৫২ বছর পরে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে চালু হওয়া মৈত্রী এক্সপ্রেস

মৈত্রী এক্সপ্রেস বা ঢাকা-কলকাতা এক্সপ্রেস একটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী ট্রেন যেটি বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ভারতের কলকাতা শহরে যাতায়াত করে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এটিই একমাত্র ট্রেন যেটি দুই দেশের মধ্যে চলাচল করে। পূর্বে বাংলাদেশ ভারতের মধ্যে ট্রেন যাত্রার প্রচলন থাকলেও প্রায় অর্ধযুগ যাবত এই সুবিধা  বন্ধ ছিল।

৫২ বছর বন্ধ থাকার পরে ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল মানে পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশ  ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে   মৈত্রী ট্রেন পূনরায় চালু হয়। মৈত্রী   শব্দের অর্থ হল বন্ধুত্ব।  তবে মজার ব্যাপার হল ট্রেনের বগি ও ইঞ্জিন হিসেবে বাংলাদেশের সীমার মধ্যে বাংলাদেশের বগি ও ইঞ্জিন ও ভারতের সীমায় ভারতের বগি ও ইঞ্জিন ব্যবহার করা হয়। এর ফলে যাত্রীদের সীমান্তে ট্রেন পরিবর্তন করতে হয়।

বাংলাদেশ থেকে ট্রেনটি ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট রেলওয়ে স্টেশন থেকে ছেড়ে যায়।

মৈত্রী ট্রেনের পটভূমি

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের  পর ভারত ও পাকিস্থান নামে দু’টি রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পূর্ব বঙ্গ নামে বর্তমান বাংলাদেশ পাকিস্থানের অংশ ছিল ।  এতে করে রেল যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ।  ভারত ভাগের পূর্বে  ব্রিটিশ শাসনের সময়, নিয়মিত রাত ব্যাপী ট্রেন চলাচল করত কলকাতা, গোয়ালন্দ, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জের মধ্যে| ভারত পাকিস্থান যুদ্ধের আগ পর্যন্ত  ইস্ট বেঙ্গল মেল, ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস এবং বরিশাল এক্সপ্রেস – এই তিনটি ট্রেন, ১৯৬৫ পর্যন্ত দুই দেশের   চলাচল করত । 

১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্থান, পাকিস্থান থেকে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। তখন উপরের তিনটি ট্রেন থেকে ইস্ট বেঙ্গল মেইল ও ইস্ট বেঙ্গল এক্সপ্রেস পূর্বের একই রুট গেদে এবং দর্শনা হয়ে চলাচল করত এবং বরিশাল এক্সপ্রেস, বনগাঁ ও যশোর এর মাধ্যমে চলাচল করত|

এর পরে সীমিত সময়ের জন্যে এই দু’টি মেইল ট্রেইন চালু থাকলেও যাত্রীবাহী ট্রেন পরিসেবা সেই ১৯৬৫ সাল থেকেই বন্ধ ছিল। ১৯৭৪ সালে লোকসানের কবলে পড়ে রেল চলাচল একেবারে বন্ধ হয়ে যায়।  ২০০৭ সালের ফ্রেব্রুয়ারী মাসে ভারতের রাষ্ট্রপতি এবং ভারতের তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রণব মুখার্জির ঢাকা ভ্রমনের মাধ্যমে পুরনায় দুই দেশের মধ্যে ট্রেন সেবা চালু হয় । এর পরে ২০০৭ সালের জুলাই মাসের ৮ তারিখ প্রথম ট্রেন ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তাদের বহনকারী  একটি ট্রেন পরীক্ষামূলক কলকাতা থেকে ঢাকায় আসে।

তবে যাত্রী পরিসেবা চালু হয় ৫২ বছর পরে ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল ।

মৈত্রী ট্রেনের রুট

মৈত্রী এক্সপ্রেস কলকাতা ও ঢাকার মধ্যে চলাচল করা একমাত্র ট্রেন।| এটা উভয় দিক থেকেই সপ্তাহে ৫ দিন চলাচল কর।| ট্রেনটি কলকাতা থেকে ঢাকা পৌঁছাতে প্রায় ৩৭৫ কিলোমিটার দুরত্ব  অতিক্রম করে । ট্রেনটির অভিবাসন পরীক্ষণের জন্য দুটিই স্টপেজের ছিল : ভারতের দিক থেকে গেদে তে এবং বাংলাদেশ এর দিক থেকে দর্শনা’ত। পুরো দুরত্ব টা পূর্ণ করতে ১০-১১ ঘন্টা সময় লাগত।

তবে ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে মৈত্রী এক্সপ্রেসের যাত্রীদের বাংলাদেশের দর্শনা ও ভারতের গেদে স্টেশনে ইমিগ্রেশন কাজ সেরে ফেলার ব্যবস্থা চালু হয়  । এর পূর্বে সময় যাত্রীদের বাংলাদেশের দর্শনা ও ভারতের গেদে তে  সকল মালামাল নিয়ে ট্রেন থেকে নেমে কাস্টমসের আনুষ্ঠানিকতা সেরে আবারো মালামাল নিয়ে ট্রেনে উঠতে  হত।  আর ইমিগ্রেশনের কাজ সারতে মাঝপথে  চলে যায়  তিন ঘণ্টা সময়। বিষয়টি অনেক সময় যাত্রীদের জন্য বিরক্তির কারণ ছিল।

যেহেতু বাংলাদেশ এর রেল পথ টি অবৈদ্যুতিক সেহেতু সম্পূর্ণ রাস্তা টি ব্রডগেজ ডিজেল ইঞ্জিন দ্বারা চালিত হয।| বাংলাদেশে দর্শনা তে এই ট্রেন এর কর্মীদল এবং ইঞ্জিন এর বদল হয। এই যাত্রাপথে দুটি প্রধান নদী পারাপারের আছে – গঙ্গার উপর হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও যমুনা নদীর উপর যমুনা বহুমুখী সেতু, যে দুটোই বাংলাদেশে অবস্থিত।

মৈত্রী ট্রেনের টিকেট ক্রয় ও সময় সূচী

বাংলাদেশের অন্যান্য ট্রেনের টিকেট অনলাইনে ক্রয় করা গেলেও মৈত্রী ট্রেনের টিকেট অনলাইনে ক্রয় করা যায় না। এ ট্রেনের টিকেট শুধুমাত্র নির্দিষ্ট স্টেশনের কাউন্টারের স্থানীয় মুদ্রায় ক্রয় করতে হয়।

ঢাকা তে টিকিট শুধুমাত্র কমলাপুর  রেল স্টেশনের নির্দিষ্ট কাউন্টার থেকে পাওয়া যায়। কলকাতায় টিকিট ডালহৌসি স্কোয়ার এর ফেয়ারলি প্লেস এ আন্তর্জাতিক টিকেট বুকিং কাউন্টার থেকে এবং কলকাতা স্টেশন থেকে ক্রয় করা যায়।

টিকিট নেবার সময় সকাল নটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত। ত্রিশ দিন পর্যন্ত অগ্রিম টিকিট নিতে পারবেন, তবে পাঁচ বা ছয় দিন আগে গেলে টিকিট নাও পেতে পারেন। সস্তা ও আরামদায়ক হবার কারণে অনেকের প্রথম পছন্দ থাকে ট্রেন। ত্রিশ দিনের আগে কোনভাবেই অগ্রিম টিকিট নিতে পারবেন না।

মৈত্রী ট্রেনে যেতে চাইলে ভিসা আবেদনের সময় এন্ট্রি পোর্ট হিসেবে ভারতের ক্ষেত্রে গেদে ও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দর্শনা উল্লেখ করতে হবে। আর টিকেট ক্রয় করার সময় পাসপোর্ট দেখানো বাধ্যতামূলক। যদি সব যাত্রী টিকেট বুকিং করার সময় উপস্থিত না থাকে তাহলে একটি অনুমোদন চিঠির প্রয়োজন।

* মৈত্রী ট্রেন ঢাকা থেকে সকাল আটটা দশ মিনিটে (০৮:১০) ছাড়ে। কলকাতার চিতপুর স্টেশন থেকে ছাড়বে সকাল সাতটা ১০ মিনিটে।

* ট্রেন এর রিটার্ন টিকিট কাটা সম্ভব কমলাপুর স্টেশন থেকেই। তবে রিটার্ন টিকিটের মাত্র ২০ শতাংশ দেয়া হয় ঢাকা থেকে। বাকি ৮০ শতাংশ কলকাতা থেকে কাটার জন্য বরাদ্দ থাকে। তাই রিটার্ন টিকিট কিনতে পারাটা কিছুটা ভাগ্যের বিষয়।

* আপাতত সপ্তাহে তিনবার করে আপ এবং ডাউন করছে মৈত্রী। তবে সামনে আরও বাড়বে বলে শোনা যায়।

* ঢাকা থেকে কলকাতা: শুক্রবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৭), শনিবার (রেলগাড়ি নং ৩১১০), রবিবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৭), বুধবার (রেলগাড়ি নং ৩১১০)।

* কলকাতা থেকে ঢাকা: শনিবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৮), সোমবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৮), মঙ্গলবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৯), শুক্রবার (রেলগাড়ি নং ৩১০৯)।

মৈত্রী এক্সপ্রেসের ভাড়া ও সময়সূচী দেখতে বাংলাদেশ রেলওয়ের ওয়েব সাইট ভিজিট করুন।

টিকেটের মূল্য

মৈত্রী ট্রেনে করে কলকাতা যাওয়া বাসের তুলনায় বেশ সস্তা। তাই অনেকেই এটাই চেষ্টা করেন।

এসি ফার্স্টক্লাস কেবিন: ৩৪০০ টাকা। (ভ্রমণ ট্যাক্স সহ)

এসি চেয়ার কার: ২৫০০ টাকা ( (ভ্রমণ ট্যাক্স সহ)

৫০ শতাংশ ডিসকাউন্ট রয়েছে ১ থেকে ৫ বছরের শিশুদের জন্য। বয়স নির্ধারণ করা হবে পাসপোর্টে উল্লেখিত জন্মতারিখ অনুসারে। ৫ বছর এর উপরে হলে পুরো টিকিট করতে হবে। আন্তর্জাতিক পরিবহন বলে খরচের হিসেবটা ডলারে দেখানো হয়েছে। সময়ে সময়ে সেটা কিছুটা ওঠানামা করতে পারে।

এর আগে ট্রাভেল ট্যাক্স ছিল জনপ্রতি ৫০০ টাকা। সেটা এখন জনপ্রতি ৫৪০ টাকা হয়েছে শুধুমাত্র বেনাপোল ও ট্রেন এর যাত্রীদের জন্য গত ১লা জুলাই থেকে।

ব্যাগেজ

ভ্রমণে ব্যাগেজ একটা বেশ বড় ঝামেলা , আর যদি হয় লম্বা জার্নি, তাহলে তো কথাই নেই। যেহেতু আপনি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করছেন, তাই ব্যাগেজ বিষয়ে আপনাকে সচেতন হতে হবে। কারণ আপনাকে ইমিগ্রেশন পার হতে হবে।

মৈত্রী ট্রেনে  সর্বোচ্চ কত কেজি নেওয়া যায় ? একজন পূর্ণবয়স্ক যাত্রী ত্রিশ কেজি পর্যন্ত বাড়তি খরচ করা ছাড়াই নিতে পারবেন। সাথে যদি শিশু থাকে, তার ক্ষেত্রে ২০ কেজি পর্যন্ত বাড়তি খরচ ছাড়া নেয়া সম্ভব।

বাড়তি লাগেজ এর জন্য দিতে হবে বাড়তি চার্জ ।  ৩১ কেজি থেকে ৫০ কেজি পর্যন্ত নিতে হলে প্রতি কেজিতে বাড়তি দিতে হবে দুই ডলার সমপরিমাণ অর্থ। ৫১ কেজি থেকে ১০০ কেজি পর্যন্ত প্রতি কেজিতে বাড়তি দিতে হবে ১০ ডলার। এই বিশাল পরিমাণ খরচ বাঁচাবার জন্য সেরা উপায় হল, লাগেজ এর ওজন ৩০ কেজির মাঝেই সীমাবদ্ধ রাখা।

শেষ কথাঃ 

দুই বন্ধু প্রতীম দেশের মধ্যে সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার সম্প্রসারণে চালুর পরই ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে কলকাতা-ঢাকা মৈত্রী এক্সপ্রেস। ধীরে জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। তত্বাবধায়ক সরকারের একটি বড় সাফল্য হল মৈত্রী ট্রেন।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক