বাংলাদেশ বিমানবাহিনীঃ বাংলাদেশের আকাশ সীমা সুরক্ষার অতন্ত্র প্রহরী

পৃথিবীতে রাজ্য ব্যবস্থার শুরু থেকেই রাজ্যগুলো নিজেদের প্রতিরক্ষার স্বার্থে   নিজস্ব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে। প্রথম দিকে মূলত সেনা বাহিনীর দেখা মিলে ধীরে ধীরে জলজ পথে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দেখা যায় । বিজ্ঞানের ক্রম উন্নয়নের সাথে সাথে মানুষ আকাশে উড়তে শিখে। সেই সাথে শুরু হয় আকাশ পথের প্রতিরক্ষা।  বর্তমান বিশ্বে প্রায় প্রতিটি দেশ প্রতিরক্ষার জন্যে জন্যে  সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর সমন্বয়ে তাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলে।

সময় পরিক্রমায় যুদ্ধের ধরন পাল্টে যেতে থাকে। এক সময় দেখা যায় অন্যান্য বাহিনী থেকে বিমানবাহিনী খুব দ্রুত ও সহজে শত্রু ব্যুহে আক্রমণ করতে পারে। ধীরে ধীরে তাই বিমানবাহিনীর কদর বাড়তে থাকে। এর ধারাবাহিকতায়   “বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত” এই মূলমন্ত্র কে বুকে লালন করে ১৯৭১ সালে গড়ে উঠেছিলো আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর একটি অংশ “বাংলাদেশ বিমান বাহিনী”। অর্থাৎ বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বাংলাদেশ সশস্ত্র বাহিনীর আকাশ যুদ্ধ শাখা| বহু চড়াই উৎরাই পেরিয়ে আজকের বিমানবাহিনী ।

বিমান বাহিনীর মূল দায়িত্ব হল বাংলাদেশের আকাশ সীমার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা। একই সাথে, বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে বিমান সহায়তা প্রদান করাও বিমান বাহিনীর অন্যতম দায়িত্ব। এছাড়াও বিমান বাহিনী দেশে ও বিদেশে বিভিন্ন দুর্যোগে মানবিক সহায়তা প্রদান করে থাকে এবং বিশ্বব্যাপী শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কযুক্ত রয়েছে।

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস

বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর ইতিহাস জানতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে ১৯২০ সালের দিকে ।  সে সময় ভারতীয় রাজনীতিবিদরা রয়্যাল এয়ার ফোর্সে ভারত উপমহাদেশের স্থানীয় লোকজনকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানায়,  কারণ ভারতীয় রয়েল ফ্লাইং কোরের কিছু সদস্য প্রথম বিশ্বযুদ্ধে নাম এবং খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।

ভারতীয়দের এই দাবী অনুসারে ১৯৩২ সালের ৮ অক্টোবর ব্রিটিশ রয়্যাল ফোর্সের সহায়তাকারী হিসেবে ভারতীয় বিমান বাহিনী গঠন করা হয়। কিন্ত ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত এই বাহিনীর কোন উন্নতি দৃষ্টিগোচর হয় নি। এমন কি ২য় বিশ্ব যুদ্ধের সময়ও বর্তমান বাংলাদেশে প্রশিক্ষণের কোন সুযোগ হয় নি। যাইহোক, কুমিল্লা, ফেনী, পতেঙ্গা, কক্সবাজার এবং কয়েকটি স্থানে দ্রুত বিমানবন্দর নির্মাণ করা হয়। এই এলাকার জন্য শুধুমাত্র নারায়ণগঞ্জে নিয়োগ কেন্দ্র ছিল।

ভারত-পাকিস্থান ভাগ হবার পরে ১৯৫১-৫২ সালের দিকে প্রথম পাকিস্থান বিমানবাহিনীর যুদ্ধ স্কোয়াড্রনটি সুংগঠিত হয়। যা আবদুর রহিম খানের নেতৃত্বে ছিল যিনি পরবর্তিতে ১৯৬৯-৭১ সালে পাকিস্থান বিমানবাহিনীর প্রধান ছিলেন। বাংলা থেকে পিএএফ / এএফ অফিসার ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তোওয়াবও এই স্কোয়াড্রনের কমান্ডেন্ট ছিলেন যিনি পরবর্তিতে ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর প্রধান হয়েছিলেন। ১৯৬৫ সালে বাংগালী পাইলট ফ্লাইং অফিসার আলম বিমান দূর্ঘটনায় মরা যান। তার সমসাময়িক ছিলেন এ কে খন্দকার যিনি আমাদের ঐতিহাসিক মুক্তিযুদ্ধে গৌরবময় ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং রেসকোর্স ময়দানে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্থানের দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণকালে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেন। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম বিমানবাহিনী প্রধান।

১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত বাংগালীরা জীবন সংগ্রাম করে বেঁচে ছিল।  তৎকালীন পাকিস্তান বিমান বাহিনীর (পিএএফ) বাঙালি কর্মকর্তাদের নাম ও আত্মত্যাগও ছিল।  এমনকি ১৯৬৫ সালে ভারত পাক-যুদ্ধের সময় শহীদ (শহীদ) স্কোয়াড্রন নেতা আলম, উইং কমান্ডার তোওয়াব, ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আযম ও অন্যান্য অফিসাররা অসমান্য গৌরবময় ভুমিকা পালন করেন।

ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট সাইফুল আজমের কথা না বললেই নয় ।  বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এক গৌরবের নাম সাইফুল আজম। যুক্তরাষ্ট্র সাইফুল ইসলামকে লিভিং ইগল উপাধিতে ভূষিত করে। উল্লেখ্য গোটা পৃথিবীতে এই উপাধি প্রাপ্ত পাইলটের সংখ্যা ২২ জন। সাইফুল আজম ছিলেন পৃথিবীর ইতিহাসে একমাত্র ফাইটার পাইলট যিনি চারটি দেশের বিমান বাহিনীর সৈন্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই চারটি দেশ হলো পাকিস্তান, জর্ডান, ইরাক ও তার মাতৃভূমি বাংলাদেশ। দুটো ভিন্ন প্রতিপক্ষের বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখ সমর জয়ের কৃতিত্ব রয়েছে তার, এগুলো হলো ভারত ও ইসরাইল।

১৯৬৫ সালে তত্‍কালীন পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এক বৈমানিকের ভারতের বিমান বাহিনীর পাঁচটি যুদ্ধবিমান মাত্র ৩০ সেকেন্ডে ধ্বংস করেন । এখন পর্যন্ত এটি একটি বিশ্বরেকর্ড । এফ-৮৬ স্যাবর জেটের মতন মান্ধাতা জঙ্গী বিমান নিয়ে ৩০ সেকেন্ডে ৫ টা বিমান ও সেই একই ফ্লাইটে মোট ৯ টা বিমান ভূপাতিত করেন তিনি । হলিউডি ফিল্মেও চিন্তা করা যায় না । এই কৃতিত্বের জন্য তাকে পাকিস্তানে ”সিতারা-ইজুরায়ত” (বাংলাদেশের বীরবিক্রম এর সমতুল্য, পাকিস্তানের তৃতীয় সামরিক বীরত্বের খেতাব) পদকে ভুষিত করা হয়।

গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম

গ্রুপ ক্যাপ্টেন সাইফুল আজম

১৯৬৭ সালে জুনের ৫ তারিখে জর্ডানের মাফরাক ঘাঁটি থেকে প্রথমবার আরব-ইসরায়েল যুদ্ধে অংশ নেন আজম। ইজরায়েল মাফরাক  ঘাটি আক্রমণ করে। ইসরাইলি বিমানের আক্রমণ প্রতিরোধের জন্য জর্ডানের পাইলটদের সাথে নিয়ে চারটি ‘হকার হান্টার’ জঙ্গী বিমানের নেতৃত্ব দিয়ে আকাশে উড়েন তিনি। ইসরাইলি পাইলটেরা এমন কোনো বাধার কথা চিন্তাও করে নাই।  আজমের নেতৃত্বে মুহুর্মুহু আক্রমণ শুরু হয় ইসরাইলি বিমানের উপর।

আকাশপথে চলতে থাকে ডগ ফাইট। । ‘এয়ারস্পেস ডগ ফাইট’, যাকে বলা যায় ‘শূন্যের বুকে সম্মুখ সমর’।  এক পর্যায়ে ইসরায়েলি পাইলট এইচ বোলেহ এর নেতৃত্বাধীন একটি ‘ডাসল্ট সুপার মিস্টেরে’ জঙ্গী বিমান ভূপাতিত করেন আজম। তার নির্ভুল আঘাতে ঘায়েল হয় দু’জন ইসরাইলি সেনা। এরপর আরেক আঘাতে প্রায় অকেজো করে দেন আরেকটি সুপার মিস্টেরে বিমান। আঘাতপ্রাপ্ত বিমানটি ঐ অবস্থাতেই ফিরে যায় ইসরাইলি সীমানার দিকে । সে দিন সন্ধ্যায় জর্ডানের বাদশাহ হুসেইন  নিজে আসেন আজমকে অভিবাদন জানাতে। কৃতিত্বের পুরস্কার স্বরূপ জর্ডান থেকে তাকে ভূষিত করা হয় ‘হুসাম-ই-ইস্তিকলাল’ সম্মাননায়।

এই ঘটনার মাত্র দুই দিন পর, ৭ জুন ১৯৬৭ ইরাকী বিমান বাহিনীতে নিয়োগ প্রাপ্ত হয়ে পশ্চিম ইরাকী এয়ার ফিল্ড H-3 এ তিনি অবস্থান করা কালে, ইসরাইলী জঙ্গি জেট এয়ার ফিল্ড H-3 আক্রমণ করে। আকস্মিক আক্রমণে ইরাকি এয়ারফোর্স বিপর্জস্ত ।ইসারায়েলি ক্যাপ্টেন ড্রোর একের পর এক ইরাকি বিমানের ভবলীলা সাংগ করে চলেছে । তার সাথে সঙ্গী হিসাবে আছে আরেক ইজ্রায়েলি ক্যাপ্টেন গোলান । এই অবস্থায় আকাশে উড়াল দেয় সাইফুল আজম ।

ইরাকী দলের সামনে ছিল ইসরাইলের চারটি ‘ভেটোর বোম্বার’ ও দু’টি ‘মিরেজ থ্রিসি’ জঙ্গী বিমান। একটি ‘মিরেজ থ্রিসি’ বিমানে ছিলেন ইসরায়েলি ক্যাপ্টেন গিডিওন ড্রোর। উড়াল দেবার কিছুক্ষণের মাঝেই তার উইংম্যান কেও ফেলে দেয় ইজরায়েলী ক্যাপ্টেন ড্রোর । কিন্তু সাইফুল আজম অন্য ধাতুতে গড়া । পরক্ষণেই এর জবাব দেন আজম। তার অব্যর্থ টার্গেটে পরিণত হয় দ্রোরের ‘মিরেজ থ্রিসি’। সে আঘাতের পর বাঁচার যখন আর উপায় নেই তখন ক্যাপ্টেন  বিমান থেকে ইজেক্ট করে ধরা দেন, আটক হন যুদ্ধবন্দী হিসেবে।

এদিকে চারটি ‘ভেটোর’ বোমারু বিমানের সামনেও বাধা হয়ে দাঁড়ায় আজমের হকার হান্টার। ঈগলের সুতীক্ষ্ণ নজরের মতো আযমের নির্ভুল নিশানায় ধ্বংস হয় একটি ভেটোর বিমান। Vautour Bomber টির ছোট্ট কিছু ভগ্নাবশেষ সাইফুল আজমের Hunter এ গেঁথে থাকতে দেখা যায়, যা থেকে তার সহকর্মীরা বুঝতে পারেন তিনি বিমানটিকে আকাশেই গুড়িয়ে দিয়েছেন)। ইরাকি বাহিনীর হয়ে অনন্য যুদ্ধ নৈপুণ্যের জন্য তাকে ভূষিত করা হয় ‘নাত আল-সুজাহ’ সামরিক সম্মাননায়।

এ দিকে তিনি ছিলেন বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানের প্রশিক্ষক ! ১৯৭১ সালে যখন যুদ্ধ শুরু হয় তখন তিনি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেবার। কিন্তু পাকিস্তানী বাহিনী  জানত এই অকুতোভয় যোদ্ধার দেশপ্রেমের কথা। তার জাতীয়তাবোধ এবং দেশপ্রেম অবশ্যই পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য ভয়ের কারণ ছিল। তার অব্যর্থ নিশানা যাতে নিজেদের উপর আঘাত হয়ে আসতে না পারে সেজন্য ‘৭১ সালের শুরুতেই আজমকে ‘গ্রাউন্ডেড’ করে রাখে বিমান বাহিনী।

জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হবার আগে আগেই আজম নিজেও পাকিস্তান এয়ারলাইন্স ও বিমান বাহিনীতে তার সহকর্মী বাঙালিদের সাথে গোপনে পরিকল্পনা করছিলেন করাচি থেকে পাকিস্তান এয়ারলাইন্সের একটি জেট বিমান ছিনতাই করার। পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্চের ৬ তারিখেই তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানকে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন ঢাকায়। দুর্ভাগ্য, পরবর্তীতে সে পরিকল্পনা আর সফল করতে পারেন নি।

এ দিকে মতিউর রহমানের বিমান ছিনতাইয়ের পরিকল্পনাও আজমের সাথে আলোচনা করেছিলেন। মতিউর রহমান ‘টি-৩৩’ জঙ্গী বিমান নিয়ে পালিয়ে যাবার সময় মতিউর শহীদ হবার পর পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আজমকে রিমান্ডে নেয় এবং টানা ২১ দিন তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে।  সামরিক আইনে ফায়ারিং স্কোয়াডে যেতে পারতেন তিনি।  কিন্তু সামরিক সম্মাননা প্রাপ্ত খ্যাতিমান বৈমানিক হওয়ার কারণে তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত থেকে বিরত থাকে পাকিস্তান। একই সাথে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান না করার জন্য পাকিস্তান বিমান বাহিনী প্রধান এয়ার মার্শাল এ রহিম খান ও জর্ডানের বাদশাহ হুসেইনের অনুরোধ ছিল বলেও ধারণা করা হয়।

অফিসারের পাশাপাশি বেশি কিছু এয়ারম্যানও ছিল। তাদের মধ্যে একজন শহীদ (শহীদ) সার্জেন্ট জহুরুল হক। তিনি একজন গ্রাউন্ড কম্ব্যাট প্রশিক্ষক (GCI) ছিলেন, ড্রিল পরিচালনার জন্য সুপরিচিত একটি নাম। মাতৃভূমির জন্যে তার খুব দুশ্চিন্তা ছিল। তাকে  ঐতিহাসিক ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’ অভিযুক্ত করা হয়। ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারী ১৫ তারিখ নির্যাতনের ফলে মৃত্যু বরন করেন। তার স্বীকৃতি স্বরুপ বাংলাদেশ বিমানবাহিনী চট্টগ্রামে সার্জেন্ট জহুরুল হক নামে একটি বেজের নাম করণ করে। এ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার অবদানের কথা বিবেচনা করে একটি হলের নাম করন করে।

পাকিস্তান বিমান বাহিনী ত্যাগ করে আসা বাঙালী অফিসার, ক্যাডেট ও বিমান সেনারা সেপ্টেম্বর ১৯৭১ পর্যন্ত স্থলযুদ্ধে অংশগ্রহন করেন। মোট প্রায় ৩৫ জন অফিসার ও ক্যাডেট এবং প্রায় ৫০০ বিমানসেনা পাকিস্তান পক্ষ ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন। এই সব বিমান বাহিনীর সদস্যরা যদিও স্থলযুদ্ধে খুবই বিরোচিত ভূমিকা রাখছিলেন তবুও তাদের মধ্যে একটি স্বাধীন বিমান বাহিনী গঠনের চেতনা খুব প্রবল ভাবে কাজ করছিল। এই চেতনা নিয়েই কিছু সংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা পাইলট ভারতীয় বিমান বাহিনী, ভারতীয় সরকার এবং বাংলাদেশ ফোর্সেস (বিডি এফ) এর সাথে বিভিন্ন রকমের আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।

১৯৭১ সালের সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বাংলার আকাশ রাখিব মুক্ত’ এই দৃপ্ত শপথে বলিয়ান বাংলাদেশ বিমান বাহিনী বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় আসামের দিমাপুরে ২৮শে সেপ্টেম্বর ১৯৭১ সালে গঠিত হয়। শুরুতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর জনবল ছিল পাকিস্তান বিমান বাহিনীর পক্ষত্যাগী বাঙালি কর্মকর্তা ও বিমানসেনারা ।

স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদ, সাবেক পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সাহাবুদ্দিন আহমেদ, সাবেক পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সাত্তার, সাবেক পিআইএ পাইলট ক্যাপ্টেন সরফুদ্দিন এবং সাবেক কৃষিবিভাগের পাইলট ক্যাপ্টেন আকরাম আহমেদ এর উদ্যোগে ভারতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী সংগঠিত হয়।  এই সীমিত সম্পদ নিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়। বিমান বাহিনী প্রধান হিসাবে মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ কে খন্দকারকে নিয়োগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যোগ দেয়া কর্মকর্তাদের ভারতীয় বিমান বাহিনী যুদ্ধবিমানের পাইলট হিসেবে প্রশিক্ষণ দেয়। ভারত সরকার অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারকে একটি স্বাধীন বিমান বাহিনী গঠনের জন্য আমেরিকায় তৈরী ১টি পুরানো ডিসি-৩ বিমান, কানাডার তৈরী ১টি অটার বিমান এবং ফ্রান্সের তৈরী ১টি এ্যালুয়েট-৩ হেলিকপ্টার দেয়। মাত্র এই তিনটি বিমান নিয়েই বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর যাত্রা শুরু হয়।

ভারতের আসামের ডিমাপুরের একটি পরিত্যাক্ত রানওয়েতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর  ব্যবহারের জন্যে ভার বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর টেকনিশিয়ানরা উপহার পাওয়া বিমানগুলো রূপান্তর ও আক্রমণ উপযোগী করে তোলার কাজ শুরু করে। ডাকোটা বিমানটিকে ৫০০ পাউন্ড বোমা বহনে উপযোগী করে তোলা হয়। টুইন অটারটির প্রতি পাখার নিচে ৭টি করে রকেট যুক্ত করা হয়। পাশাপাশি এটি ১০টি ২৫ পাউন্ড ওজনের বোমাও বহন করতে পারত যা একটি দরজা দিয়ে হাত দিয়ে নিক্ষেপ করতে হত। আর অ্যালুয়েট হেলিকপ্টারের সামনে একটি .৩০৩ ব্রাউনিং মেশিন গান এবং দুই পাইলন থেকে ১৪টি রকেট নিক্ষেপের ব্যবস্থা করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে বিমান বাহিনীর ইতিহাস

নব গঠিত বিমান বাহিনীর দেশপ্রেমিক পাইলট এবং টেকনিশিয়ান, তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার সুলতান মাহমুদের যোগ্য  নেতৃত্বে  ‘কিলো ফ্লাইট’ নামে একটি উড়ন্ত ইউনিট গঠন করেন, পরে এয়ার ভাইস মার্শাল ও বিমান বাহিনী প্রধান পদে যোগ দেন। তবে, চট্টগ্রাম ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রায় সফল বিমান হামলা চালানোর জন্য ঐতিহাসিক ‘কিলো ফ্লাইট’-এর পাইলট সফলভাবে যাত্রা শুরু করেছে।

কিলো ফ্লাইটের অস্তিত্ব বিডি এফ এবং গোটা কয়েকজন গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিত্ব ছাড়া আর কেউ জানতেন না। কিলো ফ্লাইটে বিমান বাহিনীর পাইলটদের পাশাপাশি বেশ কয়েকজন পি আই এ এবং পান্ট প্রটেকশনে পাইলট এসে যোগ দেন। বিভিন্ন সেক্টর হতে যুদ্ধরত মোট ৫৮ জন বিমান সেনাকে এই ফ্লাইটে ডেকে নিয়ে আসা হয়।  এই ফ্লাইট, ঢাকা, চট্টগ্রাম, লালমরিহাট এলাকায় মোট ৫০টি অভিযান সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করে। এদের মধ্যে মোগলহাটে (১৫ অক্টোবর ৭১), লালমনিরহাট ও ঠাকুরগাঁয়ে (১৬ অক্টোবর ৭১), চৌগাছায় (২১ নভেম্বর ৭১), গোদনাইল ও পতেঙ্গায় (৩ ডিসেম্বর ৭১), সিলেটে (৪ ডিসেম্বর ৭১), জামালপুওে (৫ ডিসেম্বর ৭১), মেঘনা নদীতে (৬ ডিসেম্বর ৭১), সিলেটে (৭ ডিসেম্বর ৭১) এবং নরসিংদীতে (১১ ডিসেম্বর ৭১) বিমান হামলা বিশেষ উল্লেখযোগ্য।

মুক্তিযুদ্ধের সময়  বাংলার অনন্য মহান পুত্র ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান তার মাতৃভূমির জন্য প্রাণ দিয়েছিলেন। মহান  মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য পাকিস্তানকে একটি টি -33 উড়োজাহাজ দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় তিনি ভারতীয় সীমান্ত থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে  তার বিমান বিধ্বস্ত হয়।

মতিউর রহমান একটি জঙ্গি বিমান দখল এবং সেটা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। তিনি বিমান দখলের জন্য ২১ বছর বয়সী রাশেদ মিনহা্জ নামে একজন শিক্ষানবীশ পাইলটের উড্ডয়নের দিন ( ২০ই আগস্ট,১৯৭১) টার্গেট করেন। মতিউর রহমান পরিকল্পনা করেন মিনহাজ কন্ট্রোল টাওয়ারের অনুমতি পেয়ে গেলে তিনি তাঁর কাছ থেকে বিমানটির নিয়ন্ত্রন নেবেন।

পূর্ব পরিকল্পনা অনুসারে অফিসে এসে শিডিউল টাইমে গাড়ি নিয়ে চলে যান রানওয়ের পূর্ব পাশে ৷ দুই সিটের প্রশিক্ষন বিমান টি ৩৩। মিনহাজ যখন বিমানটি নিয়ে দ্বিতীয় বারের মত একক উড্ডয়নের কন্ট্রোল টাওয়ার ক্লিয়ারেন্স পায় তখন মতিউর রহমান হঠাৎ বিমানটির সামনে এগিয়ে যান এবং ইশারা দিয়ে রশীদকে বুঝালেন বিমানের পেছনের দিকে সমস্যা হয়েছে।

সমস্যা দেখবার জন্য রশীদ বিমানের উপরের ঢাকনা (কেনোপি) খুললে, ওকে কিছু বুঝতে না দিয়ে দ্রুত লাফ দিয়ে বিমানের ভেতরে ঢুকে পড়েন মতিউর রহমান। মুহুর্তকাল দেরী না করে হাতের ক্লোরোফরম দেয়া রুমাল রশীদের নাকে চেপে ধরলেন মতিউর, অজ্ঞান হয়ে যায় রশীদ। তবে  জ্ঞান হারানোর আগে রাশেদ মিনহাজ কন্ট্রোল রুমে জানাতে সক্ষম হন তিনিসহ বিমানটি হাইজ্যাক হয়েছে। জ্ঞান রশীদকে পেছনের সিটে ঠেলে পাঠিয়ে, বিমানটি দ্রুত ভারত সীমান্তের দিকে চালিয়ে নিতে যাচ্ছিলেন মতিউর।

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান

বীরশ্রেষ্ঠ ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমান

বিমানটি ছোট পাহাড়ের আড়ালে থাকায় কেউ দেখতে না পেলেও কন্ট্রোল টাওয়ার মিনহাজের বার্তা শুনতে পায় এবং রাডারে বিমানের অবস্থান বুঝে অপর চারটি জঙ্গি বিমান মতিউরের বিমানকে ধাওয়া করে। মৃত্যু আসন্ন জেনেও মতিউর রহমান বিমানটি নির্ধারিত সীমার নিচে চালিয়ে রাডার কে ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশের অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের আসার চেষ্টা করেন।

ভারত সীমান্ত থেকে আর মাত্র কয়েক মিনিট বাকি। এসময় রশীদের জ্ঞান ফিরে আসে। শুরু হয় ধস্তাধস্তি। তবু সর্বশক্তি দিয়ে সবকিছু ঠিক রাখার চেষ্টা করলেন মতিউর। কিন্তু না, আর পারলেন না। ধস্তাধস্তির এক পর্যায়ে রশীদ ইজেক্ট সুইচ চাপলে মতিউর বিমান থেকে ছিটকে পড়েন। কিন্তু প্যারাসুট না থাকাতে তিনি মাটিতে পড়ে শহীদ হন। তাঁর মৃতদেহ বিমান বিধ্বস্তের স্থান হতে প্রায় আধ মাইল দূরে পাওয়া যায়।

যশোরের বিএএফের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অফিসারদের প্রশিক্ষণ বেস তাকে (বি.এ.এফ. বেস মতিউর রহমান) নামে নামকরণ করা হয়েছে এবং জাতি  তাকে সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় শিরোনাম ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করেছে, এইসব মহান ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি, অনেকের মধ্যে, বিএএফ দুটি সেক্টর কমান্ডার উল্লেখ আছে তারা তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার খাদেমুল বাশার, যিনি পরে এয়ার ভাইস মার্শাল এবং বিমান বাহিনী প্রধান ছিলেন এবং অন্য কর্মকর্তা ছিলেন তৎকালীন স্কোয়াড্রন লিডার হামিদুল্লাহ যিনি পরে উইং কমান্ডার ছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধে বিমানবাহিনীর ২৩ জন সদস্য শহীদ হন।  মহান মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট মতিউর রহমানকে মুক্তিযুদ্ধের সর্বোচ্চ খেতাব বীরশ্রেষ্ঠ উপাধিতে ভূষিত করা হয়। এছাড়া ০৬ জনকে বীর উত্তম, ০১ জনকে বীর বিক্রম এবং ১৫ জনকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়।

২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে স্বাধীনতা পদক প্রদান করা হয়।

১৯৭১ পরবর্তী: বাংলাদেশ বিমান বাহিনী

মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিকে ভারতীয় বিমান বাহিনীর বোমাবর্ষণের ফলে পাকিস্তান বিমান বাহিনীর বেশির ভাগ বিমান ভূমিতে আটকা পরে। আত্মসমর্পণের পূর্বে পাকিস্তানি বাহিনী এসব বিমানের বেশিরভাগই ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করে রেখে যায়। পরবর্তীতে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর বিমান সেনারা  কিছু সংখ্যক বিমানকে মেরামত করে উড্ডয়ন সক্ষম করে তোলে।

স্বাধীনতার পর থেকে বিমান বাহিনী ব্যাপক পরিবর্তন এবং সম্প্রসারণ করেছে। আকাশ শক্তি এবং আকাশ প্রতিরক্ষা উভয় উপর মনোযোগ দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন যথোপযুক্ত স্থানে বেজ ও ইউনিট স্থাপন করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর বিমান বাহিনী তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বড় ধরনের অনুদান পায় যার মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিল ১০টি মিগ-২১এমএফ এবং ২টি মিগ-২১ইউএম যুদ্ধ বিমান।  ১৯৮০ এর দশকের শেষ দিকে পাকিস্তান কয়েক স্কোয়াড্রন এফ-৬ যুদ্ধবিমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনীকে উপহার হিসেবে প্রদান করে। ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী রাশিয়া থেকে ৮টি চতুর্থ প্রজন্মের মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে। ক্রমান্বয়ে বাংলাদেশ বিমানবাহিনী আজকের এই অবস্থানে এসে পৌঁছায়।

ফোর্সেস গোল ২০৩০

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর উন্নয়নের লক্ষে বর্তমানে ফোর্সেস গোল ২০৩০ নামক একটি উচ্চাভিলাষী আধুনিকায়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পথে চলছে। ফোর্সে গোল ২০৩০ অনুসারে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী আকাশ প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী বাহিনী হিসেবে গড়ে উঠছে। এই পরিকল্পনার অধীনে বিমান সক্ষমতা এবং ভূমি-ভিত্তিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা দুইটিই শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। এর ধারাবাহিকতায়  ২০১১ সালে কক্সবাজারে নতুন বিমান ঘাটি স্থাপন করা হয়েছে। ২০১৩ সালে ঢাকায় স্থাপিত হয়েছে বঙ্গবন্ধু বিমানঘাটি। ঘাটি প্রতিরক্ষা ও পাইলট উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গঠিত হয়েছে বিশেষায়িত ইউনিট স্কোয়াড্রন ৪১।

২০১০ সাল থেকে বিমান বাহিনীতে ১৬টি এফ-৭বিজিআই যুদ্ধ বিমান, ১৬ টি উচ্চতর জেট প্রশিক্ষণ বিমান, ৯টি কে-৮ প্রাথমিক জেট প্রশিক্ষণ বিমান, ৩টি এল-৪১০ পরিবহণ প্রশিক্ষণ বিমান এবং ২৩টি পিটি-৬ প্রাথমিক প্রশিক্ষণ বিমান  যুক্ত হয়েছে। একই সময়ে আরও যুক্ত হয়েছে ১৬টি এমআই-১৭১এসএইচ যুদ্ধ হেলিকপ্টার,  ২টি এডব্লিউ-১৩৯ সামুদ্রিক উদ্ধার ও অনুসন্ধান হেলিকপ্টার এবং ২টি এডব্লিউ-১১৯কেএক্স প্রশিক্ষণ হেলিকপ্টার।

২০১১ সালে এফএম-৯০ স্বল্প পাল্লার বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয়ের মধ্য দিয়ে বিমান বাহিনী ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা অর্জন করে। এখন পর্যন্ত বিমান বাহিনী দুই রেজিমেন্ট এই ক্ষেপণাস্ত্র ক্রয় করেছে। ইতোমধ্যে বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয়েছে জেওয়াই-১১বি, জেএইচ-১৬, ওয়াইএলসি-৬ এবং ওয়াইএলসি-২ রাডার ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর

আগারগাঁও-এ ২০১৪ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে বাংলাদেশের প্রথম বিমান জাদুঘর কার্যক্রম শুরু করে। যদিও বিমান বাহিনির ওয়েব সাইটে প্রাথমিকভাবে জাদুঘরের  যাত্রা ১৭ জুন ১৯৮৭ সাল বলা হয়েছে। মূলত ২০১৪ সালে জনসাধারনের জন্যে জাদুঘর খুলে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর গৌরবময় ইতিহাস তুলে ধরতে আগারগাঁয়ের আইডিবি ভবনের পূর্ব পাশে তেজগাঁও বিমানবন্দর সংলগ্ন স্থানে স্থাপন করা হয়েছে বাংলাদেশ বিমান বাহিনী জাদুঘর (Biman Bahini Jadughar)। এখানে এসে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে ব্যবহৃত ঐতিহাসিক বিমান ও হেলিকপ্টারসহ নানা নিদর্শন কাছে থেকে দেখার সুযোগ পান দর্শনার্থীরা।

পুরো জাদুঘর এলাকার পরিকল্পিত এবং নান্দনিক নকশা ও বিন্যাসে দারুণ পেশাদারি ছোঁয়া  দৃষ্টিগোচর হয় । বিমান বাহিনী সামরিক জাদুঘরটি মূলত বিভিন্ন সময়ের হেলিকপ্টার ও বিমান দিয়েই সাজানো হয়েছে। মোট ১৯টি বিমান, ২টি হেলিকপ্টার ৩টি রাডার প্রদর্শিত হয়েছে।  উল্লেখযোগ্য বিমানগুলো হলঃ

বলাকাঃ বলাকা বাংলাদেশের প্রথম যাত্রীবাহী বিমান। রাশিয়ার তৈরি এই বিমানটি বাংলাদেশে আসে ১৯৫৮ সালে।

এয়ার টুওরারঃ ট্রেইনিংয়ে জন্য এই বিমান ব্যবহার করা হয়। ১৯৯৭ সালে নিউজিল্যান্ডের তৈরি এই বিমান বাংলাদেশ বিমান বাহিনিতে যোগ হয়।

পিটি-৬ঃ ১৯৮৫ সালে চিনের তৈরি এই বিমানটি বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে যুক্ত হয়।

ফুগাসি এম-১৭০ঃ ফ্রান্সে ১৯৬০ সালে তৈরি করা এই বিমানটি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীতে যুক্ত হয় ১৯৯৭ সালে। গ্লাইডারঃ বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর আকাশ অভিজ্ঞতার জন্য জার্মানির দেওয়া এই বিমানটি বাংলাদেশে আনা হয় ১৯৮২ সালে।

এয়ারটেক কানাডিয়ান ডিএইচ ৩/১০০০ঃ কানাডার তৈরি এই বোমারু বিমানটি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে চট্টগ্রাম সুমদ্র বন্দরে সফল অভিযান পরিচালনা করে।

হান্টার বিমানঃ মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত বাংলাদেশকে ভূমি শত্রু থেকে রক্ষা করতে এই বিমানটি ব্যবহার করে। ভারতীয় বিমানবাহিনী বাংলাদেশ বিমানবাহিনীকে এই বিমানটি উপহার দেয়।

সম্প্রতি ভারত সরকার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত ডাকোটা বিমানটি বাংলাদেশকে উপহার দিয়েছে।

জাদুঘরের দক্ষিণে বেশ সুন্দর একটি ‘ফুড কোর্ট’ আছে। আছে একটি রুফটপ রেস্তরাঁও। বিমান বাহিনীর বিবিধ দ্রব্যাদি নিয়ে ‘নীলাদ্রি’ নামে একটি স্যুভেনিয়র শপও চোখে পড়বে। শিশুদের জন্য আছে বিভিন্ন রাইড আর জিরাফ, শিম্পাঞ্জি, হরিণসহ নানা রকম পশু-পাখির প্রতিকৃতি নিয়ে ‘স্কাই পার্ক’। গোলাকৃতির ঘরে লেজার-শো দেখার ব্যবস্থা আছে। এছাড়াও ব্যাটারি চালিত বোটে চড়ার অভিজ্ঞতাও নিতে পারবেন।

বিমান বাহিনী জাদুঘরের সময়সূচীঃ

বিমান বাহিনী জাদুঘর সোম থেকে বৃহস্পতিবার বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এবং শুক্র থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রবিবার সাপ্তাহিক বন্ধ।২০ টাকা মূল্যের টিকেট সংগ্রহ করে জাদুঘরে প্রবেশ করা যায়। এছারাও ৩০ টাকার টিকেটের বিনিময়ে ভেতরের হেলিকাপ্টার বা বিমানে উঠা যায়।

 

তথ্য সূত্রঃ

১। https://www.baf.mil.bd/

২। http://www.afd.gov.bd

৩। https://bn.wikipedia.org/wiki/বাংলদেশ_বিমান_বাহিনী

৪। নানা ওয়েব পোর্টাল

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক