জন্ডিস কি? কিভাবে হয় এবং এর প্রতিকার

আমাদের কাছে জন্ডিস পরিচিত একটি শব্দ। আমরা সবাই কমবেশি সবাই জন্ডিস সম্বন্ধে জানি। জন্ডিস আসলে কোনো রোগ নয়, এটি রোগের লক্ষণ মাত্র। চোখের সাদা অংশ হলুদ হয়ে যাওয়াকে আমরা জন্ডিস বলে থাকি। জন্ডিসের মাত্রা বেশি হলে হাত, পা এমনকি পুরো শরীরও হলুদ হয়ে যেতে পারে। এর পাশাপাশি প্রশাবের রঙ হালকা থেকে গাঢ় হলুদ হতে পারে।  যথাসময়ে এর চিকিৎসা না করা হলে এর থেকে মৃত্যুও হতে পারে।

জন্ডিস কি?

জন্ডিস বলতে সাধারণত বুঝায় শরীরের ত্বক-চোখ-মিউকাস মেমব্রেনে হলুদাভ রঙ দেখা যাওয়াকে। অর্থাৎ রক্তস্রোতে অস্বাভাবিক উপায়ে বাইল পিগমেন্ট (Bile Pigment) , বিলিরুবিন (Bilirubin) ইত্যাদি বেড়ে যাওয়ার ফলে শরীরের ত্বক এবং চোখের সাদা অংশ (Sclera) হলদে বর্ণ ধারণ করলে তাকে জন্ডিস বলে ।

মানুষের রক্তে সাধারনত বিলিরুবিনের স্বভাবিক পরিমাণ < ১.০-১.৫ মিলিগ্রাম/ডেসিলিটার। বিলিরুবিনের মাত্রা দ্বিগুণ হলে বাইরে থেকে বোঝা যায়। সাধারণত কিছু ক্ষেত্রে প্রস্রাব   অনেকটা গাঢ় হলুদ হয়ে যায়। শরীরের চামড়া পাণ্ডুর বা ফ্যাকাশে দেখায় বলে একে অতীতে পাণ্ডুরোগ বলা হত। সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশে জন্ডিসের একটি অন্যতম প্রধান কারণ হল ভাইরাস ঘটিত হেপাটাইটিস।

জন্ডিসের প্রকারভেদ

জন্ডিসের মাত্রা অনুসারে ইহা সাধারণত ৩ প্রকার।

১. প্রি-হেপার্টিকঃ রক্তের লোহিত কনিকা কোন কারণে বেশি বেশি ভাঙলে। যেমন: ১. হিমোলাইটিক এনেমিয়া, ২. ম্যালেরিয়া, ৩. থ্যালাসেমিয়া।

২. হেপাটিকঃ লিভারের মধ্যে কোন সমস্যা থাকলে। অধিকাংশ জন্ডিস এ কারণেই হয়ে থাকে। যেমন: ভাইরাল হেপাটাইটিস (অ,ই,ঈ,উ,ঊ), অতিরিক্ত মদাপানের ফলে, লিভার ক্যান্সার হলে।

৩. পোস্ট হেপার্টিকঃ পিত্ত লিভারে তৈরি হবার পর লিভার থেকে বের হবার রাস্তায় কোন সমস্যা থাকলে। যেমন : পিত্তনালীয় রাস্তায় পাথর, পিত্তনালীর ক্যান্সার।

জন্ডিস কিভাবে হয় বা কেন হয় ?

রক্তের প্রধান উপাধান হল স্বেত কণিকা, লোহিত কণিকা, অনুচক্রিকা এবং প্লাজমা রস । লোহিত কণিকা প্রাথমিকভাবে লিভার ও স্প্লীন (Spleen) থেকে এবং পরবর্তীতে হাড়ের মজ্জা থেকে উৎপন্ন হয়ে বেঁচে থাকে প্রায় ৩ মাস বা ১২০ দিন । সুস্থ পুরুষের ক্ষেত্রে প্রতি কিউবিক মিলিলিটার রক্তে গড়ে ৫৫০০০০০ টি এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৪৫০০০০০ টি লোহিত কণিকা থাকে এবং প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৪০০০০০ টি লোহিত কণিকা উৎপন্ন হয় । রক্ত স্রোতের মধ্যে বয়স্ক, ভেঙে যাওয়া, অস্বাভাবিক বা মরে যাওয়া লোহিত কণিকা অপসারিত হয়ে স্প্লীন, লিভার ও হাড়ের মজ্জার ভিতর জমা হয় ।

বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই লোহিত কণিকার মূল উপাদান হিমোগ্লোবিন (Haemoglobin) ভেঙে আয়রন বহনকারী প্রোটিন হেমাটিন (Haematin) অস্বাভাবিক বা গঠনগত ত্রুটির কারণে বাইল নিঃসরণের পথ অবরুদ্ধ হয়ে যায় তখন ইউরোবিলিনোজেন রক্তস্রোতের সাথে মিশে প্রস্রাবের সাথে নির্গত হয় । তখন প্রস্রাব হলদে দেখায় । রক্তে স্বাভাবিক অল্প পরিমাণ বিলিরুবিন থাকে যার মাত্রা ০.২-০.৮ মিলিগ্রাম । কিন্তু যখন রক্তে অতিরিক্ত বিলিরুবিন জমা হয় তখন আমরা তাকে জন্ডিস বলে থাকি ।

আমাদের রক্তের লোহিত কণিকাগুলো স্বাভাবিক নিয়মেই একটা সময় ভেঙ্গে গিয়ে বিলিরুবিন তৈরি করে যা পরবর্তী সময়ে লিভারে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সাথে পিত্তনালীর সাহায্যে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। বিলিরুবিন লিভারে গিয়ে পিত্ততে পরিণত হয়। পিত্ত লিভার থেকে বের হয়ে যায় বলেই আমাদের জন্ডিসে আক্রান্ত হতে হয় না।

লিভার সেলের প্রদাহের কারণে বা লিভারের অন্য অস্বাভাবিকতার কারণে পিত্ত নির্গমনে বাধা প্রাপ্ত হয়ে রক্তে চলে আসে । অপরপক্ষে লিভারের বাইরে গলস্টোন বা টিউমারের কারণে হেপাটিক ডাক্ট বাধাপ্রাপ্ত হয়ে বিলিরুবিন রক্তে চলে আসে ।

কাজেই কোনো কারণে লোহিত কনিকা বেশি বেশি ভেঙে বিলিরুবিণ তৈরি হলে। বিলিরুবিন লিভারে পিত্ততে পরিণত না হতে পারলে অথবা পিত্ত লিভারে তৈরি হলো ঠিক কিন্তু বের হওয়ার রাস্তায় কোনো বাধা থাকলে জন্ডিস হয়ে থাকে।

বাচ্চাদের ক্ষেত্রে (Neonatal Jaundice) যেটা হয়, ব্যাপক পরিমাণ লোহিত কণিকা ভেঙে গিয়ে প্রচুর বিলিরুবিন তৈরী হয় এবং রক্তে বিলিরুবিনের পরিমাণ বেড়ে যায় এটা অন্যান্যদের ক্ষেত্রে তেমন দেখা যায় না ।

জন্ডিসের কারণকে তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। ‘হেপাটোসেলুলার’, ‘অবস্ট্রাকশন’ এবং ‘হেমোলাইটিক এনিমিয়া।

হেপাটোসেলুলারঃ আমাদের দেশের মানুষের জন্ডিস হওয়ার শতকরা ৭০ ভাগ কারণ হচ্ছে ভাইরাল হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস এ, বি, সি, ডি এবং ই ভাইরাসের সংক্রমণে যকৃতে প্রদাহ সৃষ্টি হওয়াকে বলা হয় ভাইরাল হেপাটাইটিস। হেপাটাইটিস বি ও হেপাটাইটিস সি’র সংক্রমণে যকৃতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

হেপাটাইটিস এ এবং হেপাটাইটিস ই ভাইরাস ছড়ায় দুষিত পানি ও খাবারের মাধ্যমে। আর হেপাটাইটিস বি, সি এবং ডি ছড়ায় এই ভাইরাসে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা রক্ত উপাদান গ্রহণের মাধ্যমে।

হেপাটাইটিসের ক্ষেত্রে দুইটি পর্যায় লক্ষ্য করা যায়ঃ

একিউট পর্যায়ঃ এই ক্ষেত্রে জন্ডিসের লক্ষন গুলো দেখা যায়। তখন দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজে নিজেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে এন্টিবডি তৈরী করতে থাকে এবং এই এন্টিবডি ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে থাকে। যতদিন প্রতিরোধ চলবে আপনি অসুস্থ থাকবেন। যখন দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জয়লাভ করবে, জন্ডিসের লক্ষন গুলো চলে যাবে বা রোগের নিরাময় ঘটবে। কিন্তু দেহে এন্টিবডি গুলো রয়ে যাবে, ফলে ভবিষ্যতে আর কখনো হেপাটাইটিস ভাইরাস আপনার শরীরে বাসা বাধবে না।

ক্রনিকঃ  শুধুমাত্র হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের প্রভাবে রোগটি এই পর্যায়ে যেতে পারে। এই ক্ষেত্রে জন্ডিসের লক্ষন দেখা যায়না (বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই). বছরের পর বছর রোগীর শরীরে ভাইরাস থেকে যায় এবং নীরবে লিভারের ক্ষতি করে যায়।

তাই জন্ডিস বলতে মূলত একিউট ভাইরাল হেপাটাইটিসকে বুঝায়। 

অবস্ট্রাকশনঃ  শরীরের লোহিত রক্ত কণিকাগুলো ভেঙে বিলিরুবিন তৈরি হয়। এই বিলিরুবিন যকৃতে প্রক্রিয়াজাত হয়ে পিত্তরসের সঙ্গে মিশে পিত্তনালীর মাধ্যমে পরিপাকতন্ত্রে প্রবেশ করে। সবশেষে পায়খানার সঙ্গে তা শরীর থেকে বের হয়ে যায়।

পিত্তনালী, পিত্তথলি, অগ্ন্যাশয়, গল ব্লাডারে পাথর বা টিউমারের কারণে বিলিরুবিনের এই সঞ্চালন প্রক্রিয়া ব্যাহত হলে রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রা বেড়ে যায়, ফলে জন্ডিস হয়

হেমোলাইটিক এনিমিয়াঃ রক্তকণিকা স্বাভাবিকের তুলনায় দ্রুত ভেঙে গেলে বা রক্তে হিমোগ্লোবিনের মাত্রা কমে যাওয়ার কারণে জন্ডিস হওয়াকে হেমোলাইটিক এনিমিয়া বলা হয়। এ ধরনের জন্ডিসের ক্ষেত্রে চোখের সাদা অংশ হলুদ হওয়ার পাশাপাশি চোখের পাতার ভেতরের অংশ সাদা হয়ে যেতে পারে।

এ ছাড়া অটোইমিউন লিভার ডিজিজ এবং বংশগত কারণসহ আরও কিছু অপেক্ষাকৃত বিরল ধরনের লিভার রোগেও জন্ডিস হতে পারে। ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ায়ও অনেক সময় জন্ডিস হয়। তা ছাড়া থ্যালাসিমিয়া ও হিমোগ্লোবিন ই-ডিজিজের মত যে সমস্ত রোগে রক্ত ভেঙ্গে যায় কিংবা পিত্তনালীর পাথর বা টিউমার এবং লিভার বা অন্য কোথাও ক্যান্সার হলেও জন্ডিস হতে পারে।

জন্ডিসের লক্ষণ

শরীরের বিভিন্ন অংশ যেমন চামড়া, চোখ, মুখগহবর হলূদ বর্ণ ধারণ করা, প্রস্রাবের রঙ হলুদ হওয়া, পায়খানা ফ্যাকাসে হওয়া, বমি বমি ভাব ও  পেটে ব্যথা, চুলকানি, যকৃত শক্ত হয়ে যাওয়া ইত্যাদি উপসর্গও দেখা যায়। এছাড়া শারীরিক দুর্বলতা, ক্ষুধামন্দা, জ্বর, বমি, পেটব্যথা ইত্যাদিও জন্ডিসের লক্ষন হিসেবে দেখা দিতে পারে। কারো কারো জ্বর হতে পারে। পেট ও পায়ে পানি আসতে পারে।

জন্ডিসের যত্ন , চিকিৎসা ও প্রতিকার

ওপরের উপসর্গগুলি দেখা দিলেই চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।চিকিৎসকরা প্রথমেই রক্ত ও প্রস্রাব পরীক্ষার পরামর্শ দেন।রক্তে বিলিরুবিনের মাত্রার অবস্থা কেমন সেটা জানা অত্যন্ত জরুরি।লিভারে যে এনজাইমগুলি আছে-এসজিওটি,এসজিপিটি,গামা জিটি আরও অ্যালকাইল থাকে যেগুলি বাড়তে থাকে এবং এর কারনে লিভার স্বাভাবিক কাজ করে না।শরীরের বর্জ্য স্বাভাবিক বেরতে পারে না।

জন্ডিস হলেই হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে এমন নয় বা আমাদের খুব চিন্তিত হতে হবে, সেটি নয়। আমরা যেটা জানি, জন্ডিস অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভাইরাল হেপাটাইটিস এ বা ই ভাইরাস, খাদ্য বা পানিবাহিত, সেটা এমনি এমনি ভালো হয়ে যেতে পারে। তবে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে, বিলিরুবিন যদি অতিরিক্ত বেড়ে যায় এবং পাশাপাশি রোগীর কিছু লক্ষণ প্রকাশ পায়, যেমন, ক্ষুধামান্দ্য বেশি হয়, বমি হয় তাহলে সে শকে চলে যেতে পারে। ইলেকট্রোলাইট ভারসাম্যহীন হতে পারে। এগুলোর কিছু লক্ষণ দেখা গলে ডাক্তারগন রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন।  তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বাড়িতে রেখে চিকিৎসা করা হয়।

জন্ডিস হলে অনেকে অ্যাসপিরিন বা ঘুমের ওষুধ খেয়ে থাকে এটা কখনই উচিত নয় । এছাড়া পরিপাকতন্ত্রে জমে থাকা জীবাণুগুলো যাতে কোন প্রকার প্রদাহ তৈরি করতে না পারে সেজন্য রোগীকে প্রতিদিন কমপক্ষে একবার হলেও পায়খানা করা নিশ্চিত করতে হবে। জন্ডিস কোনো রোগ না হলেও  একে মোটেও অবহেলা করা ঠিক নয়।

আগে জন্ডিস এর তেমন খুব একটা ভাল চিকিৎসা ব্যবস্থা  ছিল না। কিন্তু এখন হাতের কাছেই চিকিৎসা পাওয়া যায় এর চিকিৎসা। নিকটস্থ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স,জেলা সদর হাসপাতাল, মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বেসরকারী হাসপাতালে সহজে পাওয়া যায় এর চিকিৎসা।

সাধারনত, নিয়ম মেনে চললে ১৫-২০ দিন পর বিলিরুবিন কমে গিয়ে রোগী বেশ সুস্থ বোধ করতে শুরু করেন।অনেকেই আবার পূর্বের রুটিনে ফিরে যান। চিকিৎসক যতদিন না পরামর্শ দিচ্ছেন ততদিন নিয়ম মেনে চলতে হবে নাহলে পুনরায় জন্ডিস হতে পারে।তাই অন্তিম অবস্থা পর্যন্ত পূর্ণ বিশ্রাম ও নির্ধারিত খাদ্যগ্রহন একান্ত আবশ্যক।

এছাড়া বাড়ীতে বসে জন্ডিস রোগীর যত্ন নেওয়ার জন্য যে যে বিষয় খেয়াল রাখতে হবে সেগুলো হলো-

  • জন্ডিসে আক্রান্ত রোগীর প্রথম দরকার হোল পূর্ণ বিশ্রাম। এই রোগের সবচেয়ে বড় প্রতিকার হল বিশ্রাম।  তাই রোগীকে পর্যাপ্ত পরিমাণে বিশ্রাম দিতে হবে।
  • দ্বিতীয় প্রতিকার চিকিৎসক নির্ধারিত খাদ্যগ্রহন এবং ওষুধ সেবন
  • জন্ডিসের চিকিৎসা শুরু করার আগেই তা হওয়ার কারণসমূহ খুঁজে বের করতে হবে। তারপর কারণ অনুযায়ী চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে
  • জন্ডিস রোগীকে প্রচুর পরিমাণে পানি পান করাতে হবে। তাকে পর্যাপ্ত পরিমাণে তাজা ফল বা ফলের রস খেতে দিতে হবে।
  • রান্না সহ সকল কাজে বিশুদ্ধ পানি ব্যবহার করা জরুরী।
  • তৈলাক্ত, বেশি মশলাযুক্ত ও বেশি ফ্যাটওয়ালা খাবার বর্জন করুন।
  • যে খাবারগুলি হজম হতে সময় নেয় যথা-খাসীর মাংস,শাক পাতা এই খাবারগুলি এড়িয়ে চলুন।
  • সবসময় হাতের নখ কেটে ছোট করে রাখতে হবে।
  • সবসময় খাবার-দাবার ঢেকে রাখতে হবে।
  • অবশই স্বাস্থ্য সম্মত পায়খানা ব্যবহার করতে হবে।

জন্ডিসের চিকিৎসা সাধারণত রোগের ধরণ, মাত্রা, রুগীর বয়সের উপর নির্ভর করে।  তাই যেসব বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে সেগুলো হলো-

  • জন্ডিস হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী ঔষধ খেতে হবে। এছাড়া ডাক্তারের অন্যান্য সকল উপদেশ মেনে চলতে হবে।
  • শিশুদের ফিজিওলজিকাল জন্ডিস হলে তাদের জন্য লাইট থেরাপী চিকিৎসা দেয়ার প্রয়োজন পড়তে পারে।
  • নবজাতক শিশুদের ক্ষেত্রে বিলিরুবিনের মাত্রা মারাত্মক বা অধিক আকার ধারণ করলে রক্ত পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।

প্রতিরোধ হিসেবে আমরা নিচের উপদেশগুলো মেনে চলতে পারি

  • সব সময় বিশুদ্ধ খাদ্য ও পানি খেতে হবে।
  • শরীরে রক্ত নেওয়ার দরকার হলে অবশ্যই প্রয়োজনীয় স্ক্রিনিং করে নিতে হবে।
  • ডিসপোজিবল সিরিঞ্জ ব্যবহার করাটাও খুবই জরুরি। বিশেষ করে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা প্রত্যেকেরই নেওয়া উচিত।
  • যাঁরা সেলুনে শেভ করেন, তাঁদের খেয়াল রাখতে হবে যেন আগে ব্যবহার করা ব্লেড বা ক্ষুর পুনরায় ব্যবহার করা না হয়। নাক ফোটানোর ক্ষেত্রে  অন্যের ব্যবহৃত সুই ব্যবহার না করা।
  • জন্ডিস হলে টিকা নিয়ে কোনো লাভ হয় না। তাই সুস্থ থাকতে আগেই টিকা নিতে হবে।
  • হেপাটাইটিস বি-এর ক্ষেত্রে প্রথম মাসে একটি, দ্বিতীয় মাসে একটি বা ছয় মাসের মধ্যে একটি ডোজ দেওয়া হয়। হেপাটাইটিস এ-এর ক্ষেত্রে একটি ডোজই যথেষ্ট। আর দুই ক্ষেত্রেই পাঁচ বছর পর পর বুস্টার টিকা দেওয়া হয়।
  • নেশাদ্রব্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকুন।

কিছু ভ্রান্ত ধারণা

 চুনের পানি দিয়ে হাত ধোয়ানো হয় যাতে হাত থেকে হলুদ পানি বের হয়। বা নাভীমুলে কিছু পদ্ধতি অবলম্বন করানো হয় যার ফলে নাভী হতে হলুদ একধরণের পদার্থ বের হয়। অথবা এমন ওষুধ খাওয়ানো হয় যা খেলে বমি হয় এবং বমির সাথে হলুদ পদার্থের একটি চাক বের হয়ে আসে।

ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি যে , জন্ডিস মানে হলো শরীরে অতিরিক্ত বিলিরুবিন জমা। শরীর থেকে বিলিরুবিন বের হওয়ার রাস্তা হলো মল। ত্বক, নাভীমূল দিয়ে কখনো বিলিরুবিন বের হওয়া সম্ভব না। বিলিরুবিন পাকস্থলিতে কোন কঠিন পদার্থ হিসেবে জমাট বেধেও থাকে না যা চাক হিসেবে বের হয়ে আসবে। এগুলো হল ধোকা দিয়ে মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা ।

আবার এদিকে কেউ কেউ এক ধরনের মালা মাথায় পড়ায়। মালাটি আস্তে আস্তে  মালাটি আস্তে আস্তে গলায় নেমে আসে। এগুলো আসলে মানুষকে ধোকা দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। একটা নির্দিষ্ট সময় পরে আস্তে আস্তে আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার দ্বারা আপনা থেকেই নির্মুল হবার সম্ভবনাকে কাজে লাগিয়ে ভন্ড লোকজন সময় পার করে।

মাঝে মাঝে আপনা আপনি জন্ডিস ভাল হয়ে গেলে এরা দাবি করে তাদের মালায় বা চুন ধুয়া পানি দিয়ে ভাল হয়েছে। আসলে এসব কিছুই না। ঝরে বক মরে আর ফকিরের কেরামতি বাড়ে এগুলো এই টাইপের চিকিতসা।

আবার অনেকেই বলে থাকেন জন্ডিসের একমাত্র চিকিৎসা হল ভেষজ ওষুধ খাওয়ানো ! অনেক সময় দেখা যায়, কবিরাজী চিকিৎসা ও হারবাল জাতীয় ঔষধ খাওয়ার ফলে লিভারে আরো বিরূপ প্রভাব পড়ে। আসলে ভেষজ ওষুধে কি কি উপাদান আছে তা অনেক ক্ষেত্রেই পরীক্ষিত না। জন্ডিসে লিভার এতটাই নাজুক থাকে যে এতে থাকা কোন উপাদান লিভারের ক্ষতি করে ফেলতে পারে।

জন্ডিসে কেউ কেউ শুধুমাত্র পানীয় জাতীয় খাবার খেতে পরামর্শ দেন।  যেহেতু জন্ডিসে বমি হয়, এর ফলে শরীর থেকে পানি বের হয়ে যায়। ডিহাইড্রেশন বা পানিশুণ্যতা এড়ানোর জন্য পানীয় খেতে বলা হয়। তাছাড়া, পর্যাপ্ত পানি খেলে মুত্রের সাহায্যে রক্তের অতিরিক্ত বিলিরুবিন ও বেশী নিষ্কাশিত হয়ে যায়। এ সময় দুর্বলতা কাজ করে। তাছাড়া বমির ফলে অনেক খাবার ই পেট থেকে বের হয়ে যায়। ফলে আপনার এসময় আরো বেশী ক্যালরি গ্রহণ প্রয়োজন। সলিড খাবার না খেলে ক্যলরি কোথা থেকে আসবে, শুধু পানীয় দিয়ে হবে  ?

আরেকটি প্রচলিত বিশ্বাস হচ্ছে জন্ডিসের রোগীকে হলুদ দিয়ে রান্না করা তরকারি খেতে দিলে নাকি জন্ডিস বাড়তে পারে। কথা হলো, রক্তে বিলিরুবিন নামক একটি হলুদ পিগমেন্টের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ার কারণেই জন্ডিস দেখা দেয়। এর সঙ্গে খাবারের হলুদের কোনো ধরনের যোগাযোগ নেই।

শেষ কথা

জন্ডিস কোনো রোগ নয় বলে একে মোটেও অবহেলা করা উচিত নয়। জন্ডিসের চিকিৎসা নিয়ে অনেক ভুল ধারণা প্রচলিত আছে। কেউ ঝাড়ফুঁক করে জন্ডিস নামায়, রোগীকে অতিরিক্ত হলুদ দিয়ে রান্না করা খাবার খাওয়ান, কেউ আবার বিভিন্ন গাছের শেকড় খান। এগুলো সম্পুর্ণ ভুল ধারণা।

তাই অযথা ভ্রান্ত চিকিৎসার স্বরনাপণ্য না হয়ে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি । এছাড়া নিয়মিত পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন থাকা, জীবাণুমুক্ত খাবার ও পানীয় গ্রহণ করাই জন্ডিসের আক্রমণ থেকে বাঁচার  প্রধান উপায় । তাই রাস্তাঘাটে পানি, ফলের জুস, সরবত ইত্যাদি খাওয়ার ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে।

তথ্য সূত্রঃ প্রথম আলো, বাংলাদেশে প্রতিদিন, প্রতিদিনের সংবাদ, বিডিনিউস২৪, উইকিপিডিয়া, এনটিভি সহ নানা অনলাইন পোর্টাল।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক