অবিশ্বাস্য সুপার ফুড টক দই এর উপকারিতা

এমনিতেই খাওয়া ছাড়াও রমযানের সময় সেহেরিতে আমাদের অনেকেই দই খেয়ে থাকেন। বেশীর ভাগ লোকদের খাদ্য তালিকায় দই  একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে।

পৃথিবীর সব জায়গাতেই দই খাওয়ার প্রচলন রয়েছে। আমরা সাধারনত দুই প্রকারের দই বানিয়ে থাকি ।  টক দই এবং মিষ্টি দই।কেউ কেউ টক দই পছন্দ করে আবার কেউ কেউ মিষ্টি দই পছন্দ করে । যদি তুলনা করা হয় দেখা যাবে টক দইয়ের দিকে মানুষের ঝোঁক বেশি।  তবে  টক দই মিষ্টি দই থেকে বেশি উপকারী।

 অন্তত ৪৫০০ বছর আগে থেকে মানুষ দই বানানো ও খাওয়া শুরু করেছে বলে জানা যায় । বেদ ও উপনিষদে দইয়ের ব্যবহারের কথা উল্লিখিত রয়েছে। আবার দই বিষয়ে এই তথ্যও পাওয়া যায় যে, খ্রিষ্টের জন্মের ৬০০০ বছর আগে মধ্যপ্রাচ্যের নিওলিথিক গোষ্ঠীর মানুষরা দই তৈরি করতে জানত এবং তাদের খাদ্য তালিকায় দই থাকত। প্রাচীন মিশর, রোম ও গ্রীসেও দই ব্যবহারের প্রচলন ছিল।

ধারণা করা হয়, ভারতীয় উপমহাদেশে দইয়ের প্রচলন পারস্য থেকে এসেছে। দই যখন থেকে এবং যেখান থেকেই আসুক না কেন, তা বর্তমানে বাঙালির পছন্দের খাদ্যতালিকায় স্থান করে নিয়েছে।

সাধারণ দুপুরের খাবারের পর দই খাওয়া হয়ে থাকে আর এই অভ্যাসটি খুবই উপকারী তাই আজ জানা যাক সেই উপকার গুলো যা দই আমাদের শরীরে করে থাকে । এর আগে টক দইয়ের রেসিপি দেখে নেওয়া যাক। 

দই কিভাবে হয় , কিভাবে টক দই বানাতে পারি ? 

দই খেতে যেমন সুস্বাদু তেমন স্বাস্থ্যের পক্ষেও  খুব উপকারী। দই হল এক ধরনের দুগ্ধজাত খাদ্য যা দুধের ব্যাক্টেরিয়া গাঁজন হতে প্রস্তুত করা হয়। ল্যাক্টোজের গাঁজনের মাধ্যমে ল্যাক্টিক এসিড তৈরি করা হয়, যা দুধের প্রোটিনের ওপর কাজ করে দইয়ের স্বাদ ও এর বৈশিষ্ট্যপূর্ণ গন্ধ প্রদান করে। পুষ্টিকর খাওয়ার মধ্যে দইয়ের জুড়ি মেলা ভার।

যেহেতু আজকে আমরা টক দইয়ের উপকারীতা নিয়ে আলোকপাত করব তাই চলুন দেখে নেই কিভাবে টক দই তৈরি করা যায়। 

বাংলাদেশের প্রায় সব মিষ্টির দোকানেই টক দই পাওয়া যায়। তবে স্বাস্থ্যকর দই খেতে চাইলে ঘরেই বানিয়ে ফেলতে পারেন দই। বাজারে কেনা দইয়ের মান একেক জায়গায় একেক রকম এবং এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভয় হল ভেজাল। কিন্তু কোনো রকম ঝামেলা ছাড়া যদি বাড়িতেই তৈরি করে ফেলা যায় দই তাহলে কেমন হবে বলুন তো?


দই তৈরি করতে অনেকেরই ভীতি কাজ করে।  ভাবেন কি না কি হয়ে যায় । অনেকে আবার টক দই তৈরির  করার চেষ্ট করলেও যখন আশাতীত ফল না না তখন  আর ওমুখো হন  হতে চান না। কিনে নেওয়াটকেই শ্রেয় মনে করেন।  নীচে রেসিপি দেওয়া হলো, তা অনুসরণ করলে  আনাড়ি কেউও তৈরি করে ফেলতে পারবেন নিখুঁত দই। আর এর জন্য খুব বেশি উপাদানেরও দরকার হবে না।

প্রয়োজনীয় উপকরনঃ

  • এক লিটার দুধ
  • আগের টক দই থাকলে ১/২ চামচ দই অথবা ১/২ চামচ ভিনেগার অথবা ১/২ চামচ লেবুর রস।
  • মাটির ভাঁড় না থাকলে স্টিলের বা অন্য কোন পাত্র

প্রস্তুত প্রণালীঃ

( ১ ) প্রথমে  একটি নন-স্টিক সসপ্যানে বা দুধ জ্বাল দেওয়ার পাত্রে দুধ ঢেলে চুলোয় জ্বাল দিতে হবে ।  দুধ বলক উঠলে চুলা কমিয়ে দিতে হবে।  জ্বালিয়ে দুধ অর্ধেক করে নিন আর তারপর চুলা থেকে নামিয়ে ফেলুন ।

( ২ ) এবার দুধ চামচ দিয়ে নেড়ে নেড়ে একটু ঠাণ্ডা করে নিতে হবে, কিন্তু খেয়াল রাখতে হবে যেন পুরোপুরি ঠান্ডা না হয়ে যায় । দুধটা হালকা গরম বা কুসুম গরম রাখতে হবে ।

( ৩ ) এরপর এই গরম করা দুধ মাটির ভাঁড়ে ঢেলে নিন। এক্ষেত্রে মাটির ভাঁড় ব্যবহার করতে পারলে সবচেয়ে ভাল হয় কারণ তাতে দই থেকে অতিরিক্ত পানি বের হয় যাবে আর দই খুব ভালো জমবে। মাটির ভাঁড় না থাকলে, কাঁচ, প্লাস্টিক বা স্টিলের বাটিতেও দই জমাতে পারেন। 

( ৪ )  একটা বাটিতে আগের টাটকা টক দইটা নিয়ে নরমাল এগ বিটার বা চামচ দিয়ে সামান্য ফেটে নিয়ে কুসুম গরম দুধের সাথে চামচের সাহায্যে ভালোভাবে মিশিয়ে দিতে হবে । এই দইটা কিন্তু অবশ্যই টাটকা হতে হবে আর এতে পানি থাকা যাবে না, পানি থাকলে বানানো দই ও পানি ছাড়বে ।

 খেয়াল রাখতে হবে দই মেশানোর সময় দুধ যেন বেশি গরম না থাকে, তাহলে কিন্তু দই জমবে না । দুধে যেন কোন সর না থাকে এজন্য ছেকে নিতে হবে, সর থাকলে দই ভালো জমবে না ।

(৫)  দই মেশানো দুধ টা ঢেলে ভালোভাবে ঢেকে রান্না ঘরে একটা গরম জায়গায় রেখে দিন । ঠাণ্ডা জায়গায় রাখা যাবে না। আর ফ্রিজে তো রাখাই যাবে না। এ ক্ষেত্রে  বাসায় ওভেন থাকলে ওভেনটা অফ করে ভিতরে দই এর পাত্র রেখে ওভেনের দরজা বন্ধ করে রেখে দিতে পারেন ।

আর নাড়াচাড়া করবেন না , একবারে ৮-৯ ঘন্টা পরে দেখবেন দই জমে গেছে । শীতকালে আরেকটু বেশি সময় রাখতে পারেন। গরমকালে আরো কম সময় লাগতে পারে। তখনি খাওয়ার জন্য ব্যস্ত হবেন না, দইটা ঠান্ডা হয়ে সেট হবার জন্য নরমাল ফ্রিজে রেখে দিন ৩-৪ ঘন্টা ।

টক দই এর উপকারিতা

পুষ্টিকর এবং সুস্বাদু খাদ্য হিসেবে এর সুনাম আছে। দিয়ে রয়েছে প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, রাইবোফ্ল্যাভিন, ভিটামিন B6 এবং ভিটামিন B12 । টক দই কে দুধের চাইতেও বেশি পুষ্টিকর খাবার হিসাবে ধার হয়।  কারণ দইতে দুধের চেয়ে বেশি ভিটামিন, যেমন ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস আছে। টক দইতে কোনো কার্বহাইড্রেট বা চিনি নেই। 

টক দইয়ের উপকারিতার কথা যতই বলব ততই কম  বলা হবে।  বাঙালির খাদ্যতালিকায় প্রতিদিন দই থাকে না। অথচ দই হলো পুষ্টির আধার!

তবে দই সম্পর্কে রয়েছে বেশ কিছু ভুল ধারণা। যেমন - দই খেলে অ্যাসিড হয়, মাংস খাওয়ার পর দই খাওয়া উচিত নয়, দই খেলে ঠাণ্ডা লাগে বা গলা নষ্ট হয়। তবে আসলে দই খেলে অ্যাসিড হয় না। কারণ দই নিজেই অন্য খাদ্যের পরিপাক করিয়ে অ্যাসিড নষ্ট করে। মাংস খাওয়ার পর দই খেলে তা আরো উপকার দেয় বেশি। কারণ দই আমিষ হজমে সহায়তা করে। দই খেলে ঠাণ্ডা লাগে না বা গলা নষ্ট হয় না। তবে ফ্রিজে রাখা হিমশীতল দই খেলে গলার ক্ষতি হতে পারে।

দইয়ের রয়েছে আরো নানান গুণাগুণ। প্রতি ১০০ গ্রাম ঘরে পাতা দইয়ে রয়েছে -

ক্যালসিয়াম ১৫ মিলিগ্রাম 
ভিটামিন-এ ১০২ আইইইউ 
প্রোটিন ৩ গ্রাম 
ফ্যাট ৪ গ্রাম 
ময়েশ্চার ৯০ গ্রাম 
ক্যালরি ভ্যালু ৬০ কিলোক্যালরি

যারা দুধ সহ্য বা হজম করতে পারেন না দই তাদের জন্য বেশি উপকারী। কারণ দইয়ে অ্যামাইনো অ্যাসিড যার কারণে দুধের প্রোটিনের চেয়ে দইয়ের প্রোটিন সহজে হজম হয়। খাওয়ার এক ঘণ্টা পর দুধ হজম হয় ৩২% এবং দই হজম হয় ৯০ভাগ। এছাড়াও দইয়ের রয়েছে আরো বেশ কিছ খাদ্যগুণ। চলুন এক নজরে দেখেই দইয়ের উপকারী ব্যবহারগুলো। 

দই আমাদের ইমিউনিটি সিস্টেম কে শক্তিশালী করে

দিন দিন প্রযুক্তি যেমন উন্নতি করেছে ঠিক সেইভাবেই এই উন্নতি এই সমাজকে দূষিত করে তুলছে। যা আমাদের শরীরের ইমিউনিটি সিস্টেমকে খুবই দুর্বল করে তুলেছে। দই আমাদের শরীরের সেই ইমিউনিটি সিস্টেমকে আবার শক্তিশালী করে তোলে এবং বিভিন্ন রোগের থেকে সুরক্ষা প্রদান করে।

দই আমাদর হজম শক্তিকে বাড়ায়

সারাদিন আমরা অনেক ধরনের খাবার খেয়ে থাকি।অনেক সময়ই আমাদের শরীর তা হজম করতে অক্ষম হয়।তার ফলে পেটের নানা অসুবিধা দেখা দেয়।দই কিন্তু আমাদের হজম শক্তি বাড়িয়ে তোলে যার ফলে আমাদের শরীরের পরিপাক শক্তি বাড়ে এবং পেটের সমস্যা দূর হয়ে যায়।

খাবার খাওয়ার পর দই খেলে তা খাবার পরিপাক হতে সাহায্য করে।  আবার অনেকেই হজমের সমস্যার কারণে দুধ খেতে পারেন না কিন্তু দই খেলে সমস্যা হয় না। খাবার সহজে হজম করতে সহায়তা করে দই। টক দইয়ের ব্যাকটেরিয়া অত্যন্ত উপকারী,এটা শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়াকে মেরে ফেলে এবং উপকারী ব্যাকটেরিয়া বাড়িয়ে হজম শক্তি বৃদ্ধি করে।

মুলত খাদ্যনালী বা অন্ত্রের মধ্যে থাকে মাইক্রোফ্লরা যা হজমে সাহায্য করে। টক দইয়ের মধ্যে থাকে GOOD ব্যাক্টেরিয়া যা অন্ত্রের মাইক্রোফ্লরাকে ভাল রাখে, ফলে হজম ভাল হয়।

হাড়ের গঠনে

টক দইয়ে রয়েছেে প্রচুর পরিমান ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ডি। দুটি উপাদানই হাড়ের জন্য অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। নিয়মিত দই খেলে হাড় মজবুত হবে। মহিলাদের টক দই বেশী প্রয়োজন,কেননা তারাই ক্যালসিয়ামের অভাবে বেশী ভোগেন।

৩০ বছর বয়সের পর থেকে অনেক মহিলাদের ক্ষেত্রে হাড়ের সমস্যা দেখা দেয়। এ কারনে যদি তারা নিয়মিত দই গ্রহণ করে সে ক্ষেত্রে হাড়ের সমস্যা শুরু হতে বিলম্বিত হবে। 

দই ওজন কমায়

আমাদের শরীরের চর্বি ওজন বৃদ্ধির মাধ্যমে মোটা করার সাথে সাথে সাথে অনেক অসুখও বহন করে নিয়ে আসে। চর্বি একটি হরমোন তৈরি করে যার নাম কর্টিসল। এই  কর্টিসল হরমোনটি স্থুলতা বাড়ায় । আর এই স্থুলতা আমাদের শরীরে যা ডেকে আনে অনেক রোগ বালাই।  দই সমস্যা থেকে উত্তরণে আমাদের সহায়তা করে ।দইয়ের মধ্যে ক্যালসিয়াম থাকে যা কর্টিসলের ভারসাম্য কে বজায় রাখে। আর তাই আমাদের স্থুলতার সম্ভাবনা কে কমায়।

কম ফ্যাট যুক্ত টক দই একটি ভালো স্ন্যাকস বা হালকা খাবার , কারণ এটি খেলে পেট ভরা অনুভব হয় | তাই পুষ্টিহীন খাবার বা বেশি ক্যালরি যুক্ত junk food না খেয়ে পুষ্টিকর টক দই খেলে ওজন কমাতে সাহায্য করে । কারণ এতে আমিষ থাকে, যেহেতু আমিষ হজম হতে সময় লাগে, তাই পেট ভরা বোধ হয় ও শক্তি পাওয়া যায় | অতিরিক্ত খাবারও খেতে ইচ্ছা করে না। 

স্থুলতা সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। টক দই শরীরের অতিরিক্ত ফ্যাট পুড়িয়ে দেয়। সেই সঙ্গে ওজন কমিয়ে বডি ফিট রাখতে সাহায্য করে। 

উপকারী ব্যাকটেরিয়া

দইয়ে রয়েছে অসংখ্য উপকারী ব্যাকটেরিয়া। এ ব্যাকটেরিয়াগুলো দেহের ক্ষতি করে না বরং হজমে সহায়তা করে। এ ছাড়া দেহের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও কাজ করে দইয়ের ব্যাকটেরিয়া।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি

নিয়মিত দই খাওয়া হলে তা আপনার রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে। এ ছাড়া দই দেহের রক্তের শ্বেতকণিকা বাড়িয়ে দেয়, যা জীবাণু সংক্রমণের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দইয়ের প্রোবায়োটিকস অন্ত্রের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এমনকী খাদ্যনালীতে কোষ উত্‍পাদনেও বড় ভূমিকা নেয় প্রোবায়োটিকস। ঠান্ডা লাগা , সর্দি ও জ্বর না হওয়ার জন্য এটি ভালো কাজ করে। 

কোলেস্টরেল কমায়

দইয়ের মধ্যে রক্তের কোলেস্টরলকে কমানোর ক্ষমতা আছে। দইয়ে থাকে ল্যাক্টোবেসিলাস, অ্যাসিডোফিলাস এর মতো বিভিন্ন প্রোবায়োটিকস যা খারাপ কোলেস্টেরল কমাতে সাহায্য করে। কোলেস্টেরল থেকে আমাদের নানা হৃদয় সংক্রান্ত অসুখ আর স্ট্রোক থেকে মুক্তি পেতে সাহায্য করে। তাই নিয়মিত দই খেতে পারলে কোলেস্টরেলের খারাপ প্রভাব থেকে মুক্ত থাকা যাবে আশা করা যায়। 

হার্টের স্বাস্থ্যের উন্নতি করে

দই ধমনীর কোলেস্টরেল আটকায় বলে আমাদের হার্টের অবস্থা ভাল থাকে। এ কারনে দুপুরের খাবার খাওয়ার পর দই খেতে পারলে আমাদের হার্ট সুরক্ষিত থাকবে এবং কার্ডিওভাস্কুলার সংক্রান্ত অসুখও দূরে থাকবে বলে আশা করা যায়। 

দেহের ছত্রাক প্রতিরোধ

অনেকের দেহের সংবেদনশীল অঙ্গে ছত্রাকের সংক্রমণ হয়। আর এ ছত্রাকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সহায়তা করে দই।

কোলন ক্যান্সার রোধে দই

টক দই খুব ভাল কাজ করে কোলন ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ভাল কাজ করে বলে জানা যায়। ৪৫ হাজার জনের ওপর করা একটি গবেষণা, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অফ ক্যান্সার, তাতে প্রকাশিত হয়েছিল ওই রিপোর্ট। রিপোর্টে গবেষকদের দাবি, দইয়ের মধ্যে যে হেলদি ব্যাক্টেরিয়া আর প্রোবায়োটিকস থাকে, কলোরেক্টাল ক্যান্সার রোধে তা সাহায্য করে।

পাকস্থলীর নানা সমস্যা দূরীকরণে

পাকস্থলীর নানা সমস্যা দূর করতে দই বিশেষ ভূমিকা রাখে । বিশেষ করে ল্যাকটোজের প্রতি সংবেদনশীলতা, কোষ্টকাঠিন্য, ডায়রিয়া, কোলন ক্যান্সার ও অন্ত্রের সমস্যা নানা সমস্যা দূর করতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করে। 

আলসারের সম্ভাবনা কমায়

দই আমাদের পেটে আলসার হওয়ার সম্ভবনা কে অনেকটা রোধ করে।দই আমাদের ক্ষুদ্রান্ত্রকেও সুরক্ষিত রাখে। তাই  দুপুরের খাওয়ার পর দই খাওয়া একটি খুবই ভালো অভ্যাস বলে বিবেচিত।

উচ্চ রক্ত চাপে দই

টক দই শরীরের উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রনে রাখে। প্রতিদিন মাত্র এক কাপ করে টক দই খেলে উচ্চ রক্তচাপ প্রায় এক তৃতীয়াংশ কমে যায় এবং স্বাভাবিক হয়ে আসে।

বার্ধক্যরোধে দই

টক দই শরীরে টক্সিন জমতে বাধা দেয় | তাই অন্ত্রনালী পরিষ্কার রেখে শরীরকে সুস্থ রাখে ও বুড়িয়ে যাওয়া রোধ বা অকাল বার্ধক্য করে| শরীরে টক্সিন কমার কারণে ত্বকের সৌন্দর্যও বৃদ্ধি পায়। 

ছোট বাচ্চাদের জন্য দই খাওয়া খুবই উপকারী

বাচ্চাদের পাচনতন্ত্র বড়দের মত থাকে না বরং তাদের পাচনতন্ত্র থাকে অনেক দুর্বল  । এ কারনে তারা সব খাবার খেতে পারে না, কারন হজমে সমস্যা হয় । কিন্তু দই এমন একটি খাবার যা  খুব সহজেই বাচ্চারাও হজম করতে পারে। এ দিকে দই এর মধ্যে ক্যালসিয়াম থাকে যা বাচ্চাদের নরম হাড়কে শক্ত বানায় আর বেড়ে উঠতে সাহায্য করে।

নারীর সুস্বাস্থ্য

একদম টাটকা মানে সদ্য তৈরি দই খেতে মেয়েদের উপদেশ দেওয়া হয়। কারণ, তা বিভিন্ন ‘ইস্ট’জনীত প্রদাহ যেমন ‘ক্যানডিডা’য়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে। এই ধরনের রোগ নারীদের অনেক যন্ত্রণা দেয়। টক দইয়ে থাকা ‘ল্যাক্টোব্যাসিলাস অ্যাসিডোফিলাস’ নামক ব্যাকটেরিয়া ইস্ট প্রদাহ থেকে রক্ষা্ করে। এ কারনে মেয়েরা নিয়মিত দই খাওয়া উচিত। 

অন্য দিকে, দইয়ে লাক্টিলবাসিলাস আসিডফিলাস থাকে।এই ব্যাক্টেরিয়া আমাদের খাদ্যে খাজা চিনির সাথে প্রতিক্রিয়া করে আর হাইড্রোজেন পারঅক্সাইড তৈরি করে যা যোনির ছত্রাক সংক্রমণ কে দূর করে।

বিষন্নতাকে​ দূর করে ও চাপ মুক্ত করে

প্রযুক্তির উতকর্ষতার সাথে সাথে সমাজে বিষন্ন এবং চাপে থাকার পরিমাণ বেড়েই চলছে। কিছু ব্যাক্টেরিয়া যা আমাদের অন্ত্রে থাকে সেই সকল ব্যাক্টেরিয়া থেকে আমাদের মস্তিকের চাপ কে নিয়ন্ত্রণ করে। দই আমাদের মস্তিষ্কের চাপ নিয়ন্ত্রণ করতে সাহায্য করে । ফলে দই খেলে বিষন্নতা ও চাপ থেকে কিছুতা হলেও মুক্ত থাকা যায়। 

চিন্তিত

চিন্তিত

দই যে শুধু খাবার হিসেবে খাওয়া হয় এমন নয় বরং রূপচর্চাতেও রয়েছে টক দইয়ের সমান ব্যবহার। জেনে নেওয়া যাক ত্বক ও চুলের যত্নে দইয়ের ব্যবহার।

ত্বকের যত্নে

১. অমসৃণ, রুক্ষ ত্বক নিয়ে মন খারাপ? এক কাপ টক দই ও দুটি কলা চটকে ভালো করে মিশিয়ে নিন। গোসলের আগে পুরো শরীরের ত্বকে লাগান। ২০ মিনিট অপেক্ষা করে গোসল করে ফেলুন। ত্বকের মসৃণতা দেখে তাক লেগে যাবে।

২. ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়াতেও দইয়ের জুড়ি নেই। টক দই, বেসন ও মধু মিশিয়ে নিন ভালো করে। মুখসহ পুরো শরীরের ত্বকে ব্যবহার করুন। আধা ঘণ্টা পর মাসাজ করে ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে ত্বকের রং হবে আরো উজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত।

৩. ত্বকের অবাঞ্ছিত লোম নিয়ে বিব্রত থাকেন অনেকেই। দি ব্যবহার করে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াবিহীন ভাবে এই অবাঞ্ছিত লোম দূর করতে পারেন ।

১ টেবিল চামচ টক দই, ২ টেবিল চামচ ময়দা, ১ চা চামচ লেবুর রস ও ১ চিমটি হলুদ মিশিয়ে ঘন পেস্ট তৈরি করুন। ত্বকে পুরু করে প্রলেপ দিন এবং শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করুন। এরপর পানি দিয়ে ভালো করে ঘষে ঘষে ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ৩-৪ বার এভাবে ব্যবহার করুন । এই মিশ্রণটি লোমের রং পরিবর্তন করে এবং লোম ওঠার পরিমাণ কমিয়ে দিবে। 

চুলের যত্নে

১. যাদের চুল কিছুটা শুষ্ক ও রুক্ষ প্রকৃতির তারা চুলে মেহেদি লাগালে সেই চুল আরো রুক্ষ হয়ে ওঠে। মেহেদি ব্যবহার করার সময় এর সাথে মিশিয়ে নিন মেহেদির অর্ধেক পরিমাণে টক দই, তারপর ব্যবহার করুন যথা নিয়মে। টক দই ব্যবহারের ফলে চুলের রুক্ষতা দূর হয়ে চুল কোমল হয়ে উঠে।


২. সিলকি চুল কে না পছন্দ করে । আমার নিজের চুল হল কুঁকড়ানো তাই প্রায়ই সিলকি চুলের অভাবে বোধ করি। দুধ না থাকলে  দুধের স্বাদ যেমন ঘুলে মেটানো যায়, তেমনি আপনি চিলে টক দই ব্যবহা করে চুলকে সাময়িক সিলকি করে তুলতে পারি। 

  মাত্র ১৫ মিনিটেই কিন্ত ঝলমলে সিল্কি চুল পেতে  পারেন । কিভাবে ? এ ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারেন দই। একটি কলা চটকে নিন। এতে এক কাপ টক দই ও ১ টেবিল চামচ মধু ভালো করে মিশিয়ে পুরো চুলে লাগান। ১৫ মিনিট রেখে চুল শ্যাম্পু করে ধুয়ে ফেলুন।

৩. আমাদের যেমন পুষ্টিকর খাবার দরকার হয় তেমনি চুলেরও দরকার পুষ্টিকর উপাদান।  চুলে পুষ্টি যুগিয়ে চুলকে স্বাস্থ্যজ্জ্বল করে তোলে দই।

একটি পুরো ডিম ভালো করে ফেটিয়ে নিন। এ মেশান আধা কাপ টক দই ও ১ টেবিল চামচ অলিভ অয়েল। মিশ্রণটি পুরো চুলে লাগান। আধা ঘণ্টা পর শ্যাম্পু দিয়ে ভালো করে চুল ধুয়ে ফেলুন। নিয়মিত ব্যবহারে চুলের ঘনত্ব বাড়বে।

টক দই কিভাবে খাওয়া যায় ? 

টক দই খাওয়ার সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি হচ্ছে বোরহানি করে খাওয়া। টক দইয়ের ভিতর বিট লবন, গোল মরিচ গুঁড়া, পুদিনা বাটা ইত্যাদি দিয়ে তৈরী করা বোরহানি খেতে যেমন অসাধারন তেমনি স্বাস্থ্যকরও বটে। এছাড়া স্বাদ অন্যরকম করতে তেতুলের রস ও জিরা গুঁড়াও মেশানো যায় বোরহানির সাথে। টক দইয়ের ভিতর সবকিছু দিয়ে  ব্লেন্ডার দিয়ে ভাল করে  ব্লেন্ড করে বোরহানি তৈরি  করে খেতে পারেন। 

টক দই আরও খাওয়া যায় সালাদের সাথে। টমাটো, শসা, গাজর ইত্যাদি কেটে টক দই মিশিয়ে তার সাথে বিট লবন, গোল মরিচের গুঁড়া যোগ করে খেতে হবে। এছাড়াও বিভিন্ন ফল কেটে টক দই সহযোগেও খাওয়া যায়। দুটো পদ্ধতিই সুস্বাদু ও পুষ্টিকর।

যেভাবেই টক দই খাওয়া হোক না কেন মূল কথা হল এটি খুব উপকারি। নিয়মিতভাবে টক দই খেলে আমাদের শরীর থাকবে অনেক রোগমুক্ত, সতেজ ও স্বাভাবিক। যা প্রতিটি মানুষেরই কাম্য।

শেষ কথা

টক দই একটি পুষ্টিকর, তৃপ্তিকর, সর্বজন সমাদৃত ও সহজ লভ্য খাদ্য ।  ডেসার্ট বা মিষ্টি জাতীয় খাবার হিসাবে এটিকে খাওয়া যেতে পারে।  ওজন কমাতে কম ফ্যাট যুক্ত ও চিনি ছাড়া টক দই খাওয়া যায় । এ ছাড়াও টক দইয়ের এত গুনাগুন জানার পরে  এটিকে সুপার ফুড বলাই যেতে পারে তাই না ? 

তথ্যসূত্রঃ দেশি-বিদেশি নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক