যক্ষ্মা কি? কিভাবে হয়, এর প্রতিকার ও প্রতিরোধ

যক্ষ্মা বা যক্ষা আমাদের সকলের পরিচিত মারাত্মক সংক্রামক রোগ যা প্রাথমিকভাবে ফুসফুসকে আক্রান্ত করে। এটি একমাত্র জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট প্রদাহজনিত রোগ যা সারা বিশ্বে মৃত্যুর কারন হিসেবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে। যক্ষ্মা ভয়াবহতা এমন মারাত্মক যে শুধুমাত্র ২০১৫ সালে ১ কোটি ৮০ লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল। একই সাথে ১০ কোটি ৪০ লক্ষ লোক যক্ষায় আক্রান্ত হয়।

যক্ষ্মা একটি প্রাচীন রোগ। এক কালে এই রোগটি বেশ আতঙ্কের বিষয় ছিল। যিশু খ্রিস্টের জন্মের তিন হাজার সাতশ বছর আগে প্রথম ইজিপ্টের এক মমির ভেতর যক্ষ্মা রোগের জীবাণু পাওয়া গিয়েছিল। এর ওপরে গবেষণা করতে করতে, ১৮৮০ সালে জন পক্স পালমোনারি টিউবার কোলোসিসের ভ্যাকসিন ভিসিজি আবিষ্কার করেন। তার দুই বছর পর ৮২ সালে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু আবিষ্কার করা হয়।

১৮৮২ সালে জার্মান বিজ্ঞানী রবার্ট কোথ এই রোগ আবিষ্কারের পূর্বে ১৬ ও ১৯ শতাব্দিতে ইউরো ও আমেরিকায় মহামারি আকারে দেখা দিয়েছিল।

রবার্ট কোঁখের এই আবিষ্কারের পরে এই রোগ নির্মূলে ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হয়, ও পরবর্তীতে বিভিন্ন ওষুধ আবিষ্কারের কারনে বিশ্বব্যাপী এই রোগের প্রকোপ আস্তে আস্তে কমে আসে। এদিকে ২০২৫ সালের মধ্যে যক্ষা রোগটি বিশ্বও থেকে পুরুপুরি নির্মুল হবে বলে জাতিসংঘ প্রত্যাশা করছে ।

যক্ষ্মা বা যক্ষা কি?

“যক্ষ্মা” শব্দটা এসেছে “রাজক্ষয়” থেকে। ক্ষয় বলার কারণ এতে রোগীরা খুব শীর্ণ (রোগা) হয়ে পড়েন ।

যক্ষ্মা বা যক্ষা (Tuberculosis বা টিবি) একটি সংক্রামক রোগ। মাইকোব্যাক্টেরিয়াম টিউবারকিউলোসিস (Mycobacterium tuberculosis) নামক একটি জীবাণু এই রোগের জন্য দায়ী।

যক্ষ্মা রোগে সবচেয়ে বেশী আক্রান্ত হয় ফুসফুস, যদিও হৃৎপিণ্ড, অগ্ন্যাশয়, ঐচ্ছিক পেশী ও থাইরয়েড গ্রন্থি ছাড়া শরীরের প্রায় যেকোনও অঙ্গেই যক্ষ্মা রোগ হতে পারে এমনকি কিডনি, মেরুদন্ড অথবা মস্তিষ্ক পর্যন্ত আক্রান্ত হতে পারে।

যক্ষায় সংক্রমিত প্রতি দশ (১০) জনের মধ্যে একজনের সক্রিয় যক্ষা হতে পারে। পৃথিবীর যক্ষ্মা রোগীদের প্রায় এক তৃতীয়াংশেরও বেশী ভারতীয় উপমহাদেশে বাস করে। তবে,  জীবাণু শরীরে ঢুকলেই কিন্তু যক্ষ্মা হয় না। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হলে যক্ষ্মা হওয়ার সম্ভবনা তুলনামূলক বেশি থাকে।

যক্ষার প্রকারভেদ

চিকিৎসকগণ সাধারণত দু ধরনের যক্ষার কথা বলে থাকেন।

সুপ্ত যক্ষা বা  Latcut TB:

যক্ষা সৃষ্টিকারী জীবাণু সুপ্তাবস্থায় থাকে ও শারীরিক কোন লক্ষণ প্রকাশ করেনা বা ছড়ায় না। কিন্তু যে কোন সময় এটি সক্রিয় হতে পারে। ধারনা করা হয়, সারা পৃথিবীতে এক তৃতীয়াংশ জনগণ সুপ্ত যক্ষ্মায় আক্রান্ত এবং এর মধ্যে ১০ শতাংশ যে কোন সময় সক্রীয় যক্ষা রোগ সৃষ্টি ক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে পারে।

সক্রিয় যক্ষা বা Active TB : 

লক্ষণ প্রকাশকারী যক্ষা ও সংক্রামক ধরনের। সুপ্ত যক্ষার তুলনায় সক্রিয় যক্ষায় আক্রান্ত লোকের সংখ্যা কম। যক্ষ্মা যে কোন বয়সে যে কোথাও হতে পারে তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এর প্রকোপ বেশি দেখা যায়।

বছরের পর বছর ধরে যক্ষার জীবাণু শরীরে থাকলে পরবর্তীতে এটি সক্রিয় যক্ষায় রূপ নিতে পারে। সাধারণত বয়স, ঔষধ সেবন, অপুষ্টি, কেমোথেরাপী, মদপান ইত্যাদির জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সক্রিয় যক্ষা হতে পারে। সংক্রমণের প্রথম দুই বছরের মধ্যে যক্ষা হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে।

সাধারণত বয়স, ঔষধ সেবন, অপুষ্টি, কেমোথেরাপী, মদপান ইত্যাদির জন্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেলে সক্রিয় যক্ষা হতে পারে।

যক্ষ্মা কেন হয়

যক্ষ্মা মূলত একটি সংক্রামক রোগ। বলা হচ্ছে, সংক্রামক রোগের ভেতর সারা পৃথিবীতে যক্ষ্মাই ‘টপ কিলার’ বা ‘শীর্ষ খুনি’। মাইক্রোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিস নামে এক প্রকার ব্যাকটেরিয়া এই রোগের জন্য দায়ী।

জীবাণুর সঙ্গে মিলিয়ে ডাক্তারি ভাষায় এই রোগের নাম রাখা হয়েছে ‘টিউবারকুলোসিস’। সংক্ষেপে টিবি নামেই সবাই চেনে। এককালে যক্ষ্মাকে ‘ক্ষয় রোগ’ বা ‘রাজ রোগ’ বলা হতো। কারণ, এই রোগে রোগী খুবই শীর্ণ হয়ে পড়ে, আর মৃত্যু ছিল প্রায় অবধারিত। যক্ষ্মা এখন নিরাময়যোগ্য অসুখ।

শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে যক্ষার জীবাণু প্রবেশ করলে  : রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে যক্ষার জীবাণু ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। জীবাণুগুলো ফুসফুসে স্থায়ীভাবে আরও দ্বিগুণ হয়ে থেকে যেতে পারে। এর ফলে যক্ষার সংক্রমণ হতে পারে তবে এর উপসর্গগুলো বোঝা যায় না এবং রোগ ছড়ায় না।

রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হলে যক্ষার জীবাণু ফুসফুসে এবং শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে যেতে পারে এবং তা রোগ প্রতিরোধী কোষগুলো ধ্বংস করে দিতে পারে। বছরের পর বছর ধরে যক্ষার জীবাণু শরীরে থাকলে পরবর্তীতে এটি সক্রিয় যক্ষায় রূপ নিতে পারে।

যক্ষা রোগের জীবাণু যেভাবে ছড়ায়

বাতাসের মাধ্যমে যক্ষা রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে রোগের জীবাণু বাতাসে মিশে যক্ষা রোগের সংক্রমণ ঘটায়। যক্ষ্মা রোগীর প্লেট, গ্লাস এমনকি বিছানা আলাদা করে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।  এ ছাড়া কাঁচা দুধ, পাস্তুরিত দুধের মাধ্যমেও ছড়াতে পারে যক্ষ্মা।

ঘন বসতি, নোংরা, অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন, নিম্ন জীবনমান, অপুষ্টি, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার অভাব ইত্যাদি যক্ষ্মা সংক্রমণে সাহায্য করে।

এটি যেহেতু হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে ছড়ায়, তাই যার এ রোগ আছে তাকে কিছু ব্যপারে সতর্ক হতে হবে। যেমন- হাঁচি বা কাশির সময় মুখে রুমাল দেওয়া, হাত দিয়ে মুখ ঢাকা অথবা একদিকে সরে কাশি দিতে হবে। যেখানে সেখানে থুতু বা কফ ফেলা যাবে না। আক্রান্ত ব্যক্তির মুখের কাছাকাছি গিয়ে কথা বললে এ রোগের জীবাণু ছড়াতে পারে।

তাই দেখা যায়, সংক্রামক রোগ হবার কারনে আক্রান্ত ব্যক্তি যদি কাছের মানুষ হয় তবে এই রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা বেশি থাকে। বিশেষ করে আক্রান্ত রোগীর মুখের কফ বা লালার সংস্পর্শেই আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকেন – যেমনঃ  রোগীর ব্যবহৃত – গ্লাস বা কাপ ইত্যাদি যদি ভাল ভাবে পরিস্কার না করে অন্য একজন সেই জিনিস দিয়ে কিছু খেয়ে থাকেন – তা হলে লুকানো জীবাণু আক্রমণ করতে পারে ।

ঠিক তদ্রুপ – সিগারেট বা যে কোন কিছুই একজন আরেক জনের মুখের কিছু ভাগা ভাগি করে খেলে খুবি সাবধানে খেতে হয় – অজানা কার ও অবশ্যই না – এ রকম ও দেখা গেছে আক্রান্ত ব্যক্তি ঘাসের মধ্যে কফ ফেলে তখন সুস্থ গাভী যখন সেই ঘাস খায় – সে ও আক্রান্ত হওয়ার পর তার দুধ খাওয়ায় সুস্থ ব্যক্তি টিবি তে আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন – অর্থাৎ যেভাবেই হউক শ্বাস নালি বা খাদ্য নালির ভিতর এই জীবাণু ঢুকতে পারলেই – আক্রান্ত হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।

অন্যদিকে যক্ষা চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক ব্যবহার হয়ে আসছে, দেখা যায় এর যথেচ্ছ ব্যবহারের কারনে যক্ষা সৃষ্টিকারী জীবাণুরনতুন নতুন প্রজাতি তৈরি হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে এন্টিবায়োটিক ঠিক মত কাজ করছেনা ও মাল্টি ড্রাগ রেসিস্ট্যাণ্ট টিবি ( এম ডি আর – টিবি) তৈরি হচ্ছে, যার মাধ্যমে সুস্থ ব্যাক্তি আক্রান্ত হচ্ছে।

উপসর্গ ও লক্ষণ (Symptom & Sign):

পৃথিবীর যক্ষ্মা রোগীদের এক তৃতীয়াংশেরও বেশী (প্রায় অর্ধেক) ভারতীয় উপমহাদেশে বসবাস।  জীবাণু শরীরে ঢুকলেই সবার যক্ষ্মা হয় না। যাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রে যক্ষ্মা বেশি হয় | ফুসফুসে যক্ষ্মা হলে হাল্কা জ্বর ও কাশি হতে পারে। কাশির সঙ্গে গলার ভিতর থেকে থুতুতে রক্তও বেরোতে পারে। মুখ না ঢেকে কাশলে যক্ষ্মা সংক্রমণিত থুতুর ফোঁটা বাতাসে ছড়ায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট হিসেবে ৫-৬ মাস জ্বর থাকার মূল কারণ এই টিবি। এক নাগারে তিন সপ্তাহের বেশি কাশি, জ্বর, কাশির সাথে কফ এবং মাঝে মাঝে রক্ত বের হওয়া ইত্যাদি ফুসফুসের যক্ষার প্রধান উপসর্গ।

  • রোগী দীর্ঘদিন যাবত খুসখুসে কাশিতে ভুগতে থাকে ।
  • ধীরে ধীরে ক্ষুধামন্দা, ওজন কমে যাওয়া ও সন্ধ্যার দিকে অল্প অল্প জ্বর হতে থাকা ।
  • হাঁটাহাটি করলে ক্লান্তি লাগবে-এমনকি শ্বাসকষ্টও হতে পারে।
  •  কফ হবে। সেই কফ আর সারবে না। সাধারণ এন্টিবায়টিক খেলেও সারবে না।
  • ঠিক মতো চিকিৎসা না হলে শেষের দিকে কাশের সাথে রক্ত যাওয়া, ফুসফুসে পানি জমা, শ্বাসকষ্ট, বুকে ব্যথা ইত্যাদি নানা ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে ।
  • শ্বাস নেয়ার সময় অথবা কাশি বা হাঁচির সময়  বুকে ব্যথা হওয়া
  • শিশুদের ক্ষেত্রে সাধারণত জ্বর আসা, খাওয়ার অরুচি, ওজন কমে যাওয়া এসব লক্ষণ দেখা যায় । খুব কম শিশুরই কাশির সাথে রক্ত যায়।
  • দীর্ঘদিন স্থায়ী গলা ভাঙ্গা বা স্বর বসে যাওয়াও যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ হতে পারে।

যক্ষা ফুসফুস থেকে অন্যান্য অঙ্গেও ছড়িয়ে পরতে পারে বিশেষ করে যাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাদের এবং বাচ্চাদের ক্ষেত্রে। তখন একে “অ-শ্বাসতন্ত্রীয় যক্ষা” (Extrapulmonary Tuberculosis) বলা হয়, যেমন প্লুরাতে প্লুরিসি, কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রে মেনিনজাইটিস, লসিকাতন্ত্রে স্ক্রফুলা, প্রজনন তন্ত্রে প্রজনন তন্ত্রীয় যক্ষা, পরিপাক তন্ত্রে পরিপাক তন্ত্রীয় যক্ষা এবং অস্থিকলায় পট’স ডিজিস।

বিশেষ ধরনের ছড়িয়ে যাওয়া যক্ষাকে বলা হয় মিলিয়ারী যক্ষা (Miliary tuberculosis)। অনেক ক্ষেত্রে ফুসফুসীয় এবং অ-ফুসফুসীয় যক্ষা একসাথে বিদ্যমান থাক্তে পারে। ফুসফুস বহির্ভূত যক্ষার লক্ষণ–

  • চামড়ায় যক্ষ্মা হলে চামড়া ফুলে যায়, লাল হয়ে ওঠে, ঘা হয় এবং কালো কালো দাগ হতে পারে। ঘা এর মাঝখানে কিছুটা নিচু থাকে।
  • অন্ত্র ও খাদ্যনালীর যক্ষা–  লক্ষণগুলো হল পেটফাঁপা, পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বদহজম, পাতলা পায়খানা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি।
  • জয়েন্ট, হাড় অথবা শিরদাড়া আক্রান্তের ক্ষেত্রে আক্রান্ত অঙ্গ ফুলে যাবে, ব্যথা হবে এবং শিরদাড়া বাঁকা হয়ে যেতে পারে।
  • অন্ত্র ও খাদ্যনালীর যক্ষ্মার লক্ষণগুলো হল পেটফাঁপা, পেটব্যথা, ক্ষুধামন্দা, বদহজম, পেটের মধ্যে বুটবাট শব্দ হওয়া আবার কখনও কখনও পাতলা পায়খানা, খাবারে অরুচি ইত্যাদি।
  • গ্রন্থি বা গ্লান্ড এর যক্ষা–  গ্রন্থি ফুলে যায়, লাল হয়ে যায় এবং ব্যথা হয়। শরীরের বিভিন্ন গ্রন্থির মধ্যে থেকে সাধারণত ঘাড়েরগ্রন্থিগুলোতে এই যক্ষা বেশি হতে পারে।
  • কিডনি ও মূত্রনালীতে যক্ষ্মা–  পেটের পাশে, কোমড়ের উপরে ব্যথা হয়। প্রস্রাবের সঙ্গে রক্তপাত হতে পারে তবে অনেক সময় তা খালি চোখেদেখা যায় না। প্রস্রাবে জ্বালাপোড়া এবং ঘন ঘন প্রস্রাব হতে পারে।

তবে এসব লক্ষণ শুধু মাত্র প্রাথমিক ধারনার জন্য, পুরপুরি নিশ্চিত হওয়ার জন্য অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ  গ্রহণ করতে হবে।

মনে রাখতে হবে, কারও শরীরে যক্ষ্মার সাধারণ লক্ষণসমূহ দেখা দিলে আর বিলম্ব না করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হবে কারণ এই অবস্থায় যে কোন লোকেরই যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি।

রোগ নির্ণয় (Dignosis):

যক্ষ্মা রোগের লক্ষণ ও উপসর্গগুলো কারো দেখা গেলে এবং তার আশেপাশে আক্রান্ত রোগী থাকলে তা থেকে যক্ষ্মা হয়েছে বলে সন্দেহ করা যেতে পারে । এ অবস্থায় রোগীর কতগুলো পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে হয়। সাধারণত ডাক্তারগন রোগীকে নিচের তিনটি পরীক্ষা করতে দেন।

১) বুকের এক্স-রে, (২) রোগীর কফ পরীক্ষা, (৩) রোগীর রক্ত পরীক্ষা

এর মধ্যে কফ পরীক্ষা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ । কারণ কফের মধ্যে যক্ষ্মা রোগের জীবাণু পাওয়া গেলে তা এ রোগের প্রত্যক্ষ প্রমাণ । যে লোকের কাশি তিন সপ্তাহের বেশী স্থায়ী তার বুকের ভেতরের কফ অবশ্যই পরীক্ষা করতে হবে । এছাড়া রোগীর বুকের এক্স-রে দেখেও যক্ষ্মা শনাক্ত করা সম্ভব । প্রয়োজনানুসারে ডাক্তার রোগীকে রক্তের পরিক্ষা দেন

যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা

একটি কথা আছে, ‘যার হয় যক্ষ্মা তার নেই রক্ষা’। এই তথাকথিত ভয়ঙ্কর রোগটি কিন্তু এখন আর অতটা ভয়ঙ্কর নেই। কিন্তু বর্তমান আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার কল্যাণে যক্ষ্মা থেকে অবশ্যই রক্ষা পাওয়া সম্ভব। তবে এ ক্ষেত্রে,  যক্ষ্মায় আক্রান্ত হলে অবশ্যই পূর্ণমাত্রায় চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে৷ ওষুধের কোর্স অসম্পূর্ণ রাখলে চলবে না৷

ডাক্তার ও রোগীর সমন্বিত প্রচেষ্টা এবং সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে-যক্ষ্মা বা টিবি রোগ- এখন খুব সহজেই নিরাময় সম্ভব।  চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী রোগীকে ধৈর্য সহকারে এ রোগের জন্য চিকিৎসা নিতে হবে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ও জাতীয়-যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ-কর্মসূচির সমন্বিত উদ্যোগে যক্ষ্মা বা টিবি রোগ চিকিৎসার একটি সুন্দর চিকিৎসা নির্দেশিকা প্রণয়ন করেছে, যা অনুসরণ করে যক্ষ্মার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করা যায়।

বাংলাদেশ সরকার সুচিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য পুরো চিকিৎসার ওষুধ বিনামূল্যে দিয়ে থাকে। যাতে অর্থের অভাবে কোন রোগীর চিকিৎসা ব্যাহত না হয়। যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসায় সাফল্যের জন্য ডাক্তার ও রোগীর সুসমন্বিত-প্রয়াসের পাশাপাশি এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও আবশ্যক।

চিকিৎসককে রোগীদের এ রোগ সম্পর্কে ভালো ধারণা দিতে হবে, এ রোগের চিকিৎসা ও চিকিৎসার সময়-ঠিকমতো চিকিৎসা না নেয়ার কুফল- চিকিৎসা শেষ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা প্রক্রিয়ার সাথে-যুক্ত থাকার গুরুত্ব ইত্যাদি ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে হবে। যক্ষ্মা বা টিবি রোগের ওষুধগুলো উচ্চমাত্রার বিধায় এগুলোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সম্পর্কে রোগীকে অবহিত করতে হবে। পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দিলে রোগীর করণীয় বিষয়েও রোগীকে ভালোভাবে বুঝাতে হবে।

সাধারণত যক্ষার ওষুধ কিছুদিন খাওয়ার পর শতকরা ৮০ ভাগ লক্ষণ চলে যায়। তখন রোগী ভাবে সে হয়তো সম্পূর্ণ ভালো হয়ে গেছে এবং ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দেয়। এর ফলাফল মারাত্মক হতে পারে। এ রকম পরিস্থিতি হলে, অন্যরকম চিকিৎসা শুরু করতে হয়। তখন ওষুধ দিয়ে পুনরায় চিকিৎসা আরম্ভ করতে হয়।

রোগীকে নিয়মিতভাবে মাঠকর্মীদের নিবিড় পর্যবেক্ষণে-রাখতে হবে-যাতে তারা চিকিৎসা প্রক্রিয়া থেকে কোনোভাবেই বিচ্ছিন্ন না হয়। অনিয়িমিত ওষুধ গ্রহণ বা নির্ধারিত সময়ের পূর্বেই ওষুধ খাওয়া বন্ধ করার ফলে-নিরাময়যোগ্য যক্ষ্মা বা টিবি রোগ কষ্টসাধ্য নিরাময় ও ব্যয়বহুল মাল্টিড্রাগ রেসিট্যান্ট টিবিতে মোড় নেয়, যা এ রোগের একটি ভয়াবহ পর্যায়।

মনে রাখতে হবে যক্ষ্মা ছোঁয়াচে রোগ। যক্ষ্মার জীবাণু পুরোপুরি দূর না হওয়া পর্যন্ত বা পুরোপুরি সেরে না যাওয়া পর্যন্ত রোগীকে অন্য আর সবার থেকে আলাদা থাকতে হবে৷ ডাক্তারের পরামর্শ মতো নিয়ম মেনে রোগীকে নিয়মিত ওষুধ সেবন করতে হবে।

•    সাধারণত গুরুতর অসুস্থ রোগীদের কিছু দিনের জন্যে বিশ্রামে থাকতে হবে
•    যে সব রোগীদের কফ পরীক্ষায় যক্ষ্মার জীবাণু পাওয়া গেছে, রোগীর থাকার ঘর শুকনো এবং উষ্ণ হতে হবে
•    রোগীকে মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, ডাল ইত্যাদি প্রোটিন সমৃদ্ধ খাবার বেশি খেতে হবে।
•    যক্ষ্মার ওষুধ রোগীর বয়স ও ওজন অনুযায়ী সঠিক মাত্রা নির্ধারণ করে প্রয়োগ করতে হবে।

যক্ষ্মা রোগ প্রতিরোধের উপায়
যক্ষ্মা বা টিবি রোগের সংক্রমণ থেকে বাঁচতে একজন সুস্থ ব্যক্তিকে নিম্মলিখিত বিষয়গুলোর ব্যপারে সাবধান হতে হবেঃ

  • জন্মের পর পর প্রত্যেক শিশুকে বিসিজি টিকা দিতে হবে।
  • পুষ্টিকর ও সুষম খাদ্য গ্রহণের মাধ্যমে শরীরের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে হবে।
  • বাসস্থানের পরিবেশ খোলামেলা, আলো-বাতাস সম্পন্ন হতে হবে।
  • জনাকীর্ণ পরিবেশে বসবাস যথাসম্ভব পরিহার করতে হবে।
  • হাঁচি-কাশি দেয়ার সময় রুমাল ব্যবহার করা
  • রোগীর কফ থুথু নির্দিষ্ট পাত্রে ফেলে তা মাটিতে পুঁতে ফেলা
  • ডায়াবেটিস জাতীয় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসকারী রোগের ক্ষেত্রে, সুষ্ঠু চিকিৎসা নিতে হবে।
  • যক্ষ্মা আক্রান্ত রোগীকে সবসময় নাক মুখ ঢেকে চলাচল করতে হবে।
  • যক্ষ্মা জীবাণুযুক্ত রোগীর সাথে কথা বলার সময় একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
  • রোগী জীবাণুমুক্ত না হওয়া পর্যন্ত রোগীকে অন্য সবার থেকে একটু আলাদা রাখতে হবে।
  • জীবাণুযুক্ত রোগীকে যেখানে সেখানে কফ ফেলা পরিহার করতে হবে।

তথ্যসূঃ তথ্য সূত্রঃ উইকিপিডিয়া, এনটিভি সহ নানা অনলাইন পোর্টাল।

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক