইড, টিওবি'র সাহায্য নেওয়া হয়েছে আর ছবি নেওয়া হয়েছে ফ্লিকার এবং টিওবি থেকে। 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক