মাইকেল মধুসূদন দত্তঃ বাংলা সাহিত্যে বহুমাত্রিক প্রতিভার এক দিকপাল

যে সব খ্যাতিমান লেখকের অবদানে বাংলা সাহিত্য ধন্য হয়েছে মাইকেল মধুসূদন দত্ত তাদের অন্যতম। মাইকেল মধুসূদন বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক।  ঊনবিংশ শতাব্দীর অন্যতম সেরা বাঙালি কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তাকে মহাকবি হিসেবে  ডাকা হয়। তিনি বাংলার সাহিত্যের নবজাগরণের পুরোধা ব্যক্তিত্ব।  ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে বাংলা সাহিত্যে ইউরোপীয় চিন্তা ও চেতনার সার্থক প্রতিফলন ঘটান মাইকেল মধুসূদন দত্ত।

ব্রিটিশ ভারতের যশোর জেলার এক সম্ভ্রান্ত কায়স্থ বংশে জন্ম হলেও মধুসূদন যৌবনে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করে মাইকেল মধুসূদন নাম গ্রহণ করেন এবং পাশ্চাত্য সাহিত্যের দুর্নিবার আকর্ষণবশত ইংরেজি ভাষায় সাহিত্য রচনায় মনোনিবেশ করেন। জীবনের দ্বিতীয় পর্বে মধুসূদন আকৃষ্ট হন নিজের মাতৃভাষার প্রতি। এই সময়েই তিনি বাংলায় নাটক, প্রহসন ও কাব্যরচনা করতে শুরু করেন।

জন্ম ও পারিবারিক পরিচিতি

সাহিত্য-শিল্প ইতিহাসের এক আধুনিক বিবর্তনকালে কবি মধুসূদন দত্তের জন্ম। বাংলা সাহিত্য মধ্যযুগীয় সাহিত্য বলয় থেকে বেরিয়ে আধুনিক রূপায়নের দিকে যাত্রা শুরু করেছে।চযাপদের কবিতার বহমান স্রোত ক্ষীণ হয়ে আসছে। বাংলা ভাষা এক আধুনিক রূপ নিচ্ছে।

বাংলা সাহিত্যের প্রথম আধুনিক কবি ও নাট্যকার মাইকেল মধুসূদন দত্ত ১৮২৪ সালের ২৫ জানুয়ারি যশোরের কেশবপুরের অন্তর্গত কপোতা নদের তীরে সাগরদাঁড়ি গ্রামের বিখ্যাত দত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা রাজনারায়ণ দত্ত। মাতা জাহ্নবী দেবী।রাজনারায়ণ বসু ছিলেন কলকাতার সদর দেওয়ানি আদালতের এক খ্যাতনামা উকিল। মাতা জাহ্নবী দেবী ছিলেন তৎকালীন যশোর জেলার অন্তর্গত কাঠি পাড়ার জমিদার গৌরীচরণ ঘোষের কন্যা

শিক্ষা জীবন

শিশুকালে মধুসূদনের হাতে খড়ি হয়েছিল তাঁদের বাড়ীর চন্ডীমণ্ডপে। মধুসূদনের প্রাথমিক শিক্ষা তাঁর মা জাহ্নবী দেবীর কাছে। জাহ্নবী দেবীই তাঁকে রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণ প্রভৃতির সঙ্গে সুপরিচিত করে তোলেন।  সাগরদাঁড়ির পাশের গ্রাম শেখপুরা মসজিদের ইমাম মুফতি লুৎফুল হকের কাছে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। ইমামের কাছে তিনি বাংলা, ফারসি ও আরবি পড়েছেন। তার হাতেই মধুসূদনের প্রথমিক শিক্ষার ভিত্তি রচিত হয়েছিল।

তেরো বছর বয়সে মধুসূদন কলকাতায় আসেন। স্থানীয় একটি স্কুলে কিছুদিন পড়ার পর ১৮৩৩ খ্রীষ্টাব্দে তিনি তদনীন্তন হিন্দু কলেজে (বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়) ভর্তি হন ও ১৮৪১ সাল পর্যন্ত সেখানে ইংরেজী ও ফরাসী অধ্যয়ন করেন। মেধাবী ও কৃতী ছাত্ররূপে তার সুনাম ছিল।  তাই অচিরেই কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি. এল. রিচার্ডসনের প্রিয় ছাত্র হয়ে ওঠেন। অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন ডি এল রিচার্ডসন তাকে কবিতা লিখতে উত্সাহিত করেছিলেন। হিন্দু কলেজের অধ্যাপক ডিরোজিওর স্বদেশানুরাগে উদ্বুদ্ধ হয়ে তিনি ইয়ং বেঙ্গল সমিতিতে নাম লেখান।

১৮৩৪ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কলেজের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে ইংরেজি ‘নাট্য-বিষয়ক প্রস্তাব’ আবৃত্তি করে উপস্থিত সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কলেজের প্রতিটি পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করার জন্য, তিনি বরাবর বৃত্তি পেতেন।

হিন্দু কলেজে অধ্যয়নের সময়েই মধুসূদন কাব্যচর্চা শুরু করেন। তখন তাঁর কবিতা জ্ঞানান্বেষণ, Bengal Spectator, Literary Gleamer, Calcutta Library Gazette, Literary Blossom, Comet প্রভৃতি পত্রিকায় প্রকাশিত হতো।  কলেজে অধ্যয়নকালে তিনি নারী-শিক্ষা বিষয়ে প্রবন্ধ লিখে স্বর্ণপদক লাভ করেছিলেন। কলেজে তাঁর সহপাঠী ছিলেন ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রাজনারায়ণ বসু, গৌরদাস বসাক, প্যারীচরণ সরকার প্রমুখ ঊনবিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

১৮৪৩ সালে মধুসূদন খ্রীষ্টধর্মে দীক্ষিত হবার ইচ্ছা পূষণ করেন । এরপর ওই বছরই ১৩ ফেব্রুয়ারি মিশন রো-তে অবস্থিত ওল্ড মিশন চার্চ নামে এক অ্যাংলিক্যান চার্চে গিয়ে তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁকে দীক্ষিত করেছিলেন পাদ্রী ডিলট্রি। তিনিই তাঁর “মাইকেল” নামকরণ করেন। মধুসূদন পরিচিত হন “মাইকেল মধুসূদন দত্ত” নামে।  এই সময় তিনি হিন্দু কলেজ পরিত্যাগ করে শিবপুরস্থ বিশপস্ কলেজে ভর্তি হন এবং  ১৮৪৭ খ্রিষ্টাব্দে পর্যন্ত তিনি এখানে অধ্যয়ন করেন । এখানে অধ্যয়নকালে তিনি গ্রীক, ল্যাটিন, ফরাসী, হিব্রু প্রভৃতি ভাষা আয়ত্ব করেন।

খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ ও মাদ্রাজ গমন

মধুসূদনের চোখে তখন মহাকবি হবার প্রবল স্বপ্ন। বিলেত যাওয়ার জন্য তিনি তখন মরিয়া হয়ে উঠেছেন। বিলেতে যাওয়ার সুবিধা হবে এই ভেবে তিনি ১৮৪৩ সালের ৯ ফেব্র“য়ারি হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন। নামের শেষে যোগ করেন ‘মাইকেল’। যদিও শেষ অবধি তার সে সময় আর বিলেত যাওয়া হয়নি। ধর্মান্তরিত হওয়ার ফলে পিতার রোষানলে পড়ে ত্যাজ্যপুত্র হলেন।

খ্রিষ্ট ধর্ম গ্রহণ করায় একই বছর হিন্দু কলেজ থেকে তাকে বিতাড়িত করা হয় হয়ে বিশিপস কলেজে ভর্তি হন । খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের ফলে পিতা-মাতা, আত্মীয় স্বজন থেকে তিনি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। রাজনারায়ণ দত্ত তাঁকে পরিত্যাগ করলেও, বিশপস কলেজে পড়াশোনার ব্যয়ভার বহন করছিলেন। চার বছর পর তিনি টাকা পাঠানো বন্ধ করেন।

বিশপস কলেজে কয়েকজন মাদ্রাজি ছাত্রের সঙ্গে মধুসূদনের বন্ধুত্ব হয়েছিল। বিশপস কলেজে অধ্যয়ন শেষ করে যখন কলকাতায় চাকরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হন মধুসূদন। তখন তাঁর সেই মাদ্রাজি বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ্যান্বেষণে মাদ্রাজে ( বর্তমান চেন্নাই) চলে যান মধুসূদন। প্রচলিত আছে যে, আত্মীয়স্বজনের অজ্ঞাতসারে নিজের পাঠ্যপুস্তক বিক্রি করে সেই টাকায় মাদ্রাজ গিয়েছিলেন তিনি।

কর্মজীবন

ধুসূদন মাদ্রাজেও বিশেষ সুবিধা করে উঠতে পারেন নি। মাদ্রাজে এসে তিনি প্রথমে মাদ্রাজ মেইল অরফ্যান এ্যাসাইলাম স্কুলে (১৮৪৮-১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দ) । তবে বেতন যা পেতেন, তাতে তাঁর ব্যয়সংকুলান হত না। এই সময় তাই তিনি ইংরেজি পত্রপত্রিকায় লিখা শুরু করেন।  পরে মাদ্রাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হাইস্কুলে শিক্ষকতা (১৮৫২-১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দ) শুরু করেন। এ ছাড়া এখানে তিনি তিনি সাংবাদিক ও কবি হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।  মাদ্রাজে থাকাবস্থায় তিনি হিব্রু, ফরাসি, জার্মান, ইটালিয়ান, তামিল ও তেলেগু ভাষা শিক্ষা করেন।

‘টিমোথি পেন পোয়েম’ ছদ্মনামে মাদ্রাজের প্রভাবশালী পত্র-পত্রিকায় কবিতা প্রকাশ। মাদ্রাজ সার্কুলেটর জেনারেল ক্রনিকাল, এথেনিয়াম এবং স্পেকটেটর পত্রিকায় সাংবাদিকতা ও সম্পাদকীয় বিভাগে কাজ। তারপর ‘এথেনিয়াম’ পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্ব গ্রহণ। মাদ্রাজের বিখ্যাত ব্যবসায়ী আরবুথনট কোম্পানীর কুডাপ্পা জেলার অফিস সুপারিন্টেনডেন্ট নীলকর ডুগালড ম্যাকটাভিস এরন আশ্রিত সুন্দরী কন্যা রেবেকা ম্যাকটাভিসকে বিয়ে করেন ।  উভয়ের দাম্পত্যজীবন সাত বছর স্থায়ী হয়েছিল। রেবেকার গর্ভে মধুসূদনের দুই পুত্র ও দুই কন্যার জন্ম হয়।

মাদ্রাজে অবস্থানকালেই Timothy Penpoem ছদ্মনামে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past প্রকাশিত হয়। মাতার মৃত্যু সংবাদ শুনে কলকাতা আগমন এবং গোপনে পিতার সংগে সাক্ষাৎ করেন।

১৮৫৪ সালে স্পেকটেটর পত্রিকায় সহ-সম্পাদক নিযুক্ত হন। প্রচার পুস্তিকা ‘দ্য এ্যাংলো সেক্সন এন্ড দ্য হিন্দু’ প্রকাশ। ১৮৫৫ সালের ১৬ জানুয়ারি কবির পিতার পরলোক গমন। রেবেকার সংগে বিবাহ বিচ্ছেদ। পিতার সম্পত্তি রক্ষার্থে কলকাতা আগমন। এমিলিয়া হেনরিয়েটা সোফিয়া হোয়াইট নামে ইংরেজ কন্যাকে স্ত্রীরূপে স্বেচ্ছাগ্রহণ। এরপর তিনি তিনি তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরিয়েটাকে নিয়ে ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ২রা ফেব্রুয়ারি  কলকাতা আসেন।  এরপর জুনিয়র পুলিশ আদালতে কেরানীর পদে চাকরি লাভ। ১ ৮৫৭ সালে পুলিশ আদালতে দোভাষীর পদে নিযুক্ত হন।

বিলেতে গমন

মধুসূদনের দূর্দিনে একমাত্র সুহৃদ ছিলেন বিদ্যাসাগর। আপন অসচ্ছলতা সত্ত্বেও বিদ্যাসাগর বহু অর্থ ব্যয় করেন মধুসূদনের ব্যারিস্টারী পড়ার জন্যে। কবি ইংল্যান্ডে আইন বিষয়ে পড়ালেখা করতে গিয়েছিলেন, কিন্তু সেখানের আবহাওয়া এবং বর্ণবাদিতার কারণে বেশি দিন ইংল্যান্ডে থাকেন নি।

যে আর্থিক নিরাপত্তার আশ্বাসে তিনি বিলাত যাত্রা করেন, অচিরেই তা ভঙ্গ হলো। তাঁর ভূসম্পত্তির পত্তনীদার ও প্রতিভূরা তাঁকে বিলাতে ও তাঁর স্ত্রীকে কোলকাতায় টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলেন। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে মে মাসের ২ তারিখে নিতান্ত নিরুপায় হয়ে দুটি শিশু সন্তানসহ তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী হেনরীয়েটা কলকাতা ছেড়ে ইংল্যান্ডে স্বামীর নিকট গিয়ে পৌঁছালেন।

ব্যাপক অর্থসংকটের কারণে স্ত্রী, পুত্র, কন্যাসহ মাইকেল মধুসূদন প্রথমে ১৯৬৩ সালে ফ্রান্সের প্যারী ও পরে ভার্সাই নগরীতে যান। দেশ থেকে অর্থ না আসায় তাঁর অবস্থা এমন শোচনীয় হয়ে পড়ল যে, স্ত্রীর গহনা, নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী এমনকি বই পুস্তক পর্যন্ত বন্ধক রাখতে হয়।

অবস্থা এমন চরম আকার ধারণ করে যে, কপর্দকহীন অসহায় অবস্থায় ঋণের দায়ে তাঁর জেলে যাবার উপক্রম ঘটে। একমাত্র ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের  কল্যাণে তিনি তার আইন বিষয়ে পড়া শেষ করে ভারতে আসতে সক্ষম হয়েছিলেন। ফ্রান্সে থাকাকালীন সময়ে অর্থকষ্টে পড়লে, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তাঁকে অর্থ দিয়ে সাহা্য্য করেন। এ কারনে তাকে নিয়ে  ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর নামে চতুর্দশপদী কবিতাও লিখেন।

বিদ্যার সাগর তুমি বিখ্যাত ভারতে।
করুণার সিন্ধু তুমি, সেই জানে মনে,
দীন যে, দীনের বন্ধু !– উজ্জল জগতে
হেমাদ্রির হেম-কান্তি অম্লান কিরণে।
কিন্তু ভাগ্য-বলে পেয়ে সে মহা পর্বতে,
যে জন আশ্রয় লয় সুবর্ণ চরণে,
সেই জানে কত গুণ ধরে কত মতে
গিরীশ। কি সেবা তার সে সুখ সদনে !
দানে বারি নদীরূপ বিমলা কিঙ্করী।
যোগায় অমৃত ফল পরম আদরে
দীর্ঘ-শিরঃ তরু-দল, দাসরূপ ধরি।
পরিমলে ফুল-কুল দশ দিশ ভরে,
দিবসে শীতল শ্বাসী ছায়া, বনেশ্বরী,
নিশায় সুশান্ত নিদ্রা, ক্লান্তি দূর করে।

এই দুর্দিনেও তিনি সৃষ্টি বিমুখ ছিলেন না। এখানে ভার্সাইতে অবস্থানকালে তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। বাংলা সনেট (চতুর্দশপদী) এর সার্থক  স্রষ্টা কবি মধুসূদন দত্ত ১৮৬৫ খ্রীষ্টাব্দে ফ্রান্সের ভার্সাই নগরীতে অবস্থানকালেই ইতালির কবি পেত্রার্কের সনেট থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে প্রথম বাংলা সনেটের দিগন্ত উন্মোচন করেন। ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দে কবির চতুর্দশপদী  কবিতাগুলি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। এই কবিতাগুলিতে কবি চিত্তের ব্যকুলতা, স্বদেশ প্রেমিকতা ও আবেগ ধ্বনিত হয়েছে। নিচের চতুর্দশপদী কবিতাংশের কবি স্মরণ করেছেন জন্মভূমির কপোতাক্ষ নদের কথা :-

সতত, হে নদ, তুমি পড় মোর মনে।
সতত তোমার কথা ভাবি এ বিরলে;
সতত (যেমতি লোক নিশার স্বপনে
শোনে মায়া-মন্ত্র ধ্বনি) তব কলকলে
জুড়াই এ কান আমি ভ্রান্তির ছলনে !
বহু দেশ দেখিয়াছি বহু নদ-দলে,
কিন্তু এ স্নেহের তৃষ্ণা মিটে কার জলে ?
দুগ্ধ-স্রোতোরূপী তুমি জন্ম-ভূমি-স্তনে !

১৮৬৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি পুনরায় ইংল্যান্ড যান এবং ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে গ্রেজ-ইন থেকে ব্যারিস্টারি পাস করেন। লন্ডনের ‘গ্রেজ ইন’ থেকে ব্যারিস্টারী পাস করে দেশে ফিরে ১৭-১১-১৮৬৬ তারিখে কলকাতা বারে যোগদান করেন এবং ৭-৫-১৮৬৭ তারিখে হাইকোর্ট বারে যোগদান করেন। পরে তাঁকে প্রিভিউ কাউন্সিলের ‘আপীল একজামিনার’ হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। আইন ব্যবসায় তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেননি। তা ছাড়া অমিতব্যয়ী স্বভাবের জন্য তিনি ঋণগ্রস্তও হয়ে পড়েন।

১৮৬৮ খ্রিষ্টাব্দে বিদ্যাসাগর ঋণগ্রস্ত হয়ে বিপদে পড়লে, মধুসূদন তাঁর সম্পত্তি কুড়ি হাজার টাকায় বিক্রয় করে বিদ্যাসাগরকে বিপদমুক্ত করেন।

কিন্তু ওকালতিতে সুবিধে করতে না পেরে ১৮৭০ খ্রিষ্টাব্দের জুন মাসে মাসিক এক হাজার টাকা বেতনে হাইকোর্টের অনুবাদ বিভাগে যোগদান করেন। কিন্তু দুবছর পর এ চাকরি ছেড়ে তিনি পুনরায় আইন ব্যবসা শুরু করেন।

সাহিত্য কর্ম

মধুসূদন বাংলা সাহিত্যে একজন নাট্যাকার হিসেবে পদার্পণ করেন। তিনি রামনারায়ণ তর্করত্ন রচিত রত্নাবলী নাটকটি ইংরেজীতে অনুবাদ করতে গিয়ে বাংলা সাহিত্যে ভাল নাটকের অভাব অনুভব করেন। এই অভাববোধ থেকেই তিনি নাটক রচনাতে উৎসাহী হন।

টিমোথি পেন পোয়েম’ ছদ্মনামে প্রথম কাব্যগ্রন্থ The Captive Ladie (১৮৪৯ খ্রিষ্টাব্দ) এবং দ্বিতীয় গ্রন্থ Visions of the Past ()১৯৪৯ প্রকাশিত হয়।

রামনারায়ণ তর্করত্নের রত্নাবলী (১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দ) নাটক ইংরেজিতে অনুবাদ করতে গিয়ে, তিনি বাংলা নাট্যসাহিত্যে উপযুক্ত নাটকের অভাব অনুভব করেন। এই সময় তিনি বাংলায় নাটক রচনার সংকল্প করেন। এই সূত্রে তিনি কলকাতার পাইকপাড়ার রাজাদের বেলগাছিয়া থিয়েটারের সঙ্গে জড়িত হন।  ১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দে পাশ্চাত্য রীতিতে রচনা করেন ‘শর্মিষ্ঠা’ নাটক। এটিই ছিল প্রকৃতপক্ষে বাংলা ভাষায় রচিত প্রথম মৌলিক নাটক। এই অর্থে মধুসূদনকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম নাট্যকার বলা হয়।

শর্মিষ্ঠা আধুনিক পাশ্চাত্য  রীতিতে রচিত প্রথম বাংলা নাটক। নাটকের আখ্যান মহাভারতের আদিপর্বে বর্ণিত রাজা যযাতি, শর্মিষ্ঠা ও দেবযানীর ত্রিকোণ প্রেমের কাহিনী অবলম্বন করে রচিত । অবশ্য শর্মিষ্ঠা পাশ্চাত্য নাট্য রীতিতে লিখলেও, মাইকেল এই নাটকে সংস্কৃত শৈলীকে সম্পূর্ণ বর্জন করেন নি।

এই নাটকের কাব্য ও অলংকার-বহুল দীর্ঘ সংলাপ, ঘটনার বর্ণনাত্মক রীতি, প্রবেশক, নটী, বিদুষক প্রভৃতির ব্যবহার সংস্কৃত শৈলীর  মতই । অন্য দিকে এ নাটকে ইংররেজী নাটকের মত রোমান্টিকতা দেখা যায়।  প্রথম রচনা হিসেবে ত্রুটিবিচ্যুতি থাকলেও, সেই যুগের ইংরেজি-শিক্ষিত পাঠকসমাজে এ নাটকটি সাদরে গৃহীত হয়।

১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি দুটি প্রহসন রচনা করেন। এই দুটি প্রহসন হলো  ‘একেই কি বলে সভ্যতা’ ও ‘বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’। এই বছরেই তিনি গ্রিক পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে রচনা করেন ‘পদ্মাবতী’ নাটক। এ নাটকেই তিনি পরীক্ষামূলকভাবে ইংরেজি কাব্যের অনুকরণে অমিত্রাক্ষর ছন্দ ব্যবহার বরেন। ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি অমিত্রাক্ষরে লেখেন ‘তিলোত্তমাসম্ভব’ কাব্য।

প্রহসন দু’টি প্রথমটিতে মধুসূদন উনিশ শতকের ইংরেজি শিক্ষাপ্রাপ্ত বাবু সমাজের অতি আধুনিকতা, জীবন উপভোগের প্রবল বাসনা, অমিতাচার ও উগ্রতাকে তীব্র পরিহাসের রূপকে তুলে ধরেছেন। আর দ্বিতীয়টিতে তিনি সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গ-বিদ্রূপে রূপায়িত করেছেন  সনাতনপন্থী সমাজপতিদের নৈতিক চরিত্রের অধঃপতন তথা কুলীন ব্রাহ্মণদের নারী উপভোগের বিকৃত বাসনাকে। এ প্রহসন দুটিতেই মধুসূদন তাঁর পাশ্চাত্য সাহিত্য ও জীবনচেতনা অধ্যয়নের প্রথম প্রকাশরূপে ইংরেজি Comedy of manners-এর রস ও রীতিকে গ্রহণের মাধ্যমে বাংলা প্রহসনকে আন্তর্জাতিক মাত্রা দান করেছেন। আঞ্চলিক তথা গ্রামীণ ভাষা ব্যবহার করে করে বাংলা প্রহসনকে সমৃদ্ধির শীর্ষভাগে উন্নীত করেছেন।

সমসাময়িক সমাজ সম্পর্কে মধুসূদনের ব্যাপক অভিজ্ঞতার পরিচয়, বাস্তবতার যথার্থ চিত্রণ, বিচিত্র চরিত্রের সার্থক রূপায়ণ, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপের তীব্রতা ও সংলাপের সাবলীলতায় তিনি যে বিপুল প্রতিভার উজ্জ্বল পরিচয় দিতে সক্ষম হয়েছেন, তাতে প্রহসনদ্বয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করেছে।

১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দে রামায়ণের কাহিনি অবলম্বনে তিনি রচনা করেন ‘মেঘনাদ বধ কাব্য’। এটি পরিচিত করে তোলা যদিও খুব সহজ ছিল না, তারপরও তিনি নিজেকে মহাকাব্যটির মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্রভাব প্রকাশ করেছিলেন। তারই অংশ হিসেবে তিনি কাব্যে প্রথম হোমেরিক স্টাইলের লেখার প্রবর্তন করেন।

রামায়ণ কাহিনীকে আশ্রয় করে মেঘনাদ বধ রচিত হলেও এর চরিত্র, পরিকল্পনা প্রতিপাদ্য ও গঠন কৌশলের সঙ্গে রামায়ণের সাদৃশ্য কমই। রামায়ণের রাম সাক্ষাৎ ভগবান ও আদর্শের প্রতীক। আর রাবণ দূরাচার, রাক্ষ, প্রজাপীড়ক ও ইন্দ্রিয়াসক্ত। কিন্তু মধুসূদনের রাবণ স্বাধীন দেশের স্বাধীন নৃপতি প্রজাবৎসল শাসক। সমুদ্রের অপর পার থেকে আগত রাম রাবণের রাজ্য আক্রমণ করলে তিনি তা মেনে নিতে পারেননি। তিনি বাধ্য হয়ে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন। মেঘনাদ বধ কাব্যের প্রথম সর্গেই কবি প্রদত্ত যুদ্ধক্ষেত্রের বর্ণনার মধ্য দিয়েই রাবণের এ অন্তকরণের পরিচয় মেলে। প্রিয় পুত্র বীরবাহুর মৃতদেহ দেখে রাবণ বলেছেন :

‘যে শয্যায় আজি তুমি শুয়েছ, কুমার
প্রিয়তম, বীরকুল সাধ এ শয়নে
সদা, রিপুদল বলে দলিয়া সমরে
জন্ম ভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে
যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শতধিক তারে।’

রাবণের সমর অভিজ্ঞতা এভাবেই বেদনায় ভরে গেছে। শেষ পর্যন্ত এক নিদারুণ পরাজয়ের যন্ত্রণায় তিনি মুষড়ে পড়েছেন। রাবণের এ মানবভাগ্যে যুগ মানসেরই প্রতিফলন ঘটেছে।

১৮৬১ সালে আরো  দুটি রচনা হল,  ‘কৃষ্ণকুমারী’ ও ‘ব্রজাঙ্গনা’ কাব্য।

কৃষ্ণকুমারী  বা্ংলা সাহিত্যের প্রথম সার্থক ট্রাজেডি নাটক। নাটকটির কাহিনি উইলিয়াম টডের ‘রাজস্থান’ নামক গ্রন্থ থেকে  নেওয়া হয়েছে। নাটকটি ১৮৬০ সালে রচিত হলেও প্রকাশিত হয় ১৮৬১ সালে। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কৃষ্ণকুমারী নাটকে নায়িকা চরিত্রে অভিনয় করেন কৃষ্ণকুমারী নিজে। নাটকে কাহিনী প্রবাহিত হয় মদনিকা এবং ধনদাস চরিত্রের মাধ্যমে। নাটকের মূল বিষয়বস্তু হল কৃষ্ণকুমারীর নিজের জীবন বিসর্জন।

কৃষ্ণকুমারী রূপে গুণে অনন্য। তার একটি চিত্রপট দেখে জগৎসিংহ তাকে বিবাহ করার জন্য ব্যাকুল হয়ে যায়। ধনদাসের মাধ্যমে ভীমসিংহের কাছে রাজা জগৎসিংহ কৃষ্ণার বিবাহের পয়গাম পাঠান।ধনদাস এই নাটকে একটি হীন চরিত্র সে টাকার জন্য সব করতে পারে। নাটকের মদনিকা চরিত্র হল বিলাসবতীর সখী। ধনদাস হল জগৎসিংহের নারী সংগ্রহকা।এই নাটকের উল্লেখযোগ্য চরিত্রগুলো হলো: কৃষ্ণকুমারী,মদনিকা,বিলাসবতী, ভীমসিংহ, জগৎসিংহ,মানসিংহ,ধনদাস প্রমুখ।

১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দে নারী প্রগতিবাদী নাটক বীরাঙ্গনা রচনা করেন। এই বছরে তিনি কিছুদিন হিন্দু প্যাট্রিয়ট পত্রিকা সম্পাদনা করেন।

ভার্সাইতে অবস্থানকালে তিনি ইতালীয় কবি পেত্রার্কের অনুকরণে বাংলায় সনেট লিখতে শুরু করেন। তাঁর এই সনেটগুলি ১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দে চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী নামে প্রকাশিত হয়।

১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে হোমারের ইলিয়াড অবলম্বনে তিনি রচনা করেন হেক্টরবধ।

১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে  তাঁর শেষ রচনা মায়াকানন (অসমাপ্ত) রচনা করেন। শেষ জীবনে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে বেঙ্গল থিয়েটারের কর্ণধার শরত্চন্দ্র ঘোষের অনুরোধে তিনি ‘মায়াকানন’ নাটক রচনায় হাত দেন। নাটকটি তিনি শেষ করতে পারেননি। মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ ও দারিদ্র্যের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হয়।

বাংলা রচনা

  • শর্মিষ্ঠা নাটক (১৮৫৯ খ্রিষ্টাব্দ)
  • একেই কি বলে সভ্যতা (১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)
  •  বুড় সালিকের ঘাড়ে রোঁ’ (১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)
  • পদ্মাবতী নাটক (১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)
  • তিলোত্তমাসম্ভব কাব্য (১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দ)
  • মেঘনাদবধ কাব্য (১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ)
  • ব্রজঙ্গনা কাব্য (১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ)
  • কৃষ্ণকুমারী নাটক (১৮৬১ খ্রিষ্টাব্দ)
  • বীরাঙ্গনা কাব্য (১৮৬২ খ্রিষ্টাব্দ)
  • চতুর্দ্দশপদী কবিতাবলী (১৮৬৬ খ্রিষ্টাব্দ)
  • হেক্টর বধ (১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দ)
  • মায়াকানন (১৮৭৪ খ্রিষ্টাব্দ, মৃত্যুর পরে প্রকাশিত)

ইংরেজি রচনা

  • The Captive Ladie (1854)
  • The Anglo-saxon and the Hindu (1854)
  • Ratanavali, Translation (1858)
  • Sermista , Translation (1859)
  • Nil Durpan, Translation (1861)

শেষ জীবন ও পরলোক গমন

মধুসূদনের শেষ জীবন চরম দুঃখ-দারিদ্র্যের মধ্যে দিয়ে অতিবাহিত হয়। ঋণের দায়, অর্থাভাব, অসুস্থতা, চিকিৎসাহীনতা ইত্যাদি কারণে তার জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। আইন ব্যবসায় তিনি তেমন সাফল্য লাভ করতে পারেননি। নাবালক ছেলেমেয়ের কথা ভেবে তার মন সর্বদাই চিন্তিত। ছেলে মিল্টন ও আলবার্ট নেপোলিয়ন কি তাহলে অভুক্ত অবস্থায় মারা যাবে? আদরের দুলালী শর্মিষ্ঠার কী হবে?
মাত্র ৪৫ বছর বয়সে গলায় ঘা-সহ অনেক জটিল রোগ বাসা বাঁধে মধুসূদনের দেহে। আদরের মেয়ের কথা চিন্তা করে অবশেষে কন্যাদায়গ্রস্ত পিতা মধুসূদন তেরো বছর বয়সী কন্যাকে পাত্রস্থ করলেন দ্বিগুণ বয়সী বেকার যুবক অ্যাংলো ইন্ডিয়ান উইলিয়াম ওয়াল্টার এভান্স ফয়েডের সঙ্গে।

১৮৭৩ সালের এপ্রিল মাসে মধুসূদন ভগ্ন স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধারের জন্য উত্তর পাড়ার জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখার্জির সাদর আহবানে উত্তর পাড়া লাইব্রেরি ভবনের দ্বিতীল-এ বসবাস করতে শুরু করেন।

মে মাসের দিকে মধুসূদনের স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতি। ১৮৭৩ সালের ২১ জুন মধুসূদন পরিবারসহ রোগজীর্ণ শরীর নিয়ে কলকাতায় চলে যান।  স্ত্রী হেনরিয়েটাও নিদারুণ জ্বরে আক্রান্ত। বন্ধু-বান্ধবের সহযোগিতায় মধুসূদনকে খুবই পীড়িত অবস্থায় ইন্টালীর বেনে পুকুর বাড়িতে স্থানান্তরিত ও পরে আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে পাঠানো হয় ।এই হাসপাতালে কবি মাত্র আট দিন জীবিত ছিলেন। দীর্ঘ দিন ধরে অনিয়ম ও বিনা চিকিৎসায় তার শরীর ক্রমেই জীর্ণ ও রোগগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল। হাসপাতালের চিকিৎসায় তার শরীর একটু উন্নতি হলেও ক্রমাগত গলার ব্যথা ও হৃদরোগসহ জটিল ব্যাধিতে তিনি আক্রান্ত ছিলেন।

মধুসূদন নিশ্চিত মৃত্যুর প্রহর গুনছেন শুনে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ ও দ্বন্দ্ব সৃষ্টি হতে লাগলো। তিনি খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলেও পাদরিরা তাকে খ্রিষ্টান বলে মেনে নিতে রাজি ছিলেন না।

এরকম সময়ই এলো স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যুসংবাদ। জুনের ২৬ তারিখে স্ত্রী হেনরিয়েটার মৃত্যু। মধুসূদনের শারীরিক অবস্থা ক্রমাগত আরো খারাপ হতে লাগলো। একে একে তার বন্ধুরা রেভারেন্ট কৃষ্ণ মোহন ঘোষ, উমেশ চন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় ও মধুসূদনের ভ্রাতুষ্পুত্র ত্রৈলোক্যনাথ দত্ত এসে হাজির হলো হাসপাতালে তার অন্তিম মুহুর্তে।

জুনের ২৮ তারিখে হাসপাতালে মধুসূদনের ধর্মীয় প্রার্থনা  শেষ করা হয় । জুনের ২৯ তারিখে রোববার বেলা দুইটায় পুত্র-কন্যা, জামাতা, বন্ধুজনের উপস্থিতিতে আলীপুর জেনারেল হাসপাতালে কপর্দকহীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল মাত্র ৪৯ বছর।

ধর্মান্তরিত মধুসূদন কোনদিন গির্জায় যাননি অভিযোগ তুলে সমাধি ক্ষেত্রে ধর্মযাজকদেন আপত্তিতে শবদেহ কিছু সময় মর্গে রাখা হয় এবং সমাধি ক্ষেত্রে অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়।  মধুসূদনের বন্ধুরা তার শবদেহ শ্মশানে নেয়ার যাবতীয় আয়োজন করেছিলেন; কিন্তু মধুসূদন খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করায় সে পথও তার চিরতরে রুদ্ধ হয়ে যায়।

বন্ধু রেভারেন্ট কৃষ্ণ মোহন ঘোষ মধুসূদনকে খ্রিষ্টান কবরস্থানে সমাহিত করার অনুমতির জন্য লর্ড বিশপ রবার্ট মিলমানের কাছে ধরনা দিয়েও ব্যর্থ হলেন। গ্রীষ্মের প্রচণ্ড ভ্যপসা গরমে কবির মরদেহ মর্গে পচতে আরম্ভ করল। তখন সংস্কারমুক্ত অমিতেজ পাদরি রেভারেন্ট ডক্টর পিটার জন জার্বো খ্রিষ্টান পাদরি বিশপের অনুমতি ছাড়াই শবদেহ সমাহিত করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করলেন।

৩০ জুন সেন্ট জেমস চার্চ-এর ধর্ম যাজকের উদ্যোগে কৃষ্টীয়রীতি অনুযায়ী কলকাতা লোয়ার সার্কুলার রোডে সমাধি ক্ষেত্রে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে পূর্ণ মর্যাদায় মরদেহ সমাহিত। মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তকে যে খৃস্টান কবরস্থানে সমাহিত করা হয়েছিল সেখানে তার চারদিন আগে কবির জীবন সঙ্গী প্রিয়তমা স্ত্রী হেনরিয়েটাকে সমাহিত করা হয়েছিল। কবির স্ত্রীর পাশেই শোয়ানো হলো কবিকে। কলকাতার লোয়ার সার্কুলার রোডের পাশে খৃস্টান কবরস্থানে কবিকে সমাহিত করলেও কবি তার সৃষ্ট কর্মের মাঝে যুগ যুগ ধরে অমর হয়ে আছেন এবং থাকবেন।

মহাকবি জীবনের অন্তিম পর্যায়ে জন্মভূমির প্রতি তাঁর সুগভীর ভালোবাসার চিহ্ন রেখে গেছেন অবিস্মরণীয় পংক্তিমালায়। তাঁর সমাধিস্থলে নীচের কবিতাটি লেখা রয়েছে :

‘দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম)মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী’

শেষ কথা

মাইকেল মধুসূদন বাংলা ভাষায় সনেট ও অমিত্রাক্ষর ছন্দের প্রবর্তক। কবি মাইকেল মধুসূধন দত্ত শুধু একজন যশস্বী কবি ছিলেন না; তিনি নাট্যকার, অভিনেতা, প্রাবন্ধিক এবং একজন সমাজ সংষ্কারক ছিলেন। বিদ্যার শিরোমনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর এবং কবি মাইকেল মধুসূদন দত্ত নারীদের চার দেওয়ালে বন্দী না রেখে তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞানে শিক্ষিত করে তোলার জন্য কাজ করেছেন।

মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িটি প্রত্নতত্ত্ব ও জাদুঘর বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে। ১৯৬৮ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বাড়িটি প্রথমবারের মতো সংস্কার করে। গত ২০০১ সালে মধুপল্লী ঘোষিত হওয়ার পর কয়েকটি কক্ষে কবি পরিবারের ব্যবহৃত জিনিসপত্র নিয়ে একটি জাদুঘর গড়ে তোলা হয়েছে।

এখানে গড়ে তোলা হয়েছে ‘মধুসূদন একাডেমী। বাড়িতে ঢুকতেই চোখে পড়ে কবির আবক্ষ মূর্তি। বাড়ির উঠোনে জমিদারবাড়ির ঠাকুরঘর। তারপর প্রতিটি ঘরে কবির ব্যবহূত বিভিন্ন আসবাব রয়েছে। কবির বাড়ির পূর্ব ও পশ্চিম পাশ দিয়ে সরু ধারায় বয়ে গেছে কপোতাক্ষ নদ। এখানে দেয়ালে স্থাপিত হয়েছে কবির লেখা কবিতা এবং ছবি। এখানে কবির সাহিত্যকর্ম, জীবনীসহ নানা বিষয়ে জানানোর ব্যবস্থাও রয়েছে।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের বাড়িতে যেতে হলে প্রথমে আপনাকে যশোর জেলা শহরে আসতে হবে। যশোর বাস টার্মিনাল থেকে বাসে কেশবপুর আসতে হবে। যশোর জেলা শহর থেকে কেশবপুর উপজেলা শহর ৩২ কিলোমিটার। আর কেশবপুর উপজেলা থেকে ১২ কিলোমিটার দূরত্ব সাগরদাঁড়ি।

তথ্য সূত্রঃ উইকি, সামহোয়ারইন, নয়াদিগন্ত, বাংলাদেশ প্রতিদিন ও নানা ওয়েব পোর্টাল ।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক