থ্যালাসেমিয়া কি ? থ্যালাসেমিয়া কেন হয় ও প্রতিকার

থ্যালাসেমিয়া কারো কাছে এই রোগটি হয়ত পরিচিত আবার কেউ কেউ এই নামটিই বোধ হয় না শুনে থাকতে পারেন। তবে সবাই এই রোগ সম্পর্কে জ্ঞাত। যারা থ্যালাসেমিয়া হিসেবে চিনেন না তারা হয়ত রক্ত স্বল্পতা নামে একটি অসুখ আছে সে হিসেবে চিনতে পারেন।  পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লাখ শিশু এ রোগ নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। বাংলাদেশে প্রায় ২০ হাজার শিশু এ রোগটিতে ভুগছে এবং প্রতি বছর ছয় হাজার শিশু এর জিন নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে।

আবার বাংলাদেশে, দেশে প্রতিবছর প্রায় আট হাজার শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্ম নিচ্ছে। সারাদেশে এ রোগে আক্রান্ত সাড়ে তিন লাখেরও বেশি শিশু। দেশে দেড় কোটিরও বেশি মানুষ এ রোগের জীবাণু বহন করছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪ দশমিক ১ ভাগ মানুষ ‘বিটা থ্যালাসেমিয়া’র বাহক !

থ্যালাসেমিয়া কী?

থ্যালাসেমিয়া (Thalassemia) রক্তের একটি রোগ যা সাধারনত বংশগতভাবে ছড়ায়।  এ রোগ পিতা মাতার কাছ থেকে ত্রুটিপূর্ণ জিনের মাধ্যমে সন্তানের শরীরে আসে। বিষয়টি কেমন ? ওকে চলুন জেনে আসা যাকঃ

হিমোগ্লোবিন রক্তের খুবই গুরত্বপূর্ণ উপাদান। । এটি রক্তের একটি বিশেষ রঞ্জক পদার্থ যা শরীরের বিভিন্ন অংশে অক্সিজেন পরিবহন করে। আমরা নিশ্বাসের সঙ্গে যে অক্সিজেন বহন করি, হিমোগ্লোবিনের কাজ হলো তা শরীরের সমস্ত অংশে বহন করে নিয়ে যাওয়া। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর রক্তে অক্সিজেন পরিবহনকারী হিমোগ্লোবিনের উপস্থিতি কম থাকে।

হিমোগ্লোবিন তৈরী হয় দুটি আলফা প্রোটিন ও দুটি বিটা প্রোটিন দিয়ে। যদি এই প্রোটিন গুলোর উৎপাদন শরীরে কমে যায়, তবে শরীরের হিমোগ্লোবিনের উৎপাদনও কমে যায় এবং থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। আলফা ও বিটা প্রোটিন তৈরী হয় জীন হতে। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়।

কেউ যখন কোন ত্রুটিপূর্ণ জীন তার বাবা-মায়ের কাছ হতে বংশানুক্রমে পায়, তখনই মূলত থ্যালাসেমিয়া দেখা দেয়। তবে  পিতা মাতার একজন বাহক হলে এবং অন্যজন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষ হলে সন্তানদের থ্যালাসেমিয়া হবার সম্ভাবনা কম।

থ্যালাসেমিয়া ধারণকারী মানুষ সাধারণত রক্তে অক্সিজেন স্বল্পতা বা “অ্যানিমিয়া”তে ভুগে থাকেন। অ্যানিমিয়ার ফলে অবসাদগ্রস্ততা থেকে শুরু করে কারো কারো অঙ্গহানি পর্যন্ত ঘটে থাকে ।  প্রতিবছর পৃথিবীতে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে।

থ্যালাসেমিয়ার প্রকারভেদ

তীব্রতা অনুসারে রোগ মাত্রা অনুযায়ী মৃদু, মাঝারি বা তীব্র এভাবে তিন ধরনের হতে পারে। বেশির ভাগ তীব্র থ্যালাসেমিয়া রোগী ভীষণ রক্তস্বল্পতায় ভোগে এবং এদের প্রতি দুই চার সপ্তাহ পর পর নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। কারো কারো ক্ষেত্রে কিছুই দরকার হয় না। আবার, একদল আছে এ দুইয়ের মাঝামাঝি, অর্থাৎ এদের মাঝে মাঝে রক্ত দিতে হয়।

একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইন থাকে, যথাক্রমে—হিমোগ্লোবিন-আলফা এবং হিমোগ্লোবিন-বিটা। যদি আলফা চেইনে কোনো সমস্যা হয় তখন তাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া।

আর যদি বিটা চেইনে কোনো সমস্যা হয় তখন তাকে বলে বিটা থ্যালাসেমিয়া। দুই গ্রুপের হিমোগ্লোবিন চেইনের সংশ্লেষণ মূলত জেনেটিক্যালি নিয়ন্ত্রিত হয়।  জিনগত ত্রুটি বিবেচনায় এ রোগ দুইটি প্রধান ধরনের হতে পারে-

০১। আলফা থ্যালাসেমিয়া (Alpha-thalassemia) : চারটি জিন দিয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়া ধারা (Chain) গঠিত হয়।  সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া বিটা থ্যালাসেমিয়া থেকে কম তীব্র । আলফা থ্যালাসেমিয়াবিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়।

প্রত্যেক মানুষ বাবা-মা কাছ থেকে দুটি করে এই জিন পায় । প্রাপ্ত জিনগুলোর মধ্যে এক বা তার অধিক ত্রুটিপূর্ণ হলে Alpha-thalassemia হয়। যত বেশি জিন ত্রুটিপূর্ণ হবে তত বেশি মারাত্মক সমস্যা দেখা দিবে। সাধারনত

একটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে থ্যালাসেমিয়ার কোন লক্ষণ ও উপসর্গ দেখা যাবে না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির মাধ্যমে তার সন্তানের মধ্যে এই রোগ ছড়াবে।

দুইটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে হালকা উপসর্গ দেখা যাবে। এই অবস্থাকে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মাইনর (Alpha-thalassemia minor) অথবা, আলফা থ্যালাসেমিয়া ট্রেইট ( Alpha-thalassemia trait) অথবা, কুলিস এ্যানিমিয়া (Cooley’s anemia)।

তিনটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে এর উপসর্গগুলো মাঝারি থেকে মারাত্মক আকার ধারণ করে। এই অবস্থাকে বলে হিমোগ্লোবিন এইচ ডিজিজ।

চারটি জিন ত্রুটিপূর্ণ হলে একে বলে আলফা থ্যালাসেমিয়া মেজর (Alpha thalassemia major) অথবা হাইড্রপস ফিটেইলস (Hydrops fetalis)। এর ফলে প্রসবের (delivery) পূর্বে অথবা জিনের পরপর ভ্রূণ নষ্ট হয়ে যায়। নবজাতক যেসব শিশুর এই সমস্যা থাকে তারা জন্মের সময় বেশ স্বাস্থ্যবান থাকে। তবে জন্মের প্রথম দুই বছরের মধ্যেই এর উপসর্গ দেখা যায়।

০২। বিটা থ্যালাসেমিয়া (Beta-thalassemia) : Beta-thalassemia ধারা (Chain) গঠিত হয় দুইটি জিন দিয়ে। বাবা-মা প্রত্যেকের কাছ থেকে একটি করে মোট দুইটি জিন আমরা পেয়ে থাকি। একটি অথবা উভয় জিনই ত্রুটিপূর্ণ হলে Beta-thalassemia দেখা দেয়।

সাধারণভাবে আলফা থ্যালাসেমিয়া কম তীব্র। আলফা থ্যালাসেমিয়া বিশিষ্ট ব্যক্তির ক্ষেত্রে রোগের উপসর্গ মৃদু বা মাঝারি প্রকৃতির হয়। অন্যদিকে বিটা থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে রোগের তীব্রতা বা প্রকোপ অনেক বেশি; এক-দুই বছরের শিশুর ক্ষেত্রে ঠিকমত চিকিত্সা না করলে এটি শিশুর মৃত্যুর কারণ হতে পারে। তবে বিশ্বে বিটা থ্যালাসেমিয়ার চেয়ে আলফা থ্যালাসেমিয়ার প্রাদুর্ভাব বেশি।

এ রোগীর  হিমোগ্লোবিনের বিটা চেইন তৈরিতে সমস্যা হয়। তবে হিমোগ্লোবিনের কোনো নির্দিষ্ট চেইন তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় দুটি জিনের মধ্যে একটিতে যদি কারও সমস্যা হয়, তাহলে এ রোগে আক্রান্ত হবেন না। কিন্তু হবেন এ রোগের একজন বাহক। এ রোগের বাহকদের সাধারণত তেমন কোনো সমস্যা থাকে না। তবে একজন বাহক যদি পরবর্তীকালে অন্য একজন থ্যালাসেমিয়া বাহকের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন, তবে তাদের সন্তানরা এ রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা প্রবল।

বিশ্বের আনুমানিক ৬০-৮০ মিলিওন মানুষ বিটা থ্যালাসেমিয়ার জিন বহন করছে। আলফা থ্যালাসেমিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও চীনের সর্বত্র এবং কখনও কখনও ভূমধ্যসাগরীয় ও মধ্যপ্রাচ্যের লোকদের মধ্যে দেখতে পাওয়া যায়। তবে  থ্যালাসেমিয়া স্বল্প উন্নত দেশ যেমন নেপাল,বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে বেশি দেখা যায়।

প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ১ লক্ষ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। আশঙ্কা করা হচ্ছে,আগামী ৫০ বছরে থ্যালাসেমিয়া অনেক বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়াবে।

থ্যালাসেমিয়া কেন হয়?

মানুষের রক্তের লোহিত কণিকার আয়ু হল তিন মাস। অস্থিমজ্জায় অনবরত লোহিত কণিকা তৈরি হচ্ছে এবং প্রতি তিন মাস পর পরই প্লীহা-এ লোহিত কণিকাকে  রক্ত থেকে বের করে দিচ্ছে । থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের ক্ষেত্রে এই লোহিত কণিকার আয়ুষ্কাল অনেক কমে যায়। তাদের হিমোগ্লোবিন ঠিকমতো তৈরি না হওয়ায় লোহিত কণিকাগুলো সহজেই ভেঙে যায়। যে হারে কণিকাগুলো ভেঙ্গে কমে যায়  সেই হারে  অস্থিমজ্জার পক্ষে লোহিত কণিকা তৈরি করা সম্ভব হয়ে ওঠে না, ফলে আয়রন বের হয়ে আসে।

এদিকে থ্যালামেশিয়া আক্রান্ত রোগীকে  নিয়মিতভাবে রক্ত গ্রহণ করতে  হয় বলে তাদের রক্তে আয়রনের পরিমাণ ধীরে ধীরে বেড়ে যায়। ফলে একদিকে যেমন রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্লীহা আয়তনে বড় হতে থাকে। পরবর্তী সময়ে অতিরিক্ত আয়রণ জমা হওয়ার কারণে মস্তিষ্কও, হৃদপিন্ড, প্যানক্রিয়াস, যকৃত, অন্ডকোষ ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়।

থ্যালাসেমিয়া কিভাবে হয়?

থ্যালাসেমিয়া বহনকারী অর্থাৎ বাহক আর রোগী একই কথা নয়। থ্যালাসেমিয়ার একজন বাহক অন্য আরেক বাহকের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হলে তাদের সন্তানের মাঝে থ্যালাসেমিয়া রোগ দেখা দিতে পারে। তাদের জন্ম দেওয়া ২৫% সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগী, ৫০% থ্যালাসেমিয়া বাহক ও বাকি ২৫% স্বাভাবিক শিশু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

উল্লেখ্য এ ক্ষেত্রে মনে রাখা প্রয়োজন যে,  স্বামী-স্ত্রীর ব্লাড গ্রুপের মিল বা অমিলের সঙ্গে থ্যালাসেমিয়া রোগের কোনো সম্পর্ক নেই। তাই বিয়ের আগে রক্ত পরীক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। এতে আপনার অনাগত সন্তানের থ্যালাসেমিয়া হবার ঝুকি এড়ানো যায়। দুইজন বাহকের মধ্যে বিবাহের মাধ্যম ব্যতীত থ্যালাসেমিয়া হওয়ার কোনো পথ নেই।

থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীর সঙ্গে ওঠা-বসা করলে বা একই থালা গ্লাসে খেলেও থ্যালাসেমিয়া হয় না। মানে থ্যালামেশিয়া কোন ছুঁয়াচে রোগ নয়।  এটি একটি জন্মগত রোগ, তাই অন্য কোন রোগের কারণে এই রোগের উৎপত্তি হয় না।

থ্যালাসেমিয়া রোগের লক্ষন

থ্যালাসেমিয়া মাইনরে সামান্য অ্যানিমিয়া বা রক্তস্বল্পতা ছাড়া সাধারণত বড় কোনো উপসর্গ থাকে না। থ্যালাসেমিয়া মেজরে সাধারণত শিশুর জন্মের দুই বছরের মধ্যে উপসর্গসহ স্পষ্ট হয়। থ্যালাসেমিয়া রোগের ধরণ এবং এর তীব্রতার উপর ভিত্তি করে এর উপসর্গগুলোও ভিন্ন হতে পারে। তবে থ্যালাসেমিয়া হলে সাধারনত কিছু লক্ষন দেখে অনুমান করা যায়। উপসর্গের মধ্যে আছে-

  • অতিরিক্ত কান্নাকাটি করা
  • ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া
  •  অল্পতেই হাঁপিয়ে যাওয়া
  • মুখের হাড়ের বিকৃতি
  • সংক্রামক রোগে বেশি আক্রান্ত হওয়া
  • হৃৎপিণ্ডে সমস্যা
  • অস্বাভাবিক অস্থি
  • ক্ষুধামান্দ্য বা খেতে অনীহা
  • শারীরিক বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া
  • ত্বক হলদে হয়ে যাওয়া বা জন্ডিস
  • প্লীহাস্ফীতি/ পেট বাইরের দিকে প্রসারিত হওয়া বা পেট ফুলে যাওয়া ইত্যাদি।

অনেক সময় এই লক্ষণ এত বেশি থাকে যে শিশুকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়।

আলফা থ্যালাসেমিয়ায় শরীরের হাড়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ফলে সহজেই হাড় ভেঙে যায়, সঙ্গে রক্তস্বল্পতা, জন্ডিস, প্লীহাস্ফীতি ও অপুষ্টি থাকে। আলফা থ্যালাসেমিয়ার একটি খারাপ ধরন হলো, হাইড্রপস ফিট্যালিস। এ ক্ষেত্রে শিশু জন্মের আগেই অথবা জন্মের কিছু পরেই মৃত্যুবরণ করে।

থ্যালাসেমিয়া রোগীকে নিয়মিত রক্ত দিতে হয়। এতে আবার কিছু প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। অতিরিক্ত আয়রন বা লোহা শরীরে জমা হয়ে হৃৎপিণ্ড, লিভার ও অনালগ্রন্থিতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। রোগী থাইরয়েড হরমোনজনিত অসুখ, ডায়াবেটিস, অ্যাড্রেনাল ও পিটুইটারি হরমোনজনিত অসুখে আক্রান্ত হতে পারে।

থ্যালাসেমিয়ার ভয়াবহতাঃ

থ্যালাসেমিয়ার রোগীকে বাঁচিয়ে রাখতে দিনের পর দিন রক্ত দিয়ে যেতে হয়। সারা বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় নয় লাখ শিশু থ্যালাসেমিয়া নিয়ে জন্মগ্রহণ করছে। বাংলাদেশে এর সংখ্যা হচ্ছে আনুমানিক ১০ হাজার। এসব শিশুর অধিকাংশই বেঁচে থাকে রক্ত পরিসঞ্চালনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে। রক্ত না নিয়ে যেমন এরা বেঁচে থাকতে পারে না একসমুদ্র রক্ত দিলেও যেন এই রোগীর তৃষ্ণা মিটে না।

একদিকে যেমন রক্তশূন্যতা সৃষ্টি হয়, অন্যদিকে প্লীহা আয়তনে বড় হতে থাকে, এর পর আস্তে আস্তে লিভার বড় হয়। রোগী ধীরে ধীরে শ্বাসকষ্টে ভুগতে শুরু করে, সঙ্গে ক্ষুদামন্দা উল্লেখযোগ্য। এ সময় রোগীর শারীরিক অবস্থার উন্নতির জন্য তার শরীরে রক্ত দেয়া শুরু হয়। নিয়মিত রক্ত না দিলে শিশুটি স্বাভাবিক চলাফেরা করতে পারে না। আমাদের শরীর দৈনিক মাত্র ১ (এক) মিলিগ্রাম আয়রণ পরিত্যাগ করতে পারে।

কিন্ত এক ইউনিট রক্তে প্রায় ২৫০ ইউনিট আয়রণ থাকে, ফলে ধীরে ধীরে শরীরে অতিরিক্ত আয়রণ জমতে থাকে। এই অতিরিক্ত আয়রণ জমা হয়ে হার্ট, প্যানক্রিয়াস, লিভার, থাইরয়েড, পিটুইটারি, আড্রেনাল গ্লান্ড, টেস্টিস, ওভারি ইত্যাদি অঙ্গের কার্যক্ষমতাকে নষ্ট করে দেয়।

বার বার রক্ত সঞ্চালনের কারণে থ্যালাসেমিয়ার রোগীদের রক্ত বাহিত বিভিন্ন রোগ যেমন-হেপাটাইটিস বি, হেপাটাইটিস সি, ম্যালারিয়া, সিফিলিস, এইডস ইত্যাদি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে পারে। অস্থিমজ্জা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায় এবং এতে হাড় পাতলা ও ভঙ্গুর হয়ে যেতে পারে। এছারাও এই রোগীকে প্রচন্ড সাবধানে চলাফেরা করতে হয় নয়ত যে কোন মুহুর্তে অন্য যে কোন রোগের জীবানু দ্বারা আক্রান্ত হয়ে যেতে পারে।  এই আয়রন নিয়ন্ত্রনের জন্য প্রয়োজন হয় ব্যয়বহুল ঔষধ।

রক্ত গ্রহণের সাথে সাথে  পানিবাহিত রোগের মতো নানা রক্তবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়; যেমন—জন্ডিস, এইচআইভি, হেপাটাইটিস ‘বি’ ও ‘সি’ ভাইরাসজনিত রোগ। থ্যালাসেমিয়ার রোগীর আয়ুস্কাল সাধারনত ২০-৩০ বছর পর্যন্ত। এই স্বল্পকালীন জীবনে রোগীর নিজের ও পরিবারের যে মানসিক অর্থনৈতিক বিপর্যয় ঘটে তা কেবল ভুক্তভোগী ছাড়া কারো পক্ষে অনুধাবন করা সম্ভব নয়।

রোগ নির্ণয়

ডাক্তাররা রোগের ইতিহাস, লক্ষণ, সাধারণ শারীরিক পরীক্ষা করে থ্যালাসেমিয়া সন্দেহ হলে কমপ্লিট ব্লাড কাউন্ট পরীক্ষা করে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ দেখে থাকেন। প্রয়োজন মনে করলে হিমোগ্লোবিন ইলেকট্রোফোরেসিস পরীক্ষাও করা হয়।

এক্স-রে করে দেখা হয় হাড় কতখানি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সাধারণত মাথা ও মুখমণ্ডলের এক্স-রে করা হয়। বুকের এক্স-রে পরীক্ষায় অনেক সময় দেখা যায় পাঁজরের হাড় বিকৃতি ঘটেছে। অনেকের হার্টও আকারে বড় হয়ে যায়।

থ্যালাসেমিয়া রোগের চিকিৎসা

পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর রোগী যদি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত বলে শনাক্ত হন, তাহলে তাকে চিকিৎসা দিতে হবে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে শিশুরাই থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়, তাই তাদের চিকিৎসা হওয়া উচিত একজন শিশু রক্তরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে।

মাইনর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে সাধারণত চিকিৎসার কোন প্রয়োজন হয় না। অপরদিকে মেজর থ্যালাসেমিয়ার ক্ষেত্রে, নিয়মিত রক্ত গ্রহন (প্রয়োজনবোধে বছরে ৮ থেকে ১০ বার) করতে হয়। বার বার রক্ত নেওয়ার ফলে বিভিন্ন অঙ্গে অতিরিক্ত লৌহ জমে যেতে পারে এবং এর ফলে যকৃত বিকল হয়ে যেতে পারে। তাই, এরকম ক্ষেত্রে জটিলতা এড়াতে আয়রন চিলেশন থেরাপীর সাহায্যে অতিরিক্ত লৌহ বের করে দেওয়া হয়।

অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়া রোগ হতে সম্পূর্ণভাবে মুক্ত হওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে একজন ম্যাচ ডোনার লাগবে। আমাদের দেশে অস্থিমজ্জা প্রতিস্থাপনের ব্যবস্থা না থাকায়, এই অপারেশন দেশের বাইরে গিয়ে করতে হয়। এছাড়াও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রণ এবং ফলিক এসিড সেবন করতে হতে পারে। আবার জীবনযাপন পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। যেমন- চিকিৎসকের পরামর্শ ব্যতিত কোন ঔষধ বা ভিটামিন সেবন না করা, সুষম ও পুষ্টিকর খাবার বিশেষ করে ক্যালসিয়াম, জিংক, ভিটামিন ডি সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে ইত্যাদি।

থ্যালাসেমিয়া নির্ণয় করার পর রোগীদের নিয়মিত যেসব বিষয় খেয়াল রাখা উচিত

  •   নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করানো।
  •   রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ ১০ গ্রাম বা ডেসিলিটার রাখার চেষ্টা করতে হবে।
  •   হেপাটাইটিস-বি ভাইরাসের টিকা নেওয়া।
  •   শিশুরোগীর ক্ষেত্রে প্রতি তিন মাস অন্তর উচ্চতা, ওজন, লিভার ফাংশন পরীক্ষা করা।
  •   আট থেকে ১০ ব্যাগ রক্ত দেওয়ার পর রক্তে লৌহের পরিমাণ নির্ণয় করতে হবে।
  •   শিশুর প্রতিবছর বুদ্ধি ও বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা।
  •  রক্তে লৌহের মাত্রা এক হাজার ন্যানো গ্রাম বা মিলি লিটারের ওপরে হলে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হওয়া।
  •   বিশুদ্ধ রক্ত পরিসঞ্চালন নিশ্চিত করা।

বিয়ের আগেই নারী-পুরুষের রক্ত পরিক্ষা করা উচিত

থ্যালাসেমিয়া একটি বংশগত রোগ। এটি কোনো ধরনের ছোঁয়াচে বা সংক্রামক রোগ নয়। কোনো ব্যক্তির সংস্পর্শ, বাতাস, পানি, খাবার, কাপড়-চোপড় কিংবা অন্য কোনো কিছুর সংস্পর্শে এ রোগ ছড়ায় না। বিটা থ্যালাসেমিয়া অথবা ত্রুটিপূর্ণ হিমোগ্লোবিন জিন বহন করা কোনো রোগ নয় এটি। তবে বাবা-মা বিটা থ্যালাসেমিয়া অথবা হিমোগ্লোবিন-ই ডিসঅর্ডার জিন বহন করলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অর্থাৎ স্বামী-স্ত্রী দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়া রোগে আক্রান্ত হয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে।

যদি কারো রক্তে থ্যালাসেমিয়ার জিন শনাক্ত হয়, তা হলে থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত একজন নারী বা পুরুষ যদি অন্য একজন সুস্থ নারী বা পুরুষের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়, তা হলে তাদের সন্তানের থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে থ্যালাসেমিয়ার জিন বহনকারী নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে দেওয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ কোনো ধরনের চিকিৎসার মাধ্যমে থ্যালাসেমিয়ার বা হিমোগ্লোবিন-ই ডিসঅর্ডারের পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। এ জিন নিয়ে জন্মগ্রহণকারীকে সারাজীবন এটা বহন করতে হবে।

যেহেতু থ্যালাসেমিয়া বাহক কোনো নারী বা পুরুষ অন্য একজন থ্যালাসেমিয়ার বাহককে বিয়ে করে, তা হলে তাদের অনাগত শিশু থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হবে। তাই থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে বিয়ের আগেই নারী ও পুরুষের রক্ত পরীক্ষা করতে হবে। রক্ত পরীক্ষায় যদি দুজনই থ্যালাসেমিয়ার বাহক ও রোগী হন, তা হলে বিয়ে বন্ধ করতে হবে। এতে দেশে থ্যালাসেমিয়ার বাহক বা রোগী কমে আসবে।

এক সময় সাইপ্রাসের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হয়ে পড়েছিল। তখন ওই দেশের সরকার এ বিষয়ে গবেষণা করে দেখতে পায়, যাদের বাবা ও মা দুজনই থ্যালাসেমিয়া জীবাণুর বাহক, তাদের সন্তান থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। এরপরই সাইপ্রাসে থ্যালাসেমিয়ার বাহক নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে দেওয়া বন্ধ করার পদক্ষেপ নেওয়া হয়। বর্তমানে দেশটিতে থ্যালাসেমিয়া বাহকের সংখ্যা ৩ শতাংশে নেমে এসেছে।

প্রতিরোধে করনীয়ঃ 

  • থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো, এ রোগের বাহকদের শনাক্ত করা। এ জন্য স্ক্রিনিং কর্মসূচি গ্রহণ করে বাহকদের চিহ্নিত করে পরামর্শ দিতে হবে।
  • পরিবারের কারও থ্যালাসেমিয়া রোগের ইতিহাস থাকলে, সন্তান গ্রহনের পূর্বে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্র এবং পাত্রীর রক্ত পরীক্ষা করে দেখতে হবে, তাদের মধ্যে কেউ থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত কিনা। আবার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ের ক্ষেত্রে থ্যালাসেমিয়া রোগের সম্ভাবনা বেড়ে যায়। তাই, এ ব্যপারে সাবধান হতে হবে।
  •  যদি কোনো কারণে দুজন বাহকের বিয়ে হয়েও যায়, তাহলে সন্তান গর্ভধারণের অনতিবিলম্বে গর্ভস্থিত সন্তানের পরীক্ষা করা সম্ভব এবং পরীক্ষায় যদি প্রমাণিত হয় যে ভ্রূণটি থ্যালাসেমিয়ায় আক্রান্ত, সেক্ষেত্রে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী এবং বাবা-মায়ের ইচ্ছায় গর্ভপাত ঘটানো যেতে পারে।
  • দু’জন থ্যালাসেমিয়া বাহক যাতে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয় সে বিষয়ে জনগণকে সচেতন করে তুলতে হবে। এক্ষেত্রে বিবাহের পূর্বে তাদের রক্ত পরিক্ষা করে নেওয়া যেতে পারে।
  •  বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ‘এইডস’ কে যেভাবে সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে জনগণকে সচেতন করা হয়েছে, ঠিক সেভাবেই থ্যালাসেমিয়া রোগী কিংবা বাহকদের কি কি করনীয় তা বিশদভাবে তুলে ধরতে হবে। টেলিভিশন, রেডিও, পত্র-পত্রিকায় থ্যালাসেমিয়া নিয়ে পর্যপ্ত প্রচারণা চালাতে হবে ।
  •  প্ল্যাকার্ড, বিলবোর্ড স্থাপন, পোস্টার, লিফলেট এবং বিশেষ ক্রোড়পত্র বিতরণের মাধ্যমে জনসচেতনতা গড়ে তুলার চেষ্টা করতে হবে।
  • মেডিকেল শিক্ষা কারিকুলামে থ্যালাসেমিয়াকে এমনভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে প্রত্যেক চিকিৎসকই থ্যালাসেমিয়া সম্পর্কে সঠিক ধারণা লাভ করতে পারে।

শেষ কথা

থ্যালাসেমিয়ার তেমন ভাল কোন চিকিৎসা আমাদের দেশে  না থাকায় এ রোগ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি গর্ভস্থ শিশুর থ্যালাসেমিয়া আছে কি-না তাও পরীক্ষা করে দেখা উচিত। শিশু গর্ভে আসার চার মাস পর থেকে থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা তা নির্ণয় করা সম্ভব। বাংলাদেশের জনসংখ্যার শতকরা প্রায় ৪.১ শতাংশ এবং সারা পৃথিবীতে প্রায় এক বিলিয়ন থ্যালাসেমিয়া রোগী আছে। প্রতি বছর আরও প্রায় ৩.৫ মিলিয়ন মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। থ্যালাসেমিয়া প্রতিরোধে ব্যপক সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন।

থ্যালাসেমিয়া নিরাময়যোগ্য। তবে যেহেতু এটি একটি জন্মগত সমস্যা, যদি তার জিনগত সমস্যাকে পরিবর্তন করা না হয়, অর্থাৎ যে অঙ্গ দিয়ে সমস্যাযুক্ত হিমোগ্লোবিন তৈরি হচ্ছে, সে অঙ্গ মানে বোনমেরু (অস্থিমজ্জা), এটাকে যদি অস্থিমজ্জা সংযোজনের মাধ্যমে পরিবর্তন করা যায়, তাহলে একে সম্পূর্ণ নিরাময় করা সম্ভব।

তথ্য সূত্রঃ উইকি পিডিয়া, ইহাসপাতাল, ThalsBangla, আমরা বন্ধু,  আমাদের সময়, এনটিভি, বিডিহ্যালন্থ,

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক