স্যাটেলাইট কি? বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটঃ এক নতুন দিগন্তে বাংলাদেশ!

বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন দিগন্তে প্রবেশ করছে। আর এর মাধ্যমে ৫৭তম স্যাটেলাইট সদস্য দেশের তালিকায় বাংলাদেশ নাম লিখিয়েছে । কৃত্রিম এই উপগ্রহের মাধ্যমে দেশের টেলিযোগাযোগসহ তথ্যপ্রযুক্তি খাতে থাকবে নিত্য নতুন সুবিধা।

তাই সাম্প্রতিক সময়ে প্রচুর আলোচিত একটি বিষয় এই স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইট নিয়ে সবার মনেই নানা প্রশ্ন ঘুরছে। আজ তাই আমাদের আয়োজন এই স্যাটেলাইট নিয়ে।  

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহ নিয়ে আলোচনা করা করার পূর্বে আমাদের জানতে হবে স্যাটেলাইট কি, স্যাটেলাইটের যুগ কিভাবে শুরু হয়েছিল, কিভাবে কাজ করে, স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ, কি কি  কাজে স্যাটেলাইট ব্যবহৃত হয় ইত্যাদি। চলুন তাহলে পরিচিত হওয়া যাক আধুনিক বিশ্বের এক বিস্ময়কর প্রযুক্তি সাথে।  

স্যাটেলাইট কি?

স্যাটেলাইট শব্দটিকে বাংলায় রুপান্তর করলে দাঁড়ায় কৃত্রিম উপগ্রহ। স্যাটেলাইট শব্দটি ১৬১০ সালে জ্যোতির্বিজ্ঞানে প্রথম ব্যবহার করেছিলেন জোহানেস কেপলার। 

আচ্ছা স্যাটেলাইটকে স্যাটেলাইট নামে ডাকা হয় কেন ? অন্য কোন নামেও তো ডাকা যেত তাই না? আসলেই তো !

স্যাটেলাইট শব্দটা এসেছে ল্যাটিন ভাষা থেকে, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় “অনুসরণ করা”। তার মানে কি কোন কিছুকে অনুসরন করলে করলে তাকে স্যাটেলাইট ধরা যায়? তাহলে তো এই যে চাঁদ পৃথিবীকে ঘিরে ঘুরছে, চাঁদ একটি স্যাটেলাইট আবার আমাদের এ সুন্দর পৃথিবী সূর্যকে ঘিরে ঘুরছে, সুতরাং পৃথিবীও একটি স্যাটেলাইট। এক্সাক্টলি গুলো স্যাটেলাইট ।  

স্যাটেলাইট দুই প্রকার যথা, প্রাকৃতিক স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম উপগ্রহ বা মানুষের তৈরি স্যাটেলাইট । পৃথিবী এবং চাঁদ হল প্রাকৃতিক স্যাটেলাইটের উদাহরণ। হাজার হাজার কৃত্রিম বা মানুষের-তৈরী স্যাটেলাইট পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে।

ছবিঃ SES

তবে বর্তমানে স্যাটেলাইট বলতে মূলত মানুষের তৈরি কোন ডিভাইস বা যন্ত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরছে এমন কিছুই বুঝায়। স্যাটেলাইট সম্পর্কিত ধারনাটি সর্বপ্রথম থিওরিটিক্যালি ১৯৩৬ সালের দিকে ব্যবহার শুরু হয়। পরবর্তিতে বৈজ্ঞানিকভাবে স্যাটেলাইট শব্দটি বর্তমানের এ রুপে গ্রহণ করা হয় ১৯৫৭ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে মানবসভ্যতার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর মধ্য দিয়ে। রাশানদের দেখা দেখি ১৯৫৮ সালে আমেরিকা তাদের তৈরি এক্সপ্লোরার-১ নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠায়। 

পৃথিবীকে প্রদক্ষিণকারী যে কোনো বস্তুই হলো স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ। স্যাটেলাইট দুই ধরনের। ন্যাচারাল স্যাটেলাইট বা প্রাকৃতিক উপগ্রহ এবং আর্টিফিশিয়াল স্যাটেলাইট বা কৃত্তিম উপগ্রহ। চাঁদ পৃথিবীর একমাত্র প্রাকৃতিক উপগ্রহ। চাঁদ ব্যতীত সব উপগ্রহ আর্টিফিশিয়াল স্যাটেলাইট। স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী থেকে একটি নির্দিষ্ট দুরত্তে তাদের নিজস্ব কক্ষপথে পৃথিবীর চারিদিকে আবর্তনশীল।

কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি দিয়ে দিতে হয় । কারণ মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু উপগ্রহ জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে থেকে সে সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে। 

কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইটকে কিভাবে পৃথিবীর বাইরে পাঠানো হয়?

স্যাটেলাইটকে রকেট বা স্পেস শাটলের কার্গো বে-এর মাধ্যমে নির্ধারিত কক্ষপথে পাঠানো হয়। কারন একমাত্র রকেটের পক্ষেই পৃথিবীর মুক্তিবেগ অর্জন করে মহাশূন্যে পৌঁছানো সম্ভব। স্যাটেলাইটকে তার কক্ষপথে ছেড়ে দিয়ে রকেট আবার পৃথিবীতে ফিরে আসে। পাঠানোর সময় রকেট নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হয় ইনার্শিয়াল গাইডেন্স সিস্টেম (আইজিএস) মেকানিজম। পৃথিবীর অভিকর্ষ পার হতে রকেটকে ঘণ্টায় ২৫ হাজার ৩৯ মাইল ত্বরণে ছুটতে হয়।

আচ্ছা আমরা তো জানি পৃথিবীর উপর দিকে কিছু ঠেলে দিলে আবার পৃথিবীর দিকে ফেরত আসে তাই না ?  বিশ্বাস না হলে একটি বল এই মূহুর্তে উপরে ঢিল দিয়ে বরাবর তার নীচে দাঁড়িয়ে থাকুন। 😛 

তাহলে কৃত্রিম উপগ্রহ কেন পৃথিবীতে ফেরত আসছে না? 

কৃত্রিম উপগ্রহকে যখন পৃথিবীর বাইরে পাঠানো হয় সে সময় কক্ষীয় গতি ও তার জড়তার ওপর পৃথিবীর অভিকর্ষের যে প্রভাব রয়েছে,  এ দুই'ইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করতে না পারলে কৃত্রিম উপগ্রহ এ অভিকর্ষের টানে ফের ভূপৃষ্ঠে চলে আসতে পারে। এ জন্য কৃত্রিম উপগ্রহকে ১৫০ মাইল উচ্চতাবিশিষ্ট কক্ষপথে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ১৭ হাজার মাইল গতিতে পরিভ্রমণ করানো হয়।

ছবিঃ উইকিপিডিয়া

তবে কৃত্রিম উপগ্রহের এ গতি বেগ কিন্ত নির্ধারিত নয়  গতিবেগ কত হবে, তা নির্ভর করে কৃত্রিম উপগ্রহটি পৃথিবী থেকে কত উচ্চতায় রয়েছে, তার ওপর। পৃথিবী থেকে ২২ হাজার ২২৩ মাইল উপরে স্থাপিত স্যাটেলাইট ঘণ্টায় ৭০০ মাইল বেগে পৃথিবীকে আবর্তন করে। পৃথিবীর সঙ্গে কৃত্রিম উপগ্রহগলোও ২৪ ঘণ্টা প্রদক্ষিণ করতে থাকে ।

আবার কিছু কিছু উপগ্রহ আছে যে গুলো ভূ-স্থির বা জিওস্টেশনারি উপগ্রহ নামে পরিচিত । এগুলো এক জায়গাতেই থাকে। এই জিওস্টেশনারী উপগ্রহগুলোকে সাধারণত আবহাওয়া ও যোগাযোগ সংক্রান্ত কাজে ব্যবহৃত হয়।

স্যাটেলাইট কিভাবে কাজ করে?

১৭২৯ সালে বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন কামানের গোলার পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করার একটি তত্ত্ব প্রকাশ করেন। এই তত্ত্ব মতে কোন কামানের গোলা পাহাড় থেকে ছুঁড়ে দিলে তা কিছুটা পৃথিবীর সমান্তরালে যেয়ে তারপর ভূপাতিত হয়। অর্থাৎ বস্তুর বেগকে কাজে লাগিয়ে কোন বস্তুকে পৃথিবীর আকর্ষণ দ্বারা পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করানো সম্ভব। অর্থাৎ কোন বস্তুকে যদি কেন্দ্রাতিগ বেগে শূন্যে ছেড়ে দেওয়া হয় তা পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকবে। এটা অনেকটা সার্কাসে মোটরসাইকেল ঘোরানো খেলার মত যেখানে মোটরসাইকেল ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে যায় কিন্তু পরে যায় না।

জানা প্রয়োজন বৃত্তাকার পথে ঘুর্ণায়মান বস্তুর উপর দুইটি বল কাজ করেঃ কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force) আর কেন্দ্রবিমুখী বল (Centrifugal Force)। কেন্দ্রমুখী ও কেন্দ্রবিমুখী বল সমান ও বিপরীত। বৃত্তাকার পথের যেকোন বিন্দুতে কেন্দ্রমুখী বল কাজ করে কেন্দ্র বরাবর, আর কেন্দ্রবিমুখী বল কাজ করে কেন্দ্র থেকে বাহিরের দিকে (ঐ বিন্দুগামী ব্যসার্ধ বরাবর)। বস্তুর উপর প্রয়োগকৃত এই দুই বল একে অপরকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এবং ফলে বস্তু বৃত্তাকার পথে ঘুরতে থাকে।

কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যাতে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখী শক্তি  স্যাটেলাইটটিকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে -  আবার পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি বা অভিকর্ষজ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। এই সেন্ট্রিফিউগাল গতি ও অভিকর্ষজ শক্তি উপগ্রহটিকে ভারসাম্যে রাখে। গতির কারনে উপগ্রহটি পৃথিবীর চারদিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। 

ভারসাম্য ছাড়া স্যাটেলাইট মহাশূণ্যে একটি সরল রেখায় উড়বে অথবা পৃথিবীতে পতিত হবে। স্যাটেলাইটগুলো ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা, গতি ও পথে প্রদক্ষিণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির। দুটি কমন কক্ষপথ হলো- জিওস্টেশনারী এবং পোলার।

জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইট বিষুব রেখার উপর দিয়ে পশ্চিম থেকে পূর্ব দিকে ভ্রমণ করে। পৃথিবীর ঘূর্ণনের সাথে তাল রেখে একই দিকে অগ্রসর হয় এই স্যাটেলাইট। আর এ কারণেই পৃথিবী থেকে মনে হয় জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইট একই স্থানে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পোলার স্যাটেলাইট উত্তর থেকে দক্ষিণ অভিমুখে এক মেরু থেকে আরেক মেরুতে ভ্রমণ করে। পৃথিবী নিচের দিকে ঘোরে বলে এইসব স্যাটেলাইট দিয়ে একই সময়ে পুরো পৃথিবীর চিত্রধারণ সম্ভব হয়।

টিভি ও বেতারসংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবী থেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে।

একটি স্যাটেলাইট মহাকাশে পাঠানোর পরে সেটি তার জন্যে নির্ধারিত কক্ষপথে স্থির হতে প্রায় এক মাসের মত সময় নেয়। এরপর থেকে এটি নিয়মিতভাবে পৃথিবীতে স্থাপিত গ্রাউন্ড স্টেশনের সাথে সিগন্যাল আদান-প্রদান করতে থাকে। পৃথিবীতে একটি অতিরিক্ত গ্রাউন্ড স্টেশন রিজার্ভে রাখা হয়, যাতে জরুরী প্রয়োজনে সেটা ব্যবহার করা যায়। একটি নির্দিষ্ট সময় পরে স্যাটেলাইট তার কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। কিন্তু এটি কখনো তার ঘূর্ণন বন্ধ করে না। মহাশূন্যে এ রকম প্রচুর অকার্যকর স্যাটেলাইট রয়েছে যেগুলোকে স্পেস গার্বেজ বা মহাশূন্যের আবর্জনা বলা হয়।

পৃথিবী থেকে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানো হয়, কৃত্রিম উপগ্রহ সেগুলো গ্রহণ করে এবং বিবর্ধিত (এমপ্লিফাই) করে পৃথিবীতে প্রেরণ করে । কৃত্রিম উপগ্রহ দুইটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য ।

স্যাটেলাইট কিভাবে কাজ করে

কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিস এন্টেনা ব্যবহার করে সিগনালকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পরে রিসিভার দিয়ে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয় ।

এই যে আমরা এত স্যাটেলাইট নিয়ে বক বক করে যাচ্ছি এই স্যাটেলাইটের যাত্রাটি এত সহজেই হয়েছিল? 

স্যাটেলাইটের সূচনালগ্ন

কৃত্রিম উপগ্রহ ও মহাকাশ যাত্রার ইতিহাস খুব একটা পুরনো নয়, একেবারেই নতুন। আপনারা জেনে অবাক হবেন যে, মহাকাশ যাত্রার প্রথম পদক্ষেপটির সূচনা হয়েছিল ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর। এই যাত্রার সূচনা করে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন। 

অক্টোবর ৪, ১৯৫৭। তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্গত কাজাখস্তানের বাইকোনুর রকেট লঞ্চ সাইটে চলছে  শেষ সময়ের প্রস্তুতি। শুরু হলো কাউন্টডাউন। টি মাইনাস ২৫ সেকেন্ড, টি মাইনাস ১০ সেকেন্ড, ইগনিশান সিকুয়েন্স স্টার্ট- ৬,৫,৪,৩,২,১… বুম! সবাই অবাক বিস্ময়ে চেয়ে দেখলো মহাকাশের পথে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলেছে  মানুষের পাঠানো প্রথম দূতঃ স্পুটনিক-১।  স্পুটনিক শব্দের অর্থ হলো ভ্রমণসঙ্গী। 

সেই থেকে কৃত্রিম উপগ্রহের যাত্রা শুরু। সবে মাত্র ২য় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি হয়েছে। সোভিয়েন ইউনিয়ন ও আমেরিয়াক্র মধ্যে শুরু শীতল যুদ্ধের সূচনা।  ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক শ্রেষ্ঠত্তের লড়াই শুরু হয়। তখনও মহাকাশে কেউ ঐভাবে মহাকাশ যান পাঠাই নি। এমন সময় শুরু হয় কে কার আগে মহাকাশ জয় করবে । এর মাঝে  স্পুটনিক-১ এর মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশ যাত্রায় যুক্ত্ররাষ্টকে পেছনে ফেলে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করে।

অনেকটা ভলিবল আকৃতির সেই কৃত্রিম উপগ্রহটির ভর ছিল ৮৩৬ কেজি মাত্র। পৃথিবীকে একবার ঘুরে আসতে এটা সময় নেয় প্রায় ৯৮ মিনিট। স্পুটনিক-১ সেই সময়ের রাজনীতি, মিলিটারি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে এক নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেয়। তবে স্থায়ীত্ব বেশিদিন ছিল না, মাত্র তিন মাস। সর্বমোট ৭০ মিলিয়ন কিলোমিটার আবর্তনের পর পৃথিবীর বুকে ছিটকে পড়ে।

এই সব কিছুরই শুরু হয়েছিল ১৯৫২ সালে। ‘ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অফ সায়েন্টেফিক ইউনিয়ন’ পৃথিবী পৃষ্ঠের ম্যাপিং করার জন্য স্যাটেলাইট তৈরির ঘোষনা দেয়।

স্পুটনিক-১ ছবিঃ cosmosmagazine

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করে।যুক্ত্ররাষ্ট্রের হোয়াইট হাউস দপ্তর থেকে প্রথম স্যাটেলাইট হিসেবে ভ্যানগার্ডের নাম প্রস্তাব করা হয়। কিন্তু স্পুটনিক-১ এর উৎক্ষেপণ সব হিসাব নিকাশ পালটে দেয়। 

যুক্তরাষ্ট্র তখন মারিয়া হয়ে উঠে। এটা ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের এক বড় ধরনের পরাজয়। যুক্ত্ররাষ্টের সাধারন লোকজন এই আশঙ্কা করছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন অচিরেই হয়তো নিউক্লিয়ার ওয়ারহেড বহনকারী ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করতে সক্ষম হবে। এই আশঙ্কা তীব্র হয় যখন নভেম্বরের ৩ তারিখে সোভিয়েত ইউনিয়ন তাদের দ্বিতীয় স্যাটেলাইট স্পুটনিক-২  উৎক্ষেপণ করে। স্পুটনিক-২ যাত্রী হিসেবে লাইকা নামের একটা কুকুর বহন করে নিয়ে যায়। অবশ্য উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে লাইকা মারা যায়।

অবশেষে ৩১ জানুয়ারি, ১৯৫৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশে তাদের প্রথম স্যাটেলাইট  এক্সপ্লোরার-১ পাঠাতে সক্ষম হয়। আর এর মধ্য দিয়েই জন্মলাভ করে ‘ন্যাশনাল এরোনটিক্স এন্ড স্পেস এডমিনিস্ট্রেশান- নাসা’।

ভস্টক-১ নামক সোভিয়েত কৃত্রিম উপগ্রহ মানুষ নিয়ে প্রথম পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করে। যে মানুষটি প্রথম মহাকাশে গিয়েছিলেন ইউরি গ্যাগারিন। তিনি ছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের নাগরিক। তিনি ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ভস্টক-১ এ চড়ে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করেন। স্টক-৬ নামক কৃত্রিম উপগ্রহে চড়ে প্রথম সোভিয়েত মহিলা মহাকাসচারি ভেলেন্তিনা তেরেসকোভা মহাকাশে ঘুরে আসেন ১৯৬৩ সালে।

আবহাওয়া সংক্রান্ত কৃত্রিম উপগ্রহ ভ্যানগার্ড ২। ১৯৫৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি এটি উৎক্ষেপিত হয়েছিল। এটি আবহাওয়া সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে পৃথিবীতে পাঠাতে পারত। ১৯৬০ সালের ১ এপ্রিল টাইরোস ১ পৃথিবী থেকে উৎক্ষেপিত হয়। এটি বিস্তারিতভাবে পৃথিবীর আবহাওয়া সংক্রান্ত ছবি পাঠাতে সক্ষম হয়। ওই বছরই ২৩ নভেম্বর টাইরোস ২ পৃথিবী থেকে বিচ্ছুরিত ইনফ্রারেড বা অবলোহিত রশ্মি পরিমাপ করে এবং আবহাওয়ার ছবিও সংগ্রহ করে।

১৯৬১ সালের ১২ জুলাই নিক্ষিপ্ত টাইরোস ৩ আটলান্টিক মহাসাগরের হারিকেন ইথার নামক ঝড় প্রথম আবিষ্কার করে। এক্ষেত্রে হারিকেনের কারণে যেসব অঞ্চল আক্রান্ত হতে পারে সেসব অঞ্চলকে আগেই সতর্ক করা হয়। এই ধারাবাহিক উপগ্রহমালার অনেক উপগ্রহ নিক্ষিপ্ত হয় যা তাপমাত্রা নির্ণয় করে মহাকাশে ইলেকট্রনের ঘনত্বের পরিমাপ করে।

ইনটেলসেট-১ কৃত্রিম উপগ্রহকে পাঠানো হয় বাণিজিয়কভাবে ব্যবহারের জন্য যোগাযোগ উপগ্রহ হিসেবে। রিমোটসেনসিং বা দূর অনুধাবনের জন্য পাঠানো প্রথম উপগ্রহ হলো ল্যান্ডসেট-১। একে পাঠানো হয় ১৯৭২ সালে। আন্তর্জাতিক যোগসূত্র স্থাপনের জন্য অ্যাপোলো-সয়োজ টেস্ট প্রজেক্ট নামে একটি কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে প্রথম পাঠানো হয় ১৯৭৫ সালে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ এ পর্যন্ত প্রায় সহস্রাধিক কৃত্রিম উপগ্রহ মহাকাশে পাঠিয়েছে। কয়েক শত কৃত্রিম উপগ্রহ বর্তমানে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং হাজার হাজার অব্যবহৃত কৃত্রিম উপগ্রহ বা তাদের অংশবিশেষ মহাকাশে ধ্বংসাবশেষ হিসেবে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। 

স্যাটেলাইটের প্রকারভেদ 

স্যাটেলাইটকে আমরা মূলত প্রাকৃতিক আর কৃত্রিম এই  দুইভাগে ভাগ করতে পারি। কিন্ত বর্তমানে স্যাটেলাইট বলতে আমরা মূলত কৃত্রিম উপগ্রহ বা মানুষের বানানো স্যাটেলাইটকেই বুঝে থাকি। 

প্রতিটি স্যাটেলাইট ডিজাইন করা হয় একটা নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য বা কাজকে সামনে রেখে।নির্দিষ্ট কাজের ভিত্তিতে স্যাটেলাইটগুলোকে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়।

ওয়েদার স্যাটেলাইট: এই স্যাটেলাইট আবহাওয়া পর্যবেক্ষনের কাজে ব্যবহার করা হয়। এ স্যাটেলাইটগুলো ক্যামেরা বহন করে যা নির্দিষ্ট সময়ে বা যখন দরকার তখন পৃথিবীর আবহাওয়া সংক্রান্ত ফটো ধারন তুলে গ্রাউন্ড স্টেশনে প্রেরণ করে। ওয়েদার বা আবহাওয়া স্যাটেলাইটের উদাহরণ হিসেবে TIROS, COSMOS এবং GEOS  এগুলোর নামে উল্লেখ করা যেতে পারে।  

ওয়েদার স্যাটেলাইট TIROS ছবিঃ airandspace

কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট: স্যাটেলাইট কমিউনিকেশন বলতে সহজ ভাষায় বলা যায়, স্যাটেলাইটের মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান। এই ব্যবস্থায় শূন্যে উৎক্ষেপিত বিভিন্ন ধরনের স্যাটেলাইট ভূপৃষ্ঠ থেকে বিভিন্ন উচ্চতায় অবস্থান করে পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। তথ্যের আদান-প্রদান হয় স্যাটেলাইটের সঙ্গে পৃথিবীতে স্থাপিত কোনো আর্থ স্টেশনের। কোনো ডিভাইসের অথবা একটি স্যাটেলাইটের সঙ্গে আরেকটি স্যাটেলাইটের যোগাযোগ হয়।

অর্থাৎ সাধারণভাবে যোগাযোগ বলতে আমরা প্রেরক এবং প্রাপকের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদানকে বুঝি। প্রতিটি স্যাটেলাইটের জন্য একটি নির্দিষ্ট সীমানা নির্ধারিত থাকে। এই সীমানার মধ্যেই স্যাটেলাইটটি ফোকাস করা থাকে এবং তার কাজের পরিসীমাও এর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। 

কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইটের মাধ্যমে টেলি যোগাযোগ বা তথ্যের আদান প্রদান  করা হয় । ব্রডকাস্টিং স্যাটেলাইটও এর অন্তর্ভূক্ত। এই কম্যুনিকেশনকে স্পেস কম্যুনিকেশনও বলে। এই স্যাটেলাইটে একটি অ্যান্টেনা সিস্টেম, একটি ট্রান্সমিটার তথা প্রেরক যন্ত্র, পাওয়ার সাপ্লাই ও রিসিভার তথা গ্রাহক যন্ত্র থাকে।

সাধারণ যোগাযোগের উপগ্রহগুলিতে টেলস্টার এবং ইন্টেলস্যাট রয়েছে। একটি যোগাযোগ উপগ্রহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল ট্রান্সপন্ডার - এটি মূলত একটি রেডিও যা গ্রাউন্ড ষ্টেশন থেকে একটি ফ্রিকোয়েন্সিতে মডুলেটেড মাইক্রোওয়েভ তথা সিগন্যাল+ উচ্চ কম্পাঙ্কের বহনকারী তরঙ্গ  গ্রহণ করে এবং তারপরে স্যাটেলাইট সেই মডুলেটেড ওয়েভকে বিবর্ধিত করে পৃথিবীতে স্থাপিত গ্রাহক স্টেশনে পাঠিয়ে দেয় . একটি উপগ্রহ সাধারণত শত শত বা হাজার হাজার ট্রান্সপন্ডার রয়েছে।

কমিউনিকেশন স্যাটেলাইটকে বলা হয় “স্পেস মিরর”। এ ধরনের স্যাটেলাইট আসলেই মহাশূন্যে বিশাল এক আয়নার মত কাজ করে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে রেডিও, টিভি, ইন্টারনেট ডাটা এবং অন্যান্য বিভিন্ন ধরনের তথ্য এই স্যাটেলাইটে পাঠানো হয় এবং কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট সেই ডাটা পৃথিবীর অন্য প্রান্তে পাঠাতে পারে। ব্যবহার করা হয় টিভি ও রেডিও ব্রডকাস্টিং, আবহাওয়ার খবর জানতে এবং পৃথিবীর টেলিফোন ব্যবস্থার মেরুদণ্ড হিসেবে।

ব্রডকাস্ট স্যাটেলাইটঃ এই স্যাটেলাইটের কাজ হল টেলিভিশনের সিগনাল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে প্রেরণ করা। এটি বর্তমানে বহুল ব্যবহৃত। 

পোলার অরবিটিং স্যাটেলাইটঃ নাম থেকেই বুঝা যাচ্ছে, এটার ঘূর্ণনগতি হচ্ছে পোল টু পোল, মানে উত্তর দক্ষিণ বরাবর। যেহেতু পৃথিবী ঘুরে পূর্ব পশ্চিম বরাবর এবং এই স্যাটেলাইট ঘুরে উত্তর দক্ষিণ বরাবর, তাই এটা পৃথিবীর কোনো একটা অবস্থানের সাপেক্ষে কখনোই স্থির থাকে না, বরং একেকবার পৃথিবীর একেক অঞ্চলের উপর দিয়ে প্রদক্ষিণ করে। এই ধরণের স্যাটেলাইট মূলত ব্যবহার হয় পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার জন্য। এটির উচ্চতাও জিওস্টেশনারি স্যাটেলাইট এর তুলনায় অনেক কম। 

জিওস্টেশনারী স্যাটেলাইট বা ভূ স্থির উপগ্রহঃ যখন কোন স্যাটেলাইটকে ৩৫,৭৮৬ কি.মি. উচ্চতায় স্থাপন করা হয় তখন সেই স্যাটেলাইটটি পৃথিবীর সাথে সমবেগে আবর্তন করে অর্থাৎ স্যাটেলাইটটি এমনভাবে পৃথিবীর চারদিকে ঘুরে যেন পৃথিবীর চারদিকে এক বার ঘুরতে তার ২৪ ঘন্টা সময় লাগে আর যেহেতু পৃথিবীরও নিজের চারদিকে একবার ঘুরতে ২৪ ঘন্টা সময় লাগে তাই পৃথিবীর সাপেক্ষে স্যাটেলাইটটিকে স্থির মনে হবে। এই স্যাটেলাইট কমিউনিকেশনের জন্যে বেশ ভাল কিন্ত এ ধরনের স্যাটেলাট পুরু পৃথিবীকে কভার করতে পারে না। সমগ্র পৃথিবীকে কভার করতে হলে এই কক্ষপথে তিনটি স্যাটেলাইট স্থাপন করতে হয়। যদি তিনটিই স্যাটেলাইট পরষ্পর থেকে ১২০ ডিগ্রি কোণে জিও স্টেশনারী অরবিটে অবস্থান করে তাহলে একই সাথে সমগ্র পৃথিবীকে কভার করা সম্ভব।

​বৈজ্ঞানিক স্যাটেলাইটঃ বৈজ্ঞানিক কার্যক্রমের জন্যে এ ধরনের স্যাটেলাইটকে প্রেরণ করা হয়। 

ন্যাভিগেশন স্যাটেলাইট: এই স্যাটেলাইট বিমান ও সমুদ্রগামী জাহাজ ডিটেক্ট ও ন্যাভিগেট তথা পথ নির্দেশনা করতে ব্যবহার করা হয়। GPS NAVSTAR স্যাটেলাইট হল সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি ন্যাভিগেশনাল স্যাটেলাইট । আর জিপিএস হল স্যাটেলাইট ভিত্তিক নেভিগেশন সিস্টেম ।

ছবিঃ itsgoingdown.org

গোবাল পজিশনিং সিস্টেম (জিপিএস) স্যাটেলাইট স্থাপন করা হয় ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার মাইল উচ্চতায়।  জিপিএস সিস্টেম এমন একটি নেটওয়ার্ক যা ২৪ টি স্যাটেলাইট নিয়ে গঠিত যা নিরবিচ্ছিন্নভাবে তথ্য ও পৃথিবীর কোন অবস্থানের ছবি পাঠাতে সক্ষম যেকোন সময়ে ও যেকোন আবহাওয়ায়।

আর্থ অবজারভেশন স্যাটেলাইট: এই স্যাটেলাইট পৃথিবী পৃষ্ঠ নিরীক্ষন করতে ও পৃথিবী পৃষ্ঠের বিভিন্ন অংশের ছবি তুলতে ব্যবহার করা হয়। মূলত পৃথিবী পরিবর্তনগুলো রেকর্ড করে যেমন তাপমাত্রা থেকে শুরু করে বনায়ন বা আইসক্রিট নিয়েও সে পর্যবেক্ষন চালায়।

মিলিটারী স্যাটেলাইট: এই স্যাটেলাইট শুধুমাত্র সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। এর কাজগুলো মূলত গোপনে মনিটর করা হয়। কি ধরনেরক আজ দেওয়া হয় তা গোপন রাখ হয় তবে মূলত কাজ হল- নিউক্লিয়ার মনিটরিং, রাডার ইমেজিং, ফটোগ্রাফি ও শত্রুর গতিবিধ পর্যবেক্ষন, শত্রু এলাকার মিলিটারি টেরিটরি ছবি তুলা ইত্যাদি।  

স্যাটেলাইটগুলো কোন উচ্চতায় থাকবে তার উপর ভিত্তি করে স্যাটেলাইটগুলো তিন ভাগে ভাগ করতে পারি।

১। লো-আর্থ অরবিটঃ লো-আর্থ অরবিট এর স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ১৬০-২,০০০কি.মি.উপড়ে অবস্থান করে । যে স্যাটেলাইটগুলো দ্বারা পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করা হয় সাধারণত সেই স্যাটেলাইটগুলোকেই এই কক্ষপথে রাখা হয় । যেহেতু এই স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছাকাছি অবস্থান করে তাই এই স্যাটেলাইটগুলো দ্বারা প্রায় নিখুঁত ভাবে পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণ করা যায় । এই কক্ষপথেই আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশনের অবস্থান ।

২। মিডিয়াম আর্থঃ মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ২০,০০০কি.মি. উপড়ে অবস্থান করে । এই কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির দরকার পরে । মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইটগুলোর গতিবেগ খুবই মন্থর হয়ে থাকে । মোট ১২টি মিডিয়াম আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট দিয়ে পুর পৃথিবীতে সংযোগ করা যায়, এর সংখ্যা জিওস্টেশনারি আর্থ এর থেকে বেশি কিন্তু লো-আর্থ এর তুলনায় বেশ কম হয় । এই কক্ষপথে সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইটগুলো থাকে ।

৩। জিওস্টেশনারি আর্থঃ জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিটের স্যাটেলাইট পৃথিবীর পৃষ্ঠ হতে ৩৬,০০০ কি.মি. উপড়ে অবস্থান করে । এই স্যাটেলাইটের ক্ষমতা অনেক বেশি হয় । টিভি এবং রেডিও ট্রান্সমিশনে এর কাজে জিওস্টেশনারি আর্থ অরবিট ব্যাবহার করা হয় । সাধারণত অ্যান্টেনার একটা নির্দিষ্ট অবস্থান থেকে এই কক্ষপথে ।

মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যাঃ 

জাতিসংঘের মহাকাশবিষয়ক সংস্থা ইউনাইটেড নেশনস অফিস ফর আউটার স্পেস অ্যাফেয়ার্সের (ইউএনওওএসএ) হিসাব মতে,  ২০১৭ সাল পর্যন্ত মহাকাশে স্যাটেলাইটের সংখ্যা ৪ হাজার ৬৩৫। এর সাথে প্রতি বছরই স্যাটেলাইটের এ সংখ্যা ৮ থেকে ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে।

স্পুটনিকের পর এই পর্যন্ত প্রায় ৬৬০০ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছে যার মধ্যে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ৩৬০০ টি স্যাটেলাইট কক্ষপথে অবস্থান করছে। এদের মধ্যে কার্যকর আছে ১০০০ টির মত স্যাটেলাইট। বাকিগুলো জ্বালানী ফুরিয়ে অকার্যকরভাবে কক্ষপথে ঘুরে বেড়াচ্ছে এবং বেশীরভাগ মহাশূন্যে হারিয়ে গেছে।

এ পর্যন্ত প্রায় ৫০টিরও অধিক দেশ থেকে কয়েক হাজার স্যাটেলাইট মহাকাশে উৎক্ষেপন করা হয়েছে তবে পৃথিবীর মাত্র ১০ টি দেশ নিজস্ব প্রযুক্তিতে ও নিজস্ব উৎক্ষেপনকেন্দ্র থেকে মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপন করতে সক্ষম হয়েছে। দেশগুলি হল সোভিয়েত ইউনিয়ন (১৯৫৭), যুক্তরাষ্ট্র(১৯৫৮), ফ্রান্স(১৯৬৫), জাপান(১৯৭০), চীন(১৯৭০), যুক্তরাজ্য(১৯৭১), ভারত(১৯৮০), ইসরায়েল(১৯৮৮), ইউক্রেইন(১৯৯২) ও ইরান(২০০৯)। বর্তমানে মহাকাশে ঘুরনায়মান স্যাটেলাইটের সংখ্যা হল ১০৭১ টি। আর মজার ব্যাপার হল এর ৫০ ভাগ উৎক্ষেপণ করেছে যু্ক্তরাষ্ট। 

অনেক তো আলোচনা হল এবার আমাদের নিজেদের স্যাটেলাইট বংগবন্ধু-১ ফিরে আসা যাক। 

বাংলাদেশের স্যাটেলাইটের যাত্রা পথ

দেশের স্বাধীনতার পর ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রস্তাব দেন বাংলাদেশ যেন ভারতের আর্থ স্টেশন বা উপগ্রহ ভূকেন্দ্র ব্যবহার করে বহির্বিশ্বের সাথে যোগাযোগ বজায় রাখে। তবে বঙ্গবন্ধু বিনয়ের সাথে এই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে নিজ দেশেই আর্থ স্টেশন তৈরির কাজ শুরু করেন। ১৯৭৫ সালে রাঙ্গামাটিতে উদ্বোধন করেন দেশের প্রথম আর্থ স্টেশন বেতবুনিয়া উপগ্রহ ভূকেন্দ্র।

১৯৭৫ সালে বেতবুনিয়া উপগ্রহ কেন্দ্র উদ্বোধন বঙ্গবন্ধু

এই স্বপ্নযাত্রার প্রস্তুতি শুরু হয়েছিল এক দশক আগে। বাংলাদেশে প্রথম স্যাটেলাইট নিয়ে কাজ শুরু হয় ২০০৭ সালে। বাংলাদেশে টেলি যোগাযোগ খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি ২০০৮ সালে এ বিষয়ে একটি কমিটি করে। এরপর ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। সে সময় মহাকাশের ১০২ ডিগ্রি পূর্ব দ্রাঘিমাংশে কক্ষপথ বরাদ্দ চেয়ে জাতিসংঘের অধীন সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নে (আইটিইউ) আবেদন করে বাংলাদেশ। কিন্তু বাংলাদেশের ওই আবেদনের ওপর ২০টি দেশ আপত্তি জানায়। এই আপত্তির বিষয় এখনো সমাধান হয়নি।

 ২০০৯ সালে জাতীয় তথ্যপ্রযুক্তি নীতিমালায় রাষ্ট্রীয় স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের বিষয়টি যুক্ত করা হয়। এরপর নিজস্ব স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন ইউনিটের (আইটিইউ) কাছে ইলেক্ট্রনিক আবেদন দাখিলসহ প্রাথমিক ধাপ শেষ করে বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি সংস্থার সম্পৃক্ততায়, জনবল এবং বাজেট বরাদ্দে এগিয়ে চলে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিভিন্ন ধাপ।

এরপর ২০১৩ সালে রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের বর্তমান কক্ষপথটি কেনা হয়। বাংলাদেশ বারবার আইটিইউর কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থাকলেও এখন পর্যন্ত নিজস্ব কক্ষপথ আনতে পারেনি।

বিভিন্ন খাতে খরচ

উপগ্রহ উৎক্ষেপণের মাধ্যমে সম্প্রচার ও টেলিযোগাযোগ সেবা পরিচালনায় ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে একনেক সভায় দুই হাজার ৯৬৮ কোটি টাকার ‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ’ প্রকল্প অনুমোদন পায়। 

এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে বরাদ্দ দেওয়া হয় এক হাজার ৩১৫ কোটি ৫১ লাখ টাকা, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৪৪ শতাংশ। এ ছাড়া ‘বিডার্স ফাইন্যান্সিং’ এর মাধ্যমে এ প্রকল্পের জন্য এক হাজার ৬৫২ কোটি ৪৪ লাখ টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়।

এই প্রেক্ষিতে হংক সাংহাই ব্যাংকিং করপোরেশনের (এইচএসবিসি) সঙ্গে প্রায় একহাজার ৪০০ কোটি টাকার ঋণচুক্তি  হয়  ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে। এক দশমিক ৫১ শতাংশ হার সুদসহ ১২ বছরে ২০ কিস্তিতে ওই অর্থ পরিশোধ করতে হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উতক্ষপণের সময় ছবিঃ উইকি

স্যাটেলাইট সিস্টেমের নকশা তৈরির জন্য ২০১২ সালের মার্চে প্রকল্পের মূল পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ পায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ‘স্পেস পার্টনারশিপ ইন্টারন্যাশনাল’।

এরপর স্যাটেলাইট সিস্টেম কিনতে ফ্রান্সের কোম্পানি তালিস এলিনিয়া স্পেসের সঙ্গে একহাজার ৯৫১ কোটি ৭৫ লাখ ৩৪ হাজার টাকার চুক্তি করে বিটিআরসি।  

পৃথিবীর কক্ষপথে একটি স্যাটেলাইট বসাতে প্রয়োজন হয় সুনির্দিষ্ট অরবিটাল স্লট। ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে রাশিয়ার সংস্থা ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে এই অরবিটাল স্লট ইজারা নিতে অনুমোদন দেওয়া হয় ২১৮ কোটি ৯৬ লাখ টাকা।

এর মাঝে স্যাটেলাইটের সার্বিক ব্যবস্থাপনার জন্য ‘বাংলাদেশ কমিউনিকেশন স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেড’ নামে একটি সংস্থা গঠন করা হয়। এই সংস্থা গঠনে মূলধন হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয় পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

স্যাটেলাইট নির্মাণ:

৩.৭ টন বা প্রায়  ৩, ৫০০ কিলোগ্রাম ভরের বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো  ডিজাইন এবং তৈরি করেছে ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালাস অ্যালেনিয়া স্পেস। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভ‚মি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভ‚-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানটির। 

বিটিআরসি এবং থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস কোম্পানির মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হচ্ছে; ছবিসূত্রঃ ফোকাস বাংলা

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ করে এ বছরের ৩০ মার্চ একটি বিশেষ উড়োজাহাজে উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পৌঁছে দেয় থ্যালাম অ্যালেনিয়া স্পেস। আর যে রকেট এটাকে মহাকাশে নিয়ে যাচ্ছে সেটি বানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের স্পেসএক্স। সেখানের বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর প্রতিকূলতা পেরিয়ে বেসরকারি মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের ফ্যালকন নাইন রকেটে করে স্যাটেলাইটটি ২০১৮ সালের ১১ মে (বাংলাদেশ সময়ানুযায়ী) মহাকাশে প্রেরণ করা হয়। 

স্যাটেলাইট তৈরি এবং ওড়ানোর কাজটি বিদেশে হলেও এটি নিয়ন্ত্রণ করা হবে বাংলাদেশ থেকেই। এ জন্য গাজীপুরের জয়দেবপুরে তৈরি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন (ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা) স্যাটেলাইট নিয়ন্ত্রণের মূল কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে। আর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা হবে রাঙামাটির বেতবুনিয়া গ্রাউন্ড স্টেশন।

বাংলাদেশের গাজীপুরে গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন।ছবি: প্রথম আলো

স্যাটেলাইট তৈরির এই পুরো কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) তত্ত্বাবধানে। তিনটি ধাপে এই কাজ হয়েছে। এগুলো হলো স্যাটেলাইটের মূল কাঠামো তৈরি, স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও ভূমি থেকে নিয়ন্ত্রণের জন্য গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি।

কেনা হয় কক্ষপথ

বাড়ি বানাতে যেমন জমি বা স্লট কিনতে হয় তেমনি নিজস্ব স্যাটেলাইট স্থাপন করতে গেলেও মহাকাশে স্লট কিনতে হয়। এগুলোকে বলা হয় অরবিটাল স্লট বা কক্ষপথ ।  স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ এবং তা কক্ষপথে রাখার জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে বাংলাদেশ কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) ক্রয় করে ।

মহাকাশে এই কক্ষপথের অবস্থান ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এর ফুটপ্রিন্ট বা কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজিকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় । চুক্তি অনুসারে প্রাথমিকভাবে ১৫ বছরের জন্য অরবিটাল স্লট কেনা হচ্ছে। তবে ১৫ বছর করে আরও দুবার চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে বিটিআরসি।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের বিবরণ

বঙ্গবন্ধু-১ কৃত্রিম উপগ্রহটি ১১৯.১° ডিগ্রী পূর্ব দ্রাঘিমার কক্ষপথে পাঠানো হয়েছে। এ স্যাটেলাইটটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে নামকরণ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ ১৬০০ মেগাহার্টজ ক্ষমতাসম্পন্ন মোট ৪০টি কে-ইউ এবং সি-ব্যান্ড ট্রান্সপন্ডার বহন করবে ।

‘ফ্যালকন-৯’ রকেটে ছবিটি স্পেসএক্সের প্রতিষ্ঠাতা এলন মাস্কের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া।

এখন পর্যন্ত নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এই ৭০ টি ট্রান্সপন্ডারের মধ্যে ২০টি থাকবে বাংলাদেশের জন্য বরাদ্দ আর বাকি ২০টি ভাড়া দেওয়া হবে। চল্লিশটির মধ্যে ২৬টি হবে কেইউ ব্যান্ড (Ku Band) আর ১৪টি সি ব্যান্ড (C Band)-এর ট্রান্সপন্ডার। প্রতিটি ট্রান্সপন্ডার থেকে ৪০ মেগাহার্টজ হারে ফ্রিকোয়েন্সি প্রাপ্তির হিসেবে স্যাটেলাইটের মোট ফ্রিকোয়েন্সি তাত্ত্বিকভাবে ১,৬০০ মেগাহার্টজ  পাবার কথা থাকলে কিছু কারিগরি সীমাবদ্ধতার কারণে এ ফ্রিকুয়েন্সী ১,৪০০ মেগাহার্টজের মতো হবে বলে বিশেষজ্ঞগণ মত দিয়েছেন। 

স্যাটেলাইটের বাইরের অংশে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকার রঙের নকশার ওপর ইংরেজিতে লেখা রয়েছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু ১। বাংলাদেশ সরকারের একটি মনোগ্রামও সেখানে রয়েছে।

মহাকাশে প্রতিটি স্যাটেলাইট বা কৃত্রিম উপগ্রহের একটি কার্যকরী মেয়াদকাল থাকে। বঙ্গবন্ধু ১ স্যাটেলাইটের ক্ষেত্রে সেটি ধরা হয়েছে কমপক্ষে ১৫ বছর।

স্যাটেলাইটের আওতা 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের ২৬ টি  Ku Band ট্রান্সপন্ডারের আওতায় থাকবে সমগ্র বাংলাদেশ ও বঙ্গোপসাগরে তার নির্ধারিত জলভাগ। এছাড়া এই ব্যান্ডের রিজিওনাল বিমের আওতায় থাকবে ভারত, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন ও ইন্দোনেশিয়া।

আর অন্যদিকে বাকি ১৪ টি  রিজিওনাল C Band-এর আওতায় থাকবে আরো বিশাল এলাকা। এই ট্রান্সপন্ডারগুলো তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ বা মাইক্রোওয়েভ সংকেত হিসেবে গ্রাউন্ড স্টেশন থেকে পাঠানো তথ্য (Up-link) গ্রহণ করবে। অতপর সেই সংকেতগুলোকে কয়েকগুণ বর্ধিত(Amplification) করে পুনরায় তা ফেরত পাঠানো হবে (Down-link) পৃথিবীতে। 

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ ও নিয়ন্ত্রণ

সর্বপ্রথম ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই এই স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনা করা হয়। স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য  ১৬ ডিসেম্বর তারিখ ঠিক করা হলেও হারিকেন আরমায় ফ্লোরিডায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হলে তা পিছিয়ে যায়।

২০১৮ সালেও কয়েকদফা উৎক্ষেপণের তারিখ পিছিয়ে যায় আবহাওয়ার কারণে।

এর পর আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, চূড়ান্ত পর্যায়ে উৎক্ষেপণ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে গত ৪ মে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে দুই স্টেজের এই রকেটের স্ট্যাটিক ফায়ার টেস্ট সম্পন্ন হয়।

মে মাসের ১০ তারিখ  শুক্রবার বাংলাদেশ সময় ভোররাত ৩টা ৪৭ মিনিটে বাংলাদেশের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহটি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে মহাকাশ পানে যাত্রা শুরুর কথা ছিল। সব প্রস্তুতি সেরে উৎক্ষেপণের  জন্যে শুরু হয়ে গিয়েছিল কাউন্ট ডাউন। কিন্তু একেবারে শেষ মিনিটের শুরুতে (T- 58 sec) এসে থমকে যায় সেকেন্ডের কাঁটা। স্পেসএক্সের ভেরিফায়েড টুইটার অ্যাকাউণ্ট থেকে জানা যায় যে, গ্রাউন্ড সিস্টেমের Auto Abort কমান্ডের কারণে শেষ মুহূর্তে এসে বাতিল হয় সেদিনের মহাকাশযাত্রা, স্যাটেলাইটটি আর ওড়েনি লঞ্চ প্যাড থেকে।

সাধারণত উৎক্ষেপণের শেষ মুহূর্তগুলো কম্পিউটার দ্বারা সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়। হিসেব যদি একটুও এদিক সেদিক  হয়,  তাহলে কম্পিউটার রকেটকে উৎক্ষেপণ থেকে বিরত রাখে।

পরের দিন ১১ তারিখ শনিবার রাত ২টা ১৪ মিনিটে (বাংলাদেশ সময়ানুযায়ী) পুনরায় উৎক্ষেপণের সময় নির্ধারিত হয়। এবার আর ব্যর্থতা জেঁকে বসেনি কোনোভাবেই।  ঠিক ঠিক ঘড়ির কাঁটা ধরে ঐতিহাসিক মুহূর্তটি এল রাত ২টা ১৪ মিনিটে। তীব্র আগুনের হলকা ছুটিয়ে প্রচণ্ড শক্তিতে মহাকাশের পথে ডানা মেলল বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১। চাঁদে অবতরণকারী প্রথম মহাকাশযান অ্যাপোলো-১১ এই স্পেস সেন্টার থেকেই উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল।

উৎক্ষেপণের মুহূর্তটি স্পেসএক্সের ওয়েবসাইট থেকে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় কোটি কোটি বাংলাদেশি নির্ঘুম আর উৎকণ্ঠায় কাটায় শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত দেশ এক ঐতিহাসিক মূহুর্তের সাক্ষী হয়ে থাকে। 

ঐতিহাসিক এই মুহূর্তের সাক্ষী হতে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টারে উপস্থিত ছিল বাংলাদেশ সরকারের একটি প্রতিনিধিদল।  এ সময়, ঘটনাস্থল কেনেডি স্পেস সেন্টারে সমবেত বাঙালিরা সমবেত কণ্ঠে ধরেন জাতীয় সংগীত, ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। উৎক্ষেপণস্থল থেকে ১৩ হাজার কিলোমিটার দূরে বাংলাদেশের অসংখ্য মানুষও তখন গেয়ে ওঠেন একই সংগীত। 

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক রকেট উৎক্ষেপণ প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স এর ‘ফ্যালকন ৯’ রকেটে করে ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে ১২ মে বাংলাদেশ সময় রাত ২ টা ১৪ মিনিটে  সফলভাবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১  মহাকাশের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।

স্পেসএক্সের ফ্যালকন নাইনের প্রসঙ্গ যখনই আসে তখনই স্পেসএক্স এর  এলিট লেভেলের গ্রাহক হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নাসা, লুক্সেমবার্গভিত্তিক আন্তর্জাতিক স্যাটেলাইট অপারেটর এসইএস (SES)-এর মত সংস্থার নাম চলে আসে। স্পেসএক্সের এ তালিকায় বাংলাদেশ নাম বসিয়েছে ! 

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মিশন সফল হওয়ার রোমাঞ্চিত মহাকাশ গবেষণা সংস্থা স্পেসএক্সের কর্মকর্তারাও। তাদের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডার কেনেডি স্পেস সেন্টার থেকে গতকাল শুক্রবার উৎক্ষেপণ করা হয় স্যাটেলাইটটি। উৎক্ষেপণ করার ৩৩ মিনিট পর সেটি জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে পৌঁছানো সম্ভব হয়।

এ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের জন্য প্রথমবারের মতো ফ্যালকন-৯ ব্লক ৫ রকেট ব্যবহার করা হয়েছে। এ মডেলের রকেটের চূড়ান্ত ও হালনাগাদ সংস্করণ ছিল এটি। এ রকেট এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে কম রক্ষণাবেক্ষণ করেই ১০ বা তার বেশিবার ব্যবহার করা যাবে। এমনকি একই দিনে একাধিকবার তা মহাকাশে পাঠানো যাবে। এর আরও উন্নত সংস্করণ ব্যবহার করে মহাকাশে যাবে মানুষ।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট বহনকারী রকেটটির ২টি স্টেজ রয়েছে। উৎক্ষেপণের দেড় মিনিটের মাথায় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটটিকে বহনকারী রকেট ফ্যালকন-৯ ম্যাক্স কিউ অতিক্রম করে। নির্দিষ্ট উচ্চতায় পৌঁছে রকেটের স্টেজ-১ খুলে যায়। কাজ শুরু করে স্টেজ-২।

এরপর সফলভাবে পৃথিবীতে ফিরে আসে স্টেজ-১ এবং নেমে আসে আটলান্টিকে ভাসমান ড্রোন শিপে। ফ্যালকন-৯-এর স্টেজ-২ ২টা ৪৭ মিনিটে পৌঁছে যায় জিওস্টেশনারি ট্রান্সফার অরবিটে। মহাশূন্যে ভাসতে থাকে বাংলাদেশের প্রথম যোগাযোগ স্যাটেলাইট।

কক্ষপথে স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত স্যাটেলাইটের যাত্রার ধাপটিকে বলে লঞ্চ অ্যান্ড আরলি অরবিট ফেইজ (এলইওপি)। এই ধাপে লাগে ১০ দিনের মত। এরপর কক্ষপথে স্থাপিত হওয়ার ধাপটিকে বলা হয় স্যাটেলাইট ইন অরবিট। কক্ষপথে স্থাপনের এই প্রক্রিয়াটিতে সময় লাগে ২০ দিন।

সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যার অপেক্ষায় ছিল অসংখ্য মানুষ। ছবিটি আলোকচিত্রী ব্র্যাডি কেনিস্টনের টুইটার অ্যাকাউন্ট থেকে নেওয়া।

এরপর বঙ্গবন্ধু-১-এর নিয়ন্ত্রণ নেয় যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি ও দক্ষিণ কোরিয়ার তিনটি গ্রাউন্ড স্টেশন।মহাকাশের ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে নিজস্ব অরবিটাল স্লটে জায়গা করে নিতে ৩৬ হাজার কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয় বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটকে।

এটি দুই স্টেজের রকেটযান, যার জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয় তরল অক্সিজেন (LOX) আর রকেট গ্রেডের কেরোসিন (RP-1)। এর নকশা, তৈরি ও চালনার পুরোভাগের কৃতিত্ব মহাকাশ সংস্থা স্পেসএক্সের।

ফ্যালকন নাইন উচ্চতায় প্রায় ৭০ মিটার (২২৯ ফুট) আর ব্যাসে ১২ ফুট বা ৩.৬৬ মিটার। ৫৯৭ টন ভরের এই রকেটযানের অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ও লিথিয়াম ধাতুর সংকর দিয়ে। এই রকেটের দুইটি স্টেজেই আছে প্রচণ্ড শক্তিশালী মার্লিন ক্লাস ইঞ্জিন।

ফ্যালকন নাইনের গঠন কাঠামো; ছবিসূত্রঃ nasa.gov

উলম্ব অবস্থায় ফ্যালকন নাইনের সবচেয়ে উপরের অংশে থাকে স্যাটেলাইট। উপরের এই অংশে বেশ বড় আকারের স্যাটেলাইট বহন করা সম্ভব। এরপরের অংশে রয়েছে স্টেজ-২; আর একদম নিচের শেষাংশের নাম হল স্টেজ-১। স্টেজ-১ নয়টি মার্লিন ক্লাস ইঞ্জিনযুক্ত স্টেজ-১ একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব অতিক্রমের পর রকেট থেকে আলাদা হয় পৃথিবীতে ফিরে আসে। এই স্টেজ-১ পরবর্তীতে পুনরায় কোনো উৎক্ষেপণে ব্যবহার করা যায়। কিন্তু এক ইঞ্জিন বিশিষ্ট স্টেজ-২ আর পৃথিবীতে ফেরত আসে না । সে রকেটের বাকি কাঠামোর সাথে থেকে যায় মহাশূন্যে।

স্পেসএক্স হলো মার্কিন মহাকাশযান ও রকেট প্রস্তুতকারক এবং উৎক্ষেপণকারী প্রতিষ্ঠান। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় ২০০২ সালে এটি প্রতিষ্ঠা করেন ইলোন মাস্ক। প্রতিষ্ঠানটির মহাকাশযান সিরিজের নাম ড্রাগন এবং রকেট সিরিজের নাম ফ্যালকন। ফ্যালকন সিরিজের সর্বশেষ প্রযুক্তির ভার্সন-৫ রকেটে করে মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।

বিজনেস ইনসাইডার ফ্যালকন-৯ রকেট সম্পর্কে জানিয়েছে, ২০১০ সালে এ মডেলের রকেটের উদ্বোধনের পর এখন পর্যন্ত ৫৬টি মিশন পরিচালনা করেছে স্পেসএক্স। এর মধ্যে এ বছরে ফ্যালকন-৯ ব্যবহার করে আটটি ফ্লাইট পরিচালিত হয়েছে। মাস্ক তাই এ রকেটকে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য রকেট বলেই বর্ণনা করেন।

কি উপকারে আসবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১?

স্যাটেলাইটের প্রয়োজনীয়তার কথা, এর উপকারের কথা আগেই বলেছি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্প সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ যোগাযোগ এবং সম্প্রচার কাজেই মূলত ব্যবহার করা হবে।  এর আগে দেশের স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুরের কাছ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া করে তাদের সম্প্রচার কার্যক্রম চালাতো।

এত দিন  বাংলাদেশের বিভিন্ন স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেলগুলো প্রতিবছর অন্যান্য দেশের স্যাটেলাইট পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানকে প্রায় দেড় কোটি মার্কিন ডলার সমপরিমাণ অর্থ ভাড়া হিসেবে পরিশোধ করে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। বাংলাদেশের নিজস্ব স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রচার কার্যক্রম পরিচালিত হলে এ অর্থ বাংলাদেশেই থেকে যাবে। ফলে বড় অঙ্কের টাকার বৈদেশিক মুদ্রাও সাশ্রয় হবে। দেশের বেসরকারি টেলিভিশনগুলোর স্যাটেলাইট ভাড়াবাবদ ব্যয়ও কমে আসবে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ ব্যবহারের মাধ্যমে দেশের টিভি চ্যানেলগুলো এখন থেকে কম খরচে উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে পারবে। আর দেশের টাকা দেশে তো থাকছেই।

স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলোর সম্প্রচার দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পৌছে দেয়ার কাজটি করে থাকে কিছু ক্যাবল অপারেটর কোম্পানি। কিন্তু এই কোম্পানিগুলোর সেবা অনেক ক্ষেত্রেই সন্তোষজনক নয়। আবার দেশের অনেক জায়গাতেই এই সেবার প্রসার ঘটেনি। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর মাধ্যমে ডাইরেক্ট টু হোম (ডিটিএইচ ) সেবা চালু করলে শুধুমাত্র একটি ডিশ এন্টেনার মাধ্যমে নিরবিচ্ছিন্নভাবে চ্যানেল্গুলোর সম্প্রচার উপভোগ করা যাবে। এতে একই সাথে মানসম্মত ছবি এবং শব্দ পাওয়া সম্ভব হবে।  ট্রিপল প্লে- অর্থাৎ ডিশ, ইন্টারনেট ও কলিং- এ তিনটি সেবা একসাথে ডিটিএইচ এর মাধ্যমে পাওয়া যাবে। এতে করে প্রত্যন্ত এলাকায় এই সুবিধা ছড়িয়ে দেয়া যাবে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের মূল অবকাঠামো তৈরি করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস।

এ ছাড়া স্যাটেলাইট থেকে পাওয়া যাবে উচ্চগতির ইন্টারনেট ব্যান্ডউইথ। ফলে ব্যান্ডউইথের বিকল্প উৎসও পাওয়া যাবে। দেশের পার্বত্য ও হাওড় এলাকাগুলোসহ কিছু প্রত্যন্ত অঞ্চল ও দ্বীপ রয়েছে যেখানে মানুষজন এখনো ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত। এসব এলাকায় মানসম্মত মোবাইল ফোন নেটওয়ার্ক কাভারেজ এবং ইন্টারনেট সেবার প্রসারে কাজে লাগবে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১।  প্রাপ্ত ব্যান্ডউইথ ব্যবহার করে দেশের দুর্গম দ্বীপ, নদী ও হাওর এবং পাহাড়ি অঞ্চলে স্যাটেলাইট প্রযুক্তিতে নিরবচ্ছিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা চালুও সম্ভব হবে। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে স্বাভাবিক টেলিযোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হলেও উদ্ধারকর্মীরা স্যাটেলাইট ফোনে যোগাযোগ রেখে দুর্গত এলাকায় কাজ করতে সক্ষম হবেন। 

২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি রাষ্ট্রের কাছে ভাড়া দেওয়া যাবে। নেপাল, ভূটান, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, কির্জিস্তান, মায়ানমারসহ  কয়েকটি দেশ রয়েছে যাদের কাছে স্যাটেলাইট ভাড়া দিয়ে প্রচুর পরিমানে  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। বছরে যেটা প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের মত।

টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্সের মত আরও অনেক সুবিধা এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে সম্প্রসারিত হবার সুযোগ রয়েছে।

স্যাটেলাইটের এসব সুবিধা নিশ্চিত করতে হলে দরকার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা। আর এ ক্ষেত্রে প্রথম উদ্যোগটি সরকারকেই নিতে হবে। স্যাটেলাইটের নিয়ন্ত্রণ ও বিপণনের কাজটিও করতে হবে দক্ষতার সঙ্গে। এ ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতকে দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগাতে হবে। সব বিষয় যাতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় না পড়ে, সেটি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ উৎক্ষেপণের পর মুহূর্ত থেকে এ স্যাটেলাইটের মেয়াদ থাকবে ১৫ বছর। অযথা সময়ক্ষেপণ করা হলে বাংলাদেশের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থে তৈরি এ স্যাটেলাইটের উদ্দেশ্য পূরণ কঠিন হবে।

শেষ কথা

এটা কি বাংলাদেশের প্রথম স্যাটেলাইট? অনেকেই দেখলাম এই ভুলটা করছে। না, এটা বাংলাদেশের পাঠানো প্রথম স্যাটেলাইট না। বাংলাদেশ থেকে পাঠানো প্রথম স্যাটেলাইট হচ্ছে “ব্র্যাক অন্বেষা”, সেটা একটা পোলার ন্যানো-স্যাটেলাইট যেটা পাঠানো হয়েছে ৩ জুন, ২০১৭ তারিখে। তবে বঙ্গবন্ধু-১ হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম জিওস্টেশনারি কম্যুনিকেশন স্যাটেলাইট। মজার ব্যাপার হচ্ছে, “ব্র্যাক অন্বেষা”এবং বঙ্গবন্ধু-১, দুটোই স্পেস-এক্স নামক সংস্থার মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা হলো বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট -১ এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ৫৭ তম দেশ হিসেবে অভিজাত স্যাটেলাইট পরিবারে পা দিয়েছে। এই স্যাটেলাইটের মাধ্যমে আমরা কি ধরনের সুবিধা পাবো তার পুরোটাই মূলত  নির্ভর করছে কিভাবে এই স্যাটেলাইট ব্যবহার করা হবে তার উপর।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক