ফেসবুকে প্রবেশ বন্ধ, ঢুকতে পারছি না- বিকল্প উপায়ে ফেসবুক চালানোর উপায়

২০১৫ সালের নভেম্বরে দেশের আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার আশংখায় ও জাতীয় নিরাপত্তার দোহায় দিয়ে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেসবুক, ভাইবার সহ বেশ কিছু ওয়েবসাইট ও অ্যাপস এর কার্যক্রম সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল।

এর আগে ২০ দলীয় জোটের হরতাল-অবরোধের সময়ও ‘ভাইবার’ ও ‘হোয়াটসঅ্যাপ’সহ ইন্টারনেটে যোগাযোগের কয়েকটি মাল্টিমিডিয়া অ্যাপ কয়েক দিনের জন্য বন্ধ রাখা হয়। জানুয়ারিতে বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলার সময় ‘নিরাপত্তার’ কারণ দেখিয়ে ভাইবার, ট্যাংগো, হোয়াটসঅ্যাপ, মাইপিপল ও লাইন নামের পাঁচটি ভয়েজ  কল করা যায় এমন অ্যাপসের সেবা সরকার বন্ধ করে দিয়েছিল । তখন বলা হয়েছিল, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য এসব অ্যাপস ব্যবহার করতেন।

নভেম্বরে ফেসবুক, ম্যাসেঞ্জার, ভাইবার ও হোয়াটসঅ্যাপ বন্ধ করার নির্দেশনা দেয় বিটিআরসি। পরে আরেকটি নির্দেশনায় লাইন, ট্যাংগো, হ্যাং আউটসহ আরও কয়েকটি মাধ্যম বন্ধের কথা জানানো হয়। তখন পুলিশ বলেছিল, নাশকতাকারীরা মোবাইল ফোনে কথা না বলে ইন্টারনেটভিত্তিক এসব অ্যাপ ব্যবহার করায়  অপরাধীদের ধরতে সমস্যা হচ্ছে। তখন ফেসবুক বন্ধ করতে গিয়ে পুরা ইন্টারনেট ব্যবস্থার লেজে গোবরে অবস্থা করেছিল বিটিআরসির টেকনিশিয়ানরা।

লিখিত নির্দেশনায় সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলো বন্ধের কথা বলা হলেও মৌখিকভাবে ইন্টারনেট বন্ধের নির্দেশনা দেয়া হয়। সে অনুযায়ী আইআইজিগুলো বেলা দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত এক ঘণ্টা ইন্টারনেট সেবা বন্ধ রাখে। পরে বিটিআরসি থেকে ইন্টারনেট সেবা চালু করার কথা জানিয়ে দেয়ার পর সেটা চালু করা হয়।

আশ্বর্য্যের বিষয় হল এর আগে বাংলাদেশের ইতিহাসে ইন্টারনেট সংযোগ চালু হবার পরে  কখনো বন্ধ করা হয় নি। এমনকি সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৭ সালে কারফিউয়ের সময়ও মোবাইল ফোন সেবা সাময়িক বন্ধ থাকলেও ইন্টারনেট চালু ছিল। যদিও একবার বিটিআরসি ইন্টারনেটের আপলোড গতি কমানোর নির্দেশনা দিয়েছিল কিন্ত ইন্টারনেট তখনও পুরোপুরি বন্ধ করা হয় নি।

সারা দেশে দেড় ঘণ্টা ইন্টারনেট বন্ধ থাকায় টিকিট বিক্রিতে বিপাকে পড়েছিল বিভিন্ন শ্রেণির গণমাধ্যম ও দেশের বিমান সংস্থাগুলো।এছাড়া ইন্টারেটি ভিত্তিক সেবা দানকারী সংস্থাগুলো চরম বিপাকে পড়েছিল।

এর পূর্বে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার সীমিত বা বন্ধ করার বিষয়ে চলতি মাসের শুরুর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন । নেদারল্যান্ডস থেকে ফিরে ২০১৫ সালের ৮ নবেম্বর সাংবাদিক সম্মেলনে জঙ্গি অর্থায়নে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ধরতে জটিলতার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন,

‘বাংলাদেশ ডিজিটাল করেছি। এর শুভ ফলও যেমন আছে, খারাপ ফলও আছে। আমরা থ্রি-জি ও ফোর-জিতে চলে গেছি। এ কারণে জঙ্গিরা ইন্টারনেট, ভাইবার থেকে শুরু করে নানা ধরনের অ্যাপস ব্যবহার করে জঙ্গি কার্যক্রম চালাচ্ছে। সে জন্য আমাদের চিন্তাভাবনা আছে, যদি খুব বেশি ব্যবহার করে হয়তো একটা সময়ের জন্য বা কিছুদিনের জন্য বন্ধ করে দেব। এই লিংকগুলো (জঙ্গি অর্থায়নের সূত্র) যাতে ধরা যায়।’

অনেকেই প্রফেশনালি ফেসবুক ব্যবহার করেন পেটের খোরাক তথা জীবিকা জোগানোর জন্য।ফেসবুকের উপরই হয়ত তাদের মূল জীবিকা নির্ভর করে। আবার আমাদের অনেকেই নানা প্রফেশনে জড়িত থাকার কারনে ফেসবুক ব্যবহার করে যোগাযোগ রক্ষা করতে হয়। এ অবস্থায় যদি  বাংলাদেশ সরকার বিটিআরসি’র মাধ্যমে ফেসবুকে প্রবেশ বন্ধ করে রাখে সেটি আমাদের মত প্রফেশনালদের মাথায় সাপে ভর হওয়ার মত অবস্থা হয়ে যায়।প্রয়োজনীয় যোগাযোগ করতে না পারার দরুন নানা কাজ আটকে থাকে।

ফেসবুকে প্রবেশ বন্ধ, ঢুকতে পারছেন না ?  তখন কি করা যায় ? অবশ্যই বিকল্প চিন্তা করতে হবে ফেসবুকে প্রবেশের জন্যে। তবে এ ক্ষেত্রে সবাই প্রবেশ করতে না পারলেও একটা সীমিতি অংশ ফেসবুক ঠিকই চালিয়ে গিয়েছেন।  ২০১৫ সালে ফেসবুকে  প্রবেশ করা যখন বাংলাদেশ থেকে বন্ধ করে দেওয়া হয় তখনও মানুষ বিকল্প উপায়ে ফেসবুকে প্রবেশ করেছিল। এ ক্ষেত্রে ব্যবহারকারীরা ভিপিএন (VPN) এর মাধ্যমে টানলে সৃষ্টি করে ফেসবুকে প্রবেশ করে। কিভাবে প্রবেশ করে সেটি জানার পূর্বে সংক্ষেপে জেনে নেই ভিপিএন কি

ভিপিএন প্রসেস

ভিপিএন এর পূর্ণ রুপ হল, ‘ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক’ ।  যখন একটি পাবলিক নেটওয়ার্কের মাধ্যমে একাধিক কম্পিউটারকে (বা আলাদা নেটওয়ার্ক) একই নেটওয়ার্কের আওতায় আনা হয়, তখন তাদের ভিপিএন বলে। নিরাপদ যোগাযোগ এবং ডাটা অ্যানক্রিপ্ট করার একটি পদ্ধতি হিসেবে ভিপিএন’কে কাজে লাগানো হয়।  মানে হল ভিপিএন আপনার ব্যবহৃত ডিভাইজকে একটি ভার্চুয়াল নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযুক্ত করে এবং আপনার পাঠানো সব ডাটা দ্রুততার সঙ্গে এনক্রিপ্ট করে ফেলে অর্থাৎ পাবলিক ডোমেইন থেকে লুকিয়ে ফেলে।ভিপিএন ব্যবহার করে ইন্টারনেট ব্যবহার করলে ব্রাউজিং হিস্টোরির কোনো ট্র্যাক রাখে না। ফলে আপনি অনলাইনে  মোটামোটি নিরাপদ থাকবেন। যদিও বেশির ভাগ ভাল ভিপিএন সার্ভিসের জন্য টাকা গুনতে হয়। তবে কিছু ফ্রি সার্ভিসও আছে । ভিপিএন ব্যবহারের ফলে আপনি কিছু সুবিধা পাবেন ।

ভিপিএন ব্যবহার করার মাধ্যমে আপনি ডাটা নিরাপদে আদান প্রদান করতে পারছেন, ভিপিএন ব্যবহার করলে আপনার অবস্থান কেউ সহজে ট্র্যাক করতে পারবে না কারন ভিপিএন আপনার আইপি এড্রেস লুকিয়ে রাখে, আইএসপি তে ব্লক রাখা সাইটগুলো ভিজিট করতে পারবেন। যেমন , ফেসবুক বা ইউটিউব যদি সরকার বন্ধ করে দেয় আপনি চাইলে ভিপিএন অন করে এসব সাইট ব্যবহার করতে পারবেন। তবে, কিছু অসুবিধাও রয়েছে যেমন,  যদিও বেশির ভাগ ভাল ভিপিএন সার্ভিসের জন্য আপনাকে টাকা গুনতে হবে । তবে কিছু ফ্রি সার্ভিসও আছে। ভিপিএন ব্যবহার করে টরেন্ট ফাইল ডাউনলোড করতে সমস্যা হয়।

যাই হোক চলু দেখে কিভাবে ভিপিএন ব্যবহার করে হবে।

তাদের মধ্যে যারা জানেন না নিষিদ্ধ থাকা সত্বেও কিভাবে বিকল্প পদ্বতিতে ফেসবুক ব্যবহার করতে হয় তাদের জন্য শেয়ার করছি কিভাবে আপনি ব্রাউজারের ও অ্যাপসের মাধ্যমে ফেসবুক ব্যবহার করবেন।

ফেসবুক বন্ধ থাকলেও অ্যান্ড্রয়েড ফোনে কিভাবে ব্যবহার করবেন

মোবাইল থেকে OperaMini বা UC ব্রাউজার দিয়ে সরাসরি ফেসবুক ব্যবহার করতে পারবেন। অথবা নীচের পদ্ধতিও অবলম্বন করতে পারেন।

এই এপসটি আমি ২০১৫ সালেও ব্যবহার করেছি। আর্টিকেলটি লিখার সময় আবার ইনস্টল করে ব্যবহার করে নিশ্চিত হয়েই এই এপ্লিকেশনটি রিকমেন্ড করছি। বেশি কয়েকটি ফ্রি এপস ব্যবহার করেছিলাম এর মধ্যে সুপার ভিপিএন SuperVPN নামের এপসটি আমার পছন্দের তালিকায় সবচেয়ে উপরে। অন্যান্য এপস থেকে এই এপসটি ইউজার ফ্রেন্ডলি এবং খুব ভাল সার্ভিস দেয়। এটি আপনাকে ৬০ দিনের ট্রায়াল ব্যবহারের সুযোগ দেয়।

প্লে স্টোর থেকে সুপার ভিপিএন ইনস্টল করে ওপেন করুন। কানেক্ট অপশনে ক্লিক করুন। যেহেতু আমরা ফ্রি এপস ব্যবহার করছি তাই বিজ্ঞাপন আসতে পারে বিজ্ঞাপন কেটে কানেক্ট করি।

ভিপিএন

সুপার ভিপিএন ব্যবহার

সুপার ভিপিএন এবার আপনাকে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্কের সাথে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবে। যখন সে প্রাইভেট নেটওয়ার্কের সাথে যুক্ত হবে তখন উপরে দেখুন চাবির মত একটি চিহ্ন এসেছে।

এবার মানে হল আপনি এখন সিকিউর আপনার মেইন আইপি লুকিয়ে ফেলা হয়েছে।এখন বন্ধ হয়ে থাকা সাইটগুলো  ব্রাউজ করতে পারেন বা বন্ধ থাকা এপসগুলোতে প্রবেশ করতে পারবেন। ছাড়াও আপনি ProXPN, Hotspot Shield,
Cybershost, SecurityKiss, SpotFlux ইত্যাদি ফ্রি এপস ব্যবহার করে দেখতে পারবেন।আপনি চাইলে পিউর ভিপিএন বা হটস্পট শীল্ডের মত পেইড এপস ব্যবহার করে বিরক্তির কর এড ছাড়াই বন্ধ থাকা ফেসবুক চালাতে পারবেন।

পিসিতে বন্ধ সাইটগুলো ব্যবহার পদ্ধতি

এন্ড্রয়েড ফোনের অনুরুপ আপনি পিসিতেও ভিপিএন ইনস্টল দিয়ে দেশে বন্ধ থাকা সাইটগুলো ভিজিট করতে পারবেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এক সময় হটস্পট শীল্ড ব্যবহার করতাম। হটস্পট শীল্ডের ফ্রি এবং পেইড দুটি ভার্শনই আমি ব্যবহার করেছি। হটস্পট শীল্ড আমার ব্যবহার করা ভিপিএন সার্ভিসগুলোর মধ্যে সেরাদের একটা। অন্যদের তুলনায় সে তুলনামূলক কম স্পীড ডাউন করে না । হটস্পট শীল্ডের সাহায্যে যখন বন্ধ থাকা ফেসবুক ব্যবহার করতাম তখন প্রায় স্বাভাবিকভাবেই সাইট লোড হত।  হটস্পট শিল্ড ব্যবহারের সময় ডিসকানেক্টেড থাকার সময় লাল আইকন থাকবে, কানেক্টেড করার সময় হালকা হলুদ হবে। আর কানেক্ট হবার পরে সবুজ রংয়ের আইকন পাবেন।

যদিও এখন আমি প্রয়োজনে পিউর ভিপিএন ব্যবহার করি। আপনি চাইলে অন্যান্য ফ্রি বা পেইড ভিপিএন ব্যবহা করে বন্ধ ফেসবুক বিকল্প পদ্ধতিতে ব্যবহার করতে পারেন। আবার আপনি চাইলে কিছু ব্রাউজার এড অন আছে যেগুলো ব্যবহার করে বিকল্প পদ্ধতিতে ফেসবুক বা বন্ধ সাইট ভিজিট করতে পারেন।

নোট ঃ শুধুমাত্র শিক্ষনীয় উদ্দেশ্যে এই আর্টিকেলটি লিখা হয়েছে। ব্যবহার করতে হবে নিজ দায়িত্বে। অনৈতিক কাজে বা নিষিদ্ধ সাইট ব্রাউজ করলে কোন ভাবেই লেখককে দায়ী করা যাবে না।

 

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক