টাংগুয়ার হাওর -বাংলাদেশের অন্যতম বড় জলাভূমি

‘ছয় কুড়ি বিল, নয় কুড়ি কান্দা, টাংগুয়ায় সবার জীবন বান্ধা।
মিল্যা মিশ্যা রাইখ্যা খাইতাম, খাইয়া-পইরা সবে মিল্যা বাঁচতাম।

এই প্রবচনটি টাংগুয়ার হাওরের বিস্তৃতি এবং এর উপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন জীবিকা ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে।টাংগুয়ার হাওর(Tanguar haor) বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম হাওর।  স্থানীয় লোকজনের কাছে হাওরটি নয়কুড়ি কান্দার ছয়কুড়ি বিল নামেও পরিচিত। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা এবং তাহিরপুর উপজেলায় অবস্থিত জীববৈচিত্রে সমৃদ্ধ মিঠা পানির এ হাওর। ভারতের মেঘালয়ের খাসিয়া, জৈন্তা পাহাড়ের পাদদেশে সারি সারি হিজল-করচ শোভিত, পাখিদের কলকাকলি মুখরিত টাংগুয়ার হাওর মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম।

এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় রামসার স্থান, প্রথমটি সুন্দরবন। কসময় গাছ-মাছ-পাখি আর প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের আধার ছিল এই হাওর। ১৯৯৯ খ্রিস্টাব্দে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ‘প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়, তখনই অবসান হয় দীর্ঘ ৬০ বছরের ইজারাদারির। ২০০০ খ্রিস্টাব্দে ২০ জানুয়ারি এই হাওরকে ‘রামসার স্থান’ (Ramsar site) হিসেবে ঘোষণা করা হয়।

রামসার কনভেনশন (ইংরেজি: Ramsar Convention) হলো বিশ্বব্যাপী জৈবপরিবেশ রক্ষার একটি সম্মিলিত প্রয়াস। ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে ইরানের রামসারে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশসমূহ কনভেনশন অন ওয়েটল্যান্ডস নামক একটি আন্তর্জাতিক চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। পরবর্তিতে এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রসহ মোট ১৫৮টি দেশ স্বাক্ষর করে এবং পৃথিবীর ১৬৯ মিলিয়ন হেক্টর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত ১,৮২৮টি স্থান আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমি হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়।

মাছ ,বন, পাখী,জীববৈচিত্র,নির্মল বায়ূ,উন্মুক্ত আকাশ,মেঘালয় এর পাহাড় শ্রেণীর অপরূপ সৈন্দর্য এ গুলিই টাংগুয়ার হাওরের বিশেষ বৈশিষ্ট। জলাশয় গুলি যেন ছোট ছোট সমুদ্র্ । ঢেউ নেই , প্রশান্ত শলীল ,সব মিলিয়ে সৈন্দর্যের এক প্রাকৃতিক আধার। পাশে টেকের ঘাট এবং লাউড়ের গড় পাহাড় কন্যা মেঘলয়ের পাদদেশে গড়ে ওঠা জনপদ,যাদু কাটা নদী একটি প্রাকৃতিক সুইমিং পুল,বারিকিয়ার টিলা সুন্দর একটি পিকনিক স্পট,সব মিলিয়ে এক অংগে এত রূপ যেন ।

হাওর পরিচিত

টাঙ্গুগার হাওর প্রকৃতির খেয়ালেই গড়ে উঠেছে। কি তার সৌন্দর্য সেটি লিখে প্রকাশ করার মত নয়।যেখানে আনাগোনা করে নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা। সে মেঘ কখনো কখনো জমাট-আবার কখনো হালকা বাতাসে দলছুট হয়ে পাগলা ঘোড়ার মত উত্তরে দাঁড়ানো আকাশছোঁয়া বিশাল খাসিয়া পাহাড়ে গিয়ে আঁছড়ে পড়ছে। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য পাহাড় ও হাওরের জলরাশি তার নিচে জলজ উদ্ভিদ দেখতে হাজারো পর্যটক ছুটে চলেছেন, ঘুরছেন টাংগুয়ায়।

বর্ষায় হাওরের এল রুপ দেখবে আর শীতে অন্যরুপ। বর্ষায় হাওরের পানিতে অর্ধডোবা হিজল-করস গাছ অন্য এক সৌন্দর্য্য এনে দিবে। বর্ষায় বিশাল হাওরে সাগরের মত ঢেউ।  শীতকালে কুয়াশা ঢাকা প্রান্তরে অতিথি পাখির কলকাকলী।

বাংলাদেশের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে, সুনামগঞ্জ জেলার তাহিরপুর ও ধর্মপাশা উপজেলার ১৮ মৌজায়, ৫১টি জলমহালের সমন্বয়ে মোট আয়তন ৬,৯১২.২০ একর। তবে নলখাগড়া বন, হিজল করচ বনসহ বর্ষাকালে সমগ্র হাওরটির আয়তন দাড়ায় প্রায় ২০.০০০ একর।  এটি বাংলাদেশের অন্যতম বড় জলাভূমি। পানিবহুল মূল হাওর ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং বাকি অংশ গ্রামগঞ্জ ও কৃষিজমি।

শীত মৌসুমে পানি শুকিয়ে কমে গেলে এখানকার প্রায় ২৪টি বিলের পাড় (স্থানীয় ভাষায় কান্দা) জেগে উঠলে শুধু কান্দা’র ভিতরের অংশেই আদি বিল থাকে, আর শুকিয়ে যাওয়া অংশে স্থানীয় কৃষকেরা রবিশস্য ও বোরো ধানের আবাদ করেন। এসময় এলাকাটি গোচারণভূমি হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বর্ষায় থৈ থৈ পানিতে নিমগ্ন হাওরের জেগে থাকা উঁচু কান্দাগুলোতে আশ্রয় নেয় পরিযায়ী পাখিরা —রোদ পোহায়, জিরিয়ে নেয়।

ভারতের মেঘালয়ের পাদদেশে অবস্থিত এই টাঙ্গুয়ার হাওর। মেঘালয় পর্বত থেকে প্রায় ৩০টি ঝরনা এসে সরাসরি মিশেছে হাওরের পানিতে। সারিসারি হিজল-করচশোভিত, পাখিদের কলকাকলি সদা মুখরিত টাংগুয়ার হাওর। এটি মাছ, পাখি এবং অন্যান্য জলজ প্রাণীর এক বিশাল অভয়াশ্রম। জীববৈচিত্র্য ও সৌন্দর্যের কারণে টাঙ্গুয়ার হাওরের সুনাম শুধু সুনামগঞ্জ বা বাংলাদেশে নয়, বাইরেও আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত (রামসার সাইট)।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র

টাংগুয়ার হাওর প্রকৃতির অকৃপণ দানে সমৃদ্ধ। এ হাওর শুধু একটি জলমহাল বা মাছ প্রতিপালন, সংরক্ষণ ও আহরণেরই স্থান নয়। এটি একটি মাদার ফিশারী। হিজল করচের দৃষ্টি নন্দন সারি এ হাওরকে করেছে মোহনীয়। এ ছাড়াও নলখাগড়া, দুধিলতা, নীল শাপলা, পানিফল, শোলা, হেলঞ্চা, শতমূলি, শীতলপাটি, স্বর্ণলতা, বনতুলসী ইত্যাদি সহ দু’শ প্রজাতিরও বেশী গাছগাছালী রয়েছে এ প্রতিবেশ অঞ্চলে।

জেলা প্রশাসনের কার্যকর ও টেকসই ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে বর্তমানে এ হাওরে রয়েছে ছোট বড় ১৪১ প্রজাতির ২০৮ প্রজাতির পাখি, ১ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৩৪ প্রজাতির সরীসৃপ, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটি এবং ২১ প্রজাতির সাপ।নলখাগড়া বন বৃদ্ধি পেয়েছে কয়েকগুণ।

টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্যের মধ্যে অন্যতম হলো বিভিন্ন জাতের পাখি । শীত মৌসুমে অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে ব্যাপক পাখির আগমন ও অবস্থানে মুখরিত হয় টাঙ্গুয়ার হাওর।  সাধারণ হিসাবে বিগত শীত মৌসুমের প্রতিটিতে ২০/২৫ লক্ষ পাখি টাঙ্গুয়ার হাওরে ছিল বলে অনুমান করা হয়। কোন কোন স্থানে কিলোমিটারের বেশী এলাকা জুড়ে শুধু পাখিদের ভেসে থাকতে দেখা যায়।

টাঙ্গুয়ার হাওর মাছ-পাখী এবং উদ্ভিদের পরস্পর নির্ভরশীল এক অনন্য ইকোসিস্টেম। স্থানীয় বাংলাদেশী জাতের পাখি ছাড়াও শীতকালে, সুদূর সাইবেরিয়া থেকে আগত পরিযায়ী পাখিরও আবাস এই হাওর। টাঙ্গুয়ার হাওরে সম্ভবত পাখিদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় ফেব্রুয়ারি মাসে। পাখি দেখতে চাইলে টাঙ্গুয়ার হাওরে কমপক্ষে দুই দিন দুই রাতের একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা নিয়ে বেড়িয়ে পড়ুন। এ হাওরে প্রায় ৫১ প্রজাতির পাখি বিচরণ করে।

আমাদের দেশীয় পাখিগুলো সারা বছরই খুনসুটি, জলকেলি আর খাবারের খোঁজে এক বিল থেকে আরেক বিলে ওড়াউড়ি করে মাতিয়ে রাখে এই হাওরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত। আর শীত এলে আমাদের দেশি পাখির সাথে হরেক রকমের পরিযায়ী পাখিরা ভিড় করে টাঙ্গুয়ার হাওরে। এতে হাওয়ার শোভা বেড়ে যায় কয়েকশ গুণ।

পৃথিবীর প্রায় ১০ হাজার জাতের পাখির মধ্যে এক হাজার ৮৫৫ জাতের পাখি পরিযায়ী। এসব অতিথি পাখি প্রতি বছর তুষারপাত ও শৈত্যপ্রবাহ থেকে নিজেদের রক্ষার তাগিদে শীত মওসুমে শীতপ্রধান দেশ সুদূর সাইবেরিয়া, চীন, মঙ্গোলিয়া, নেপালসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে শুধু ডানায় ভর করে ঝাঁকে ঝাঁকে ছুটে আসে এই টাংগুয়ার হাওরে। অতিথি পাখিরা ডানা মেলে একটানা আকাশের ওড়ার কান্তিতে প্রথমে কিছুটা ঝিমিয়ে পড়লেও প্রচুর খাদ্যসমৃদ্ধ টাংগুয়ার হাওরে বিচরণ করে সজীবতা ফিরে পায়।

পরিযায়ী পাখিদের মধ্যে বিরল প্রজাতির প্যালাসেস ঈগল, বড় আকারের গ্রে কিংস্টর্ক রয়েছে এই হাওড়ে। স্থানীয় জাতের মধ্যে শকুন, পানকৌড়ি, কালেম, বৈদর, ডাহুক, বালিহাঁস, গাঙচিল, বক, সারস, কাক, শঙ্খচিল, জলকুক্কুট (এই হাওরের ২৮-২৯%) ইত্যাদি পাখির নিয়মিত বিচরণ এই হাওরে। এছাড়া আছে বিপন্ন প্রজাতির পরিযায়ী পাখি কুড়ুল (বাংলাদেশে এর নমুনাসংখ্যা ১০০টির মতো)।

২০১১’র পাখিশুমারীতে এই হাওরে চটাইন্নার বিল ও তার খাল, রোয়া বিল, লেচুয়ামারা বিল, রুপাবই বিল, হাতির গাতা বিল, বেরবেরিয়া বিল, বাইল্লার ডুবি, তেকুন্না ও আন্না বিলে প্রায় ৪৭ প্রজাতির জলচর পাখি বা ওয়াটারফাউলের মোট ২৮,৮৭৬টি পাখি গণনা করা হয়। এই শুমারিতে অন্যান্য পাখির পাশাপাশি নজরে আসে কুট, মরিচা ভুতিহাঁস, পিয়ংহাস; সাধারণ ভুতিহাঁস, পান্তামুখী বা শোভেলার, লালচে মাথা ভুতিহাঁস, লালশির, নীলশির, পাতিহাঁস, লেনজা, ডুবুরি, পানকৌড়ি ইত্যাদি পাখিও।

এসব অতিথি পাখি টাংগুয়ার হাওরে কুয়াশাছন্ন সকালের সোনালি রোদে সূর্য স্নান সেরে দল বেঁধে চষে বেড়ায়।  ছোট শামুক, ঘাস, শস্যদানা, আর পোকামাকড়ের সন্ধানে হাওরের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে। উড়ে বেড়ানো আর কলকাকলিতে মুখরিত হাওর পাড়ের এলাকাজুড়ে বিরাজ করছে নয়নাভিরাম চোখজুড়ানো দৃশ্য। বিশাল হাওরের জলে ডুব দিয়ে মাছ শিকার করা, শামুক খাওয়া, জলকেলি, খুনসুটি এবং কিচিরমিচির কলতান পাড়ের মানুষের ভোরে ঘুম ভেঙে যায় আর পাখিপ্রেমীদের সহজেই নিয়ে যায় অন্য এক ভুবনে।

এছাড়াও ৬ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ৪ প্রজাতির সাপ, বিরল প্রজাতির উভচর, ৬ প্রজাতির কচ্ছপ, ৭ প্রজাতির গিরগিটিসহ নানাবিধ প্রাণীর বাস, এই হাওরের জীববৈচিত্র্যকে করেছে ভরপুর। মাছের অভয়াশ্রম হিসাবে এর গুরুত্ব সবচেয়ে বেশী।

টাঙ্গুয়ার হাওর হচ্ছে বাংলাদেশের অন্যতম একটি মিঠাপানির মাদার ফিশারিজ। স্থানীয়ভাবে ছয়কুড়ি কান্দা আর নয় কুড়ি বিল নামে পরিচিত এই বিশাল জলাভূমি শুধু পাখি নয়, মাছের জন্যও বিখ্যাত। একসময় টাঙ্গুয়ার হাওরে প্রায় ২০০ প্রজাতির মাছ ছিল। এ হাওরের বিখ্যাত মাছের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করা যায় মহাশোলের কথা। মাছটির দুটি প্রজাতি পাওয়া যেত এই হাওরে। এ ছাড়া রয়েছে গাং বাইম, কালবাউশ, তারা বাইম, বাইম, গুতুম, গুলশা, টেংরা, তিতনা, গইন্না, রুই, কাতল, চিতল, বোয়ালসহ আরো নানা প্রজাতির দেশি মাছ।

টাঙ্গুয়ার হাওর সংরক্ষণের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো দেশের মৎস্যসম্পদ বৃদ্ধি করা। টাঙ্গুয়ার হাওরে মা মাছ নিরাপদে ডিম ছাড়বে আর বর্ষাকালে এই মাছগুলো ছড়িয়ে পড়বে দেশের অন্যান্য নদীনালা ও খালবিলে। সেজন্য টাঙ্গুয়ার হাওরের ইজারা প্রথা বিলোপ করে মাছের অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়।

টাঙ্গুয়ার হাওরের উদ্ভিদের মধ্যে অন্যতম হলো জলজ উদ্ভিদ। এছাড়া আছে হিজল, করচ, বরুণ, পানিফল, হেলেঞ্চা, বনতুলশী, নলখাগড়া, বল্লুয়া, চাল্লিয়া ইত্যাদি জাতের উদ্ভিদ।  টাঙ্গুয়ার হাওরের প্রবেশ মুখেই দেখা যায় সারি সারি হিজলগাছ। দেখে মনে হবে এই গাছগুলো হাওরে আগত অতিথিদের অভিবাদন জানানোর জন্যই দাঁড়িয়ে আছে। মূল হাওরে প্রবেশ করলে হাওরের পানির নিচের দিকে তাকালে দেখা মিলবে হরেক রকম লতা-পাতা জাতীয় জলজ উদ্ভিদ। পানির নিচে সে এক অপরূপ সবুজের স্বর্গরাজ্য। টাঙ্গুয়ার হাওরে আরো আছে করচ, পানিফল, হেলেঞ্চা, বনতুলসি, নলখাগড়া, বল্লুয়া ও চাল্লিয়া জাতের উদ্ভিদ।

কিভাবে যাবেনঃ

হাওরে যেতে হলে প্রথমে যেতে হবে সুনামগঞ্জ জেলা শহরে। ঢাকা থেকে সড়ক পথে সুনামগঞ্জ যাওয়া যায়। সায়দাবাদ থেকে শ্যামলী পরিবহন, হানিফ এন্টারপ্রাইজ, এনা পরিবহন, মামুন পরিবহনের নন এসি বাস যায় সুনামগঞ্জ। ভাড়া নন-এসি ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা। এ ছাড়া মহাখালি থেকে এনা পরিবহনের বাস ছাড়ে। বাসে করে সুনামগঞ্জ যেতে সময় লাগবে ছয় থেকে সাড়ে ছয় ঘন্টার মত।

সুনামগঞ্জ শহরের আগে শুরমা সেতু থেকে লেগুনা কিংবা মোটরবাইকে যেতে হবে তাহিরপুর কিংবা সোলেমানপুর। তবে ফেব্রুয়ারি মাসে সোলেমানপুর যাওয়াই উত্তম। কারণ তাহিরপুর থেকে সোলেমানপুরের বৌলাই নদীতে এ সময়ে নাব্যতা কমে যায়।

সুনামগঞ্জ থেকে সোলেমানপুর যেতে একটি লেগুনার ভাড়া পড়বে ৮শ’ থেকে ১ হাজার ২শ’ টাকা। যাওয়া যাবে কমপক্ষে আটজন।
মোটরবাইকে দু’জনের খরচ পড়বে ৩শ’ থেকে ৪শ’ টাকা। সোলেমানপুর থেকে ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া করে পাতলাই নদী ধরে যেতে হবে টাঙ্গুয়ার হাওরে।

সেখানে বিভিন্ন রকম ইঞ্জিন নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। নৌকা ভাড়া করতে কিছু বিষয়ের উপর লক্ষ্য রাখুন যেমন নৌকায় বাথরুম আছে কিনা, নৌকার ছাদ বাঁশের কিনা। বাঁশের ছাদ থাকলে রোদে নৌকার ভেতর কম গরম হয় এবং ছাদের উপর বসেও আরাম পাওয়া যায়। নৌকা ভাড়া করতে দরদাম করে নিন।

সাধারণত ছোট নৌকা ১৫০০ থেকে ২০০০ টাকা, মাঝারি নৌকা ২৫০০ থেকে ৩৫০০ টাকা এবং বড় নৌকা ৩৫০০ থেকে ৫০০০ টাকায় সারাদিনের জন্য ভাড়া করা যায়। ২ দিন এবং ১ রাত নৌকায় কাটাতে চাইলে বড় নৌকা ভাড়া করতে ৭০০০ থেকে ৮০০০ টাকার মত লাগবে। রান্নার জন্য নৌকার মাঝিকে খরচের টাকা দিলে সে বাবুর্চি নিয়ে যাবে কিংবা নিজেই রান্নার ব্যবস্থা করে ফেলবে। কি করবেন তা অবশ্যই মাঝির সাথে আগে আলোচনা করে দরদাম ঠিক করে নিবেন।

গ্রীষ্মকালে শহরের সাহেব বাড়ি খেয়া ঘাট পার হয়ে অপর পার থেকে প্রথমে মোটর সাইকেল যোগে ২ ঘন্টায় শ্রীপুর বাজার/ডাম্পের বাজার যেতে হয়। ভাড়া ২০০ টাকারা আশে পাশে । সেখান থেকে ভাড়াটে নৌকায় টাঙ্গুয়া ঘরে আসা যা সেয়।ক্ষেত্রে ভাড়া বাবদ ব্যয় হতে পারে ৩০০-৪০০/- টাকা।

কোথায় থাকবেন:

টাঙ্গুয়ার হাওরে বেড়াতে গেলে নৌকায় রাত্রি যাপন করাটা অনেক বেশি মজার। আপনি চাইলে থাকতে পারেন ওয়াচ টাওয়ারের পাশেই গোলাবাড়ীতে হাওড় বিলাস নামক রেস্ট হাউজে অথবা সরকারি ব্যবস্থাপনায় টেকেরঘাট চুনাপাথর খনি প্রকল্পের রেস্ট হাউজে, বেসরকারিভাবে নির্মিত খন্দকার আবাসিক হোটেলেও থাকতে পারবেন। আবার দিনে দিনে হাওর ঘুরে রাতটা তাহিরপুর পৌরসভার রেস্ট-হাউজে কাটিয়ে দিতে পারেন, তবে সেক্ষেত্রে আগে থেকে যোগাযোগ করে যেতে হবে।

এছাড়া চাইলে আপনি সুনামগঞ্জ শহরেও থাকতে পারেন। যেখানে ভাড়া ২০০ থেকে শুরু করে ১০০০ টাকা ।

হোটেল নূর-পূর্ববাজার স্টেশন রোড সুনামগঞ্জ
হোটেল সারপিনিয়া-জগন্নাথবাড়ী রোড, সুনামগঞ্জ।
হোটেল নূরানী, পুরাতন বাস স্ট্যান্ড , সুনামগঞ্জ।
হোটেল মিজান, পূর্ব বাজার-সুনামগঞ্জ।
হোটেল প্যালেস, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, স্টেশন রোড
সুরমা ভ্যালী আবাসিক রিসোর্ট

কি খাবেন ?

তাহিরপুরে খাবার হোটেল থেকে হাওরের প্রায় ২০ থেকে ২৫ প্রজাতির মাছের মধ্যে নিজের পছন্দের মাছ দিয়ে খেতে পারেন । আর যদি বেশিদিন টাঙ্গুয়ায় থাকার পরিকল্পনা থাকে তবে তাহিরপুর থেকে নৌকায় উঠার আগে যে কয়দিন অবস্থান করবেন সেই কয়দিনের বাজার করে নিতে পারেন। আর তাজা মাছ কেনার জন্য হাওরের মাঝখানের ছোট বাজারগুলোতে যেতে পারেন। এছাড়া সাথে নিতে পারেন দেশি হাস কিংবা দারুণ সব শুঁটকি।

টাঙ্গুয়ার হাওরে ২ দিন ১ রাতের ট্যুর প্ল্যান

সুবিধামত যেকোন দিন রাতের বাসে করে সুনামগঞ্জ গেলে সকাল ৭ টার মধ্যে সেখানে পৌছে যাবেন। সুনামগঞ্জে নাস্তা সেরে সিএনজি ভাড়া করে তাহিরপুর যেতে ১ ঘন্টার মত সময় লাগবে। ঘাট থেকে নৌকা ঠিক করে নৌকায় ওঠার আগে ২ দিন ১ রাতের জন্য মাছ ছাড়া অন্য প্রয়োজনীয় বাজার করে নিন। সকাল ৯ থেকে ১০ টার মধ্যে নৌকায় যাত্রা শুরু করার চেষ্টা করুন। সোজা নৌকা নিয়ে চলে আসুন ওয়াচ টাওয়ার এলাকায়।

এদিকে জলাবনের সৌন্দর্য্যের পাশাপাশি ছোট ছোট নৌকা নিয়ে ছোট বাচ্চাদের ঘুরতে দেখবেন। চাইলে ওয়াচ টাওয়ারে রান্নার কাজ করে ফেলতে পারেন। ওয়াচ টাওয়ার দেখা শেষে চলে যেতে পারেন হাওরের মাঝখানে। দিগন্তজোড়া জলরাশি দেখে দুপুরের পর পরই টেকেরঘাটের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করুন। এই দিকে নৌকা যতই এগুতে থাকবে ততই পানি স্বচ্ছ হতে হতে এক সময় হাওরের তলা পর্যন্ত দেখতে পারবেন।

হাওরে গোসল না করে থাকলে টেকেরঘাটের নীলাদ্রি লেকে এসে গা ভেজাতে পারেন। তবে যতটুকু জানি এখন এখানে গোসল করা কর্তৃপক্ষ নিষিদ্ধ করেছে।  আর এখানেই হাওরে নৌকা বেধে নৌকার মধ্যে রাত কাটিয়ে দিতে পারেন। সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠে যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখতে রওনা দিন। টেকেরঘাট থেকে মটরসাইকেল নিয়ে যেতে পারবেন। নৌকা নিয়ে যাওয়া যায় তবে একটু দূর হওয়ায় মাঝি আপত্তি করতে পারে অথবা আরো ৩০০০ থেকে ৪০০০ টাকা অতিরিক্ত চাইতে পারে তাই সবচেয়ে ভালো হয় তাহিরপুর ঘাট থেকে নৌকা ভাড়া করার সময় মাঝিকে যাদুকাটা নিয়ে যাবার কথা বলে নৌকা ঠিক করা।

যাদুকাটা নদী ও বারিক্কাটিলা দেখে দুপুরের মধ্যে টেকেরঘাট ফিরে আরেকটু সময় হাওর ঘুরে সন্ধ্যার আগেই তাহিরপুর চলে আসুন। সেখান থেকে সিএনজি ভাড়া করে সরাসরি সুনামগঞ্জ বাস স্ট্যান্ড চলে আসতে পারেন। রাতের বাসে করে পুনরায় সকালে ঢাকায় !

টাংগুয়ার হাওর ভ্রমণের সতর্কতা ও কিছু পরামর্শ

– হাওর ভ্রমণকালে অবশ্যই অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট সঙ্গে নিন।

– বর্ষায় হাওর এলাকায় বজ্রপাত বেশি হয় তাই বজ্রপাতের সময় নৌকার ছৈয়ের নিচে অবস্থান করুন।

– খাবারের অতিরিক্ত অংশ/উচ্ছিষ্ট জৈবিক অংশ ইত্যাদি হাওরের পানিতে ফেলতে পারেন।

-পলিথিন , প্লাস্টিক , চিপসের প্যাকেট এসব হাওরে ফেলবেন না।

– উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী মাইক বা যন্ত্র পরিহার করুন।

– টাংগুয়ার মাছ, বন্যপ্রাণী কিংবা পাখি ধরা বা এদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ে এমন কাজ থেকে বিরিত থাকুন।

– টাংগুয়ার জলাবনের কোন রুপ ক্ষতিসাধন না করার ব্যপারে সতর্ক থাকুন।

-টাংগুয়ায় শামুক, ঝিনুক বা অন্য কোন প্রকার জলজ বা স্থলজ প্রাণী/কীটপতঙ্গের ক্ষতিসাধন করা  থেকে সতর্ক থাকুন।

ভ্রমণে সাথে নিন

টর্চ ব্যাকআপ ব্যাটারিসহ, ক্যাম্পিং মগ, চাদর, রেইনকোর্ট বা ছাতা, নিয়মতি সেবনীয় ওষুধ, টয়লেট পেপার, ব্যাগ ঢেকে ফেলার মতো বড় পলিথিন, প্লাস্টিকের স্যান্ডেল (চামড়ার স্যান্ডেল পরিহার করা ভাল হবে), সানগ্লাস, ক্যাপ বা হ্যাট, গামছা (যা সহজে শুকাবে), খাবার পানি, হাফ প্যান্ট এবং সহজে শুকায় এমন জামাকাপড়।

শেষ কথা

বিশ্বের সর্বাধিক বৃষ্টিবহুল অঞ্চল চেরাপুঞ্জির খুব কাছেই অবস্থিত রামসার সাইট টাঙ্গুয়ার হাওর। শীতের শুরুতে অতিথি পাখি আসা শুরু করে। রাষ্ট্রীয়ভাবে অতিথি পাখি শিকার করা দণ্ডনীয় হলেও রাতের আঁধারে মাছ ধরার জালসহ বিভিন্ন ফাঁদ দিয়ে অতিথি পাখি শিকার করে স্থানীয় শিকারীরা। টাংগুয়ার হাওরের উপর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীকে সংগঠিত করে আত্মকর্মসংস্থান ও বিকল্প আয়ের উৎস সৃষ্টির মাধ্যমে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের উপর তাদের নির্ভরশীলতা হ্রাসসহ টাংগুয়ার হাওরে একটি কার্যকর সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রকল্পের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সুরক্ষা, জীবিৈবচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রতিবেশ ব্যবস্থা অটুট রক্ষার লক্ষ্যে সমগ্র হাওরকে কোর জোন ও বাফার জোনে বিভক্ত করা হয়েছে। ‘মাছ ধরা নিষিদ্ধ এলাকা’ এর সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে।

টাংগুয়ার হাওর এলাকার দরিদ্র ও হতদরিদ্র জনগণের হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অত্যধিক মাত্রায় নির্ভরশীলতা, দারিদ্র পীড়িত মানুষের মাছ চুরির প্রবণতা, মাছ চুরিতে প্রভাবশালী গোষ্ঠির সহায়তা ও ইন্ধন, স্বার্থান্বেষী মহলের ক্রমাগত বিরোধিতা (বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ, প্রভাব বিস্তার) ও আর্থ-সামাাজক উন্নয়ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয়হীনতা টাংগুয়ার হাওর সহ-ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে দেখা দিয়েছে।  টাংগুয়ার হাওর সমাজভিত্তিক টেকসই সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার কাজ আমাদের মতো জনবহুল তবে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের দেশের জন্য একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ।   এ হাওর আমাদের সকলের  । মনে রাখতে হবে এ হাওর আমাদের সকলের আমাদের অসতর্কতায় যদি হাওরের পরিবেশ নষ্ট হয় সেটি আমাদের জন্যে দীর্ঘ মেয়াদে কুফল বয়ে নিয়ে আসবে।

তথ্যঃ সামু, উইকি, ntvbd,sunamganj.gov.bd ইত্যাদি

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক