নীলাচল , নীলগিরি প্রকৃতির এক অপরুপ সৌন্দর্য্যের হাতছানি

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপরুপ লীলাভূমি। বান্দরবান জেলাকে প্রকৃতি অকৃপণভাবে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে। সৌন্দর্যমন্ডিত এই জেলা ভ্রমণের জন্যে পর্যটকদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বান্দরবানে অসংখ্য পর্যটন স্পট ও ট্রেকিং এরিয়া রয়েছে। এ সব পর্যটন স্থানের মধ্যে নীলগিরি ও নীলাচল অন্যতম। আপনি একই দিনে নীলগিরি ও নিলাচল ঘুরে আসতে পারেন। ফ্যামিলি ট্রিপের জন্যে একদিনে স্বর্ণমন্দির, নীলাচল, নীলগিরি এই স্থান তিনটি খুবই উপযুক্ত।

নীলাচল

নীলাচল (Nilachal) বান্দরবানের আকর্ষণীয় একটি পর্যটন কেন্দ্রে। বান্দরবান শহরের সবচেয়ে কাছে সবচেয়ে সুন্দর পর্যটন কেন্দ্র সম্ভবত নীলাচল।  এটি বান্দবান শহর থেকে ৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। নীলাচলের উচ্চতা সমুদ্রপৃষ্ট থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট যা কিনা টাইগার পাড়ায় একটি পাহাড়ের উপরে অবস্থিত। বান্দরবান শহর ছেড়ে চট্টগ্রামের পথে প্রায় তিন কিলোমিটার চলার পরেই হাতের বাঁ দিকে ছোট একটি সড়ক এঁকেবেঁকে চলে গেছে নীলাচলে। এ পথে প্রায় দুই কিলোমিটার পাহাড় বেয়ে তাই পৌঁছুতে হয়। মাঝে পথের দুই পাশে ছোট একটি পাড়ায় দেখা যাবে ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠীর মানুষের বসবাস।
চারদিকে দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়ের ঢালে কোথাও আঁকা-বাঁকা রাস্তা, পাহাড়ী পাড়া আর রূপালী নদী গুলো যেন শিল্পীর আঁকা ছবি। এই পাহাড় থেকে এক নজরে দেখা যাবে পুরো বান্দরবান শহর। সুর্যোদয় আর সুর্যাস্ত দেখা যেতে পারে এখান থেকেও। সকালে মেঘের ভেলার খেলা আর বিকেলের সূর্যাস্ত এই দুইটি সময়ই নীলাচল তার পূর্ণ রূপ ধারণ করে। নীলাচলে সুর্যাস্তের দৃশ্য আমাদের মনে স্বর্গীয় অনুভূতি আনে। এই জায়গায় বর্ষা, শরৎ কি হেমন্ত— তিন ঋতুতে ছোঁয়া যায় মেঘ।
নীলাচলে রয়েছে আকাশ, পাহাড় আর মেঘের অপূর্ব মিতালী আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের চাদর। যদি মেঘের দেখা পেতে চান তবে খুব সকালে যেতে হবে নীলাচল। শহরের পাশের সাঙ্গু নদীকেও খালি চোখে দেখা যায় ৷ আর আকাশ মেঘমুক্ত থাকলে হয়ত দূরের কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত উপভোগ করতে পারবেন। উপরে উঠলে দেখতে পাবেন পাহাড়ী আঁকাবাঁকা রাস্তা এটিও পর্যটকদের বিমোহিত করে। নীলাচলের একেক স্থান থেকে একেক রকম প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য উপভোগ করা যায়। নীলাচলের পাহাড়ে  চোখ জুড়ানো বনফুলের দৃশ্য চারপাশেই দেখা যায়৷

নীলাচলের সৌন্দর্য অবলোকন করার জন্য আগত পর্যটকদের জন্যে এখানে আছে কয়েকটি বিশ্রামাগার ও রিসোর্ট। সম্প্রতি পর্যটকদের জন্যে নতুন কয়েকটি জায়গা তৈরি করা হয়েছে । নীলাচলের মূল পাহাড়ের শিখরের চারপাশেই মনোরম স্থাপনা শৈলীতে নির্মাণ করা হয়েছে এসব কেন্দ্র।  এখানকার টিকেট ঘরের পাশে ‘ঝুলন্ত নীলা’ থেকে শুরু করে ক্রমশ নীচের দিকে আরও কয়েকটি বিশ্রামাগার তৈরি করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘নীহারিকা’ এবং ‘ভ্যালেন্টাইন’ পয়েন্ট। পাহাড়ের নানা ঢালে এস্থানগুলো গড়ে তুলা হয়েছে। একেকটি স্থান অন্যটি থেকে আলাদা। একেক জায়গা থেকে সামনের পাহাড়ের দৃশ্যও একেক রকম। কমপ্লেক্সের মাঝে বাচ্চাদের খেলাধুলার ব্যবস্থা এবং বসার ব্যবস্থা রয়েছে।

নীলাচলে পর্যটকরা সাধারণত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত থাকতে পারেন। নীলাচলে বাড়তি আকর্ষণ হল এখানকার নীল রং এর রিসোর্ট। নাম নীলাচল স্কেপ রিসোর্ট। শুধুমাত্র যারা রিসোর্টে রাত্রি যাপন করেন তাদেরই থাকার অনুমতি মিলে। নীলাচলে পাহাড়ে সবুজের ঢালে ঢালে পর্যটকদের থাকার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ‘নীলাচল এস্কেপ রিসোর্ট’৷ সাধারণ পর্যটকদের জন্য এ জায়গাটিতে সূর্যাস্ত পর্যন্ত অবস্থানের অনুমতি থাকলেও রিসোর্টের অতিথিরা সারা রাতই উপভোগ করতে পারেন নীলাচলকে ।

প্রবেশ মূল্য

নীলাচল পর্যটন কমপ্লেক্সে জনপ্রতি প্রবেশ মূল্য ৩০ টাকা। নীলাচলে যেতে সড়কের টোল পরিশোধ করতে হয়। অটো রিকশা ৩০ টাকা, জিপ ৬০ টাকা। পর্যটকরা সকাল থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত নীলাচলে অবস্থান করতে পারবেন।

কোথায় থাকবেন

নীলাচলে থাকতে চাইলে নীলাচল স্কেপ রিসোর্টের তিনটি কটেজের একটি থেকে বেছে নিতে পারেন  আপনার পছন্দের কটেজ । প্রতিটি কটেজে দুইটি করে রুম আছে, প্রতি রুমের ভাড়া পড়বে ৩০০০ টাকা। নীলাচলে থাকতে চাইলে আগে থেকেই  বুকিং দিয়ে রাখা ভাল । এছাড়া নীলাচল বান্দরবান শহরের কাছে বলেই আপনি বান্দরবান শহরের হোটেল ও রিসোর্ট গুলোতে থাকতে পারবেন।

নীলগিরি

বাংলাদেশের সবচেয়ে উচু পাহাড় চূড়া গুলোর মধ্যে নিলগিরি অন্যতম। বান্দরবান জেলা শহর থেকে প্রায় ৫২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২০০ ফুট উচ্চতায় এই পর্যটন কেন্দ্রটি অবস্থিত৷ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২২০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থানের কারণে নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্র সর্বদা মেঘমণ্ডিত আর এটাই এই পর্যটন কেন্দ্রের বিশেষ আকর্ষণ।  এই জায়গা থেকে পর্যটকরা সহজেই মেঘ ছুঁতে পারেন বলে একে বাংলাদেশের দার্জিলিংও বলা হয়৷

আপনি যদি কখনো বান্দরবান যান , তবে প্রথমেই দেখতে পাবেন ‘চান্দের গাড়ি ‘ । ইচ্ছে হলে চান্দের গাড়িতে অথবা জিপ-এ করে চলে যেতে পারেন চিম্বুক । বান্দরবান শহর থেকে সেখানে পৌছুতে আপনার প্রায় এক ঘন্টার একটু বেশি সময় লাগবে । চিম্বুক হতে নীলগিরির দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার । গাড়িতে যেতে প্রায় ৪৫ মিনিটের মতো সময় লাগে ।

এই পুরো পর্যটন কেন্দ্রটিই প্রতিষ্ঠা করেছিল বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং তারাই এর পরিচালনা করে থাকেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৭ ইঞ্জিনিয়ার কন্সট্রাকশন ব্যাটালিয়ন কর্তৃক চিম্বুক-থানচি সড়কটি নির্মাণের সময় ম্রো জনগোষ্ঠী অধ্যুষিত বান্দরবান থানিছ সড়কের কাপ্রু পাড়া এলাকায় প্রথমে নিরাপত্তা চৌকি হিসেবে এটি নিমিত হয়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাদের পরিকল্পনায় এটি একটি পর্যটন কেন্দ্রের পূর্ণতা লাভ করে।  বান্দরবানের আলীকদম থেকে থানচীগামী রাস্তা ধরে পাহাড়ী পথে নীলগিরি পৌঁছানো যায়।

দীগন্ত জুড়ে সবুজ পাহাড় আর মেঘের লুকোচুরি যে কাউকে নীলগিরি তার রূপ দিয়ে বিমোহিত করে রাখবে। যেখানে আকাশ যেন পাহাড়ের সাথে মিতালী করেছে, মেঘগুলো চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে। আপনাকে একা হতে দিবে না। নীলগিরি গেলে মনে হবে আকাশ নিজে এসে ধরা  আপনার হাতে ধরা দিয়েছে। মাথার উপর নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা খেলা করে নীলগিরির পাহাড়ে। অপরূপ সৌন্দর্য্যের এক নীলাভূমি এই নীলগিরি। চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় এঁকেবেঁকে চলা নদী,মেঘ ছুয়ে যায় চুল।

শীতকাল এবং বর্ষাকাল দুই ঋতুতেই এইখানে ভ্রমণে অনেক বেশি আনন্দ। তবে বর্ষাকালে ভ্রমণে গেলে বেশী মজা পাওয়া যায়। কারণ এই সময়ে মেঘের অপরূপ নৃত্য দেখতে দেখতেই দিন বয়ে যায়। মেঘেরা কতটা দ্রুত বিস্তার লাভ করে সেটা এবার বর্ষায় যারা নীলগিরি ভ্রমণে গিয়েছেন তারাই বলতে পারবেন। চিন্তা করুন আপনি দাঁড়িয়ে আছেন আর সাদা মেঘ আপনার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। দারুণ অনুভূতি। শরীর-মন জুড়িয়ে যায় অল্পতেই। এ এক অসাধারণ সৌন্দর্য।

নীলগিরি যাওয়ার পথে আপনি দেখে যেতে পারেন বান্দরবানের অপার সৌন্দর্যময় শৈলপ্রপাত। এখানে আদিবাসী বম তরুণীরা আপনাকে স্বাগত জানাবে। তাদের কাছে পাবেন নানা হস্ত শিল্পের জিনিস।  বান্দরবান থেকে নীলগিরি যেতে পাহাড়ি পথের ধারে নিজেদের নানান হস্তশিল্প বিক্রি করেন ক্ষুদ্র-নৃ গোষ্ঠীর মানুষেরা । পর্যটকরা সহজেই কিনতে পারেন এসব আকর্ষণীয় পণ্য ।

নীলগিরি থেকে চারপাশে তাকালে সারি সারি মেঘের পাহাড়ে আছড়ে পড়া ও প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য আপনাকে বিমোহিত করবে। নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে যে দিকে চোখ যায় শুধুই সবুজ আর সবুজ । চারপাশে সবুজের সমারোহ আর নির্জন প্রকৃতি নীলগিরির অন্যতম আকর্ষণ । নীলগিরির চূড়া থেকে পাহাড়ের সারির পাশাপাশি আকাশ পরিস্কার থাকলে আপনার চোখে পড়বে বগালেক, বাংলাদেশের সর্বোচ্চ পাহাড় চূড়াগুলোর একটি কেওক্রাডং, কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত এবং চট্টগ্রাম বন্দর ও সাঙ্গু নদী।

নীলগিরির সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হল এখান থেকে চোখে পড়ে বান্দরবানের উপর দিয়ে বয়ে চলা সর্পিলাকার সাঙ্গু নদী। সাঙ্গু নদীর অপরূপ সৌন্দর্য এখান থেকে উপভোগ করা যায়। সাঙ্গুর বুক চিরে বয়ে চলা ছোট ছোট নৌকাগুলোকে দেখলে দূর থেকে মনে হবে ছোট ছোট কিছু পোকা বয়ে চলছে সাঙ্গু নদী দিয়ে।

নীলগিরি পর্যটন কমপ্লেক্সের পাশেই আরেকটি পাহাড়ে ক্ষুদ্র ‍নৃ-গোষ্ঠী ‘ম্রো’দের গ্রাম ‘কাপ্রু পাড়া’ । নীলগিরিতে বেড়াতে যাওয়া পর্যটকরা সহজেই অবলোকন করতে পারেন আদিবাসী এই জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা । নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রের পাশেই পাহাড়িদের জুম ক্ষেতের মাঝে জুম ঘর   দেখা মিলে।  জুম চাষের এ দৃশ্য দেখা যাবে জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত ।

পিঠে বেতের ঝুড়ি নিয়ে  মেয়েরা খাড়া পাহাড় বেয়ে বাগানের  যত্ন নিচ্ছে  আপন মনে। তাদের হাতের কোমল পরশে বাগানের গাছপালাগুলো তরতর করে বেড়ে উঠছে । এসব বাগানের মাঝে বেড়ে উঠেছে সেগুন, কড়ই, নিমসহ নানা জাতের ফলদ ও বনজ গাছ। এসব গাছপালার সঙ্গে হিমেল হাওয়ায় ভেসে আসা টগর, গাঁদা, বকুল, বেলি, মাধবিলতা, জবা ফুলের সুবাসে মন হারিয়ে যায় কোনো এক স্বর্গীয় অনুভূতির খোঁজে।

কোথায় থাকবেন ?

নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে আছে বেশ কয়েকটি কটেজ৷ ফলে পর্যটকরা চাইলে পাহাড়চূড়ার এ পর্যটন কেন্দ্রটিতে সহজেই রাত যাপন করতে পারেন । নীলগিরিতে রাতযাপনের জন্য সেনাবাহিনী পরিচালিত মেঘদূত, আকাশনীলা, নীলাঙ্গনা, হেতকরা রাইচা, মারমা রাইচা নামের আকর্ষণীয় কয়েকটি কটেজ রয়েছে। আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সংবলিত এসব কটেজে অবস্থান ও রাতযাপনের জন্য সেনাবাহিনীর বান্দরবান ব্রিগেড হেডকোয়ার্টারের সঙ্গে আগাম যোগাযোগ করতে হয়।

ভাড়া ৪ হাজার থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। ভাড়া একটু বেশি পড়লেও রাতে থাকলে আপনার টাকা উসল হবে যাবে।নীলগিরির রাতের সৌন্দর্য আরো হতবাক করে। চারিদিকের হরিণ, শিয়ালসহ বিভিন্ন বন্য প্রাণীর ডাক আর পাহাড়গুলোর আলো-আঁধারির খেলা দেখে আপনার জীবনকেই যেন রহস্যময় বলে মনে হবে।

আর নীলগিরি রেস্টুরেন্টে দশ জনের অধিক খাবার খাওয়ার ক্ষেত্রে বিলের সঙ্গে অতিরিক্ত এক থেকে দেড় হাজার টাকা চার্জ নেয়ার নিয়ম রয়েছে। নীলগিরি’তে রাত্রিযাপনে কটেজের রুম বুকিং এবং রেস্টুরেন্টে খেতে প্রায় দেড় মাস আগে বুকিং দিতে হয়।

বুকিংয়ের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর অফিসার পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার রেফারেন্স অবশ্যই লাগবে। রেফারেন্স ছাড়া কোনো বুকিং নেওয়ার নিয়ম নেই নীলগিরি রিসোর্টে। তবে পর্যটকদের ঘুরে বেড়াতে কোনো রেফারেন্স লাগে না, সেক্ষেত্রে নীলগিরি পর্যটন স্পটটি ঘুরে বেড়াতে পর্যটকদের জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং গাড়ির জন্য আলাদা তিনশ টাকা অতিরিক্ত ফি নেয়ার নিয়ম চালু রয়েছে।

তবে যদি চান  বান্দরবান শহরে রয়েছে থাকার জন্য আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সংবলিত প্রচুর ভালো মানের হোটেল। সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে রুম ভাড়ায়ও তারতম্য ঘটে এসব হোটেলে। সেটা ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা বা কোথাও কোথাও তারও বেশি হতে পারে। নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রটি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত । এর সার্বিক তত্ত্বাবধানে আছে বান্দরবান সেনা রিজিয়ন । তাই দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় হলেও জায়গাটিতে নিরাপত্তার কোনো অভাব নেই ।

কখন যাবেন

অপরূপ সৌন্দর্য্যের এক নীলাভূমি এই নীলগিরি। নীলগিরির কারণে বান্দরবানকে বাংলাদেশের দার্জিলিং বলা হয়। শীতকাল এবং বর্ষাকাল দুই ঋতুতেই এইখানে ভ্রমণে অনেক বেশি আনন্দ। তবে বর্ষাকালে ভ্রমণে গেলে বেশি আন্দন পাওয়া যায়। কারণ এই সময়ে মেঘের অপরূপ নৃত্য দেখতে দেখতেই দিন বয়ে যায়। আর এই জন্যে নীলগিরিতে খুব সকালে যেতে হবে। তবে বর্ষায় অতি বৃষ্টি হলে পাহাড় ধ্বসের আশংকা থাকে তখন অনেক সময় নীলগিরি যাবার রাস্তা বন্ধ থাকে।

নীলগিরি তার রুপের পসরা মেলে সারা বছরই বসে থাকে। সকাল বেলা পাবেন মেঘের ভেলা , সূর্যোদয়ে পাবেন আলোর খেলা। বিকেলের সূর্যাস্ত কিংবা জ্যোৎস্না রাতের মায়াময় চারপাশ আপনাকে মুগ্ধ করবে । শরৎ আর হেমন্তের মেঘ আর নীল আকাশ মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে। শীতে কুয়াশার চাদরে মুড়ে থাকে চারপাশ। সে এক দেখার মত দৃশ্য। তাই নীলগিরি যেতে পারবেন যে কোন সময়ই।

নীলাচল বা নীলগিরি যাবার উপায়

আপনি দেশের যেখানেই থাকেন না কেন নীলাচল কিংবা নীলগিরিতে যেতে হলে আপনাকে প্রথমে বান্দরবান আসতে হবে। যদি ঢাকা থেকে আসতে চান সে ক্ষেত্রে ঢাকার নানা জায়গা থেকে এস. আলম, সৌদিয়া, সেন্টমার্টিন পরিবহন, ইউনিক, হানিফ, শ্যামলি, ডলফিন ইত্যাদি পরিবহনের বাস বান্দারবানের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। জনপ্রতি এসব বাসের ভাড়া  যথাক্রমে নন এসি ৫৫০ টাকা ও এসি ৯৫০-১৫০০ টাকা। সাধারণত ঢাকা থেকে বাসে বান্দরবান যেতে সময় লাগে ৮-১০ ঘন্টা।

আর কেউ যদি মনে করেন ট্রেনে যাবেন সে ক্ষেত্রে পুরু পথ ট্রেনে চাইলেও যেতে পারবেন না । সে ক্ষেত্রে ঢাকা থেকে ঢাকা থেকে চট্রগ্রাম গামী সোনার বাংলা, সুবর্ণ এক্সপ্রেস, তূর্ণা নিশিতা, মহানগর গোধূলি এইসব ট্রেনে করে চট্রগ্রাম যেতে পারবেন। শ্রেনীভেদে ভাড়া ৩৫০ থেকে ১২০০টাকার মত। কেউ চাইলে অবশ্য বিমান পথেও আসতে পারেন।

ট্রেনে বা বিমান পথে চট্টগ্রাম পৌঁছার পর চট্টগ্রামের বদ্দারহাট থেকে পূবালী ও পূর্বানী নামের দুটি বাসের একটি উঠে পারতে পারেন। এ বাস দুটি বান্দারবান- চট্টগ্রাম আসা যাওয়া করে।  এ দুটি বাসে জনপ্রতি ২২০ টাকা ভাড়া লাগে। চট্রগ্রামের ধামপাড়া বাস স্ট্যান্ড থেকে ২০০-৩০০ টাকা ভাড়ায় বাসে করে বান্দরবান আসতে পারবেন।

বান্দরবান থেকে নীলাচল বা নীলগিরিতে যেতে চাইলে চান্দের গাড়ি/ জিপ/ সিএনজি বা লোকাল বাসে আসা যাওয়া করতে পারবেন। তবে লোকজন যদি ৮-১২ জন হয় তবে চান্দের গাড়ি ভাড়া করে নেওয়া ভাল। রিজার্ভ ভাড়া নিলে আশে আশে আরো কিছু স্থানে ঘুরতে পারবেন বা কোথা আদিবাসি পল্লীতে একটু সময় কাটাতে পারবেন। বান্দরবান স্ট্যান্ড থেকে সাধারনত এক দিনের জন্যে ৩০০০-৫০০০ টাকার মধ্যেই ভাড়া পেয়ে যাবেন। ভাড়া ফিক্সড করা করা থাকে। ল্যান্ডক্রুজার টাইপ জীপ গুলোতে ৭-৮ জন যেতে পারবেন, ছোট জীপ আছে সেগুলোতে ৪-৫ জন থেকে পারবেন আর সিএনজিতে ৩-৪ জন।

কোন ধরনের সমস্যা না হলে নীলাচলে আশা করা যায় ৪৫ মিনিটে পৌছে যাবেন। আর নীলগিরিতে যতে আড়াই থেকে তিন ঘন্টা লাগতে পারে।

আপনাদের ট্রিপ মেটের সংখ্যা যদি কম হয় তাহলে লোকাল বাসে যেতে পারেন। সে ক্ষেত্রে থানচি বাস স্ট্যান্ড থেকে ১ ঘন্টা পর পর ছেড়ে যাওয়া কোন বাসে উঠে পড়ুন। ভাড়া নিবে ১২০ টাকা। চাইলে আপনারা অন্যকোন গ্রুপের সাথে শেয়ারে গাড়ি নিতে পারেন । তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

নীলগিরি যাওয়ার পথে নিরাপত্তার জনিত কারণে সেনা চেকপোষ্টে পর্যটকদের নাম ও ঠিকানা লিপিবদ্ধ করতে হয়। সাধারণত বিকেল ৫ টার পর থেকে নীলগিরির উদ্দেশে আর কোন গাড়ীকে যেতে দেয়া হয় না তাই ভ্রমণের পূর্বে সময়ের দিকে খেয়াল রাখুন। নীলগিরি পর্যটন কেন্দ্রে যাবার জন্যে পর্যটকদের কাছ থেকে টিকেট বাবদ জনপ্রতি ৫০ টাকা এবং গাড়ির জন্য আলাদা ৩০০ পার্কিং ফি নেয়া হয়।

কোথায় থাকবেন

নীলাচলে জেলা পরিষদের তত্ত্বাবধানে নীলাচল স্কেপ রিসোর্টে তিনটি কটেজ পরিচালিত হয়। ভাড়া ৩০০০ টাকার মত। থাকলে চাইলে আগে থেকেই যোগাযো করে বুকিং দিয়ে রাখতে হবে।  আর  নীলগিরিতে সেনবাহিনী নিয়ন্ত্রিত কটেজে থাকার ব্যবস্থা আছে। ছয়টি কটেজে থাকার জন্যে রুম প্রতি ভাড়া পরবে ৪,০০০-১০,০০০টাকা । তবে নীলগিরি রিসোর্টে থাকতে চাইলে আগে থেকেই বুকিং দিতে হবে এবং বুকিং দিতে সেনাবাহিনীর অফিসার পর্যায়ে পরিচিত কর্মকর্তার রেফারেন্স লাগবে।  তবে কমপক্ষে এক মাসে আগে বুকিং দিয়ে রাখা ভাল তা না হলে বুকিং পাবার সম্ভাবনা কম।

দেখা যায় যে, বেশীরভাগ পর্যটক বান্দরবান থেকে  নীলাচল , নীলগিরি দিনে গিয়ে দিনেই ফিরে আসেন।এ ক্ষেত্রে তারা বান্দবান শহরের আশে পাশের কটেজ, হোটেল বা রিসোর্ট বেঁছে নেন।   বান্দরবানে থাকার জন্যে বেশ কিছু হোটেল, রিসোর্ট ও কটেজ রয়েছে। বান্দরবান থাকার জন্যে যে সকল হোটেল ও রিসোর্ট রয়েছে তার মধ্যে:

হোটেল হিল ভিউ: বান্দরবান শহরের বাস স্ট্যান্ড এর পাশেই। ভাড়া ৮০০ থেকে ২৫০০ টাকা।
হোটেল হিলটন: বান্দরবান শহরের বাস স্ট্যান্ড এর কাছেই। ভাড়া ৮০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
হোটেল প্লাজা: বাস স্ট্যান্ড থেকে ৫মিনিট হাঁটা দূরত্বে। ভাড়া ৬০০ থেকে ৩০০০ টাকা।
রিভার ভিউ: শহরের সাঙ্গু নদীর তীর ঘেষে হোটেলটির অবস্থান। ভাড়া ৬০০ থেকে ২০০০ টাকা।
পর্যটন মোটেল: পাহাড় ও লেকের পাশেই অবস্থিত। শহর থেকে ৪ কি:মি: দুরে মেঘলায় অবস্থিত। ভাড়া ১২০০ থেকে ২৫০০ টাকা।

হোটেল,মোটেল, রিসোর্ট বা কটেজের ভাড়া নির্ভর করে আপনি কোন সিজনে যাচ্ছেন তার উপর।   সিজন (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারী) ও সরকারি ছুটির দিনে পর্যটকের সমাগম বেশি হয় বলে ভাড়া কম বেশি হতে পারে। আর আপনি অফ সিজনে বা ছুটির দিন ব্যতিত যান তাহলে  ২০-৫০% ডিসকাউন্ট পাবেন। তবে ঝামেলা এড়াতে আগে থেকেই হোটেল রুম বুকিং করে রাখতে পারেন।

তথ্য ও ছবিঃ  অনলাইন

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক