বাংলাদেশ নৌবাহিনীঃ জলজসীমা সুরক্ষার এক নির্ভীক প্রহরী

“শান্তিতে সংগ্রামে সমুদ্রে দুর্জয়”  এই মূলমন্ত্র ধারন করে বাংলাদেশ নৌবাহিনী বাংলাদেশের জলজসীমা প্রতিরক্ষায় নিয়োজিত। বাংলাদেশ নৌবাহিনী সশস্ত্রবাহিনীর নৌযুদ্ধ শাখায় নিয়োজিত। বাংলাদেশ নৌবাহিনী ১,১৮৮১৩ বর্গকিলোমিটার বা ৪৫৮৭৪ বর্গমাইল সমুদ্রসীমা ও এ এলাকায় অন্তর্ভুক্ত সকল বন্দর ও সামরিক স্থাপনার নিরাপত্তায় নিয়োজিত। দেশের তিন-চর্তুর্থাংশের সমান আয়তনের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং সমুদ্রসীমায় খনিজ সম্পদ ও মৎস্য আহরণসহ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল রাখা বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দায়িত্ব।

মুলতঃ বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দায়িত্ব দুটি ভাগে বিভক্ত, যুদ্ধকালীন দায়িত্ব ও শান্তিকালীন দায়িত্ব। যুদ্ধের সময় সমুদ্র এলাকায় শত্রু মোকাবেলার পাশাপাশি গ্যাস, তেল ও খনিজ সম্পদের মত সমুদ্র সম্পদ রক্ষা এবং সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সচল রাখা নৌবাহিনীর গুরুদায়িত্ব।

এছাড়া শান্তির সময় বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সদস্যরা লোকচক্ষুর অন্তরালে সাগরে চোরাচালান বিরোধী অভিযান, জলদস্যু বিরোধী অভিযান, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মৎস্যসম্পদ রক্ষাসহ পরিবেশ দুষণ নিয়ন্ত্রন অভিযানে পরিচালনা করে থাকে । বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় দেশের সমুদ্র তীরবর্তী এলাকা এবং দ্বীপাঞ্চলের মানুষের পাশে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে এগিয়ে আসে বাংলাদেশ নৌবাহিনী। নৌবাহিনী আঞ্চলিক সন্ত্রাস বিরোধী কার্যক্রমে একটি প্রধান অংশগ্রহণকারী শক্তি এবং জাতিসংঘ মিশনের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও যুক্ত রয়েছে। 

বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ইতিহাস

কিভাবে আজকের এই নৌবাহিনী বা নৌ শক্তিতে বাংলাদেশ ? এ  বিষয় জানতে হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর  ইতিহাসকে আমরা কয়েকটি স্তরে ভাগ করে পারি। চলুন জটপট স্তরগুলো সম্পর্কে জেনে নেওয়া যাক।

প্রারম্ভিক ইতিহাস

নৌবাহিনীর ইতিহাসের সাথে জাহাজ নির্মাণ শিল্প জড়িত। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে বাংলার ইতিহাস অনেক পুরাতন।  চতুর্দশ শতকে ঐতিহাসিক পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলায় আগমনের বর্ণনায় সোনারগাঁয়ে নির্মিত কাঠের জাহাজে ভ্রমণের বর্ণনা দেন। এ দিকে,  ইউরোপীয় পর্যটক সিজার ফ্রেডরিকের মতে পঞ্চদশ শতকে চট্টগ্রাম ছিল সমুদ্রগামী জাহাজ নির্মাণের মূল কেন্দ্র। সপ্তদশ শতকে তুরস্কের সুলতানের নৌবহর নির্মিত হয় চট্টগ্রামে। এভাবে জাহাজ নির্মাণ শিল্পের বিকাশ বাংলায় শক্তিশালী নৌবাহিনী তৈরির ভিত্তি রচনা করে।

মুঘল শাসনামলের সময় মুঘলদের অধিকাংশ জাহাজ বাংলায় নির্মাণ হয়েছিল বলে জানা যায়। বাংলা দখলের পরে মুঘরা বার্মিজ জলদস্যুতা রুখতে একটি শক্তিশালী নৌবাহিনী ঘটনের চিন্তা করে। এ উদ্দেশ্যে ভোলা, সন্দ্বীপ, নারায়ণগঞ্জের কদম রসুল, খিজিরপুর, ঢাকা ইত্যাদি কৌশলগত জায়গায় নৌঘাটি স্থাপন করে। তবে মুঘলরা সুমদ্রে ছিল দুর্বলতাই জলদস্যুতা রোধ করতে ব্যর্থ হয়। নিজেরা না পেরে মুঘল শাসক শায়েস্তা খানকে জলদস্যু দমনের দায়িত্ব প্রদান করে। শায়েস্তা খান মাত্র এক বছরের ৩০০ নৌকা ও জাহাজ সংগ্রহ করে বার্মিজ জলদস্যু দমন করে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং আরাকান বার্মিজদের থেকে ছিনিয়ে আনেন।

প্রাচীন যুদ্ধ জাহাজ
সুত্রঃ Total War Center

ব্রিটিশরা  প্রথম নৌপথেই উপমহাদেশে আসে। এ জন্যে ব্রিটিশ শাসনের শুরু থেকেই তারা নৌঘাটি স্থাপন করতে থাকে। তারা পশ্চিম দিক থেকে উপমহাদেশে প্রবেশ করেছিল এ কারনে তাদের মূল মনোযোগ ছিল পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলে কেন্দ্রীভূত। বাংলাসহ উত্তর-পূর্ব অঞ্চলে কোন নৌ-অবকাঠামো নির্মাণের কোন উদ্যোগ ব্রিটিশরা গ্রহণ করে নি।

জানা যায় নে,  ১৮০৫ সালের বিখ্যাত ট্রাফালগার যুদ্ধে ব্রিটিশ নৌবাহিনী বাংলায় তৈরি জাহাজ ব্যবহার করে। ১৮১৮ সালে জার্মান নৌবাহিনীর কাঠ-নির্মিত ফ্রিগেট ডাচল্যান্ড  চট্টগ্রামে তৈরি হয়।

পাকিস্তান শাসনামলে নৌবাহিনী

ব্রিটিশদের শাসনামলে যেমন বাংলায় নৌ কাঠামো নির্মাণের গুরুত্ব ছিল না তেমনি পাকিস্থান গঠনের পর পূর্ব পাকিস্থানেও নৌ কাঠামো নির্মাণে শাসক গোষ্টি কোন গরুত্ব দেয় নি। পাক-ভারত যুদ্ধের সময় ১৯৬৫ সালে বলা যায় দায় সারাভাবে প্রতিকী চারটি টহল জাহাজ চট্টগ্রামে মোতায়েন করা হয়।  ১৯৭০ সালে খুলনায় সীমিত অবকাঠামো নিয়ে পিএনএস তিতুমীর প্রতিষ্ঠা করা হয়। চট্টগ্রামে কোন অবকাঠামো বা সরঞ্জাম সম্প্রসারণ বা আধুনিকায়ন করা না হলেও এ বছরই চট্টগ্রামে নৌ কমান্ডারকে কমোডোর কমান্ডিং চিটাগাং এ উন্নীত করা হয়। মোট কথা পাকিস্থান থাকা অবস্থায় বাংলায় নৌ  শক্তি বৃদ্ধির বিষয়টি মূলত আলাপ আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল।

১৯৭১: স্বাধীনতা যুদ্ধ, তাদের অবদান ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীর জন্ম

বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু হয় ১৯৭১ সালে। পাকিস্থানী বাহিনী বাংলাদেশে নৃশংস সামরিক আক্রমণ শুরু করে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বাহিনী ও সর্ব সাধারণ প্রতিরোধ গড়ে তোলা শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান নৌবাহিনীর ফ্রান্সে নির্মাণাধীন ডুবোজাহাজ পিএনএস ম্যাংরো থেকে ৮ জন বাঙালি নাবিক বিদ্রোহ করেন এবং বাংলাদেশে ফিরে নৌবাহিনীর ভিত্তি তৈরি করেন।

মার্চের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি এন এস ম্যাংরো ফ্রান্সের তুলন সাবমেরিন ডকইয়ার্ডে যায় পাকিস্তানি সাবমেরিনারদের প্রশিক্ষন দেয়ার জন্য। এ প্রশিক্ষণে ৪১ জন অফিসার প্রেরণ করা হয়।  সেই ৪১ জন সাবমেরিনারদের মধ্যে ১৩ জন ছিলেন বাঙালি অফিসার। তারা আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যার কথা শুনে পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। এর মধ্যে ৮ জন ৩০ মার্চ বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। ৯ এপ্রিল ১৯৭১ তারা দিল্লিতে এসে পৌছান। পরবর্তিতে তাদের সাথে সাথে আরো অনেক নৌসেনা যুক্ত হন।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে সেক্টর কমান্ডার্স কনফারেন্সে বাংলাদেশ নৌবাহিনী আনুষ্ঠানিক যাত্রা আরম্ভ করে। বাংলাদেশ নৌবাহিনী মাত্র ৪৫ জন লোকবল নিয়ে যাত্রা আরম্ভ করে।  শুরুতে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর সরঞ্জাম বলতে ছিল ভারত থেকে পাওয়া দ পদ্মা ও পলাশ নামে দু’টি জাহাজ। এ দু’টি জাহাজ পরবর্তিতে পাকিস্থানী নৌবহরে আক্রমণে ব্যবহার করা হয়।

বাংলাদেশকে মুক্তিযুদ্ধের সময় যে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয়েছিল তার মধ্য দেশের অভ্যন্তরীন সকল নৌ চলাচল, বন্দর এবং উপকূলীয় এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল ১০নং সেক্টর বা নৌ সেক্টর। এ সেক্টরের কোন নির্দিষ্ট সেক্টর কমান্ডার ছিল না। যখন যে সেক্টরে অপারেশন চলত তখন সেই সেক্টরের কমান্ডারদের সহযোগীতায় নৌ-গেরিলাদের কাজ করতে হত।

নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেয়ার উদ্দেশ্যে ঐতিহাসিক পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে ২৩ মে ১৯৭১ তারিখে একটি গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প খোলা হয়। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয় সি-২ পি (C-2 P)।  এই ট্রেইনিং ক্যাম্পে ট্রেনিং দেয়ার জন্যে অন্যান্য সেক্টরসমূহের বিভিন্ন শিবির থেকে মে মাসের শুরুর দিকে প্রায় ৩০০ জন বাছাইকৃত যোদ্ধা সংগ্রহ করা হয়।

মজার ব্যাপার হল, এ ট্রেনিং ক্যাম্পে মুক্তি যোদ্ধাদের কি ধরনের প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে সে বিষয়টি এতই গোপনীয় ছিল যে, সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যেও শুধুমাত্র যার এলাকায় অপারেশন চালানো হবে তিনি ব্যতীত আর কেউ এই সম্পর্কে কিছুই অবগত ছিলেন না।  তবে ট্রেইনিং এর শুরু করার আগেই যোদ্ধাদের বলে দেওয়া হত যে একটি একটি আত্মঘাতী বা সুইসাইডাল অপারেশন। তাই অপারেশন সফল করতে প্রয়োজনে জীবন দেওয়া লাগতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবিসহ একটি সম্মতিসূচক ফর্মে স্বাক্ষর নেয়া হতো।ফর্মে লেখা থাকতো যে,

আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।

যুদ্ধের সময় নৌ সেনাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সামুদ্রিক যোগাযোগের পথ বন্ধ করা এবং সকল সমুদ্র ও নদীবন্দরগুলো ব্যবহার অনুপযোগী করে তোলা। সে লক্ষে তারা সারা দেশব্যাপী ৪৫টি প্রথাগত ও অপ্রথাগত আক্রমণ চালান। ১৯৭১ সালের ১৫ অগাস্ট বাংলাদেশ নৌবাহিনী ও মুক্তিবাহিনীর নৌযোদ্ধারা অপারেশন জ্যাকপট নামক একটি কমান্ডো অভিযান চালান চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর এবং চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে।

এই অভিযানে মোট ২৬টি জাহাজ ধ্বংস হয় ও আরও বহু জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এসব জাহাজের মধ্যে রয়েছে এমভি হরমুজ, এমভি আল আব্বাস, ওরিয়েন্ট বার্জ নং-৬ এবং এসএস লাইটিং এর মত জাহাজ যারা পাকিস্তানি বাহিনীর জন্য অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম বহন করছিল।

সুষ্ঠুভাবে অভিযান পরিচালনার জন্য ৬টি টাস্কফোর্সে বিভক্ত করা হয় সাঁতারু মুক্তিবাহিনীকে। এগুলো ছিল চট্টগ্রাম, মংলা, রাজশাহী, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট এবং চাঁদপুর। প্রতিটি টাস্ক এলিমেন্টে ছিল ৩ জন করে সাঁতারু যোদ্ধা। প্রত্যেক যোদ্ধাকে দেয়া হয় প্রথমে ১টি এবং পরে ২টি করে মাইন, ১ গ্রেনেড, ১টি ডেগার, সাঁতারের জন্য একজোড়া ফিনস, কম্পাস, ঘড়ি, ম্যাপ।

চট্টগ্রাম অপারেশনঃ নৌ কমান্ডোদের দ্বারা চট্টগ্রাম বন্দরে অপারেশন পরিচালিত হয় ১৫ আগস্ট মধ্যরাতে অর্থাৎ ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে। হরিনা ক্যাম্প থেকে আসা ৬০ জনের দলকে ২০ জন করে তিন ভাগে ভাগ করা হয়। ১ ও ২ নং দল তাদের পূর্ব পরিকল্পনা মোতাবেক ভিন্ন ভিন্ন পথ ধরে চট্টগ্রামের নির্দিষ্ট বেইজ ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে।

টিম কমান্ডারদের বলা হয়েছিল যে, দুটি বাংলা গানকে সতর্ক সংকেত হিসেবে ব্যবহার করা হবে। গান দুটি প্রচার করা হবে কলকাতা আকাশবানীর পক্ষ থেকে পূর্বাঞ্চলীয় শ্রোতাদের জন্য বিশেষ অনুষ্ঠানে সকাল ৬টা থেকে ৬:৩০ মিনিট অথবা রাত ১০:৩০ মিনিট থেকে রাত ১১টায়। এই ফ্রিকোয়েন্সির নাম ও গান দুইটি শুধু টিমের কমান্ডারই জানতো । গান দু’টি হলঃ

প্রথম সংকেত ছিল পঙ্কজ মল্লিকের গাওয়া “আমি তোমায় শুনিয়েছিলাম যত গান”এর অর্থ হল ২৪ ঘন্টার মধ্যে আক্রমণ করতে হবে বা আক্রমণের সময় কাছাকাছি।

সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় এর গাওয়া গান “আমার পুতুল আজকে প্রথম যাবে শ্বশুরবাড়ি” গানটি ছিলো দ্বিতীয় সংকেত যার অর্থ আক্রমণের জন্য ঘাঁটি ত্যাগ কর। অর্থাৎ সুস্পষ্ট নির্দেশ আক্রমণ করতেই হবে।

দল দু’টো ১৪ আগস্ট  প্রথম গানের সংকেত পায়। প্রথম সংকেত পাবার পর পর তারা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে তাদের বেইজ ক্যাম্প চরলক্ষ্যায় পৌছায়। ৩য় দলটির তখনো কোন খবর পাওয়া যায় নি। এরপর ১৫ আগস্ট তারা ট্রানজিস্টারে চূড়ান্ত সংকেত পায়, এবং নৌ সেনারা অপারেশনের সকল প্রস্তুতি শেষ করে।

চট্টগ্রামে অপারেশন জ্যাকপট পরিকল্পনা
Source: dailyswadhinbangla.com

চটগ্রামের এ অপারেশনে  ৩১ জন কমান্ডো যোদ্ধা অংশ নেয়। ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে রাত ১ টায় নৌ-কমান্ডোরা তাদের অপারেশনের জন্য যাত্রা আরম্ভ করেন। জোয়ার-ভাটার সন্ধিক্ষণ । একটু পরেই শুরু হবে ভাটার টান । তার আগেই কাজ সারতে হবে । নইলে ভাটার টানে সাগরে ভেসে যেতে হবে। কর্ণফুলীর তীর থেকে কমান্ডোরা নেমে পড়লেন পানিতে । তাঁরা জানতেন- কেউ কেউ হয়তো ফিরবেন না অথবা সবাই । কিন্তু তাঁরা তো পলাশীর ময়দান থেকেই মাথায় কাফনের কাপড় জড়িয়ে এসেছেন । ভয় কিসের! প্রত্যেকের বুকে গামছা দিয়ে একটি করে লিমপেট মাইন বাধা, কোমরে ড্যাগার ।

রাত ১টা ১৫ মিনিটে কমান্ডোরা পানিতে নেমে জাহাজের উদ্দেশ্যে সাঁতরানো শুরু করে, এবং বেশ দ্রুততার সাথে নিজ নিজ বাছাইকৃত টার্গেট জাহাজসমূহের গায়ে মাইন লাগিয়ে সাঁতার কেটে সরে পরে। রাত ১টা ৪০ মিনিটে প্রথম বিস্ফোরণ ঘটে। তারপর একে একে সব গুলো মাইন বিস্ফোরিত হয় ।

এ অপারেশনে তিনটি বড় জাহাজ এম ভি হরমুজ (৯৯১০ টন অস্ত্রবাহী জাহাজ যা ১৩ জেটিতে ১৪ আগস্ট এসে পৌঁছায়), এম ভি আল-আব্বাস (১০৪১৮ টন সামরিক সরঞ্জামবাহী জাহাজ ১২ নং জেটিতে ৯ আগস্ট এসে পৌঁছায়) এবং ওরিয়েন্ট বার্জ নং ৬ (৬২৭৬ টন অস্ত্র ও গোলাবারদ সহ ফিস হারবার জেটিতে অবস্থান ছিল) ধ্বংস করা হয়।

মংলা সমুদ্র বন্দর অপারেশনঃ ২৭শে জুলাই ১৯৭১ সনে,৬০ জন নৌ- কমান্ডো ও ২০০ জন বাংলাদেশী অর্থাৎ মোট ২৬০ জনের সি আন্ড সি বিশেষ কমান্ডো দল  ভারতের কানিং মাতলার বন্দর থেকে মংলা অপারেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রা  আরম্ভ করে  সুন্দর বনের গভীর জঙ্গল পাড় হয়ে  ১৩ ই আগস্ট ১৯৭১ সনে সন্ধ্যা ৬ টায় মংলা বন্দর এ পৌঁছায়। দলটি মংলা বন্দর ও ডাংমারি বিলের পিছনে, পরিত্যক্ত জমিদার বাড়িতে অবস্থান নেয়। তাদের অবস্থান থেকে মংলার দূরত্ব ডাংমারি বিলের  দিয়ে ৬ মাইলের মত যা নৌকায় পৌঁছোতে সময় লাগে ১ ঘন্টা।

১৫ই আগস্ট, ৭১ এ রেডিও মারফত চুড়ান্ত একশন গান বাজার পর তারা পরম করুনাময় আল্লাহ`র কাছে স্বাধীনতা যুদ্ধের শহীদদের ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল অপারেশনের সাফল্যের জন্য বিশেষ দোয়া করেন। ঠিক রাত ১২টায় কমান্ডোরা ১৫টি নৌকায় মংলা বন্দরের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করে। মংলায় রাত ২ টা পৌঁছার কথা থাকলেও পথ পরিদর্শকের ভুল নির্দেশনায় আরো অনেক পরে তারা বন্দরে পৌঁছান। নির্ধারিত সময়ের পরে পৌঁছানোয় ইতিমধ্যে অপারেশন জ্যাকপটের পরিকল্পনায় অনুসারে বাংলাদেশের সব নদী ও সমুদ্র বন্দরে অপারেশন শেষ।

এ ক্ষেত্রে এ অপারেশন পরিচালনা করা শুধুমাত্র চরম ঝুঁকি নেওয়াই নয় বরং বলা যায় একটি আত্মঘাতী অপারেশন হয়ে দাঁড়ায়। তা স্বত্ত্বেও কমান্ডোরা সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে ভোর ৪.৩০ মিনিটে মংলা অপারেশন শুরু করেন।  কমান্ডো দল হেভি মেশিন গান, মেশিনগান, এনরগা সহকারে ৩ জনের ছোট ছোট দল করে, ৬৬টি উপদলে বিভক্ত হয়ে , নৌ-কমান্ডোদের ছাউনি দিতে (কভারিং দিতে) মংলা বাঁধের পিছনে অবস্থান নেন।

এ সময়  কমান্ডো দলের উপ-কমান্ডার রাজা ও খিজির জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নৌ-কমান্ডোদের সহযোগিতায় মেশিনগান নিয়ে পশুর নদীর হাঁটু পানিতে নেমে  পড়েন । সময়ের অভাবে শুধুমাত্র ২৪ জন নৌ-কমান্ডো এ অভিযানে অংশ নিতে পেরেছিলেন। ৬টি উপদলে বিভক্ত হয়ে ২৪ জন নৌ-কমান্ডো ৬টি বিদেশী জাহাজে মাইন  লাগান , ভোর ৬:৩০ মিনিট থেকে নৌ-কমান্ডোদের লাগানো মাইন বিকট শব্দ করে ফাটতে শুরু করে।

আক্রান্ত হবার ৩০ মিনিটের মধ্যেই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর ৪টি বিমান মংলা বন্দরের উপরে ঘুরতে দেখা যায়। আক্রান্ত জাহজগুলির মধ্য একটি সোমালীয়, একটি মার্কিন, ২টি চীনা, ১টি জাপানি ও ১টি পাকিস্তানী জাহাজ। এ অপারেশনে আক্রান্ত মোট ৬টি বিদেশী জাহাজই ধ্বংস হয় এবং ৩০,০০০ হাজার টন গোলা-বারুদ ও যুদ্ধের সরঞ্জাম সহকার ধীরে ধীরে পশুর নদীতে তলিয়ে যায়।

উল্লেখ করা প্রয়োজন,  মংলা অপারেশন কমান্ডার আমিনুর রহমান,খসরু ও আরও ২ জন নৌ- কমান্ডো এ অপারেশনে মংলা বন্দর এর অতিরিক্ত বাধা পার হয়ে অসীম সাহসিকতার সাথে সোমালীয় ৭,০০০ হাজার টনের অস্ত্র বহনকারী জাহাজ এস,এস,লাইটং-এ মাইন লাগান এবং এস.এস. লাইটং-কে ধ্বংস করেন।  এই অপারেশনে দুইজন মুক্তিযোদ্ধা নিখোঁজ হন, ধারণা করা হয় তারা স্রোতের টানে ভেসে গেছেন অথবা মারা গেছেন।

চাঁদপুর নদী বন্দরে আক্রমণঃ    চাঁদপুর বন্দর অপারেশনে ১৮ জন নৌ-কমান্ডো অংশ নেন। এ গ্রুপের ১৮ জনকে তিনজন করে মোট ৬টি ছোট দলে ভাগ করা হয়। এই অভিযানে মাইন বিস্ফোরণে ২টি স্টিমার, গমবাহী একটি জাহাজ সহ ছোট বড় আরো অনেকগুলো নৌযান ধ্বংস হয়।

নারায়ণগঞ্জ নদী বন্দর অপারেশনঃ উপরের অপারেশনগুলোর মত নারায়ণগঞ্জেও ১৯৭১ এর ১৫ আগস্ট মধ্যরাত বা ১৬ আগস্ট প্রথম প্রহরে অপারেশন পরিচালিত হয়েছিল। এ অপারেশনে মোট ৪টি জাহাজ ও বেশ কয়েকটি নৌযান নৌ কমান্ডোরা ধংস করেন।  ঢাকার কাছাকাছি নারায়নঞ্জ শহরের কেন্দ্রস্থলে এ অপারেশন পরিচালনা করে কমান্ডোরা বিশেষ সাহসকতার পরিচয় দান করেন। এ অপারেশনে মোট ২০ জন কমান্ডো অংশ নিয়েছিলেন।

১৫ আগস্টের ঐ অপারেশনগুলোতেই প্রায় ২৬টি জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয় এবং আরো অনেক নৌযান ক্ষতিগ্রস্থ হয়। আগস্ট মাসের এসব অপারেশন ছাড়াও আগস্ট-নভেম্বর মাসব্যাপী আরো অনেকগুলো নৌ-কমান্ডো অপারেশন পরিচালনা করা হয়। এসব অপারেশনে পাকিস্তানি বাহিনী ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখিন হয়। যুদ্ধকালীন এ সব অপারেশনে আনুমানিক ক্ষতির পরিমাণ হলঃ

প্রায় সর্বমোট ৫০৮০০ টন জাহাজ ধ্বংসপ্রাপ্ত ও নিমজ্জিত।

৬৬০৪০ টন জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত।

এবং বেশ কিছু সংখ্যক পাকিস্তানি নৌযান বাংলাদেশী নৌ-কমান্ডোদের হস্তগত

নৌবাহিনীর সবগুলো গুলো অপারেশনই যে সফলতার মুখ দেখে এমন নয়। নিরাপত্তা জোরদার করায় অক্টোবরের পরে আর চট্টগ্রামে আর অপারেশন পরিচালিত করা যায় নি। এদিকে একই কারনে, চারবার হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ধ্বংস করার চেষ্টা করা হলেও তা বিফলে যায়।

অপারেশন হটপ্যান্টঃ অপারেশন জ্যাকপটের পরে নৌ কমান্ডোরা ভারতে ফেরত যায়।  এ অপারেশনের পরে এরুপ বৃহৎ কোন অপারেশনে তাদের পাঠানো হয় নি।  ছোট ছোট দল পাঠানো হতো কিছু নির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুর ওপর আঘাত হানতে, এবং সুযোগ পেলেই কমান্ডোরা সেখানে আক্রমণ চালাতেন।

তৎকালীন বাংলাদেশের সরকার প্রধান তাজ উদ্দিন আহমেদের কাছ থেকে অনুমতি পেয়ে ৯ নাম্বার সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল আগস্টে এম এন সামান্থ এর কাছে চারটি গান বোটের আবেদন করেন। অক্টোবর মাসে কলকাতা বন্দরে অজয় ও অক্ষয় নামে দু’টি টহল জান মুক্তি বাহিনীকে দেওয়া হয়। পরবর্তি এক মাসে ৩৮ লাখ রুপিতে ক্ষিদিরপুর ডকইয়ার্ডে মেরামত করা হয়।

টহলজানগুলোতে পরবর্তীতে ২ টি কানাডিয়ান ৪০X৬০ মিমি বোফর গান এবং ২টি হালকা ইঞ্জিন এবং ৮ টি গ্রাউন্ড মাইন (ডেকের দুই পাশে চারটি করে) এবং আরো ১১টি গ্রাউন্ড মাইন দ্বারা সজ্জিত করা হয়। নতুন কমিশন করা জাহাজ দু’টির নাম দেওয়া হয় বিএনএস পদ্ম ও বিএনএস পলাশ। বাংলাদেশের হয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যাপ্টেন কামরুজ্জামানের উপস্থিতিতে এ দুটি জাহাজ কমিশনিং করা হয়। লেঃ কমান্ডার কেপি রায় এবং কে মিত্র ছিলেন জাহাজ দুটোর কমান্ডে নিয়োজিত। বাংলাদেশে নবগঠিত এই নৌবাহিনীর উদ্দেশ্য ছিলো:

১। ছালনা প্রবেশমুখ মাইন দ্বারা উড়িয়ে দেয়া

২। পাকিস্তানী জাহাজের উপর হামলা চালানো

ভারতীয় নৌবাহিনীর ফ্রিগেটের প্রহরায়, নভেম্বরের ১০ তারিখ জাহাজ দুটি সফলভাবে মংলা বন্দরের প্রবেশ মুখে মাইন দ্বারা আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়। তার পরদিনই ১১ নভেম্বর , ১৯৭১ এ তারা ব্রিটিশ জাহাজ “দ্যা সিটি অফ সেইন্ট এলব্যান্স” কে মংলা বন্দর থেকে তাড়াতে সক্ষম হয়

দেশ শত্রুমুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত এই নৌকমান্ডোরা সারাদেশে অসংখ্য সফল অভিযান পরিচালনা করেন। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানবাহিনীর ভুলবশত আক্রমণে পদ্মা ও পলাশ ডুবে যায়। অফিশিয়াল তথ্য অনুযায়ী মুক্তিযুদ্ধকালে নৌবাহিনীর সাথে যুক্ত ছিল ৩৩৪ জন সদস্য যাদের মধ্য ২২ জন যুদ্ধে শহীদ হন।

স্বাধীনতা পরবর্তিতে নৌবাহিনী

স্বাধীনতা লাভের পরে বাংলাদেশ নৌবাহিনী একমাত্র সম্পদ বলতে ছিল চট্টগ্রামে পাকিস্তান নৌবাহিনীর পরিত্যক্ত ঘাটি সাবেক পিএনএস বখতিয়ার, খুলনায় বিপর্যস্ত ঘাটি সাবেক পিএনএস তিতুমীর এবং ঢাকায় একটি পরিবহন শিবির। এ সময় নৌবাহিনীর কোন জাহাজ, ঘাটি, স্থায়ী আবাস, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা, সাংগঠনিক কাঠামো কিছুই ছিল না।  মাত্র ১৮০ জন সদস্য নিয়ে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের নৌবাহিনী।

প্রথমে নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ছিল সেনাসদরের একটি উইং এ । পরবর্তিতে বর্তমান বানৌজা হাজী মহসিন এ নৌ সদর স্থানান্তরিত করা হয়। প্রথমবারের মত  নৌবাহিনীতে ১৯৭২ সালে ১০০ জন লোকবল নিয়োগ প্রধান করা হয়। এই নিয়োগপ্রাপ্তদের অধিকাংশই ছিল মুক্তিযোদ্ধা। নৌ সদস্যদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত চট্টগ্রাম নৌ ঘাটিতে। সংস্থাপন বিভাগের দুইটি জলযানকে ১৯৭২ সালে নদীভিত্তিক টহল জাহাজে রূপান্তরিত করে নৌবাহিনীতে যুক্ত করা হয়।

ভারতীয় নৌবাহিনী ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে একটি উপকূলীয় টহল জাহাজ উপহার দেয় যা ব বানৌজা পদ্ম নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে কমিশন লাভ করে। এটিই ছিল সমদ্রগামী প্রথম জাহাজ। ১৯৭৪ সালে একটি কানাডিয়ান কার্গো জাহাজকে সংস্কার করে বানৌজা শহীদ রুহুল আমিন নামে যুক্ত করা হয় এবং জাহাজটিকে নৌবাহিনীর ফ্ল্যাগশিপ করা হয়। এটি ছিল নৌবাহিনীর প্রথম জাহাজ যা গভীর সমুদ্রে চলাচল করতে সক্ষম। ১৯৭৪ সালের মধ্যে নৌবাহিনীর ঘাটি সা খান, হাজী মহসিন ও তিতুমীর স্থাপিত হয়।

১৯৭৬ সালে চট্টগ্রামের জলদিয়ায় বাংলাদেশ মেরিন একাডেমীর ক্যাম্পাসে নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণ কেন্দ্র বাংলাদেশ নেভাল একাডেমী অস্থায়ীভাবে স্থাপিত হয়। নারায়ণগঞ্জ ডকইয়ার্ড পাঁচটি নদী  ভিত্তিক টহল জাহাজ নির্মাণ করে যা ছিল নৌবাহিনীর জন্য একটি মাইলফলক।

স্বাধীনতার পর নৌবাহিনীর প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে যুক্তরাজ্য নৌবাহিনীর দুটি ফ্রিগেট বানৌজা ওমর ফারুক ও বানৌজা আলী হায়দার যথাক্রমে ১৯৭৬ এবং ১৯৭৮ সালে নৌবাহিনীতে সংযোজন করা হয়।  ১৯৮০ সালে কিছু মিসাইল বোট ক্রয়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করে। ১৯৮২ সালে রাজকীয় নৌবাহিনীর তৃতীয় ফ্রিগেটটি বানৌজা আবুবকর নামে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত হয়।  ১৯৮২ সালে বাংলাদেশ নেভাল একাডেমীকে পতেঙ্গার বর্তমান অবস্থানে স্থানান্তর করা হয়। ১৯৮৯ সালে নৌবাহিনীতে যুক্ত হয় প্রথম ক্ষেপণাস্ত্রবাহী  ফ্রিগেট বানৌজা ওসমান।

পরবর্তী দুই দশকে বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে যুগান্তকারী পরিবর্তন সাধিত হয়। নৌবাহিনীর আকার বৃদ্ধির পাশাপাশি এর কার্যপরিধি, দায়িত্ব ও ভবিষ্যত পরিকল্পনায়ও পরিবর্তন সাধিত হয়। বিভিন্ন ধরনের জাহাজ সংযোজনের সাথে সাথে নৌবাহিনীতে পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন ধরনের অস্ত্রশস্ত্র যেমন মিসাইল, টর্পেডো, মাইন এবং অন্যান্য সমরাস্ত্র সংযোজন করা হয়েছে। এছাড়াও পর্যায়ক্রমে নৌবাহিনীতে মিসাইল, টর্পেডো, মাইন এবং গোলাবারুদ সংরক্ষণ ও মেরামতের সক্ষমতা অর্জন করা হয়েছে। অন্যান্য দেশের উন্নত নৌবাহিনীর সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর আধুনিকায়ন, বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম ও জাহাজ সংযোজন ও বিয়োজন করা হয়েছে। বর্তমানে নৌবাহিনী বাংলাদেশের সমুদ্রসীমা প্রতিরক্ষায় সদা প্রস্তুত। নৌবিমান শাখা সংযোজনের বিষয়টিও বর্তমানে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

সরঞ্জাম

বাংলাদেশ নৌবাহিনীতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে ৪টি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী ফ্রিগেট, দুইটি টহল ফ্রিগেট, ৪টি কর্ভেট, ৩৮টি বিভিন্ন ধরণের ছোট যুদ্ধজাহাজ এবং ৩০টি সহায়ক যুদ্ধজাহাজ। ডুবোজাহাজ শাখায় রয়েছে দুইটি ডিজেল ইলেক্ট্রিক অ্যাটাক ডুবোজাহাজ। নৌবাহিনীর উড্ডয়ন শাখার রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হেলিকপ্টার ও স্থির ডানার বিমান। পাশাপাশি নৌবাহিনীর স্পেশাল ওয়ারফেয়ার ডাইভিং অ্যান্ড স্যালভেজ (সোয়াডস) নামে একটি বিশেষ বাহিনীও রয়েছে।

ফোর্সেস গোল ২০৩০

বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর উন্নয়নে ফোর্সেস গোল ২০৩০ নামক একটি দীর্ঘমেয়াদী আধুনিকায়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করে।  এই পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে সব ধরনের সরঞ্জাম এবং অবকাঠামো উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ এবং উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা। বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্ব অনুধাবন করে নৌবাহিনীকে এই পরিকল্পনায় সর্ব্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়া হয়। পরিকল্পনায় নৌবাহিনীকে ত্রিমাত্রিক বাহিনীতে রূপান্তর করার কথা বলা হয়।

এরই ধারাবাহিকতায় পটুয়াখালী জেলার রাবনাবাদ চ্যানেলে নৌবাহিনীর জন্য বানৌজা শের-এ-বাংলা নামক ঘাটি স্থাপনের কাজ চলছে। এটি হবে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ নৌঘাটি যেখানে বিমান উড্ডয়ন ও ডুবোজাহাজ ভেড়ানোর ব্যবস্থা থাকবে। একই সাথে কক্সবাজারের পেকুয়ায় বানৌজা শেখ হাসিনা নামক ডুবোজাহাজ ঘাটির কাজও চলমান রয়েছে।

২০১১ সালে যুক্তরাজ্য থেকে ব্যবহৃত দু’টি টহল জাহাজ কিনে যা পরবর্তিতে সংস্কার ও আধুনিকায়নের পরে ক্ষেপনাস্ত্রবাহী কর্ভেট হিসেবে ব্যবহার করছে। ফোর্সেস গোল ২০৩০ এর লক্ষে ২০১৪ সালে চীন থেকে দুইটি ব্যবহৃত টাইপ ০৫৩ এইচ২ (জিয়াঙ্ঘু ক্লাস) ফ্রিগেট ক্রয় করা হয়। ২০১৩ ও ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কোস্টগার্ড নৌবাহিনীকে দু’টি হ্যামিল্টন ক্লাস কাটার উপহার দেয় যা বর্তমানে টহল ফ্রিগেট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

২০১৬ সালে চীন থেকে দুইটি টাইপ ০৫৬ কর্ভেট কেনা হয়েছে এবং বর্তমানে আরও দুইটি নির্মাণাধীন রয়েছে। ২০১৩ সালে চীন থেকে কেনা হয় দুইটি দুর্জয় ক্লাস বৃহৎ টহল জাহাজ। ডুবোজাহাজ বিধ্বংসী ক্ষমতা সম্পন্ন আরও দুইটি দুর্জয় ক্লাসের জাহাজ খুলনা শিপইয়ার্ডে নির্মাণ করে ২০১৭ সালে নৌবাহিনীতে যুক্ত করা হয়েছে। 

এদিকে,  ২০১১ সালের ১৪ জুলাই দুইটি এডব্লিউ ১০৯ হেলিকপ্টার সংযোজন করার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর উড্ডয়ন শাখার উদ্বোধন হয়। পরবর্তীতে ২০১৩ সালে দুইটি ডরনিয়ার ডিও ২২৮এনজি সামুদ্রিক টহল বিমান উড্ডয়ন শাখায় যুক্ত হয়।

২০১৭ সালে চীন থেকে দুইটি পুরাতন টাইপ ০৩৫জি (মিং ক্লাস) ডুবোজাহাজ সংযুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ নৌবাহিনী সমুদ্রগর্ভে অপারেশনের সক্ষমতা অর্জন করে। ডুবোজাহাজ সংযোজনের মাধ্যমে নৌবাহিনী ত্রিমাত্রিক নৌবাহিনীতে পরিণত হয়।

২০১৭ সালের জুলাই মাসে সংসদে প্রতিরক্ষা কার্যে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী আনিসুল হক বাংলাদেশ নৌবাহিনীর অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার উপর আলোকপাত করেন। তিনি জানান,

পেকুয়ায় ডুবোজাহাজ ঘাটি নির্মাণের জন্য ৩৩৩ একর ভূমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে। ঘাটিটি নির্মাণের জন্য চীনের সাথে সমঝোতা স্বারক সাক্ষরিত হয়েছে। নৌবাহিনীর জন্য চারটি মাইনসুইপার এবং একটি পালযুক্ত প্রশিক্ষণ জাহাজ ক্রয় করা হবে বলে মন্ত্রী জানান। তিনি আরও জানান যে চট্টগ্রাম ড্রাই ডকে বিদেশি জাহাজ নির্মাণ সংস্থার সহযোগিতায় ছয়টি ফ্রিগেট নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। সরকার দেশেই ক্ষেপণাস্ত্র এবং শত্রু-মিত্র চিহ্নিতকরণ ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।

নৌবাহিনীর আধুনিকায়নের জন্যে ভবিষ্যত পরিকল্পনা হিসেবে নীচের সরঞ্জামগুলো যুক্ত করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

  • মিং ক্লাস সাবমেরিন- ২টা
  • সম্পূর্ন নতুন কিলো বা আমুর ক্লাস সাবমেরিন ২টা।(২০২০ পর)
  • ২০২০ সালের মধ্যে ২টা নতুন ফ্রিগেট প্রযুুক্তি সহ।
  • আরো ৪টা টাইপ ৫৬ ক্লাস করভেট চীন থেকে।প্রযুুক্তি পাওয়ার পর দেশেও উৎপাদন করা হবে।
  • ৫টি মাইন নিষ্ক্রিয়কারী জাহাজ।তবে টাকা বরাদ্দ হয় নি।
  • দুর্জয় ক্লাস পেট্রোল ক্রাফ্ট ৪টি। যা দেশে নির্মান হচ্ছে।
  • পদ্না ক্লাস পেট্রোল জাহাজ ২৩টা যা ২০৩০ সালের মধ্যে আসবে। এটাও দেশে নির্মান হবে।
  • আরো দুইটা জ্বালানী জাহাজ ২০২০ সালের মধ্যে।
  • ২টি রিসার্চ & সার্ভে জাহাজ
  • ৩টা চাইনিজ “হারবিন জেড ৯” কপ্টার।
  • আরো দুইটা ডরনিয়ার বিমান।
  • সোয়াডসের জন্য এমআই ১৭ কপ্টার।
  • হাসপাতাল জাহাজ।
  • বরিশালে সবচেয়ে বড় নৌ ঘাঁটি।যেখানে রানওয়ে থাকবে।
  • চীনের উপকূলীয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।

শেষ কথা

যে অবস্থায় বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর গঠন হয়েছে পৃথিবীর  ইতিহাসে এমন  বাহিনী সৃষ্টি বিরল। একদম শূন্য হাতে একটা প্রতিরক্ষা বাহিনী !

আধুনিক বিশ্বে যুদ্ধ ব্যবস্থায় উভয় পক্ষ সর্বাত্মক দূরত্ব থেকে একে অন্যের ওপর আক্রমণ রচনা করে থাকে। যুদ্ধের কলাকৌশল সেই দিকে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। সেখানে স্বাধীনতাযুদ্ধে নৌ-কমান্ডোরা সব রকম নিরাপত্তা ছাড়াই বর্ষায় ভয়াল এবং উন্মত্ত কর্ণফুলি, যমুনা, পশুর, শিবসা, শীতলক্ষ্যা, পদ্মা এবং বঙ্গোপসাগরের বুকে শত্রুর অতি কাছাকাছি পৌঁছে শত্রু জাহাজ ধ্বংস করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন এসব অভিযানে শত্রু সৈন্য ছাড়াও নদীতে হিংস্র জানোয়ার দ্বারা আক্রমণ এবং প্রবল স্রোতে গভীর সমুদ্রে ভেসে যাওয়া কিংবা তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা কম ছিল না। কিন্তু সব ভয় এবং বিপদকে উপেক্ষা করে  মুক্তি পাগল দেশ প্রেমিক বীরেরা শত্রুর অহঙ্কার গুঁড়িয়ে দিয়েছিলেন একের পর এক আঘাত হেনে। ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক জাহাজ, পন্টুন, ফেরি, লঞ্চ, গানবোট, বার্জ ডুবিয়ে এবং ধ্বংস করে শত্রুর মনোবল চূর্ণ করে দেয়।

সম্প্রতি বাংলাদেশ নৌবাহিনী ব্যাপক সামরিক ক্রয়-পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে সামরিক বাহিনীর জন্য অস্ত্র, যন্ত্রপাতি এবং সামরিক সরঞ্জাম যেমন জাহাজ ধ্বংসকারী মিসাইল, সমুদ্রে টহলের বিমান, ফ্রিগেট, সাবমেরিন ও হেলিকপ্টার। নৌবাহিনীর সর্বাধুনিক ফ্রিগেট বানৌজা বঙ্গবন্ধুর ন্যায় অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ ক্রয় প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি আগামী কয়েক বৎসরের মধ্যে নৌবাহিনীর পুরাতন জাহাজসমূহ প্রতিস্থাপনের বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন আছে।

তথ্য সূত্রঃ

১। https://bn.wikipedia.org

২। bhorerkagoj.com

৩। নানা ওয়েব পোর্টাল

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক