জিরার উপকারিতাঃ অজানা অথচ দরকারী বেশ কিছু তথ্য

জিরা, ইংরেজিতে কিউমিন নামে পরিচিত। আমাদের দেশে ও অনান্য দেশে যা মসলা হিসেবেই রান্নার কাজে ব্যবহার হয়। তবে আপনি জেনে অবাক হবেন এই মসলার অসাধারন সব উপকারিতা আছে। যে জিরা আপনি রানাবান্নায় হয়ত ব্যবহার করেন, কিন্তু স্রেফ রান্নার জন্য ব্যবহার করার মধ্যেই জিরা র সবগুণ শেষ নয়!  আপনি হয়ত, জিরার ঔষধি গুণের কথা মনেই আনেন নি!  জিরা শুধু, মশলাই নয়, বহু ঔষধি গুণ সম্পন্ন!  তেতো স্বাদ এবং ঝাঁঝ সহ জিরা যে কোন খাবারের স্বাদ বাড়িয়ে দেয়। রান্নাকে উপাদেয় করার সাথে সাথে জিরা হল ভেষজ বা মেডিসিনাল গুণ সম্পন্ন অন্যতম একটা মশলা।

মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর জিরার ফার্মোকোলজিকাল প্রভাব আছে, কারণ এর মধ্যে অ্যান্টি-ডায়াবেটিক, অ্যান্টি-টিউমার এবং অ্যান্টি-এপিলেপ্টিক গুণ থাকে। এটা একই সাথে ইমিউনোলজিক,তাই ভেষজ গুণসম্পন্ন মশলার তালিকার এর স্থান সবার ওপরে।

জিরার স্বাস্থ্য সংক্রান্ত গুণ পাওয়ার সবথেকে সহজ উপায় হল জিরা  পানি পান করা । সারারাত অর্ধেক মুঠো জিরা পানিতে ভিজিয়ে রেখে দিন সকালে সেই পানি পান করে ফেলুন।

শুধু খাবারের স্বাদ বাড়াতে নয়, শরীরের সক্ষমতা বাড়াতেও জিরার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। সে কারণেই  আয়ুর্বেদিক বিশেষজ্ঞরা প্রতিদিনের ডায়েটে কোনও না কোনও ভাবে জিরাকে অনর্ভুক্ত করার পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এখন প্রশ্ন হল, হঠাৎ করে জিরাকে এতটা গুরুত্ব দেওয়ার কারণ কী? একাধিক গবেষণার পর জানা গেছে হজম ক্ষমতার উন্নতির পাশাপাশি নানাবিধ পেটের রোগ সারাতে এই প্রকৃতিক উপাদানটি যেমন বিশেষ ভূমিকা নেয়, তেমনি অ্যাস্থমার প্রকোপ কমাতে এবং ত্বক ও চুলের সৌন্দর্য বৃদ্ধিতেও কাজে আসে। এখানেই শেষ নয়। জিরার আরও অনেক উপকারিতা আছে, যে সম্পর্কে বাকি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করা হল।

জিরার উপকারিতাসমূহ

 হজমে সহায়ক: 

হজম ক্ষমতার উন্নতিতে জিরার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। জিরায় আছে থাইমল। আসলে এতে উপস্থিত থাইমল এক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে।  থাইমল খাবার হজমে সহায়তা করে।

তাই তো যারা হজমের রোগে ভুগছেন, তারা দিনে কম করে ৩ বার জিরা দিয়ে বানানো চা বা পানি পান করুন। কয়েকদিন জিরা পানি বা জিরার চা পান করলে দেখবেন উপকার মিলতে শুরু করবে। কীভাবে বানাতে হবে জিরা চা? খুব সহজ। প্রথমে ১ কাপ পানি ১ চামচ জিরা মিশিয়ে পানি ফুটিয়ে নিন। যখন পানি ফুটে গেছে তখন আঁচটা বন্ধ করে পানি ছেঁকে নিয়ে পান করুন।

এক গ্লাস পানিতে এক চা চামচ জিরা জ্বাল দিতে হবে। তারপর এর রং বাদামী হয়ে আসলে নামিয়ে ফেলতে হবে। ঠান্ডা হয়ে এলে এটি পান করতে হবে। এটি দিনে ৩-৪ বার পান করতে হবে। এ মিশ্রণটি পেট ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে এবং হজমশক্তি বৃদ্ধি করবে।

নিয়মিত জিরা পানি পান করলে অ্যাসিডিটির সমস্যা থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। এছাড়াও গর্ভকালীন হজম এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা দূর করতে জুরি নেই জিরা পানির।

শরীরকে হাইড্রেট করে

জিরার অনেক স্বাস্থ্য উপকারিতার মাঝে একটি হচ্ছে গরম কালে এটি দেহকে আর্দ্র রাখতে সাহায্য করে। এটিতে স্বাস্থ্যসম্মত মশলা জিরা থাকার কারনে এটি প্রাকৃতিক ভাবে দেহের তাপমাত্রা কমায়। আমাদের প্রতিদিনকার কর্মব্যস্ততার মাঝে  আমরা অনেক সময়ে প্রয়োজনীয় পরিমাণ পানি খেতে ভুলে যাই এবং তৃষ্ণা পেলে পানি খাই।  পানি কম খাবার ফলে শরীর ডিহাইড্রেটেড হয়ে যায়। সকাল বেলা এক-গ্লাস জিরা পানি পান করলে সেটি শরীরের পানির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবার পাশাপাশি শরীরকে রিহাইড্রেট করে।

অনিদ্রা দূর করতে

আপনি কি অনিদ্রা সমস্যা রয়েছে ? তবে জিরা হতে পারে এর একটি সুন্দর সমাধান। জিরা গুঁড়ো এবং একটি কলা মিশিয়ে নিন। এটি নিয়মিত রাতে খান। এটি ভাল ঘুমাতে সাহায্য করবে।

যাদের রাতের বেলা ভাল করে ঘুম আসে না, তারা প্রতিদিন ঘুমনোর আগে ১ চামচ চটকানো কলার সঙ্গে হাফ চামচ জিরা পাউডার মিশিয়ে খেতে পারেন। এই ঘরোয়া ওষুধটি খেলে ঘুমের আর তেমন কোনও সমস্যা হবে না । কারণ জিরা এবং কলা এক সাথে  খেলে মস্তিষ্কে মেলাটোনিন নামে এক ধরনের রাসায়নিকের ক্ষরণ বেড়ে যায়। এই কেমিকালটি ঘুম আসার ক্ষেত্রে দারুনভাবে সাহায্য করে।

ঠান্ডা-জ্বরের প্রকোপ কমিয়ে রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে

জিরাতে রয়েছে অ্যান্টি-ব্য়াকটেরিয়াল এবং অ্যান্টি- ইনফ্লেমেটরি প্রপাটিজ যা ঠান্ডা লাগা এবং জ্বরের প্রকোপ কমাতে বিশেষভাবে ভূমিকা পালন করে  বলে জানা যায় । এই প্রকৃতিক উপাদানটি শরীরের প্রবেশ করা মাত্র দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে বাড়িয়ে দেয় ।

আয়রন এবং ডায়েটারি ফাইবারের উৎস জিরা। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ঠিক রাখার জন্য নিয়মিত জিরা পানি পান করলে অনেক অসুখ থেকেই দূরে থাকা সম্ভব। এর ফলে ভাইরাল ফিবার এবং ওই সংক্রান্ত নানাবিধ কষ্ট কমে যায়। জ্বরের প্রকোপ কমাতে ১ চামচ জিরা এবং অল্প পরিমাণ আদা, ১ গ্লাস পানিতে মিশিয়ে নিন  তারপর পানি ফুটিয়ে নিয়ে ছেঁকে নিন। এই ছেঁকে নেওয়া পানি দিনে ২-৩বার পান করুন। তাহলেই দেখবেন জ্বর বা ঠান্ডা জণিত কষ্ট কমে যাবে।

বদহজম রোধে জিরা

দিনের শুরুতে এক-গ্লাস জিরা জল পানি খেয়ে নিলে সেটি পরিপাকতন্ত্রের জন্য ভালো কারণ এটা ডায়রিয়া, সকালবেলার শরীর খারাপ, গা গোলানো এবং ডিসপেপসিয়ার মতন বিভিন্ন সমস্যার প্রতিকার করে। এ পানি এনজাইমের সংশ্লেষণে সাহায্য করে, কারণ এই এনজাইম ফ্যাট, কার্বোহাইড্রেট ও গ্লুকোজকে ভাঙে।

রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়ায়

জিরাতে রয়েছে প্রচুর পরিমানে আয়রন। আয়রন শক্তির মাত্রা বজায় রাখতে সাহায্য করে, শরীরে রক্ত প্রবাহ বৃদ্ধি মাধ্যমে সেলুলার স্তরে অক্সিজেনের পরিমান বৃদ্ধি করে।

কোষ্ঠকাঠিন্য রোধে

আপনি কি কনস্টিপেশন বা কোষ্ঠকাঠিন্য সমস্যায় ভুগছেন? তাহলে আজ থেকেই জিরার সাথে বন্ধুত্ব করে ফেলুন, দেখবেন আরাম পাবেন । কারণ এতে রয়েছে প্রচুর মাত্রায় ফাইবার, যা বেশ কিছু এনজাইমের ক্ষরণ বাড়িয়ে দিয়ে কোষ্টকাঠিন্যের মতো রোগ সারাতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। শুধু তাই নয়, পাইলসের কষ্ট কমাতেও জিরা দারুনভাবে সাহায্য করে।

যাদের কোষ্ঠকাঠিন্য আছে তারা দিনে দুইবার এই জিরা পানি পান করতে পারেন।  অথবা ১ চামচ জিরা ভেজে নিয়ে গুঁড়ো করে নিন। তারপর সেই পাউডার ১ গ্লাস পানিতে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেতে শুরু করুন। দেখবেন উপকার  পাবেন। এক্ষেত্রে, জিরা পাউডার এবং জলের সঙ্গে অল্প করে মধু মিশিয়েও খাওয়া যেতে পারে । এমনটা করলে বেশি উপকার পাবেন বলে আশা করা ।

শরীর থেকে টক্সিক উপাদান দূর করতে

শরীরের থেকে টক্সিক উপাদান পরিষ্কার করতে এই জিরা পানির জুড়ি মেলা ভার। সারা রাত পানি ভিজিয়ে রাখুন জিরা। সকালে খালি পেটে খান। এতে সারা দিন শরীর ঝরঝরে থাকে।

রক্তস্বল্পতা দূরীকরণ

জিরাতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে আয়রন  যা রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে। শরীরের জন্য জরুরী অন্যতম মিনারেল আয়রন রক্তে হিমোগ্লোবিন তৈরি করে যা অক্সিজেন পরিবহন করতে সহায়তা করে। নিয়মিত জিরা পানি পান রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে।

লিভার ভাল রাখে

জিরা পানি শরীর থেকে বিষাক্ত উপাদান বের করতে করতে সহায়তা করে। তাই লিভার ভাল রাখতে এবং ফ্যাটি লিভারের সমস্যায় জিরা পানি খুবই উপকারী।

ডায়াবেটিস বা রক্তে শর্করা রোধে

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগীদের বেশি করে জিরা খাওয়া দরকার। মসলাটি শুধু তাদের ডায়েটকে নিয়ন্ত্রণে রাখে না; একইসাথে রক্তে চিনির পরিমাণও কমিয়ে দেয়। জিরা পানির মধ্যে ব্লাড সুগার নিয়ন্ত্রণ করবার গুণ আছে। জিরা পানি শরীরে রক্তের উপাদানের পরিমাণ বজায় রাখার পাশাপাশি রক্তের মধ্যে শর্করারা মাত্রা কমাতে সাহায্য করে।

গর্ভবতী মেয়েদের শরীর সুরক্ষায়

গর্ভাবতী মহিলাদের শরীর ঠিক রাখতে জিরার কোনও বিকল্প হয় না বললেই চলে। এই সময়  সন্তান সম্ভাব্য মায়েদের কনস্টিপেশন এবং হজমের সমস্যা হয়ে থাকে। আর যেমনটা আগেও বলা হয়েছে যে, জিরা এই দু ধরনের সমস্যা কমাতে দারুন উপকারে লাগে। সেই সঙ্গে মাথা ঘোরা এবং গর্ভাবস্থা সম্পর্কিত আরও সব লক্ষণ কমাতেও বিশেষ ভূমিকা নেয়।

জিরাতে থাকা আয়রন গর্ভবতী ও স্তন্যদাত্রী মায়েদের জন্য খুবই ভালো। এটা গর্ভস্থ ভ্রুণের, বাচ্চার এবং মায়ের আয়রনের চাহিদা মেটাতে সাহায্য করে।  এ সব কারণেই তো ভাবি মায়েদের প্রতিদিন ১ গ্রাস গরম দুধে হাফ চামচ জিরা এবং ১ চামচ মধু মিশিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন বিশেষজ্ঞরা।

 রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে জিরা

জিরা পানিতে রয়েছে প্রচুর পরিমাণে পটাশিয়াম। রক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং অতিরিক্ত লবণের ক্ষতিকর প্রভাব কাটাতে পর্যাপ্ত পরিমাণে পটাশিয়াম প্রয়োজন। তাই নিয়মিত জিরা পানি খাওয়ার অভ্যাস করলে জিরা পানিতে থাকা পটাশিয়াম রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে থাকে।

গ্যাসের সমস্যা সমাধানে

আমাদের অনেকেরই পেটে গ্যাস হওয়া একটি সাধারণ সমস্যা।  পেটের গ্যাস কমাতে জিরা পানি সাহায্য করে। যদি গ্যাসের কারণে পেট ফুলে থাকে তাহলে ধীরে ধীরে জিরা পানি খেতে পারেন।

জিরা খাবার হজম প্রক্রিয়ায় কার্যকর ভূমিকা রাখে। খাবার সঠিক ভাবে হজম না হলে পেটে গ্যাসের প্রবণতা বাড়ে। জিরা পাকস্থলীতে গ্যাস জমতে বাধা দেয়। খাবার দ্রুত হজম প্রক্রিয়ায় সাহায্যের মাধ্যমে এটি কাজ করে।

অ্যাসিডিটির সমস্যার জন্য ভালো জিরা পানি খুবই উপকারি। যেকোনো ভারী খাবার খাওয়ার পর ধীরে ধীরে জিরাপানি খেলে অ্যাসিডিটির হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়

গলা ব্যথা দূর করতে

গলা ব্যথা কমাতে জিরা পানি সাহায্য করে থাকে। কিছু পরিমাণে জিরা পানিতে ফুটিয়ে নিন। এবার এটি দিয়ে কিছু সময় কুলিকুচি করুন। এটি আপনার গলা ব্যথা কমাতে সাহায্য করবে।

বমি বমিভাব দূর করতে

জিরাপানি বমি বমি ভাব দূর করতে সাহায্য করে তাই গর্ভবতী নারীরা এটি পান করতে পারেন ‘মর্নিং সিকনেস’ থেকে মুক্তি পেতে।

ক্যান্সার প্রতিরোধে

গবেষণায় পাওয়া গেছে জিরাতে আছে শক্তিশালী ক্যান্সার বিরোধী বৈশিষ্ট্য। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে এটা পেট ও লিভার ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষামূলক প্রভাব রাখতে পারে। জিরাতে বিদ্যমান এন্টি-ফ্রির্যা ডিকেলস উপাদান ক্যান্সারের বিস্তার রোধ করে। জিরার অ্যান্টি-কারসিনোজেনিক উপাদান ক্যান্সারের কোষ প্রতিরোধে সহায়তা করে। এবং প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যান্সারের কোষ বাড়তে বাঁধা প্রদান করে।

বেস্ট ক্যান্সার, লিভার ক্যান্সার, পাকস্থলি ক্যান্সার প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে জিরা পানি। Cancer Research Laboratory of Hilton Head Island, South Carolina, USA এর মতে জিরার উপাদানসমূহ ক্যান্সার প্রতিরোধ করে থাকে। প্রতিদিনের রান্নায় কিছু পরিমাণের জিরা মিশিয়ে নিন।

পেট পরিষ্কার করতে

অল্প পরিমাণের  জিরা ভেজে গুঁড়ো করে নিবে হবে। এরপর ১ গ্লাস পানি, ১ চামচ মধু ও গুঁড়া জিরা এক সাঙ্গে মিশিয়ে প্রতিদিন সকালে খালি পেটে খেতে হবে।

মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী

গবেষণা অনুযায়ী, জিরা মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য সহায়ক। এটা আমাদের অত্যাবশ্যকীয় ফাইবারকে আরও ধারালো করে তুলে আমাদের বুদ্ধিমান ও চালাক-চতুর বানায় বলে জানা যায়।

ওজন হ্রাস করতে

ভাবছেন শরীরের ওজন বেড়ে গেছে কমানো দরকার ? কিন্তু ওজন কমাতে গেলে তো প্রচুর ব্যায়াম বা কঠিন ডাইট করতে হবে তাই না ? আরেহ এটি বেশ কষ্টসাধ্য ব্যাপার ! আর এ কারণে ওজন বাড়তেই আছে প্রতিনিয়ত। এভাবে ওজন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেখা দেয় নানা শারীরিক সমস্যা। তবে এখন শারীরের ওজন নিয়ে দুশ্চিন্তা মাথা থেকে ঝেরে ফেলুতে পারেন ।

জিরা মেটাবলিজম বৃদ্ধি করে খাবারের রুচি হ্রাস করে থাকে। শুধু তাই নয় এটি রক্তে বিষাক্ত পদার্থ দূর করে থাকে। নিয়মিত জিরা পানি পানে ওজন কমাতে সাহায্য করে থাকে।

প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় জিরা রাখলে পুরো শরীর থেকে মেদ কমিয়ে ফেলা সম্ভব।

বোল্ডস্কাই ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্যনুযায়ী, ৮৮জন নারীর উপর করা একটি রিসার্চে প্রমাণিত হয়েছে যে, জিরা মেদ কমানোর জন্য খুবই কার্যকর। জিরা শরীরের মেটাবলিজম র‍্যাট বাড়িয়ে দ্রুত ক্যালোরি বার্ন করে সাহায্য করে।

জনপ্রিয় ইংরেজি ওয়েবসাইট বোল্ডস্কাই এ ওজন কমাতে জিরার বিভিন্ন ব্যবহার সম্পর্কে বলা হয়। জিরা মাত্র ১৫ দিনে পেটের মেদ কমাতে খুবই কার্যকর পদ্ধতি। খাওয়া বা পানীয় হিসেবে প্রতিদিন জিরার গুঁড়া খেলে দেখতে পাবেন এর যাদুকরী ফলাফল।

মেদ কমাতে জিরা

মেদ কমাতে জিরা

জেনে নিন ওজন কমাতে কীভাবে জিরা ব্যবহার করবেন।

পদ্ধতি ১ঃ ওজন কমাতে জিরা পানীয় 

২ টেবিল চামচ আস্ত জিরা এক গ্লাস পানিতে সারারাত পানিতে ভিজিয়ে রাখুন। সকালে ওই পানি ফুটিয়ে নিন। পানি ছেঁকে জিরা সরিয়ে নিন ও অর্ধেক লেবুর রস মেশান। দ্রুত মেদ কমানোর জন্য এই পানি প্রতিদিন সকালে পান করুন একটানা দুই সপ্তাহ।

পদ্ধতি ২ঃ ওজন কমাতে টকদই ও জিরার গুঁড়া 

এক চা চামচ জিরার গুঁড়া ৫ গ্রাম টকদইয়ের সাথে মিশিয়ে নিন। প্রতিদিন এই জিরা টকদইয়ের মিশ্রণ খান। ওজন কমাতে জিরা দিয়ে তৈরি করুন বিভিন্ন খাবারে মেন্যু।

এক গ্লাস পানিতে তিন গ্রাম জিরা পাউডারের সাথে কয়েক ফোঁটা মধু মিশিয়ে পান করুন। ভেজিটেবল সুপ্যের সাথে এক চা চামচ জিরা মিশিয়ে খেতে পারেন।

ভাত রান্না হয়ে আসার একটু আগে এর সাথে জিরা মিশিয়ে নিন। জিরা শুধু ভাতের সুগন্ধই বাড়াবে না বরং ওজন কমাতেও সাহায্য করবে।

পদ্ধতি ৩ঃ লেবু, আদা ও জিরার মিশ্রণ

ওজন কমাতে এটা সবচেয়ে কার্যকর। এই ওজন কমানোর খাবার বানাতে প্রথমে আদা গ্রেট(কুচিয়ে)নিন। একইভাবে সেদ্ধ গাজর ও কুচিয়ে নিন। আপনি চাইলে আরো দু এক পদের সেদ্ধ সবজি দিতে পারেন। এবার এসব উপকরণ একসাথে মিশিয়ে এর মধ্যে অল্প জিরার গুঁড়া, সামান্য লেবুর রস কুচানো আদা ভালোভাবে মিশিয়ে নিন। রাতের খাবারে অন্যকিছু বাদ দিয়ে এই সালাদ খান। দেখবেন মেদ দ্রুত কমে যাবে।

জিরার এন্টিঅক্সিডেন্ট মানব দেহের মেটাবলিজমের হার বাড়ায়। এটি আমাদের দেহের ক্যালরি বার্ন করতে সাহায্য করে। পুরুষদের পেটের মেদ কমাতে জিরা খুবই কার্যকর।

হার্ট এ্যাটাক থেকে রক্ষা করে জিরা 

জিরা শরীরে খারাপ চর্বি ও কলস্টোরল তৈরিতে বাধা দেয়। এভাবে জিরা শরীরের মেদ কমায় ও হার্ট এট্যাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমায়।

ত্বকের সুরক্ষা

লাল লাল ফুসকুড়ি, ব্রণ ইত্যাদি শরীর থেকে দূষিত পদার্থ বের করে দেওয়ার জন্য হয়। বিপাক ক্রিয়ার মাধ্যমে শরীর থেকে দূষিত পদার্থগুলো বের হয়ে গেলে ত্বকের উপর এর প্রভাব কমে আসে। জিরা পাচনতন্ত্রের যত্ন নেওয়ার মাধ্যমে ত্বকের সুরক্ষাও দিয়ে থাকে।

দূষণরোধ

জিরা শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি করে। কিডনি ও লিভারের কার্যকারিতা বাড়িয়ে দিয়ে বিপাক ক্রিয়ার উন্নতি ঘটায়। এতে শরীর থেকে দূষিত পদার্থগুলো বের হয়ে যায়। এ কারনে বিভিন্ন রোগের সংক্রমণ থেকে শরীর সুরক্ষা পায় ।

এছাড়া কিডনি সমস্যাসহ খুশকি দূর করা, শ্বাস-প্রশ্বাসজনিত নানা সমস্যা, হজমশক্তি বাড়ানো ও বিপাকীয় কার্যকলাপে ভূমিকা রাখে জিরা। তাই সুস্থ থাকতে প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় জিরা খাওয়ার বিকল্প নেই।

জিরা শুধুমাত্র শারীরিক উপকারিতা সম্পন্ন না জিরায় সৌন্দর্য্য চর্চার গুণও বিদ্যমান। 

ত্বকের সৌন্দর্যে

তারুণ্য ধরে রাখতে জিরা পানির জুড়ি নেই। জিরা পানি শরীর থেকে টক্সিন বের করে দিতে পারে। এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে ডায়াটারি ফাইবার থাকে ত্বকের ময়লা বা নোংরা সরিয়ে ত্বককে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখে এবং সতেজ-চকচকে ও উজ্জ্বল করে তোলে। জিরা জলের মধ্যে প্রয়োজনীয় ক্যালসিয়াম, সেলেনিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ ও কপার থাকে যা ত্বককে নরম, নমনীয় ও মসৃণ রাখে ফলে স্বাভাবিক ভাবেই মুখের ত্বক সুস্থ-সতেজ ও চকচকে হয়।

পরিমাণ মতো মধুর সঙ্গে জিরা মিশিয়ে একটা ফেস প্যাক বানিয়ে নিন। তারপর সেটি নিয়মিত মুখে লাগাতে থাকুন। এমনটা করলে দেখবেন অল্প দিনেই ত্বকের হারিয়ে যাওয়া ঔজ্জ্বল্য ফিরে আসবে। সেই সঙ্গে ত্বক আরও বেশি করে সুন্দর হয়ে উঠবে।

এখন কথা হল, ফেস প্যাকটি বানাবেন কীভাবে?

চলুন দেখি নেই কিভাবে এই ফেস প্যাকটি বানাতে পারেন গরুয়ায় পদ্ধতিতেই।  এ জন্যে হাফ চামচ হলুদ গুঁড়োর সঙ্গে হাফ চামচ জিরা পাউডার এবং ১ চামচ মধু মিশিয়ে নিন। তারপর ভাল করে সবকটি উপাদান মেখে নিয়ে মুখে লাগান। ফেস প্যাকটি ১০ মিনিট রেখে দেওয়ার পর গরম পানি দিয়ে ধুয়ে ফেলুন। প্রসঙ্গত, সপ্তাহে ২-৩ বার এইভাবে ত্বকের পরিচর্যা করলেই দেখবেন  কাঙ্ক্ষিত ফল মিলতে পাওয়া শুরু করেছেন।

চুলের সৌন্দর্য্যে জিরা

জিরা পানিতে আছে প্রচুর পুষ্টি উপাদান। তাই চুলের গোঁড়া থেকে পুষ্টির জোগান দিয়ে চুলকে ঝলমলে করে তোলে জিরা পানি। এছাড়াও নিয়মিত জিরা পানি পান করলে চুল পড়া বন্ধ হয়। রুক্ষ হয়ে যাওয়া চলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতেও জিরা নানাভাবে সাহায্য করতে পারে। কীভাবে? এক্ষেত্রে ১ গ্লাস  পানিতে  ১ চামচ জিরা পাউডার এবং ১টা ডিমের কুসুম মিশিয়ে নিন। তারপর সেই মিশ্রনটি চুলে লাগিয়ে কিছুক্ষণ রেখে দিন। যখন দেখবেন মিশ্রনটি শুকিয়ে গেছে, তখন ভাল করে চুলটা ধুয়ে নিন। সপ্তাহে ১ বার এইভাবে চুলের পরিচর্যা করলেই দেখবেন হারিয়ে সৌন্দর্য ফিরে আসবে।

জিরা কিভাবে খাব ?

রান্না করা খাবারে জিরার ব্যবহার হয়েই থাকে। মূলত রান্নায় স্বাদ আনতেই ব্যবহার করা হয় জিরা। কিন্তু এই জিরারও আরও বহু গুণ রয়েছে। তবে রান্নায় নয়, জিরা ভেজানো পানি খেলে আরও অনেক  উপকারিতা পাওয়া যায়। উপরের আলোচনায় আমরা অনেক স্থানেই জিরা পানির কথা বলেছি, তাহলে কিভাবে বানাবো এই জিরা পানি ?

জিরাতে পানি ভিজিয়ে খেতে সমস্যা হলে এভাবে আমরা খেতে পারি।  পানি-১ লিটার জিরা-দেড় চা চামচ চুলায় একটি হাঁড়িতে পানি ফুটিয়ে জিরা দিয়ে আরো ৮-১০ মিনিট ফুটিয়ে পানি পোনে ১ লিটার হলে নামিয়ে ছেঁকে ঠাণ্ডা করতে হবে। এটি চাইলে কুসুম গরম বা বরফ শীতল দুইভাবেই খাওয়া যায়। আরো সুস্বাদু করার জন্য এর সাথে সামান্য চিনি, বিট লবন, গোলমরিচ গুঁড়ো, লেবুর রস, ধনেপাতা/পুদিনাপাতা কুচি ও চাইলে কাঁচা আম যোগ করে ব্লেন্ড করে নেয়া যায়।

শেষ কথাঃ

নিত্য প্রয়োজনীয় মসলাগুলোর মধ্যে অন্যতম জিরা। রান্না করা খাবারে জিরার ব্যবহার হয়েই থাকে। মূলত রান্নায় স্বাদ আনতেই ব্যবহার করা হয় জিরা। কিন্তু এই জিরারও আরও বহু গুণ রয়েছে। সুগন্ধি এই মশলাটি আমাদের নানা অসুখ-বিসুখ থেকে দূরে থাকতে সাহায্য করে। তাই যত তাড়াতাড়ি পারেন আপনার প্রতিদিনের খাদ্যে কিছু জিরা যোগ করুন।

তথ্যসূত্রঃ দেশি-বেদেশি নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক