ফিজিওথেরাপি কি? কখন প্রয়োজন?

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা WHO-এর নির্দেশনা অনুযায়ী ফিজিওথেরাপি বা ফিজিক্যাল থেরাপি হল এমন একটি চিকিৎসা ব্যবস্থা যা সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং একজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক স্বতন্ত্রভাবে রোগীর রোগ নির্ণয় করে চিকিৎসাব্যবস্থা প্রদান করতে পারেন।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এবং ওয়ার্ল্ড কনফেডারেশন ফর ফিজিক্যাল থেরাপি (ডব্লিউসিপিটি)-এর মতে স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক প্রফেশনাল ডিগ্রীধারীরাই ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক বা ফিজিওথেরাপিস্ট এবং স্বাধীনভাবে চিকিৎসা সেবা প্রদান করতে পারেন।

ফিজিওথেরাপি কি ?

ফিজিও (শারিরীক) এবং থেরাপি (চিকিৎসা) শব্দ দুটি মিলে ফিজিওথেরাপি বা শারিরীক চিকিৎসার সৃস্টি। ফিজিওথেরাপি আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক অন্যতম এবং একটি অপরিহার্য শাখা। শুধুমাত্র ঔষধ সব রোগের পরিপুর্ণ সুস্থতা দিতে পারে না। বিশেষ করে বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা থেকে যে সব রোগের সৃষ্টি হয়, তার পরিপুর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় ফিজিওথেরাপি।

ফিজিওথেরাপি হল একটি আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসা  পদ্ধতি যেখানে একজন ফিজিওথেরাপিস্ট রোগীর সব কথা শুনে-বুঝে, রোগীকে ভালভাবে দেখে এবং প্রয়োজনে বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রোগীর সঠিক রোগ , আঘাত বা অঙ্গ বিকৃতির ধরন নির্নয় করে রোগীকে বিভিন্ন ধরনের ফিজিক্যাল মেথড যেমন ম্যানুয়াল টেকনিক , তাপ এবং ব্যায়ামের মাধ্যমে চিকিৎসা করে থাকেন ।

সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক প্রতিবন্ধিতা, বিকলাঙ্গতা, পক্ষাঘাত এবং বড় কোন অস্ত্রোপচারের পর রোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসার ক্ষেত্রে ফিজিওথেরাপির ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাছাড়া বিভিন্ন ধরনের বাত, মাথা, ঘাড়, কাঁধ, পিঠ, কোমর ও হাঁটুর ব্যথায় এবং স্পোর্টস ইঞ্জুরিতে ফিজিওথেরাপি বিশ্বব্যাপী একটি স্বীকৃত চিকিৎসাব্যবস্থা।

ফিজিওথেরাপি’র সূচনা ও বাংলাদেশে পরিচয়

ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা সাম্প্রতিক কোন চিকিৎসা ব্যবস্থা নয়। হিপোক্রেটাস সেই প্রাচীন গ্রীসে ম্যাসেজ ও ম্যানুয়াল থেরাপি দ্বারা ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার  পরিচয় করিয়েছিলেন। খ্রিস্টপূর্ব ৪৬০ সালে হেক্টর ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার একটি শাখা ব্যবহার করতেন যাকে বর্তমানে হাইড্রোথেরাপী বলা হয়।  যতটুকু জানা যায় ১৮৯৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার বর্তমান ধারা অর্থাৎ ম্যানুয়াল থেরাপি, ম্যানিপুলেটিভ থেরাপি, এক্সারসাইজ থেরাপি, হাইড্রোথেরাপি, ইলেক্ট্রোথেরাপি ইত্যাদি প্রবর্তন করা হয়। নিউজিল্যান্ডে ১৯১৩ এবং আমেরিকাতে ১৯১৪ সালে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা শুরু হয়।

বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপির যাত্রা অনেক দিন পরে। ১৯৭২ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য বিদেশী ফিজিওথেরাপিষ্ট দ্বারা স্বাধীন বাংলাদেশে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসার সূচনা হয়। এর পরে ফিজিওথেরাপীর ব্যবহার এ দেশে উত্তর উত্তর বাড়তেই থাকে। এর গুরুত্ব উপলব্ধি করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চিকিৎসা অনুষদের অধীনে স্নাতক ডিগ্রী চালু করা হয়। বর্তমানে নিটোর, সিআরপি, পিপলস্‌ ইউনিভার্সিটি, গণবিশ্ববিদ্যালয়, স্টেট্‌ কলেজ অব হেলথ্‌ সায়েন্স সহ ৭টি ইনষ্টিটিউটে ফিজিওথেরাপী গ্রাজুয়েশন কোর্স চালু রয়েছে।

ফিজিওথেরাপির প্রকারভেদ

একজন ফিজিওথেরাপিষ্ট রোগীর রোগ বর্ণনা, ফিজিক্যাল টেষ্ট, ফিজিওথেরাপিউটিক স্পেশাল টেষ্ট, প্রয়োজন সাপেক্ষে বিভিন্ন রেডিওলজিক্যাল টেষ্ট এবং প্যাথলজিক্যাল টেষ্ট এর মাধ্যমে রোগ নির্ণয় বা ডায়াগ্‌নোসিস করে থাকেন। ফিজিওথেরাপি নিতে আসা প্রত্যেকটি ব্যক্তির চিকিৎসা চিকিৎসকগণ রোগীর সুনির্দিষ্ট প্রয়োজন অনুসারে বেশ কিছু থেরাপি থেকে পছন্দ করে নেন।

ফিজিওথেরাপি বিশেষজ্ঞগণ তাদের বিশেষ জ্ঞান (এক্সপার্টিজ) অনুযায়ী অর্থোপেডিক, নিউরোলজি, গাইনি কিংবা শিশু রোগীর চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও ফিজিওথেরাপির উপ-শাখার বিশেষজ্ঞ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসক রয়েছেন।

ম্যানুয়েল থেরাপিঃ ম্যানুয়েল থেরাপির মধ্যে রয়েছে জয়েন্টগুলো নড়াচাড়া করা , স্ট্রেচিং ইত্যাদি এর মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে মেরুদন্ডের নাড়াছাড়া, হাড়ের বিভিন্ন জয়েন্টের মুভমেন্ট ও স্ট্রেচিং

এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম থেরাপিঃ এর মধ্যে রয়েছে মাসল ট্রেইনিং ও শক্তিশালী করন , কার্ডিওভাসকুলার ট্রেইনিং ও স্ট্রেচিং

ইলেক্ট্রোথেরাপিঃ – যার মধ্যে রয়েছে  ট্রান্সকুটানিয়াল বৈদ্যুতিক স্নায়ু উত্তেজক ( Transcutaneous Electrical Nerve StimulationTENS), লেজার থেরাপি, ডায়থেরমি এবং আল্ট্রাসাউন্ড।  তবে ফিজিওথেরাপি চিকিৎসাতে মেশিনের ব্যবহার খুবই নগন্য।

বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৯০ হাজার মানুষ ফিজিওথেরাপি চিকিত্সার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এর মধ্যে শতকরা প্রায় ৯০ ভাগ সঠিক ফিজিওথেরাপি চিকিত্সা পায় না এবং অপচিকিত্সার শিকার হন। (সূত্র : বিপিএ-২০০৯)।

কেন এই ফিজিওথেরাপি নিবেন ?

আমরা যত আধুনিক প্রযুক্তি দিকে এগিয়ে চলছি তত বেশি পরিমান স্বাস্থ্যগত সমস্যাতে আক্রান্ত হচ্ছি। দেখা গেছে শরীরের বিভিন্ন রোগ শুধুমাত্র ঔষধ দিয়ে নিরাময় করা সম্ভব হয় না। বিশেষ করে যে সব রোগের উৎস  বিভিন্ন মেকানিক্যাল সমস্যা, সেসব ক্ষেত্রে ওষুধের ভূমিকা তুলনামূলকভাবে কম। যেমন : বাত, কোমর ব্যথা, ঘাড় ব্যথা, হাঁটু ব্যথা, আঘাতজনিত ব্যথা, হাড় ক্ষয়জনিত রোগ, জয়েন্ট শক্ত হয়ে যাওয়া, স্ট্রোক, প্যারালাইসিস, মুখ বেঁকে যাওয়া, সেরিব্রাল পালসি, স্পোর্টস ইনজুুরি ইত্যাদি।

তাহলে এসব রোগ থেকে পরিপুর্ণ সুস্থতা লাভের উপায় কী? এ ক্ষেত্রেই চলে আসে ফিজিওথেরাপির কথা। ফিজিওথেরাপি এই সব রোগ থেকে মানুষকে পুরু পুরি মুক্তি না দিতে পারলেও উপশম করে।

ফিজিওথেরাপি কখন প্রয়োজন

এ দেশে বাত-ব্যাথা ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত রোগীরা সঠিক চিকিৎসা পায় না। ফলে এ সংক্রান্ত সমস্যা বেড়েই চলছে। এ কারনে  দেশের একটা বড় সংখ্যক লোক উৎপাদন কার্যক্রম থেকে বিচ্ছিন্ন। বাত-ব্যাথা ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত এই সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্যে প্রয়োজন রোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে যথাযথ ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

দীর্ঘমেয়াদি রোগ, বিশেষ করে বাত-ব্যথা ও পক্ষাঘাতের রোগীদের সমস্যা ওষুধ দিয়ে নিরাময় সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা। এবার জেনে নেওয়া যাক কাদের ফিজিওথেরাপি চিকিৎসা প্রয়োজন।

স্নায়ুতন্ত্রের সমস্যায়

স্ট্রোক, আঘাত অথবা শল্যচিকিৎসায় অনেকে স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতায় ভুগে পঙ্গুত্ব বরণ করতে হয়। এ ধরনের সমস্যা আক্রান্ত রোগীর অনেক সময় শরীর অবশ হয়ে যায় বা মাংসপেশি শক্ত হয়ে যায়।  ফলে তাকে পড়তে হয় নানা বিড়ম্বনায় । রোগীর শরীরের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা এবং অস্থিসন্ধি সচল রাখা তখন চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়ে। এ অবস্থা থেকে একমাত্র ফিজিওথেরাপী মুক্তি দিতে পারে।

মাংসপেশি ও হাড়ের সমস্যা 

অনেক সময় দেখা যায়  ভেঙে যাওয়া হাড় জোড়া লাগার পর আঘাতপ্রাপ্ত অংশের মাংসপেশি ও হাড় ঠিকমতো কাজ করে না বা কাজ করতে বেশ সময় নেয়।  এ  ক্ষেত্রে আক্রান্তদের ফিজিওথেরাপি দেওয়া প্রয়োজন পড়ে । এ ছাড়া নানা ধরনের বাত যেমন স্পন্ডিলাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, স্পন্ডিলিস্থেসিস; অর্থাৎ ঘাড়, কোমর ও মেরুদণ্ডের ব্যথায় এই চিকিৎসা  বেশ কাজে দেয় । পাশাপাশি অস্থিসন্ধির বাত, হাঁটুর ব্যথা, ফ্রোজেন শোল্ডার বা কাঁধে ব্যথা এবং পায়ের গোড়ালির সমস্যায় আক্রান্তদের ফিজিওথেরাপি ডেইয়া হয়।

পোড়া রোগীদের জন্য

আমাদের দেশে প্রচুর অগ্নিকান্ড ঘটে ফলে পোড়া রোগীর সংখ্যাটা নেহায়েত ছোট নয়। পোড়া রোগীর  দীর্ঘ দিন ধরে মাংসপেশি সংকোচিত হয়ে থাকে। এ অবস্থায় অনেকে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণে আশংকায় থাকেন। যদি নিয়মিত ফিজিওথেরাপি নেওয়া হয় তাহলে স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ববরণে ঝুঁকি থেকে মুক্ত থাকা যায়।

শিশুরোগের ক্ষেত্রে

আমাদের দেশে বা বিশ্বের নানা দেশে কিছু শিশু জন্মগতভাবে  প্যারালাইসিস বা সেরিব্রাল পালসি ও মেরুদণ্ডের সমস্যায় আক্রান্ত হয়ে জন্ম নেয় । এ সকল শিশুদের ফেজিওথেরাপি দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে। এ ছাড়াও দেখা যায় অনেক শিশুর ড়, হাত, পা বেঁকে যায়। এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেও ফিজিও থেরাপির বিকল্প নেই।

হৃদ্‌রোগ ও ফুসফুসের সমস্যায়

বুকে কফ জমা, শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত রোগীদের  ফিজিওথেরপির প্রয়োজন পড়ে। তাছাড়াও  হৃদ্‌যন্ত্রে অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে রোগীর অক্সিজেন ধারণক্ষমতা ঠিক রাখতে ফিজিওথেরাপি দিতে হয়। ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট (আইসিইউ) রোগীদেরও ফিজিওথেরাপির প্রয়োজন হয়।

হাটু ব্যথার

হাটু ব্যথা অনেক কারণে হয়, তবে সবচেয়ে বেশি অস্টিওআর্থাইটিস জনিত হাটু ব্যথা। অস্টিওআর্থাইটিস জনিত হাটু ব্যথা নিয়ে বেশির ভাগ প্রশ্নই এমন, অনেক দিন ধরে আমাদের বাবা মা, নিকট আত্নীয় হাটু ব্যথায় ভুগতেছে বা আমরা নিজেরাই হাঁটু ব্যথায় ভুগতেছি কিন্ত ভাল হচ্ছে না । চলাফেরায় সমস্যা, সিঁড়ি দিয়ে উঠানামা সমস্যা, দাঁড়িয়ে নামাজ পড়তে সমস্যা। অনেকেই বিছানায় বন্দি । এ সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে সঠিক থেরাপি।

শল্যচিকিৎসায়

নানা কারনে আমাদের শল্য চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়। শল্য চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে মাংসপেশি ও অস্থিসন্ধির স্বাভাবিক ব্যবহার বাধাগ্রস্ত হয়।  তাই স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ফিজিওথেরাপি ভাল কাজ দেয়।

বার্ধক্যজনিত সমস্যা

বার্ধক্যে শরীরের বিভিন্ন অংশের ব্যথা ও মাংসপেশিতে ক্ষয়ের কারণে  শেষ বয়সে অনেকে চলাচল করার সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।   বার্ধক্যজনিত মানুষের স্বাভাবিক চলাচলের ক্ষমতা বজায় রাখতে ফিজিওথেরাপির বিকল্প নেই।

এ ছাড়াও কোমর ব্যাথা, কনুই ব্যাথা , ঘাড় ব্যাথা সহ নানা সমস্যাতে ফিজিও থেরাপি ব্যবহার হয়। তবে অবশ্যই মনে রাখা প্রয়োজন যে আমরা যেন একজন সঠিক ফিজিওথেরাপিস্টের শরণাপন্ন হই। 

তথ্য ঃ অনলাইন।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক