চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত – উদ্দেশ্য কি? বাস্তবায়ন ও ফলাফল

ইংল্যান্ড এক সময় বিশ্বের প্রায় অনেক দেশ শাসন করতো । মূলতঃ  শাসন বলা হলেও শাসন ছিল না এটি ছিল শোষন।  ব্রিটিশ শাসনের নামে ভারতবর্ষও তার ব্যতিক্রম ছিল না। সেটা নিয়ে আছে এক দুঃখ গাঁথা অধ্যায়। তার পরতে পরতে অনেক নির্যাতন আর অস্ফুট কান্না।

ব্রিটিশরা উপমহাদেশ শাসন শুরুর পর থেকেই ভারতে প্রচলিত দীর্ঘদিনের নানা প্রথা, আইনকানুন বিলোপ করে নতুন  নতুন সব আইন-কানুনের প্রচলন শুরু করে।  বিভিন্ন ক্ষেত্রে এ দেশের মানুষ নতুন বিধিবিধানের সঙ্গে পরিচিত হয়। এ রকমই একটি বিধান হলো চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। এই আইনটি প্রণয়ন করা হয় জমির মালিকানাসংক্রান্ত বিষয়ে চুক্তির মাধ্যমে।

ইংরেজ শাসনের প্রেক্ষাপট

ইংল্যান্ডের একদল বণিক ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি নামে একটি বণিক সংঘ গড়ে তোলে। বণিক সংঘটি ১৬০০ খ্রিস্টাব্দে রাণী এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছর মেয়াদি প্রাচ্যে একচেটিয়া বাণিজ্য করার সনদপত্র লাভ করে। এই সনদপত্র নিয়ে কোম্পানির প্রতিনিধি বাণিজ্যিক সুবিধা লাভের আশায় আকবরের দরবারে হাজির হন। এরপর ক্যাপ্টেন হকিন্স ১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে জেমসের সুপারিশপত্র নিয়ে বাণিজ্য সমপ্রসারণের লক্ষ্যে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাঁর অনুমতি নিয়ে ১৬১২ খ্রিস্টাব্দে সুরাটে বাণিজ্য কুঠি স্থাপিত হয়।

পরবর্তীকালে ১৬১৫ খ্রিস্টাব্দে প্রথম জেমসের দূত হয়ে জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন স্যার টমাস রো। সম্রাটের কাছ থেকে তিনি ইংরেজদের জন্য বাণিজ্যিক সুবিধা আদায় করে নেন। ১৬১৯ খ্রিঃ তিনি ভারতবর্ষ ত্যাগ করেন। ধীরে ধীরে  ভারতবর্ষের অন্যান্য অঞ্চলে তাদের যাতায়াত শুরু হয়। ইতোমধ্যে কোম্পানি সুরাট আগ্রা, আহমদাবাদ প্রভৃতি স্থানে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে তাদের ভিত্তি মজবুত করে ফেলে।

কোম্পানি তার দ্বিতীয় বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে মসলিমপট্টমে। এরপর বাংলার বালাসোরে আরেকটি বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এদের শক্তি ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকলে এরা করমণ্ডল (মাদ্রাসা শহর) উপকূলে একটি দুর্গ নির্মাণ করতে সক্ষম হয়। বাংলার সুবেদার শাহ সুজার অনুমোদন লাভ করে তারা ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দে হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি স্থাপন করে। এভাবে কোম্পানি কাশিমবাজার, ঢাকা, মালদহেও বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে।

১৬৫৮ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন প্রতিনিধি হিসেবে জেমস হার্ট ঢাকা প্রবেশ করার মধ্য দিয়ে বাংলায় ইংরেজ আগমন শুরু হয়। প্রথমে বাণিজ্য করার উদ্দেশ্যে বাংলার মাটিতে ইংরেজদের আগমন ঘটে। বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসলেও ক্রমশ তারা স্থানীয় রাজনীতি ও শাসন কাজে হস্তক্ষেপ করতে শুরু করে। ইংরেজরা বিভিন্ন ছলে, বলে, কলে, কৌশলে বাংলার ক্ষমতা তাদের হাতে নেয়ার চেষ্টা করে।

১৬৬৮ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা দ্বিতীয় চার্লস পর্তুগীজ রাজকন্যা ক্যাথরিনের সঙ্গে বিয়ের যৌতুক হিসেবে লাভ করেন বোম্বাই শহর। অর্থাভাবে চার্লস ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কাছে পঞ্চাশ হাজার পাউন্ডের বিনিময়ে শহরটি বিক্রি করে দেন। পরবর্তীকালে এই বোম্বাই শহরই কোম্পানির প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্রে পরিণত হয়।

জব চার্ণক নামে আরেকজন ইংরেজ ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে ১২০০ টাকার বিনিময়ে কোলকাতা, সুতানটি ও গোবিন্দপুর নামে তিনটি গ্রামের জমিদারী স্বত্ত্ব লাভ করেন। ভাগীরথী নদীর তীরের এই তিনটি গ্রামকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীকালে কোলকাতা নগরীর জন্ম হয়। এখানেই কোম্পানি ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় উইলিয়ামের নাম অনুসারে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গ নির্মাণ করে। ধীরে ধীরে এটি ইংরেজদের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষা এবং রাজনৈতিক স্বার্থ বিস্তারের শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত হয়।

বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশী যুদ্ধ হয় তাতে বাংলার নবাবের করুন মৃত্যু দিয়ে এই ভুখন্ডে অর্থাৎ ভারতবর্ষে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পথ সূচিত হয়।   এর ফলে বাংলা রাজনৈতিক স্বাধীনতা হারায়। এই শাসন বাংলার সমাজ সংস্কৃতিতে ও ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। ১৭৫৭ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত প্রায় দু’শো বছর বাংলার মাটিতে ইংরেজরা তাদের শাসন ব্যবস্থা ধরে রাখে।

সিরাজ উদ দৌলা

নবাব আলীবর্দী খাঁর দৌহিত্র ছিলেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা। নবাব আলীবর্দী খাঁর মৃত্যুর পর ১৭৫৬ সালে সিরাজউদ্দৌলা মাত্র ২২ বছর বয়সে বাংলার নবাব হন। বয়স অনেক কম থাকায় এবং নানা চাপে পড়ে দূরদর্শিতার অভাবে নবাব টিকতে পারেন নি। সিংহাসনের আরোহনের পর পরই তরুণ নবাবকে নানা ষড়যন্ত্র ও বিরোধী শক্তির মুখোমুখি পড়তে হয়। ইংরেজরা বাঙালিদের উপর অন্যায়, অত্যাচার করতো।

এরকম বিভিন্ন কারনে ইংরেজদের সাথে নবাবের বিরোধ দেখা দেয়। ইংরেজদের সাহায্যের হাত বাড়ায় নবাবের এর বিরোধী শক্তিগুলো। সবাই মিলে নবাবকে উৎখাতের চেষ্টা করতে থাকে। তিনি দেশ শাসন করতে গিয়ে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্রের মধ্যে একদিকে ছিল ইংরেজদের ক্রমবর্ধমান শক্তি, অন্যদিকে বড় খালা ঘসেটি বেগম, সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের মতো ঘনিষ্টজনদের সাথে পাল্লা দিয়ে রাজ্য শাসন করা। তার সাথে যুক্ত ছিল রায় দুর্লভ এবং জগৎ শেঠের মতো প্রভাবশালী বনিকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র।

পলাশীর যুদ্ধে নেতৃত্ব দেয় ইংরেজদের পক্ষ থেকে লর্ড ক্লাইভ। এবং তাকে সহায়তা করে নবাব সিরাজের পরিবারের কয়েকজন ও মীরজাফর, উমিচাঁদ, জগত শেঠ সহ অন্যান্য বিশ্বাসঘাতক। যুদ্ধে নবাবের পক্ষের সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাস ঘাতকতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন। পরে তাকে হত্যা করা হয়। এ পরাজয় এর মধ্য দিয়ে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবের পতন হয় ও বাংলার আকাশে স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পথে

বিশ্বাসঘাতকতার পুরষ্কার স্বরূপ মীরজাফর বাংলার নবাব হয় এবং লর্ড ক্লাইভ তৎকালীন ত্রিশ লক্ষ টাকা ও চব্বিশ পরগনার জায়গিরদারি লাভ করে। যার ধারাবাহিকতায় আমরা প্রায় দু’শো বছর পরাধীন ছিলাম।   এর পরে লর্ড ক্লাইভ ইংল্যান্ড চলে যায়।

তখনকার সময় ইংরেজদের শাসন কাজের অভিজ্ঞতা না থাকায় যারা তাদের কথামত দেশ চালাবে এরকম লোক দিয়ে শাসন কাজ চালায়। তারা প্রথমে মীর জাফর ও পরে মীর কাশিমকে সিংহাসনে বসায়। কাশেম ছিলেন কিছুটা স্বাধীনচেতা। ফলে ইংরেজদের সাথে দু’বার যুদ্ধ হয়।

১৭৬৪ সালে বক্সারের যুদ্ধে তিনি পরাজিত হন। মীর কাশিমের পরাজয়ের কারণে বাংলার সার্বভৌমত্ব উদ্ধারের শেষ চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়। ইংরেজ শক্তি অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাংলা তথা উপমহাদেশের সর্বত্র ক্ষমতার বিস্তার ঘটাতে থাকে। এরপর থেকে ইংরেজরা পুরোপুরি ক্ষমতা দখল শুরু করে।

ক্লাইভ  ফিরে আসে ১৭৬৫ সালের মে মাসে এবং ইংরেজ সরকারের গভর্নর নিযুক্ত হন। একজন কেরানী থেকে সে গর্ভনর হয়। সে  ভারতে ফিরে প্রথমেই পরাজিত অযোধ্যার নবাব এবং দিল্লির সম্রাটের দিকে নজর দেন। তিনি অযোধ্যারী পরাজিত নবাবের সঙ্গে মৈত্রী স্থাপন করেন। তার বিনিময়ে আদায় করে নেন কারা ও এলাহাবাদ জেলা দুটি। যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ বাবদ আদায় করেন পঞ্চাশ লক্ষ টাকা।

ক্লাইভ ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মাধ্যমে সম্রাট শাহ আলম ও বাংলার নওয়াব নাজমুদ্দৌলা র সঙ্গে যথাক্রমে ১২ আগস্ট ১৭৬৫ ও ৩০ সেপ্টেম্বর ১৭৬৫-তে সম্পাদিত দুটি ঐতিহাসিক চুক্তির মাধ্যমে ১৭৬৫ সালে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ানি লাভ করে। এ দুটি চুক্তির আওতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে রাজকীয় ফরমানের মাধ্যমে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দীউয়ান নিযুক্ত করা হয় এ শর্তে যে, কোম্পানি বাংলায় আদায়কৃত রাজস্ব হতে সম্রাটকে কর হিসেবে সুনিদ্দিষ্ট ছাব্বিশ লক্ষ টাকা এবং বাংলার নওয়াবকে তাঁর নিজামত (বেসামরিক প্রশাসন) চালাবার জন্য তিপ্পান্ন লক্ষ টাকা দেবে।

একটি দিল্লির সম্রাট শাহ আলমের সঙ্গে। ১৭৬৫ সালে মোগল সম্রাট শাহ আলমের নিকট থেকে ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী একসালা চুক্তির  মাধ্যমে বার্ষিক ২৬ লক্ষ টাকা রয়্যালটির বিনিময়ে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার ভূমি রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ কর্তৃত্ব বা দেওয়ানী লাভ করেন।  এই টাকা নিয়মিত পাঠাবার জামিনদার হবে কোম্পানি।

অপর চুক্তিটি হয় মীর জাফরের নাবালক পুত্র নবাব নাজিম-উদ-দ্দৌলার সঙ্গে। ১৭৬৫ খ্রি: মীর জাফরের মৃত্যুর পর তার পুত্র নাজিম-উদ-দৌলাকে শর্ত সাপেক্ষে বাংলার সিংহাসনে বসানো হয়। শর্ত থাকে যে তিনি তার পিতার মতো ইংরেজদের নিজস্ব পুরাতন দস্তক অনুযায়ী বিনা শুল্কে অবাধ বাণিজ্য করতে দিবেন এবং দেশীয় বণিকদের অবাধ বাণিজ্যের সুবিধা বাতিল করে দিবেন।

বাৎসরিক ৫৩ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নবাব কোম্পানির দেওয়ানী লাভের সকল শর্ত মেনে নেন। এই চুক্তিদ্বয়ের ফলে যে দেওয়ানী লাভ করা হয় তাতে এ অঞ্চলে কোম্পানির ক্ষমতা একচেটিয়া বৃদ্ধি পায়। নবাব এখন বস'ত কোম্পানির পেনশনার মাত্র। সম্রাটও তাই। সমস্ত ক্ষমতা কোম্পানির হাতে। দেওয়ানীর ফলে কোম্পানির যে আয় হবে তা দিয়ে কোম্পানির সমস্ত খরচ কুলিয়ে ব্যবসার সমস্ত পুঁজি সংগ্রহ করা সম্ভব। 

রবার্ট ক্লাইভ

সুতরাং, দেওয়ানীর গুরুত্ব সম্পর্কে বলতে হয় যে, বক্সারের যুদ্ধের পর বাংলায় ইংরেজ শাসনের পথ সুগম হয়। এ সময়ে ইংরেজ কোম্পানি মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে বাংলার রাজস্ব আদায়ের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্থাৎ দেওয়ানী লাভ করে। ১৭৬৫ খ্রিঃ দেওয়ানি লাভের পর প্রকৃতপক্ষে ইংরেজরাই বাংলার সত্যিকার শাসকরূপে আত্মপ্রকাশ করে। দেওয়ানী লাভের ফলে ইংরেজরা যে সব সুবিধা লাভ করে তা হল

এক. দেওয়ানী লাভ কোম্পানির শুধু রাজনৈতিক নয় অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বিশাল বিজয়।

দুই. সম্রাট ও নবাব উভয়েই ক্ষমতাহীন শাসকে পরিণত হন। প্রকৃতপক্ষে তারা হয়ে যান কোম্পানির পেনশনভোগী কর্মচারী।

তিন. দেওয়ানী লাভের ফলে এবং নবাব কর্তৃক প্রদত্ত শর্ত অনুযায়ী শুল্কহীন বাণিজ্যের কারণে কোম্পানির কর্মচারীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তাদের অর্থ লোভ দিন দিন বেড়ে যেতে থাকে। ক্ষতিগ্রসত হতে থাকে দেশীয় বণিক শ্রেণি, সাধারণ মানুষ। তাদের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে পড়ে।

চার. দেওয়ানী লাভের ফলে বাংলা থেকে প্রচুর অর্থ সম্পদ ইংল্যান্ডে পাচার হতে থাকে। এর পরিমাণ এতটাই ছিল যে এই অর্থের বলে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ-বর ক্ষেত্র প্রস'ত হয়েছিল।

একশালা বন্দোবস্তের সময় কোম্পানী মোহাম্মদ রেজা খানকে নায়েবে দেওয়ান নিযুক্ত করে রাজস্ব আদায় করতে থাকে। কিন্তু রাজস্ব আদায় আশানুরুপ না হওয়ায় রেজা খানকে অপসারন করে প্রত্যেক পরগনায় এক জন করে ইংরেজ রেভিনিউ সুপারভাইজার নিয়োগ করে। এ সময় থেকেই উল্লেখিত পরিমান রয়্যালটি উত্তোলনের জন্য রায়তদের(কৃষককুলের) উপর খাজনা আদায়ে নির্মম অত্যাচার করা হত।

বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে মুনাফা সর্বোচ্চকরণের জন্য যথেচ্ছ রাজস্ব আদায়, কোম্পানির কর্মচারীদের লুটতরাজ এবং ভুলনীতির কারণে ১৭৭০ সালে (১১৭৬ বঙ্গাব্দ) বাংলার বুকে নেমে আসে ইতিহাসের সর্বাপেক্ষা ব্যাপক ও ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ, যা ছিয়াত্তরের মন্বন্তর নামে পরিচিত। এ দুর্ভিক্ষে প্রায় এক কোটি মানুষ মৃত্যুবরণ করে। গ্রামের পর গ্রাম উজার হয়ে যায়। কিন্তু ইংরেজ বেনিয়াদের রাজস্ব আদায়ের নিষ্ঠুরতা কোনভাবেই হ্রাস পায়নিভয়াবহ এই দূর্ভিক্ষ মাঝেও ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী রায়তদের নিকট থেকে তৎকালীন ১,২৪,০০০ টাকা খাজনা আদায় করেছে ।

দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ শুরু হল। এমনটি অতীতে এই অঞ্চলের মানুষ কখনো দেখেনি। ১৭৭০ সালের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত ৮ মাস সময়ের মধ্যে প্রায় এক কোটি মানুষ না খেয়ে মারা গেছে। এই বছরের ১৫ জুলাই থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর- মাত্র দুই মাস- সময়ে মধ্যে শুধু কলকাতা শহরে অন্তত ৭৬ হাজার মানুষ মারা যান। [ শিবনাথ শাস্ত্রী, রামতনু লাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ, সংকলন বিশ্বজিৎ ঘোষ, নবযুগ প্রকাশনী, ঢাকা, ২০১২, পৃষ্ঠা : ৩]

দুর্ভিক্ষ

নজিরবিহীন সেই দুর্ভিক্ষের ফলাফল সম্পর্কে ‘হৃদয় নাড়া দেয়া’ বর্ণনা দিয়ে শাস্ত্রী লিখেছেন:

মানুষের লাশ রাস্তায়, রাস্তার ধারে পড়ে থাকতো। পড়ে থাকতো হাটে ঘাটে, কলকাতা শহরের জেলগুলোর ভেতরে। এসব লাশ সরানোর জন্য মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর ছিল।’ এরপর তিনি লিখেছেন: ‘আশ্চর্যের বিষয় ছিল যে, নব্য প্রতিষ্ঠিত ব্রিটিশ প্রশাসন এই মর্মান্তিক অবস্থাকে মোকাবেলায় কোনো পদক্ষেপ নেয়নি।

১৭৭১ সালে বাংলা থেকে রাজস্ব আদায় হয়েছিল এক কোটি সাতান্ন লাখ ছাব্বিশ হাজার পাঁচ শত ছিয়াত্তর টাকা। প্রতিবছর বর্ধিত রাজস্ব আদায় স্বত্ত্বেও আরো বেশি রাজস্ব আদায় এবং রাজস্ব ব্যবস্থাকে জন্য সুনির্দিষ্ট ভিত্তির উপর দাঁড় করাতে কোম্পানি প্রথমে একশালা, পরে পাঁচশালা বন্দোবস্ত করে।

পাঁচসালা বন্দোবস্ত (১৭৭২-১৭৭৭) প্রচলিত জমিদার পদ্ধতির পরিবর্তন ঘটিয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ খাজনা দিতে অঙ্গীকারাবদ্ধ ইজারাদার দের সঙ্গে পাঁচ বছরকালীন খাজনা আদায়ের ব্যবস্থা প্রবর্তনই পাঁচসনা বন্দোবস্ত। ওয়ারেন হেস্টিংস কর্তৃক ১৭৭২ সালে প্রচলিত এ পরীক্ষামূলক ব্যবস্থার উদ্দেশ্য ছিল, ভূমির খাজনা বৃদ্ধি ও তা যথাসময়ে আদায় করা।

হেস্টিংস তাই তাঁর দুজন নায়েব রেজা খান ও শিতাব রায়কে বরখাস্ত করে  দেওয়ানীর দায়িত্বভার নিজেই সরাসরি হাতে তুলে নেন। তিনি খালসা, অর্থাৎ রাজস্ব সদর দপ্তর মুর্শিদাবাদ থেকে কলকাতায় সরিয়ে আনেন, এবং দীউয়ানি পরিচালনার জন্য স্বয়ং সভাপতি থেকে একটি রাজস্ব কমিটি গঠন করেন।

রাজস্ব ব্যবস্থাপনার কর্ণধার হিসেবে হেস্টিংস ১৪ মে ১৭৭২ তারিখে তাঁর রাজস্ব প্রশাসনের রূপরেখা ঘোষণা করেন। তদনুযায়ী, কমিটি অব সার্কিট (এ কমিটির চেয়ারম্যান তিনি নিজেই ছিলেন) দেশের বিভিন্ন প্রদেশে সফর করে রাজস্ব আদায়কারীদের সঙ্গে ‘পাঁচসনা বন্দোবস্ত’ চূড়ান্ত করে। রাজস্ব আদায়কারীদের আদায়কৃত রাজস্বের শতকরা দশ ভাগ, রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব হতে অব্যাহতিপ্রাপ্ত পূর্বকার জমিদারদেরকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বার্ষিক ভাতা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ইউরোপীয় প্রতিনিধিদের দ্বারা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করা হয়। এরা ‘জেলা কালেক্টর’ হিসেবে অভিহিত হন। কমিটি অব সার্কিট বন্দোবস্তের কাজ ১৭৭২ সালের মধ্যে শেষ করে।

পাঁচসনা বন্দোবস্তের কার্যকারিতা সময়ে দেখা যায় যে, অনুমান ভিত্তিক অতিরিক্ত রাজস্ব ধার্যের কারণে বহুসংখ্যক কৃষক রাজস্ব দিতে ব্যর্থ হয়। এ কারনে অনেকেই গ্রেফতার হওয়া আটক হবার ভয়ে পালিয়ে যান। অনেক পরগনায় নির্যাতিত রায়তগণ অত্যাচারী রাজস্ব আদায়কারীদেরকে প্রকাশ্যে বাধা দেয়। অধিকাংশ রাজস্ব আদায়কারীরই ভূম্যধিকারী হওয়ার এবং ভূমি ব্যবস্থাপনার পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না।

অভিজ্ঞতা না থাকলেও ধনী হবার আশায় তারা ভূমি নিয়ন্ত্রনণ ব্যবস্থায় যুক্ত হয়। বিভিন্ন ধরনের কঠোরতা ও নির্যাতনমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাঁরা রাজস্ব আদায় খাতে বিনিয়োগকৃত মূলধন আহরণে সচেষ্ট হন। ফলে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি ঘটে।

খাজনা আদায় নিশ্চিত করতে রেভিনিউ কালেক্টরের কাজ তদারকী করার জন্য ৩ সদস্যের রেভিনিউ কাউন্সিল গঠিত হয়। এই কাউন্সিলের অধীন ৫ সদস্যের কমিটি অব সার্কিট গঠন করা হয়। সার্কিট কমিটির সদস্যগন জেলা সদরে তাবু স্থাপন করে অবস্থান করতেন। সার্কিট কমিটির এই আবাসস্থলের নামকরন করা হয় সার্কিট হাউজ।

গ্রামাঞ্চল  ঔপনিবেশিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গঠিত সকল প্রাদেশিক কাউন্সিল রাজস্ব আদায় ব্যবস্থার ভয়াবহ পরিণতি সম্পর্কে প্রতিবেদন পাঠাল। ওয়ারেন হেস্টিংসকে তাঁর রাজস্ব নীতির জন্য কঠোর সমালোচনার সম্মুখীন হতে হয়। মুলত ওয়ারেন হেস্টিংসের  অভিশংসনের প্রধান কারণগুলির একটি ছিল তাঁর রাজস্ব নীতি।

যাহোক, কোর্ট অব ডাইরেক্টর্স কলকাতা সরকারকে ভবিষ্যতে রাজস্ব আদায়ে ইজারাদারি ব্যবস্থা পরিত্যাগ করে জমিদারদের সঙ্গে বন্দোবস্ত করার পরামর্শ দেয়। তদনুযায়ী, ১৭৭৭ সালে কুখ্যাত পাঁচসনা বন্দোবস্তের মেয়াদান্তে জমিদারদের সঙ্গে স্বল্প-মেয়াদি রাজস্ব বন্দোবস্ত করা হয়।

পাঁচসালা বন্দোবস্তের কারনে জমিদারগন খাজনা আদায় করে নিজেদের ভোগ-বিলাসে মত্ত হয়ে পড়ে এবং কোম্পানীকে পুরোপুরি খাজনা প্রদানে গড়িমসি করে। বিধায় ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়ে ১৭৭৭ সালে পূনরায় একসালা বন্দোবস্ত  দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত Permanent Settlement )

কাঙ্খিত খাজনা আদায়ে ব্যর্থ হয়ে কোম্পানী কর্মকর্তাগন রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনায় পদ্ধতী পরিবর্তন করার চিন্তা ভাবনা করেন। ১৭৮৬ সালে লর্ড কর্ণওয়ালিশ ভারতের গভর্ণর জেনারেল নিযুক্ত হয়ে সার্বিক বিষয়ে পর্যালোচনা করে ১৭৯০ সালে দশ বছর মেয়াদী জমিদারী বন্দোবস্ত প্রথা চালু করেন যা দশসালা  বন্দোবস্ত নামে পরিচিত । তবে বন্দোবস্ত চুক্তিতে উল্লেখ করা হয় পরবর্তীতে এই মেয়াদ বর্ধিত করা হলে আলাদাভাবে নিলাম ডাকার প্রয়োজন হবে না। এই সময় রাজস্ব বোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কালেক্টর কর্তৃক জমির খাজনা নির্ধারন করার নিয়ম চালু হয়।

কিন্তু কোন ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত ফল না দেয়ায় ১৭৯৩ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড কর্নওয়ালিস বাংলার ভূমি রাজস্ব ব্যবস্থায় ‘চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত’ চালু করেন। ১৭৯৩ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানির সঙ্গে ভূমির মালিক সব শ্রেণির জমিদার ও স্বতন্ত্র তালুকদারদের সঙ্গে একটি চুক্তি সম্পন্ন হয়।

পূর্ববর্তী ব্যবস্থাসমূহে জমিদাররা ছিল কোম্পানির রাজস্ব আদায়কারী এজেন্ট। জমিতে তাদের কোন দখলিস্বত্ব ছিল না। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে জমিদারদের জমির মালিক ও স্বত্বাধিকারী করা হয়। কৃষকরা জমির ওপর তাদের স্বত্ব হারিয়ে জমিদারের প্রজায় পরিণত হয়। আগে জমিদাররা এজেন্ট হিসাবে জমির মালিক কৃষকের কাছ থেকে রাজস্ব আদায় করতো চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বদৌলতে তারা নব্য সৃষ্ট প্রজার কাছ থেকে কর আদায়ের অধিকারী হলো।

এই আইনের মাধ্যমে চাষি বা রায়তরা তাঁদের জমির ওপর মালিকানা হারান। পূর্বে যে জমির মালিক ছিল খোদ কৃষক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তার মালিক হলো জমিদার। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার ও তালুকদাররা জমির স্থায়ী মালিকানা লাভ করেন। এই বন্দোবস্তের ফলে ভূমি মালিকরা চিরস্থায়ীভাবে একটি নির্দিষ্ট হারে খাজনা প্রদান করার সুযোগ লাভ করেন। কিন্তু যেসব প্রজা বা রায়ত জমি চাষ করত তাদের ক্ষেত্রে স্থায়ী নির্দিষ্ট কোনো খাজনার বিধান ছিল না। উপরন্তু প্রজারা তাদের বংশপরম্পরায় বসবাস ও চাষাবাদ করে আসা জমি অন্য কারো কাছে হস্তান্তরের অধিকার হারায়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনুযায়ী আদায়কৃত বাৎসরিক খাজনার নয়-দশমাংশ কোম্পানিকে দেয়ার শর্তে বংশানুক্রমিক ভোগদখল, ক্রয়-বিক্রয়, বিলি-ব্যবস্থার অধিকারী হয় জমিদাররা।ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি এই বিধান প্রচলনের পর জমিদারদের কাছ থেকে রাজস্ব আদায়ে অনেক বেশি কড়াকড়ি আরোপ করে।

কোনো জমিদার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে রাজস্ব প্রদানে ব্যর্থ হলে তাঁর জমিদারি নিলামে তোলার ব্যবস্থা করা হয়। ফলে অনেক জমিদারির মালিকানা বদল হতে থাকে। ৷ কোম্পানী প্রশাসন মুলত বহুমুখী উদ্দেশ্যে এই ভূমি ব্যবস্থা প্রনয়ন করে ৷ এই ব্যবস্থার প্রবর্তক লর্ড কর্নওয়ালিস বলেন যে;

“আমাদের নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যই (এ দেশের ) ভূস্বামীগনকে আমাদের সহযোগী করিয়া লইতে হইবে ৷ যে ভূস্বামী একটি লাভজনক ভূসম্পত্তি নিশ্চিত মনে ও সুখে শান্তিতে ভোগ করিতে পারে তাহার মনে উহার কোনরুপ পরিবর্তনের ইচ্ছা জাগিতেই পারে না ” (বদরুদ্দীন উমর,ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন, নওরোজ কিতাবিস্তান,১৯৮৭, পৃঃ১৪)

কর্নওয়ালিস তৎকালীন বৃটেনে প্রচলিত Manorial System এর আদলে বাঙলার সমাজ ব্যবস্থাকে ঢেলে সাঁজাতে চাইলেন।

মনোরিয়াল পদ্ধতি

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রতি জমিদাররা তীব্র প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। কিন্তু তারা এ বন্দোবস্ত মেনে নিয়েছিলেন কারণ তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প পথ খোলা ছিল না। তাদেরকে বলা হয় যে, হয় তাদের বন্দোবস্ত মেনে নিতে হবে, নয় একটি বার্ষিক বৃত্তির বিনিময়ে জমিদারি স্বত্ব ছেড়ে দিতে হবে। অধিকাংশ জমিদার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বটিকা গলাধঃকরণ করার চেষ্টা করেন, কারণ তারা ভীতির সঙ্গে লক্ষ্য করেন যে, যারা এ নতুন ব্যবস্থাকে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন তাদের নির্মমভাবে দমন করা হয়েছে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে যারা জমিদারি ক্রয় করেছিলো তারা ছিল শহরে বসবাসরত ব্যবসায়ি শ্রেণি। তাদের মেজাজ এবং চরিত্রও ছিল পূর্বের জমিদারদের চেয়ে ভিন্ন। নিজেরা সরাসরি জমিদারি তত্ত্বাবধান না করে মধ্যস্বত্ত্বভোগী একটি শ্রেণির ওপর নির্ভর করতো। এই নির্ভরশীলতার কারণে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত কাঠামোর মধ্যে ‘পত্তনি’ নামে নতুন ভূমিস্বত্বের সৃষ্টি হয় এবং পত্তনিদার নামে নতুন বংশানুক্রমিক মধ্যস্বত্বভোগী শ্রেণি জন্মলাভ করে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্থের মাধ্যমে জমিদার ঔপনিবেশিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ভূ-সম্পত্তির নিরঙ্কুশ স্বত্বাধিকারী হন। জমির স্বত্বাধিকারী হওয়া ছাড়াও জমিদারগণ স্বত্বাধিকারের সুবিধার সাথে চিরস্থায়ীভাবে অপরিবর্তনীয় এক নির্ধারিত হারের রাজস্বে জমিদারিস্বত্ব লাভ করেন।

চুক্তির আওতায় জমিদারদের কাছে সরকারের রাজস্ব-দাবি বৃদ্ধির পথ রুদ্ধ হয়ে গেলেও জমিদারদের তরফ থেকে প্রজাদের ওপর রাজস্বের দাবি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে কোন বিধিনিষেধ আরোপিত হয়নি। ফলে, শত শত বছর পাশাপাশি বসবাস করা সত্ত্বেও স্বদেশের মুসলমান ও স্বজাতির নমশূদ্রদের (নিম্ন বর্ণের হিন্দু)উপর নেমে এল অবর্ণনীয় শোষণ,নির্যাতন ও অত্যাচার। বর্ণ হিন্দু নব্য জমিদাররা গড়ে তুলে সম্পদের পাহাড়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে উচ্চ বর্ণ হিন্দু জমিদার ও ইংরেজদের লুণ্ঠন সম্পর্কে বিনয় ঘোষ লিখেছেনঃ

“নবাবের সিংহাসন নিয়ে চক্রান্ত করে, জমিদারী বন্দোবস্ত ও রাজস্ব আদায়ের নতুন ব্যবস্থা প্রবর্তন করে, ব্যক্তিগত ও অবৈধ বাণিজ্য থেকে প্রচুর মুনাফা লুণ্ঠন করে এবং আরও নানা উপায়ে উৎকোচ-উপঢৌকন নিয়ে চার্ণক-হেজেস-ক্লাইভ-হেষ্টিংস-কর্নওয়ালিসের আমলের কোম্পানির কর্মচারীরা যে কি পরিমাণ বিত্ত সঞ্চায় করেছিলেন তা কল্পনা করা যায় না। …. দেখতে দেখতে প্রচুর অর্থ ও নতুন রাজনৈতিক ক্ষমতার জোরে কোম্পানি সাহেবরা সত্যি সত্যি নবাব বনে গেলেন। তাদের মেজাজ ও চালচলন সবই দিন দিন নবাবের মতো হয়ে উঠতে লাগল” (বিনয় ঘোষ, কলকাতা শহরের ইতিবৃত্ত, পৃষ্ঠা ৪৪৫)।

সে সময়ে এই ব্যবস্থার সমর্থক একদল বুদ্ধিজীবী ও তৈরি হয়।বঙ্কিমচন্দ্র চট্রোপাধ্যায় এই সম্পর্কে বলেন,

“১৭৯৩ সালে যে ভ্রম ঘটিয়াছিল, এক্ষনে তাহার সংশোধন সম্ভব না  ৷ সেই ভ্রান্তির উপরে আধুনিক বঙ্গ সমাজ নির্মিত হইয়াছে ৷ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ধ্বংস  বঙ্গ সমাজের ঘোরতর বিশৃঙ্খলা উপস্থিত হইবার সম্ভাবনা ৷ আমরা সামাজিক বিপ্লবের অনুমোদক নই ৷ বিশেষ যে বন্দোবস্ত ইংরেজরা সত্য প্রতিজ্ঞা করিয়া চিরস্থায়ী করিয়াছেন তাহার ধ্বংস করিয়া তাঁহারা এই ভারতমন্ডলে মিথ্যাবাদী বলিয়া পরিচিত হয়েন প্রজাবর্গের চিরকালের অবিশ্বাস ভাজন হয়েন এমন কুপরামর্শ আমরা ইংরেজদিগকে দিই না ৷ যে দিন ইংরেজ অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব সমাজের অমঙ্গলাকাঙ্ক্ষী হইব সেই দিন সে পরামর্শ দিব ৷ ” (বদরুদ্দীন উমর, প্রাগুক্ত, পৃষ্টা ২১ )

ইংরেজ তোষণকারী বুদ্ধিজীবিবের মধ্যে রামমোহন রায়ও ছিলেন। প্রেস রেগুলেশনের বিরুদ্ধে ১৮২৩ সালে রামমোহন সুপ্রিম কোর্টের কাছে যে আবেদন লিখেছিলেন তার পরিপ্রেক্ষিতে ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদার বলছেন :

…So far as India was concerned Rammohan had an unbounded faith in the sense of Justice and goodness of the British Government, and accepted the British rule as an act of Divine providence to deliver India from the tyranny of its Muslim rules. But, curiously enough, he was enamoured of the colonisation of India by the British and glorified the role played by them for civilising the Indians.[রামমোহন রচনাবলী, সম্পাদনা : প্রসাদরঞ্জন রায়, ডিসেম্বর ২০০৮, পৃ ৭৫১]

নানা অসন্তোষ সত্ত্বেও এই চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ব্যবস্থাটি প্রায় দেড় শ বছর টিকে ছিল। শেরে বাংলা ফজলুল হক সরকারের ১৯৩৮ সালে প্রণীত বঙ্গীয় প্রজাস্বত্ব আইনের মাধ্যমে কার্যত প্রজারা জমির স্বত্বাধিকারী হয়ে ওঠে। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলোপের মাধ্যমে বাংলায় চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিলোপ ঘটে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রবর্তনের কারণ ও উদ্দেশ্যঃ

কোন একক কারণে চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রবর্তন হয়নি। এর পিছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। সেগুলো হলঃ

  • ইংরেজ প্রশাসনকে গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত করা। কেননা চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদাররা বিচারিক কর্মকাণ্ডসহ কিছু প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডও সম্পাদন করে।
  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ইংরেজ শোষণকে পরোক্ষ শোষণে পরিণত করে। জমিদার ও নায়েব গোমস্তারা সরাসরি অত্যাচার নিপীড়ন করে কর আদায় করতো। সঙ্গতকারণেই কৃষকদের রাগ-ক্ষোভ ছিল তাদের প্রতি। বাংলার কৃষক বিদ্রোহগুলো পরিচালিত হয়েছে জমিদারদের বিরুদ্ধে, তা সরাসরি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়নি। মহান সিপাহী অভু্যত্থান ছাড়া কোন বিদ্রোহ ব্রিটিশকে সরাসরি মোকাবেলা করতে হয়নি। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের এটিও একটি কারণ ছিলো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের প্রধান নীতিসমূহঃ

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল কোম্পানি সরকার ও জমিদারদের মধ্যে সম্পাদিত একটি চুক্তি। এর মূল নীতি নিম্নরূপ -

  • চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত জমিদারদেরকে জমির স্থায়ী মালিকে পরিণত করে এবং জমিদারগণ জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করে।
  • জমিদারদের স্বাধীনভাবে জমি হস্তান্তর, দান বা উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বন্টনের ক্ষমতা দেয়া হয়।
  • রাজস্বের পরিমাণ চিরদিনের জন্যে নির্দিষ্ট করে দেওয়ার ফলে নিয়মিত রাজস্ব প্রদানের বিনিময়ে 
  • জমিদার জমিদারী ভোগের চিরস্থায়ী অধিকার লাভ করে। কোন অজুহাতে রাজস্ব বাকী রাখা যাবে না। জমির রাজস্ব কিস্তি নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে পরিশোধ না করতে পারলে, জমি নিলাম করে রাজস্ব আদায় করা হবে। এই নিয়ম সূর্যাস্ত আইন' নামে পরিচিত।
  • এ প্রথা চালু হওয়ার ফলে জমিদারদের প্রশাসনিক ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়। সরকার স্বয়ং শান্তি রক্ষা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এই ব্যবস্থায় কৃষককে জমিদারের ইচ্ছাধীন প্রজায় পরিণত করা হয় ।
  • এ ব্যবস্থা অনুযায়ী বিচার, পুলিশী ও শুল্ক আদায় সংক্রান্ত যাবতীয় ক্ষমতা জমিদারদের হাত থেকে ব্রিটিশ সরকারের হাতে বর্তাবে।
  • বিশৃঙ্খলা দমনে জমিদাররা একটি লাঠিয়াল বাহিনী সৃষ্টি করতে পারবে । জমিদাররা ভূমি কর ছাড়াও প্রজাদের ওপর বিভিন্ন ধরনের করারোপ করতে পারবে । জমিদারদের নিরাপত্তার স্বার্থে ইংরেজরা সামরিক সাহায্য করতে পারবে।
  • খাজনা বাকি পড়লে জমিদারদের ভূমির কিছু অংশ বিক্রি করে রাজস্ব আদায় করার ব্যবস্থা ছিল।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্থের প্রভাব

একথা ঠিক চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শাসনের ভিত্তি রচিত হয়। এ বস্তোবস্তের প্রভাব কেবল কৃষক সমাজেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, উৎপাদন কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন বাংলার আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থার গতি প্রকৃতি আমূল বদলে দেয়।

এই ব্যবস্থা অনুযায়ী জমিদার বংশানুক্রমে জমির স্বত্ব ভোগ করবেন এবং তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ রাজস্ব কোম্পানির কোষাগারে জমা দিতে হবে । নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তকালের মধ্যে খাজনা জমা দিতে না পারলে জমিদার জমির অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন । বছরের নির্দিষ্ট দিনে সূর্যাস্তের পূর্বে রাজস্ব পরিশোধ করতে হত বলে একে সূর্যাস্ত আইন ও বলা হয়।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বাংলার আর্থ-সামাজিক কাঠামোতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলে। কর্ণওয়ালিস জমিদার ছিলেন। তিনি ইংল্যান্ডের মতো এদেশেও একটি জমিদার শ্রেণি গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ইউরোপ আর উপমহাদেশের আর্থ-সামাজিক কাঠামো ও তার বিকাশের ধরন এক ছিল না। 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলাফল অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী। এর ফলাফলকে আর্থ-সামাজিক পরিবর্তন ও ভূমি-অর্থনীতি বিপর্যয়, দুই শ্রেণীতে বিভক্ত করা যায়। নিমে তা আলোচনা করা হলো। তবে  বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া এ ব্যবস্থায় সুবিধার চেয়ে অসুবিধাই অধিক পরিলক্ষিত হয়।

সুবিধাঃ

জমির উন্নয়নঃ  জমির উপর স্থায়ী মালিকানা লাভ করায় জমিদারগণ জমির উন্নয়নে সাধ্যমত চেষ্টা করেন। এতে কিছু ক্ষেত্রে জমির উৎপাদিকা শক্তি এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। ফলে কৃষি অর্থনীতি চাঙ্গা হয়।

সরকারের নির্দিষ্ট আয়ের পরিমাণ ধারনা পাওয়াঃ  এ ব্যবস্থার প্রধান সুবিধা হচ্ছে সরকারের রাজস্ব আয় সুনির্দিষ্ট হওয়ার ফলে সরকার তার আয়ের পরিমাণ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়। যে কারণে বাজেট প্রণয়ন, বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সরকারের পক্ষে সহজ হয়।

অনুগত একটি শ্রেণীর সৃষ্টিঃ এ ব্যবস্থার ফলে ইংরেজদের অনুগত একটি জমিদার শ্রেণীর সৃষ্টি হয়। ফলে ব্রিটিশ শাসন দৃঢ়করণ এবং দীর্ঘায়িতকরণে জমিদাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

সামাজিক গতিশীলতাঃ নব সৃষ্ট বিত্তবান জমিদারদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও জনকল্যানমূলক কর্মকান্ডে অর্থ ব্যয়ের ফলে গ্রামীন সমাজ জীবনে গতিশীলতা আসে। এভাবে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত গ্রামবাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে এক বিপ্লব ঘটায়।

অবকাঠামোর উন্নয়নঃ উপর জমিদারের স্থায়ী মালিকানা স্বীকৃত হওয়ার কারণে অনেকেই নিজ নিজ এলাকায় নানা ধরনের জনকল্যাণমূলক কাজে ব্রতী হন। তারা নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, চিকিৎসালয়, উপাসনালয় প্রভৃতি প্রতিষ্ঠা করেন। তাছাড়া প্রজাদের কল্যাণের জন্য রাস্তাঘাট, পুল তৈরি, পুকুর খননের মতো কাজ ছাড়াও অনেক সামাজিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে তাঁরা জড়িত হন।

পুঁজিবাদী শ্রেণীর সৃষ্টিঃ  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে পরোক্ষভাবে ভারত উপমহাদেশে পুঁজিবাদ সম্প্রসারিত হয়। জমিদার শ্রেণীর হাতে অর্থ আসায় তা ব্যবসা-বাণিজ্যে লগ্নি হতে থাকে। কালক্রমে জমিদার শ্রেণী হতে পুঁজিপতি গোষ্টির সৃষ্টি হয়।

আর্থসামাজিক উন্নয়নঃ  জমিদাররা জমির মালিক হওয়ার কারণে উৎসাহিত হয়ে পতিত জমি, জঙ্গলাকীর্ণ জমি চাষের ব্যবস্থা করেন। ফলে উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দেশের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হয়।

শিক্ষার সম্প্রসারঃ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের পরোক্ষ ফল হিসাবে বাংলায় ইংরেজি শিক্ষার প্রসার ঘটেছে। বেশ কয়েকজন প্রজা হিতৈষী জমিদার প্রজাদের কল্যাণে ব্যাপকভাবে স্কুল-কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। এটি সম্ভব হয়েছিলো জমি হতে প্রাপ্ত রাজস্ব দ্বারা, যার মালিক ছিলো জমিদার।

কুফলঃ

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মাধ্যমে মূলত জমিদারের স্বার্থ সুরক্ষিত হয়। তারা ধীরে ধীরে ধনীক শ্রেণিতে পরিণত হয়। কিন্তু অপর দিকে জমিতে প্রজাদের পুরোনো স্বত্ব সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়। ফলে জমিদার ইচ্ছে করলেই যেকোনো সময় তাদের জমি থেকে উচ্ছেদ করতে পারত। প্রথম দিকে প্রজাস্বত্ব আইন না থাকায় তাদের ভাগ্যের জন্য তারা সম্পূর্ণভাবেই জমিদারের দয়ার উপর নির্ভর করতো।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সুফলের চেয়ে কুফলের পরিমানই বেশি। সেগুলো সংক্ষেপে উল্লেখ করা হলঃ

মামলা-মোকান্দমাঃ  চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত অনেকটা হঠাৎ করে প্রবর্তিত করা হয়। এর ফলে সঠিক জরিপের মাধ্যমে জমি ভাগ হয়নি। উপরস্তুত নিষ্কর জমির ওপর বেশি করে রাজস্ব নির্ধারিত হয়। জমির সীমানা নির্ধারণ নিয়ে জমিদাররা একে অপরের বিরুদ্ধে অসংখ্য
মামলা করতে থাকে।

দেশিয় শিল্প ধ্বংসঃ দেশীয় কুটির শিল্প গুলো ধ্বংস হবার ক্ষেত্রে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত একটি যে কারন ছিল ১৭৯৩  লর্ড কর্নওয়ালিসের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর ডিরেক্টরদের কাছে লেখা একটি পত্র থেকে বোঝা যাই এতে সে লিখে যে

"ভূমিস্বত্বকে নিরাপদ ঘোষনা করার সঙ্গে সঙ্গেই এদেশীয় হাতে যে বিরাট পূঁজি আছে সেটাকে তারা অন্য কোনভাবে নিয়োগ করার উপায় না দেখে ভূসম্পত্তি ক্রয়ের উদ্দেশ্যে ব্যয় করবে ৷ " ( ভারতীয় জাতীয় আন্দোলন লেখক বদরুদ্দীন উমর পৃষ্টা ১৫)

কর্নওয়ালিসের এই উক্তিটি থেকে বোঝা যায় ইংরেজরা বাংলায় সে সময় উৎপাদনশীল বানিজ্য বা কুটির বা বৃহত্তর শিল্পগুলো বা দেশীয় মালিকানাধীন মৌলিক বানিজ্য গুলোতে এদেশীয় পূঁজিপতিদের এর প্রকার বিরত রাখার জন্য প্রকাশই নীতি গ্রহন করেছিল ৷ ইংরেজরা চাইতো বাংলার পূঁজিবাদের বিকাশ হোক তাদের ছত্রছায়ায় এর ফলে গড়ে উঠুক একটি শ্রেনীর যারা যুগ যুগ ধরে তাদের উপনিবেশ গুলোতে তাদের শাসন টিকিয়ে রাখবে ৷ আর এই ক্ষেত্রে ইংরেজরা পুরোপুরি সফল হয়েছিল ৷

কৃষকদের দুরবস্থাঃ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে প্রজা ও কৃষকদের কোন উন্নতি হয়নি। জমিতে প্রজাদের পুরাতন স্বত্ব চিরতরে বিলুপ্ত হয়, তারা জমির মালিকানা হারায়।  তারা জমিদারদের করুণার উপর নির্ভরশীল হতে বাধ্য হয়। জমিদার ইচ্ছা করলে যে কোন সময় কৃষকদের উচ্ছেদ করতে পারতেন। পরিশ্রম করেও কৃষকগণ যথাযথ পারিশ্রমিক পেতেন না।  উদাহরন হিসেবে একটি বিষয় তুলে ধরা যায়,

সে সময় উত্তরবঙ্গে বিঘা প্রতি ৫ মণ ধান উৎপন্ন হতো। এ ছাড়া কিছু পাট ও আউস ধান পেতো। দশ বিঘা জমিতে ৫০ মণ ধান উৎপন্ন হতো। তার দাম মণ প্রতি ছয় টাকা আট আনা (ষোল আনায় এক টাকা) দরে মোট ৩২৫ টাকা, ৫০ টাকার পাট ও ৩৬ টাকার আউস এবং বিছালীর দাম ৫০ টাকা ধরে উৎপন্ন ফসলের মোট দাম পেতো ৪৬১ টাকা।

আধিপ্রথায় আধিয়ার পেতো ২৩০ টাকা আট আনা আর জমিদারও পেতো সমান ২৩০ টাকা আট আনা। জমিদারের খরচ ছিল কেবল জমির খাজনা বাবদ ব্যয় ছিল মাত্র ২০ টাকা। জমিদার ২০ টাকা খরচ করে মুনাফা পেতো ২১০ টাকা আট আনা।

অপরদিকে ১০ বিঘা জমি চাষ করতে কৃষকের খরচ হতো নিম্নরুপঃ এক জোড়া বলদের পালন বাবদ বাৎসরিক ব্যয় ৪০ টাকা, লাঙল-কোদাল অর্থাৎ কৃষি যন্ত্রপাতি বাবদ ব্যয় ৬ টাকা, বীজ ধান বাবদ খরচ ৯ টাকা আট আনা, মজুরি বাবদ ব্যয় ২৬ টাকা। মোট ৮১ টাকা আট আনা ব্যয় করে আধিয়ার পায় ২৩০ টাকা আট আনা। তার নিট আয় ১৪৯ টাকা।

একজন আধিয়ারের পরিবারে ছয় জন সদস্য বিবেচনায় নিয়ে সেসময় পরিবার প্রতি ব্যয়ের হিসাব করা হয়েছিল ৪৫৪ টাকা আট আনা। এর মানে আধিয়ারের বছরে ঘাটতি পড়তো ৩০৫ টাকা আট আনা। এ ঘাটতি পূরণের জন্য ঋণের আশায় ভাগচাষি আধিয়াররা জোতদারের দুয়ারে ধর্ণা দিত। জোতদার দেড়াবাড়িতে সুদ, আবওয়াব ও আসল ধানের বাবদ আধিয়ারের সর্বস্ব কেড়ে নিয়ে তাকে গোলামে পরিণত করত। ইচ্ছামত জমি হতে উচ্ছেদ করে ক্রমে নিশ্চিহ্ন করে ফেলত!

জমিদার সংঘ সৃষ্টিঃ ১৮৭০ সালে তৎকালিন বৃহত্তর পাবনাতে কৃষকরা জমিদারদের বিরুদ্ধে একটি বৃহত্তর বিদ্রোহ সংগঠিত করে ৷ এটি দমন করতে জমিদার ও ইংরেজ সরকারকে চরম বেগ পেতে হয়ে ছিল ৷ এই সময় জমিদার গন একে অপর সাথে যোগাযোগের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে ৷ এর প্রেক্ষিতে জমিদার সংঘের সৃষ্টি করে ৷

সূর্যাস্ত আইনঃ  সূর্যাস্ত আইনের ফলে নির্দিষ্ট তারিখে সূর্যাস্তের মধ্যে খাজনা পরিশোধ করতে হত। এ  বিধানের কঠোরতার কারণে অনেক বড় বড় জমিদারী নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। এগুলোর মধ্যে বর্ধমানের, নাটোরের, দিনাজপুরের, নদীয়ার, বীরভূমের ও বিষ্ণুপুরের জমিদারী উল্লেখযোগ্য। একমাত্র বর্ধমানের জমিদারী ছাড়া চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের সাত বছরের মধ্যে অন্যান্য সব জমিদারী ধ্বংস হয়ে যায়।

রাজস্বে স্থবিরতাঃ এই ব্যবস্থা গ্রহণের পরবর্তীকালে জমির মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকলেও সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পায় নি। ফলে ব্রিটিশ সরকার বর্ধিত রাজস্বের লাভ হতে বঞ্চিত হয় ।

গ্রামীণ অর্থনীতির দুরবস্থাঃ জমিদারীর স্বত্ব ও আয় সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে নায়েব গোমস্তাদের উপর দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে জমিদারগণ গ্রাম ছেড়ে শহরে বাসবাস শুরু করেন। ফলে গ্রামীন জীবনে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যায়। এ কারনে গ্রামের অর্থনৈতিক অবস্থা দিন দিন খারাপের দিকে যেতে থাকে।

 শিল্পবাণিজ্য ধবংসঃ জমিতে অর্থ নিয়োগের ফলে বিনা পরিশ্রমে ইচ্চামাফিক আয়ের সম্ভাবনা দেখা যায় । জমিতে অর্থ বিনিয়োগ করে অনায়াসে সম্পদ ও মর্যাদা লাভের আশায় শিল্প-বাণিজ্য পরিত্যক্ত হতে থাকে।  ফলে নিম্নবর্ণের অনেক ব্যক্তি, সাধারণ মানুষ যারা কোম্পানির সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করে প্রচুর অর্থের মালিক হন, তারা জমিদারী কিনে আভিজাত্যের মর্যাদালাভে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ফলে দেশীয় পুঁজি, দেশীয় শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা ধ্বংস হয়ে যায়।

ফরিয়া – দালাল – ফটকাবাজ আমিন থেকে জমিদারঃ এই ব্যবস্থার প্রভাবে তাঁতি , তেলি , আমিন, ফটকাবাজ দের হটাৎ জমিদার হয়ে যাওয়ার সুযোগ মিলে ৷ যাদের ইতি পূর্বে মান সম্মানের ছিটে ফোটাও ছিল না ৷ যেমন গঙ্গাগোবিন্দ সিংহ, মানিক চাঁদ, কান্ত বাবু, দর্পনারায়ন ঠাকুর, এরা মুলত ছিল ইংরেজদের বেনিয়া হতে জমিদার হয়েছিল ৷ কলকাতার ঠাকুর পরিবারের জয়রাম ঠাকুর ছিল চব্বিশ পারগনার আমিন ৷ মুর্শিদাবাদের জমিদার দানেশানন্দ নিত্যানন্দ ছিলে প্রথম জীবনে তাঁতী ৷ ( চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালী সমাজ , ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র পৃষ্ঠা ৯৩ )

মামলার জটঃ ১৮৬২সালে কলকাতা হাইকোট প্রতিষ্ঠা হবার পর সারা ভারতে বছরে ১৪ লক্ষ মামলা হয় তার মধ্য শুধু বাংলার মামলা ছিল ৫ লক্ষ ৷ ( চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ও বাঙালী সমাজ , ইতিহাস চর্চা কেন্দ্র পৃষ্ঠা ৮৭)

মুসলমানদের দুরবস্থাঃ  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে বাংলার হিন্দু-মুসলমান সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তবে ইংরেজদের ওপর চরম আক্রোশ নিয়ে বাংলাদেশের নির্যাতিত কৃষকরা যখন যুদ্ধরত, ‘মুসলমান মাত্রই রাণীর বিদ্রোহী প্রজা’– রূপে  চিহ্নিত করা হতো বিষয়টা এমন দাঁড়ায় যে, “… বাংলার মুসলমান পরিবারগুলোর অস্তিত্ব হয় পৃথিবীর বুক থেকে মুছে গেছে, না হয় ইংরেজদের সৃষ্ট নতুন ধনী শ্রেণীর নীচে ঢাকা পড়েছে" (উইলিয়াম হান্টার) ।

সামাজিক বিদ্রোহঃ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সৃষ্ট জমিদারদের অত্যাচার- নিপীড়ন ছিলো কল্পনাহীন। এর ফলে সামাজিক ক্ষেত্রে গণ-অসন্তোষ দেখা দেয়। অসংখ্য কৃষক বিদ্রোহের সূত্রপাত ঘটে। যার পরিসমাপ্তি ঘটে ভয়াবহ রক্তপাতের মধ্য দিয়ে।

বাংলার প্রায় সর্বত্র, বিশেষ করে, পূর্ববঙ্গে ১৮৫০-এর দশকের শেষভাগ থেকে কয়েক দফা কৃষক বিদ্রোহ ঘটে। এ ছিল জমিদার ও রায়তদের মধ্যে ক্ষুণ্ণ সম্পর্কের সবচেয়ে প্রত্যক্ষ বহিঃপ্রকাশ। প্রথমে সাঁওতাল পরগনায় কৃষক গোলযোগ (১৮৫৫) দিয়ে এই সঙ্কটের সূচনা ঘটে। এরপর নীল চাষ হয় এমন সব জেলায় দেখা দেয় নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-৬১)।

১৮৫৮ সন থেকে ১৮৬০ সন পর্যন্ত নীল প্রতিরোধ আন্দোলন চলে। ১৮৭০-এর দশক ও ১৮৮০-র দশকের প্রথমভাগে কৃষক প্রতিরোধ উদ্বেগজনক মোড় নেয়। এই সময় বাংলার কোন কোন এলাকায় চাষিরা জমিতে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে ও জমিদারদের উদ্বৃত্ত শোষণ নূ্যনতম করার লক্ষ্যে একত্রে জোট নাঁধে।

এই আমলে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য কৃষক আন্দোলনগুলি হলো তুষখালি (বাকেরগঞ্জ) কৃষক আন্দোলন (১৮৭২-৭৫), পাবনা কৃষক বিদ্রোহ (১৮৭৩), ময়মনসিংহ উপজাতীয় কৃষক আন্দোলন (১৮৭৪-১৮৮২), মুন্সীগঞ্জ (ঢাকা) কৃষক আন্দোলন (১৮৮০-৮১) ও মেহেন্দীগঞ্জ (বাকেরগঞ্জ) কৃষক বিদ্রোহ (১৮৮০-৮১)। ফরায়েযীরা (মুসলিম সংস্কারবাদী একটি সম্প্রদায়) কৃষক স্বার্থের পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করে এবং গোটা দেশজুড়ে, বিশেষ করে, দক্ষিণ বাংলায় জমিদারি নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে ব্যাপক গোলযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম গড়ে তোলে।

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ভাঙ্গন

১৮৮৮ সাল থেকে শুরু করে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত প্রথম ভূমি জরিপ কার্য সম্পাদিত হয়। এই জরিপকে ক্যাডেষ্টাল সার্ভে সংক্ষেপে সি,এস বলে। এই জরিপের মত নির্ভূল জরিপ আর ২য় বার এদেশে হয়নি। তাই সি,এস রেকর্ডকে সকল জরিপের মূল জরিপ হিসাবে ধরা হয়। এত বছর পরে এখনো সিএস জরিপকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। 

১৯৩৮ সালের দিকে  স্যার ফ্রান্সিস ক্লাউডের নেতৃত্বে একটি কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি দীর্ঘ পর্যালোচনা করে  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তকে অযৌক্তিক এবং রায়তদেরকে সরাসরি সরকারের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে জমিদারদের অত্যাচার থেকে রেহাই দেওয়ার সুপারিশ করে । ১৯৪৫ সালে স্যার বাউল্যান্ডের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি গঠন করা হলে তারাও একই মতামত পূনর্ব্যক্ত করেন। সে অনুযায়ী ১৯৪৭ সালের ১০ এপ্রিল বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইন সভায় রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাস্বত্ব আইনের খসড়া বিলটি উপস্থাপিত হয়।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ ও ইংরেজদের বিদায় পর ১৯৫০ সালে ১৬ মে রাষ্ট্রীয় অধিগ্রহন ও প্রজাস্বত্ব আইন পাশ হয়। উক্ত আইনে রাষ্ট্রের সকল ভূমি জমিদারদের নিকট থেকে সরকার কর্তৃত্ব গ্রহন করে প্রজাদের সম্পত্তির মালিকানা করে প্রজাদের স্বত্ব প্রতিষ্ঠিত করেন। তবে জমিদারদের নিকট থেকে ভূমি অধিগ্রহন করতে সরকারকে নির্ধারিত টাকা প্রদান করতে হয়। এ সময় একজন জমিদারকে সর্বোচ্চ ৩৭৫ বিঘা সম্পত্তি ব্যতিরেকে সমস্থ সম্পত্তি সরকারের অনুকুলে ফেরৎ দিতে হয়।

১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যে জরিপ হয় তাহাকে ষ্টেট এ্যাকুইজেশন সার্ভে সংক্ষেপে এস,এ সার্ভে বলা হয়। বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একক ব্যক্তির অনুকুলে সর্বোচ্চ ১০০ বিঘা সম্পত্তি রাখার বিধান চালু করেন।

পরবর্তীতে ১৯৮৪ সালে রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ একক ব্যক্তির অনুকুলে সর্বোচ্চ ৬০ বিঘা সম্পত্তি রাখার বিধান চালু করেন। যাহা বর্তমানেও চালু আছে। কোরআনের সুরা নিসা অনুযায়ী পিতা জীবিত থাকাকালীন সন্তানের মৃত্যু হলে মৃত ব্যক্তির ওয়ারেশ পিতামহের সম্পত্তির অংশ হতে বঞ্চিত হয়।

রাষ্ট্রপতি হুসাইন মোহাম্মদ এরশাদ মুসলিম পারিবারিক আইনে এই বিষয়টি সংশোধন করে মৃত ব্যক্তির ওয়ারেশদেরকে পিতামহের সম্পত্তির অংশিদার হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেন। রিভিশনাল সার্ভেকে সংক্ষেপে আর,এস এবং ডিভিশনাল সার্ভেকে সংক্ষেপে ডি,এস বলা হয়।

ইতিকথা

প্রকৃতপক্ষে, “কর্ণওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত ছিল একটি সাহসিকতাপূর্ণ বিজ্ঞ পদক্ষেপ” (মার্শম্যান)। তিনি প্রজাদের মঙ্গলের কথা চিন্তা না করেই ইংল্যান্ডের জমিদারী প্রথার আলোকে এদেশে অভিজাত জমিদার শ্রেণী তৈরি করতে চেয়েছিলেন যার ফলে ইংরেজরা এদেশে তাদের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভিত্তি সুদৃঢ় করেছিলো।

দীর্ঘ মেয়াদে যদি আমরা লক্ষ্য করি তাহলে দেখতে পাই যে,  চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে কৃষকরা সরাসরি জমিদার কর্তৃক শোষিত হতে থাকে। এদিকে, এসব অত্যাচারিত জমিদার শ্রেণির পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রামীণ সমাজে একটি শিক্ষিত শ্রেণি গড়ে উঠে।

এই শিক্ষিত শ্রেনী পরবর্তী সময়ে দেশ-জাতি সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে ব্রিটিশ কর্তৃক সৃষ্ট জমিদার শ্রেণি যারা প্রথমদিকে ব্রিটিশ সম্রাজ্যের হাতিয়ার ছিল, তাদেরই পরবর্তী প্রজন্ম পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ব্রিটিশ-রাজ উৎখাতের জন্য স্বাধীনতা আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।

তথ্য সূত্রঃ

১। muldharabd.com

২। bangladesh-history-textbook.blogspot.com

৩। bn.wikipedia.org

৪। blog.bdnews24.com

৫। amarblog.com

৬। আরো নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক