চর্যাপদঃ বাংলা সাহিত্যের প্রাচীন নিদর্শন

বাংলা সাতিহ্যের কথা আসলে আমাদের মনে আসে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর,কাজী নজরুল ইসলাম, শরৎচন্দ্র কিংবা হুমায়ূন আহমেদ প্রমুখ প্রথিতযশা সাহিত্যিকের নাম। তারা আমাদের কাছে বাংলা সাহিত্যকে নিয়ে গিয়েছেন অন্য রকম উচ্চতায়। কিন্ত তাদের উত্তরসূরী কারা ছিল বা তাদের বর্তমান সাহিত্যচর্যার বর্তমান ধারা কোথা থেকে এসেছে ? একটা ধারা তো এক দিনেই আসে না যুগ যুগ বা শতাব্দির পর শতাব্দি লেগে যায়। 

বাংলা সাহিত্যের আদিরূপ হল চর্যাপদ। বাংলা ভাষার প্রাচীনতম কাব্য তথা সাহিত্য নিদর্শন হলো এই চর্যাপদ। বাংলা ভাষার উৎস ধরা হয় যে ভাষাকে, অর্থাৎ ‘নব্য ভারতীয় আর্যভাষা’, তারও প্রাচীনতর নিদর্শন চর্যাপদ। প্রায় এক হাজার বছর পূর্বে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল। 

চর্যাপদ কি , কবে রচনা হয়েছিল?

চর্যাপদ বাংলা ভাষার প্রাচীনতম পদ সংকলন তথা সাহিত্য নিদর্শন। নব্য ভারতীয় আর্যভাষারও প্রাচীনতর রচনা এটি।  এটি বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম, এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের একমাত্র নিদর্শন। এখন পর্যন্ত বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনযুগের এই একটাই নিদর্শন পাওয়া গেছ।  তবে তার মানে এই নয়, সে যুগে বাংলায় আর কিছু লেখা হয়নি বা তার আগে লেখা হয় নি। হতে পারে লেখা হয়েছিল, কিন্তু সংরক্ষিত হয়নি।

প্রাপ্ত চর্যাপদগুলো খ্রিস্টীয় অষ্টম হতেে দ্বাদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে। তবে বিভিন্ন গবেষকগণ এই পুথির পদগুলোর রচনাকাল সম্পর্কে বিভিন্ন মতামত দিয়েছেন। এর ভিতরে উল্লেখযোগ্য কিছু মত দেওয়া হলো। যেমন‒

  •  সুনীতি চট্টোপাধ্যায়ঃ খ্রিষ্টীয় ৯০০ হইতে ১২০০-র মধ্যে রচিত "চর্য্যাপদ" নামে পরিচিত কতকগুলি বৌদ্ধ সহজিয়া মতের গানে আমরা বাঙ্গালা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন পাই। 
    [ভাষা-প্রকাশ বাঙ্গালা ব্যাকরণ। রূপা।বৈশাখ ১৩৯৬
  • সুকুমার সেনঃ বাঙ্গালা ভাষার আদি স্তরের স্থিতিকাল আনুমানিক দশম হইতে মধ্য-চতুর্দশ শতাব্দ (৯০০-১৩৫০ খ্রীষ্টাব্দ)। হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর আবিষ্কৃত ও প্রকাশিত 'হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধগান ও দোহা' নামক বইটির প্রথম গ্রন্থ "চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়" অংশে সঙ্কলিত চর্যাগীতিগুলি আদি স্তরের অর্থাৎ প্রাচীন বাঙ্গালার নিদর্শনরূপে উল্লিখিত হইলেও এগুলির ভাষা খাঁটি আদি স্তরের বাঙ্গালা নহে। [ভাষার ইতিবৃত্ত। আনন্দ পাবলিশার্স প্রাইভেট লিমিটেড। নভেম্বর ১৯৯৪
  • ডঃ মুহম্মদ শহীদুল্লাহঃ আমি বাঙ্গালা সাহিত্যের আরম্ভ ৬৫০ খ্রীঃ বলিয়া নির্দেশ করিয়াছি। নাথ-গীতিকার উদ্ভব বৌদ্ধযুগে। কিন্তু আমরা তাহা পাই নাই। আমরা বৌদ্ধযুগের একটি মাত্র বাঙ্গালা পুস্তক পাইয়াছি। ইহার নাম আশ্চর্যচর্যাচয়। [বাঙ্গালা ভাষার ইতিবৃত্ত। মাওলা ব্রাদার্স। জুলাই ১৯৯৮] 

চর্যাপদ লিখার সময় সুনির্দিষ্ট করা না গেলেও ধরা হয় খ্রিষ্টীয় অষ্টম থেকে দ্বাদশ শতকে এর যাত্রা। এ নিয়ে বেশ বিতর্ক আছে, তবে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য মত এটাই।

রচিত এই গীতিপদাবলির রচয়িতারা ছিলেন সহজিয়া বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্যগণ। এটি মূলত বৌদ্ধ সহজিয়া বা বৌদ্ধ তান্ত্রিক সাধকদের সাধন সঙ্গীত। বৌদ্ধ ধর্মের গূঢ় অর্থ সাংকেতিক রূপের আশ্রয়ে ব্যাখ্যার উদ্দেশ্যেই তাঁরা পদগুলি রচনা করেছিলেন। এই বিবেচনায় এটি একটি ধর্মগ্রন্থজাতীয় রচনা। বাংলা সাধন সংগীত শাখাটির সূত্রপাতও হয়েছিলো এই চর্যাপদ থেকেই। একই সাথে চর্যাপদ হতে সমকালীন বাংলার সামাজিক ও প্রাকৃতিক চিত্রাবলি পাওয়া যায়। 

চর্যাপদ । ছবিঃ Bdnews24

চর্যাপদের নাম অনেকগুলো যেমন ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’, ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’, ‘চর্যাগীতিকোষ’, ‘চর্যাগীতিকা’, ‘চর্যাপদ’, ‘হাজার বছরে পুরান বাঙ্গালা ভাষার বৌদ্ধ গান ও দোহা’। ড. সুকুমার সেন মুনিদত্তের টীকা থেকে নাম সংগ্রহ করেন ‘চর্যাশ্চর্যবিনিশ্চয়’ যার অর্থ চর্যার অপূর্ব ব্যাখ্যা। তাই তিনি ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ নামটিকে অশুদ্ধ বলেছেন।

খুঁজ পাওয়া গেল কিভাবে?

রাজেন্দ্রলাল মিত্র ১৮৮২ সালে  নেপালে প্রাপ্ত সংস্কৃত ভাষায় রচিত বিভিন্ন বৌদ্ধপুথির একটি তালিকা প্রস্তুত করেন। এই তালিকাটির নাম ছিল- Sanskrit Buddhist Literature in Nepal। রাজেন্দ্রলাল মিত্রের (২৬.৭.১৮৯১) মৃত্যুর পর তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার বাংলা-বিহার-আসাম-উড়িষ্যা অঞ্চলের পুথি সংগ্রহের দায়িত্ব দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী (১৮৫৩-১৯৩১)’র উপর।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী এ জন্যে চারবার নেপাল ভ্রমণ করেন। ১৮৯৭ সালে বৌদ্ধ লোকাচার সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহের জন্য তিনি প্রথমবার নেপাল ভ্রমণ করেন। ১৮৯৮ সালের তার দ্বিতীয়বার নেপাল ভ্রমণের সময় তিনি  কিছু বৌদ্ধ ধর্মীয় পুঁথিপত্র সংগ্রহ করেন। ১৯০৭ সালে তৃতীয়বার নেপাল ভ্রমণকালে নেপাল রাজদরবারের লাইব্রেরি থেকে  কিছু নতুন পুথির সন্ধান পান।  

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদের দোহা এবং কৃষ্ণাচার্য বা কাহ্নপাদের দোহা, ও আগে  আবিষ্কৃত ডাকার্ণব পুঁথি একত্রে ১৯১৬ সালে  বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে ‘হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধগান ও দোঁহা’ শিরোনামে সম্পাদকীয় ভূমিকাসহ প্রকাশ করেন ।  ১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদ থেকে এটি প্রকাশিত হলে আলোড়ন সৃষ্টি হয়।  বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাস পুনর্গঠনে এ-আবিষ্কার একটি মাইলফলক হয়ে আছে।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ছবিঃআড্ডায় বইয়ের পাতা

চর্যাপদ প্রকাশের পর গত ১০০ বছরে বাংলাদেশে ও বাংলার বাইরে চর্যাপদ সংগ্রহ, সম্পাদনা ও তা নিয়ে অনেক গবেষণা হয়েছে। এ-ধারায় সর্বশেষ কাজটি আমরা পেয়েছি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও ফোকলোর-বিশেষজ্ঞ ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শাহেদের কাছ থেকে। ২০১৭ সালের একুশের বইমেলায় প্রকাশিত এই বইটির প্রকাশক কথাপ্রকাশের স্বত্বাধিকারী জসিমউদ্দিন।

চর্যাপদের ভাষা

চর্যাপদের ভাষায় ৫টি ভাষার মিশ্রণ দেখা যায় – বাংলা, হিন্দি, মৈথিলী, অসমীয়া ও উড়িয়া। চর্যাপদের সংগ্রহ প্রকাশিত হওয়ার পর এর ভাষা নিয়ে যেমন প্রচুর গবেষণা হয়েছে তেমনি প্রচুর তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। ভারতের বিভিন্ন ভাষাবাষীরা এই চর্যাপদের উপর নিজ নিজ মাতৃভাষার অধিকার দাবি করে বিতর্ক সৃষ্টি করেছেন।

অসমিয়ারাও দাবি করে এর ভাষা অসমিয়া, মৈথিলিরাও দাবি করে এর ভাষা মৈথিলি, উড়িয়ারাও দাবি করে এর ভাষা উড়িয়া। এমনি দাবি করে মগহি, ভোজপুরিয়া আর নেওয়ারিরাও। কেবল হিন্দিভাষীদের দাবিই উড়িয়ে দেয়া যায়।

সমস্যাটা বুঝতে হলে এই অঞ্চলের ভাষার বিবর্তন সম্পর্কে কিছুটা জানা থাকা দরকার। এই লেখায় সে সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করছি না, সেটি ভিন্ন আলোচনা; কেবল এই তথ্যটা জানা জরুরি, তখনো বাংলা ভাষা পুরোপুরি স্বতন্ত্র ভাষা হয়ে ওঠেনি, বরং স্বতন্ত্র একটি ভাষা হয়ে উঠছে। এর কেবলই কিছু আগে বাংলা ভাষা থেকে আলাদা হয়েছে উড়িয়া ভাষা। তখনো মৈথিলি আর অসমিয়া বাংলা থেকে পুরোপুরি আলাদা হয়ে স্বতন্ত্র ভাষা হয়ে ওঠেনি; মৈথিলি পুরোপুরি আলাদা হয়েছে তের শতকে, অসমিয়া আলাদা হয়েছে ষোল শতকে।​

চর্যাপদ ছবিঃ কালেরকন্ঠ

এই অঞ্চলের অন্যান্য ভাষাগুলোও বাংলা থেকে পুরোপুরি পৃথক হয়েছে খুব বেশিদিন হয়নি; ফলে চর্যার ভাষায় এই সব ভাষারই কিছু কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। আর উড়িয়া, মৈথিলি আর অসমিয়া, বিশেষ করে শেষ দুটি ভাষার বৈশিষ্ট্য চর্যাপদে বেশ ভালভাবেই বিদ্যমান। ফলে চর্যাপদের উপর এই ভাষাগুলোর দাবি কোনভাবেই নস্যাৎ করে দেয়া যাবে না। তবে এ ব্যাপারে কোনই সন্দেহ নেই, চর্যাপদ আমাদেরও সম্পদ।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী তাঁর সম্পাদিত হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা বৌদ্ধ গান ও দোহা গ্রন্থের ভূমিকায় চর্যাচর্যবিনিশ্চয়, সরহপাদ ও কৃষ্ণাচার্যের দোহা এবং ডাকার্ণব-কে সম্পূর্ণ প্রাচীন বাংলার নিদর্শন বলে দাবি করেছেন। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন কাব্যের আবিষ্কর্তা ও সম্পাদক বসন্তরঞ্জন রায় বিদ্বদ্বল্লভও হরপ্রসাদ শাস্ত্রী'র এ দাবিকে  অনুমোদন দেন ।  এ দিকে ১৯২০ সালে বিজয়চন্দ্র মজুমদার তাঁদের দাবি অস্বীকার করে চর্যা ও অন্যান্য কবিতাগুলির সঙ্গে বাংলা ভাষার সম্পর্কের দাবি বানচাল করার চেষ্টা করেন। তবে ‘বঙ্গাল দেশ’, ‘পঁউয়া খাল’ (পদ্মানদী), ‘বঙ্গালী ভইলি’ ইত্যাদির উল্লেখ থাকায় বাঙালির দাবি অগ্রগণ্যরূপে বিবেচিত হয়।

ভাষার সংমিশ্রন

পরবর্তিতে ১৯২৬ সালে ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় তাঁর The Origin and Development of the Bengali Language গ্রন্থে চর্যাগান ও দোহাগুলির ধ্বনিতত্ত্ব, ব্যাকরণ ও ছন্দ বিশ্লেষণ করে শুধুমাত্র এইগুলিকেই প্রাচীন বাংলার নিদর্শন হিসবে প্রমাণ করেন। যেমন, সম্বন্ধ পদে –অর বিভক্তি, সম্প্রদানে –কে, সম্প্রদানবাচক অনুসর্গ –অন্তরে (মধ্যযুগীয় ও আধুনিক রূপ –তরে), অধিকরণে –অন্ত, -ত, অধিকরণবাচক অনুসর্গ –মাঝে, অতীত ক্রিয়ায় –ইল এবং ভবিষ্যত ক্রিয়ায় -ইব। চর্যা মৈথিলী বা পূরবীয়া হিন্দিতে রচিত হলে অতীত ক্রিয়ায় –অল ও ভবিষ্যতে –অব যুক্ত হত। 

অন্যান্য ভাষাবিদরা যাঁরা চর্যাকে নিজ নিজ ভাষার প্রাচীন নিদর্শন বলে দাবি করেছিলেন, তাঁরা ডক্টর সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যয়ের মত এই রকম সুস্পষ্ট ও সুসংহত বৈজ্ঞানিক প্রমাণের দ্বারা নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন নি। 

১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহর প্যারিস থেকে প্রকাশিত Les Chants Mystique de Saraha et de Kanha গ্রন্থে সুনীতিকুমারের মতামত সমর্থন করেন। তবে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ এর একটি সমাধান দিয়েছেন। সব ভাষার মিশ্রণ থাকায় তিনি এর ভাষার নাম দিয়েছেন বঙ্গ-কামরূপী, বা প্রত্ন-বাংলা-আসামি-উড়িয়া-মৈথিলি ভাষা।

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ

ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ছবিঃ মানব কন্ঠ

চর্যাপদের ভাষা অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য।  চর্যাপদগুলোর ভিতরে রয়েছে নানা ধরনের দুর্বোধ্য ভাব। এর আক্ষরিক অর্থের সাথে ভাবগত অর্থের ব্যাপক ব্যবধান আছে। ফলে এই পদগুলোতে বুঝা-না-বুঝার দ্বন্দ্ব রয়ে যায়। সেই কারণে চর্যায় ব্যবহৃত ভাষাকে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী বলেছেন সন্ধ্যাভাষা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। তাঁর মতে-

'সহজিয়া ধর্মের সকল বই-ই সন্ধ্যা ভাষায় লেখা। সন্ধ্যা ভাষার মানে আলো-আঁধারি ভাষা, কতক আলো, কতক অন্ধকার, খানিক বুঝা যায়, খানিকটা বুঝা যায় না। অর্থাৎ, এই সকল উঁচু অঙ্গের ধর্মকথার ভিতরে একটা অন্য ভাবের কথাও আছে। সেটা খুলিয়া ব্যাখ্যা করিবার নয়। যাঁহারা সাধনভজন করেন তাঁহারাই সে কথা বুঝিবেন, আমাদের বুঝিয়া কাজ নাই।'

চর্যাপদের সংখ্যা ও রচয়িতাগণ

বইটিতে মোট চর্যা বা পদ বা গান আছে ৫০ টি মতান্বরে ৫১টি। এরমধ্যে ১টি পদের টীকা বা ব্যাথ্যা দেয়া নেই। ৫১টি পদের মধ্যে পাওয়া গেছে সাড়ে ৪৬টি; একটি পদের অর্ধেক পাওয়া গেছে। 

চর্যাপদ নিয়ে যারা  গভেষণা করেছেন তাদের মধ্যে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, পরেশচন্দ্র মজুমদার ও ডক্টর রামেশ্বরের নাম উল্লেখযোগ্য। হরপ্রসাদ শাস্ত্রী নেপালের রাজদরবারে রয়েল লাইব্রেরি থেকে মোট সাড়ে ছেচল্লিশটি পদ আবিষ্কার করেন। এর মধ্যে ২৪, ২৫ ও ৪৮ নং পদ পাওয়া যায়নি। সুতরাং এর মোট পদসংখ্যা ৫০। 


চর্যার কবিগণ সিদ্ধাচার্য নামে পরিচিত। চর্যাপদের মোট কবির সংখ্যা ২৩, মতান্তরে ২৪ জন। এ নিয়েও বিতর্ক আছে; যেমন অনেকেই বলেন দারিক পা আর দাড়িম্ব পা আলাদা ব্যক্তি, কিন্তু গ্রহণযোগ্য মত হল, এই দুইজন একই ব্যক্তি। এভাবে একেকজনের গণনায় কবির সংখ্যা একেকরকম; তবে গ্রহণযোগ্য মত ২৩ জন।

চর্যার কবিরা ছিলেন পূর্ব ভারত ও নেপাল রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঞ্চলের অধিবাসী। কেউ পূর্ববঙ্গ, কেউ উত্তরবঙ্গ, কেউ বা রাঢ়ের অধিবাসী ছিলেন। কেউ কেউ বিহার, কেউ ওড়িশা, কেউ বা আবার অসম বা কামরূপের বাসিন্দাও ছিলেন।

চর্যাপদের প্রাচীনতম কবি সরহ পা। অনেকে দাবি করেন, লুই পা সবচেয়ে পুরোনো; তাদের এই ধারণার পক্ষে প্রমাণ, চর্যার প্রথম পদটি তার রচিত, এই প্রমাণের ভিত্তিতে তাকে আদিকবি'ও বলা হয়। কিন্তু পরে এটা প্রমাণিত হয়েছে, চর্যাপদের কবিদের মধ্যে প্রাচীনতম কবি সরহ পা-ই। আর সবচেয়ে বেশি পদ লিখেছেন কাহ্নু পা, ১৩টি। সরহ পা লিখেছেন ৪টি পদ। ভুসুক পা লিখেছেন ৮টি, কুক্কুরী পা ৩টি, লুই পা, শান্তি পা আর সবর পা ২টি করে। বাকি সবাই ১টি করে পদ লিখেছেন।

২৪, ২৫ ও ৪৮ সংখ্যক পদগুলি হরপ্রসাদ শাস্ত্রী আবিষ্কৃত পুঁথিতে না থাকলেও ডক্টর প্রবোধচন্দ্র বাগচী আবিষ্কৃত তিব্বতি অনুবাদে পাওয়া যায়। চর্যাকার তান্ত্রীপা ও লাড়ীডোম্বীপা এঁদের কোন পদ পাওয়া যায়নি। শবর পা চর্যার শ্রেষ্ঠ কবি। এর মধ্যে বিরুআপা, কুক্কুরিপা, লুইপা, ডোম্বীপা, শবরপা, ধামপা, জঅনন্দপা, মৎসেন্দ্রনাথ ছিলেন বাঙ্গালী কবি।

নেপালের তিব্বতাঞ্চলে এখনও এই ধারার সঙ্গীত টিকে আছে ‘বজ্রা’ নামে। 

বাংলার আশে পাশে না হয় চর্যাপদ নেপালে কেন ?

আচ্ছা প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক যে, বাংলায় কিংবা বাংলার আশে পাশেই বাংলার আদি নিদর্শন পাওয়ার কথা তাই না ? তাহলে নেপাল কেন ?  

একাদশ শতকের শেষের দিকে পাল সাম্রাজ্যের অবসান ঘটিয়ে  সেন রাজারা ক্ষমতা দখল করে।  পালরা ছিলেন বৌদ্ধধর্মের মহাযান রূপের অনুসারী এবং সেনরা হিন্দু। ফলে স্বভাবতই, দেশের বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর মধ্যে বিধর্মী সম্রাটের প্রতি ভয় কাজ করে। তাই সেনদের আগমনের ফলে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের বাংলায় অবস্থান করা তাদের জন্যে হয়ত আর নিরাপদ ছিল না বলে মনে করে।

সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনে বেশিরভাগ সময় ঝড়-ঝাপটা ধর্মের উপর দিয়েই পড়ে, খুব স্বাভাবিকভাবেই  অপেক্ষাকৃত ধনী বৌদ্ধরা চলে যায় উত্তরে, নেপাল ভূটান তিব্বতে। আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই, তাদের বড়ো অংশই হিন্দু ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়ে যায়। । আর বাকিরা হয় প্রাণ হারায়, আর নয়তো ধর্মান্তরিত হয়ে রাজধর্ম গ্রহণ করে হিন্দু হয়। আমজনতার ক্ষেত্রে ধর্মান্তরের এই চক্র পরবর্তীতে মুসলিম শাসনামলেও চালু থাকে।

রাজ্য স্থানান্তরের ফলে তাদের সাথে তাদের সংস্কৃতিও স্থানান্তরিত হয়েছিল। ফলে ঐ বৌদ্ধদের সাথে বৌদ্ধ তান্ত্রিকদের গানগুলোও চলে যায় নেপালে তিব্বতে। এই কারণে চর্যাপদের পুঁথিটি পাওয়া গেছে নেপালে, বাংলায় বা বাংলার আশেপাশে নয়। এবং একই কারণে বাংলায় এ ধরনের আর কোন পুঁথিও পাওয়া যায়নি, হয়তো সেগুলোও নেপালে তিব্বতে চলে গিয়েছিল, সেখানে কেউ সেগুলো সংরক্ষণের প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি।

সেখানকার ভাষার সাথে যুক্ত হয় চর্যার ভাষা। আবার চর্যার ভাষায় যুক্ত হলো স্থানীয় ভাষা। ভাষার এই অদলবদলে বাংলা ভাষার আদিম রূপের একখানা তিব্বতি সংস্করণ বেরোল, যার টীকাকারের নাম মুনিদত্ত। সেই তিব্বতি সংস্করণ থেকেই চর্যাপদের আবিষ্কার হয়েছে হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দ্বারা।

পরিশিষ্ট

চর্যাপদ শুধু প্রাচীন বাংলা সাহিত্যেরই নিদর্শন নয়, প্রাচীন বাংলা গানেরও নিদর্শন। এ ছাড়া পদগুলি থেকে তৎকালীন বাঙালি জীবনের আচার-আচরণ ও সমাজের বাস্তব পরিচয়ও পাওয়া যায়। “আপনা মাংসে হরিণা বৈরী” এই কথাটি আমাদের খুবই পরিচিত। কারো কোনো ভালো দিকই যখন তার জন্য খারাপ বা ক্ষতিকর কিছু বয়ে নিয়ে আসে, তখন আমরা এই কথাটি ব্যবহার করে থাকি। এই অতি পরিচিত উক্তিটিও চর্যাপদের   কবি ভুসুকুপার একটি পদ থেকে।

একই ভাবে চর্যাপদ হতে তখনকার মানুষ হরিণ শিকার, নৌকা চালনা, চেঙারি তৈরি, শুঁড়ির কাজ ইত্যাদি করত বলে জানা যায় । কাড়া-নাকাড়া ও ঢাক-ঢোল বাজিয়ে বর-কনেকে বিয়ের আসরে নিয়ে যাওয়া হতো। সমাজে যৌতুক প্রথা প্রচলিত ছিল। গরু ছিল গৃহপালিত পশু; হাতিরও উল্লেখ আছে। মেয়েরা পরিধানে ময়ূরপুচ্ছ, গলায় গুঞ্জার মালা এবং কর্ণে কুণ্ডল পরত। টাঙ্গি, কুঠার, নখলি বা খন্তা ছিল উল্লেখযোগ্য অস্ত্র ছিল বলে জানা যায়। চর্যাপদ নিয়ে তো অনেক কথা হল একটি চর্যাপদের উদাহরণ দেখে নিই। 😀 

১৪ নং পদটির সংক্ষেপ হলো

“গঙ্গা জউনা মাঝেঁরে বহই নাঈ 
তহিঁ চড়িলী মাতঙ্গী পোইআ লীলে পার করেই ।। 
বাহ তু তোম্বী বাহ লো ডোম্বী বাটত ভইল উছারা 
সদ্গুরু পাও-পসাএঁ জাইব পুণু জিণউরা ।। 
পাঞ্চ কেডুআল পড়ন্তেঁ মাঙ্গে পীঠত কাছী বান্ধী 
গতণ দুখোলে সিঞ্চহু পাণী ন পইসই সান্ধি ।। 
চান্দ সূজ্জ দুই চাকা সিঠিসংহার পুলিন্দা 
বাম দাহিণ দুই মাগ ন চেবই বাহ তু ছন্দা ।। 
কাবড়ী ন লেই বোড়ী ন লেই সুচ্ছলে পার করেই 
জো রথে চড়িলা বাহ্বা ণ জানি কুলেঁ কুল বুলই ।।”* 

আধুনিক বাংলায়ঃ 
"গঙ্গা যমুনা মাঝে রে বয় নৌকা, 
তাউ চড়িয়া চণ্ডালী ডোবা লোককে অনায়াসে পার করে ।। 
বা তুই ডুমনি ! বা লো ডুমনি ! পথে হইল সাঁঝ, 
সদ্‌গুণ পায়ের প্রসাদে যাইব পুনরায় জিনপুর ।। 
পাঁচ দাঁড় প্রিতে নৌকার গলুইয়ে, পিঠে কাছি বাঁধিয়া 
গগন-রূপ সেচনী দিয়ে ছেঁচ, পানি পশে না ছেঁদায় ।। 
চাঁদ সূর্য্য দুই চাকা, সৃষ্টি সংহার মাস্তুল, 
বাঁ-ডাইন দুই রাস্তা বোধ হয় না, বা তুই স্বচ্ছন্দে ।। 
কড়ি লয় না, পয়সা লয় না, মাগনা পার করে, 
যে রথে চড়িল (পথ) বাহিতে না জানিয়া কূলে কূলে বেড়ায় ।।"


ডিসক্লেইমারঃ যেহেতু সরাসরি কোন গভেষণা নিবন্ধন থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয় নি তাই ভুল-প্রান্তি থাকাটা স্বাভাবিক। কোন ভুল তথ্য উপস্থাপিত হলে ক্ষমাপ্রার্থী। সেক্ষেত্রে কমেন্ট বক্সে আপনাদের সহযোগিতা পাব বলে প্রত্যাশা করি।  

তথ্য সূত্রঃ somewhereinblog.net, bcssolutionbd.com, onushilon.org, bn.wikipedia.org

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক