চোখ ভালো ও পরিষ্কার রাখার উপায়

চলা-ফেরা করতে চোখের ভূমিকা অপরিসীম। মানুষের শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো চোখ। চোখ ছাড়া সবকিছু অন্ধকার। তাই সব ধরনের ঝুঁকি এবং বিপদ থেকে এই বিশেষ অঙ্গটিকে নিরাপদ রাখতে হবে।

প্রকৃতিগত কারণেই আমাদের চোখ সর্বদা সুরক্ষিত রয়েছে। অক্ষিগোলকের  বাইরে থেকে যে অংশটুকু দেখা যায় সে টুকুও চোখের পাতা দিয়ে ঢাকা থাকে। এছাড়া আইলেশ ও আইভ্রু চোখকে  ধুলা-বালি থেকে রক্ষা করে। চোখের পানি বা অশ্রু সাধারনত ধুলা-বালি ও রোগ জীবানু ধুয়ে চোখকে সুস্থ রাখে।

বর্তমান সময় কম্পিটার,ল্যাপটপ, ট্যাব বা মোবাইলে আমাদের অনেক সময় কাটাতে হয়।  দীর্ঘ সময় ধরে ল্যাপটপ বা কম্পিউটারের সামনে বসে থাকলে একপর্যায়ে চোখে চাপবোধ হয়। এ ছাড়াও নানা কারনে চোখে সমস্যা দেখা দিতে পারে।  এসবের বেশিরভাগই আমরা এড়িয়ে চলি বা পাত্তা দেই না ।  যেমন- চোখ থেকে পানি পড়া, চোখ লাল হয়ে যাওয়া, মাথা যন্ত্রণা, চোখ শুকিয়ে যাওয়া প্রভৃতি। এসব কিছু মোটেই এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। মারাত্মক কিছু রোগের পূর্ব লক্ষণ এগুলো। তাই চোখ ভালো রাখার কয়েকটি সহজ উপায় জেনে নিন-

খাবার

চোখ ও চোখের দৃষ্টি ভাল রাখতে নিয়মিত কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন, চর্বি, খনিজ লবন, পানি ও ভিটামিন জাতীয় খাবার প্রয়োজনীয় পরিমানে গ্রহন করতে হবে।

বিভিন্ন ভিটামিনের মধ্যে ভিটামিন এ চোখের জন্যে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।  ভিটামিন এ ছাড়াও ভিটামিন ই এবং ভিটামিন সি দৃষ্টিশক্তি  স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

শাকসবজী, ফলমূল, ছোট মলাঢেলা মাছ ইত্যাদি বেশী বেশী খেতে হবে। শিশুদের ৬ মাস বয়স থেকে বুকের দুধের পাশাপাশী শাকসবজী, ফলমূল আল্প অল্প করে খাওয়াতে হবে। চলুন তাহলে দেখে নেই কি ধরনের খাবার চোখের দৃষ্টি শক্তির জন্যে খুব ভাল ভূমিকা রাখে।

পালংশাক: পালং শাক চিনে না এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। এ শাকটি আমার খুব প্রিয়। এটি শুধু মুখরোচক সবজিই নয় তা ছাড়া এতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ‘লুটিন’ নামক পুষ্টি উপাদান, যা চোখে ছানি পড়ার ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করে। লুটেইন বা লুটিন যাই বলি না  কেন তা চোখে পিগমেন্ট তৈরি করে, যা ক্ষতিকর নীল রশ্মি থেকে চোখকে বাঁচায়। এই উপাদান বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চোখকে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যাওয়া থেকে বাঁচাবে। এতে আরও আছে বিটা ক্যারোটিন আর জিক্সান্থিন। এ দুটো উপাদানই চোখের স্বাস্থ্যের জন্যে খুব ভাল ভূমিকা রাখে।

গাজরঃ  গাজর চোখের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এতে উচ্চমানের বিটা ক্যারোটিন, ভিটামিন এ, মিনারেলস ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট আছে। গাজরের বিটা ক্যারোটিন নিজে নিজেই ভিটামিন-এ’তে রূপান্তরিত হয় । যা দৃষ্টিশক্তির উন্নতিতে ভূমিকা রাখে। বিটা-ক্যারোটিন আমাদের দেহের ভেতরে রাসায়নিক বিক্রিয়ার মাধ্যমে রেটিনল বা ভিটামিন-এ’তে রূপান্তরিত হয়, আর ভিটামিন-এ আমাদের দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিটাক্যারোটিন চোখের ভেতর দিয়ে আলোর প্রবাহকে শোষণ করে ও রাতে কম আলোয়ও দেখার শক্তি বাড়ায়।

কমলাঃ  চোখের জন্যে  ভিটামিন-এ এর  সঙ্গে ভিটামিন-সি এবং ভিটামিন-ই এর প্রয়োজনীয়তা আজ প্রমাণিত। এদের অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট বলা হয়। এসব ভিটামিন বয়সজনিত চোখের দৃষ্টিক্ষয় অনেকাংশে রোধ করে। কমলাতে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন সি।  গবেষণায় দেখা গেছে, ১০ বছর প্রতিদিন একটি করে কমলা খেলে অন্ধত্বের হার অন্যদের তুলনায় ৬৪ শতাংশ হ্রাস পায়। তাই প্রতিদিন অন্তত একটি করে কমলা খাবারের তালিকায় রাখুন।

ঝিনুক: যদিও আমাদের দেশে ঝিনুকের মাংস খাবার প্রচলন নেই তবে  ঝিনুকের মাংসে অন্য যে কোনো খাবারের  তুলনায় প্রচুর পরিমানে  জিংকের  পাওয়া যায়।   ‍যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের খাদ্য ও পুষ্টিবিদ ক্যারোলিন কফম্যান বলেন, “জিংক যকৃতে জমে থাকা ভিটামিন এ ব্যবহার করে রেটিনায় মেলানিন তৈরি করতে সাহায্য করে। মেলানিন আমাদের চোখের ওপর একটি রক্ষাকারী আবরণ তৈরি করে।”

টমেটোঃ টমেটো সকলের পরিচিত একটি সবজি যা এখন প্রায় সারা বছরই পাওয়া যায়। টমেটোতে রয়েছে ভিটামিন-এ, বি, সি, কে, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, লাইকোপিন, ক্রোমিয়ামসহ নানা উপাদান। টমেটো যেমন কাঁচা খাওয়া যায়, তেমনি রান্না করেও খাওয়া যায়। সালাদে টমেটো অতুলনীয়। চোখের যত্নে যা খাবেন টমেটো খেলে অনেক লাভ। এক গবেষণায় দেখা গেছে টমেটোতে থাকা লাইকোপিন চোখের রেটিনাকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। এটি সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে চোখকে সুরক্ষা দেয়।

গ্রিন টিঃ  গ্রিন টি আমাদের দেশে খুব একটা জনপ্রিয় না , তবে ইদানিং মানুষ গ্রিন টি বা সবুজ চা গ্রহনে আগ্রহী হইচ্ছেন। এই সবুজ চায়ের রয়েছে অসংখ্য উপকারিতা । এটি চোখের জন্যও উপকারী। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্য ও পুষ্টিবিদ এবং এবিসি নিউজের মেডিকল কন্ট্রিবিউটর ডেভিড ক্যাটজ বলেন, “সবুজ চা, ফ্ল্যাভানয়েড নামক উপাদানের সমৃদ্ধ উৎস। এতে আছে প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা রেটিনাকে সূর্যালোকের তেজস্ক্রিয়তা থেকে রক্ষা করে।”

এ ছাড়া টি ব্যাগ ব্যবহারের পরে  সেই টি ব্যাগ চোখের উপর দিয়ে রাখলে চোখ সতেজ রাখে । এ ছাড়া চোখের নিচের কালো দাগ দূর করে। তবে যাদের এলার্জি আছে তারা ব্যবহারে সতর্কতা অবল্বমন করবেন।

মিষ্টি আলুঃ মিষ্টি আলু আমার খুব প্রিয় একটা খাবার। মিষ্টি আলু পুষ্টিগুণে ভরপুর। এতে রয়েছে বিটা-ক্যারোটিন, ভিটামিন-সি, ই ও ডি। চোখের যত্নে মিষ্টি আলু খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি খাবার। এটি চোখের স্বাস্থ্য ভালো রাখে। দৃষ্টিশক্তি ধরে রাখতে এর তুলনা হয়না। আর মিষ্টি আলু শুধু চোখের যত্নেই কাজে লাগে না, হাড়ের ক্ষয়রোধেও সাহায্য করে। রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতেও মিষ্টি আলু বেশ উপকারী।

আখরোট-বাদামঃ আখরোটে আছে উদ্ভিজ্জ ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড, যা সামুদ্রিক খাবার থেকে ভিন্ন। এটি রক্ত প্রবাহ, লিপিডের মাত্রা ইত্যাদি ঠিক রাখতে সাহায্য করে, যা চোখ ও অপরাপর দেহযন্ত্রগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত বাদাম খেলে বার্ধক্যজনিত চোখের অসুখ অনেকটা কমে যায়।

ভুট্টাঃ ভুট্টায় আছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন এ, সি ও লাইকোপিন; যা দৃষ্টিশক্তি প্রখর করতে সাহায্য করে৷ আধ-কাপ রান্না ভুট্টায় একজন মানুষের চোখের জন্য প্রয়োজনীয় সব উপাদান পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে। তাই নিয়মিত ভুট্টা খেতে পারেন। আর নিয়মিত ভুট্টা খেলে চোখের হলুদ পিগমেন্ট হারানোর কোন ঝুঁকি থাকে না। এমনকি ছানি পড়ার ঝুঁকি অনেকাংশে কমে যায়।

কুমড়াঃ  বিশেষজ্ঞদের মতে ক্যারোটিনয়েডস লুটিন ও জিক্সান্থিন বার্ধক্যজনিত চোখের সমস্যা প্রতিরোধে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু পুষ্টি উপাদান। কুমড়া লুটিন ও জিক্সান্থিনের চমৎকার উৎস। এছাড়াও কুমড়ায় প্রচুর ভিটামিন এ আছে।

মাছঃ মাছে ভাতে বাঙ্গালী এই প্রচলনটা বন্ধ হবার পথে । আপনি আবার এটি শুরু করে দিতে পারেন। বিভিন্ন ধরনের মাছ চোখের জন্য বিশেষ উপকারী। স্যামনের মতো ওমেগা ৩ সমৃদ্ধ সামুদ্রিক মাছ চোখ ভাল রাখতে সাহায্য করে। মাছের তেলও চোখের জন্য বেশ কার্যকরী। এগুলো চোখের শুষ্কতা রোধ করতে সাহায্য করে। বিশেষজ্ঞরা একারণে সপ্তাহে অন্তত তিনদিন মাছ খাওয়ার পরামর্শ দেন।

ওমেগা থ্রি ফ্যাটি এসিড যা ফিশ অয়েল নামে পরিচিত, বিশেষভাবে পরিচিতি পাওয়ার কারণ হল এর অসামান্য স্বাস্থ্যগুণ। সামুদ্রিক মাছ থেকে প্রাপ্ত ওমেগা থ্রি চোখের কোষের কাঠামো স্থিতিশীল রাখে এবং কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগে সহায়তা করে।

ডিমঃ ডিম এমন একটি খাবার যা সবদিক থেকেই আমাদের দেহের জন্য উপকারী। এতে চোখের  যত্নের জন্যে জন্য প্রয়োজনীয় উপাদান ভিটামিন এ, লিউটিন, জিঙ্ক সহ প্রচুর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট থাকে যা অন্ধকারে দেখার জন্য চোখকে উপযুক্ত করে তোলে।

এছাড়া সব ধরনের তরতাজা ফলমূল , সবজি ,সবুজ শাক চোখের রক্ত সরবরাহ করতে সাহায্য করে। চোখের নানা ধরনের রোগ প্রতিরোধ করে।  সুষম ও স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে চোখ ভাল রাখা যায়। এ ধরনের খাবার খেলে চোখ খারাপ হওয়ার ঝুঁকিও কমে যায়।

সঠিক পরিমাণ আলোতে কাজ করুণ

আপনি যখন কোন কাজ করেন বা পড়ালেখা করেন তা যদি অপর্যাপ্ত আলোতে করেন তাহলে আপনার চোখের পরিশ্রম অনেক হয়। যার ফলে চোখের উপর চাপ পড়ে। অন্যদিকে অতিরিক্ত আলোতে কাজ করাও চোখের জন্য ক্ষতিকর। এর ফলে চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। আলোর এসব কমবেশির ফলে যে চাপের সৃষ্টি হয় এ চপ কমাতে সব সময় চেষ্টা করবেন পর্যাপ্ত আলোতে কাজ করতে।

দিনের বেলা সূর্যের আলো সরাসরি ব্যবহার করা উচিৎ নয়। রাতে টিউব লাইটের আলো চোখের জন্য আরাম দায়ক। টেবিলল্যাম্পের আলোতে লেখাপড়ার সময় ল্যাম্পটি দেয়ালের দিকে রেখে প্রতিফলিত আলোতে পড়া ভালো। লোডশেডিং এর সময় বা যে সব এলাকায় বিদ্যুত নেই সেখানে যে আলোকম্পমান নয় সে আলো ব্যবহার করা ভালো। ল্যাম্প, মোমবাতী কিংবা হারিকেনের মধ্যে হারিকেনের আলো সবচেয়ে ভালো।

ধুমপান ছাড়ুন

সিগারেটের প্যাকেটের গায়ে লেখা থাকে “সংবিধিবদ্ধ সর্তকীকরণঃ ধুমপান স্বাস্থ্যের জন্যে ক্ষতিকর।” শরীরের নানা জটিলতার সাথে অতিরিক্ত ধুমপান চোখেরও ক্ষতি করে থাকে। রেটিনা নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে। পাশাপাশি, এর ফলে ক্ষতি হয় চোখের স্নায়ুকোষগুলিরও।

ধুলো-ময়লা ও দূষিত পরিবেশ

প্রতিদিন কাজের শেষে চোখ ঠান্ডা ও পরিষ্কার পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে নিতে হবে। এছাড়াও দিনে ১০ থেকে ১৫ বার চোখে জলের ঝাপটা দিন। তাতে চোখ ঠাণ্ডা থাকে। চোখ আর্দ্র হয় ও রক্তসঞ্চালন বাড়ে। তবে বরফজল বা মাত্রাতিরিক্ত গরম জল দেবেন না।
সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মি চোখের  জন্যে ক্ষতিকর । প্রখর সূর্যালোক এবং এর সাথে থাকা আল্ট্রা ভায়লেট রশ্মি আপনার চোখের খুব ক্ষতি সাধন করতে পারে। এ রশ্মি চোখের টিস্যু ড্যামেজ করা সহ কর্নিয়ার অনেক ক্ষতি সাধন করে।তাই সূর্যালোক থেকে দূরে থাকা উত্তম। রোদে গেলে সানগ্লাস পরা উচিত।
যাঁদের এমনিতেই চশমা পরতে হয়, তারা ফটোক্রোমেটিক লেন্স ব্যবহার  করতে পারেন, এটি আপনার জন্যে আরাম দায়ক হবে। কনজাংটিভাইটিস, কর্নিয়াল আলসার, আইরাইটিসের রোগীদের জন্য এবং ছানি অপারেশনের পর কালো চশমা ব্যবহার করা জরুরি।
চোখ ভালো রাখতে প্রতিদিন ঘুমাতে যাওয়ার আগে ঠান্ডা ও পরিষ্কার পানি দিয়ে চোখ ভালোভাবে ধুয়ে ঘুমানো উত্তম। তবে খুব গরম বা খুব ঠান্ডা পানি ব্যবহার করবেন না।

পানি পান

“পানির অপর নামে জীবন” এ বাক্যটি আমাদের সকলেরই জানা আছে।  চিকিত্সকরা জানাচ্ছেন, চোখ ভালো রাখতে গেলে, সারাদিনে প্রচুর পরিমানে পানি খাওয়া প্রয়োজন। রোজ অন্তত ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি খেতে হবে। তার ফলে একদিকে যেমন চোখ পরিষ্কার এবং সুস্থ থাকবে, তেমনই ডিহাইড্রেশনেরও চিন্তা থাকবে না।

কম্পিউটার মনিটরের আলোর পরিমাণ স্বাভাবিক রাখা

বর্তমান প্রযুক্তির যুগ। কাজের প্রায় প্রত্যেকটা সেক্টরে কম্পিউটার ব্যবহার হচ্ছে। হয়ত আপনাকে কাজের তাগিতে ঘন্টার পর ঘণ্টা কম্পিউটারে কাজ করে যেতে হচ্ছে এর ফলে একটানা কম্পিউটারের মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকার ফলে দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব পড়ছে। চোখের প্রচুর চাপ পড়ে একই সাথে মাথা ব্যাথাও করতে পারে।  এ ক্ষতিকর প্রভাব এড়াতে  কম্পিউটারের মনিটরটির আলো সহনীয় পর্যায়ে রাখুন।

আপনি যদি আপনার কম্পিউটারের আলো বাড়াতে বা কমাতে বিরক্তি বোধ করেন তাহলে  অনলাইনে এ সম্পর্কিত বেশ কিছু সফটওয়ার আছে ।  f.lux নামের ফ্রি সফটওয়্যারটি এদের মধ্যে একটি। চাইলেই ডাউনলোড করে নিতে পারেন। এটি দিনের বেলা ও রাতের বেলা নিজে থেকে আপনার কম্পিউটার মনিটরের আলো সঠিক পরিমানে রাখবে। এর ফলে চোখের উপর প্রভাব টা কমবে এবং দীর্ঘক্ষণ কাজ করার ফলে চোখে যে জ্বালা পোড়া করে তাও কমে যাবে।

টিভি দেখা

অফিস থেকে ফিরে কিংবা অবসরে টিভি দেখা আমাদের একটি অতি সাধারন ঘটনা। এক সময় আমি ব্যক্তিগতভাবে অন্ধকারে টিভি দেখতে পছন্দ করতাম কিন্ত পুরুপুরি অন্ধকারে টিভি দেখা ঠিক নয়। দিনের বেলা যে দরজা বা জানালার আলো টিভি স্ক্রিনে প্রতিফলিত হয়, সেগুলো বন্ধ রাখাই ভালো। সাধারণত ১০ ফুট দূর থেকে টিভি দেখা উচিত। তবে ছয় ফুটের কম দূরত্ব থেকে টিভি দেখা উচিত নয়। বড়-ছোট বিভিন্ন সাইজের টিভি দেখার ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন দূরত্ব বজায় রাখতে হয়।

প্রতি ২০ মিনিট অন্তর কিছুক্ষণের জন্য কম্পিউটার, মোবাইল, টিভি স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে রাখুন। ঝিরঝির করা, কাঁপা কাঁপা ছবি ও ভৌতিক ছায়াযুক্ত ছবি না দেখাই ভালো। রঙিন টিভিতে রং, উজ্জ্বলতা ও কন্ট্রাস্ট ঠিক রেখে টিভি দেখতে হবে। টিভি দেখার সময় টিভির পেছনের দিকের দেয়ালে একটি টিউব লাইট বা শেড-যুক্ত ৪০ বা ৬০ ওয়াটের বাল্ব জ্বালিয়ে টিভি দেখা উচিত। একটানা অনেকক্ষণ টিভি দেখা উচিত নয়, মাঝে মধ্যে বিরতি দিয়ে চোখকে বিশ্রাম দিতে হবে।

চোখের ব্যায়াম করুন

শরীরের অন্যান্য অংগের মত চোখের জন্যও রয়েছে ব্যায়াম। আপনার চোখের পেশী সমূহের ব্যায়ামের মাধ্যমে আপনার চোখের আভ্যন্তরীণ রক্তসংবহন বৃদ্ধি পাবে ফলে চোখ ভাল থাকবে। চোখ ভালো রাখতে মাঝে মধ্যেই চোখের ব্যায়াম করুন।  আলাদা কিছু করতে হবে না, শুধু চেয়ারে মেরুদণ্ড সোজা কিন্তু শরীর শিথিল করে বসতে হবে। শরীরের কোন পেশীকে অহেতুক শক্ত করে রাখা যাবে না।

এবার প্রথমে দৃষ্টি সামনে সোজাসুজি রাখুন। ৫ সেকেন্ড পর মুখ সোজা রেখে ডান দিকে ঘোরাবেন চোখের মণি। ৫ সেকেন্ড এভাবেই থাকুন। এবার চোখের মণি ওপরে নিন। ৫ সেকেন্ড পরে চোখের মণি বাম দিকে নিন। একইভাবে ৫ সেকেন্ড পরে চোখের মণি নিচে নিন। নিচের দিকে ধরে রাখুন ৫ সেকেন্ডে। এতে কিন্তু আপনার চোখ একবার ঘুরে এলো।

এভাবে ৫ বার ক্রমান্বয়ে চোখের মণি ডানে, ওপরে, বামে, নিচে রেখে ব্যায়ামটি করুন। এরপর পুরো প্রক্রিয়া উল্টে দিন। তবে ব্যায়ামের ফলে আপনার দৃষ্টিশক্তির উন্নতি হবেনা এটা কেবল চোখকে ভাল ভাবে কাজ করতে সাহায্য করবে।

পর্যাপ্ত বিশ্রাম আর ঘুম

একটানা চোখ খুলে কাজ না করাই ভালো। কাজের মাঝে অল্প সময়ের জন্য হলেও চোখ বন্ধ করুন। চোখকে পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন। অন্তত আট ঘন্টা ঘুম মুখের ত্বক ও চোখের স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি।  তা না হলে চেহারায় ক্লান্ত ভাব ফুটে উঠবে। ঘুমের সময় চোখের পেশি শিথিল হয়। চোখও সতেজ থাকে। কম ঘুমে চোখের পেশিতে চাপ পড়ে। ফলে চোখ জ্বালা হতে পারে।

প্রসাধনীর ব্যবহার কমাতে হবে

প্রসাধনী চোখের জন্য ক্ষতিকর। অতিরিক্ত প্রসাধনী চোখে ব্যবহার করলে অ্যালার্জিক কনজাংটিভাইটিস, ব্লেফারাইটিস, স্টাই ইত্যাদি রোগ হওয়ার আশঙ্কা বেশি থাকে। অনেকের মাথায় খুশকি একটি সাধারন সমস্যা। খুশকি থেকে চোখ আক্রান্ত হয়ে ব্লেফারাইটিস দেখা দিতে পারে। এ কারুনে  মাথায় খুশকী থাকলে  সপ্তাহে ২ বার খুশকী নাশক শ্যাম্পু ব্যবহার করে মাথা খুশকী মুক্ত রাখতে হবে।

নিয়মিত চোখ পরীক্ষা

বছরে অন্তত দুইবার নিয়ম করে চোখ পরীক্ষা করানো জরুরি। এতে ছানি, গ্লুকোমা বা রেটিনার ম্যাকুলার ক্ষয়ের মতো মারাত্মক সমস্যা অল্পেই ধরা পড়ে।
 চোখে কিছু পড়লে
আমাদের পরিবেশ দূষিত থাকায় ধুলোকণা, কীটপতঙ্গ, ছোট ইটপাথর বা কাঠের টুকরা থেকে শুরু করে ছোট খেলার বল নানা কিছু আছে হঠাৎ চোখে পড়তে পারে। এসবের কারণে চোখে প্রথমে খচখচে, চোখ দিয়ে অবিরত পানি পড়ে, তাকালে চোখ জ্বালা করে এবং চোখ বন্ধ রাখলে আরাম হয়, চোখ লাল হয়ে যায়।
কোন কিছু পড়লে তাড়াতাড়ি বের না করা হলে চোখের কার্নিয়ায় ঘষা লেগে চোখের ক্ষতির কারন হতে পারে। যখন বাচ্চারা চোখ চুলকায় বা কচলায় তখন বুঝতে হবে  তাদের চোখের হয়ত কিছু পড়েছে। এ কাজ থেকে তাদের বিরত রাখতে হবে। কোন কিছু পড়লে দেখা গেলে সাধারনত কটন বাডস বা তুলো একটু পেঁচিয়ে অন্যের সাহায্য নিয়ে আলতো করে বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে বা পানির দিয়ে চোখ ধুয়ে ফেললে আশা করা যায় ময়লা বের হয়ে আসবে।

চোখ পরিষ্কার রাখা

আমাদের দেশের পরিবেশে এখন প্রচুর ধুলাবালি বিদ্যমান। বের হলেই সেই মাত্রাটা আরো বেড়ে যায়। ধুলা-বালি চোখের খুব ক্ষতি করে। দিনে অন্তত ৭-৮ বার চোখ পানি দিয়ে পরিষ্কার করুন।  ঠান্ডা পানির ঝাপটা দিয়ে চোখ ধুলে চোখে আরাম লাগবে ও চোখ পরিস্কার হবে। একই সাথে আপনাকে সজীব লাগবে।

শেষ কথা

চোখ আমাদের অমূল্য সম্পদ। আমাদের জীবনের জন্য চোখের গুরুত্ব তুলনাহীন। তাই চোখের যত্ন নিয়ে চোখ রাখার জন্য সবার সচেষ্ট হওয়া উচিৎ।  মনে রাখবেন আপনি কেবল আপনার দৃষ্টিশক্তি ঠিক রাখতে পারেন, তাই এখনই সাবধান না হলে পরে পস্তাতে হবে আপনাকেই।

মানুষের শরীরের অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হলো চোখ। চোখ ছাড়া সবকিছু অন্ধকার। তাই সব ধরনের ঝুঁকি এবং বিপদ থেকে এই বিশেষ অঙ্গটিকে নিরাপদ রাখতে হবে।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক