4

ক্রিকেটের বরপূত্রঃ ব্রায়ান লারা

ব্রায়ান লারা, ক্রিকেটপ্রেমীদের জন্য একটি অতি পরিচিত ও সম্মানিত একটি নাম, “ক্রিকেটের বরপূত্র” যার উপাধি, তার পুরো নাম হচ্ছে “ব্রায়ান চার্ল্‌স লারা”। তিনি ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দের ২ মে তারিখে ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর স্যান্টা ক্রুজে জন্মগ্রহণ করেন। ব্রায়ান লারাকে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ ব্যাট্‌স্‌ম্যানদের একজন হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি টেস্ট ক্রিকেট ব্যাট্‌স্‌ম্যান রেটিং-এ বহুবার ১ নং ব্যাট্‌স্‌ম্যান হয়েছেন। টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাটিং-এর অনেক রেকর্ডই তার। তিনিই একমাত্র ব্যাট্‌স্‌ম্যান যিনি ক্রিকেটে কুয়ান্টিপল সেঞ্চুরী (পাঁচশ’ রান) [ফার্স্ট-ক্লাস ক্রিকেটে] এবং কুয়াড্রপল সেঞ্চুরী (চারশ’ রান) [আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে] করেছেন।

এক নজরে ব্রায়ান লারা

পুরো নাম – ব্রায়ান চার্ল্‌স লারা
জন্ম – ১৯৬৯ সালের ২ মে, ত্রিনিদাদের স্যান্টা ক্রুজে
নিকনেম – দ্য প্রিন্স
উচ্চতা – ৫ ফুট ৮ ইঞ্চি (১.৭৩ মিটার)
ব্যাটিং স্টাইল – বা-হাতি
বোলিং স্টাইল – ডান হাতি লেগ ব্রেক
ভূমিকা – মিডল অর্ডার ব্যাট্‌স্‌ম্যান

জীবনের প্রথম ধাপ

ওয়েস্ট ইন্ডিজের এই অনবদ্য ক্রিকেট খেলোয়ার তার পরিবারের ১১ ভাই-বোনের মধ্যে দশম ছিলেন। লারার বাবা বান্টি এবং বড় বোন অ্যাগনেস সাইরাস লারাকে ছয় বছর বয়সেই স্থানীয় হার্ভার্ড কোচিং ক্লিনিকে ভর্তি করে দেন। ফলে লারার পক্ষে ভালো ব্যাটিং শিখার কোনো সুযোগ পাওয়া সম্ভব হয় নি। লারার প্রথম স্কুল ছিলো “সেন্ট জোসেফ’স রোমান ক্যাথলিক প্রাইমারী”। এরপর তাকে “সান-জুয়ান সেকেন্ডারী স্কুলে” ভর্তি করা হয়। এক বছর পর, চৌদ্দ বছর বয়সে তিনি “ফাতিমা কলেজে” ভর্তি হন, যেখানে তিনি ক্রিকেট ক্যারিয়ার শুরু করেন কোচ মিঃ হ্যারি রামদাসের অধীনে। চৌদ্দ বছর বয়সেই তিনি স্কুলবয়েজ লীগে ৭৪৫ রান (গড় প্রতি ইনিংসে ১২৬.১৬ রান) সংগ্রহ করেন। যা তাকে ত্রিনিদাদের অনুর্ধ্ব-১৬ জাতীয় দলে ডাক পাইয়ে দেয়। ১৫ বছর বয়সে তিনি তার প্রথম ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান অনুর্ধ্ব-১৯ টুর্নামেন্টে অংশগ্রহণ করেন এবং সেই বছরেই তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের অনুর্ধ্ব-১৯ জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দেন। তিনি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগো-র জুনিয়র ফুটবল এবং টেবিল-টেনিস খেলতেন কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে তার সাফল্যের পথ ক্রিকেটই। তিনি তার পথিকৃৎ হিসেবে ভাবতেন গর্ডন গ্রিনিজ, ভিভ রিচার্ড্‌স্‌, রয় ফ্রেডরিক্‌সকে এবং তাদেরকেই অনুসরণ করতেন।

 

  • ফার্স্ট-ক্লাস ক্যারিয়ার

১৯৮৭ সাল ছিলো সাফল্যের অন্যতম একটি সাল লারার জন্য। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ইয়োথ চ্যাম্পিয়নশিপে তিনি আগের বছরে কার্ল হুপারের গড়া ৪৮০ রানের রেকর্ড ভেঙ্গে ৪৯৮ রানের নতুন রেকর্ড গড়েন। ১৯৮৮-র জানুয়ারীতে লারা তার প্রথম ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচ খেলেন ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর হয়ে লিওয়ার্ড আইল্যান্ডের বিপক্ষে। তার দ্বিতীয় ফার্স্ট-ক্লাস ম্যাচেই তিনি ৯২ করেন বারবাডোসের বিপক্ষে, ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই কিংবদন্তী জোয়েল গার্নার এবং ম্যালকম মার্শালের দুরন্ত আক্রমণের বিপক্ষে। জাতীয় দলের ডাক পেয়েও তাকে পিছাতে হয় তার বাবার মৃত্যুর কারণে। ১৯৮৯ সালে তিনি জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজ বি দলের নেতৃত্ব দেন। ১৯৯০ সালে তিনি ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগোর সর্বকনিষ্ঠ অধিনায়কের সম্মান পান এবং দলকে গেডেস গ্র্যান্ট শিল্ড জিতে এনে দেন।

ব্যাটিং> ম্যাচ – ২৬১ (ইনিংস – ৪৪০), রান – ২২১৫৬, গড় – ৫১.৮৮, সেঞ্চুরী – ৬৫, হাফ-সেঞ্চুরী – ৮৮, সর্বোচ্চ – ৫০১(অপরাজিত)
বোলিং -> ম্যাচ – ২৬১, ওভার – ৮৫.৪, রান – ৪১৬, গড় – ১০৪.০০, ইকোনমি গড় – ৪.৮৫, উইকেট – ৪
সবচেয়ে ভালো বোলিং ফিগার – ১ উইকেট ১ রান দিয়ে
ফিল্ডিং -> ৩২০ টি ক্যাচ।

 

  • লিস্ট-এ ক্যারিয়ার

ব্যাটিং -> ম্যাচ – ৪২৯ (ইনিংস – ৪১১), রান – ১৪৬০২, গড় – ৩৯.৬৭, সেঞ্চুরী – ২৭, হাফ-সেঞ্চুরী – ৮৬, সর্বোচ্চ – ১৬৯
বোলিং -> ম্যাচ – ৪২৯, ওভার – ২২.২, রান – ১৪৯, গড় – ২৯.৮০, ইকোনমি গড় – ৬.৮৭, উইকেট – ৫, সবচেয়ে ভালো বোলিং ফিগার – ২ উইকেট ৫ রান দিয়ে
ফিল্ডিং -> ১৭৭টি ক্যাচ

 

তার ঘরোয়া দলসমূহ
১৯৮৭-২০০৮ -> ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোব্যাগো
১৯৯২-১৯৯৩ -> ট্রান্সভাল
১৯৯৪-১৯৯৮ -> ওয়ারউইকশায়ার
২০১০ -> সাউদার্ন রক্‌স্‌

 

  • আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার

টেস্ট
১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বরে আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে ব্রায়ান লারার আগমন। তার প্রথম প্রতিপক্ষ পাকিস্তান। পাকিস্তানের লাহোরের গাদ্দাফি স্টেডিয়ামে লারার অভিষেক হয়। সেই ম্যাচে লারা ১ম ও ২য় ইনিংসে ৪৪ ও ৫ রানে সাজঘরে ফেরেন। প্রায় ১৬ বছর টেস্ট খেলার পর এই বরপূত্র তার শেষ টেস্ট খেলেন ২০০৬ সালের ১ ডিসেম্বরে পাকিস্তানের সাথেই, সে ম্যাচে তিনি প্রথম ইনিংসে ০ তে উমর গুলের বলে বোল্ড ও দ্বিতীয় ইনিংসে ৪৯ রানে উমর গুলের বলে শোয়েব মালিকের তালুবন্ধি হন।

ব্যাটিং -> ম্যাচ – ১৩১ (ইনিংস – ২৩২), রান – ১১৯৫৩, গড় – ৫২.৮৮, স্ট্রাইক রেট – ৬০.৫১, হাফ-সেঞ্চুরী – ৪৮, সেঞ্চুরী – ৩৪টি, সর্বোচ্চ – ৪০০* (ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, ২০০৪) এবং ৬টি ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন।
বোলিং -> ম্যাচ – ১৩১, ওভার – ১০ রান – ২৮, গড় – , ইকোনমি গড় – , উইকেট – ০, সবচেয়ে ভালো বোলিং ফিগার – মেডেন ওভার।
ফিল্ডিং-> ম্যাচ – ১৩১ (২৪১ ইনিংস), ক্যাচ – ১৬৪।

ব্রায়ান লারা ১২টি আন্তর্জাতিক টেস্টে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। নিচের ছবিতে তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

ওয়ান-ডে ক্যারিয়ার
১৯৯০ সালের ৯ নভেম্বরে পাকিস্তানের জাতীয় স্টেডিয়াম, করাচীতে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পাকিস্তানের বিপক্ষে অভিষেক হয় ব্রায়ান লারার। সেই ম্যাচে ব্রায়ান লারা ২০ বল খেলে ১১ রানেই সাজঘরে ফেরেন ওয়াকার ইউনুসের বলে এল.বি.ডব্লিউ-এর ফাঁদে পড়ে। সেই ম্যাচে পাকিস্তান ৬ রানের জয় পায়। সে থেকেই শুরু হয় এই ক্রিকেট বরপূত্রের একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের যাত্রা। প্রায় ১৭ বছর এই কিংবদন্তী একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলে তার যাত্রা শেষ হয় ২১ এপ্রিল ২০০৭-এ, ইংল্যান্ডের সাথে ২০০৭ বিশ্বকাপের সুপার এইট পর্বে। সে ম্যাচে ৩৯ বল খেলে মাত্র ১৮ রানেই পিটারসেনের হাতে রান আউট হন।

ব্যাটিং->  ম্যাচ – ২৯৯ (ইনিংস – ২৯৬), রান – ১০৪০৫, গড় – ৪০.৪৮, স্ট্রাইক রেট – ৭৯.৫১, হাফ-সেঞ্চুরী – ৬৩, সেঞ্চুরী – ১৯, সর্বোচ্চ – ১৬৯ (শ্রীলংকার বিপক্ষে, ১৯৯৫ সালে) এবং ৩২ টি ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন।
বোলিং -> ম্যাচ – ২৯৯ ওভার – ৮.১, রান – ৬১, গড় – ১৫.২৫, ইকোনমি গড় – ৭.৪৬, উইকেট – ৪, সবচেয়ে ভালো বোলিং ফিগার – ৫ রান দিয়ে ২ উইকেট (ইংল্যান্ডের বিপক্ষে, ১৯৯৪)।
ফিল্ডিং -> ম্যাচ – ২৯৯ (ইনিংস – ২৯৬) ক্যাচ – ১২০।

ব্রায়ান লারা ৩০টি আন্তর্জাতিক একদিনের ক্রিকেটে ম্যান অফ দ্য ম্যাচ পুরস্কারে পুরস্কৃত হয়েছেন। নিচের ছকে তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে।

টুয়েন্টি২০
২০১০ সালের ১৩ই নভেম্বরে হারারে স্পোর্টস্‌ ক্লাব স্টেডিয়ামে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টুয়েন্টি২০ অভিষেক হয় ব্রায়ান লারার। সেই ম্যাচে লারা ৬৪ বলে ৬৫ রান করে রে প্রাইসের বলে মুতিজওয়ার তালুবন্ধি হন। টুয়েন্টি২০ ক্যারিয়ার তার খুব অল্পদিনের, মাত্র ৩টা ম্যাচ খেলেছেন।

ব্যাটিং -> ম্যাচ – ৩, রান – ৯৯, গড় – ৩৩.০০, স্ট্রাইক রেট – ১১৫.১১, হাফ-সেঞ্চুরী – ১, সেঞ্চুরী – ০, সর্বোচ্চ ৬৫।
বোলিং -> করেন নি।

ব্রায়ান লারা মোট ৪৭টি আন্তর্জাতিক টেস্ট ম্যাচে অধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন, এর মধ্যে ১০টিতে জয়ী, ২৬টি ড্র এবং ১১টিতে পরাজিত হয়েছেন। আর একদিনের ক্রিকেটে তিনি ১২৫টি ম্যাচে অধিনায়ক থাকেন, এর মধ্যে ৫৯টি জয়, ৫৯টি হার এবং ৬টি পরিত্যক্ত হয়।

 

  • অবসর গ্রহণ

২০০৭ সালের ১৯ এপ্রিল লারা সকল প্রকার ক্রিকেট থেকে অবসর নেয়ার ঘোষণা দেন। বলেন যে আগামী ২১ এপ্রিল, ২০০৭ এর ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার ম্যাচটিই হবে তার শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। কিন্তু ২০১০ সালে তিনি আন্তর্জাতিক টুয়েন্টি২০ খেলার জন্য প্রত্যাবর্তন করেন, পরে ২০১১ সালে আবার অবসর গ্রহণ করেন।

 

ব্যক্তিগত জীবন

লারা ডারহাম কাউন্টি ক্রিকেট ক্লাবের সাবেক অভ্যর্থক এবং ব্রিটিশ অন্তর্বাস মডেল লিনসি ওয়ার্ডের স্বামী। ২০০০ সালের শেষের দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের অস্ট্রেলিয়া সফরে ওয়ার্ড লারার অর্ধাঙ্গিনী হন। তার বড় মেয়ের নাম সিডনী এবং ছোট মেয়ের নাম টায়লা।তার পিতা ১৯৮৯ সালে হার্ট অ্যাটাকে এবং মাতা ২০০২ সালে ক্যান্সারে মারা যান। লারার সাথে ত্রিনিদাদের নামকরা ব্যবসায়ী ওয়েন আরমোগ্যানের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিলো।
২০০৯ সালে লারা ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটের উন্নতির জন্য অর্ডার অফ অস্ট্রেলিয়ার(AM) অবৈতনিক সদস্য হন।

 

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্রায়ান লারার অবিস্মরণীয় ৪০০* রানের ইনিংসের ম্যাচটির স্কোরকার্ড ->

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

আসাদুজ্জামান নূর অন্তর
 

"আসাদুজ্জামান নূর" শব্দ দু'টোর আভিধানিক অর্থ দাঁড়ায় "কালের সিংহ মানে সময়ের বীর, আলো/ আলোপ্রাপ্ত/ আলোকিত বা আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতের আলোয় আলোকিত"... জানি না আমি তেমন কিনা.. আশায় আছি, এক প্রানবন্ত ভবিষ্যতের.. ফেসবুকে, টুইটারে, গুগল প্লাসে আমি