বঙ্গভঙ্গঃ উপমহাদেশের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা

বঙ্গভঙ্গ ব্রিটিশ ভারত শাসন আমলের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। বঙ্গভঙ্গ অবিভক্ত বাংলায় তথা সমগ্র ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরম্নত্বপূর্ণ ঘটনা। পূর্ব বাংলায় সুষ্ঠু প্রশাসনিক ব্যবস্থা না থাকায় এবং জনগণের ভাগ্যোন্নয়নের উদ্দেশ্যে লর্ড কার্জন এ উদ্যোগ গ্রহণ করেন।

এ ঘটনা হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে। বাংলার বিভক্তি এবং আমাদের সঙ্গে এর একটি অংশ যুক্ত করে নতুন প্রদেশ গঠনের মাত্র ৬ বছরের মধ্যে তা ব্রিটিশ কতৃক বাতিল ঘোষিত হয় । 

বঙ্গভঙ্গ কি ?

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দের ২৩ই জুন ভাগিরতি নদীর তীরে পলাশীর আম বাগানে বাংলা, বিহার ও উডিষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাদ্দৌলার পরাজয়ের মাধ্যমে এ ভারতীয় মহাদেশে ইংরেজ শাসন শুরু হয় । ১৮৫৪ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা, বিহার, উড়ি্ষ্যা ও আসাম নিয়ে একটি প্রশাসনিক এলাকায় তৈরি করা হয়।  উল্লেখ্য এই সমগ্র এলাকার আয়তন ছিল ১,৮৯,০০০ বর্গমাইল। 

বিহার ও উড়িষ্যা সমন্বয়ে গঠিত বাংলা ব্রিটিশ ভারতের একটি একক প্রদেশ হিসেবে বেশ বড় আকার ধারণ করেছিল। তৎকালীন বাংলা, বিহার, উডিষ্যা, আসাম ও আরো কিছু অঞ্চল নিয়ে গঠিত প্রশাসনিক এলাকার নাম দেওয়া হয় বাংলা প্রেসিডেন্সি। এর আয়তন বিশাল হওয়াই পুরো বাংলা প্রেসিডেন্সিতে একসাথে শাসন কার্য চালিয়ে নেওয়া ব্রিটিশদের পক্ষে প্রায় অসম্ভব ছিল। 

১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে উড়িষ্যায় দুর্ভিক্ষ দেখা দিলে চরম প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ফলে 'বাংলা প্রেসিডেন্সি' থেকে আসামকে পৃথক করে একটি পৃথক প্রেসিডেন্সি তৈরি করা হয়। এই সময় শ্রীহট্ট (সিলেট) , কাছাড় ও গোয়ালপাড়া ইত্যাদি বাংলা ভাষাভাষী অঞ্চলকে আসামের সাথে যুক্ত করা হয়েছিল। এটাই ছিল প্রথম বঙ্গভঙ্গ। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই ভাগ কার্যকর।

১৮৯৯ সালে লর্ড কার্জনকে ভারতের বড়লাট নিয়োগ দেওয়া হয়। সে সময়  বাংলায় জাতীয়তাবাদ বৃদ্ধি পেলে লর্ড কার্জন এই জাতীয়তাবাদকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে বাংলা প্রেসিডেন্সীকে ভেঙ্গে বাংলাকে দুর্বল করার চেষ্টা করে। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে ১৯০১ সালে বাংলা প্রেসিডেন্সি থেকে উড়িষ্যাকে পৃথক করার প্রস্তাব করা হয়।

লর্ড কার্জনের একনিষ্ট সমর্থক ও উপদেষ্টা এ্যাণ্ডুজ ফ্রেজারকে বাংলার লেফটেনান্ট পদে নিয়োগ দেওয়া হয়। ক্ষমতা গ্রহণের পরে ফ্রেজার বড় লাট কার্জনের কাছে বঙ্গবিভাগের পরিকল্পনা পেশ করে। ১৯০৩ বঙ্গাব্দের ৩ ডিসেম্বর তারিখে লর্ড কার্জন এই পরিকল্পনা প্রায় অক্ষুণ্ণ রেখে সরকারিভাবে উত্থাপন করেন এবং তা  'ক্যালকাটা গেজেট'-এ প্রকাশিত হয়। 

অবশেষে ১৯০৫ সালে ৫ জুলাই সরকারিভাবে বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।খবরটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল প্রথম কোলকাতা প্রেস- থেকে। আর ৭ই জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়। এই ঘোষণাটির ৭ম অনুচ্ছেদটির বৈদ্যুতিন অনুলিপি তুলে ধরা হলো- আর.সি.মজুমদারেরর স্ট্রাগল ফর ফ্রিডম পুস্তকের পৃষ্ঠা-২০।

ইংরেজি ভাষায় লিখিত এই অনুচ্ছদের বঙ্গানুবাদ

আসামের বর্তমান প্রধান কমিশনারকে প্রতিনিধি গভর্নর করে বাংলার চট্টগ্রাম, ঢাকা এবং রাজশাহী বিভাগ, মালদহ জেলা এবং পার্বত্য ত্রিপুরা রাজ্য নিয়ে নতুন একটি রাজ্য গঠিত হবে। দার্জিলিং বাংলার সাথে থাকবে। উভয় অঞ্চলের গুরুত্ব বিবেচনা করে সমন্বয়ের জন্য রাজ্যের নাম হবে পূর্ববঙ্গ ও আসাম। এর রাজধানী হবে ঢাকা আর অধীনস্থ কিছু হেডকোয়ার্টার হবে চট্টগ্রামে।১,০৬,৫৫০ বর্গমাইলের ও ৩ কোটি ১০ লাখ জনগোষ্ঠীর এই অঞ্চলে, ১ কোটি ৮০ লাখ মুসলিম এবং ১ কোটি ২০ লাখ হিন্দু বসবাস করে। এর অধীনে একটি আইন সভা থাকবে। রাজস্ব বোর্ডের দুই সদস্য এবং কোলকাতা হাইকোর্টের কর্তৃত্ব অবিঘ্নিত থাকবে।বিদ্যমান বাংলা প্রদেশ পূর্ব দিকের এই বিশাল অঞ্চল এবং ছোট নাগপুরের পাঁচটি হিন্দু রাজ্য ছেড়ে দেয়ায় আয়তনে ছোট হলেও সম্বলপুর ও উরিষ্যার পাঁচটি পূর্ববর্ণিত রাজ্যের অধিগ্রহণ করবে। ৫ কোটি ৪০ লাখ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৪ কোটি ২০ লাখ হিন্দু এবং ৯০ লাখ মুসলিম অধ্যুষিত এর মোট আয়তন হবে ১,৪১,৫৮০ বর্গ মাইল।সংক্ষেপে বাংলা ও আসামের বর্তমান অঞ্চলসমূহ দুটো অখণ্ড এবং সার্বভৌম প্রদেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে। প্রতিটির মধ্যেই ব্যাপক সমরূপী অঞ্চল রয়েছে, যারা সুনির্দিষ্ট সীমানা দ্বারা পৃথককৃত, সম্পদে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং উন্নত প্রশাসনিক ব্যবস্থায় সজ্জিত।”পাদটীকা: পুনর্বিবেচিত এই বিভাজনের পরিকল্পনা ১৯শে জুলাই সরকারী ঘোষণা হিসেবে জনসমক্ষে আসে, ২০শে জুলাই কোলকাতা প্রেস থেকে তা প্রকাশিত হয়।

অতঃপর ১৯০৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর বঙ্গভঙ্গ সম্পন্ন হয়। দু'টি ভাগে ভাগ হয়ঃ

১.বাংলা প্রদেশঃ বাংলা,বিহার,ও উড়িষ্যা নিয়ে গঠিত হয়েছিল বাংলা প্রদেশ । কলকাতা ছিল এর রাজধানী ।
২.পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশঃ ঢাকা,রাজশাহী,চট্টগ্রাম ও আসামকে নিয়ে পূর্ববঙ্গ ও আসাম নামে একটি নতুন প্রদেশ এবং এর রাজধানী হয় ঢাকা । নতুন প্রদেশের আয়তন ছিল ১,০৬,৫০৪ বর্গ মাইল । এর লোকসংখ্যা ছিল ৩ কোটি ১০ লক্ষ । জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিল মুসলমান ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ইংরেজ সরকার কয়েকটি কারণের ওপর ভিত্তি করে সর্বশেষ ১৯০৫ সালের ১৬ অক্টোবর বঙ্গভঙ্গ কার্যকর হয়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার কবিত্বপূর্ণ ভাষায় এ দিনটিকে উভয় বঙ্গের মিলনের চিহ্ন স্বরূপ রাখি বন্ধনের প্রস্তাব করে লিখলেন,

আগামী ৩০ আশ্বিন বাংলাদেশ আইন দ্বারা বিভাজ্য হবে। কিন্তু ঈশ্বর যে বাঙালিকে বিচ্ছিন্ন করেননি তাই বিশেষ রূপ স্মরণ ও প্রচার করার জন্য সেই দিবসটিকে আমরা বাঙালির রাখি বন্ধনের দিন করিয়া পরস্পরের হাতে হরিদ্রা বর্ণের সূত্র বাঁধিয়া দেব। রাখি বন্ধনের মন্ত্রটি এই, ‘ভাই ভাই এক ঠাঁই’।

বঙ্গভঙ্গের প্রেক্ষাপট বা কারন

ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্থাব করেন। বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাবনার পেছনে সরকারি ব্যাখ্যা যথেষ্ট যৌক্তিকভাবে দেওয়া হয়েছিল।

বাংলা হচ্ছে একটি বিশাল প্রদেশ। পূর্ব ও পশ্চিম বাংলা ছাড়াও বিহার এবং উড়িষ্যা ছিল বাংলার অন্তর্গত। তাই কলকাতা কেন্দ্রে বসে গভর্নর জেনারেলের পক্ষে পুরো বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ছিল কষ্টকর। বাংলার লেফটেন্যান্ট গভর্নরকে ১৮৯,০০০ বর্গ মাইল এলাকা শাসন করতে হতো এবং ১৯০৩ সাল নাগাদ প্রদেশটির জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়ে ৭ কোটি ৮৫ লক্ষে দাঁড়ায়। এর ফলস্বরূপ পূর্ব বাংলার অনেকগুলি জেলা কার্যত বিচ্ছিন্ন এবং অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে অবহেলিত ছিল। ফলে এত বড় এলাকায় শাসন ব্যবস্থা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

এই কারণেই পূর্ব বাংলা ও আসাম অবহেলিত থেকে গিয়েছিল। কার্জন ভেবেছিলেন বাংলায় সুশাসন প্রতিষ্ঠিত করতে হলে বাংলা প্রদেশকে দুটো অংশে ভাগ করে শাসন করতে হবে। ফলে তাদের কাছে উন্নয়নের বাতাস পৌঁছাবে।

লর্ড কার্জন বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব প্রস্তুত করেন ১৯০৪ সালে। এরপর তিনি পূর্ববঙ্গে প্রস্তাবের সমর্থনে জনমত তৈরির জন্য সফরে বের হন। ঢাকাসহ কয়েকটি জেলা ভ্রমণ করেন তিনি। পূর্ববঙ্গের মানুষ বুঝতে পারে এবার এ অঞ্চলের উন্নয়ন হবে। কার্জন ঢাকায় এসে উন্নয়নের সূচক হিসেবে ১৯০৪ সালে ঢাকায় একটি টাউন হল নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

লর্ড কার্জন

লর্ড কার্জন ছবিঃ বাংলা ইনফো

১৮৮৫ সালে 'ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস' নামক একটি রাজনৈতিক দলের জন্ম হয়। ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতীয় জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধি পায়।  এ আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল ছিল কলকাতা শহর। ফলে, জাতীয়তাবাদ আন্দোলনকে দুর্বল করে কলকাতার গুরুত্ব হ্রাস করে বঙ্গভঙ্গ কার্যকর করলে ষড়যন্ত্রকারীরা সে সুযোগ আর পাবে না। তারা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে। এ কারনে ব্রিটিশ সরকার 'ভাগ কর ও শাসন কর' নীতি অবলম্বন করে।

বঙ্গভঙ্গের পূর্বে ব্রিটিশ সরকারের যতো উন্নয়ন সব হতো যেমন, শিল্প, ব্যবসায়-বাণিজ্যি, অফিস-আদালত, কলকারখানা, স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি প্রায় সব কিছুই কলকাতার কেন্দ্রিভূত ছিল। যেহেতু এ অঞ্চলের বেশিরভাগ মানুষ মুসলিম তাই মুসলিমরা হিন্দুদের তুলনায় সুযোগ সুবিধা কম পেত। তাই তুলনামূলকভাবে পূর্ব বংলার জনগণ অবহেলিত হতো।  ফলে পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা সব দিকেই পিছিয়ে পড়েছিল। অধিকাংশ মুসলমানরা তখন ভাবতে শুরু করে যে, বঙ্গভঙ্গ হলে তারা অর্থনৈতিক  উন্নয়নের সুযোগ পাবে। এ জন্য পূর্ববঙ্গের মুসলমান জনগণ বঙ্গভঙ্গের প্রতি সমর্থন জানায়।

ব্রিটিশ শাসনামলে উপমহাদেশের মুসলমিল সম্প্রদায় নির্মমভাবে শোষিত ও বঞ্চিত হতে থাকে। ব্রিটিশ সরকার হিন্দুদের প্রতি উদারনীতি এবং মুসলমানদের প্রতি বৈরী নীতি অনুসরণ করতে থাকায় মুসলমানরা সামাজিক প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন একটি  হতদরিদ্র পরিণত হয়। ফলে, তৎকালীন সময়ে হিন্দুরাই সবচেয়ে বেশি সরকারি চাকরির সুবিধা পেত। এক্ষেত্রে মুসলিমরা ছিল পিছিয়ে।

স্যার সলিমুল্লাহ  জনগণকে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, নতুন প্রদেশ সৃষ্টি হলে পূর্ববাংলার মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নের যথাযথ সুযোগ পাবে। ফলে, হিন্দু সম্প্রদায় প্রভাবিত কলকাতার উপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক নিভর্রশীলতা হ্রাস পাবে। মুসলিমরা যাতে সমানভাবে সরকারি চাকরি করতে পারে এ জন্য বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আর বঙ্গভঙ্গের ফলে মুসলিমরাই সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়। 

নবাব সলিমুল্লাহ ছবিঃ পরিবর্তন

অবিভক্ত বাংলার পূর্ব অংশে মুসলমানরা ছিল সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং পশ্চিম অংশে হিন্দুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ। ফলে ধর্মীয়ভাবেও দুইভাগ করে ফেলার একটা চিন্তা করা হয়। 

বাংলা ছিল সোনালী আঁশ পাটের ভান্ডার । ফলে প্রচুর পাট উৎপাদন হত। উৎপাদন হলে কি হবে ছিল না পাটকল। পাটকল ছিল কলকাতা আর হুগলিতে । এ কারনে পাট টেনে নিতে হত সেখানে । ফলে পূর্ব বাংলার কৃষকরা পাটের ন্যায্য দাম পেত। ফলে পূর্ব বাংলার জনগণ পাটের ন্যায্য দাম নিশ্চিত পেতে বঙ্গভঙ্গের পক্ষে মত দেয়। 

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল

বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ব্রিটিশরা যে কারনে বঙ্গভঙ্গ করে তা পুরুপুরি বাস্তবায়িত করা যায় নি। কারন এতে বাঁধ সাধে তৎকালীন হিন্দু শ্রেণি বা হিন্দু নেত্রীবর্গ। আন্দোলনের শুরুতেই হিন্দু নেতৃস্থানীয় লোকজন বাংলা পত্রপত্রিকা, ভারত ও ইংল্যান্ডের ইংরেজি পত্রিকাগুলো প্রতিবাদ করে। 

এ সময় নবাব সলিমুল্লাহ ইংরেজদের পক্ষ নিলেও সমগ্র বাংলা মুসলিমরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে আসে নি।  হিন্দু মুসলিমদের মধ্যে আলাদা প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। 

হিন্দুদের প্রতিক্রিয়া

বঙ্গভঙ্গের বিরুদ্ধে হিন্দুদের অবস্থান ছিল খুবই কঠিন। বঙ্গভঙ্গকে হিন্দুরা স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেনি। বাংলার উচ্চ ও মধ্যবিত্ত হিন্দুরাই এর  বিরুদ্ধে প্রচন্ড ঝড় তুলেছিল। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মধ্যে ১৯০৫ সালের ১৭ আগস্ট কলকাতার কাশিম বাজারে মহারাজ শ্রী মনীন্দ্র চন্দ্র শীলের সভাপতিত্বে এক বিরাট সভা অনুষ্ঠিত হয়। তিনি বলেন,

নতুন প্রদেশে মুসলমানদের প্রধান্য স্থাপিত হলো বাঙালি হিন্দুরা সংখ্যা লঘিষ্ঠে পরিণত হবে। আমাদের জাতির ভাগ্যে ভবিষ্যতে যে কী হবে, তা চিন্তা করলে আমি আতঙ্কিত হয়ে পড়ি।

সভায় তারা প্রচার করেন যে, বঙ্গভঙ্গ 'বঙ্গমাতার অঙ্গচ্ছেদের সমতুল্য।' বঙ্গভঙ্গ দিবসে কলকাতার টাউন হলে বর্ণ হিন্দুদের এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে লাল মোহন ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী প্রমুখ প্রভাবশালী হিন্দু নেতৃবৃন্দ যোগ দিয়ে ঘোষণা দেন যে, বঙ্গভঙ্গ রোধের জন্য তারা তাদের শেষ রক্ত বিন্দু উৎসর্গ করবে !

হেমেন্দ্রমোহনের তোলা বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের একটি জনসভার ছবি সূত্রঃ আনন্দবাজার

একই সাথে হিন্দু লেখক, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক নেতাবৃন্ধ বঙ্গভঙ্গকে বাঙালি জাতির বিকাশমান ধারাকে  শেষ করার ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করতে থাকে। 

এরপর বাংলার ঐক্য ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক হিসেবে ২২ সেপ্টেম্বর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নেতৃত্বে রাখিবন্ধন কর্মসূচি পালন করেন। এ সময় রবি ঠাকুর বঙ্গভঙ্গ রদ করার  প্রস্তাবকদের জন্যে মর্মস্পর্শী গান আমার সোনার বাংলা লিখে। যা পরে ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে গ্রহণ করা হয়। কুষ্টিয়ার বাউল গগন হরকরার “আমি কোথায় পাব তারে” গানের সুরেই রবীন্দ্রনাথ “আমার সোনার বাংলা” গানটির সুর করেন।

ব্রিটিশ সরকারের এই বিভেদ ও শাসন নীতির বিরুদ্ধে তারা গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। বঙ্গভঙ্গের জন্য তৎকালীন হিন্দু পন্ডিত দ্বিজেন্দ্রনাথ রায়, রজনীকান্ত সেন এবং সর্বোপরি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেশে যে স্বদেশ প্রেমের বন্যা বইতে লাগল এবং জনসাধরণের মধ্যে যে উন্মাদনা সৃষ্টি হলো ভারত বর্ষের ইতিহাসে এর পূর্বে বা পরে সেরূপ কখনো হয়নি।

১৯০৫ সালের ১৭ জুলাই ইংরেজদের বিরুদ্ধে বয়কটের ডাক দেন সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী। ব্রিটিশ পণ্য বয়কট প্রস্তাব গৃহীত হয়, শুরু হয় স্বদেশী আন্দোলনের। তাদের স্বদেশী আন্দোলন প্রথম দিকে বয়কট দিয়ে শুরু হলেও এক সময় তা সন্ত্রাসী কার্যকলাপে পরিণত হয়। 

ফলে ব্রিটিশ পণ্য বর্জনের জন্য স্বদেশী আন্দোলন ও সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপ উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯০৫ সালের জুলাই মাসের ভিতরে এই আন্দোলনে স্থানীয় জমিদার এবং সাধারণ প্রজাদের সাথে চরমপন্থী দলগুলোও শরিক হয়ে উঠে। ক্রমান্বয়ে এই আন্দোলন ব্রিটিশ-বিরোধী জাতীয়তাবাদী অন্দোলনে রূপ লাভ করে। এই সময় ভারতের অন্যান্য প্রদেশে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে ব্রিটিশ বিভেদ নীতি দিয়ে মুসলমানদেরকে এই আন্দোলন থেকে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করে, ব্রিটিশরা ব্যর্থ হয়।  

সহিংস আন্দোলনের কথা আসলে নাম চলে আসে ক্ষুদিরামের।  তিনি ইংল্যান্ডে উৎপাদিত কাপড় জ্বালিয়ে দিতে লাগলেন, কারণ ওগুলো তো বিদেশের তৈরি। তখন সবাই চাইছিল দেশের তৈরি পণ্য ব্যবহার করতে। আবার কখনও ইংল্যান্ড থেকে আমদানীকৃত লবণবোঝাই নৌকা ডুবিয়ে দিতে লাগলেন- এমনই সব কাজ ! এসব কর্মকাণ্ডে সমবয়সীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেপরোয়া। 

একবার মেদিনীপুর মারাঠা কেল্লার প্রবেশদ্বারে দাঁড়িয়ে ক্ষুদিরাম বিপ্লবীদের প্রকাশিত নিষিদ্ধ পুস্তিকা বিতরণ করছিলেন। এক হাবিলদার এসে ধরেল মুখে ঘুষি মেরে পালিয়ে যান। কিশোর ক্ষুদিরামের কথা ভারতবাসীর মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ল। যদিও বয়স কম হওয়ায় সেবার তার শাস্তি কম হয়েছিল।  এর পর ক্ষুদিরাম আরো বেপোরোয়া হয়ে পড়ে। 

ক্ষুদিরাম

আটকের পরে ক্ষুদিরাম ছবিঃ ইন্ডিয়ান টাইমস

১৯০৭ সালে দেশ জুড়ে যখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে একদিন ১৩ বছরের এক কিশোর বিপ্লবী সুশীল সেন পুলিশ সার্জেন্টকে ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দেয়। সুশীলের বিরুদ্ধে মামলা হয়। এই মামলার বিচারক ছিলেন কিংসফোর্ড। বিচারে সুশীলকে ১৫ বেত্রাঘাতের হুকুম দেন তিনি। খবরটি দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। তাছাড়া আগে থেকেই কিংসফোর্ডের বিরুদ্ধে বিপ্লবীদের ক্ষোভ ছিল। সুতরাং বিপ্লবীরা এর প্রতিশোধ নিতে চাইলেন। ক্ষুদিরাম বসু এবং প্রফুল্ল চাকীকে এ দায়িত্ব দেয়া হলো।

প্রতিদিন ক্লাব থেকে সন্ধ্যার পর সাদা গাড়িতে করে নিয়মিত বাড়ি ফেরেন কিংসফোর্ড। এটা ক্ষুদিরাম জানতেন। প্রতিশোধের পরিকল্পনা সেভাবেই করা হলো। ১৯০৮ সালের ৩০ এপ্রিল সন্ধ্যায় ক্লাব থেকে কিংসফোর্ডের গাড়ি বের হতেই গাড়ি লক্ষ্য করে বোমা ছুড়লেন দুই বিপ্লবী। কিন্তু ওটা কিংসফোর্ডের গাড়ি ছিল না। হুবহু দেখতে ওই গাড়িতে ছিলেন অ্যাডভোকেট কেনেডির স্ত্রী এবং তার মেয়ে।  দুজনই নিহত হলেন। মুহূর্তেই চারদিকে শোরগোল পড়ে গেল। যাই হোক, ক্ষুদিরাম পুলিশের হাতে ধরা পড়লেন।সহিংস আন্দোলনের ফলে সন্ত্রাসী কর্মকান্ড বাড়তে থাকে এবং হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা প্রকট আকার ধারণ করে।

একদিকে কলকাতার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা বিরোধীতা করলেও অন্যদিকে, পূর্ব বাংলার হিন্দুরা, বিশেষ করে নিম্নবর্ণের হিন্দুরা বঙ্গভঙ্গকে স্বাগতমই  জানায়। কারন, কৃষিকাজ করা পূর্ব বাংলার হিন্দু সমাজের আয় বেড়ে যাওয়া ছিল এর মূল কারণ। বঙ্গভঙ্গের আগে পূর্ব বাংলার আয়ের বড় অংশই পশ্চিমের জমিদাররা নিয়ে যেত। ফলে কৃষকরা তাদের ন্যায্য পাওনা পেতো না। কিন্তু বঙ্গভঙ্গের পর সেই অবস্থা পাল্টে যায়। 

কংগ্রেসসহ উগ্র হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিবীদদের বিভিন্ন কর্মকান্ড ও সহিংস আন্দোলন বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন ধর্মীয় ছোঁয়া পায়। সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী বাংলা ভাগকে হিন্দুদের অপমান আর মুসলমানদের প্রতি পক্ষপাতমূলক আচরণ বলে দাবী করে পুরো ব্যাপারটিকে একটি ধর্মীয় রঙ দেবার চেষ্টা করেন। অথচ বাস্তবে বঙ্গভঙ্গের ফলে পূর্ব বাংলার হিন্দুদের উন্নতিই হয়েছিল !

মহাত্মা গান্ধী

মুসলিমদের প্রতিক্রিয়া

মুসলিমরা প্রথম দিকে বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতা করলেও পরবর্তীতে বঙ্গভঙ্গের পক্ষেই অবস্থান নেয়। নবাব সলিমুল্লাহ এ ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বঙ্গভঙ্গের পরই মুসলমানদের রাজনৈতিক অধিকার আদায়ে ১৯০৬ সালে গঠিত হয় মুসলীম লীগ। পূর্ব বাংলা প্রদেশ গঠনের সিদ্ধান্ত ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলমানরাও স্বাগত জানায় । মোহামেডান লিটারারি সোসাইটি, মুসলিম সাহিত্য সমিতি, মোহামেডান প্রভিন্সিয়াল ইউনিয়নসহ বিভিন্ন মুসলিম সংগঠনগুলো বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায়।

তবে মুসলমানরা সবাই যে পক্ষে ছিলেন তা-ও নয়। শিক্ষিত মুসলিমদের একটি অংশ বঙ্গভঙ্গের বিরোধীতাও করেছিলেন। তবে এদের বেশিরভাগই ছিলেন কলকাতায় বাস করা জমিদার কিংবা কংগ্রেসপন্থী রাজনীতিবীদ। যেসব নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তারা হলেন আবদুর রসুল, আবদুল হালিম গজনভী, মাওলানা খররোখ আহমদ নেজামপুরী, আবুল কাসেম, লিয়াকত হোসেন প্রমুখ।

ভারতীয় মুসলমান সমিতি বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু পশ্চিমের মুসলমানদের কেউই পূর্বের নবাব সলিমুল্লাহর মতো জনগণকে প্রভাবিত করতে পারেননি। ফলে বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলনে মুসলমানদের ভূমিকা ছিল খুবই কম।

মোহামেডান এসোসিয়েশনের সভাপতি খান বাহাদুর মোহাম্মদ ইউসুফ বঙ্গভঙ্গ বিরোধী সভায় সভাপতিত্ব করেছিলেন।
কিন্তু মুসলমানদের চাপে তাঁকে ঘোষণা করতে হয়েছিল যে, তিনি ব্যক্তিগতভাবে এই সভায় যোগদান করেছেন। সমিতির সভাপতি হিসেবে নয়। 

বঙ্গভঙ্গ প্রসঙ্গে মুসলমানদের ভেতর তিন ধরনের মনোভাব কাজ করেছে। প্রথম: মুসলমানদের ভেতর অনেকে বঙ্গভঙ্গ বিরোধী আন্দোলনে যোগদান করেছিলেন।

যে নবাব পরিবার বঙ্গভঙ্গের অন্যতম সমর্থক ছিলেন, তারই একজন সদস্য, খাজা আতিকুল্লাহ কংগ্রেস অধিবেশনে বঙ্গবঙ্গের বিরুদ্ধে মতামত প্রদান করেন। ড. সুফিয়া আহমদ, খাজা নাজিমুদ্দিন ও খাজা শাহাবুদ্দিনের বরাত দিয়ে বলেছেন, যে খাজা আতিকুল্লাহ নাকি খাজা সলিমুল্লাহর সঙ্গে ব্যক্তিগত আক্রোশের বশবর্তী হয়ে বঙ্গভঙ্গের বিরোধিতা করেছিলেন। পরে বঙ্গভঙ্গ রদ করার প্রতিবাদে অনুষ্ঠিত সভায়ও তিনি উপস্থিত ছিলেন।

তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া, রোর বাংলা, দৈনিক সংগ্রাম, অনুশিলন , আরো নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক