চোখের ১২টি ব্যায়াম যা সহজেই ঘরে করতে পারেন

মানব শরীরের প্রত্যেকটা অঙ্গ গুরুত্ব বহন করে। দেহের সঠিক কাঠামো ও নিজেকে ভাল রাখার জন্যে জন্য কত কিছুই না করি থাকি। ব্যায়াম করা, সাঁতার কাটা, হাঁটা  সহ আরও কত-কী। কিন্তু চোখ ভালো রাখতে ব্যায়াম, ব্যাপারটা হয়তো অস্বাভাবিক শুনাতে পারে।

শরীরের অন্য সব অংশের মতো আমরা আলাদা করে আমাদের চোখের যত্ন নিতে ভুলে যাই বা প্রয়োজন মনে করি না।   কিন্তু ব্যায়াম আছে আপনার চোখের জন্যেও। চোখের জন্য এই ব্যায়ামগুলো খুবই উপকারি। তাছাড়া আপনার দৃষ্টি শক্তি ভালো রাখতেও এগুলো কাজে দিবে।

প্রযুক্তিনির্ভর জীবনযাত্রায় দিনের সিংহভাগ সময় কাটে স্মার্টফোন, কম্পিউটার বা ল্যাপটপের সামনে। চোখের উপর পড়া এই বাড়তি চাপ থেকে আসে ক্লান্তি, হয় অস্বস্তি।

বেশি সময় ধরে কম্পিউটারের সামনে বসে থাকা, টিভি দেখা ও মোবাইল স্ক্রিনে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে থাকা এইসব আমাদের চোখের উপর ফেলছে স্থায়ী প্রভাব। আমরা যারা অতিরিক্ত কম্পিউটার ব্যবহার করি তাদের চোখের ফোকাস বেশিরভাগ সময়ই নিকটবর্তী স্থানে থাকে। পাশাপাশি এদের চোখের পাতা ফেলার হার অনেক কম। সাধারণত প্রতি মিনিটে ২০ বার চোখের পলক পড়ে, কিন্তু কম্পিউটারের পর্দায় তাকানোর সময় তা সাতবারে নেমে আসে।

এ দুটি কারণে চোখে দেখা যায় নানারকম সমস্যা যার মধ্যে চোখে ঝাপসা দেখা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, জ্বালাপোড়া, মাথা ব্যথা কিংবা চোখের পেশি চুলকানি উল্ল্যেখযোগ্য।  এ ছাড়া ঘাড় ও মাথা ব্যাথা তো আছেই। এ সব সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে বাড়িতেই সহজ কিছু ব্যায়াম করতে পারি।

এই ব্যায়ামগুলো দৃষ্টিশক্তি বৃদ্ধি ও চোখের যত্নে সহায়ক হবে। প্রতিদিন সময় করে কিছুটা সময় যদি এই ব্যায়ামগুলো করা যায়, তাহলে অনেক উপকার পাবেন। নিয়মিত চোখের ব্যায়াম করলে দৃষ্টি উন্নত হয়, চোখের রোগ হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়, চোখের শুষ্কতা কমায়, চোখের জ্বালাপোড়া কমায়।

চোখের ব্যায়াম ১ঃ

কাজের ফাঁকে খানিকটা সময় চোখ বন্ধ করে রাখুন। একটি চেয়ারে আরাম করে বসুন। হাতে হাত ঘষে হাতের তালু কিছুটা গরম করে নিয়ে বন্ধ চোখের উপরে আলতো করে রাখুন। জোরে চাপ দেবেন না, নাক ঢেকে রাখবেন না। হাতের তালু এমনভাবে রাখবেন যাতে ভেতরে কোনো আলো প্রবেশ করতে না পারে। এখন, কল্পনা করুন কোনো বস্তু বা কোনো রং আপনি দেখতে পাচ্ছেন।

এবার ঐ বস্তু বা রঙের ওপর আপনার দৃষ্টি ফোকাসের চিন্তা করুন বা কোনো শুভ ঘটনা চিন্তা করুন এবং কল্পনা করুন। সাথে সাথে ধীরে ধীরে, গভীর নিশ্বাস নিন এবং ছাড়ুন। এখন অনুভব করবেন যে, সবকিছু অন্ধকার লাগছে। মিনিট দুয়েক এভাবে চালিয়ে যান। এর পর, হাত দুটো ধীরে ধীরে নামিয়ে চোখ আস্তে আস্তে খুলে ফেলুন। কয়েকবার রিপিট করুন।  দিনে বেশ কয়েকবার এভাবে করুন। এতে চোখের রক্ত সরবরাহ বাড়বে এবং চোখের পেশি সক্রিয় থাকবে।

ব্যায়াম-২

টেলিভিশন, মোবাইল ফোন বা কম্পিউটার হচ্ছে যেকোন সময় চোখের সামনে চলতে থাকার সামগ্রী। কাজেই এর ভেতরে থেকেও চোখের সুরক্ষার কথা মাথায় রাখা উচিত। যারা কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন বেশি মাত্রায় ব্যবহার করেন তাদের ক্ষেত্রে চোখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা যায়। তাদের জন্য ব্যায়াম হচ্ছে একটানা তাকিয়ে না থেকে ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা। কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন ব্যবহারের সময় সাধারণের তুলনায় ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলুন। এতে চোখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে রেহাই পাবেন।

যাঁরা কম্পিউটার ও মোবাইল ফোন বেশি ব্যবহার করেন, তাঁদের চোখের রেটিনা শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা দেখা দিতে পারে। তাঁদের ক্ষেত্রে এই “আই ব্লিংকিং” ব্যায়াম খুবই উপযোগী। এতে চোখ শুকিয়ে যাওয়ার সমস্যা কমে এবং চোখের রক্ত সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।

অন্তত আধাঘন্টা পর পর চোখ দুটোকে বিশ্রাম দিন। বন্ধ করে রাখুন চোখ। এই বিশ্রামের সময়সীমা কমপক্ষে আধা মিনিট হওয়া লাগবে। যদি সম্ভব হয় তবে এক/দুই মিনিট বন্ধ রাখুন চোখ। যেভাবে এক কাজটি করতে পারেন তা হল

  • প্রথমে কম্পিউটারের মনিটর এবং রুমের আলো নিভিয়ে দিন।
  • মাথার পিছনে কিছু ছোট বালিস দিন বা অফিসে থাকলে চেয়ারে শিরদাঁড়া সোজা করে বসুন।
  • চোখ বন্ধ রাখুন কিছুক্ষণ।
  • এ ভাবে চোখ বন্ধ রাখুন ৫ থেকে ১০ মিনিট।
  • এটি দিনে দুইবার করতে পারলে খুব ভাল হয়।

ব্যায়াম-৩ ম্যাসেজ

চোখের চারপাশে আঙুল দিয়ে ম্যাসাজ করলে কিন্তু অক্সিজেনের পরিবহন ভালো হয় এর ফলে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়ে চোখের ধকল দূর হয়। চোখের অশ্রুনালির কাছে হালকা চাপ দিয়ে ম্যাসাজ করলে চোখের আর্দ্রতা বাড়ে এবং চোখের প্রশান্তি দেয়। বন্ধ চোখের একদম উপরের অংশে, অর্থাৎ ভ্রূর কোল ঘেঁষে নিচে এবং চোখের নিচের অংশে আলতো হাতে ম্যাসাজ করুন। দুই বা চার আঙ্গুলের সাহায্যে ধীরে ধীরে এই প্রক্রিয়াটি অনুসরণ করুন এক মিনিট মতন সময় নিয়ে।

এ ছাড়া চোখের পাতার ওপর মৃদুভাবে দুই বা তিনটি আঙুল দিয়ে চক্রাকারে ম্যাসাজ করতে থাকুন। ১০ বার ঘড়ির কাঁটার দিকে ও ১০ বার বিপরীত দিকে এ ম্যাসাজ করুন। চোখের দুই পাতার মাঝখানে তিনবার ম্যাসাজ করতে পারেন  ঠিক চোখের পাতায় কখনো হাত দিয়ে বেশি চাপ দিতে যাবেন না, তাতে উল্টো ক্ষতিই হতে পারে চোখের। তাছাড়া সরাসরি চোখে হাত দিয়ে চোখ রগড়ানোর অভ্যাস থাকলে সেটা অবশ্যই ছাড়তে হবে।

তাছাড়া চোখের চারপাশের পেশীকে শক্ত করতেও এই ম্যাসাজের জুড়ি নেই। আপনার চোখের চারপাশে যদি ফাইন-লাইন, রিঙ্কল, বা আই ব্যাগ থাকে, তাহলে এই ম্যাসাজের ফলে সেটাও কমবে, আর আপনার চোখও সুন্দর হবে।

চোখের ব্যায়াম-৪

চেয়ারে বা বিছানায় সোজা হয়ে আরাম করে বসুন। এবার মাথা স্থির  রেখে  একবার বাঁদিকে কোনো বস্তুর ওপর পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন ও একবার ডানদিকে কোনো বস্তুর ওপর পাঁচ সেকেন্ড তাকিয়ে থাকুন । এবার চোখ স্বাভাবিক করে কয়েকবার পলক ফেলুন। একই প্রক্রিয়া ডান দিকে অনুসরণ করুন। এভাবে ১০ বার করুন।

ব্যায়াম-৫ঃ চোখ ঘোরানো

চোখের সামনে একটি বড় গোলাকৃতির বস্তু কল্পনা করে নিন। এবার এই আকৃতি অনুযায়ী ধীরে ধীরে চোখ ঘোরাতে থাকুন, ঘড়ির কাঁটার অভিমুখে এবং ঘড়ির কাঁটার বিপরীতে ৪ বার করে। এরপর চোখ বন্ধ করে রাখুন ২ সেকেন্ড। বড় করে শ্বাস নিন। দিনে ২ বার করে এই ব্যায়াম করুন। এটি চোখের পেশি ভাল রাখতে সহায়তা করে।

ব্যায়াম-৬ 

গরম পানিতে একটি তোয়ালে বা রুমাল ভিজিয়ে নিন  পাশাপাশি আর একটি তোয়ালে ঠাণ্ডা পানিতে ভিজিয়ে নিন। এবার গরম তোয়ালে আলতোভাবে সম্পূর্ণ মুখের ওপর চেপে চেপে লাগাতে থাকুন। তবে এ ক্ষেত্রে  চোখের পাতা, ভ্রু এবং  থুতনির ওপর বেশি গুরুত্ব দিবেন । এবার আপনার ঠান্ডা তোয়ালে দিয়ে একইভাবে চেপে চেপে লাগাতে থাকুন। এভাবে একবার গরম পানি লাগানো তোয়ালে আর  একবার ঠান্ডা পানি লাগানো তোয়ালে দিয়ে চার থেকে ছয় বার মুখের উপর লাগাতে পারেন।  তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন শেষ বারেরটা অবশ্যই যেন ঠান্ডা তোয়ালের চাপ হয়।

ব্যায়াম-৭ঃ ট্যারা হোন

কয়েক সেকেন্ড গভীরভাবে শ্বাস নিন। এবার চোখের সঙ্গে সমান্তরাল রেখে সামনের দিকে একটি হাত প্রসারিত করুন। এবার প্রসারিত হাতের বৃদ্ধা আঙুল দাঁড় আঙুলের ডগায় করিয়ে দৃষ্টি নিবদ্ধ করুন । এর পর দৃষ্টি সেখানেই রেখে আঙুল ধীরে ধীরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে আনুন যেন নাক স্পর্শ করে । এ সময় আঙ্গুল ঝাপসা হয়ে যাবে। মনে হবে আপনি ট্যারা।  হাতের অবস্থান নাকের কাছে রেখেই গভীরভাবে কয়েকবার নিঃশ্বাস নিন ও ধীরে ধীরে ছাড়ুন। এবার ধীরে ধীরে হাতের আঙ্গুল আগের মতো নির্দিষ্ট দূরত্বেই নিয়ে যান। তবে গোটা সময়ই বৃদ্ধা আঙুলের ডগার ওপরই দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে।  এ প্রক্রিয়াটি আপনি  ১০-১২ বার করতে পারেন।

ব্যায়াম-৮

চোখ বন্ধ রেখেই চোখ বৃত্তের মত কল্পনা করে ঘোরাতে থাকুন। আস্তে আস্তে ডান থেকে বামে বা বাম থেকে ডানে সবদিকে ঘুরাতে থাকুন। এরপর উপরে থেকে নিচে বা নিচ থেকে উপরে উঠানামা করুন। একইভাবে ভূমির সমান্তরালে একবার ডান থেকে বামে আর একবার বাম থেকে ডানে নিয়ে আসুন। কিছুক্ষণ চোখের এই ব্যয়ামটি চালিয়ে যান।

ব্যায়াম-৯ঃ ফিগার অফ এইট

এই ব্যায়ামটি করার জন্য মনে করুন যে আপনার থেকে ১০ ফুট দূরে শুন্যের মধ্যে ঝুলে আছে একটি বড় অসীম প্রতীক। যদি মনে হয় এটা সম্ভব নয় তবে  একটি বড় আর্ট পেপারে একটি অসীমতার রেখা এঁকে নিন। এরপর চার্টটি দেয়ালে  টানিয়ে দিনে। এবার  ১০ ফুট দূরে দাঁড়ান। এবার চোখ দুটো নাড়িয়ে অসীমতার রেখাগুলোকে অনুসরণ করুন। প্রথমে একদিকে যান পরে আবার বিপরীত দিকে আসুন। বেশ কয়েকবার এভাবে করতে থাকুন।

 ব্যায়াম-১০ চোখ স্থির রেখে মাথাটা ঘোরান

উপরের ব্যায়ামগুলোতে চোখের ঘুরিয়েছি বা চোখ নাড়িয়েছি। এবার আমরা চোখ স্থির রেখে মাথা ঘোরাবো।  সামনে কোনো একটি জিনিসের দিকে স্থিরভাবে তাকিয়ে ঘড়ির কাঁটার দিকে ১০ বার মাথাটা ঘোরান। একইভাবে ঘড়ির কাঁটার দিকে মাথা ঘোরান আরও ১০ বার।

ব্যায়াম-১১ঃ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকা

আনমনে হয়ত অনেকেই কাজটি করেন। তবে এবার চোখের আরামের কথা চিন্তা করে কাজটি করতে হবে। ঘরের বাতি নিভিয়ে দিন। চোখ বন্ধ করে দুই হাত কাপের মতো দুই চোখের উপর রাখুন। এবার শরীরটাকে শিথিল করে কয়েক মিনিট অন্ধকারের দিকে চেয়ে থাকুন।

ব্যায়াম-১২ঃ ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা

সাধারণত প্রতি ৩-৪ সেকেন্ড পরপর চোখের পাতা ফেলা চোখের নানা প্রকার ছোটোখাটো সমস্যা থেকে মুক্তি দেয়। বিশেষ করে যখন আমরা একটানা কম্পিউটার বা টিভির দিকে তাকিয়ে থাকি তখন খুব কমই চোখের পাতা ফেলা হয়। এ সময় খেয়াল করে ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা ফেলতে পারলে ভাল হয় । এছাড়াও টানা ১ মিনিট ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলা, একটি ব্যায়ামের মতো কাজ করে। এতে দৃষ্টিশক্তি ভাল থাকে।

শেষ কথা

চোখ আমাদের জন্য কতোটা গুরুত্বপূর্ণ  বলার অপেক্ষা রাখে না । কিন্তু আমরা অনেকেই এই অতিগুরুত্বপূর্ণ অংগের সঠিক যত্ন নিতে ভুলে যাই। দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখার জন্য শুধুমাত্র কিছু খাবার খেলেই চোখের স্বাস্থ্য ঠিক থাকে না। চোখের জন্য দরকার বাড়তি কিছু যত্ন।কেননা, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টিশক্তি ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। অতি সম্প্রতি গবেষণায় দেখা গেছে, শরীরচর্চার পাশাপাশি চোখের নিয়মিত যত্ন নিলে ‘ম্যাকুলার ডিজেনারেশন’ নামের চোখের মারাত্মক অসুখ প্রতিরোধে সহায়তা করে।

চোখের স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধ করার যত্ন নিতে হবে, আর নিয়মিত এই ব্যায়ামগুলো অনুসরণ করতে হবে। প্রতিদিন মাত্র ১০-১৫ মিনিটের ব্যায়ামে আপনার চোখের পেশি মজবুত হবে। দৃষ্টিশক্তি উন্নত হবে এবং পরবর্তী জীবনে অনেক চোখের রোগের ঝুঁকি কমে যাবে। চোখের  ক্লান্তিভাব ও মানসিক চাপ কমে যাবে। তাই অন্তত পছন্দ সই বেশ কিছু ব্যায়াম অনুশীলন করা উচিত।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক