৮০০ বছর পর চালু হারিয়ে যাওয়া প্রাচীনতম জ্ঞানের উৎস: নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়

আশ্চর্য্য লাগে না যখন অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ প্রতিষ্ঠারও  বহু পূর্বে ইতালির বোলোনিয়াতে ইউরোপের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে, নালন্দার বয়স তখনই সাড়ে ছ’শ পেড়িয়ে ! 

আটশ বছরেরও বেশি সময় পর আবারও শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখর হল ভারতের বিহার রাজ্যের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৪ সালের ১লা সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হয়। তবে এ বিশ্ববিদ্যালয়টি  পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সর্বপ্রথম আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় ও সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চ শিক্ষা কেন্দ্র।

হিউয়েন সাঙ এবং ভারতীয় ইতিহাসবিদ প্রজ্ঞাবর্মণ গুপ্ত রাজা কুমারগুপ্তকে নালন্দা বিশ্ব বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা বলে উল্লেখ করে গেছেন।খনন কাজে  পাওয়া একটা সীলমোহর থেকেও এই দাবীর পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়।নালন্দা শব্দটির  ব্যুৎপত্তি নিয়ে একাধিক মতবাদ প্রচলিত আছে। চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাং এর মতে  নালন্দা শব্দটি  “ন অলম দা” কথাটি থেকে। এই শব্দটির  অর্থ “উপহার দানে যার বিরাম নেই” বা “অবিরত দান”।

অন্য দিকে আর এক জন চীনা পর্যটক ইৎ সিং এর মতে, ‘নালন্দা’ নামটি ‘নাগ নন্দ’ নামে এক সাপের নাম থেকে এসেছে। এ সাপটি স্থানীয় এক পুষ্করিণীতে বাস করত। নালন্দায় খননকার্য পরিচালনাকারী হীরানন্দ শাস্ত্রী’র মতে, এ অঞ্চলে প্রচুর নাল (পদ্মের মৃণাল) পাওয়া যেত।নালন্দা’ নামটির আদি অর্থ ছিল ‘দা নাল অর্থাৎ পদ্মের মৃণাল প্রদান করে । “নালম” শব্দের অর্থ পদ্ম ফুল যা জ্ঞানের প্রতীক রূপে প্রকাশ করা হয়েছে আর “দা” দিয়ে বুঝানো হয়েছে দান করা।তার মানে “নালন্দা” শব্দের অর্থ দাঁড়ায় “জ্ঞান দানকারী”|

এ প্রাচীন শিক্ষাকেতনটি একসময় কালের গর্ভে হারিয়ে যায়।  ১৯ শতকে ভারতীয় পুরাতত্ত্ব  প্রাথমিকভাবে এই প্রত্নস্থলে খননকার্য চালায়। ১৯১৫ সালে প্রথম এখানে নিয়ম মাফিক খননকার্য শুরু হয় । নালন্দা মহাবিহারের যে অংশে আজ পর্যন্ত খননকার্য চালানো হয়েছে, তার আয়তন শুধুমাত্র দৈর্ঘ্যে ১,৬০০ ফুট (৪৮৮ মি) ও প্রস্থে ৮০০ ফুট (২৪৪ মি) বা প্রায় ১২ একর। তবে মধ্যযুগে নালন্দার আয়তন আরও অনেক বেশি ছিল। নালন্দা মহাবিহার একটি উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকীর্তি। এটির বৈশিষ্ট্য হল একটি প্রকাণ্ড প্রাচীর ও তার একটিমাত্র প্রবেশ্বদ্বার। নালন্দা মহাবিহারে আটটি পৃথক চত্বর ও দশটি মন্দির ছিল। সেই সঙ্গে অনেকগুলো ধ্যানকক্ষ ও শ্রেণিকক্ষও ছিল। নালন্দা ছিল একটি আবাসিক মহাবিহার। এখানে ছাত্রদের অনেকগুলো বাসভবন ছিল । জানা যায়, নালন্দা মহাবিহারে ১০,০০০ ছাত্র ও ২,০০০ শিক্ষক ছিলেন।

নালন্দার ধ্বংসস্তুপের মধ্য থেকে প্রচুর ভাস্কর্য, মুদ্রা, সিলমোহর ও উৎকীর্ণ লিপিও আবিষ্কৃত হয়। এগুলির কয়েকটি নিকটবর্তী নালন্দা পুরাতত্ত্ব সংগ্রহালয়ে রক্ষিত আছে। বর্তমানে নালন্দা একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন কেন্দ্র এবং বৌদ্ধ তীর্থপর্যটকদের অন্যতম গন্তব্যস্থল।

নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা ও প্রতিষ্ঠাতা

পৃথিবীর বুকে গড়ে ওঠা সর্বপ্রথম আবাসিক  ও সবচেয়ে প্রাচীন উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি ভারতের বিহারের পাটনা থেকে ৯৫ কিমি. বা ৫৯ মেইল দক্ষিণ-পূর্ব দিকে বিহার শরিফ শহরের কাছে অবস্থিত। এটি মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের গড়ে তোলা একটি প্রতিষ্ঠান যা ৫ম থেকে ৬ষ্ঠ খ্রিস্টীয় শতাব্দীর মধ্যে তৈরি করা হয় । তবে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা হবার সময়কাল নিয়ে কিছুটা মতভেদ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য মত হল  একরাদ্বাতীয়া সময়কালে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ধারণা করা হয়, রাজা কুমার গুপ্ত  বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ভিত্তি স্থাপন করেন।

৪২৭ থেকে ৪৫০ খ্রীষ্টাব্দের কোন এক সময়ের মধ্যে এটি স্থাপিত হয়েছিল বলে ধারনা করা হয়। মূলত, বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের বিদ্যাক্ষেত্র হিসেবে এটি চালু করা হয়। রাজা বলাদিত্যের সময় একটি উপাসনালয় তৈরি করা হয় যার দৈর্ঘ্য ছিল ৩০০ ফুট লম্বা। রাজা ভিজরা এবং পরবর্তী রাজা শিলাদিত্যের সময় ভবনের সংখ্যা বাড়িয়ে ছয়ে নিয়ে আসা হয় এবং পুরো বিশ্ববিদ্যালয় উঁচু প্রাচীরের ভিতরে নিয়ে আসা হয়। পরে সম্রাট হর্ষবর্ধন ও পাল বংশের রাজারাও এই মহাবিদ্যালয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করেন।

নালন্দার ইতিহাস

প্রাচীন ইতিহাস

জানা যায়, প্রাচীনকালে নালন্দা একটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম ছিল। মগধের রাজধানী রাজগৃহ বর্তমানে রাজগির দিয়ে একটি বাণিজ্য পথ ছিল , সেই পথের ধারে নালন্দা অবস্থিত ছিল।  কথিত আছে, জৈন তীর্থঙ্কর মহাবীর ১৪টি চতুর্মাস নালন্দায় অতিবাহিত করেছিলেন। বুদ্ধ নালন্দার কাছাকাছি পাবরিক নামক আম বাগানে উপদেশ দান করেছিলেন বলে কথিত আছে। তার একজন প্রধান শিস্য নালন্দা অঞ্চলেই জন্মগ্রহণ  ও নির্বাণ লাভ করেন। এ ঘটনা থেকে বুঝা যায় খ্রিস্টপূর্ব ৫ম-৬ষ্ঠ শতাব্দীতেও একটি গ্রাম হিসেবে নালন্দার অস্তিত্ব ছিল।

গুপ্তযুগে নালন্দা

নালন্দার ইতিহাসের সূচনা ঘটে গুপ্তযোগে। একটি সিলমোহর থেকে জানা যায় এ মহাবিহারের প্রতিষ্ঠাতা চিলেন শক্রাদিত্য নামে এক রাজা। তিনি হলেন গুপ্ত রাজা প্রথম কুমার গুপ্ত। প্রথম কুমার গুপ্ত ৪১৫ থেকে ৪৫৫ সাল পর্যন্ত রাজত্ব করেন। নালন্দা থেকে তার মুদ্রা পাওয়া যায়। তাঁর উত্তরসূরি বুদ্ধগুপ্ত, তথাগতগুপ্ত, বালাদিত্য ও বজ্র পরবর্তীকালে আরও কয়েকটি মঠ ও মন্দির নির্মাণ করিয়ে নালন্দা মহাবিহারকে প্রসারিত ও পরিবর্ধিত করেন।

গুপ্ত রাজবংশ ছিল একটি ব্রাহ্মণ্যবাদী রাজবংশ। যদিও গুপ্ত বংশের  নরসিংহগুপ্ত (বালাদিত্য) মহাযান দার্শনিক বসুবন্ধুর দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন বলে কথিত আছে। তিনি নালন্দায় একটি সঙ্ঘারাম এবং ৩০০ ফুট উঁচু একটি বিহার নির্মাণ করেন।চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং-এর মতে, এই বিহারটি ছিল “বোধিবৃক্ষের তলায় নির্মিত মহাবিহারটির” অনুরূপ। হিউয়েন সাং এর মতে,  বালাদিত্যের পুত্র বজ্রও “ভক্তিসমাহিত চিত্তে” একটি সঙ্ঘারাম নির্মাণ করেন।

গুপ্তোত্তর যুগে নালন্দা

গুপ্তোত্তর যুগে দীর্ঘকাল বহু রাজা নালন্দায় নতুন নতুন বিহার, মঠ ও মন্দির নির্মাণের ব্যবস্থা করেন।কোনও এক সময়ে  মধ্য ভারতের এক  রাজা শিলাদিত্য নালন্দা মহাবিহারের অট্টালিকাগুলিকে  উচ্চ একটি প্রাচীরের ভীতরে নিয়ে আসেন।পরবর্তীতে কোন এক সময় পূর্ণবর্মণ নামে আরেক জন রাজা ৮০ ফুট উঁচু তামার একটি বুদ্ধমূর্তি নির্মাণ করান। তিনি সেই মূর্তির জন্য ছয়টি ধাপবিশিষ্ট একটি বেদিও নির্মাণ করান। ধারনা করা হয়, পূর্ণবর্মন হল মৌখরী রাজ বংশের রাজা যাকে রাজা অশোকের শেষ বংশধর হলা হয়।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর নালন্দা মহাবিহারের সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন কনৌজের সম্রাট হর্ষবর্ধন। ৬ষ্ঠ শতকের মাঝের দিকে গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটলে উত্তর ভারত ছোট ছোট প্রজাতন্ত্র ও রাজ্যে বিভক্ত হয়ে পড়ে। বড় ভাই থানেসারের রাজা রাজ্যবর্ধন গৌড়ের সম্রাট শশাংকের হাতে নিহত হলে ৬০৬ সালে হর্ষকে রাজা ঘোষণা করা হয়; তখন তার বয়স ছিল মাত্র ১৬ বছর । হর্ষবর্ধন বৌদ্ধধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছিলেন এবং নিজেকে নালন্দার ভিক্ষুদের দাস মনে করতেন। তিনি মহাবিহারের মধ্যে পিতলের একটি মঠ নির্মাণ করান এবং ১০০টি গ্রাম থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব নালন্দার জন্য বরাদ্ধ দেন। এছাড়াও তিনি সেই গ্রামগুলির ২০০ জন গৃহস্থকে আদেশ দেন যে, তাঁরা যেন মহাবিহারের ভিক্ষুদের চাহিদা অনুসারে রোজ চাল, মাখন ও দুধ সরবরাহ করেন। জানা যায়, নালন্দার প্রায় এক হাজার ভিক্ষু কনৌজে হর্ষবর্ধনের রাজকীয় উপাসনা সভায় উপস্থিত হতেন।

পালযুগে নালন্দা

খ্রিস্টীয় ৮ম শতাব্দীতে পাল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। খ্রিস্টীয় ১২শ শতাব্দী পর্যন্ত পাল রাজারা  শাসন করেছিলেন। পাল সাম্রাজ্যের উৎসস্থল ছিল বাংলা অঞ্চল। পাল সাম্রাজ্যের নামকরণ করা হয় এই সাম্রাজ্যের শাসক রাজবংশের নামানুসারে। পাল সম্রাটদের নামের শেষে ‘পাল’ অনুসর্গটি যুক্ত ছিল। প্রাচীন প্রাকৃত ভাষায় এই শব্দটির অর্থ ছিল ‘রক্ষাকর্তা’। পাল রাজারা বৌদ্ধধর্মের মহাযান ও তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের অনুগামী ছিলেন।

৭৫০ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের সম্রাট পদে গোপালের আরোহনের সাথে সাথে এ সাম্রাজ্যের যাত্রা শুরু হয়। অধুনা বাংলা ও বিহার ভূখণ্ড ছিল পাল সাম্রাজ্যের প্রধান কেন্দ্র। এই সাম্রাজ্যের প্রধান শহরগুলি ছিল বিক্রমপুর, পাটলীপুত্র, মুঙ্গের, রামাবতী (বরেন্দ্র),  তাম্রলিপ্ত ও জগদ্দল।

পাল রাজারা ধ্রুপদি ভারতীয় দর্শন, সাহিত্য, চিত্রকলা ও ভাস্কর্যশিল্পের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। পাল সম্রাটরা একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন। তাঁদের শাসনামলেই প্রোটো-বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটে।

বহু শিলালিপি ও সাহিত্যিক উপাদান থেকে জানা যায়, পাল রাজারা উদারভাবে নালন্দার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। তবে পালযুগে অন্যান্য মহাবিহারগুলি নালন্দা থেকে অনেক শিক্ষিত ভিক্ষুকে গ্রহণ করায় নালন্দা একক গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। পালযুগে বৌদ্ধধর্মের উপর বজ্রযানের প্রভাব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছিল। নালন্দার উপরেও তার প্রভাব পড়েছিল। ফলে নালন্দা মহাবিহার ধীরে ধীরে তান্ত্রিক মতবাদ ও জাদুবিদ্যার অনুশীলনে কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়ে

পাল রাজাদের রাজত্বকালে নালন্দায় অনুশীলিত মহাযান মতবাদের সঙ্গে বজ্রযান নামে পরিচিত মহাযান দর্শনের তন্ত্র-প্রভাবিত একটি মতবাদের মিশ্রণ ঘটে। নালন্দা মহাবিহার গুপ্তযুগের সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার বহন করত এবং সেই উত্তরাধিকার ছিল বহু-প্রশংসিত। পাল রাজারা অনেক বড় বড় মন্দির ও মঠ নির্মাণ করেছিলেন । এগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল সোমপুর মহাবিহার। আবার নালন্দাও বিক্রমশিলা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতাও করতেন। তাঁদের শাসনকালে নালন্দার আদলে জগদ্দল, ওদন্তপুরী, সোমপুর ও বিক্রমশিলায় চারটি মহাবিহার গড়ে ওঠে। উল্লেখ করা যেতে পারে, পাল রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা গোপাল নালন্দা থেকে মাত্র ৬ মাইল (৯.৭ কিমি) দূরে ওদন্তপুরী মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন।

নালন্দা থেকে পাওয়া লিপিগুলো থেকে জানা যায়, গোপালের পুত্র ধর্মপাল ছিলেন নালন্দার পৃষ্ঠপোষক। ধর্মপাল বিক্রমশিলা মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন । তবে জানা যায় যে, পালযুগে নালন্দার সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ধর্মপালের পুত্র দেবপাল । সম্রাট দেবপাল সোমপুর মহাবিহারটি প্রতিষ্ঠা করেন। নালন্দার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে থেকে পাওয়া একাধিক ধাতুমূর্তিতে রাজা দেবপালের নাম উল্লেখ পাওয়া যায়।

দুটি গুরুত্বপূর্ণ উৎকীর্ণ লিপি থেকেও রাজা দেব পালের কথা জানা যায়। এর মধ্যে প্রথমটি হল একটি তাম্রলিপি। তাম্রলিপি থেকে জানা যায়, সুবর্ণদ্বীপের বতর্মানে ইন্দোনেশিয়ার সুমাত্রা’র শৈলেন্দ্র-বংশীয় রাজা বলপুত্রদেব “নালন্দার বহুমুখী উৎকর্ষে আকৃষ্ঠ হয়ে” সেখানে একটি মঠ নির্মাণ করেন এবং সেটির রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দেবপালের কাছে পাঁচটি গ্রামের রাজস্ব অনুমোদন করার অনুরোধ জানান। দেবপাল তাঁর অনুরোধ রক্ষা করেছিলেন। অন্য লিপিটি হল ঘোসরাওয়ান।  এই লিপি থেকে জানা যায়, তিনি বীরদেব নামে এক বৈদিক পণ্ডিতকে পৃষ্ঠপোষকতা করেন। পরবর্তীকালে এই বীরদেব নালন্দার অধ্যক্ষ নির্বাচিত হয়েছিলেন।

পূর্ব ভারতের পাঁচটি বৌদ্ধ উচ্চশিক্ষা কেন্দ্র পালযুগে একটি রাষ্ট্র-পরিচালিত কার্যক্রম গঠন করেছিল। পণ্ডিতেরা সহজেই একটি শিক্ষাকেন্দ্র থেকে অপর শিক্ষাকেন্দ্রে যেতে পারতেন।  প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব একটি প্রতীকচিহ্ন ছিল। সেই প্রতীকচিহ্নের কেন্দ্রে একটি ধর্মচক্র এবং তার দুই পাশে দুটি হরিণের চিত্র আঁকা ছিল। এই প্রতীকচিহ্নের নিচে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির নাম খোদায় করা থাকত। নালন্দার মহাবিহারের ক্ষেত্রে এই নামটি ছিল ‘শ্রী-নালন্দা-মহাবিহার-আর্য-ভিক্ষুসঙ্ঘস্য’ (অর্থাৎ, “নালন্দা মহাবিহারের সম্মানীয় ভিক্ষুদের সঙ্ঘ”)

নালন্দার গঠন

নালন্দা যখন খ্যাতির শিখরে আরোহন করে তখন সেখানে প্রায় ১০০০ ছাত্র এবং ২০০০ শিক্ষক পড়াশোনা ও উচ্চতর গবেষণায় কার্যে নিয়োজিত ছিলেন। গড়ে প্রতি ৫ জন ছাত্রের জন্য ১ জন শিক্ষক।  নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টি মোট ত্রিশ (৩০) একর জায়গা জুড়ে ছিল। ৩ টি বহুতল স্থাপনায় পড়াশোনার জন্য ব্যবহৃত পান্ডুলিপি ও ফলক সংরক্ষণ করা হয়। এই স্থাপনা তিনটি নাম ছিলঃ রত্নসাগর, রত্নদধি , রত্নরঞ্জক। এই মহাবিহারে অসংখ্য শ্রেণীকক্ষ ছাড়াও সেখানে অসংখ্য মন্দির এবং ধ্যানকক্ষ ছিল। মহাবিদ্যালয়ের মোট ক্যাম্পাস ছিল ৮ টি। বাইরের কোন ঝামেলা যাতে শিক্ষার পরিবেশকে নষ্ট না করতে পারে সেজন্য উঁচু লাল ইটের পাঁচিল দিয়ে ঘেরা ছিল সমগ্র বিশ্ব বিদ্যালয় চত্বর।

এই বিশাল বিশ্ববিদ্যালয়টির  খরচ চালানোও সহজ ব্যাপার ছিল না। অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় যাতে নালন্দার প্রশাসনকে কারো উপর নির্ভরশীল হতে না হয় সেদিক বিবেচনা করে ২০০ গ্রামের কর দিয়ে  নালন্দার ব্যয় মিটানোর জন্য ব্যবস্থা করা হয় । এই সব গ্রামের করের টাকা থেকেই ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় সব খরচ চলতো।

নালন্দার গ্রন্থাগার

ইতিহাসবিদগণ নিশ্চিত যে,  দশ বছর নালন্দায় অবস্থানের পরে ইৎ সিং প্রচুর বই নিয়ে চিনে ফিরে যান। এ থেকে প্রমাণিত হয়, নালন্দায় একটি সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার ছিল।   নালন্দার গ্রন্থাগারটির নাম ছিল ‘ধর্মগঞ্জ’ (‘ধর্মের হাট’)। তিনটি বহুতলবিশিষ্ট ভবনে এই গ্রন্থাগারটি অবস্থিত ছিল। ভবনগুলির নাম ছিল ‘রত্নসাগর’ (‘রত্নের মহাসাগর’), ‘রত্নোদধি’ (‘রত্নের সমুদ্র’) ও ‘রত্নরঞ্জক’ (‘রত্নখচিত’)। ভবন তিনটির মধ্যে রত্নোদধি ছিল নয়টি তলবিশিষ্ট ভবন। রত্নোদধি’তেই পবিত্রতম ধর্মগ্রন্থ প্রজ্ঞাপারমিতা সূত্র ও গুহ্যসমাজ  রাখা ছিল বলে জানা যায়।

নালন্দা মহাবিহারের গ্রন্থাগারে ঠিক কত সংখ্যক  বই রক্ষিত ছিল তা জানা যায়  নি। তবে ধারনা করা হয়, সেখানে লক্ষাধিক গ্রন্থের সংগ্রহ ছিল। নালন্দায় শুধুমাত্র ধর্মগ্রন্থের পুথিই রক্ষিত ছিল না। বরং ব্যাকরণ, জ্যোতিষবিদ্যা, সাহিত্য, ন্যায়শাস্ত্র,  জ্যোতির্বিজ্ঞান ও ভেষজবিদ্যা-সংক্রান্ত গ্রন্থও ছিল।

ইতিহাসবিদগণের অনুমান, নালন্দা মহাবিহারের গ্রন্থাগারটি সংস্কৃত ভাষাবিদ পাণিনির শ্রেণিবিন্যাস ক্রমের ভিত্তিতে বিন্যস্ত হয়েছিল। ধারনা করা হয়, বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি  ত্রিপিটকের প্রধান তিনটি বিভাগ বিনয় পিটক, সুত্ত পিটক ও অভিধম্ম পিটকের ভিত্তিতে বিন্যস্ত ছিল।

নালন্দায় যা পড়ানো হত

ভাবতে অবাক লাগে কতটা সুনাম আর শৃঙ্খলার সাথে এই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হত। ইচ্ছে করলেই যে কেউ এখানে ভর্তি  হতে পারত না। ভর্তির পূর্বে তাকে মৌখিক পরীক্ষায় পাশ করতে হত।  হিউয়েন সাংয়ের বক্তব্য অনুসারে জানা যায়, তখন প্রতি ১০ জনের মধ্যে দুজন নালন্দায় শিক্ষার সুযোগ পেত এবং তা ছিল মেধার ভিত্তিতে। নালন্দার সুশিক্ষার খ্যাতির সুবাতাস এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে অনুন্নত-প্রতিকুল এবরোথেবরো যোগাযোগ ব্যবস্থাও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি সুদূর তিব্বত, চীন, জাপান, ইন্দোনেশিয়া, পারস্য, গ্রীস, তুরষ্ক থেকে ছুটে আসা বিদ্যা অনুরাগীদের।  এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে সংস্কৃত ভাষায় দক্ষতা ছিল বাধ্যতামূলক।

পুর্ব এশিয়ার দেশ জাপান, চীন, কোরিয়া বা অন্য কোথাও থেকে আসা ছাত্ররা প্রথমে সুমাত্রা ও জাভা দ্বীপে গিয়ে সংস্কৃত ভাষা শিখে নালন্দায় মৌখিক পরীক্ষায় অবতীর্ন হত। নালন্দাতে ভর্তিতে জাত, ধর্মবিশ্বাস এবং জাতীয়তার কোন বাধা ছিল না মানে বিশ্ববিদ্যালয়টি ছিল সকলের জন্য উন্মুক্ত। বিদেশী ছাত্রদের ২০% এবং উপমহাদেশের নেটিভ ছাত্রদের ৩০% নাম্বার পেয়ে  পেয়ে ভর্তির যোগ্যতা অর্জন করতে হত। এখানে বৌদ্ধ ধর্মের মহাযান অধ্যায়ন করা ছিল সবার জন্যে বাধ্যতামুলক। এর পাশাপাশি ১৮ টি মূল বিষয় পড়ার সুযোগ ছিল। যেমন, বিজ্ঞান, মেডিসিন, এস্ট্রোলজি, সাহিত্য, চারুকলা, চিকিৎসাবিদ্যা অধ্যায়ন। এছাড়া ছিল হিন্দু দর্শনের ছয়টি বিষয়। বুদ্ধ ধর্মের আরও শাখা যেমন হীনযানপন্থা, থেরবাদ ও বাণিজ্য শিক্ষার সুযোগ ছিল।বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার নূন্যতম বয়স ছিল ১৬।

হিউয়েন সাং-এর জীবনগ্রন্থ হতে জানা যায়, নালন্দার সকল ছাত্রই মহাযান ও বৌদ্ধধর্মের আঠারোটি (হীনযান) সম্প্রদায়ের ধর্মগ্রন্থ অধ্যয়ন করতেন। তিব্বতীয় বৌদ্ধ দর্শন বলে আজ যা পালন করা হয় তার বড় অংশ এসেছে নালন্দা থেকে। বৌদ্ধ দর্শনের অন্যান্য রূপ যেমন, মহাযান যা ভিয়েতনাম, চীন, কোরিয়া এবং জাপানে অনুসরণ করা হয়, নালন্দাতেই শুরু হয়েছিল।

নালন্দা মহাবিদ্যালয় ছিল এককথায় প্রাচীন যুগের জ্ঞান ভাণ্ডার । প্রাচীন মহাবিদ্যালয়গুলোর খুব কমই এত বেশি বিষয়ে পাঠ দান করা হত।  নালন্দাতে আরো বেশ কিছু বিষয় পড়ানো হত। যেমনঃ

চিকিৎসাবিজ্ঞানঃ নালন্দাতে নানা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করা হত। তবে তুলনামূলক ভারত ও চীনের চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করা হত। ফলে বুঝা যায় হাজার বছর আগেই চিকিৎসার ক্ষেত্রে একাধিক পদ্ধতির তুলনা করে উত্তম পদ্ধতি অবলম্বন করার মত আধুনিক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি নালন্দায় শিক্ষা দেয়া হত।

গনিত ও জ্যোতির্বিজ্ঞানঃ নালন্দা মহাবিহারের গণিত চর্চার উপর আলোকপাত করা হত। এছাড়াও জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রাচীন ভারতের উৎকর্ষতা যা পরবর্তীতে আধুনিক বিশ্বকে বিস্ময়ে হতবাক করেছে তার সুতিকাগার ছিল এই  নালন্দা মহাবিদ্যালয়।

ভাষাবিজ্ঞানঃ নালন্দাতে মূলত  সংস্কৃত আর পালি ভাষা শেখানো হত। এখানে ব্যাকরণ ও ভাষার চর্চা করা হত।  নালন্দায় ব্যাকরণ ছাড়াও বৌদ্ধ সাহিত্য পাঠের ব্যবস্থা ছিল। প্রাচীন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভাষা চর্চা বলতে মূলত ব্যাকরণ চর্চাই বুঝাত।   নালন্দা কিন্তু সাহিত্যকে গুরুত্ব দিয়ে উন্নত মানুষিকতার পরিচয় দিয়েছিল।

তর্কশাস্ত্রঃ দর্শন চর্চায় নালন্দা মহাবিহার অবিস্মরণীয় ভুমিকা পালন করেছিল। এখানে তর্কশাস্ত্রের মৌলিক নিয়মগুলো যত্নের সাথে শেখানো হত। ব্যক্তিগত মতামতের চেয়ে যুক্তি বড় এই সত্যটি অনেক আগে গ্রীকরা উপলব্ধি করলেও যুক্তি প্রয়োগের নিয়ম ও প্রণালীতে ভারতবর্ষ ছিল অনেক এগিয়ে ছিল।  এই এগিয়ে থাকার পিছনে নালন্দার ছিল বিরাট ভুমিকা।

যুদ্ধবিজ্ঞানঃ নালন্দাতে প্রধানত তীর চালনো শেখানো হত। এছাড়াও যুদ্ধ কৌশল ও সৈন্য সমাবেশ নিয়ে জ্ঞান দেওয়া হত।

নালন্দায়  বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গ

বুদ্ধের নালন্দায় অবস্থানঃ

ধারনা করা হয় বুদ্ধ নালন্দায় একাধিকবার আগমন করেছিলেন সেখানে তিনি তাঁর অনুসারীদের সাথে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা করতেন। নিজের জীবনের শেষবার ভ্রমনের সময় বুদ্ধ নালন্দায় এসেছিলেন। বুদ্ধ যখন নালন্দায় আসেন তখন নালন্দা মহাবিদ্যালয় খ্যাতির শিখরে আরোহন করেনি।  তবে নালন্দা সেসময় খুব সমৃদ্ধশালী একটি নগরী ছিল বলে ধারনা করা হয়।

নালন্দায় হিউয়েন সাং

চীনা তীর্থযাত্রী  হিউয়েন সাং ভারত উপমহাদেশ পরিভ্রমণে আসেন। তবে কত সালে আসেন তার সঠিক কোন দলিল পাওয়া যায় নি। তবে ধারনা করা হয় হিউয়েন সাং ৬৩০ থেকে ৬৪৩ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী কোন সময়ে ভারত উপমহাদেশে আসেন। হিউয়েন ৬৩৭/৬৩৮ সালে প্রথমবার নালন্দায়  আসেন । এরপর ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে তিনি দ্বিতীয়বার নালন্দায় আসেন। নালন্দার মঠে তিনি প্রায় দুই বছর সময় অতিবাহিত করেছিলেন।  নালন্দা মহাবিহারে তিনি উষ্ণ অভ্যর্থনা পান। নালন্দায় তাঁর ভারতীয় নামকরণ করা হয়েছিল ‘মোক্ষদেব’।  নালন্দার তদনীন্তন অধ্যক্ষ শীলভদ্রের অধীনে তিনি  অধ্যয়ন করেন। বৌদ্ধশাস্ত্র ছাড়াও হিউয়েন সাং নালন্দায় ব্যাকরণ, ন্যায়শাস্ত্র ও সংস্কৃত ভাষা ইত্যাদি বিষয়ে শিক্ষা করেছিলেন। বলে জানা যায়, পরবর্তীকালে তিনি এই মহাবিহারে শিক্ষাদানও করেন ।

হিউয়েন সাং তাঁর বাসকক্ষের জানলার  থেকে দেখা নালন্দার দৃশ্য বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন

…সম্পূর্ণ মহাবিহারটি ইষ্টকনির্মিত একটি প্রাচীরের দ্বারা পরিবেষ্টিত। এই প্রাচীরটি সমগ্র মহাবিহারটিকে বাইরে থেকে ঘিরে রেখেছে। একটি দ্বার দিয়ে এই মহৎ মহাবিহারে প্রবেশ করতে হয়। [সঙ্ঘারামের] মধ্যে অন্যান্য আটটি সভাগৃহ সেই মহাবিহার থেকে পৃথক অবস্থায় রয়েছে। সুসজ্জিত স্তম্ভ ও পরি-সদৃশ্য স্তম্ভশীর্ষগুলি একত্রে সূচালো পর্বতশীর্ষের ন্যায় সন্নিবেশিত। মনে হয় যেন, মানমন্দিরগুলি [সকালের] কুয়াশায় এবং স্তম্ভশীর্ষের কক্ষগুলি মেঘের মধ্যে হারিয়ে গিয়েছে।

হিউয়েন সাং ছিলেন হর্ষবর্ধনের সময়ে আসা সম্মানীয় অতিথি। হিউয়েন সাং হর্ষবর্ধনের জনকল্যাণমুখী কাজকর্মের বর্ণনা দিয়েছেন। হিউয়েন-সাং-এর জীবনী জিউ জি-র সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে লিখিত হুইলি-র Life of Hiuen-Tsang, The Tripitaka Master of the Great Zi En Monastery-তে এ সব কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে।  নালন্দায় মহাযান দর্শনের উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করা হত বলে  বলে জানিয়েছেন। জানা যায়,  রাজা হর্ষবর্ধন ওড়িশা পরিদর্শনে গেলে তাঁরা নালন্দাকে পৃষ্ঠপোষকতা দানের জন্য রাজার নিন্দা করেন, নালন্দায় যে ‘আকাশকুসুম’ দর্শনের শিক্ষা দেওয়া হয় তার উপহাস করেন।  তাকে বলা হয়, রাজা হর্ষবর্ধনের উচিত একটি কাপালিক মন্দিরেরও পৃষ্ঠপোষকতা করা ।  হর্ষবর্ধন ফিরে এসে এই কথা নালন্দার অধ্যক্ষকে জানালে, তিনি সাগরমতি, প্রজ্ঞারশ্মি, সিংহরশ্মি ও হিউয়েন সাং-কে ওড়িশার ভিক্ষুদের মতামত খণ্ডন করার জন্য প্রেরণ করেন।

চীনে প্রত্যাবর্তনকালে হিউয়েন সাং ২০টি  ঘোড়ার  ৫২০টি পেটিকায় করে ৬৫৭টি বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থ  যার মধ্যে অনেকগুলো ছিল মহাযান ধর্মগ্রন্থ ও ১৫০টি সংরক্ষিত স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে আসেন।

দুংহুয়াং গুহাচিত্রে হিউয়েন সাং-এর ভারত থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের চিত্র।

নালন্দায় ইৎ সিং

চীনে ফেরার পরবর্তী ৩০ বছরে অন্তত এগারো জন চীনা ও কোরীয় পর্যটক নালন্দায় এসেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে অন্যতম হল ইৎ সিং।

ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং-এর ভ্রমণবিবরণী পড়ে অনুপ্রাণিত হয়ে তীর্থযাত্রী ই ৎসিং ভারত উপমহাদেশে আসার ইচ্ছা পোষণ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি শ্রীবিজয়ে সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা করেন এবং ৬৭৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতে আসেন। তিনি ভারতে চৌদ্দ (১৪) বছর অবস্থান করেছিলেন। এই চৌদ্দ বছরের মধে তিনি দশ বছর তিনি কাটিয়েছেন নালন্দা মহাবিহারে।  ইৎ সিং যখন ৬৯৫ সালে  চীনে ফিরে যান, তখন সাথে করে ৪০০টি সংস্কৃত গ্রন্থ নিয়ে যান। পরে সেই গ্রন্থগুলো অনুদিত হয়।

হিউয়েন সাং তার  জিউ জি গ্রন্থে ৭ম শতাব্দীর ভারতের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক চিত্র বর্ণনা দিয়েছিলেন । কিন্তু ই ৎসিং তাঁর বিবরণে  মূলত বৌদ্ধধর্মের উৎসভূমি ভারতে সেই ধর্মের চর্চা ও মঠের ভিক্ষুদের প্রথা, রীতিনীতি ও নিয়ম-নির্দেশিকার  বর্ণনা করেন।

ইৎ সিং উল্লেখ করেন তখন ২০০টি গ্রামের (রাজস্বের আয় থেকে নালন্দার রক্ষণাবেক্ষণ কার্য চলত। উল্লেখ্য, হিউয়েন সাং- তার বর্ণনায় ১০০টি গ্রামের কথা বলেন।   ইৎ সিং  বর্ণনা করেন, নালন্দা মহাবিহারে আটটি সভাগৃহ ও প্রায় ৩০০টি কক্ষ বিদ্যমান ছিল। মহাবিহারে প্রতিদিন কিছু নির্দিষ্ট আচার অনুষ্ঠান পালন করা হত।   সকাল শুরু হত একটি ঘন্টার মাধ্যমে। ঘন্টা দেওয়া হলে বিহার থেকে হাজার হাজার ভিক্ষু তাদের রুম থেকে বের হয়ে  চত্বরের মধ্যস্থ বা পার্শ্বস্থ একাধিক বিশালাকায় জলাধারে উপস্থিত হতেন এবং স্নান করতেন। এর পরবর্তী ঘন্টার মাধ্যমে বুদ্ধপূজা পালন করা হয়। প্রতিদিন সন্ধ্যায় ‘চৈত্যবন্দনা’ অনুষ্ঠিত হত। এ অনুষ্ঠানটি বিহারের কেন্দ্রস্থলে হত। তবে অধিবাসীর সংখ্যা বেশি বলে এক সাথে সমাবেশ করা কঠিন হত।

নালন্দার ধ্বংস ও ইখতিয়ার উদ্দিন মুহম্মদ বিন বখতিয়ার খলজী

নালন্দা মহাবিহার বেশ কয়েকবার বহিঃশত্রুর দ্বারা আক্রমণের মুখে পড়ে। যতদূর জানা যায়  মোট তিনবার নালন্দা আক্রান্ত হয়। প্রথমবার স্কন্দগুপ্তের সময়ে (৪৫৫-৪৬৭ খৃষ্টাব্দে) মিহিরাকুলার নেতৃত্বে মধ্য এশিয়ার যুদ্ধবাজ হানদের দ্বারা আক্রমণ হয় । উল্লেখ্য মিহিরকুলার নেতৃত্ব হানরা ছিল প্রচণ্ড রকমের বৌদ্ধ-বিদ্বেষী। তারা বিহারে আক্রমণ করে বৌদ্ধ ছাত্র ও ধর্মগুরুদের নির্মমভাবে হত্যা করে। স্কন্দগুপ্ত ও তার পরবর্তী বংশধরেরা একে পূণর্গঠন করেন।

দ্বিতীয় বার নালন্দা আক্রান্ত হয় আরো দেড়শ বছর পরে।  এবার আক্রান্ত হয় বাংলার শাসক শশাংকের দ্বারা। শশাংক তখন গৌড় শাসন করতেন। শশাংক ছিলেন চরম বৌদ্ধ বিদ্বেষী।  রাজা হর্ষবর্ধনের সাথে তার বিরোধ ও ধর্মবিশ্বাস এই ধ্বংসযজ্ঞে প্রভাব বিস্তার করে। রাজা হর্ষবধন প্রথমদিকে শৈব ধর্মের অনুসারী ছিলেন পরবর্তীতে বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন।  এবং হর্ষবধন বৌদ্ধ ধর্মের একজন পৃষ্ঠপোষকে পরিণত হন।

এ সময় বেশ কিছু ব্রাক্ষণ বিদ্রোহ মাথা ছাড়া দিয়ে উঠে। হর্ষবধন  ধীরে ধীরে গজিয়ে উঠা ব্রাহ্মণদের বিদ্রোহও নিষ্ঠুরভাবে দমন করেছিলেন। অন্যদিকে রাজা শশাঙ্ক ছিলেন ব্রাহ্মণ্য ধর্মের একজন শক্তিশালী পৃষ্ঠপোষক ও এর একান্ত অনুরাগী। রাজা শশাঙ্ক যখন মাগ্ধায় প্রবেশ করেন তখন বৌদ্ধদের পবিত্র স্থানগুলোকে ধ্বংস করেন, খণ্ড-বিখণ্ড করেন বুদ্ধের ‘পদচিহ্ন’কে। বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি তার বিদ্বেষ এত গভীরে যে তিনি বৌদ্ধদের ধর্মীয় স্থান ছাড়াও, বুদ্ধগয়াকে এমনভাবে ধ্বংস করেন যাতে এর আর কিছু অবশিষ্ট না থাকে ।চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙয়ের বর্ণনায় শশাঙ্কের আক্রমণ ও নালন্দা ধ্বংসের ইতিহাস ফুটে উঠেছে।

নালন্দা তৃতীয়বারের মত ধ্বংস হয় খলজির হাতে, এটি একটি বিতর্কিত বিষয়। এটি নিয়ে তেমন কোন রেফারেন্স পাওয়া যায় না। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এবং ঐতিহাসিকদের কথা বিবেচনায় আনলে দেখা যায় যে খিলজিকে দোষ দিলে নালন্দার বিলুপ্তির একটা কারন পাওয়া যায় বটে কিন্তু খিলজির সাথে বিহার ধংসের ব্যাপারটি ঠিক মেলানো যায় না।

ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খলজী সংক্রান্ত সকল তথ্যই মুসলিম ঐতিহাসিক মিনহাজউদ্দীন শিরাজের তাবাকাত-ই-নাসিরি গ্রন্থ থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে। নালন্দা ধ্বংসের অপবাদটি খলজিকে দিয়েছিলেন  দিয়েছেন পারসিক মুসলিম মিনহাজ। সেসময় ইসলামী বিশ্বে তুর্কি আর পারসিকদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছিল। খিলজি ছিলেন তুর্কি। তাই তাঁকে ছোট করার উদ্দেশ্য নিয়ে মিনহাজ এসব কথা চালাতে পারেন  বলে ধারনা করা হয়।

মিনহাজের ‘তাব্বাকাত-ই-নাসিরি’ ছাড়া, প্রথম দিকের তূর্ক-আফগানদের এই অভিযানকে সমালোচনা করে লেখা ভারতীয়দের ইতিহাসে পাওয়া যায় না।  খলজি’র নালন্দা ধ্বংসের ঘটনাটি বিশেষ করে বেশিরভাগ হিন্দুদের কাছেই খুব গুরুত্ব পেয়েছে। একপাক্ষিক এই দাবিটি যে ডাহা মিথ্যা একটু খোঁজ নিলেই  জানা যায় । উল্লেখ্য নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় চরমভাবে ধ্বংস হয় দুইবার এবং তার পেছনে প্রতিবারই কলকাঠি নেড়েছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী ও বৌদ্ধদের দ্বন্দ্ব। চীনা পরিভ্রাজক হিউয়েন সাং তাই বলে গেছেন।

এ ছাড়া আরো একটি কারনে এ যুক্তি খন্ডিত হয়ে যায়, তা হল খলজি যখন নালন্দা আক্রমণ করে ধ্বংস করে ফেলেন তখন তিনি যদি ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্যই নালন্দা ধ্বংস করে থাকেন তবে তার দ্বারা বিহারের আরও ৪ টি মহাবিদ্যালয় কেন ধ্বংস হল না?? সেগুলোও তো বৌদ্ধ ধর্মই প্রচার করছিল।

উইকিপিডিয়া থেকে সরাসরি নীচের অংশটি তুলে ধরছিঃ

তাবাকাত-ই-নাসিরি গ্রন্থে এই লুণ্ঠনের বিবরণ পাওয়া যায়:

মুহাম্মদ-ই-বখত-ইয়ার সাহসের সঙ্গে খিড়কি দরজা দিয়ে সেই স্থানে প্রবেশ করেন, দূর্গটি দখল করেন এবং প্রচুর সামগ্রী লুট করেন। সেই স্থানের অধিকাংশ বাসিন্দাই ছিলেন ব্রাহ্মণ এবং এই সকল ব্রাহ্মণদের সকলেরই মস্তক ছিল মুণ্ডিত। তাঁদের সকলকে হত্যা করা হয়। সেখানে প্রচুর বই ছিল। বইগুলি দেখতে পেয়ে মুসলমানেরা কয়েকজন হিন্দুকে আদেশ দেয়, তারা যেন সেই বইগুলি সম্পর্কে তাদের তথ্য দেয়। কিন্তু সকল হিন্দুকেই হত্যা করা হয়েছিল। [বইগুলির বিষয়বস্তু সম্পর্কে] অবহিত হওয়ার পর জানা যায়, সেই দূর্গ ও শহরটি ছিল একটি মহাবিদ্যালয়। হিন্দুদের ভাষায় তাঁরা সেটিকে বলতেন একটি মহাবিদ্যালয় [مدرسه]

উপরিউক্ত উদ্ধৃতিতে একটি বৌদ্ধ মঠ (বিহার) ও তার ভিক্ষুদের (মুণ্ডিতমস্তক ব্রাহ্মণ) উপর আক্রমণের কথা বলা হয়েছে। এই ঘটনার সঠিক তারিখটি জানা যায় না। গবেষকদের মতে, এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১১৯৭ থেকে ১২০৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী কোনও এক সময়ে। অনেক ইতিহাসবিদ মনে করেন, যে মঠটিকে দূর্গ বলে ভুল করা হয়, সেটি ছিল ওদন্তপুরা। তবে কয়েকজনের মতে, সেই মঠটি ছিল নালন্দা বলে থাকেন।

কি বিভ্রান্ত হচ্ছেন ?

এই সময়কার ঘটনাবলির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ হল তিব্বতি ভিক্ষু-তীর্থযাত্রী ধর্মস্বামীর জীবনী। তিনি ১২৩৪ থেকে ১২৩৬ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ভারতে আসেন। ১২৩৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি যখন নালন্দা দর্শন করেন, তখনও এই মহাবিহারটি চালু ছিল।

যদি খলজির আক্রমণে পুরুপুরু ধ্বংস হয়েই যায় তাহলে কিভাবে তিনি ১২৩৫ সালেও নালন্দা’র অস্তিত্ব পান? তবে প্রথাগত তিব্বতি গ্রন্থ, যেগুলি অনেক পরবর্তীকালে রচিত হয়, সেগুলিতে বলা হয়েছে যে, নালন্দা আরও কিছুকাল চালু ছিল।

সর্বশেষ ধ্বংস হওয়া  স্তুপ থেকে নালন্দাকে আবারো মাথা তুলে দাঁড় করানোর শেষ চেষ্টা চালিয়েছিলেন মুদিত ভদ্র নামে এক বৌদ্ধ ভিক্ষু কিন্তু এইবার পুন:রায় তাতে আগুন লাগিয়ে দেয় ঈর্ষার আগুনে জ্বলতে থাকা দুই ক্ষু্ব্ধ ধর্মান্ধ ব্রাহ্মন।  বার বার ব্রাক্ষণদের ধর্মীয় হিংসার অনলে বার বার নালন্দা ধ্বংস হতে হতে কালের গর্ভে হারিয়ে যায় এই প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়টি।

মজার ব্যাপার হল তৎকালীন ভারতীয় ইতিহাসবিদদের কাছে তখন নালন্দার ধ্বংস বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন না করলেও এখন তারা  অসংখ্য লেখা  লিখে যাচ্ছে। ব্যাপকভাবে প্রচার করে যাচ্ছে, নালন্দার ধ্বংস  হয়েছে বখতিয়ার খিলজী নামের এক মুসলিম সেনাপতির হাতে, কিন্তু বেমালুম চেপে যায়, প্রথম দুইবারের ধ্বংসের কথা, যাদের মধ্যে একজন ছিল বাংলার বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্য ধর্মের শাসক রাজা শশাঙ্ক। তারা চেপে যায়, সপ্তম শতাব্দী থেকে ব্রাহ্মণ রাজপূতদের ক্ষমতায় আসার পর বৌদ্ধদের প্রতি অবর্ণনীয় অত্যাচারের ফলে তাদের ঢালাওভাবে দেশত্যাগের কথা।

যাই হোক,  যার নালন্দার হাতেই ধ্বংস হয়ে থাকুক না কেন নালন্দায় বার বার ধর্মীয় বিজয় সফল হলেও লজ্জিত হয় মানবতা, পরাজিত হয় সভ্যতা, শৃঙ্খলিত হয় শিক্ষা।

নালন্দার বিশ্ববিদ্যালয়ের পুর্নজন্ম

প্রায় আটশ বছর বিরান হয়ে থাকার পরে ২০০৬ সালে নালন্দাকে আবার পুনর্জন্ম দেওয়ার প্রস্তাব দেন ভারতের তদানীন্তন রাষ্ট্রপতি এপিজে আবদুল কালাম। বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন যাত্রা ভারত সরকার ও পূর্ব এশিয়া সম্মেলনভুক্ত (ইএএস) ১৮টি দেশের একটি উদ্যোগের ফসল।

চার বছর পরে ২০১০ সালে ভারতীয় পার্লামেন্টে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় বিল পাস হয় । এই প্রস্তবনায় বলা হয় নতুন করে নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করে তাতে  প্রস্তাব রাখা হয়েছিল ভাষাতত্ত্ব, ইতিহাস, পররাষ্ট্রনীতি, পরিবেশবিদ্যা বা বৌদ্ধ দর্শনের মতো নির্বাচিত কয়েকটি বিষয় পড়ানো হবে। প্রতিটি বিষয়ে মাত্র ২০জন করে শিক্ষার্থী ভর্তি হতে পারবে।

বিশ্ববিদ্যালয়টি হবে সম্পূর্ণ আবাসিক। ২০২০ সালের মধ্যে আবসনের সব ব্যবস্থা করা হবে।বিহারের রাজধানী পাটনা থেকে ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত রাজগির শহরে একটি অস্থায়ী ক্যাম্পাসে এই শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হলো। সেখান থেকে মাত্র  ১২ কিলোমিটার দূরে আজও দাঁড়িয়ে আছে দ্বাদশ শতকের প্রাচীন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়টির ধ্বংসাবশেষ।

নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যাতে একটি জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান হয়ে উঠতে পারে তাই  প্রথম থেকেই  দেশ-বিদেশের পন্ডিতদের নিয়ে গড়ে তোলা হয় ‘নালন্দা মেন্টর গ্রুপ’ -যার নেতৃত্বে ছিলেন অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন।

নালন্দার পুনর্জন্ম কেন জরুরি, তা ব্যাখ্যা করে প্রফেসর সেন বলছিলেন

‘এই বিশ্ববিদ্যালয় ছিল এশিয়াব্যাপী একটা অঙ্গীকারের পরিচয় – ভারতের সঙ্গে চীন-জাপান-কোরিয়া ও অন্যদের সহযোগিতার দ্যোতক।

২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরের ১ তারিখ থেকে ১৫ জন ছাত্রছাত্রী আর এগার জন শিক্ষককে নিয়েই যাত্রা শুরু করে নতুন নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়।

ভারত সরকার এই বিশ্ববিদ্যালয়টির পুনরায় গঠনের জন্য ৪৫৫ একর জমি এবং ২৮২৮ কোটি টাকা (প্রায় ৪৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) অনুমোদন করে। চীন, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড ও অন্যান্য দেশের সরকারও এই বিশ্ববিদ্যালয়টি স্থাপনে অর্থসাহায্য করে।

তবে ইতিমধ্যেই শত শত কোটি টাকা খরচ হলেও নালন্দা এখনও পুরোদস্তুর ক্যাম্পাস পায়নি – ধ্বংসাবশেষ থেকে কিছুটা দূরে রাজগীরের এক কনভেনশন সেন্টারেই ক্লাস শুরু হচ্ছে। প্রথমবার সারা বিশ্ব থেকে হাজারেরও বেশি আবেদন পড়লেও কর্তৃপক্ষ মাত্র ১৫ জন ছাত্র-ছাত্রী নির্বাচন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম শুরু করে।

২০১৪ সালের ভর্তি হওয়া ছাত্ররা একটি ভাড়া করা হোটেলে থাকে ক্লাস শুরু করে । বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আবাসিক ডর্মেটরি রয়েছে।এসি বা নন এসি সিংগেল বা শেয়ারড বেজড আবাসিক ব্যবস্তা।  নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হলে আপনাকে নীচের শর্তগুলোর পূরণ করতে হবে।

মাস্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির যোগ্যতাঃ এক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান ও বাইরের ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা শর্ত পূরণ করতে হয়।

ইন্ডিয়ান ছাত্রদের জন্যে ৫৫% মার্কসসহ অন্তত তিন বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রী বা সমপর্যায়ের সিজিপিএ ধারী হতে হবে।

বিদেশী ছাত্রদের জন্যে পূর্বে কমপক্ষে ১৫ বছরের শিক্ষাগত অভিজ্ঞতা দরকার যেখানে অন্তত ৪ স্কেলে ২.২ সিজিপিএ বা সমপর্যায়ের গ্রেড থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে অবশ্যই বিদেশীদের  নীচের যেকোন একটি ইংলিশ ভাষার কোর্স করা থাকতে হবে

পোষ্ট গ্রাজুয়েট ডিপ্লোমা প্রোগ্রামে ভর্তি যোগ্যতাঃ সংশ্লিষ্ট ভাষা বা অন্য কোন বিষয়ে অন্তত তিন বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রী থাকতে হবে।সকল প্রার্থীদের ইংরেজী ভাষার উপর দক্ষতা থাকতে হবে।

শেষ কথা

নালন্দা ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় । এটি শুধু ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, সারা পৃথিবীতেই যত প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়ের  অস্তিত্ব পাওয়া গেছে তাদের মধ্যে নালন্দা অন্যতম। ৪২৭ থেকে ১১৯৭ সাল পর্যন্ত এটি ভারতের অন্যতম বৌদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে সক্রিয় ছিল। প্রাচীনকালে চীন, গ্রিস, পারস্য ইত্যাদি দেশ  থেকে বিদ্যার্থী ও বিদ্বানরা এ বিশ্ববিদ্যালয়ে আসতেন শিক্ষার চর্চা করার জন্যে।  মৌর্য শাসক অশোক নালন্দা বেশ কিছু ভবন তৈরি করে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে গুপ্ত ও পাল সম্রাটরাও  নালন্দা মহাবিহারের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। ভারতের বিহার রাজ্যের পাটনা থেকে প্রাচীন নালন্দা বিহারের দূরত্ব ৯৫ কিলোমিটার। বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার এককালীন ঘনিষ্ঠ সংযোগের কারণেই হোক আর বৌদ্ধ ঐতিহ্যের সাথে আমাদের ঘনিষ্ঠ সংযোগের জন্যই হোক, বাংলাদেশের মানুষ নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যকে ধারণ করে। ফলে এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পুনরুত্থান আমাদের জন্যও একটি বড় খবর।

তথ্য সূত্রঃ

১।https://bn.wikipedia.org/wiki/নালন্দা

২। http://www.dibalok.com/news/details/Literature/2617

৩। http://itibritto.com/story-of-bakhtiyar-khilji-and-the-destruction-of-nalanda-university/

৪। http://shodalap.org/shams/8918/

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক