চীনা পরিব্রাজক ফা হিয়েন ও হিউয়েন সাং’য়ের উপমহাদেশে আগমন

সুপ্রাচীনকাল থেকেই পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে পর্যটকেরা বাংলায় ছুটে এসেছেন।জগৎবিখ্যাত ইবনে বতুতা থেকে শুরু  করে ফরাসী  জ্যাঁ ব্যাতিস্ত টার্ভানিয়ার বর্ণনায় বাংলায় আগমনের কথা জানা যায়। বাংলায় স্বর্ন বা হিরক খনি ছিল না তবে ছিল এ দেশের সহজ সরল অথিতিপরায়ন মানুষ ও হাজার বছরের আবহমান সংস্কৃতি। সংস্কৃতি আর উদার প্রকৃতির মানুষ এবং পরিবেশের জন্যে এদেশে পর্যটকেরা ছুটে আসতেন। তবে ঠিক কবে থেকে বাংলায় বিদেশী পর্যটকেরা আসতে শুরু করে তার সঠিক হিসাব নেই।

ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রমাণ মিলে চিনের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার সম্পর্ক হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন, বৌদ্ধশাস্ত্রের প্রাচীন গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদ করা , গৌতমবুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানগুলো দর্শন করা , তীর্থ ভ্রমণ, বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত, সিদ্ধাচার্যদের সঙ্গে ভাব বিনিময়, উপমহাদেশখ্যাত বৌদ্ধ বিহারগুলো দর্শন, চীনের সঙ্গে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য খ্রিপূর্ব কাল থেকেই চলে আসছিল বলে জানা যায়। আজকে আমরা বাংলায় চিনা পর্যটকদের আগমন নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করব।

ফা হিয়েন

ভারতীয় উপমহাদেশে  আগমন করা  চৈনিক পর্যটকদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা উল্লেখযোগ্য হচ্ছেন ফা-হিয়েন, হিউয়েন সাং, ইৎ-সিং প্রমুখ। এসব সুপ্রসিদ্ধ চৈনিক পর্যটক লিখিত বিবরণাদির মধ্যে ফা-হিয়েনের ভ্রমণ বৃত্তান্তই সর্বাপেক্ষা প্রাচীন। ফা হিয়েনের  ইংরেজি: Fa Xian ,প্রথাগত চীনা: 法顯; সরলীকৃত চীনা হল 法显 । বৌদ্ধ এ যাজকের নামের সঠিক উচ্চারণ সম্ভবত ফাজিয়ান এবং তা ফা-সিয়েন হিসেবেও লেখা হয়। ফা হিয়েন নিয়ে একটি গল্প প্রচলিত আছে। 

চীন দেশের এক গ্রাম। সেই গ্রামের দশ এগার বছরের একদল ছেলে মাঠের মধ্যে  পাকা ধান কাটছিল। এমন সময় তাদের সামনে এসে দাঁড়াল একদল দস্যু ধান লুট করতে আসল। কিশোর ছেলের দল ভয়ে দিশেহারা হয়ে যে যেদিকে পারল ছুটে পালাল। কেবল একজন তার নিজের জায়গায়  গাছের মত দাঁড়িয়ে যেন তার চোখে এক ফোটা  ভয়ের চিহ্ন নেই । বরং তার ভয়হীন  সহজ-সরল মুখে কেমন একটা বেদনার আঁচড়। দস্যুদের দিকে সেই বেদনার চোখ তুলে বালকটি বলল, “পূর্বজন্মে তোমরা অনেক পাপ করেছ, এ জন্মে তাই তোমাদের এমন দুঃখের জীবন।একারনে তোমাদের চুরি করে বাঁচতে হয় । আর চুরি কর না  তাহলে পরের জন্মে আরও বেশী দুঃখ পাবে।”
এক ছোট্ট বালকের মুখে এমন অদ্ভুত জ্ঞানের কথা শুনে দস্যু দল  অভিভূত হয়ে গেল।   তারা পাকা ধানের দিক থেকে বাড়ানো হাত সরিয়ে নিয়ে, ফাঁকা হাতে তারা ফিরে চলে গেল মাঠ ছেড়ে। একা দাঁড়িয়ে থাকা এ ছেলেটি হল ফা হিয়েন।

ফা হিয়েন ৩৩১ খ্রিস্টাব্দে চিনের ফিং ইয়াং অঞ্চলের উ ইয়াং নামক স্থানে জন্মগ্রহণ করেন। ছেলেবেলা থেকেই বাবা মা তাঁকে আশ্রমে রেখে মানুষ করেছিল বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর আদর্শে । খুব অল্প  বয়সে তাকে আশ্রমে পাঠানো হয়।  দীক্ষা গ্রহণের পর তাঁর ফা-হিয়েন (অর্থাৎ বিনয়ের প্রতিমূর্তি) নামকরণ হয়, তিনি ‘সি’ উপাধিতেও ভূষিত ছিলেন। সি শব্দের অর্থ শাক্য নন্দন।  চীনে তখন ঘরে ঘরে বৌদ্ধ ধর্ম ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে। তৈরী হচ্ছে মঠের পর মঠ। চীনাভাষায় বৌদ্ধশাস্ত্র অনুবাদ করা হচ্ছে। এর পরেও কিছু কিছু সন্ন্যাসীর মনে একটা গভীর সংশয় রয়ে যায়।

তাঁরা প্রতিদিন যে সব আচার-আচরণ পালন করে চলেছেন, তার কোনটা ঠিক কোনটা বেঠিক, কোন জিনিষটার আসল মানে কি, এসব জানা যাবে কি করে? জানতে হলে একটাই পথ। সে হল  ভারতবর্ষে বুদ্ধের জন্মভূমিতে গিয়ে শিক্ষালাভ করা । সেখান থেকে বৌদ্ধশাস্ত্রের বইপত্র নিয়ে আসাই হল একমাত্র উপায়। ফা-হিয়েনের বয়স যখন  পয়ষট্টির উপরে, তিনি নিজেই সেই গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নিলেন।ভারতবর্ষে যেয়ে নিয়ে আসবেন বৌদ্ধশাস্ত্রের বইপত্র এবং বুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন।

খ্রিস্টীয় চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে তাওআন নামে একজন সুপন্ডিত ও নিষ্ঠাবান বৌদ্ধ ভিক্ষুর শিক্ষার প্রভাবে  চিনের ভিক্ষু সম্প্রদায়ের মধ্যে গৌতম বুদ্ধ এবং বৌদ্ধধর্মের জন্মভূমি ভারতীয় উপমহাদেশ পরিদর্শন করবার প্রবল আগ্রহ ও উদ্দীপনা সঞ্চারিত হয়। তাছাড়া,  তখন সুপ্রসিদ্ধ ভারতীয় বৌদ্ধ পন্ডিত কুমারজীবও চিন পরিদর্শনে আসেন। বিখ্যত এ দু’জন বৌদ্ধ পন্ডিতের উৎসাহ-অনুপ্রেরণায় ফা-হিয়েন এবং আরো চারজন চিনা ভিক্ষু ভারতে আসার পরিকল্পনা করেন।  নিজের দেশে তাঁর গুরু ছিলেন কুমারজীব। চতুর্থ শতাব্দীতে তিনি চীনে গিয়েছিলেন ।  ভারতবর্ষে পা বাড়ানোর আগে যেদিন শিষ্য এসে প্রণাম জানালে গুরুর পায়ে, গুরু বললেন,

‘যদিও তোমার আসল কাজ ধর্ম বিষয়ে জ্ঞানলাভ, তবুও যে দেশে যাচ্ছ, সে দেশের সব কিছুই তাকিয়ে দেখো। তুমি ফিরে এলে, তোমার চোখ দিয়ে এ দেশের মানুষ যেন দেখতে পায় একটা গোটা ভারতবর্ষের ছবি।’

তাঁর সহযাত্রী চারজন চিনা ভিক্ষুর নাম হল লুই কিং, তাও কিং, হুইয়িং ও লুই ওয়েই। ৩৯৯ খৃস্টাব্দে চ্যাংগান থেকে তারা মধ্য এশিয়ার পথে ভারতীয় উপমহাদেশ অভিমুখে যাত্রা করেন। তিব্বতের পামীর মালভূমির দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে সঙ্গীদের সাথে তিনি এখানে আসেন।

মৌর্য সাম্রাজ্যের পর ভারতবর্ষে রাজত্ব করেছে বিদেশী কুষাণরা। তারপর আসে গুপ্ত সাম্রাজ্য। প্রথমে প্রথম চন্দ্রগুপ্ত। তারপর সমুদ্রগুপ্ত, তারপর দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, এই দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তই কিংবদন্তীর সেই বিখ্যাত বিক্রমাদিত্য। ইতিহাসে বা উপকথায় সম্রাট বিক্রমাদিত্যের তালবেতাল, বত্রিশ সিংহাসন সহ আরো  অনেক মজার সব গল্প আছে।  তাঁর আমলেই ফা-হিয়েন এসে পৌঁছলেন ভারতে।

ফা-হিয়েন গুপ্তযুগে সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বিক্রমাদিত্যের রাজত্বকালে ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন।  চীন থেকে ভারতবর্ষে আসার কোনো সোজা-সাপ্টা পথ ছিল না তখন কোথাও। বহু কাঠখড় পুড়িয়ে তবেই ভারতবর্ষে আসতে হত। ভারতীয় উপমহাদেশে আগমনকারী চিনা পর্যটকদের সবাই কিন্তু মধ্য এশিয়ার দুর্গম পাহাড় অরণ্য মরুভূমি অতিক্রম করে আসেননি। এঁদের কেউ-বা অসম, ব্রহ্মদেশ পথে, কেউ-বা তিববত ঘুরে আবার কেউ বা সমুদ্রপথে সেকালের সুসমৃদ্ধ তাম্রলিপ্তি (বর্তমান পশ্চিম বাংলার তমলুক) বন্দরে হয়ে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রবেশ করেন।  ফা-হিয়েন এসেছিলেন রোদে জ্বলজ্বল বিরাট মরুভূমি গোবী পেরিয়ে খোটান। সেখান থেকে বরফেঢাকা পামীর পর্বতমালা ডিঙিয়ে সিন্ধু নদীর তীরে। সিন্ধু পেরিয়ে গান্ধার, তক্ষশীলা, পুরুষপুর। পুরুষপুর হল এখনকার পেশোয়ার।

আসা পথে তারা পথে ভারতীয় উপমহাদেশগামী আরও একটি চিনা ভিক্ষু দলের সাথে মিলিত হন। তুন হুয়াং থেকে তারা অগ্নিদেশে অর্থাৎ কারাসর আসেন এবং সেখান থেকে দুর্গম ও বিপদসংকুল মরুপথ অতিক্রম করে মধ্য এশিয়ার অন্যতম বৌদ্ধ সংস্কৃতি কেন্দ্র খোটানে উপস্থিত হন। এখানে কিছুকাল অবস্থানের পর ফা-হিয়েন ও তার সাথীরা পামীর অঞ্চল পার হয়ে গিলগিটের পথে কাশ্মীরে প্রবেশ করেন।

দীর্ঘ সাত মাসের পথকষ্টে ও রোগাক্রান্ত আক্রান্ত হয়ে এ সময় ভিক্ষু দলের অনেকে নিরুৎসাহীত হয়ে পড়লেও ফা-হিয়েন ছিলেন তার লক্ষ্যে অটল। ফা-হিয়েনের চারজন সহযাত্রীর  মধ্যে দু’জন লুই ওয়েই ও হুইয়িং পথের ক্লেশ সহ্য করতে না পের নিজ দেশে ফিরে যান। লুই কিং পথিমধ্যে মারা যান। ফা-হিয়েনের অপর সহযাত্রী তাও কিং পাটলীপুত্র (বর্তমান পাটনা) পর্যন্ত তার সাথে পরিভ্রমণ করেন। পাটলীপুত্রে অবস্থানকালে তাও কিং গভীর মনোযোগ সহকারে বৌদ্ধ শাস্ত্রগ্রন্থাদি অধ্যয়ন করেন। তাও কিং পাটনার  জনজীবনে বুদ্ধদেবের অমর বাণীসমূহের বাস্তব প্রতিফলন দেখে বিশেষ মুগ্ধ হন এবং তিনি ভারত উপমহাদেশেই জীবনের বাকি দিনগুলো কাটানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

অন্যে দিকে,  ফা-হিয়েন ছিলেন অতিমাত্রায় উৎসাহী, উদ্যমী। তাই প্রায় সত্তর বছর বয়সেও তিনি দীর্ঘ সময় ধরে একা একাই ভারতীয় উপমহাদেশের বহু অঞ্চলে গমন করেন।  তিনি উড্ডিয়মান, পুরুষপুর তক্ষশীলা, কপিলাবস্তু, পাটলীপুত্র, রাজগৃহ,  মথুরা, কান্যকুব্জ, শ্রাবন্তী, বৃদ্ধগয়া, বারাণসী ইত্যাদি স্থানের  বৌদ্ধতীর্থ ও বৌদ্ধশাস্ত্র চর্চার কেন্দ্রসমূহ পরিদর্শন করেন।

ফা হিয়েন

ফা-হিয়েন মূলত উপমহাদেশে ভ্রমণ করেন বৌদ্ধশাস্ত্রের বিভিন্ন পুঁথিসংগ্রহ করেন এবং সংস্কৃতি ভাষা শিক্ষা ও পুঁথি নকল করবার উদ্দেশ্যে । পাটলীপুত্রে তিন বছর অবস্থান করেন তিনি এ কাজ চালিয়ে যান । অতঃপর তিনি চম্পায় (ভাগলপুর অঞ্চল) ও পরে তাম্রলিপ্তিতে (তমলুক) উপস্থিত হন।  এ সময় তাম্রলিপ্তি বৌদ্ধধর্মের এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।  বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন, পুঁথি নকল ও বুদ্ধমূর্তির চিত্র ও নকশা অঙ্কনের কাজে তিনি বছর দুয়েক তাম্রলিপ্তিতে  অবস্থান করেন। তারপর তাম্রলিপ্তি  থেকে সমুদ্রপথে সিংহল যান এবং সেখানেও দু’বছর অবস্থান করেন। সিংহল থেকে কিছু বৌদ্ধপুঁথি সংগ্রহ করে তিনি সমুদ্রপথে নানা বিপদের মুখোমুখি হয়ে  প্রথমে যবদ্বীপে পৌঁছেন এবং পরে সেখান থেকে ৪১৪ খৃস্টাব্দে দীর্ঘ পনেরো বছর পরে স্বদেশ চিনে ফিরে যান।

জীবনের বাকি সময়  তিনি চিনদেশে আগত ভারতীয় ভিক্ষু সহযোগিতায় তার নিয়ে আসা শাস্ত্রগ্রন্থের পুঁথিগুলোর চিনা ভাষায় অনুবাদকাজে  ব্যস্ত ছিলেন। পাটলীপুত্রে সম্রাট অশোকের রাজগৃহ দেখে মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন ফা-হিয়েন। তিনি লিখেছেন,

‘পাটলীপুত্র শহরের মাঝখানে অশোকের রাজপ্রাসাদ। আগের মতই উজ্জ্বল এখনো। এই রাজগৃহের পাথর, দেওয়াল, তোরণদ্বার এবং খোদাই ও ভাষ্কর্য্যের কাজ এমন সুনিপুণ যা জগতের আর কোন মানুষের পক্ষে গড়া সম্ভব নয়।

সব দেখে , ফা-হিয়েন পাটলীপুত্রের নাম দিয়েছিলেন ‘ফুলের শহর’।

চিন দেশে  প্রত্যাবর্তনের কয়েক বছর পরে বিরাশি মতান্তরে অষ্টাশি  বছর বয়সে দক্ষিণ চিনের অন্তর্গত কিংচিউ নামক স্থানে সু-য়ু সিন-সে সংঘারামে  ফা হিয়েনের মৃত্যু হয়।

ফা হিয়েন চিন থেকে বের হয়ে মোট বার বছর পরিভ্রমণ করেন। এর মধ্যে ছয় বছর আসা-যাওয়াতে চলে যায়। আর বাকি ছয় বছর তিনি  ভারতীয় উপমহাদেশে অবস্থান করেছিলেন। ফা হিয়েনের ভারত উপমহাদেশ  ভ্রমণের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বৌদ্ধ তীর্থসমূহ পরিদর্শন, সংস্কৃতি ভাষা শিক্ষা ও বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থসমূহের পুঁথি সংগ্রহ।উপমহাদেশের  মানুষের সাথে তার ভাব বিনিময়ের মাধ্যমে ছিল সংস্কৃত ভাষা তাই বিভিন্ন বৌদ্ধ বিহারে অবস্থানকালে তিনি সংস্কৃত ভাষা  অধ্যয়ন করেছিলেন।

ফা হিয়েন সরল বিশ্বাসী ও সংঘের অনুশাসনাবলীর প্রতি খুব নিষ্ঠাসম্পন্ন ছিলেন। এ কারণে ত্রিপিটকের অন্তর্গত বিনয়পিটকের প্রতি তার আগ্রহ খুব বেশি ছিল। তিনি বৌদ্ধশাস্ত্রের যেসব পান্ডুলিপি সঙ্গে নিয়ে যান তার মধ্যে প্রাধান হল মহাসাঙ্ঘিক সম্প্রদায়ের ও মহীশাসন সম্প্রদায়ের বিনয় পিটকদ্বয়। মহাসাঙ্ঘিক বিনয়টি তিনি চিনা ভাষায় অনুবাদ করেন।

ফা-হিয়েন মোট সাতটি গ্রন্থ  রচনা করেন । এর মধ্যে  মধ্যে ছয়টি হল সংস্কৃত বৌদ্ধশাস্ত্র গ্রন্থের চিনা অনুবাদ এবং বাকি গ্রন্থটি হল ভারতীয় উপমহাদেশে তার পরিভ্রমণ সংক্রান্ত মৌলিক রচনা “ফো-কুয়ো-কিং” অর্থাৎ বুদ্ধভূমির বিবরণ। এ বইটিতে তিনি  চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের শুরুর দিকে মধ্যএশিয়া ও উত্তর ভারতে বৌদ্ধধর্মের, বৌদ্ধতীর্থস্থানগুলো ও বৌদ্ধশাস্ত্রচর্চার অবস্থা সম্পর্কে বহু মূল্যবান তথ্য বর্ণনা করেন। বৌদ্ধ ধর্মই ছিল তার মূল চিন্তাধারা যে কারনে তিনি উপমহাদেশের তৎকালীন  রাজনৈতিক অবস্থা বা ওই সংক্রান্ত অন্য কোন প্রসঙ্গ প্রায় কখনই তার আলোচনার অন্তর্ভূক্ত  করেননি। এমনকি, অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হল  তৎকালীন প্রবল পরাক্রান্ত গুপ্ত সম্রাট দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত তথা  বিক্রমাদিত্যের নাম তার গ্রন্থে একবার উল্লেখ করেন নি। যদিও ফা হিয়েন সম্রাটের সুশাসনে প্রজাসাধারণের সুখ-সমৃদ্ধির কথা  সাধারণভাবে উল্লেখ করেছিলেন।

ফা হিয়েনের বর্ণনা থেকে জানা যায়ঃ উপমহাদেশ এক অপূর্ব শান্তির দেশ! রাজার শাসনের কঠোরতার চেয়ে উদারতাই বেশী। কোন স্থানেই শাস্তির দণ্ড খুব  কঠোর নয় । সেসময় অপরাধীদের প্রাণদণ্ড দেওয়া নিষিদ্ধ ছিল।  তবে রাজদ্রোহ হলে শাস্তির মাত্রা কিছুটা কঠিন ছিল। সেক্ষেত্রে অপরাধীর  ডান হাত কেটে নেওয়া হত। অন্যান্য ক্ষেত্রে ছিল  শুধু অর্থদণ্ড।  প্রজারা ছিল পরিপূর্ণ স্বাধীন।অনুমতি পাস ছাড়াই এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ভ্রমণ করতে পারত । অপরাধের পরিমাণ ছিল খুব কম তাই বিচারের জন্যে আদালতে যেতে হত না।  রাতের বেলা  ঘরের দরজা খুলা রেখে ঘুমানো যেত । শহরে ধনীর সংখ্যা প্রচুর। তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতা চলতো কে কত ভাল কাজ করতে পারে। রাজপথের ধারে ধারে সরাইখানা। দাতব্য চিকিৎসালয়ে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা করতে টাকা লাগত না বরং বিনামূল্যে ঔষধ প্রদান করা হত।

গুপ্ত বংশের রাজারা ছিল  ব্রাহ্মণ্যধর্মের অনুসারী। তবু বৌদ্ধদের প্রতি বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ নেই। সিন্ধু উপত্যকা থেকে মথুরায় বেড়ানোর সময় তাঁর চোখে পড়েছিল অসংখ্য বৌদ্ধমঠ। এক মথুরাতেই তখন মঠের সংখ্যা বিশটি । তাতে বাস করতো প্রায় তিন হাজার ভিক্ষু। অথচ মথুরা হিন্দু ব্রাহ্মণদেরও তীর্থস্থান !

ফা-হিয়েনের অনূদিত বৌদ্ধশাস্ত্রের গ্রন্থগুলো  বৌদ্ধধর্মের ঐতিহ্যকে চিনে দৃঢ়ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করেছিল এবং তার  ভ্রমণ কাহিনী পাঠ করে  পরবর্তীতে  অনেক চিনা বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা বুদ্ধের জন্মভূমি পরিদর্শনে বিশেষ প্রেরণা পায় এবং পরবর্তিতে অনেকচৈনিক সন্নাসী বুদ্ধের জন্মভূমি পরিদর্শনে আসে। ফা-হিয়েনের পথ অনুসরণ করে চে-মেং (৪০৪ খ্রি.), ফা-ইয়ং (৪২০ খ্রি.), হিউয়েন সাং (৬২৯ খ্রি.), ই-ৎসিঙ (৬৭২ খ্রি. ) প্রমুখ চিনা বৌদ্ধ পর্যটকগণ উপমহাদেশ পরিভ্রমণ করেন।  চিনের সংস্কৃতিতে বুদ্ধের মুর্তি অবস্থান হল  উপমহাদেশের বিভিন্ন বৌদ্ধমন্দির থেকে তিনি বুদ্ধমূর্তির যে ছাপচিত্র ও নমুনা তিনি সংগ্রহ করেছিলেন সেগুলোর নির্যাস।

হিউয়েন-সাং  ফা-হিয়েনের পরবর্তী তীর্থ-ভ্রমণকারী ছিলেন হিউয়েন-সাং। হিউয়েন সাঙ (বা হিউয়েন-সাং বা হুয়ান-সাং বা জুয়ানজ্যাং চীনা: 玄奘)  ছিলেন আরেকজন বিখ্যাত চীনা বৌদ্ধ ভিক্ষু, পণ্ডিত, পর্যটক এবং অনুবাদক।

হিউয়েন সাং ৬০২ খ্রিস্টাব্দে লুজহু বর্তমানে হিনান প্রদেশের গৌসি টাউনের চিনহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পরিবার একটি সম্রান্ত ও উচ্চশিক্ষিত পরিবার হিসেবে পরিচিত ছিল। চেন শি ছিলেন তার পূর্বসূরী যিনি হান সম্রাজ্যের একজন মন্ত্রী ছিলেন।

তার দাদার বাবা চেন কিন পূর্ব ওয়েই সম্রাজ্যের শেনডেং প্রদেশের একজন বড় কর্মকর্তা ছিলেন আর তার দাদা চেন কাং উত্তোর কি সম্রাজ্যের রাজকীয় একাডেমির একজন অধ্যাপক হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন এবং সর্বশেষে তার বাবা চেন হুই, শুই সম্রাজ্যের একজন ম্যাজিষ্ট্রেট হিসেবে কাজ করেছেন। জানা যায় ইউয়েন সাং খুব ছোটবেলা থেকেই কনফুসিয়াসের তত্বের উপর আগ্রহ দেখান। তিনি তার বাবার কাছ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন। ৬১১ সালের বাবার মৃত্যুর পরে  হিউয়েন সাং তার বড় ভাইয়ের সাথে  লুয়াং প্রদেশে জিংতু বুদ্ধাশ্রমে পাঁচ বছর কাটিয়ে দেন।

৬১৮ সালের দিকে সুই সম্রাজ্যের পতন হলে তিনি তার ভাইয়ের সাথে চ্যাংগানে পালিয়ে যান এবং একটি আশ্রমে আরো দুই বছর কাটিয়ে দেন। ২০ বছর বয়সে তিনি একজন পূর্ণ বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তখন তিনি বৌদ্ধ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং ভারত উপমহাদেশে এসে আরো জ্ঞান অর্জনের ইচ্ছা প্রকাশ করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি পুনরায় তাং রাজ্যের রাজধানীতে গমন করে সেখানে সংস্কৃত ভাষা চর্চা শুরু করেন।

৬২৯ সালে একটি স্বপ্ন দেখে ভারত যেতে আগ্রহী হন । কিন্ত সে সময় তাং রাজ্যের সাথে তুর্কদের যুদ্ধ চলায় রাতা সকল নাগরিকদের রাজ্যে ছেড়ে অন্য কোথাও গমনে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন।  কিন্তু হিউয়েন সাং শহরের সদর দরজার বৌদ্ধ প্রহরীদের বুঝিয়ে শহর থেকে বের হতে সক্ষম হন।তিনি ৬২৯ সালে কুইংঘি প্রদেশ হয়ে গোবি মরুভূমি পার হয়ে ৬৩০ সালে তুর্পান পৌছান। তুর্পানে হিউয়েন সেখানকার বৌদ্ধ রাজার সাথে দেখা করেন যিনি হিউয়েন সাং কে কিছু মূল্যবান জিনিষপত্র এবং যাত্রার জন্য রসদ সরবরাহ করেন।

হিউয়েন সাং

এবার হিউয়েন আরো পশ্চিমে পদযাত্রা আরম্ভ করেন । তিনি ইয়ানজি ও কুচা হয়ে কিরজিকিস্থানের রাজা তুর্ক খানের সাথে দেখা করেন। তুর্কদের সাথে তাংদের যুদ্ধে চললেও ততদিনে সম্পর্কে বন্ধুত্বপূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। কিরগিস্তান থেকে পরবর্তীতে তিনি  বর্তমান উজবেকিস্তানের রাজধানি তাসখন্দে পৌছান। তারপর আরো পশ্চিমে অগ্রসর হয়ে সমরখন্দে পৌঁছান। সমরখন্দ তখন পারস্য নিয়ন্ত্রিত ছিল। সমরখন্দ থেকে আরো পশ্চিমে আমু দরিয়া এবং তিরমিজে পৌছান যেখানে তিনি প্রায় এক হাজার বৌদ্ধ ভিক্ষুর সাথে সাক্ষাৎ করেন।
আরো পশ্চিমে যেয়ে তিনি খুন্দুজ শহরে সেখানকার যুবরাজ তার্দুর অন্তুষ্টিক্রিয়া দেখার জন্য কিছুকাল ছিলেন । এরপরে আরো পশ্চিমে নব বিয়হার পরিদর্শন করনে। নব বিহার হল বর্তমান আফগানিস্থান। এরপরে তিনি আদিনপুর বর্তমানে জালালাবাদ পৌঁছান।

আদিনপুর থেকে খাবার পাস দিয়ে পেশাওয়ারের দিকেন যাত্রা করেন। পেশাওয়ার থেকে সোয়াত উপত্যকার দিকে যাত্রা করেন। সিন্ধু নদ পার হয়ে কাশ্মীরের দিকে চলে আসেন। কাশ্মীরে ময়াহন গ্রন্থের পন্ডিত বৌদ্ধ ভিক্ষু সংঘাসের সাথে হিউয়নের দেখা হয়। কাশ্মীর থেকে পূর্বে দিকে লাহোর ও মতিপুরের দিকে গমন করেন। এই অঞ্চলের মঠ ও স্তূপ পরিদর্শনের পর তিনি ৬৩৪ খ্রিষ্টাব্দে পাঞ্জাবের জলন্ধরে আসেন। এখান থেকে মথুরা ভ্রমণ করেন। এই অঞ্চল ভ্রমণের পর তিনি গাঙ্গেয় উপত্যাকায় চলে আসেন এবং ৬৩৫ খ্রিষ্টাব্দে গঙ্গানদীর তীরবর্তী প্রায় সকল বৌদ্ধ মঠ ও স্তূপ পরিদর্শন করেন।

হিউয়েন সাং ৬৩৭ খ্রিষ্টাব্দে বুদ্ধের জন্মস্থান লুম্বিনী এবং নির্বাণ স্থান কুশীনগর পরিদর্শন করেন। এরপর বারাণসী, বৈশালী, পাটালীপুত্র এবং বুদ্ধ গয়া ভ্রমণ করেন। এরপর বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় এ আসেন এবং এখানে প্রায় দুই বছর যুক্তিবিদ্যা, ব্যাকরণ, সংস্কৃত ভাষা নিয়ে লেখাপড়া করেন।

হিউয়েন সাং কত সালে বাংলায় আসেন?  এই প্রশ্নটি আমরা প্রায়শই নানা প্রতিযোগিতামূলক পরিক্ষাতে দেখতে পাই। ৬৩৮ সালে বাংলায় আসেন। তিনি ৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন সাং পুন্ডবর্ধনের রাজধানী পুন্ডনগরে আগমন করেন। নালন্দা থেকে ৬০০ লি অতিক্রম করে কজংগলে আসেন সেখানে কিছুদিন অতিবাহিত করার পর ৯০০ লি পুর্ব দিকে পদ্মা পার হয়ে পুন্দ্রনগর আসেন সেখানেই অনেক দিন কাটান। পুন্ডনগর হল বর্তমানে বাংলাদেশের মহাস্থানগড়। এরপরে তিনি নওগাঁর সোমপুর বিহার পরিদর্শন করেন। তার বিবরনী থেকে জানা জানায় সে সময় দেশটির পরিসীমা ছিল প্রায় ৪০০০ লি (ছয় লিতে এক মাইল) এবং এ রাজ্যের রাজধানীর পরিসীমা হল ৩০ লি। তিনি বর্ণনা করেন দেশটি ঘনবসতি পূর্ণ হলেও খাদ্যে শস্যে সমৃদ্ধ। এর

বাংলা ভ্রমণ শেষে তিনি তৎকালীন কামরুপের রাজা ভাস্করবর্মণের নিমন্ত্রণ রক্ষার্থে ৯০০ লি প্রশস্ত নদী পার হয়ে কামরুপের রাজধানী প্রাগজ্যোতিষপুরে গমন করেন।  ৯০০ লি প্রশস্ত নদীটি ধারনয়া করা হয় করতোয়া। সেখান থেকে ১৩০০ লি দক্ষিনে সমতট যান । তাঁর বর্ণনা মতে, এ দেশটির পরিসীমা ৩০০০ লি এবং রাজধানীর পরিসীমা ২০ লি।  এটি বিশাল সাগরতটে অবস্থিত। হিউয়েন-সাং-এর বিবরণ অনুযায়ী নিম্নভূমির এ দেশটি সমৃদ্ধ।আবহাওয়া নমনীয় এবং অধিবাসীদের আচরণ অমায়িক। এরা প্রকৃতিগতভাবে পরিশ্রমী, খাটো আকৃতির এবং এদের গাত্রবর্ণ কালো। তাঁরা জ্ঞানচর্চায় অনুরাগী।

তার পর ৯০০ লি পশ্চিমে সমুদ্র তীরবর্তি তাম্রলিপ্তি তে যান।তাঁর বর্ণনা মতে, সমুদ্র তীরবর্তী এ দেশটির পরিসীমা ১৪০০ অথবা ১৫০০ লি এবং রাজধানীর পরিসীমা ১০ লি। নিম্নভূমির এ দেশটির ভূমি উর্বর, এখানে নিয়মিত কৃষিকাজ হয় এবং প্রচুর ফসল ফলে। এখানকার তাপমাত্রা বেশ উষ্ণ। মানুষগুলি চটপটে ও ব্যস্ত স্বভাবের। তাঁরা পরিশ্রমী ও সাহসী।

তাম্রলিপ্তি থেকে উত্তর-পশ্চিমে প্রায় ৭০০ লি ভ্রমণ করে তিনি শশাঙ্ক এর রাজধানী কর্ণসুবর্ণ তে যান। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী দেশটির পরিসীমা প্রায় ১৪০০ অথবা ১৫০০ লি এবং রাজধানীর পরিসীমা প্রায় ২০ লি। দেশটি ঘনবসতিপূর্ণ, এ দেশের অধিবাসীরা ধনী এবং তাঁরা আয়েশি জীবনযাপন করতে পছন্দ করেন। এ নিম্নভূমির মাটি দোঅাঁশ যুক্ত; নিয়মিত জমি চাষ হয় এবং বিচিত্র ধরনের পর্যাপ্ত ফসল ফলে। এখানকার আবহাওয়া নমনীয় এবং অধিবাসীরা সৎ ও অমায়িক। জ্ঞানচর্চায় তারা গভীরভাবে আসক্ত।

বাংলা থেকে হিউয়েন-সাং সিংহলে যাওয়ার চিন্তা করেছিলেন, কিন্তু দক্ষিণ ভারতের একজন পুরোহিত বিপদসংকুল সমুদ্রপথ পরিহার করতে তাঁকে উপদেশ দেন, এ কারণেই তিনি সড়কপথ ধরে উড়িষ্যার দিকে অগ্রসর হন। উড়িষ্যা হয়ে তিনি চিনে প্রবেশ করেন।

৬৪৫ খ্রিস্টাব্দে হিউয়েন-সাং চীনে প্রত্যাবর্তণ করলে তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা প্রদান করা হয়। তখনও সিংহাসনে আসীন তাইজং তাঁকে বিভিন্ন উচ্চ পদে যোগদানের প্রস্তাব দেন, কিন্তু সব প্রস্তাবই হাসিমুখে ফিরিয়ে দেন। তিনি ৬৬৪ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বৌদ্ধ রচনার অনুবাদে তাঁর সমস্ত সামর্থ্য ব্যয় করেন।

হিউয়েন-সাং-এর গ্রন্থ জিউ জি (সি-উ চি) মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহের উপর  সবচেয়ে বড় ও পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ সম্বলিত একটি গ্রন্থ।  তিনি ভ্রমণকৃত বিভিন্ন অঞ্চলের রাজনৈতিক ও সামাজিক চিত্র সযত্নে এই গ্রন্থে বর্ননা করেন।  বাংলায়  তার পরিদর্শনকৃত বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে ছিল প্রধানত কর্ণসুবর্ণের নিকটবর্তী  রক্তমৃত্তিকা,  পুন্ড্রনগর ও এর সংলগ্ন এলাকা,  সমতট ও  তাম্রলিপ্তি। তাঁর বিবরণ বাংলার প্রত্নতাত্ত্বিক ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারে ব্যাপক সহায়তা করে। কোথাও কোথাও তাঁর বিবরণ পক্ষপাতদোষে দুষ্ট হলেও সাত শতকের বাংলার ইতিহাস, বিশেষ করে  শশাঙ্কের শাসনাধীন গৌড় রাজ্য সম্বন্ধে তিনি আলোকপাত করে।

হিউয়েন সাং ৬৫৭টি সংস্কৃত বৌদ্ধ গ্রন্থ সংগ্রহ ও অনুবাদ করেন। তৎকালীন ভারতের বৌদ্ধ শাস্ত্রের উপর সর্বোৎকৃষ্ট শিক্ষাই তিনি লাভ  করেন। হিউয়েন-সাং-এর জীবনী জিউ জি-র সহায়ক গ্রন্থ হিসেবে লিখিত হুইলি-র Life of Hiuen-Tsang, The Tripitaka Master of the Great Zi En Monastery-তে  এ সব কিছু বিস্তারিত বর্ণনা করা আছে।

শেষ কথা

অধ্যাপক লিয়াচিং চ্যাও-এর মতে চতুর্থ থেকে অষ্টম শতাব্দীর মধ্যে ১৬৯ জন চিনা তীর্থযাত্রী ভারতীয় উপমহাদেশে আগমন করেন। চীনের সঙ্গে প্রাচীন বাংলার সম্পর্ক প্রায় হাজার বছরেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। ইতিহাসের বিভিন্ন সূত্রে এর প্রমাণ মেলে। বৌদ্ধশাস্ত্র অধ্যয়ন, বৌদ্ধশাস্ত্রের প্রাচীন গ্রন্থ চীনা ভাষায় অনুবাদকরণ, গৌতমবুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত পবিত্র স্থানগুলো দর্শন, তীর্থ ভ্রমণ,  উপমহাদেশখ্যাত বৌদ্ধ বিহারগুলো দর্শন, বাঙালি বৌদ্ধ পণ্ডিত, সিদ্ধাচার্যদের সঙ্গে ভাব বিনিময়, চীনের সঙ্গে বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য খ্রিপূর্ব কাল থেকেই চলে আসছিল। এ সব কিছু আমরা বিভিন্ন চৈনিক পর্যটকদের বিবরন থেকে স্পষ্টতই পাই।

 ছবি ওতথ্য সূত্রঃ

১। https://bn.wikipedia.org/wiki/ফা-হিয়েন

২। http://www.dailysangram.com/post/49053-উপমহাদেশে-পর্যটক-ফা-হিয়েন

৩। https://bn.wikipedia.org/wiki/হিউয়েন_সাঙ

৪। http://bn.banglapedia.org/index.php?title=চৈনিক_বিবরণ

৫। http://bn.banglapedia.org/index.php?title=হিউয়েন-সাং

৬। নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক