নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ

rituparno ghoshতাঁর চলে যাওয়া – চলচ্চিত্র জগতে এক আকস্মিক ইন্দ্রপতন। তিনি ছিলেন অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী। তাঁর সৃষ্টির তুলনা করা নচেৎ বোকামি হবে। ত্রিভুজের এক প্রান্তে তাঁকে বসালে অন্য প্রান্তে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ও শেষ প্রান্তে মহাভারতকে লুকিয়ে থাকতে দেখা যাবে। যদিও তিনি বলতেন এ সবই তাঁর মাঝে মিশে আছে। তিনি আর কেউ নন – আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন, বহু পুরস্কার প্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা ঋতুপর্ণ ঘোষ।

“পালাচ্ছে দিনরাত্রি,,
পালাচ্ছে বারোমাস।।
কোথায় থামবে??”

তাঁর জীবনের অবসানটা যেন দ্রুতই ঘটে গেল। বেশ ক’দিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন । ভুগছিলেন প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগে। গত পরশু(৩০-৫-২০১৩) সকাল ৭:৩০টায় কলকাতায় নিজ বাড়িতে তাঁকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। জানা যায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন তিনি। ‘চিত্রাঙ্গদা’ তাঁর অভিনীত ও পরিচালিত শেষ চলচ্চিত্র।

১৯৬৩সালের ৩০শে আগস্ট কলকাতায়, তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সুনীল ঘোষ ছিলেন একজন ডকুমেন্টারি ফিল্ম মেকার। সেই সাথে ছবিও আঁকতেন। ‘সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুল’-এ তাঁর লেখাপড়ার শুরু। এরপর তিনি ‘জাদভপুর ইউনিভার্সিটি’ থেকে অর্থনীতিতে ডিগ্রী লাভ করেন।

এড ফিল্ম দিয়ে যাত্রা শুরু করেন তিনি। ৮০’র দশকে কলকাতার এডগুলো হত ইংরেজি এবং হিন্দির বাংলা সংস্করণ। তিনি এই চিন্তাধারা থেকে সকলকে বের করেন এবং অত্যন্ত সহজধারায় বাংলায় এড তৈরি করেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা ক্রেতাদের আকর্ষণ কাড়ে এবং তিনি পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর প্রতিভা তখন থেকেই সবার চোখে পড়ে।

১৯৯২সালে তিনি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন। শিশুতোষ এই চলচ্চিত্রের নাম দেন ‘হিরের আংটি’। এরপর ১৯৯৪সালে মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত দ্বিতীয় চলচ্চিত্র – ‘উনিশে এপ্রিল’। মা ও মেয়ের সম্পর্ককে স্বচ্ছতার সাথে তুলে ধরেন তিনি যা দর্শক হৃদয়ে দারুণ আলোড়ন ফেলে দেয়। এমনকি আলোচক মহলেও পায় ব্যাপক সাড়া। চলচ্চিত্রটি ভূষিত হয় জাতীয় পুরস্কার এ (সেরা ছবি, সেরা অভিনেত্রী-দেবশ্রী রায়)।

ধীরেসুস্থে নির্মাণ করেন পরবর্তী চলচ্চিত্র। ১৯৯৭সালে মুক্তি পায় ‘দহন’। তুলে ধরেন নারীর অসহায় মনের চিত্র ও সমাজ-ব্যবস্থা। আবারও জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার (সেরা চিত্রনাট্য, সেরা অভিনেত্রী – ইন্দ্রাণী হালদার ও ঋতুপর্ণা সেন)।  ১৯৯৯সালে নির্মাণ করেন ‘বাড়িওয়ালি’। এবার একাকী নারীর মনের অবস্থা তুলে ধরেন তাঁর চলচ্চিত্রের মধ্য দিয়ে। অভিনয়ের স্বীকৃতি হিসেবে কিরণ খের পায় সেরা অভিনেত্রীর জাতীয় পুরস্কার। সে বছরই মুক্তি পায় তাঁর ৫ম চলচ্চিত্র ‘অসুখ’।অভিনেত্রী ও তার নির্ভরশীল পিতার সম্পর্কের উপর নির্মাণ করেন এই চলচ্চিত্র। জিতে নেন জাতীয় পুরস্কার (সেরা বাংলা ছবি)।

২০০০সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘উৎসব’ চলচ্চিত্রের জন্যও পান জাতীয় পুরস্কার (সেরা পরিচালক)। একটি বাড়িকে ঘিরে গড়ে ওঠে চলচ্চিত্রটির দৃশ্যপট।  সব ব্যস্ততা ফেলে পূজোয় সবার ফিরে আসা – এর মধ্যেও তিনি ফুটিয়ে তোলেন সম্পর্কগুলোর গভীরতা।

এরপর নির্মাণ করেন ‘তিতলি’। মেয়ের আকস্মিক পছন্দ মায়ের স্মৃতিগুলো ফিরিয়ে আনার যে নির্মম পরিহাস তা এই চলচ্চিত্রে দেখা যায়। এটি মুক্তি পায় ২০০২সালে। এর পরবর্তী বছরেই মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত আরও দু’টো চলচ্চিত্র এবং জিতে নেয় জাতীয় পুরস্কার – ‘শুভ মহরৎ’ (সেরা বাংলা ছবি) ও ‘চোখের বালি’ (সেরা বাংলা ছবি)।

এবার কাজ করেন হিন্দি চলচ্চিত্র নিয়ে এবং ১৭দিনে নির্মাণ করেন ‘রেইনকোট’। চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায় ২০০৪সালে এবং আবারও জিতে নেয় জাতীয় পুরস্কার (সেরা হিন্দি ছবি)। এরপর ২০০৫সালে নির্মাণ করেন ব্রিটিশ আমলের জমিদারকে নিয়ে ‘অন্তরমহল’, ২০০৬সালে নির্মাণ করেন মানুষের চরিত্র নিয়ে ‘দোসর’। তাঁর চলচ্চিত্রগুলোয় সম্পর্কের ব্যাপ্তি ও মানুষের মনের ভাব বোঝা যেত পরিস্কার।

২০০৭-এ তিনি ইংরেজি ভাষায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন – ‘দ্যা লাস্ট লেয়ার’। শেকসপিয়রকে পছন্দ করেন এমন এক ব্যাক্তিকে নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র ভূষিত হয় জাতীয় পুরস্কার এ (সেরা ইংরেজি ছবি)। ২০০৮-এ মুক্তি পায় তাঁর নির্মিত চলচ্চিত্র ‘খেলা’। সে বছরই নির্মাণ করেন ‘সব চরিত্র কাল্পনিক’। এ চলচ্চিত্রটিও জিতে নেয় জাতীয় পুরস্বকার (সেরা বাংলা ছবি)।

২০১০সালে তিনি নির্মাণ করেন ‘আবহমান’। এ চলচ্চিত্রটি জিতে নেয় ৩টি জাতীয় পুরস্কার (সেরা বাংলা ছবি, সেরা পরিচালক, সেরা অভিনেত্রী – অনন্যা)। সে বছরই রবীন্দ্রনাথ এর গল্প নিয়ে নির্মাণ করেন ‘নৌকাডুবি’।

এরপর ২০১২সালে আবারও হিন্দি চলচ্চিত্র নিয়ে কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত তা মুক্তি পায় না (সানগ্লাস)। ‘চিত্রাঙ্গদা’ (২০১২) এর মুক্তির পর ‘সত্যান্বেষী’ নিয়ে কাজ শুরু করলেও তা শেষ করে যেতে পারেননি। তাঁর নির্মিত ১৯টি চলচ্চিত্রের ১২টিই অর্জন করেছে জাতীয় পুরস্কার। তিনি শুধু নির্মাণই করেন নি, করেছেন অভিনয়ও। তাঁর অভিনীত চলচ্চিত্রগুলো হল – ‘কাথা দেইথিলি মা কু’ (২০০৩-হিমাংশু পারিজা), ‘আরেকটি প্রেমের গল্প’ (২০১১-কৌশিক গাঙ্গুলি), ‘মেমোরিস ইন মার্চ’ (২০১১-সঞ্জয় নাগ), ‘চিত্রাঙ্গদা’ (২০১২-ঋতুপর্ণ ঘোষ)।

এছাড়াও তিনি ছিলেন উপস্থাপক এবং সম্পাদক।  ইটিভি তে ‘এবং ঋতুপর্ণ’ ও স্টার জলসায় ‘ঘোষ এন্ড কোম্পানি’ নামে দু’টি অনুষ্ঠান উপস্থাপনা করেন তিনি। তাঁর সম্পাদিত পত্রিকা ছিল ‘আনন্দলোক’ এবং সাময়িকী ছিল ‘রোববার’ (সংবাদ প্রতিদিন)।

rituparno ghosh

হঠাৎ থেমে গেলেও তাঁর চলার পথের সাজসজ্জা পাড়ি দেবে বিশাল পথ। স্মরণীয় করে রাখবে তাঁকে – ঋতুপর্ণ ঘোষ।।

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

অচ্যুত সাহা জয়
 

"কখনো কোনো পাগলকে সাঁকো নাড়ানোর কথা বলতে হয় না। আমরা বলি না। আপনি বলেছেন। এর দায়দায়িত্ব কিন্তু আর আমার না - আপনার!"