মধুর উপকারিতা – ৩০ টি দারুণ উপকার যা আপনার জানা উচিৎ

মধু একটি খুব উপকারী খাদ্য ও ওষুধ। শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক। মধু মানুষের জন্য আল্লাহ প্রদত্ত এক অপূর্ব নেয়ামত। স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং যাবতীয় রোগ নিরাময়ে মধুর গুণ অপরিসীম।

মধু একটি খুব উপকারী খাদ্য, পন্য ও ঔষধ। জন্মের পর নানা দাদীরা মখে মধু দেয় নাই এমন লোক খুঁজে পাওয়া কঠিন। প্রাচীনকাল থেকে মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে, মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৌন্দর্য চর্চা সহ নানাভাবে মধুর ব্যবহার করে আসছে। শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক।

ওষুধ ও পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ নির্যাসকে প্রাচীনকাল থেকেই পারিবারিকভাবে ‘পুষ্টিকর ও শক্তিবর্ধক’ পানীয় হিসেবে সব দেশের সব পর্যায়ের মানুষ অত্যন্ত  গুরুত্ব সহকারে ব্যবহার করে আসছে। মধুতে যেসব উপকরণ রয়েছে তার মধ্যে প্রধান উপকরণ সুগার। সুগার বা চিনি আমরা অনেকই এড়িয়ে চলি। কিন্তু মধুতে গ্লুকোজ ও ফ্রুকটোজ এ দুটি সরাসরি মেটাবলাইজড হয়ে যায় এবং ফ্যাট হিসাবে জমা হয় না।

মধু  আসলে কি?

মধু মূলত একটি তরল আঠালো মিষ্টি জাতীয় পানীয়।  সাধারণত মৌমাছিরা ফুল থেকে  পুষ্পরস হিসেবে সংগ্রহ করে তাদের মৌচাকে জমা করে রাখে। পরবর্তীতে জমাকৃত এই পুষ্পরস প্রাকৃতিক নিয়মেই মৌমাছি বিশেষ প্রক্রিয়ায় মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মধুতে রূপান্তর হয়ে যায় এবং কোষ বদ্ধ অবস্থায় মৌমাছিরা মৌচাকে সংরক্ষণ করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে,

মধু হচ্ছে এমন একটি অগাজানোশীল মিষ্টি জাতীয় পদার্থ যা মৌমাছিরা ফুলের নেকটার অথবা জীবন্ত গাছপালার নির্গত রস থেকে সংগ্রহ করে মধুতে রূপান্তর করে এবং সুনির্দিষ্ট কিছু উপাদান যোগ করে মৌচাকে সংরক্ষণ করে।

এ দিকে  বাংলাদেশের জাতীয় মধু বোর্ডের সংজ্ঞা অনুযায়ী,

"মধু হল একটি বিশুদ্ধ পদার্থ যাতে পানি বা অন্য কোন মিষ্টকারক পদার্থ মিশ্রিত করা হয় নাই।"

খাটি মধু'র বৈশিষ্ট

মধু চিনির চাইতে অনেক গুণ মিষ্টি। তরল মধু নষ্ট হয় না, কারন এতে চিনির উচ্চ ঘনত্বের কারণে প্লাজমোলাইসিস প্রক্রিয়ায় ব্যাকটেরিয়া মারা যায়। প্রাকৃতিক বায়ুবাহিত ইস্ট মধুতে সক্রিয় হতে পারে না, কারন মধুতে পানির পরিমাণ খুব অল্প।

 প্রাকৃতিক, অপ্রক্রিয়াজাত মধুতে মাত্র ১৪% হতে ১৮% আর্দ্রর্তা থাকে। আর্দ্রর্তার মাত্রা ১৮% এর নিচে যতক্ষণ থাকে, ততক্ষণ মধুতে কোন জীবাণু বংশ বৃদ্ধি করতে পারে না। পাস্তুরাইয্ড মধুতে মধুর প্রাকৃতিক ঔষধি গুণাবলী হ্রাস পায়।

 তবে মনে রাখতে হবে যে, মধুর উপকার সঠিক ভাবে পেতে হলে অবশ্যই আপনাকে খাঁটি মধু নির্বাচন করতে হবে। যদিও খাঁটি মধু পাওয়া খুবই কষ্টসাধ্য তবে অসম্ভব নয়। আপনি আপনার এলাকা থেকে খাঁটি মধু সংগ্রহ করতে পারেন। খাটি মধুতে নিন্মোক্ত বৈশিষ্ট খুঁজে পাবেন। 

  • খাটি মধুতে কখনো কটু গন্ধ থাকে না।
  • মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকারক কোনো বিষাক্ত উপাদান প্রাকৃতিক গাছে থাকলেও তার প্রভাব মধুতে থাকে না।
  • মধু সংরক্ষণে কোনো পৃজারভেটিভ ব্যবহৃত হয় না। কারণ মধু নিজেই পৃজারভেটিভ গুণাগুণ সম্পন্ন পুষ্টিতে ভরপুর খাদ্য।
  • মধু উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত, নিষ্কাশন, সংরক্ষণ ও বোতলজাতকরণের সময় অন্য কোনো পদার্থের সংমিশ্রণ প্রয়োজন হয় না।
  • খাটি মধু পানির গ্লাসে ড্রপ আকারে ছাড়লে তা সরাসরি ড্রপ অবস্থায়ই গ্লাসের নিচে চলে যায়।

খাঁটি মধু যে ভাবে চিনবেন

আমরা বাজার থেকে সব মধু কিনে নিয়ে আসি সবগুলোই কি খাঁটি ? মধুতে প্রচুর ভেজাল দেওয়া হয়। মধুর মধ্যে সাধারণত ভেজাল হিসেবে পানি, চিনি ও আরও অনেক কিছু মেশানো হয়। আসুন দেখে নেওয়া যাক কিভাবে খাঁটি মধু চিনে নিবেন। 

ফ্রিজিং

মধু একটি কিছুতে নিয়ে ডিপ ফ্রিজে একদিন রেখে দিন। একদিন পর মধু বের করে দেখুন, যদি আসল মধু হয়, তাহলে এটি বরফ হয়ে জমবে না। যদি পুরোটা জমে যায় কিংবা কিছু অংশ জমে কিংবা নিচের অংশ জমে আসছে এমন হয়, তাহলে বুঝবেন যে এটিতে ভেজাল আছে। আসল মধু ঠান্ডায় জমে যায় না।

অগ্নি পরিক্ষা

এক টুকরা কাগজ নিন। কাগজের উভয় পিঠে মধু লাগিয়ে এবার একটি দেয়াশলাই নিয়ে কাগজে আগুন দিন। যদি আগুন ধরে তাহলে বুঝবেন এটি খাঁটি মধু। আর যদি আগুন না ধরে নিবে যায় সে ক্ষেত্রে এটি ভেজাল মধু। 

একটা সিগারেটের খালি পেকেট নিন, এর ভিতরে একটা রূপালী রঙের কাগজ আছে, এতে কিন্তু সাধারণতঃ  আগুন  ধরে না। কিছু মধু হাতে নিয়ে ঐ কাগজের এপিঠ অপিঠ ভাল করে ঘষে লাগান। যদি আগুন নিভে যায় তাহলে এটা ভেজাল মধু, আর যদি আগুন ধরে যায় তাহলে এটা আসল মধু। 

এর জন্য প্রথমেই আপনাকে যে কোন সাইন্স ইকুইপমেন্ট স্টোর থেকে মেথিলেটেড স্পিরিট কিনে আনতে হবে। পরিক্ষাটি সতর্কভাবে করবেন এবং হাত দিয়ে সরাসরি ধরবেন না। সমান পরিমানে মেথিলেটেড স্পিরিট এবং মধু নিতে হবে এবং নাড়তে থাকতে হবে। যদি দেখেন মধু তলানী হিসাবে জমা হচ্ছে, তাহলে বুঝবেন মধু আসল। আর যদি স্পিরিটের রং সাদাটে হয়ে আসে, তাহলে বুঝবেন মধুটি নকল। 

ব্লটিং পেপার পদ্ধতি

এই পরিক্ষার জন্য আপনাকে কোন সাইন্স স্টোর থেকে ব্লটিং পেপার কিনে আনতে হবে। ব্লটিং পেপারের উপরে এক ফোঁটা মধু নিন। যদি মধু ব্লটিং পেপারের ভিতরে আস্তে আস্তে ঢুকে যায় বা মিশে যায়, বুঝবেন এটি আসল মধু নয়। কারণ আসল মধু ব্লটিং পেপারকে ভেজায় না।

কলঙ্ক পরিক্ষা

পরিষ্কার সাদা কাপড়ে অল্প একটু মধু লাগিয়ে শুকিয়ে নিন। একটু পর কাপড়টি ধুয়ে ফেলুন। কাপড়ে দাগ থেকে গেলে বুঝতে হবে এই মধু নকল। আর কাপড়ে দাগ না থাকলে সেটা খাঁটি মধু। এছাড়াও একটু সময় নিয়ে যদি যাচাই করতে চান আপনার কেনা মধুটি আসল না নকল।

মেথিলেটেড স্পিরিট পদ্ধতি


দ্রাব্যতা পরীক্ষা

 এক গ্লাস পানি নিয়ে এর মধ্যে এক টেবিল চামচ পরিমাণ মধু নিন। খুব ধীরে ধীরে গ্লাসটি ঝাঁকাতে থাকুন । যদি মধু পানিতে পুরাপুরি দ্রবীভূত হয়ে যায় তবে তা ভেজাল মধু। আর মধু যদি পানিতে ছোট ছোট পিন্ডের আকারে থাকে তবে তা খাঁটি মধু।

পিঁপড়া পরীক্ষাঃ এক টুকরা কাগজের মধ্যে কয়েক ফোঁটা মধু নিন। তারপর যেখানে পিঁপড়া আছে সেখানে রেখে দিন। পিঁপড়া যদি মধুর ধারে কাছে না ঘেসে তবে তা খাঁটি মধু। আর পিঁপড়া যদি তা পছন্দ করে তবে মধুতে ভেজাল আছে।

পাউরুটি পরিক্ষা

মধু আসল না নকল তা বোঝার আরেকটি সহজ উপায় রয়েছে। কী সেই উপায়? একটা পাঁউরুটির টুকরো নিয়ে এক চামচ মধুর মধ্য়ে মেশান। যদি দেখেন পাঁউরুটিটা শক্ত হয়ে গেছে তাহলে বুঝবেন মধুটা আসল, তাতে কোনও ক্ষতিকর উপাদান নেই। কারণ নকল মধুতে জলের পরিমাণ বেশি থাকে, যে কারণে পাঁউরুটি ঢুবিয়ে রাখলে তা শক্ত না হয়ে গিয়ে উলটে নরম হয়ে যাবে।

এর রকম আরো বেশ কিছু পরিক্ষার মাধ্যমে আপনি মধু খাঁটি নাকি ভেজাল পরিক্ষা করতে পারবেন। 

সবচেয়ে সেরা মধু কোনটি ? 

আমরা বিভিন্ন উপায়ে মধু সংগ্রহ করে থাকি তবে নিউজিল্যাণ্ডের মানুকা হানি বাজারে প্রাপ্য সকল মধুর চেযে বেশী ঔষধি গুণ সম্পন্ন গণ্য করা হয়। সাধারানত মানুকা নামীয় এক প্রকার ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদের ফুল থেকে উৎপন্ন মধু “মানুকা হানি” নামেও পরিচিত।

মধুতে কি কি উপাদান রয়েছে?

মধুতে প্রায় ৪৫টি খাদ্য উপাদান থাকে। ফুলের পরাগের মধুতে থাকে ২৫ থেকে ৩৭ শতাংশ গ্লুকোজ, ৩৪ থেকে ৪৩ শতাংশ ফ্রুক্টোজ, ০.৫ থেকে ৩.০ শতাংশ সুক্রোজ এবং ৫-১২ শতাংশ মন্টোজ। আরো থাকে ২২ শতাংশ অ্যামাইনো এসিড, ২৮ শতাংশ খনিজ লবণ এবং ১১ ভাগ এনকাইম। এতে চর্বি ও প্রোটিন নেই। ১০০ গ্রাম মধুতে থাকে ২৮৮ ক্যালরি।

মস্কো বিশ্ববিদ্যালয়ে মধুর নমুনা পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, মধুতে অ্যালুমিনিয়াম, বোরন, ক্রোমিয়াম, কপার, লেড, টিন, জিংক ও জৈব এসিড (যেমন-ম্যালিক এসিড, সাইট্রিক এসিড, টারটারিক এসিড এবং অক্সালিক এসিড), কতিপয় ভিটামিন, প্রোটিন, হরমোনস, এসিটাইল কোলিন, অ্যান্টিবায়োটিকস, ফাইটোনসাইডস, সাইস্টোস্ট্যাটিক্স এবং পানি (১৯-২১%) ছাড়াও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদান রয়েছে। 

ভিটামিন যেমন- ভিটামিন সি বা অ্যাসকরবিক এসিড, ভিটামিন বি-১, বি-২, বি-৩, বি-৫, বি-৬, ভিটামিন-ই, ভিটামিন-কে, ভিটামিন-এ বা ক্যারোটিন ইত্যাদি বিদ্যমান। মধু এমন ধরনের ওষুধ, যার পচন নিবারক (অ্যান্টিসেপটিক), কোলেস্টেরলবিরোধী এবং ব্যাকটেরিয়াবিরোধী ধর্ম আছে। 

মধুর উপকারিতা

মধু চিকিৎসা বিজ্ঞান একটি অন্যতম উপাদান। মুধুকে বলা হয় সর্বরোগের ওষুধ। স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, সৌন্দর্য চর্চা- মধুর ব্যবহার সবখানে।

বিখ্যাত মুসলিম চিকিৎসক ইবনে সিনা তাঁর বিশ্বখ্যাত- Medical Test book The canon of medicine গ্রন্হে বহু রোগের প্রতিষেধক হিসেবে মধু ব্যবহারের সুপারিশ করেছেন। তিনি মধুর উপকারিতা সম্পর্কে বলেছেন, মধু আপনাকে সুখী করে, পরিপাকে সহায়তা করে, ঠান্ডার উপশম করে, ক্ষুধা বাড়ায়, স্মৃতিশক্তি বৃদ্ধি ও তীক্ষ্ম করে, জিহ্বা স্পষ্ট করে এবং যৌবন রক্ষা করে। নিম্নে মধুর কয়েকটি উপকারিতা বর্ণিত হলঃ

রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায়​

মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায় এবং শরীরের ভেতরে এবং বাইরে যে কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিরোধ করার ক্ষমতাও যোগান দেয়। মধুতে আছে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী উপাদান, যা অনাকাঙ্ক্ষিত সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে

মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য রক্ষায়

মুখগহ্বরের স্বাস্থ্য রক্ষায় মধু ব্যবহৃত  হয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। কারো যদি মুখের ঘায়ের জন্য গর্ত  হয়ে যায় তবে মধু  সেই গর্ত ভরাট করতে সাহায্য করে এবং সেখানে পুঁজ জমতে দেয় না ! মধু মিশ্রিত পানি দিয়ে গড়গড়া করলে মাড়ির প্রদাহ দূর হয়। আবার মধু দাঁতের ওপর ব্যবহার করলে দাঁতের ক্ষয়রোধ করে। দাঁতের ক্ষয় রোধের পাশাপাশি দাঁতে পাথর জমাট বাঁধা রোধ করে এবং দাঁত পড়ে যাওয়াকে বিলম্বিত করে। উপরন্তু, মধু রক্তনালিকে সম্প্রসারিত করে দাঁতের মাড়ির স্বাস্থ্য রক্ষা করে।  

রোগ প্রতিরোধশক্তি বাড়ায়

মধু শরীরের রোগ প্রতিরোধ শক্তি বাড়ায় এবং শরীরের ভেতরে এবং বাইরে যে কোনো ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ প্রতিহত করার ক্ষমতাও যোগান দেয়। গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে মধুতে রয়েছে উচ্চ শক্তি সম্পন্ন অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল এজেন্ট। এই এজেন্ট শরীরের ক্ষতিকর রোগ জীবাণুর বিরুদ্ধে লড়াই করে। মধুতে  থাকা ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধকারী উপাদান  অনাকাঙ্ক্ষিত সংক্রমণ থেকে দেহকে রক্ষা করে। ২০০৭ সালে সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যায়, সুপারবাগ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ প্রতিরোধে মধু অত্যন্ত কার্যকর। বিভিন্ন ভাইরাসের আক্রমণে বিভিন্ন রোগ প্রায়ই দেহকে দুর্বল করে দেয়। এসব ভাইরাস প্রতিরোধে মধু খুবই কার্যকর।

সাধারানত মধুতে আছে প্রচুর পরিমাণে মিনারেল, ভিটামিন ও এনজাইম যা শরীরকে বিভিন্ন অসুখ বিসুখ থেকে রক্ষা করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। এছাড়াও প্রতিদিন সকালে এক চামচ মধু খেলে ঠান্ডা লাগা, কফ, কাশি ইত্যাদি সমস্যা কমে যায়। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হলে প্রতিদিন হালকা গরম পানির সাথে মধু ও লেবুর রস মিশিয়ে খান।

চাইনিজরা প্রতিদিন দুধ ও মধু মিশিয়ে সেটা রুটি দিয়ে খেতো। এটা তাদের একটি অভ্যাসে পরিণত হয়েছিলো। আবার কেউ কেউ হালকা গরম পানিতে মধু দিয়ে অথবা চায়ের সাথে মধু দিয়ে খেতো। এখনও এই অভ্যাস অনেক চাইনিজদের মধ্যেই দেখা যায়।

কাটা-ছেড়া ও ক্ষত হলে মধু ব্যবহার

মধুকে প্রাকৃতিক এন্টিসেপ্টিক বলা হয়। মধুর এন্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান কাটা বা ক্ষত স্থান জিবানুমুক্ত করে। মধু শরীরের ক্ষত, পোড়া ও কাটা জায়গার চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। মধুতে মধ্যে রয়েছে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান যা ক্ষত, পোড়া ও কাটা জায়গায় ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধি প্রতিরোধ করে। কোথাও পুরে, কেটে গেলে ক্ষত স্থানে মধুর একটি পাতলা প্রলেপ দিয়ে দিন। ব্যথা কমবে ও দ্রুত নিরাময় হবে। মধুতে আছে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল উপাদান যা ক্ষত পরিষ্কার হতে সাহায্য করে ও ব্যথা, ঘ্রাণ, পূঁজ ইত্যাদি হ্রাস করে দ্রুত ক্ষত নিরাময় করে।

 প্রাচীন কাল থেকে গ্রিস ও মিশরে ক্ষত সারাতে মধু ব্যবহৃত হয়ে আসছে।  ২০০৭ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক "ড. শোন ব্লেয়ার" বলেছেন,

"ক্ষতে ইনফেকশন সৃষ্টি হওয়া প্রতিরোধ করতেও ড্রেসিংয়ের সময় মধু মেশানো উচিত। ধরুন, আপনার শরীরের কোন অংশ কেটে গেল হাতের কাছে এ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট নেই। এবার বিকল্প হিসাবে আপনার ঘরের মধুটি আপনার কাজে আসতে পারে। মধু ব্যাকটেরিয়ার আক্রামণকেও ঠেকায়। এভাবে মধু আপনার ক্ষতে ইনফেকশন হতে দেবে না এবং ক্ষতটি ও দ্রুত সারিয়ে তুলবে।"

২০০৭ এ সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক পরীক্ষায় দেখা গেছে অধিকাংশ ক্ষত ও জখমের উপশমে মধু ডাক্তারী ড্রেসিং এর চেয়েও বেশী কার্যকর। অগ্নিদগ্ধ ত্বকের জন্যও মধু খুব উপকারী। আজকাল ছোটখাটো কাটাছেঁড়া সারাতেও মধুর ব্যবহারের কথা বলছেন বিজ্ঞানীরা । মধুর এমন মধুরতম ব্যবহার আর কি হতে পারে? কিন্তু কিভাবে ব্যবহার করবেন মধু ? চলুন দেখে নেওয়া যাকঃ

প্রথমেই রোগীর ক্ষত স্থান ভাল করে পরিষ্কার করে নিতে হবে। এবার সেই ক্ষততে পাস্তরিত মধু লাগিয়ে নিন। এবার ব্যান্ডেজ বেঁধে নিন। প্রতিদিন তিনবার এভাবে ভাল করে পরিষ্কার করে মধু ব্যবহার করুন।

হৃৎপিণ্ডের সমস্যার ঝুঁকি হ্রাস করতে মধু

মধুর সাথে দারচিনি গুঁড়া মিশিয়ে খেলে তা রক্তনালীর বিভিন্ন সমস্যা দূর করে। রক্তনালী পরিষ্কার করতে সাহায্য করে এবং রক্তের খারাপ কোলেস্টেরলের পরিমাণ ১০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। মধু ও দারচিনির এই মিশ্রণ নিয়মিত খেলে হৃদরোগের ঝুকি অনেকাংশে কমে যায়। এই মধ্যে যদি কেউ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন তাহলে সেই ঝুঁকিও কমে যাবে। 

মধু শরীরে কোলস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করতে পারে এবং হৃদ্‌যন্ত্রের রোগ প্রতিরোধে সাহায্য করতে পারে। উচ্চ রক্তচাপ কমাতেও সাহায্য করতে পারে মধুর ফলদায়ক মধু। 

শক্তি বৃদ্ধি করে

মধু তাৎক্ষনিকভাবে শক্তি বৃদ্ধি করতে সাহায্য করে। মধু যেহেতু এক প্রকার প্রাকৃতিক চিনি সেহেতু এটি দ্রুত শরীরে ক্যালোরির অভাব পুরন করে। মধু তাপ ও শক্তির ভালো উৎস। মধু দেহে তাপ ও শক্তি জুগিয়ে শরীরকে সুস্থ রাখে।

মধু আপনার শারীরিক দুর্বলতা, ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। যখনই শরীরে ক্লান্তি অনুভব করবেন এক চামচ মধু খেয়ে নিতে পারেন। শরীরের দুর্বলতা চলে যাবে নিমিষেই। অনেকেই শারীরিক দুর্বলতা কাতানর জন্য এনার্জি ড্রিঙ্কস পান করে থাকেন যা শরীরের জন্য খুবই ক্ষতিকর। তারা শারীরিক দুর্বলতা কাটানোর জন্য মধু খেতে পারেন।

মধুতে আছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক চিনিঃ গ্লুকোজ, ফ্রুক্টোজ এবং শর্করা শরীরে শক্তি সবরাহের কাজ করে। প্রতিদিন সকালে ১ চামচ মধু সারাদিনের জন্য দেহের পেশীর ক্লান্তি দূর করতে সহায়তা করে ও আপনাকে রাখে এনার্জিতে ভরপুর।

 বিশেষ করে যাদের মিষ্টি খাবারের নেশা অনেক আছে তারা অন্য মিষ্টি খাবারের বদলি হিসাবে মধু খেয়ে নিন। কিছু মানুষ আছে যারা সারাক্ষন দূর্বলতায় ভোগেন এবং দেখা যায় এই সমস্যা দূর করার জন্য তারা কিছুক্ষন পর পর চা কফি খায়। এই সমস্যায় যারা ভুগছেন তারা প্রতিদিন সকালে নিয়মিত এক চামচ মধু খেয়ে নিন এবং সারা দিন সবল থাকুন।

মস্তিষ্কের কার্যকারিতা বাড়ায়

ঘুমানোর আগেপ্রতিদিন রাতে শোয়ার আগে এক চামচ মধু খাবেন তা মস্তিষ্কের কাজ সঠিক ভাবে চালাতে খুব সাহায্য করে। এতে মস্তিষ্কের শক্তি তথা বুদ্ধি বাড়ে। যেকোনো কাজে মস্তিষ্ক আগের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়। যাদের মাথা খাটিয়ে কাজ করতে হয়, তাদের জন্য মধু এনে দেয় নতুন উদ্যম ও সৃষ্টিশীলতা। আপনার লিভারে মধু থেকে পাওয়া ফলজ শর্করা বা ফ্রুকটোজ নামের পদার্থটিই মস্তিষ্কের জ্বালানি হিসেবেই কাজ করে থাকে। মানুষের লিভারে শক্তি সংরক্ষণ করে এবং রাতব্যাপি মস্তিষ্কে শক্তি সরবরাহ করে থাকে।

ওজন কমাতে

মধুতে ভিটামিন, মিনারেল এবং এমাইনো এসিড আছে। যা শরীর মুটিয়ে যাওয়া রোধ করে। গবেষণায় দেখা গেছে সকালে খালি পেটে এক গ্লাস হাল্কা গরম পানির সাথে লেবুর রস এবং মধু মিশিয়ে পান নিয়মিত পান করলে ওজন কমাতে সহায়তা করে। তাছাড়াও এ প্রক্রিয়া নিয়মিত অনুসরন করলে শরীরে বিষক্রিয়া দূর হয়, লিভার পরিস্কার হয় এবং শরীরের চর্বি দূর হয়।

মধু খেলে পাকস্থলী থেকে বাড়তি গ্লুকোজ তৈরি হয় যার জন্য মস্তিষ্কের সুগার লেভেল বেড়ে যায় এবং মেদ কমানোর হরমোন নিঃসরণের জন্য রীতিমতো চাপ সৃষ্টি করে। ফলে মেদ কমার সুযোগ তৈরি হয়।

হজমে সাহায্য করে

যাদের নিয়মিত হজমের সমস্যা হয় তারা প্রতিদিন সকালে মধু খাওয়ার অভ্যাস করুন। মধু পেটের অম্লীয়ভাব কমিয়ে হজম প্রক্রিয়ায় সহায়তা করে।  এর ব্যবহার হাইড্রোক্রলিক এসিড ক্ষরণ কমিয়ে দেয় বলে অরুচি, বমিভাব, বুক জ্বালা এগুলো দূর করা সম্ভব হয়। হজমের সমস্যা দূর করার জন্য মধু খেতে চাইলে প্রতিবার ভারী খাবারের আগে এক চামচ মধু খেয়ে নিন। বিশেষ করে সকালে খালি পেটে এক চামচ মধু খান।

মধুতে যে পরিমাণ শর্করা থাকে তা সহজেই হজম করতে সাহায্য করে থাকে। কারণ এতে যে ডেক্সট্রিন থাকে তা সরাসরি রক্তে প্রবেশ করে এবং তাৎক্ষণিক ভাবে ক্রিয়া করে। পেট রোগা মানুষদের জন্য মধু বিশেষ উপকারি। একটি গবেষণায় বলা হয়েছে,

গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে একজন ব্যক্তি প্রতিদিন নিয়মিত তিন বেলা দুই চামচ করে মধু খেতে পারে। এতে করে গ্যাস্ট্রিক আলসার থেকে মুক্তি পেতে পারেন।

ফুসফুসের যাবতীয় রোগ ও শ্বাসকষ্ট নিরাময়ে

ফুসফুসের যাবতীয় রোগে মধু উপকারী উপাদান বলে জানা গেছে । যখন একজন অ্যাজমা (শ্বাস কষ্ট)  রোগী শ্বাস কষ্টে ভোগেন তখন রোগীর নাকের কাছে ধরে শ্বাস টেনে নেয়া হয় তাহলে সে স্বাভাবিক এবং গভীরভাবে শ্বাস টেনে নিতে পারবেন। আবার অনেকেই মনে করেন, এক বছরের পুরনো মধু শ্বাস কষ্টের রোগীদের জন্য বেশ ভালো।

হাঁপানি রোধে

হাঁপানি একটি জগন্য সমস্যা। কেউ যদি হাঁপানিতে ভোগেন সে ক্ষেত্রে  আধা গ্রাম গুঁড়ো করা গোলমরিচের সাথে সমপরিমাণ মধু এবং আদা মেশান। এবার  অন্তত তিন বার এই মিশ্রিত পানি খান। এটা হাঁপানি রোধে সহায়তা করবে।

শরীরের ব্যাথা

আপনার শরীরের জয়েন্টে জয়েন্টে ব্যথা? প্রচুর বাতের ওষুধ খেয়েও কোনো ফল পাননি? মধু খান। যে অবাঞ্ছিত রসের কারণে শরীরে বাতব্যামোর জন্ম, সে রস অপসারিত করবে মধু। আপনার বাত সেরে যাবে।

অনি​দ্রায়

আমাদের অনেকেরই অনিদ্রা সমস্যা রয়েছে। এটি আমাদের খুব ভুগান্তিতে ফেলে। এ ক্ষেত্রে মধু ভাল কাজ করতে পারে। রাতে শোয়ার আগে এক গ্লাস পানির সঙ্গে দুই চা চামচ মধু মিশিয়ে খেলে এটি গভীর ঘুম এবং সম্মোহনের কাজ করে জানা গেছে। 

কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে

কোষ্ঠকাঠিন্যে ভুগে নি এমন লোক পাওয়া দুষ্কর।  মধুতে রয়েছে ভিটামিন বি কমপ্লেক্স, ডায়রিয়া, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। ১ চা চামচ খাঁটি মধু ভোরবেলা পান করলে কোষ্ঠবদ্ধতা এবং অম্লত্ব দূর হয়।

অ্যালার্জি কমায়

আবহাওয়ার পরিবর্তন কিংবা পরিবেশগত নানা কারণে অনেকেই  অ্যালার্জি সমস্যাতে পড়েন।  এ ক্ষেত্রে  নিয়মিত মধুপানি খেলে পরিবেশগত অ্যালার্জি কম হয়। শরীরকে এ ধরনের অ্যালার্জির বিরুদ্ধে লড়াই  করার মত সক্ষম করে তুলে।

তারুণ্য বজায় রাখতে

অনেকের বয়স দেখে বুঝার কোন উপায় থাকে না যে তার বয়স হয়ত পঞ্চাশোর্ধ। তাহলে তিনি কি এমন খেয়ে থাকেন যা তারুণ্য ধরে রাখতে সাহায্য করে ?  হুম  তারুণ্য বজায় রাখতে মধুর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য । মধু এন্টি অক্সিডেন্ট, যা ত্বকের রং ও ত্বক সুন্দর করে। ত্বকের ভাঁজ পড়া ও বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে।শরীরের সামগ্রিক শক্তি বাড়ায় ও তারুণ্য বাড়ায়।

মধু হিউম্যাকটেন্ট যৌগে সমৃদ্ধ। এই যৌগটি ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখার কাজ করে এবং ত্বকের উপরিভাগের ইলাস্টিসিটি বজায় রাখে। হিউম্যাকটেন্ট যৌগটি ত্বককে নমনীয় করতেও সাহায্য করে। ফলে ত্বক থাকে দীর্ঘদিন বার্ধক্যের ছাপ মুক্ত।

সকালে ত্বকে মধু লাগিয়ে ৩০ মিনিট রেখে ধুয়ে ফেলুন। এতে মধুর বেশ কিছু উপাদান ত্বক শুষে নেয়। ফলে ত্বক মসৃণ ও সুন্দর হয়।

হাড় ও দাঁতের গঠনে

মধুর গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ক্যালসিয়াম। আর মধুতে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম দাঁত, হাড়, চুলের গোড়া শক্ত রাখে, নখের ঔজ্জ্বল্য বৃদ্ধি করে, ভঙ্গুরতা রোধ করে।

রক্তশূন্যতায়

ইদানিং রক্ত স্বল্পতা আমাদের দেশে খুব বেশি পরিমাণে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মেয়েরা এই সমস্যায় বেশি পড়েন।  মধু রক্তের হিমোগ্লোবিন গঠনে সহায়তা করে বলে এটি রক্তশূন্যতায় বেশ  উপকারী । কারণ এতে থাকে খুব বেশি পরিমাণে কপার, লৌহ ও ম্যাঙ্গানিজ।

প্রতিদিন ১ গ্লাস পানিতে ১ চামচ মধু মিশিয়ে পান করলে মধুতে বিদ্যমান ক্যালসিয়াম রক্তে প্রবেশ করে। এবং রক্তে হিমোগ্লোবিনের ভারসাম্য বজায় রাখে। এভাবে মধু রক্তস্বল্পতা রোগকে প্রতিরোধ করে।

রক্ত পরিষ্কারক

মধু রক্ত পরিষ্কারক হিসেবেও কাজ করে। এজন্যে এক গ্লাস হালকা গরম পানির সাথে এক বা দুই চামচ মধু এবং এক চামচ লেবুর রস মিশিয়ে নিন।  পেট খালি করার আগে প্রতিদিন এই মিশ্রিত পানি খান। এটা রক্ত পরিষ্কার করতে অনেক সাহায্য করে। তাছাড়া রক্তনালী গুলোও পরিষ্কার করে থাকে।

উচ্চ রক্তচাপে মধুঃ

উচ্চ রক্তচাপ ভয়ংকর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। অনেক সময় উচ্চ রক্তচাপের কোনো প্রাথমিক লক্ষণ দেখা যায় না। নীরবে উচ্চ রক্তচাপ শরীরের বিভিন্ন অংশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। এ জন্যই উচ্চ রক্তচাপকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয় । বাংলাদেশে উচ্চ রক্ত চাপে আক্রান্ত লোকের সংখ্যা মোটি মোটি খুব বড় একটা অংশ। 

মধু উচ্চ রক্ত চাপে ভাল কাজ করে।  দু'চামচ মধুর সাথে এক চামচ রসুনের রস মেশান। সকাল সন্ধ্যা দু'বার এই মিশ্রণ খান। প্রতিনিয়ত এটার ব্যবহার উচ্চ রক্তচাপ কমায়। প্রতিদিন সকালে খাবার এক ঘণ্টা আগে খাওয়া উচিত।

ঠান্ডা  জ্বরে  মধু

আমাদের এমন কাউকে পাওয়া দুষ্কর হবে যার ঠান্ডা লাগে না। যারা নিয়মিত মধু গ্রহণ করে থাকেন দেখা গেছে তুলনা মূলক তারা কম ঠান্ডায় আক্রান্ত হন।  চা, কফি ও গরম দুধের সঙ্গে মধু মিশিয়ে খেলে হাঁচি, কাঁশি, জ্বর জ্বর ভাব, জ্বর, গলা ব্যথায়, টনসিল, নাক দিয়ে পানি পড়া, জিহ্বার ঘা (ঠান্ডাজনিত) ভালো হয়।

সাধারণ ঠান্ডা ও জ্বরের ঘরোয়া চিকিতসায় মধু বেশ উপকারী। এক কাপ গরম জলে মধু, লেবু, দারুচিনি ও আদা মিশিয়ে খেলে জ্বর কমে যায়। দ্রুত নিরাময়ের জন্য দুই ঘণ্টা অন্তর অন্তর এই মিশ্রণ খাওয়া যায়।

কাশি নিরাময়ে

গবেষণায় দেখা গেছে মধু কাশি প্রতিরোধ ক্ষমতা কাশির ঔষধ এর তুলনায় অনেক বেশি। যে ব্যাকটেরিয়ার জন্য কাশি হয় মধুর এন্টিব্যাকটেরিয়াল উপাদান সে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে পারে অতি দ্রুত।

দীর্ঘমেয়াদী হোক আর স্বল্পমেয়াদী হোক, যাদের খুসখুসে কাশির সমস্যা আছে, তারা প্রতিদিন এক চামচ আদার রসের সাথে এক চামচ মধু মিশিয়ে খেয়ে নিতে পারেন। এটি কাশির সাহায্যে শ্লেষ্মা বের করে ফেলার একটি সহায়ক ওষুধ হিসেবে কাজ করে। এটি ঠান্ডা, কাশি, কণ্ঠনালির ক্ষত, নাক দিয়ে পানি পড়া ইত্যাদি থেকে দ্রুত উপশম দেয়। 

 পেনসিলভানিয়া স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, 

এক চামচ মধু বিভিন্ন সর্দির ওষুধ থেকেও অনেক বেশি কার্যকর। মধুর এই ঠাণ্ডা জনিত রোগনিরোধী গুণের কথা বলা হয়েছে এই গবেষণায়, যা কবিরাজি মতে আগে থেকেই প্রতিষ্ঠিত।

কলোস্টেরলের মাত্রা কমায়

মধুতে রয়েছে  ভিটামিন বি১, বি২, বি৩, বি৫, বি৬, সি কপার , আয়োডিন ও জিংক যা দেহে এইচডিএল কোলেস্টেরলের (এটি ভাল ) মাত্রা বৃদ্ধি করে এবং খারাপ কোলেস্টেরলের মাত্রা কমিয়ে দেয়। ফলে মধু কোলেস্টেরল সংক্রান্ত রোগ থকে দেহকে মুক্ত রাখে। 

শরীর বিষমুক্ত করে

শরীর থেকে বিষাক্ত বর্জ্য দূর করতে মধু সবচেয়ে কার্যকর বিষনাশক পানীয়  হিসেবে ধারনা করা হয় ! শরীরের বিষাক্ত পদার্থ দূর করে হজমে সাহায্য করে। মধু সাথে পানি আর সামান্য লেবু মিশিয়ে খেলে মূত্রবর্ধক হিসেবে কাজ করে এবং শরীরের বিষাক্ত পদার্থ আরও ভালোভাবে দূর করে।

শিশুদের বৃদ্ধি ও বিকাশে

মধু শিশুদের জন্যে ভাল একটি খাবার। তবে একদম বাচ্চাদের জন্যে নয়। কারনে তাদের ইমিউন সিস্টেম মধু খাবার জন্যে উপযুক্ত হয়ে উঠে না। শিশুদের ছয় মাস বয়সের পর থেকে অল্প করে (তিন চার ফোঁটা) মধু নিয়মিত খাওয়ানো  যেতে পারে।  আবার অনেকে এক বছরের পূর্বে শিশুদের মধু খাওয়ানো থেকে বিরত থাকতে বলে থাকেন। মধু গ্রহণের ফলে  তাদের সারা দেহের বৃদ্ধি, মানসিক বিকাশ ভালো হবে। তবে শিশুকে মধু নিয়মিত খাওয়াতে হবে ঠান্ডা ঋতুতে, গরমের সময় নয়। শিশুদের দুর্বলতা দূর করার জন্য মধুতে রয়েছে জিংক ও ফসফরাস। বড়দের তুলনায় বাড়ন্ত শিশুদের (বিশেষ করে যারা স্কুলে যায়) জন্য  মধু বেশি জরুরি। 

রুপচর্চায় মধুর উপকারিতা জেনে নেওয়া যাকঃ

আপনি যদি বলেন, মখুর কাজ কি? এটা খায় না মাথায় দেয়! তবে আমরা বলব, এটা দুটোই করে। শুধুমাত্র আপনার খাবার প্লেটেই নয়, আপনি চাইলে এটি রুপচর্চায় ব্যাবহার করতে পারেন। মধু আপনার ত্বক ও চুলের যত্নে রোজকার রুপচর্চায় জায়গা করে নিতে পারে।

ত্বকের সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে

মধু আপনার ত্বককে আরও উজ্জ্বল ও মসৃণ করতে সহায়তা করে। রাতে ঘুমোবার আগে আক্রান্ত স্থানে মধু লাগিয়ে দিন। সকালে ঘুম থেকে উঠে হালকা গরম পানি দিয়ে ধোবেন। এতে আপনার ত্বক উজ্জ্বল হবে । উজ্জ্বলতা বৃদ্ধি ছাড়াও এটি  দাদ এবং অন্যান্য চর্মরোগের জন্য অনেক কার্যকর  বলে জানা গেছে । কিছুদিন ব্যবহার করে দেখতে পারেন আপনার চর্ম রোগ ভাল হয়ে যেতে পারে।

মধু যখন ময়েশ্চারাইজ়িং মাস্ক 

মধু প্রাকৃতিকভাবে ত্বককে ময়শ্চারাইজ করে এবং অনেক সময় ধরে এটি ধরে রাখে। ত্বক যখন অতিরিক্ত মাত্রাই ড্রাই হয়ে যায় তখন আপনি মুখে মধু লাগাতে পারেন।  ১ চামচ মধু নিয়ে ত্বকে লাগিয়ে রাখুন । ১৫-২০ মিনিট মধুটা মুখে রেখে হালকা গরম পানিতে মুখ ধুয়ে নিন।

ক্লিনজ়ার হিসাবে মধু 

ত্বকের ক্লিনজার হিসেবে বেশ কার্যকরী মধু । মধু আপনার শরীরে অ্যান্টিব্যাকটেরিয়া হিসেবে কাজ করে। মধু ত্বকের গভীরে গিয়ে ত্বক পরিষ্কার করে থাকে. 

ব্রনের ট্রিটমেন্ট উপাদান মধু

সংবেদনশীল ও ব্রণযুক্ত ত্বকের ক্লিনজার হিসেবে বেশ কার্যকরী মধু।  মধুর মধ্যে থাকা অ্যান্টিব্যাক্টেরিয়াল ও অ্যান্টিফাঙ্গাল উপাদান আপনার ব্রণের সমস্যা দূর করতে সাহায্য করে থাকে। আপনার মুখে যদি ব্রন থাকে তাহলে ব্রণের উপর মধু ১০-১৫ মিনিট লাগিয়ে রাখতে হবে। তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে মুখ ধুয়ে ফেলুন।

হেয়ার কন্ডিশনার 

মধুকে কন্ডিশনার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। এক কাপ মধু নিয়ে এর সঙ্গে এক কাপের চারভাগের এক ভাগ অলিভ অয়েল মিশিয়ে হালকা গরম করতে হবে। চুলে লাগিয়ে কিছু সময় ধরে তোয়ালে বা শাওয়ার ক্যাপ দিয়ে ঢেকে রাখতে হবে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঠান্ডা জলে মুখ ধুয়ে নিতে হবে।  আবার চাইলে  মধু ও নারকেল তেল একসঙ্গে মিশিয়ে নিন। রুক্ষ, শুষ্ক চুলের জন্য এই মিশ্রণটি ভালো কাজ দেয়। মিশ্রণটি ১৫-২০ মিনিট লাগিয়ে রেখে তারপর হালকা গরম পানি দিয়ে চুল ধুয়ে ফেলুন।

সতর্কতাঃ

মধু অনেক রোগে কাজে লাগলেও  কিছু ক্ষেত্রে ব্যবহারে সর্তকতা অবলম্বন করতে হবে।  ডায়াবেটিস রোগের ক্ষেত্রে মধু খুবই বিপজ্জনক। কারন এটি রক্তে সরাসরি শোষিত হয় বলে সহজেই দেহের রক্ত শর্করাকে উচ্চস্তরে নিয়ে আসবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। সুতরাং ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য মধু গ্রহণ নিষেধ । 

তাছাড়া মধু সবার শরীরে গরম তৈরি করে। বাচ্চাদের বা  যে কোনো বয়সের মানুষ অধিক পুষ্টির আশায় বেশি মধু খেলে ডায়রিয়া হয়ে যেতে পারে। 

ইতিকথা

বিশ্বের সবচেয়ে স্বাস্থ্যকর খাবারগুলোর মধ্যে অন্যতম মনে করা হয় মধুকে। সর্বগুন সম্পন্ন এই মধুর গুনের কথা বলে শেষ করা যাবে না। স্বাস্থ্য সুরক্ষা, চিকিৎসা, সৌন্দর্য চর্চা- কোথায় নেই মধুর ব্যবহার? 

প্রাচীনকাল থেকে মানুষ প্রাকৃতিক খাদ্য হিসেবে, মিষ্টি হিসেবে, চিকিৎসা ও সৌন্দর্য চর্চাসহ নানাভাবে মধুর ব্যবহার করে আসছে। শরীরের সুস্থতায় মধুর উপকারিতা অনেক। তবে কিছু ক্ষেত্রে মধু ব্যবহারে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

তথ্য সূত্রঃ নানা ওয়েব পোর্টাল

নোটঃ তথ্যগুলো অনলাইন থেকে সংগৃহীত। যেহেতু নিজে সব পরিক্ষা করে আর্টিকেলটি লিখা হয় নি তাই আপনার নিজ দায়িত্বে ব্যবহার করবেন। কোন সমস্যার ক্ষেত্রে,  লেখক দায়ভার বহন করবেন না। 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক