ঢাকা মেডিকেল কলেজঃ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার অগ্রপথিক

মুন্সিগঞ্জ সদরে বাসের ধাক্কায় একজন পথচারী আহত হলে তাকে স্থানীয় লোকজন সদর হাসপাতালে নিয়ে যায়। আহত ব্যক্তির পকেট থেকে তার ফোন নিয়ে পরিবারকে ফোন করা হয়। ইতিমধ্যে তার পরিবারের লোকজনও পৌছে যায়।

সদর হাসপাতালের কর্তব্যরত ডাক্তার আহত ব্যক্তিকে পরীক্ষা করে রোগীর মাথায় ইন্টারনাল ডেমেজ হয়েছে বলে জানায়। সদর হাসপাতালে প্রয়োজনীয় লোকবল আর চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে তার সঠিক চিকিৎসা সম্ভব নয় বলে অপারগতা প্রকাশ করে। রোগীকে তিনি অন্য কোন ভাল হাসপাতালে নিয়ে যাবার পরামর্শ দেন।

এক্সিডেন্টাল রোগির ক্ষেত্রে যখন রেফারের প্রশ্ন আসে প্রথমে যে নামটি সবার মনে আসে তা হল ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল !

মেডিকেল শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং গবেষণাকে সামনে রেখে "সেবাই পরম ধর্ম" এ লক্ষ্য নিয়ে ১৯৪৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে এটি দেশের সেরা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল হিসেবে সুপরিচিত।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ স্থাপনের ইতিহাস

ব্রিটিশরা ভারতবর্ষের ক্ষমতা দখলের প্রায় ১০০ বছর পরে ১৮৪১ সালে প্রথম শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। আরো এক যুগ পরে ১৮৫৩ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ স্থাপন করে। কলকাতা মেডিকেল কলেজ স্থাপনের পরে একশ বছর পেরিয়ে যায় কিন্ত স্থাপিত হয় নি আর কোন মেডিকেল কলেজ। যদিও বেশ কিছু মেডিকেল স্কুল স্থাপিত হয়। 

ব্রিটিশ ভারতে পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীরা কলকাতা মেডিকেল স্কুলে চিকিৎসাশিক্ষা গ্রহণ করে জনসাধারণকে চিকিৎসাসেবা দিতেন। সেখানে সরকারিভাবে পূর্ববঙ্গের শিক্ষার্থীদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ আসন বরাদ্দ থাকত।

ধীরে ধীরে চিকিৎসা সেবার বৃদ্ধি করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিলে পূর্ববঙ্গের রাজধানী ঢাকা ও বিহারের রাজধানি পাটনায় মেডিকেল কলেজ স্থাপনের সিন্ধান্ত হয়। এই পরিকল্পনা করেছিলেন তখনকার গভর্নর জেনারেল জর্জ ক্যাম্পবেল, ১৮৭৩ সালে। দুই বছরের মাথায় ঢাকায় মেডিকেল স্কুলটি চালু হয়েছিল বর্তমান মিটফোর্ড হাসপাতালে। প্রথম পাঠদান শুরু হয়েছিল ১৮৭৫ সালের ১৫ জুন, ৩৮৪ জন ছাত্র নিয়ে।

মেডিকেল স্কুলটি প্রেক্ষাপট নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। ঐ সময় ঢাকার কালেক্টর ও আপিল বিভাগের জজ ছিলেন স্যার রবার্ট মিটফোর্ড । তখন সংক্রামক রোগে বিশেষ করে কলেরায় বিপুল লোকের প্রাণহানী হত। দেখা যেতে দিনে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ জন লোকও মারা যেত। কিন্ত এই কলেরা রোগের চিকিৎসা ছিল। এ মর্মান্তিক পরিস্থিতি দেখে মিটফোর্ড খুব কষ্ট পান। 

তিরিশ বছর ভারতবর্ষে অবস্থান করার পর ১৮২৮ সালে মিটফোর্ড দেশে ফিরে যান। ১৮৩৬ সালে তিনি প্যারিস ভ্রমণে যান এবং সেখানে ২১ সেপ্টেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।

মিডফোর্ড ১৮৩৬ সালে মারা যান। মারা যাবের আগে তিনি তার আট লাখ টাকার সম্পত্তির বেশির ভাগ অংশ ঢাকা জনকল্যানে ও একটি হাসপাতাল নির্মাণের জন্যে উইল করে যান। কিন্ত বাধ সাধে মিডফোর্ডের উত্তারিকাররা। এটি নিয়ে তারা আদালতের দ্বারস্থ হন ।

রবার্ট মিটফোর্ডের স্ত্রী এলিজাবেথ এবং তাঁর ‘বান্ধবী’ ম্যারি আপোলিন এই উইলের বিরোধিতা করে মামলা করেন। বিভিন্ন আদালতে এবং দীর্ঘ সময় ধরে এই মামলা চলতে থাকে এবং এতে বহু আত্মীয়স্বজন, ব্রিটিশ সরকার এবং ভারত সরকার জড়িয়ে পড়ে। মিটফোর্ডের উইল সংক্রান্ত মামলা ১৮৫০ সাল পর্যন্ত চলে। পরে লন্ডনের হাইকোর্টের চান্সারি বিভাগ উইলের বৈধতার স্বীকৃতি দিয়ে রায় দেয় এবং মিটফোর্ডের উইল অনুযায়ী তার সম্পদ ও অর্থের অবশিষ্টাংশ ঢাকায় প্রেরণ করতে নির্দেশ দেয়। অনেক নাটকের পরে আদালত ১৭,৭৪৮ পাউন্ড ১২ শিলিং ৩ পেন্স বা ১,৭৭,৪৮৬ টাকা ২ আনা অনুমোদন প্রদান করে।

 
 

এ টাকা দিয়ে কি করা হবে সে সম্পর্কেও মিটফোর্ডের কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশ ছিল না। মিটফোর্ড ফান্ড নিয়ে আলোচনা শুরু হলে তা ঢাকার(পূর্ব বঙ্গের) সর্বপ্রথম সরকারী হাসপাতাল নির্মাণের প্রস্তাব করেন গভর্নর জেনারেল লর্ড ডালহৌসি । তিনি মতামত দেন যে দাতা মিটফোর্ডের সদিচ্ছা ফলপ্রসূ ও যথাযথ হবে যদি তাঁর দেয়া অর্থ দিয়ে ঢাকায় তথা পূর্ববাংলার জনগণের জন্য ঢাকায় একটি পাশ্চাত্য চিকিৎসা পদ্ধতিতে পরিচালিত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করা হয়। তিনি সেভাবে কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন। এটিও চূড়ান্ত করা হয় যে হাসপাতালটির নাম দাতা মিটফোর্ডের নামানুসারে মিটফোর্ড হাসপাতাল রাখা হবে। 

উইলের এ টাকা নিয়ে অনেক নাটকের পর ৩২জন রোগী নিয়ে ১মে ১৮৫৮তে যাত্রা শুরু করে MITFORD NATIVE HOSPITAL। পরে অবশ্য এতে ঢাকার অনেক দানশীল ব্যক্তি উদার হস্তে দান করেছেন। বিশেষত, ১৮৮২ সালে নবাব আহসানউল্লাহ ও ভাওয়ালের রাজা রাজেন্দ্র নারায়ণের দানে এখানে প্রথম মহিলা ওয়ার্ড প্রতিষ্ঠিত হয়।

ডাঃ এলেক্স সিম্পসন হাসপাতালের ১ম ইউরোপিয়ান চিকিৎসক এবং সুপারিনটেন্ডেন্ট। রোগী দেখার পাশাপাশি সেখানে একটি মেডিকেল স্কুল স্থাপনের জন্যে তাকে দায়িত্ব দেয়া হয় । হাসপাতালের ড্রেসাররা(ওয়ার্ড বয়) এ স্কুলের ছাত্র হবে । এদের মাঝে যারা ভালো করবে তাদের কলকাতা মেডিকেল কলেজে দেশীয় ডাক্তারী পড়ার জন্যে পাঠানো হবে ।

১৮৩৫ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হবার পর ঢাকা কলেজ থেকে কিছু ছাত্রকে বৃত্তি দিয়ে সেখানে পড়তে পাঠানো হত । ঢাকা থেকে প্রকাশিত প্রথম পত্রিকা “ঢাকা প্রকাশ” বাংলাদেশে মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠার দাবী জানায় । ১৮৭৩ সালে লেফট্যানেন্ট গভর্নর স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল ঢাকায় মেডিকেল স্কুল স্থাপনের প্রজ্ঞাপন জারি করেন । ১ জুলাই ১৮৭৫ ঢাকা মেডিকেল স্কুল যাত্রা শুরু করে । বেঙ্গল থিয়েটারের হল রুমে মাটির মেঝেতে বসে ৩৮৪ জন ছাত্র পায় ডাক্তারি বিদ্যার প্রথম পাঠ ।

মেঝেতে বসে ক্লাস শুরু করতে হয় কারন কর্তৃপক্ষ ভেবেছিল  ৫০ জন ছাত্রের বেশি হবে না তাই ৫০ জন ছাত্রের ক্লাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তখন তিন বছরের কোর্স ছিল সে কোর্সে পাস করাদের সার্টিফিকেটে লেখা থাকত লাইন্সেন্ড টু প্র্যাক্টিস মেডিসিন ( LICENSED TO PRACTICE MEDICINE বা LMS )। যা পরবর্তিতে ১৯১৬ সালে লাইসেন্স অফ স্টেট মেডিসিন ফেকাল্টি অফ বেঙ্গল (LICENTIATE OF STATE MEDICINE FACULTY OFBENGAL বা LMF ) ডিগ্রিতে রুমান্তর হয়। আর যারা পাশ করবে তাদের হসপিটাল এসিসট্যান্ট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

সে সময় ঢাকা মেডিকেল স্কুলে পড়ালেখার কাজ চলত বাংলায়। তাহলে তো বাংলা বই ও সাময়িকী দরকার তাই ন ?  কোনো অজুহাত না তুলে শিক্ষকেরাই সেই প্রয়োজনীয়তা পূরণে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সূর্যনারায়ণ ঘোষ, কালীচন্দ্র দত্ত ও দূর্গাদাস রায় উদ্যোগী হয়ে ভিষগ নামে চিকিৎসাবিষয়ক একটি বিজ্ঞান সাময়িকী প্রকাশ করেছিলেন। ঢাকা থেকে ১৮৮০ সালে প্রকাশিত এই সায়মিকীই ছিল আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান-বিষয়ক প্রথম সাময়িকী। বাংলায় চিকিৎসাবিজ্ঞানের বইগুলোর মধ্যে কয়েকটির নাম পাওয়া গেছে। এগুলো হলো কাশীচন্দ্র গুপ্তের অস্ত্র চিকিৎসা, হরিপ্রসাদ চক্রবর্তী রচিত ডাক্তারি অভিধান, সূর্যনারায়ণ ঘোষ প্রণীত অস্ত্র চিকিৎসা, চুনিলাল দাসের নিদান ও রুগ্নদেহ সূক্ষ্মতত্ত্ব ইত্যাদি। এই বইগুলো প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮১ থেকে ১৮৯২ সালের মধ্যে।
ঢাকা মেডিকেল স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম চলেছে বেশ দীর্ঘকাল। 

১৮৯৪ সালে ১ মে স্যার আলফ্রেন্ড ডব্লিউ ক্রফটের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় মেয়েরা প্রথম মেডিকেলে পড়তে আসে। ১৯১০ সালে সর্বপ্রথম তিন সার্টিফিকেট পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হয়।মেডিকেল স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের তিন বার কলকাতায় গিয়ে সার্টিফিকেট পরীক্ষায় অংশ নিতে হত । মূলত এই কষ্টকর নিয়মের জন্যে ১৯৩৮ সালে ঢাকা মেডিকেল স্কুলকে কলেজে রুপান্তরের দাবি উঠে।  তবে পূর্ববঙ্গে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ নিতে নিতে চলে আসে ১৯৩৯ সাল।

মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্যে একজন ছাত্রের বিপরীতে হাসপাতালে ৫টি শয্যা থাকতে হয় । মিটফোর্ড হাসপাতালে তখন ২৫১ বেড এবং সর্বোচ্চ ৩৭৪ বেডে উন্নীত করা যাবে । সার্টফিকেটধারী মেডিকেল এসিস্ট্যান্টদের প্রবল বিরোধীতা মেডিকেল কলেজ স্থাপনে বাঁধা সৃষ্টি হয়। 

এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কাউন্সিল ১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ সরকারের কাছে ঢাকায় একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্থাব পেশ করে। কিন্ত ২য় বিশ্ব যুদ্ধের ডামাডোলে এ প্রস্তাবটি হারিয়ে যায়। ২য় বিশ্ব যুদ্ধের শেষের দিকে আবার মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্থাব আলোর মুখ দেখে। ব্রিটিশ সরকার তখন ঢাকা, করাচী ও মাদ্রাজে (বর্তমানে চেন্নাই) তিনটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। 

ঢাকার নওয়াবপুরের ধনাঢ্য ব্যক্তি জগমোহন পাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে সংশ্লিষ্ট করে একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপনের জন্যে ৪ লাখ টাকা দান করেন । তখনকার উপাচার্য ডঃ রমেশ চন্দ্র মজুমদার একক প্রচেষ্টায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী , স্বাস্থ্যসচিব , সার্জন জেনারেল , বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সকলের সম্মতি আদায় করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিকেল ফ্যাকাল্টি হিসেবে মেডিকেল কলেজ স্থাপনের । ১৯৪৩ সালের ৩ মার্চ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর রাইটার্স বিল্ডিংএর কক্ষে এক কনফারেন্সে ঢাকা মেডিকেল স্কুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে রূপান্তরের ঘোষণা দেয়া হয় ।

এ উপলক্ষে ঢাকার তৎকালীন সিভিল সার্জন ডাঃ মেজর ডব্লিউ জে ভারজিন এবং অত্র অঞ্চলের প্রথিতযশা নাগরিকদের নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়। ডাঃ উইলিয়াম জন ভার্জিন ১৯৮৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৪০ বছরপূর্তি অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণের এক পর্যায়ে বলেন যে ঢাকা মেডিকেল কলেজ স্থাপনের আলোচনা সেরে তৎকালীন ভারতবর্ষের রাজধানী দিল্লী থেকে ফেরার পথে ট্রেনে ডাঃ ভারজিন এবং সেই সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমেশচন্দ্র মজুমদারের মধ্যে আলাপচারিতায় রমেশ চন্দ্র বলেন,

‘মেডিকেল কলেজের জন্য যদি আমার নিজের বাড়ি ছেড়ে দিতে হয় তাও ঢাকায় মেডিকেল কলেজ হবে।’

তাদের প্রস্তাবনার উপর ভিত্তি করেই ১০ জুলাই ১৯৪৬ তারিখে ঢাকা মেডিকেল কলেজ চালু হয়। ক্লাস শুরু হয় ১০ জুলাই তারিখে। এই দিনটিকে তাই ডিএমসি দিবস হিসেবে পালন করা হয়। মিটফোর্ড হাসপাতালের স্থলে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার পুরাতন সেক্রেটারিয়েট বিল্ডিংটিকে ৫০০ শয্যার হাসপাতালে রূপান্তরিত করে এর আশেপাশে ঢাকা মেডিকেল কলেজ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ।

এ দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ স্থাপন হলেও ঢাকা মেডিকেল স্কুলের শিক্ষা কার্যক্রম আগের মতই পূর্বের ক্যাম্পাসে চলতে থাকে। ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত এই প্রতিষ্ঠান থেকে এলএমএফ (লাইসেন্স অব মেডিকেল ফ্যাকাল্টি) সনদ দেওয়া হতো। এরপর বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৬২ সালে স্কুলটিকে কলেজে রুপান্তরিত করে  এমবিবিএস কোর্স চালু করা হয়। যার নামকরণ করা হয় মিডফোর্ড নামে। তবে পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭২ সালে।  নবাব পরিবারের দানশীলতা স্মরণ করে পরিবর্তিতে গভর্নর আবদুল মোনেম খান মেডিকেল কলেজের নাম বদলে রাখেন স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ। আজ অবধি সলিমুল্লাহ কলেজকে মানুষ মিডফোর্ড হাসপাতাল নামেই চিনেই ! 

মেডিকেল কলেজে পথ চলা শুরু

মেডিকেল কলেজ তো স্থাপন হল কার উপর দেওয়া হবে এর গুরুভার ?  মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রাক্কালে কমিটির প্রধান ডব্লিউ যে ভারজিনের উপরই কলেজের দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ডা ভারজিনের স্মৃতি রক্ষার্থে কলেজ ভবন থেকে হাসপাতাল যাবার মধ্যবর্তী ছাউনিঘেরা করিডোরটির নামকরণ করা হয়েছে ‘ভারজিন’স করিডোর’।

সার্জন ডাঃ মেজর ডব্লিউ জে ভারজিন

সার্জন ডাঃ মেজর ডব্লিউ জে ভারজিন

শুরু দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এনাটমি আর ফিজিওলজি বিভাগ ছিল না তাই তাদেরকে মিটফোর্ড মেডিকেল কলেজে ক্লাস করতে যেতে হত। মাত্র একমাস পরে এনাটমি বিভাগে অধ্যাপক পশুপতি বসু ও ফিজিওলজি বিভাগে অধ্যাপক হীরালাল সাহা শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন । তারা যোগদানের পরে হাসপাতালের  ২২ নং ওয়ার্ডে এনাটমি ও ফিজিওলজি বিভাগের ক্লাস শুরু হয়। কারন সে সময় কোন লেকচার গ্যালারি ছিল । পরবর্তিতে ১৯৫৫ সালে কলেজ ভবন স্থাপিত হলে এসব অভাব দূর হয়। 

১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পর কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এক বিরাট সংখ্যক ছাত্র চলে এসে ঢাকা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হয়। একইভাবে অনেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছেড়ে কলকাতা মেডিকেল কলেজে চলে যায়।

রমেশচন্দ্র মজুমদার

রমেশচন্দ্র মজুমদার

দেশভাগের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের দেখা দেয় শিক্ষক সংকট। বেশির ভাগ হিন্দু সম্প্রদায়ের চিকিৎসক ভারতে চলে যান। এনাটমি বিভাগের প্রধান ডা পশুপতি বসু আর ফিজিওলজি বিভাগের প্রধান ডা হীরালাল সেন ভারতে চলে যান। তাদের স্থলাভিষিক্ত হন যথাক্রমে আব্দুর রহমান এবং ডা এম এ করিম। এভাবে অন্যান্য বিভাগেও অনেক শিক্ষক নিযুক্ত হন। 

হাসপাতালের অবকাঠামো ও লোকবল

হাসপাতালের মূল ভবনটি হাসপাতালের ছিল না। নবগঠিত পূর্ববংগ ও আসাম প্রদেশের সচিবালয় হিসেবে  ১৯০৪ সালে  স্থাপিত হয়। সেই ভবটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ১৯২১ সালে দিয়ে দেওয়া হয়। তখন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এটির একটি অংশকে ডরমেটরি ও মেডিক্যাল সেন্টার ,  অন্য অংশে কলা অনুষদের প্রশাসনিক ভবন হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভবটিকে আমেরিয়াকন বেস হাসপাতাল হিসেবে ব্যবহার করা হয় । যুদ্ধে শেষে আমেরিকানরা চলে গেলে এটি ১০০ শয্যার হাসপাতাল হিসেবে থেকে যায়। 

দেশ ভাগের পরে কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে সাময়িক ছাউনি বানিয়ে সেগুলির কয়েকটিতে হাসপাতালের বহির্বিভাগ ও কয়েকটিতে ছাত্রদের হোস্টেল খোলা হয়। অতঃপর পর্যায়ক্রমে ছাত্রাবাস, কলেজ ও হাসপাতালের জন্য নতুন নতুন ভবন নির্মিত হতে থাকে। ১৯৫২ সালে ছাত্রীনিবাস, ১৯৫৪-৫৫ সালে ছাত্রাবাস, ১৯৫৫ সালে অনেকগুলি শিক্ষাভবন, ১৯৭৪-৭৫ সালে ইন্টার্নি ডাক্তারদের হোস্টেল নির্মাণ করা হয়।

প্রথম দিকে ছাত্রীরা বাড়ি থেকেই কলেজ যাতায়াত করতেন। কিন্তু ছাত্রদের থাকার একটা ব্যবস্থা করার প্রয়োজন দেখা ছিল। তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য রমেশ চন্দ্র মজুমদার ছাত্রদের আবাসনের ব্যবস্থা করেন। এ সময় মুসলমান ছাত্ররা সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে, হিন্দু ছাত্ররা ঢাকা হলে (বর্তমানে জগন্নাথ হল), খ্রিস্টান ছাত্ররা সদরঘাটের ব্যাপ্টিস্ট মিশনে থাকত।

আর ছাত্রীরা থাকত নার্সিং হোস্টেলে।  এখন যেখানে বহির্বিভাগ সেখানেই প্রতিষ্ঠা করা হয় প্রথম ছাত্র হোস্টেল। পাকা মেঝে, সারি সারি ঘর, মাঝে চাটাই এর বেড়া। অনেকটা আর্মি ব্যারাকের মত চেহারা। টিনের ছাউনির এই হোস্টেলের ডাকনাম ছিল ‘ব্যারাক হোস্টেল’। এই ব্যারাক হোস্টেলই ছিল ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার। 

 ব্যারাক হোস্টেলই

ব্যারাক হোস্টেলই ছিল ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার

প্রথমদিকে শিক্ষার্থীরা থাকতেন নীলক্ষেত ব্যারাকে। এরপর মেডিকেল কলেজের কাছে ব্যারাক চলে আসে। ব্যারাকের সামনে ছালা আর টিনের রেস্টুরেন্ট। এর ভিতর আলি মিয়ার হোটেল ছিল বিখ্যাত।

ব্যারাক নিয়ে একটি কবিতা প্রচলিত ছিলঃ

‘ব্যারাক ভরা ধূলির আকর
রাজধানী এই ঢাকা শহর
তারই ভিতর আছে যে এক সকল গোয়ালের সেরা
অসুখ দিয়ে ভরা সে যে
ওষুধ দিয়ে ঘেরা।’

১৯৪৭ সালে বর্তমান নার্সিং ইনস্টিটিউটের স্থানে নিজস্ব ছাত্রী হোস্টেল স্থাপিত হয়। । প্রথমে ১১টি, পরে আরো দুই দফায় ৬টি ও ৩টি মোট ২০টি ব্যারাক নির্মিত হয়।

বর্তমানে যে ছাত্রী হলটি ‘ডাঃ মিলন হল’ নামে পরিচিত, তা ১৯৯২ সালের পূর্বে ডাঃ আলীম চৌধুরী হলেরই অংশ ছিল। এ হলে রয়েছে ১১৬টি রুম।

১৯৫৪ সালে ছাত্র হোস্টেল

বকশীবাজার মোড়ে ছাত্রদের জন্যে বর্তমান হলটি নির্মিত হয় ১৯৫০ থেকে ১৯৫৫ সালে। ১৯৭২ সালে যার নামকরণ করা হয় ‘শহীদ ডাঃ ফজলে রাব্বি’র নামে। এই হল এ একটি মূল ভবন ও ৩ টি ব্লকসহ মোট রুম এর সংখ্যা ২২৫ যা MBBS প্রথম বর্ষ থেকে পঞ্চম বর্ষ পর্যন্ত ছাত্রদের জন্য সংরক্ষিত।

প্রতি বছর ২০০ আসন এর বিপরীতে গড়ে ৭৫ জন ছাত্র এই হল এ থাকার অনুমতি পায়। কিন্তু নানান অনিয়ম এর কারনে প্রথম বর্ষের ছাত্রদেরকে গণরুমে থাকতে হয়। আর দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রদেরকে এক রুম এ ৮-১২ জন করে থাকতে হয়। যা বাংলাদেশের প্রথম মেডিকেল কলেজ হিসাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ-এর জন্য একটি লজ্জার বিষয়।

১৯৭৪-৭৫ সালে ইন্টার্নি ডাক্তারদের জন্য শহীদ ডাঃ ফজলে রাব্বি হলের পাশে পৃথক হোস্টেল প্রতিষ্ঠিত হয়, পরবর্তীতে এর নামকরণ করা হয় ‘শহীদ ডাঃ মিলন ইন্টার্নি হোস্টেল’। এর পূর্বে ইন্টার্নি ডাক্তাররা চাঁনখারপুলের কাছে ওল্ড পিজি হোস্টেলে থাকত।

কলেজটিতে বর্তমানে ৫ বছর মেয়াদি এমবিবিএস কোর্সে প্রতি বছর প্রায় ২০০ জন ছাত্র-ছাত্রী ভর্তি করা হয়। বর্তমান শিক্ষার্থী ১০৫০, পোস্ট গ্রাজুয়েশন ৯০০জন। মেডিকেল কলেজটি থেকে এমবিবিএস, এমডি, এমএস, এমফিল/ডিপ্লোমা, এফসিপিএস এই ৫টি কোর্সে পড়াশুনার সুযোগ রয়েছে।

স্নাতকোত্তর পর্যায়ে কোর্স আছে ৩৯ টি। আর স্নাতকোত্তর কোর্সে শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৯০০। কলেজে শিক্ষকের সংখ্যা প্রায় ২০০ জন। বর্তমানে কলেজটির অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্ত্ব পালন করছেন অধ্যাপক ডা. খান আবুল কালাম আজাদ।

মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বর্তমানে ২৫ টি ডিপার্টমেন্ট,৪৮ ইউনিট এবং ৪৫ টি ওয়ার্ড রয়েছে। ৫৬০ জন নার্স এবং স্টাফের সংখ্যা প্রায় ১১৩৭ জন। ওয়ার্ড, ইউনিট এবং কেবিনে বেডের সংখ্যা ১৭০০।

১৯৭৫ সালে এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১০৫০ থেকে ৮০০ তে হ্রাস করা হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময় এই হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ১৭০০ তে উন্নীত করা হলেও সে অনুপাতে অবকাঠামোগত ভৌত সুবিধাদি বৃদ্ধি করা হয় নি। ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর ৬০০ শয্যাবিশিষ্ট ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ২ এর উদ্বোধন করা হয়। 

প্রায় ২৩৪ জন সিনিয়র চিকিৎসকের পাশাপাশি বিভিন্ন স্নাতকোত্তর কোর্সের চিকিৎসকগন এবং কলেজের ইন্টার্ন চিকিৎসকরা চিকিৎসা সেবা প্রদানে নিয়োজিত আছেন। 

মোট এ্যাম্বুলেন্স সংখ্যা ৪ টি। তবে হাসপাতালের নিজস্ব কোন এসি এ্যাম্বুলেন্স নেই। গাড়িতে তাৎক্ষনিক অক্সিজেন সাপোর্ট দেয়ার জন্য অক্সিজেন সিলিন্ডার রয়েছে।

ঢাকার ভিতরে ৩০ কিঃ মিঃ পর্যন্ত সর্বনিম্ন ভাড়া ৩০০ টাকা। ৩০ কিঃ মিঃ অতিক্রম করার পর প্রতি কিঃ মিঃ অনুযায়ী ১০ টাকা চার্জ দিতে হয়। সাধারণত ঢাকার বাইরে তাদের এ্যাম্বুলেন্স যায় না। ঢাকা মেডিকেল থেকে উত্তরা এবং যাত্রাবাড়ীর সানারপাড় পর্যন্ত ৩০০ টাকা। 

এ ছাড়া  ঢাকা মেডিকেল কলেজে রয়েছে পার্কিং সুবিধা, ব্লাড ব্যাংকের সুবিধা, অগ্নি নির্বাপন ব্যবস্থা, প্যাথলজি সুবিধা ইত্যাদি। 

ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ সহ দেশের সংকটে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ভূমিকা

ঢাকা মেডিকেল কলেজ কেবলই একটি চিকিৎসা বিদ্যাপীঠ নয়। এদেশের গৌরবময় ইতিহাসের অংশও এই প্রতিষ্ঠান। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে জাগ্রত ছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজ। 

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেরই একটা অংশে ছিল তখনকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস বিল্ডিং। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ১৪৪ ধারা ভঙ্গের সিদ্ধান্ত হয় ওই প্রাঙ্গনেই। ভাষা আন্দোলনের গৌরবময় ইতিহাসের সাথে মিশে আছে ঢাকা মেডিকেল কলেজর শিক্ষার্থীদের নাম।

১৯৪৮ এর মার্চ মাসে রমনার রেসকোর্সে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ যেদিন ঘোষণা দেন, ‘উর্দু, শুধু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা’ সেদিন বিক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজই ক্ষোভে উত্তাল হয়েছিল সারা দেশের ছাত্র সমাজ প্রতিবাদে ফেটে পড়ে ।

‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ স্লোগানে মুখরিত প্রতিবাদী যুবকদের প্রতিহত করতে সে সময় পাকিস্থানি শাসক গুষ্টি লাঠিচার্জ, কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে । একই সাথে  বিপ্লবী ছাত্রদের গ্রেফতার অভিযান চালায়।  অনেকের সাথে সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র এম আই চৌধুরী, আবু সিদ্দিক, আলী আসগর, জসিমুল হক ও ফরিদুল হক কারাবরণ করেন।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই ঢাকা শহরের সকল ছাত্ররা মেডিকেল কলজের হোস্টেলের সামনে সমবেত হতে তাকে।  তাদের উদ্দেশ্য ছিল পূর্ব পাকিস্তানের সংসদ ভবন অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করার- কারণ তখন সংসদ অধিবেশন চলছিল। পুলিশ প্রহরা আর ১৪৪ ধারা জারি থাকায় মিছিল করা সম্ভব হচিল না। কিন্ত অকুতোভয় ছাত্ররা বিকাল ৪ টার দিকে ঐতিহাসিক আমতলায়  (যা বর্তমান জরুরি বিভাগের পাশে অবস্থিত ছিল)  থেকে ১৪৪ ধার ভঙ্গ করে মিছিল বের করে। 

ঐতিহাসিক আমতলা

ছাত্রদের নিরস্ত্র শান্তিপূর্ণ মিছিলে খাজা নাজিমুদ্দিনের পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায় । মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে সালাম , বরক্ত, রফিক , জব্বার ও শফিউর সহ নাম না জানা অনেকে। অনেকের সাথে সেদিন ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র এম আই চৌধুরী, আবু সিদ্দিক, আলী আসগর, জসিমুল হক ও ফরিদুল হক কারাবরণ করেন। ২০ নং ব্যারাকের পাশেই এক অনামী শহীদের লাশ পড়েছিল সেদিন। ভাষা আন্দোলনের এই গৌরবময় স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই ১২নং ব্যারাকের পাশে রাতারাতি শহীদ মিনার নির্মিত হয়। এর মূল উদ্যোক্তারা ছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজেরই ছাত্র।

একুশে ফেব্রুয়ারি সূর্যাস্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা সিদ্ধান্ত নেয় শহীদদের রক্তরঞ্জিত স্থানে একটি মিনার স্থাপন করার। ১২ নং ব্যরাকের ৬নং রুম ও হোস্টেলের পূর্ব পাশের গেটের মধ্যবর্তী এক জায়গায় মিনারটি ২২শে ফ্রেব্রুয়ারি ও ২৩শে ফেব্রুয়ারি রাতভর কাজ করে গড়ে তোলে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা। আর এ জন্য হাসপাতালের নির্মাণ কাজের জন্য সংরক্ষিত ইট, বালু ও সিমেন্ট ব্যবহৃত হয়।

প্রথম গড়া শহীদ মিনারটির বেদী ছিল ছয় বর্গফুট এবং উচ্চতায় দেড় ফুট। বেদী থেকে একটি কলাম গোড়া থেকে শীর্ষ পর্যন্ত সরু হয়ে উঠে গিয়েছিল। যা গোড়ায় ছিল চার বর্গফুট এবং শীর্ষে দুই বর্গফুট। পুরো মিনারটির উচ্চতা ছিল ১৪-১৫ ফুট। 

ভাষা আন্দোলন পরবর্তী সময়ে নানা আন্দোলনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের অনেক অবদান রয়েছে। ১৯৬২ সালে সামরিক শাসন ও হামিদুর রহমান শিক্ষা কমিশন বিরোধী আন্দোলনে মেডিকেল কলেজ ও ছাত্রাবাস শুধুমাত্র তৎকালীন ছাত্রনেতাদের নিরাপদ আশ্রয়স'ল বা সভার স্থানই ছিল না, এই কলেজের অনেক ছাত্র জীবনের ঝুঁকি নিয়ে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নিতেন।

১৯৬৯ সালের ২০ জানুয়ারি ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিল শুরু হলে পুলিশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান জরুরি বিভাগের কাছে মিছিলে প্রথমে লাঠিচার্জ ও পরে গুলিবর্ষণ করে। পুলিশের গুলিতে ছাত্রনেতা আসাদুজ্জামান গুরুতর আহত হলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয় কিন্তু চিকিৎসা শুরুর পূর্বে তিনি বর্তমান ৮ নং ওয়ার্ডে মারা যান। মেডিকেল কলেজের ছাত্ররা শহীদ আসাদুজ্জামানের রক্তমাখা শার্ট নিয়ে প্রথম শোক মিছিল বের করে। 

মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলে তখন ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসক, তৎকালীন ছাত্র সমাজ, হাসপাতালে কর্মরত নার্স, কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণের উল্লেখযোগ্য অবদান রাখেন। কেউ অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন । কেউ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হাসপাতালে মুক্তিযোদ্ধা ও অসহায় বাংগালীদের চিকিৎসা করেছেন। কেউ বা মুক্তি যুদ্ধা ক্যাম্প বা অন্যন্য হাসপাতালে  যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করেছেন। 

একাত্তরেরর মুক্তিযুদ্ধেও ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী এবং হাসপাতালের চিকিৎসকদের আত্মত্যাগ ছিল।এই কলেজের তৎকালীন ছাত্রদের মধ্যে বিভিন্ন সেক্টরে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেন, সেলিম আহমেদ, আলী হাফিজ সেলিম, আবু ইউসুফ মিয়া, ইকবাল আহমেদ ফারুক, মুজিবুল হক, মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, মোজাফ্ফর, আমজাদ হোসেন, ওয়ালী, ওসমান, গোলাম কবীর, জিল্লুর রহিম, ডালু, নুরুজ্জামান, শাহাদত প্রমুখ মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী নিপা লাহিড়ী শহীদ হন মুক্তিযুদ্ধে। কে ২৬ ব্যাচের ছাত্র সিরাজুল ইসলাম হাসপাতালে বিভিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করেতেন। তিনি রাতে হোস্টেলে না গিয়ে হাসপাতালের ক্যান্সার ওয়ার্ডে ঘুমাতেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের কিছু স্বাধীনতা বিরোধী ছাত্রের সহায়তায় তাঁকে ১১ ডিসেম্বর রাতে রাজাকার বাহিনী ক্যান্সার ওয়ার্ড থেকে তুলে নিয়ে যায় এবং রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে নির্মমভাবে হত্যা করে।

ডা. মোঃ ফজলে রাব্বি

ডা. মোঃ ফজলে রাব্বি

এদের অনেকেই ঢাকা শহর কমান্ডের তত্ত্বাবধানে থেকে যুদ্ধে করেছেন। মুক্তিযুদ্ধে শহীদ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে পাস করা চিকিৎসক, তৎকালীন ছাত্রছাত্রী এবং এ কলেজে কর্মরত চিকিৎসকদের মধ্যে ছিলেন ডা. মোঃ ফজলে রাব্বি, ডা. আবদুল আলীম চৌধুরী, ডা. সামসুদ্দিন আহমেদ, ডা. গোলাম মর্তুজা, ডা. আবদুল জব্বার, ডা. নরেন ঘোষ, ডা. মফিজ উদ্দিন খান, ডা. গোপাল চন্দ্র সাহা, ডা. লে. ক. এনএএম জাহাঙ্গীর এএমসি, ডা. মেজর একেএম আসাদুল হক এএমসি, ডা. লে. মোঃ আমিনুল হক এএমসি, মোঃ সিরাজুল ইসলাম (ছাত্র), মোঃ হাসান শহিদ (ছাত্র) প্রমুখ।

ডাক্তাররা এরশাদ সরকার ঘোষিত গণবিরোধী স্বাস্থ্যনীতির বিরুদ্ধে বিএমএর ব্যানারে ডাক্তাররা ১৯৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ২৭ নভেম্বর পিজি হাসপাতালে বিএমএর এমনই একটি সভায় অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে যাবার পথে এরশাদ সরকারের ভাড়াটিয়া গুণ্ডাবাহিনীর গুলিতে শহীদ হন ঢাকা মেডিকেল কলেজের কে-৩৪ ব্যাচের ছাত্র, ফিজিওলজি বিভাগের প্রভাষক ডাঃ শামসুল আলম খান মিলন।

মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে নির্মিত স্মৃতি ফলক

পরিচিত মুখ

সহশিক্ষা কার্যক্রমে ঢাকা মেডিকেল কলেজের রয়েছে সাফল্যগাথা। ১৯৪৭ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফুটবল দল তারুবালা শিল্ডে চ্যাম্পিয়ন হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্রসংসদের ক্রীড়া সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম দামাল ১৯৪৯ সালে পাকিস্তান এ ক্রিকেট দলে সুযোগ পান ওপেনিং ব্যাটসম্যান হিসেবে। ১৯৬২-৬৩ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্রিকেটদল ঢাকা বিভাগে চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করে। কুইজ এবং বিতর্ক প্রতিযোগিতাগুলোতেও এই প্রতিষ্ঠানের সাফল্য অনেক।

পঞ্চাশের দশকের জনপ্রিয় রবিন্দ্রসংগীত শিল্পী শাহজাহান হাফিজ ছিলেন এই প্রতিষ্ঠানের ছাত্র।  এই মেডিকেল কলেজ থেকেই জন্ম হয়েছে সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী ডা দিপু মণি, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী ডা আফম রুহুল হকসহ অনেকের। এই মেডিকেল কলেজ জন্ম দিয়েছে ডা মির্জা মাজহারুল ইসলাম, ডা দ্বীন মোহাম্মদ, ডা আজিজুল কাহার, ডা মারগুব হোসেনের মত কিংবদন্তী ডাক্তার যারা দেশের সীমানা পেরিয়ে বিদেশেও সমাদৃত ।

বর্তমানে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ

অতিতের গৌরবৌজ্জল ঢাকা মেডিকেল আজও সগর্বে তার স্থান দখল করে আছে । লাদেশের যে কোন লোক অসুস্থ হলে তার আত্মীয়-স্বজন প্রথমেই যে মেডিকেল কলেজের কথা মনে আনে তার নাম ঢাকা মেডিকেল। যদিও চিকিৎসা সেবার মান ভয়াবহ অবস্থায় ঠেকেছে। বরাদ্দ খুব একটা কম না থাকলে কেউ জানে কোথায় যায় এ বরাদ্দ। সেই ১৯৪৬ সালে জন্ম নিয়ে আজ ২০০৭ এ সে এক পূর্ণাঙ্গ নারীর মত যৌবনবর্তী। অথচ পুরোপুরি রোগাক্রান্ত।

গ্লোবালাইজেশনের প্রভাব পড়েছে মেডিকেল কলেজেও। সবাই বাণিজ্যে লিপ্ত বাদ নেই ডাক্তারাও ।  প্রচুর ক্লিনিক ও বেসরকারী হাসপাতাল এর জন্য দায়ী। সরকারী হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে রোগী এবং তার আত্মীয়-স্বজনদরা পড়ছেন নানা অনিয়মে। সাথে আছে ডাক্তার আর হাসপাতালের কর্মচারীদের সৈরাচারী দুর্ব্যবহার। 

এ হাসপাতালে বর্তমানে ১৭৫০ জন রোগী ভর্তির ব্যবস্থা আছে। এছাড়া ১৪০টি পেইং বেড আছে। যা দৈনিক ভাড়া ৭২.৫০ টাকা। ১৬৪টি ক্যাবিন আছে। যথাক্রমে ভাড়া রোগী প্রতি ১৪৫/-, ১৫৫/-, ২৬৫/-, ৫১৫/-, ৬১৫/- প্রতিদিন। কিন্ত সেসব বেড পাওয়া সোনার হরিণ পাওয়া একই কথা। হাসপাতালের ঝাড়ুদার থেকে শুরু করে উপরের লেভেল পর্যন্ত একটা সিন্ডিকেট হিসেবে কাজ করে।  

সবচেয়ে দুর্ভোগ পোহায় সাধারণ অর্থাৎ ফ্রি বেডের রোগীরা। তাদের দেখার যেন কেউই নেই। আর একেকজন রোগীর সাথে কয়েক জন করে আত্মীয় স্বজন। এতে যে হাসপাতালের হাইজিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে বা এরা রোগী হয়ে যাচ্ছে তা এরা বুঝতে রাজি নন। কেননা তারা মনে করে এরা না থাকলে রোগীরা অসহায়। আসলেই তাই সিন্ডিকেট গ্রুপের কাছে যে সবাই অসহায়। কারণও আছে। হাসপাতালের নিচ থেকে ওপর পর্যন্ত কেউই বিনা পয়সায় বা বকশিশে সেবা দিতে নারাজ। 

হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ আছে, মাথাভারী প্রশাসন আছে, আছে নার্স, ডাক্তার, আছে পরিচালক সবই আছে। নেই শুধু কন্ট্রোলিং প্যানেল। তবুও মানানসই কেউ টা-টু শব্দ করে না। একেকটা ওয়ার্ড যেন সিনেমার হল অথবা বাস বা লঞ্চ টার্মিনাল। ঢোকার মুখে ডিউটিরত ডাক্তারদের চেয়ার, নার্সদের টেবিল। অথচ তাদের টিকিটিও দেখা যায় না। 

আবার হাসপালের কর্মচারীরা কেউ কলিগদের সাথে ব্যস্ত এদিকে রোগি মারা যাচ্ছে সে দিকে নজর নাই, কেউ ডাকতে আসলে ধমকের উপর ধমক। কেউ আবার আছে পলিটিক্সে ব্যস্ত কেউ বা মুরগি ধরা আই মিন রোগি ধরে উপরে আয়ে ব্যস্ত। 

তবে সবাই যে খারাপ না নয় কেউ কেউ সেবার মানষিকতা নিয়ে আছে কিন্ত অতিরিক্ত রোগির চাপ দালাল এবং সিন্ডিকেটের কাছে এরা অসহায়। সিন্ডিকেটের কল্যাণে দেখা যায় ডাক্তার থেকে ওয়ার্ড বয়ের ক্ষমতা বেশি । চিন্তা করা যায় ? 

ধরুন আপনার টয়লেটে যেতে হবে। টয়লেটে যেয়ে মনে হবে আপনি ভয়াবহ কোন বিপদে পড়ে গেছেন।  বাথরুমের পানি এবং বিষ্ঠায় সয়লাব। পায়খানার দরজা ভাঙ্গা। পানির ট্যাপ নাই পানি পড়ছে। বিতিকিচ্ছিরি অবস্থা। সম্রাট শাহজাহান যদি দেখত আমার মনে হয় তাজমহল না বানিয়ে পুরু টাকা শুধুমাত্র টয়লেট বানানোতে ব্যয় করত ! 

কাগজে কলে মেথর বা ওয়ার্ড বয় থাকলেও আপনি হয়ত তাদের খুজেই পাবেন না। তারা উপরি আয়ে ব্যস্ত। ওয়ার্ড মাস্টার থাকলেও উনি অনৈতিক কাজ দেখে না দেখার বান করবেন। কেননা তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণির ইউনিয়ন তাকে গতিচ্যুত করবেন বা ঠাডা মাইর দিবে। সরকারী কর্মকর্তা আর কর্মচারীদের বদলী হয় হর হামেশাই । কিন্ত ঢাকা মেডিকেলে এখন এমন অনেক কর্মচারী/ ডাক্তার আছেন যারা চাকরি নিয়ে এখান থেকেই অবসর নিয়েছেন।

আমাদের দেশ ছাড়া বিশ্বে আর কোথাও হয়ত মেডিকেলের আশেপাশে ওষুধের দোকান থাকে না। এই দেশে আছে। শুধু তাই নয়, কোন হাসপাতালের চতুর্পাশে এত দোকানপাটের প্রাচুর্যতা দেখা যাবে না। ফল, মূল, রুটি, বিস্কুট, চা, পান, সিগারেট থেকে শুরু করে নানাবিধ পণ্যের সম্ভার কি নেই এখানে ?  খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, এগুলো চালায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীরা। তাই হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা স্বাস্থ্য বিভাগের বাপেরও সাধ্য নেই এদের কিছু বলে। 

সরকারী হাসপাতালের মূল জিনিস হল বিনামুল্যে ঔষধ। বলছি না সব ওষধ পেতে হবে। এখানে আপনি প্যারাসিটামল আর মেট্রোনিডাজল ছাড়া অন্য কোন ঔষধ যদি পান তাহলে ধরে নিন আপনি সেরা ভাগ্যবানদের একজন। 

হাসপাতালের খাবারের মান নিয়ে আর সামনে না যাই। হতে পারে হাসপাতালের খাবার খেয়ে আপনি উলটা হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছে। রোগীর আর রোগির আত্মীয় স্বজনের অভিযোগ আর অভিযোগ। হ্যাঁ অভিযোগগুলোর বেশিরভাগ যৌক্তি হলেও শোনার বা দেখার মত কেউ নাই।

সার কথা

বর্তমান যে অবস্থা হয়ত অভিযোগ করতে থাকলে তার অন্ত থাকবে না। এর পরেও তারা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অসীম অবদান রেখে যাচ্ছে। দেশ সেরা ছাত্রদের পদচারনায় আজও এ মেডিক্যাল কলেজ মুখরিত। ৫/৬ বছর অধ্যবসায় করে তাদের পাশ হয়ে বের হতে হচ্ছে। এনাটমির সাথে তাদের নৈতিকতা'র আরো অধিক শিক্ষা যদি দেওয়া যেত খুব ভাল হত। দররকার কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণে আনা। দেশ সেরা এ মেডিকেল কলেজ আবার তার পূর্বের গৌরবে ফিরবে সেই প্রত্যাশার রইল। 

তথ্যঃ উকিপিডিয়া, বাংলাপিডিয়া, প্লাটফর্ম_মেডি, মেডিভয়েজবিডি, প্রথম আলো, দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা মেডিকেল কলেজ ওয়েবসাইট। 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক