চিকুনগুনিয়া কি ? কেন হয়? চিকিৎসা ও কিভাবে প্রতিরোধ করা যায়

সম্প্রতি সময়ে দেশে আলোচিত একটি রোগ হল চিকুনগুনিয়া। অল্প কিছু দিন পূর্বেও এই রোগের সাথে এদেশের মানুষের পরিচয় ছিল না। সম্প্রতি বাংলাদেশে বিশেষ করে ঢাকায় চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্যনীয় পর্যায়ে দেখা গেছে। চিকুনগুনিয়া আক্রান্ত হলে  জ্বরের সাথে  সাথে অস্থিসন্ধী প্রচন্ড  ব্যাথা করে বলে  অবস্থা এমন হয়েছিল যে জ্বর হলেই মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ত না জানি চিকুনগুনিয়া ধরছে।  চিকুনগুনিয়া মরণঘাতী রোগ না হলেও এটি মানুষকে যথেষ্ট ভোগান্তিতে ফেলে। এই রোগে মৃত্যু ঝুঁকি প্রতি দশ হাজারে এক জন বা এর চেয়েও কম তবে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এই রোগের জটিলতা তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

চিকুনগুনিয়া কি ?

চিকুন গুনিয়া  শব্দটি একটি আফ্রিকান শব্দ যার অর্থ ধনুর মতো বাঁকা হয়ে যাওয়া বা ‘মোচড়ানো। রোগীর শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা হওয়ায় এই রোগের এমন নাম হয়েছে তাই চিকুনগুনিয়া। চিকুনগুনিয়া হচ্ছে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস (CHIKV) দ্বারা সৃষ্ট একটি  রোগ।অর্থাত চিকুন গুনিয়া এক ধরনের ভাইরাস সংক্রামিত রোগ।

১৯৫৫ সালে মেরিয়ন রবিনসন নামে একজন চিকিৎসক প্রথম  এ রোগ সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য উপস্থাপন করেন। ১৯৫২ সালে আফ্রিকার মেকন্দ, মোজাম্বিক ও তানজেনিয়া এলাকায় চিকুনগুনিয়া রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা যায়  । আফ্রিকায় এ রোগের প্রাদুর্ভাব হওয়ার পর দেখা গেল যে এ রোগের আবির্ভাব শুধু আফ্রিকায় নয় বরং   দক্ষিণ এবং দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অনেক এলাকায় যেমন ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মায়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এ রোগের প্রাদুর্ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে । বর্তমানে ইউরোপ বিশেষ করে ইতালিতে এ রোগের  সংক্রমণ পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রথম ২০০৮ সালে রাজশাহী ও চাঁপাই নবাবগঞ্জে প্রথম এ ভাইরাসের সংক্রমণ হয় বলে জানা যায়। পরবর্তীতে ২০১১ সালে ঢাকার দোহার উপজেলায় এই রোগ দেখা যায়।  তবে এর পরে বিচ্ছিন্ন দুকটি রোগী ছাড়া এ রোগের বড় ধরনের কোনো বিস্তার আর বাংলাদেশে লক্ষ করা যায়নি।

সম্প্রতি ২০১৭ সালে ঢাকায় চিকুনগুনিয়া খুব বড় আকারে বিস্তার লাভ করে আলোচনা আসে।

বর্ষাকাল শেষে  যখন মশার উপদ্রব বেশি হয় সাধারনত তখন এ রোগের বিস্তার  লক্ষ্য করা যায়।

চিকুনগুনিয়া কেন হয় ?

চিকুনগুনিয়ার ভাইরাসবাহী মেয়ে মশার কামড়ে মানুষের মধ্যে এই রোগটি ছড়ায়। এছাড়াও চিকুনগুনিয়া ভাইরাস আক্রান্ত রক্তদাতার রক্ত গ্রহণ করলে এবং ল্যাবরেটরীতে নমুনা পরীক্ষার সময়ে অসাবধানতায় এ রোগ ছড়াতে পারে। সাধারণত দুই প্রজাতির এডিস মশা  (এডিস ইজিপ্টি ও এডিস এলবোপিকটাস ) চিকুনগুনিয়ার ভাইরাস বহন করে। মশাগুলোর শরীরের ও পায়ের সাদা কালো ডোরাকাটা দাগ দেখে সহজেই চেনা যায়।

এডিস মশা

চিকুনগুনিয়া বাহিত  মশাগুলো সাধারণত  দিনের আলোতে কাঁমড় দিয়ে থাকে। মানুষ ছাড়াও আরো  কয়েকটি প্রাণি যেমন বানর, পাখি,  ইঁদুরে এই ভাইরাসের জীবনচক্র বিদ্যমান রয়েছে বলে জানা যায়।  ডেঙ্গুর জীবাণু বহনের জন্যও এডিস মশাকে দায়ী করা হয়।  চিকুন গুনিয়া অসুখের জন্য যে ভাইরাস দায়ী তা এক ধরনের ভাইরাস যা টোগা ভাইরাস পরিবারের আলফা ভাইরাস সদস্য যা একটি RNA ভাইরাস।  মশাবাহিত হওয়ার কারণে একে আরবো ভাইরাসও বলে।

এই ভাইরাস মানবদেহ থেকে মশা এবং মশা থেকে মানবদেহে ছড়িয়ে থাকে। ওই ভাইরাস রক্তের লোহিত  রক্তকনিকাকে আক্রান্ত করে থাকে। আক্রান্ত হওয়ার ফলে এসব কোষ মৃত্যুবরণ করে থাকে। রক্তের ইন্টারফেরন নামক এক ধরনের অ্যান্টিভাইরাস জাতীয় পদার্থ এ রোগের আক্রমণকে রহিত করতে পারে। ভাইরাস ইনফেকশনের ফলে রক্তে ইন্টারফেকশন নামক পদার্থ তৈরি হয় যা  অ্যান্টিভাইরাস হিসেবে কাজ করে।

সাধারনত সংক্রামক মশা কামড়ানোর চার থেকে সাত দিনের মধ্যে দেহে চিকুনগুনিয়ার উপসর্গ দেখা যায়।

চিকুনগুনিয়ার উপসর্গসমূহ

প্রাথমিক অবস্থায় রোগী জ্বরে আক্রান্ত হয়ে থাকে,ভাইরাসের সুপ্তকাল এক থেকে বার দিন হলেও চিকুনগুনিয়া   মধ্যম মাত্রার জ্বর  যা দুই থেকে পাঁচদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়ে থাকে। এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলেও অনেকের আবার কোন ধরনের উপসর্গ দেখা যায় না।  সাধারণত ৭২-৯৭% ক্ষেত্রে উপসর্গ দেখা দেয় ।  জ্বরের পরে রোগী শরীরের বিভিন্ন গিঁট প্রচন্ড  ব্যথায় আক্রান্ত হতে পারে  এবং অনেক সময়  সারা শরীরে রেশ (লাল দাগ ও ফোলা) দেখা দেয় । ফুসকুড়ি রোগের শুরুতেই দেখা দিতে পারে আবার  অনেক সময় রোগ শুরু হওয়ার দুই থেকে তিন দিন পর জ্বর কমতে শুরু করলে ফুসকুড়ির দেখা মিলতে পারে।   আর এর সাথে  বমি বমি ভাব,  শরীর ব্যথা ও প্রচন্ড  দুর্বলতা অনুভূত হয়।

এদিকে  গিঁটের ব্যথা সাধারণত হাত এবং পায়ের গিঁটে দেখা যায়।  এ  গিঁটের ব্যথা সাধারণত কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। কারো কারো ক্ষেত্রে এ ব্যথা কয়েক বছর ধরে চলতে  পারে। এছাড়া অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছে মাথাব্যথা, ক্লান্তি, পেটব্যথা, ফটোফোবিয়া বা আলোর দিকে তাকাতে সমস্যা, বড়দের আর্থ্রাইটিস ইত্যাদি।  সাধারণভাবে মশার কামরে দুই থেকে পাঁচদিনের মধ্যে এ রোগের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে।

সাধারণত এই রোগটি  হঠাৎ করেই শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধির মাধ্যমে শুরু হয় যা সাত থেকে দশ দিন পর্যন্তও স্থায়ী হতে পারে । এ জ্বর সাধারণত ৩৯ °সে (১০২ °ফা) বা মাঝে মাঝে ৪০ °সে (১০৪ °ফা) পর্যন্ত হয়। রক্তে ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সাথে সাথে জ্বর আসে এবং ভাইরাসের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে চিকুনগুনিয়া লক্ষনগুলো বৃদ্ধি পেতে থাকে।  রোগীর জ্বর কয়েকদিন পর্যন্ত স্থায়ী হয় এবং আস্তে আস্তে কমতে থাকে। ভাইরাসটির রক্তে প্রবেশের পর  ইন্টারফেরন নামে একটি এন্টিবডির সৃষ্টি হয়    তখন এর প্রভাব কমতে শুরু করে।

রোগ শনাক্তকরণ

উপরোল্লিখিত উপসর্গগুলো দেখা দিলে, ওই ব্যক্তির চিকুনগুনিয়া ভাইরাস সংক্রমণের আশংকা থাকে। রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে চিকুনগুনিয়া  ভাইরাস শনাক্ত করা হয় ।    ভাইরাস পৃথকীকরণ, RT-PCR, সেরোলজির মাধ্যমে পরীক্ষাগারে ভাইরাস শনাক্ত করা হয়।

চিকুনগুনিয়ার  চিকিৎসা

আর সব ভাইরাসজনিত জ্বরের মতোই এর নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসা নেই। চিকুনগুনিয়ার চিকিৎসা মূলত রোগের উপসর্গগুলোকে নিরাময়ের মাধ্যমে করতে হয়। এ রোগের কোনো প্রতিষেধক নেই এবং কোন টিকাও এখনও পর্যন্ত আবিস্কার হয়নি। এ রোগে আক্রান্ত রোগীকে প্রচুর পানি, সরবত,ওরস্যালাইন, ডাবের পানি পান করাতে  হবে। রোগীকে  সম্পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে । মাঝে মাঝে পানি দিয়ে শরীর মুছে দেয়া যেতে পারে। এই জ্বরের জন্য প্যারাসিটামল দেওয়া হয় , বমি বা অন্যান্য উপসর্গের জন্য সে অনুযায়ী কিছু ওষুধ দেওয়া হয় । চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথার ওষুধ সেবন করা উচিত  নিজে নিজে কোন ওষুধ না খাওয়াই উত্তম ।  উল্লেখ্য মনে রাখা প্রয়োজন এই জ্বরে এন্টিবায়োটিক কোনো কাজে আসে না। বিশেষ ক্ষেত্রে

তবে গিঁটের ব্যথার জন্য গিঁটের উপরে ঠাণ্ডা পানির স্যাঁক এবং হালকা ব্যায়াম উপকারী হতে পারে। তবে প্রাথমিক উপসর্গ ভালো হওয়ার পর যদি গিঁটের ব্যথা ভালো না হয়, তবে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়া যেতে পারে।

চিকুনগুনিয়া  রোগীকে যেন মশা না কামড়ায়  তাই  রোগীকে অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। কারণ- আক্রান্ত রোগীকে কামড় দিয়ে, পরবর্তীতে কোনো সুস্থ লোককে সেই মশা কামড় দিলে ওই ব্যক্তিও চিকুনগুনিয়া  রোগে আক্রান্ত হতে পারেন।

প্রতিরোধ

চিকুনগুনিয়ার  বিরুদ্ধে কার্যকরী অনুমোদিত কোনো টিকা নেই।  আবার  যেহেতু চিকুন গুনিয়া মশাবাহিত রোগ তাই এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত পর্যায়ে ঘুমানোর সময় মশারি টাঙিয়ে ঘুমানো, লম্বা হাতলযুক্ত জামা ও ট্রাউজার পরে থাকা,  মশা নিরোধক স্প্রে, কয়েল ব্যবহার করা যেতে পারে।

মশা নিয়ন্ত্রণের জন্যে বাড়ির আশেপাশে পানি জমতে না দিয়ে মশার উতপাদন কমিয়ে আনা যেতে পারে। শুধু স্ত্রী মশা দিনের বেলা কামড়ায়। একবার রক্ত খাওয়া শেষে ডিম পাড়ার পূর্বে তিন দিনের বিশ্রামের প্রয়োজন হয়।এদের ডিমগুলো পানিতে এক বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। বাহক যেহেতু সেই এডিস মশা, ডেঙ্গু জ্বর প্রতিরোধে আমরা যা যা করি এখানেও তাই করতে হবে, । মশার প্রজনন ক্ষেত্রগুলো ধ্বংস করতে হবে। দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা খোলা পানির আধারগুলো পরিষ্কার করতে হবে। যেমন : কমোড, ফ্রিজের পেছন দিকটার পানি, টবের পানি, টায়ারে আটকে থাকা পানি, ছাদে আটকে থাকা পানি,  ড্রেইনের স্থির পানি ইত্যাদি। এ ছাড়া বাড়ির  আশপাশের গর্ত, ডোবা পরিষ্কার করতে হবে।

তথ্যসূত্রঃ উইকি, একাধিক অনলাইন পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক