সোভিয়েত ইউনিয়ন তথা রাশিয়ার ইতিহাস ও উত্থান-পতন

রাশিয়া নামটা শুনলেই সবার হয়ত বিশ্ব মানচিত্রের বড় একটা অংশের ম্যাপ ভেসে উঠে। ছোট বেলা থেকে যখন বিশ্ব মানচিত্র দেখতাম মানচিত্রের উপরের অংশ জুড়ে রাশিয়া নামে একটা দেশের সীমানা দেখাতো। আমরা জানি পৃথিবী গোল মানে ফুটবলের মত, যদিও উপরে নীচের দিকে একটু চাপা মানে কমলা লেবুর আকৃতি ধরা যায় । মানচিত্র খুললে দেখতাম আরেরিকার পাশেও রাশিয়া নামের ছোট্ট একটা অংশ। তখন ভাবতাম একটা দেশ দুই জায়গায় কেন ! এক ফ্রেন্ডকে বললাম আচ্ছা রাশিয়া কি দুইটা ?  ও তখন হাসতেছিল। তখন সে বলেছিল জানিসই পৃথিবী গোল, ধর একটা ফুটবলকে কাটলি এবার মানচিত্রের মত এটাকে বিছিয়ে ধর দেখ দুই রাশিয়া মূলত একই কাটার ফলে আলাদা হয়ে গেছে। যাই হোক মানচিত্রের গোলকধাঁধা থেকে বর্তমানে ফিরে আসি।

আক্ষরিক অর্থেই রাশিয়ার আয়তন বিশালাকৃতির। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাগ হবার পূর্বে পৃথিবীর মোট স্থলভাগের ছয় ভাগের একভাগ ছিল এর আয়তন ! বিশ্বাস করা যায় যেখানে প্রায় ১৯০ টি দেশের আয়তন ছিল প্রায় ছয়ভাগের পাচ ভাগ আর রাশিয়া একাই ছিল এক ভাগ ! হুম এগুলো অতীত হলেও কিন্ত এখনও রাশিয়া আয়তনে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় দেশ।

রাশিয়ার ভৌগলিক অবস্থা

রাশিয়া সরকারিভাবে রুশ ফেডারেশন নামে পরিচিত। দেশটি বেশিরভাগ অংশ এশিয়া মহাদেশে পড়লে, রাজধানী ইউরোপে পড়েছেন।  উত্তর ইউরেশিয়াতে অবস্থিত রাশিয়া এখনো বিশ্বের বৃহত্তম দেশ।  রাশিয়া বিশ্বের বৃহত্তম দেশ যার রয়েছে পৃথিবীর মোট আবাসযোগ্য জমির এক অষ্টমাংশ। দেশটির মোট আয়তন ১৭,০৭৫,৪০০ বর্গকিলোমিটার (৬,৫৯২,৮০০ বর্গমাইল)।

রাশিয়ার উত্তর পশ্চিম থেকে দক্ষিন-পূর্ব পর্যন্ত নরওয়ে, ফিনল্যান্ড, এস্তেনিয়া, লিথুনিয়া ও বেলারুশ, ইউক্রেন, জর্জিয়া, আজারবাইজান, কাজাখস্থান, চীন, মঙ্গোলিয়া ও উত্তর কোরিয়া। দেশটির অখতস্ক সাগরের মাধ্যমে জাপানের সাথে ও বেরিং প্রণালীতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার সাথে সামুদ্রিক সীমানা রয়েছে।। রাশিয়া বিশ্বের নবম জনবহুল দেশ যেখানে ২০১২ হিসাব অনুযায়ী ১৪৩ মিলিয়ন লোক বসবাস করে।

রাশিয়া ইউরেশিয়া ভূ-ভাগের উত্তর অংশের বেশির ভাগ এলাকা জুড়ে  অবস্থান করছে । পূর্ব ইউরোপ এবং উত্তর এশিয়ার বেশির ভূ-খন্ড রাশিয়াতে পড়েছে।  বিশালাকৃতির রাশিয়ার প্রকৃতি একই সাথে বৈচিত্র্যময় ও বৈচিত্র্যহীন। উত্তর থেকে দক্ষিণে তুন্দ্রা, তৈগা, স্তেপ ও অর্ধ-ঊষর মরুভূমি বিস্তৃত। এটি শীতলতম দেশ বলে এ দেশে সারাবছর হিমশীতল এবং শৈত্যপূর্ণ থাকে। অতিরিক্ত আর্কটিক বরফাচ্ছন্নের, অতি উচ্চভূমি এবং রুশ প্রকৃতির দ্বারা শৈত্যপ্রবাহ সৃষ্টি হয় এবং সারাদিন শৈত্যপ্রবাহ চলতে থাকে।  রাশিয়াতে বছরের ১০ মাস শৈত্যপ্রবাহ (সেপ্টেম্বর-মে) এবং ৮ মাস বরফাচ্ছন্ন (অক্টোবর-এপ্রিল) থাকে। রাশিয়ার সাইবেরিয়া এলাকায় সারাদিন ঠাণ্ডা ও শৈত্যপ্রবাহ থাকে এবং পশ্চিম-দক্ষিণাংশে গরম থাকে।

ছবিঃ ইউটিউব

ইতিহাস

অন্যান্য দেশের মত প্রাচীন রাশিয়াও প্রথম দিকে স্থানান্তরিত লোকজন ও প্রাচীন রাজ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠে। প্রকৃতপক্ষে, প্রথমদিকে রাশিয়ার “রাশিয়া” ছিল না, বরং বেশ কিছু শহরের সমন্বয়ে ধীরে ধীরে একটি সাম্রাজ্যে পরিণত হয়। দেশটির ইতিহাস শুরু হয় ৩য় ও ৮ম খ্রিস্টাব্দের মধ্যবর্তী সময়ে পূর্ব স্লাভদের মাধ্যমে যারা ইউরোপের একটি স্বীকৃত জাতি হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ভারাঞ্জিয়ান যোদ্ধা ও তাদের বংশধরদের দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ও শাসিত হয় এবং নবম শতকে দেশটির উত্থান শুরু হয়।

নবম শতকের শুরুর দিকে, বিশাল স্থানান্তরের অংশ হিসেবে ইংল্যান্ড ও পশ্চিম ইউরোপে  স্কেন্ডেনেভিয়ান যারা মূলত ভারাঞ্জিয়ান নামে পরিচিত তারা বাল্টিক সাগর পাড় হয়ে পূর্বে ইউরোপে থিতু হয়। ভারাঞ্জিয়ানদের নেতা লিজেন্ডারী রুরিক ৮৬২ সালের দিকে তার লোকজনকে ভলকভ নদীর ওপারে নভগরড শহরে নিয়ে যায়। এ সময় রুরিক শহরটি জোড় করে দখল করে তার শাসন ভার গ্রহণ করে। নভগরড থেকে পরবর্তিতে রুরিকের উত্তরাধীকারী ওলেগ শহরটির দক্ষিন দিকে ক্ষমতার সম্প্রসারণ ঘটায়।

৮৮২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি কিয়েভের নিয়ন্ত্রণ লাভ করেন, এটি স্লাভিক শহর যা ৫ম শতাব্দীর কাছাকাছি সময়ে ডেন্পার নদী বরাবর উত্থান লাভ করেছিল । কিয়েভের উপরে ওলেগ এর শাসন প্রতিষ্ঠা ঐ অঞ্চলের একটি ঐক্যবদ্ধ রাজবংশীয় রাষ্ট্রের প্রথম প্রতিষ্ঠা। পরবর্তি ৩০০ বছর ধরে কিয়েভ স্ক্যান্ডিনেভিয়া এবং কনস্টান্টিনোপল এবং কিভেন রাশ এর মধ্যকার একটি বাণিজ্যিক রুট কেন্দ্র হয়ে ওঠে।

৯৮৯ খ্রিস্টাব্দে, ওলেগের নাতনি ভালদিমির ঐ রাজ্যের শাসক ছিল, তিনি দক্ষিণে কালো সাগরের মতো, ককেশাস পর্বতমালার এবং ভোলগা নদীর নীচের দিক  পর্যন্ত তার রাজ্যের সম্প্রসারণ ঘটান । একটি রাষ্ট্র ধর্ম প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণের পর, ভালদিমির কয়েকটি কয়েকটি মতবাদ বিবেচনা করেন এবং গ্রীক অর্থোডক্সির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, এইভাবে তিনি কন্সটান্টিনোপল ও পশ্চিমের সাথে নিজেকে যুক্ত করেন। ইসলাম প্রথম রাশিয়ে ঢুকে ৮ম শতাব্দীতে দাগেস্তান হয়ে। কিন্ত ভালদিমি’র ইসলামের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, কারন তার বিশ্বাস ছিল লোকজন এমন ধর্মের অধীনে থাকবে পারবে না যেখানে কঠিনভাবে মাদক পানীয় নিষিদ্ধ।

ভালদিমির প্রচেষ্টা  ইয়োরস্ক্ল্ভ এর মাধ্যমে সফল হয়েছিলেন। ইয়োরস্ক্ল্ভ আইন প্রনয়ন করেন একই সাথে অন্য রাজ্যের সাথে জোট করি করেন এবং তিনি শিল্প-কলাকে উৎসাহিত করেন। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি তার রাজ্য আর সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন এবং তাদের সহযোগিতা ও প্রসার লাভ করার জন্য নিযুক্ত করেন। তবে তারা সাজানোর কিছুই করেনি।

ইয়োরস্ক্লভের মৃত্যুর কয়েক দশকের মধ্যে (1054 সালে), কাইভেন রস ‘আঞ্চলিক শক্তি কেন্দ্রে হয়ে পড়ে। আক্রমণকারীদের থেকে অভ্যন্তরীণ কোন্দল পরিস্থিতি আরো খারাপ করে তুলে। এই সময় আঞ্চলিক রাজ্যের এক রাজকুমার ইউরি ডলগরুকি, মস্কভা ও লেগনিনা এর কাছাকাছি একটি পাহাড়ের উপরে শিকারী লজে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। একটি কাহিনী যা মস্কোর মত ছোট জনবসতির শহরটিকে একটি প্রসিদ্ধ নগর হয়ে উঠার পিছনে কাজ করে।

মোঙ্গলদের আক্রমণ ও মস্কোর উত্থান (1237-1613)

কিভেন রাস’ ১৩ শতকে টিকে থাকতে সংগ্রাম করে কিন্ত নতুন আগ্রমণকারী মোঙ্গলদের দ্বারা মারাত্মকভাবে ধ্বংস হয়ে পড়ে। ১২৩৭ সালে চেংগিস খানের নাতি বাতু খান ভালগা নদীর নীচের দিক তার রাজধানী (বর্তমানে কাজানে অবস্থিত ) থেকে আক্রমণ শুরু করে।

পরবর্তী তিন বছর ধরে মঙ্গোল (বা তাতার’রা) নভগরড এবং পস্কোভ ছাড়া কিভেন রাসের সব প্রধান শহর ধ্বংস করে ফেলে । এ সময় আঞ্চলিক প্রিন্সিপালদের দোষী সাব্যস্ত করা হয় নি, তবে তারা তাতার রাজ্যকে নিয়মিত শ্রদ্ধা জানাতে বাধ্য হয়, যা গোল্ডেন হোরড সাম্রাজ্য হিসাবে পরিচিত হয়ে ওঠে। পশ্চিম ইউরোপ থেকে এই সময়ের মধ্যে রাশিয়ার আক্রমণের প্রচেষ্টা করা হয়েছিল, প্রথমত সুইডেনের (১২৪০) এবং তারপর লভোনিয়ান ব্রাদার্স অফ দ্য সোয়ার্ড (1২4২) দ্বারা, যারা ভয়ানক তেওটনিক  নাইটদের (Teutonic Knights) আঞ্চলিক একটি অংশ ছিল। ঐ সময়ে  রাশিয়ার সেরা সংবাদ হল  উভয়ই  নভগরডের একজন প্রিন্স আলেকজান্ডার নেভস্কি এর কাছে পরাজিত হয়, যিনি নেভা নদীতে সুইডেনের  সাথে তার বিজয় থেকে  তার নামের উপাধী অর্জন করেন।

পরের শতাব্দিতে রাশিয়াতে তেমন কিছু ঘটে নি। মস্কো ১৪ শতক জুড়ে দক্ষিন পশ্চিম তাতাদের সাথে, উত্তর পূরবের শহরগুলির সাথে প্রভাব বিস্তার লাভ করে। শহরের গুরুত্ব বুঝাতে রাশিয়ান অর্থডক্স চার্চ শহরে স্থানান্তরিত করা হয়, যা রাশিয়ার আধ্যাত্মিক শহর হিসেবেব পরিচয় লাভ করে। শতাব্দীর শেষার্ধে মস্কো তাতারদের সরাসরি চ্যালেঞ্জ করার জন্য যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং 1380 খ্রিস্টাব্দে দিমিত্রি ডনসকো নামে একটি মুসস্কোভ রাজপুত্র তাদের আক্রমণ করার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করেছিলেন।

কুলিকোভো ফিল্ডে তাঁর চূড়ান্ত জয়লাভ তাকে তাৎক্ষনিক একজন জনপ্রিয় চরিত্র দান করে। যদিও দুই বছর পরেও তাতার’রা শহরের উপর শাসন ফিরে পায়। ১৪৮০ সালের আগ পর্যন্ত আরেকটি শতাব্দি অতিক্রম করার পরে মস্কো তাতাদের সিংহাসন থেকে তাড়িয়ে দিতে শক্তিশালী হয়ে উঠে।  সেই সময়ে তাতারের শাসক ছিলেন গ্র্যান্ড ডুকে ইভিয়ান III, যিনি ইভান গ্রেট নামেও পরিচিত ছিলেন। ইভান মস্কো প্রতিদ্বন্দ্বী শহরগুলির বেশিরভাগই পরাজিত করে শুরু করেন এবং সময়ের সাথে সাথে তিনি তাতাদের শ্রদ্ধা জানাতে তিনি সমগ্র দেশের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেন। যাইহোক,  তার নাতি ইভান IV রাজত্ব পর্যন্ত রাশিয়া একটি জোট রাষ্ট্র হয়ে উঠে নি।

ইভান IV

ছবিঃ World Atlas

ইভান IV গ্র্যান্ড ডিউক হিসেবে মাত্র তিন বছর বয়সে ১৫৩৩ সালে তার পিতা ভাসিলি III এর স্থলাভিষিক্ত হন। ইভানের মা মারা যাবার পূর্বে আরো ৫ বছর তিনি শাসন করেন। অবশেষে ১৫৪৭ সালে সামরিক পূনর্গঠন করেন এবং তাতাদের আঘাত করার প্রস্তুতি গ্রহণ করেন।

১৫৫২ খ্রিস্টাব্দে তিনি কজেন (বিখ্যাত সেন্ট বেসিলের ক্যাথিড্রাল বিজয় রক্ষার্থে নির্মিত হয় ) এবং ১৫৫৬-এ আস্ট্রকানকে পরাজিত করে গোল্ডেন হরডের ক্ষমতা ধ্বংস করে দেন।  ইভান এর তাতার অভিযান রাশিয়ান সম্প্রসারণের জন্য দিগন্ত খুলে দেয় , এবং তার শাসনামলে সাইবেরিয়াতে উপনিবেশ শুরু হয়।

ইভান IV এর শাসনামলের প্রথম দিকে তাকে এতটা ভয়াবহ মনে হয় নি। বয়স হবার সাথে সাথে তার মেজাজ চড়তে থাকে ১৫৬০ সালের দিকে তিনি বয়য়ার এর বিরুদ্ধে একটি নায়কোচিত ক্যাম্পেইন পরিচালনা করেন, তাদের জমি বাজেয়াতপ্ত করেন বা তার উপর অসন্তুষ্টদের নির্বাসিত করেন।  ১৫৮১ সালে রাগের মাথায় তিনি তার পুত্রকে লোহা দিয়ে আঘাত করে হত্যা করেন।

১৫৮৪ সালে ইভান দি ট্যারিবলের মৃত্যুর পরে তার ছেলে ফিদর উত্তারাধিকার লাভ করে। ফিদর তার রাজ্য পরিচালনার বেশিরভাগ কার্যক্রম তার শ্যালক বরিস গডুনভের হাতে ছেড়ে দেন। বরিস গডুনভ তার নিজের জন্যে রাজ্য ব্যবস্থা গড়ে তুলার কাজে হাত দেয়। ১৫৯১ সালে ফিদরের ছোট ভাইকে প্রাচীন শহর উদলচতে হত্যা করে। ১৫৯৮ সালে ফিদরের মৃত্যুর পরে গডুনভকে জার করা হয় যদি তার শাসনকে পূর্ণ বৈধ হিসেবে গ্রহণ করা হয় নি।

কয়েক বছরের মধ্যে পোলান্ডে একজন ভন্ডের আবির্ভাব ঘটে , সে দিমিত্রি হবার দাবি তুলে এবং ১৬০৪ সালে রাশিয়া আক্রমণ করে। এর পরের বছর হটাত করে গডুনভ মারা যায় সে সময় থেকেই রাশিয়ার সমস্যা শুরু হয়। পরের আট বছরের দুই জন দিমিত্রি হবার মিথ্যা সিংহাসন দাবী করে যারা পোলিস মিলিটারির সমর্থন পায়। অবশেষে ১৬১৩ সালে পোলিশদের মস্কো থেকে বহিস্কার করা হয় এবং মাইকেল রোমানভকে জার হিসেবে ঘোষণা করা হয়। রোমানভের বংশধরেরা পরবর্তি ৩০৪ বছর রাশিয়া শাসন করে। রুশ বিপ্লবের মাধ্যমে জার রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে।

১৬৭২ সালের জুন মাসে মস্কো শহরে সম্রাট অ্যালেক্সিসের দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে জন্ম নেন পিওতর আলেক্সেইভিচ। তার মা ছিলেন জনৈকা তাতার রমণী। মাত্র চার বছর বয়সে পিওতরের বাবা মারা  যায়। রুশ সাম্রাজ্যের ক্ষমতা চলে যায় পিটারের সৎ ভাই, সম্রাট তৃতীয় ফিওদরের হাতে। দুর্বলচিত্তের সম্রাট তার পরিষদদের দ্বারা খুবই প্রভাবিত ছিলেন,  পরিষদের প্ররোচণায় পিটার আর তার পরিবার একরকম কোণঠাসা হয়ে পড়ে। দুর্বল চিত্তের ফিওদর  ১৬৮২ সালে মারা গেলে পিটার আর ফিওদরের উত্তরসূরি পঞ্চম ইভানের অনুসারীদের মধ্যে  ব্যাপক ঝামেলা শুরু হয় । মস্কোর অভিজাতরা ছিলেন পিটারের পক্ষে, অন্যদিকে ইভানকে সমর্থন যোগাচ্ছিলেন বিশেষ রাজকীয় বাহিনী স্ত্রেলতসি এর হর্তাকর্তারা। দুই পক্ষের মধ্যে অবশেষে একটা চুক্তি হয়। চুক্তি অনুসারে পিটার আর ইভান দুজনকেই যুগ্মভাবে রাশিয়ার জার/সম্রাট ঘোষণা করা হয়।এ ঘোষণার সময়   পিটারের বয়স ছিল মাত্র দশ বছর।

যুগ্মভাবে জার ঘোষণা হলে দুই নাবালক জায়ের পক্ষে তখন অভিভাবক হিসেবে কাজ করে ইভানের ২৫ বছর বয়সী বোন সোফিয়া। সোফিয়া কূট চালে পিটারের পরিবারকে হেনস্থা করতে থাকে। এই অবস্থায় পিটারের মা পিটারকে নিয়ে মস্কো থেকে দূরে গ্রামে চলে আসেন।

১৬৮৯ সালে কিন্তু দৃশ্যপট পাল্টে গেল। স্ত্রেলতসি বাহিনীর মধ্যে আরেক দফা বিদ্রোহ দেখা দিলে পিটার এই সুযোগে ক্ষমতা দখল করে বসলেন। ১৬৯৬ সালে ইভান মারা গেলে পুরো ক্ষমতা চলে যায় ২৪ বছরের তরুণ পিটারের হাতে। রাশিয়ার ভাগ্যচক্রও ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হতে শুরু করে।

১৬৯৮ খ্রিস্টাব্দে, ইউরুপ সফরকালে পিটার ক্রেমলিন গার্ডের অন্য একটি বিদ্রোহের খবর পেয়েছিলেন, তিনি ফিরে আসেন, অভ্যুত্থানের প্রচেষ্টাকে পরাজিত করেন এবং সমস্ত বিদ্রোহীকে হটিয়ে দেন।

পিটারের ক্ষমতা গ্রহণ কালে নৌপথে বাণিজ্যের প্রসার ছিল তাই পিটার প্রথমেই দক্ষিনের আজভ অঞ্চল তাতাদের কাছে থেকে দখল করে নেন। তিনি ছন্মবেশে ব্রিটিশ আর ডাচ নৌবাহিনীর কারখানায় কাজ শিখে দেশে এসে এই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আধুনিক নৌবাহিনী গড়ে তুলেন।  ১৭০০ খ্রিস্টাব্দে পিটার ডেনমার্ক, নরওয়ে আর জার্মানের সাথে মিলে সুইডেন আক্রমণ করেন। টানা ২১ বছর ধরে এ যুদ্ধের বিস্তৃতি ছিল ।

পিটার দি গ্রেট

ছবিঃ ThoughtCo

আধুনিক রাশিয়ার রুপকার বলা যায় এই পিটারকে।  পিটার অর্থনীতি ও প্রশাসন ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার করেন। ব্যবসায়ীদের বাড়তি সুবিধা প্রদান করেন করেন।রাশিয়াকে ৫০ টি প্রদেশে ভাগ করে শাসন কাজ কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনা করেন।

পিটার দ্য গ্রেটের সব সংস্কারই যে ভাল কিছু ছিল তা না,  পিটার ছিলেন ভীষণ একগুঁয়ে, ভয়ানক জেদী আর প্রয়োজনে নিষ্ঠুর। সেন্ট পিটার্সবার্গ গড়তে কৃষকদের জোরপূর্বক ধরে নিয়ে কাজে লাগিয়েছিলেন আর এতে করে প্রাণ হারিয়েছিলেন বহু মানুষ। এমন কি  নিজের ছেলেকে নির্যাতন করে হত্যা করিয়েছিলেন অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে। পিটারের অন্যতম ক্ষমতার উৎস ছিল দেশের ধনী লোক আর জমিদারেরা, ফলে কৃষকদের ওপর নেমে আসে অত্যাচারের খড়গ। জানা যায় রুশ সম্রাটের ক্রোধ প্রশমিত করার ক্ষমতা ছিল কেবল তার স্ত্রী ক্যাথরিনের !

১৭২৫ সালে পিটার দি গ্রেটের মৃত্যু হলে তার কোন পুত্রসন্তান জীবিত না থাকায় দ্বিতীয় স্ত্রী ক্যাথরিন রাশিয়ার সিংহাসনে বসেন।

এই শতাব্দিটি নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে কেটে যায় । এর পরে আসে নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণের ইতিহাস। ১৯৪১ সালে জার্মানির হিটলার রাশিয়া দখল করে যে মারাত্মক ভুল করেছিল ঠিক তার ১৩০ বছর আগে আরেক বিশ্ব বিখ্যাত বরেণ্য যোদ্ধা নেপোলিয়ন বোনাপোর্ট রাশিয়া দখল করে আরেক চরম ভুলের সূচনা করেছিলেন। নেপোলিয়ন ও হিটলার দুইজনই অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, রাশিয়া দখল করার চেষ্টা করার মূল্য কতটা ভয়াবহ হতে পারে।

১৮১২ সালে নেপোলিয়ন প্রায় ছয় লক্ষ সৈন্য নিয়ে মস্কো অভিযান শুরু করেন।নেপোলিয়নের পরিকল্পনা ছিল এক বছরেই হয়ত রুশ জাররা নেপলিয়নের পায়ে লুটিয়ে পড়বে। সে লক্ষে তিনি চিন্তা করেন রুশ বাহিনীকে সামনাসামনি যুদ্ধে ধ্বংস করে দিবেন। চতুর রুশরা সম্মুখ যুদ্ধ এড়িয়ে পশ্চাদপসরণ নীতি অবলম্বন করে। এ কারনে  ১৮১২ সালে নেপোলিয়ন প্রায় বিনা বাধায় রাশিয়ার ভূখণ্ডে ঢুকে পড়েন। স্মলেনস্ক কে তখন নেপোলিয়ন প্রায় জনমানহীন অবস্থায় পান। আর ইতোমধ্যে খাদ্যাভাব ও প্রচণ্ড শীতে নেপোলিয়নের এক লক্ষ সৈন্য মারা যায়। নেপলিয়ন জার আলেকজান্ডারকে পরাজিত করতে শীতকাল উপেক্ষা করেই মস্কোর দিকে অগ্রসর হয়।

সেপ্টেম্বরে মস্কোর কাছে রোরডিনোর রণাঙ্গনে নেপোলিয়নের বাহিনী ও রুশদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধে হয়। যুদ্ধে নেপোলিয়ন জয়লাভ করলেও তার সৈন্য আর রসদের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি সাধিত হয়। এদিকে রুশরা চোরাগুপ্তা হামলা শুর করে। প্রচণ্ড খাদ্যাভাবে ও ভয়াবহ শীতে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনী এক চরম অবস্থায় পতিত হয় এবং বহু সৈন্য মারা যায়। এদিকে রুশ সেনাদের গেরিলা কায়দায় পালটা হানায় বহু ক্ষুধার্ত ও রুগ্ন সেনা হতাহত হয়। শেষ পর্যন্ত ৬ লক্ষ সেনার নিয়ে আসা নেপোলিয়ন  মাত্র ৫০,০০০ হাজার সৈন্য নিয়ে দেশে ফিরতে সক্ষম হয়েছিলেন।

নেপোলিয়নের রাশিয়া আক্রমণ

রুশ বিপ্লবের পথে

১৮২৫ সালের দিকে একদল তরুন সামরিক অফিসার কতৃক রাশিয়ায় একটি সাংবিধানিক রাজতন্ত্র গ্রহণের জন্য বাধ্য করার চেষ্টা করে চালায়। কিন্ত তারা সম্পূর্ণরুপে ব্যর্থ হয়। এ পরে নিকোলাস ১ ইউরোপের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল নেতা হয়ে ওঠে। তার উত্তরসূরি আলেকজান্ডার ২ সংস্কারের ক্ষেত্রে নমনীয় হন। ১৮৬১ সালে তিনি ক্রীতদাস প্রথা বিলুপ্ত করে দেন।  যদিও এতে করে তাদের তেমন উপকার হয় নি।

যেহেতু দেশ আরো শিল্পায়িত হয়ে উঠেছিল, তার রাজনৈতিক ব্যবস্থা এমনকি আরও বেশি চাপের সম্মুখীন হয়েছিল।  নিন্ম শ্রেণির লোকজন আরও স্বাধীনতা লাভের চেষ্টা করছিল এ কারনে আরো অরাজকতা বৃদ্ধি পাচ্ছিল এ ক্ষেত্রে সরকার অত্যন্ত রক্ষনশীল ছিল। রাশিয়া আরো শিল্পায়িত, বৃহত্তর, এবং পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠার সাথে সাথে  জার শাসক রা আরো স্বৈরাচারী হয়ে উহটে। বিংশ শতাব্দীতে অবস্থা আরো খারাপ হয়ে উঠে।

ব্লাডি সানডেঃ ১৮৯৪ সালে নিকোলাস দ্বিতীয় সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। তিনি  যোগ্য রাজনৈতিক নেতা ছিলেন না, এবং তাঁর মন্ত্রীরা প্রায় প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন। ১৯০৫ সালে জাপানের আক্রমণে রাশিয়া বেশ কয়েকটি যুদ্ধে পরাজয় বরণ করে, যে কারনে নিকোলাস ২ এর জনপ্রিয়তা কমতে থাকে।  রুশ বিপ্লবের প্রথম সূচনা হয় মূলত ১৯০৫ সালের ২২ জানুয়ারি। ইতিহাসে একে ব্লাডি সানডে হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের শাসনের বিরুদ্ধে সেদিন তরুণ ফাদার গাপনের নেতৃত্বে এক বিক্ষোভ-মিছিল  বের  হয় । এ সময় জারের পেটোয়া বাহিনী জনগণের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।  শত শত মানুষ গুলিতে নিহত হন। আতঙ্কে প্রাণ হারান আরও কয়েকশ মানুষ।

রাশিয়ার শহরজুড়ে সেই ঘটনার প্রতিবাদে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন দেশের জনগণ। এ ঘটনার জের ধরে  হরতাল-অবরোধে স্থবির হয়ে পড়ে পুরো রাশিয়া। এ অবস্থায় রাজনীতিবিদ এবং শ্রমিকরা রাশিয়াতে পার্লামেন্ট শাসনের দাবি উত্থাপন করে । কৃষকরা জমিদার থেকে তাদের জমি দখলে নিয়ে নেয়। সৈন্যরা জনগণের সঙ্গে মিলে ঘোষণা দেয় বিদ্রোহের। রাশিয়ার নৌবাহিনীর একটি  যুদ্ধ জাহাজের সৈনিকরা জার শাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ যোগদান করে । রাশিয়ার অন্যতম শহর সেন্ট পিটার্সবার্গে শ্রমিকরা তাদের সংগঠন সোভিয়েত গঠন করে।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধঃ ১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় রাশিয়া যুদ্ধে যোগদান করে। যুদ্ধে জার্মানির পক্ষ নেয়। রাশিয়া এসময় সৈন্যদের পাশাপাশি জোর করে সাধারণ কৃষকদের যুদ্ধ করতে বাধ্য করে।  তাদের ছিল না কোন প্রশিক্ষণ, ছিল তাদের প্রয়োজনীয় রসদ। এমন কি তাদের অনেককে তখন জুতা, খাবার ও অস্ত্র ছাড়াই যুদ্ধে প্রেরণ করা হয়। এ কারনে তিন বছরে প্রায় ২০ লাখ রাশিয়ান নিহত হয় আর ৫০ লাখের বেশি সৈন্য আহত হয়।  এ ভয়ানক ক্ষয় ক্ষতির জন্য রাশিয়ানরা তখন জারদের দায়ী করে। এর আগেই রুশ-জাপান যুদ্ধে রাশিয়ান বাহিনীর পরাচয় দেশটির লোকজনকে ক্ষুব্দ করে রেখেছিল।

রুশ বিপ্লব: 

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর রাশিয়াতে গণ অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করে। বিপ্লবী শক্তিগুলো বিশেষত বলশেভিক পার্টি জার রাজত্বের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান সংঘটিত করে। এ গণঅভ্যুত্থানই পরবর্তিতে বিপ্লবের রুপ ধারন করে। খাদ্যাভাব রাশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসাবে দেখা দেয়। তবে এর জন্য ফলনকে খুব বেশি দায়ী করা যায় না কারণ যুদ্ধে কৃষিজমির খুব বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। পরোক্ষ কারণ হিসাবে বলা যায় যে, সরকার যুদ্ধের ব্যয় বহন করার জন্য প্রচুর কাগুজে নোট (রুবল) বাজারে ছাড়ে। এর ফলে বাজারে ১৯১৪ সালের তুলনায় ১৯১৭ সালে মুদ্রাস্ফীতি চার গুন বৃদ্ধি পায়। কৃষকদেরকে অতি উচ্চমূল্যে কৃষি সামগ্রী ক্রয় করতে হত। কিন্তু মধ্যস্বত্তভোগীদের দৌরত্যের কারণে উৎপাদিত পন্যের ন্যায্য মূল্য কৃষকরা পেত না। ফলে তারা  তাদের উৎপাদিত পণ্য মজুদ করতে শুরু কের এবং শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজন মেটানোর জন্য উৎপাদন করতে শুরু করল। এভাবে শহরাঞ্চলে প্রতিনিয়ত খাদ্যের সংকট বাড়তে করতে থাকল। এ কারনে কলকারখানায় মজুরী বৃদ্ধির দাবীতে আন্দোলন দানা বাঁধল।   যা ঘটে ১৯১৭ সালের শুরুতে। বিপ্লবের শুরু হয় শ্রমিকদের হাত ধরে। পরবর্তিতে এ বিদ্রোহ সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সকল স্তরের জনগণ এ আন্দোলনে অংশগ্রহন করে। এক সময় সবার সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা দিয়ে সেনাবাহিনীও জার স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে।

অবস্থা এমনই খারাপ হয় যে, জার দ্বিতীয় নিকোলাস ক্ষমতা ত্যাগ করতে বাধ্য হন। সেই ঘটনার পর রাশিয়া প্রথমবারের মতো প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। অস্থায়ী সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয়। অস্থায়ী সরকারের প্রধান করা হয় প্রিন্স লভোভকে। পরবর্তীতে অস্থায়ী সরকারের প্রধান করা হয় সমাজতন্ত্রী আইনজীবী আলেকজান্ডার কেরেনস্কিকে। পরবর্তীতে লেনিনের নেতৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বলশেভিক পার্টি এই অস্থায়ী সরকারের বিপক্ষে আন্দোলনের  ঘোষণা দেয় । জার্মানিতে আত্মগোপনে থাকা লেনিন এপ্রিল মাসে রাশিয়াতে প্রবেশ করেন। লেনিনের আগমন উপলক্ষে রাশিয়ায় তার বিপক্ষ দলসমূহ মিছিল করে। যদিও এসব লেনিনবিরোধী দলও অস্থায়ী সরকারের পদত্যাগ দাবি করে। লেনিন পুনরায় আত্মগোপন করেন ফিনল্যান্ডে।

১৯১৭ সালের আগস্ট মাস নাগাদ কেরেনস্কি একটা বিভ্রমের মধ্যে ছিলেন। সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা তখন ভেঙে পড়েছে। কেরেনস্কি যাকে সামরিক বাহিনীর কমান্ডার ইন-চিফ হিসেবে অধিষ্ঠিত করেছিলেন – সেই কর্নিলভ তখন কেরেনস্কিকে রেখে হোক বা বাদ দিয়ে হোক – এক ধরণের সামরিক একনায়কতন্ত্র কায়েম করার চেষ্টা করছিলেন। কেরেনস্কির ওপর তখন আরো কারোরই আস্থা ছিল না।  এর মাঝে জেনারেল কর্নিলভের নেতৃত্বে ক্যু সংঘটিত হয়। এই ঘটনার পর যুদ্ধরত অনেক সৈনিক বলশেভিকদের পক্ষে অবস্থান নেয়।

কেরেনস্কি, ছবিঃ thefamouspeople

অক্টোবরের শুরুর দিকে কেরেনস্কির কর্তৃত্ব ভেঙে পড়লো। অন্যদিকে লেনিনের চাপে বিপ্লবী বলশেভিকরা একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঘটানোর জন্য এক গোপন প্রস্তাব পাস করলো । লেনিন জোর দিয়ে বললেন, যা করার দ্রুত করতে হবে।

লেনিন ঠিক করলেন রাশিয়ার পুরোনো ক্যালেন্ডার অনুযায়ী অক্টোবরের ২৫ তারিখ অভ্যুত্থান হবে। যা ইউরোপিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ই নভেম্বর। তাই এটি অক্টোবর বিপ্লব নামেও পরিচিত।  পেত্রোগ্রাদে মোতায়েন সামরিক বাহিনীর লোকদের মধ্যে যে বলশেভিক সমর্থকরা ছিল – তাদের দিয়ে রাজধানীতে সশস্ত্র পাহারা বসানো হলো

বলশেভিক পার্টির নেতা ভ্লাদিমির লেনিন অস্থায়ী সরকারের বিরুদ্ধে প্রায় রক্তপাতহীন অভ্যুত্থান ঘটালেন। তারিখটি ছিল নভেম্বর ৭, ১৯১৭ । বিপ্লবী বলশেভিকরা ১৯১৭ সালের ৭ নভেম্বর পেত্রোগাত দখল করে। একেই বলা হয় বলশেভিক বিপ্লব। রাষ্ট্রের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভবন তখন বিপ্লবীদের দখলে চলে যায়।  এবার বিপ্লবীরা রাষ্ট্রীয় ব্যাংক, রেলস্টেশন, টেলিফোন এক্সচেঞ্জ সহ গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ভবনগুলো দখলে নিয়ে নিলো।

অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়েছিল রাশিয়ার ধনতান্ত্রিক বুর্জোয়া শ্রেণীভুক্ত লোকজন দ্বারা। লেনিন তার পরিবর্তে সৈনিক, কৃষক ও শ্রমিকদের দ্বারা গঠিত সোভিয়েত সরকারের ঘোষণা দিলেন। শীঘ্রই লেনিনকে প্রধান করে নতুন সোভিয়েত সরকার শপথ নিলো। লেনিন হলেন বিশ্বের সর্বপ্রথম সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অধিনায়ক। নতুন যুগের সূচনা ঘটে গৃহযুদ্ধে বিপর্যস্ত রাশিয়ায়। এভাবেই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ থেকে রাশিয়া বেরিয়ে আসে। ১৯২২ সালে গঠন করা হয় সোভিয়েত ইউনিয়ন।

দু’টি ধাপে সম্পন্ন হয় রুশ বিপ্লব। প্রথম ধাপে হয় রাজতন্ত্রের পতন ও বুর্জোয়া সরকার প্রতিষ্ঠা এবং দ্বিতীয় ধাপে বিপ্লবীরা ক্ষমতা নিজের হাতে নিয়ে একটি নতুন অর্থনৈতিক বন্টন ব্যবস্থা ও সমাজ ব্যবস্থার উদ্ভব করেন, একটি সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন।

রুশ বিপ্লবের রুপকার লেনিন

১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা ছিলেন লেনিন। ১৮৮৭ সালে কাজান বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে পড়ার সময় ছাত্রদের বিপ্লবী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ  লেনিনকে বহিষ্কার করে। উনিশ শতকের শেষ দিকে পুঁজিবাদ দ্রুত বিকাশ পাচ্ছিল। যান্ত্রিক প্রযুক্তি ও হাজার হাজার শ্রমিক নিয়ে চালু হচ্ছিল কল-কারখানা। সে সময় জারের স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে ‘নারোদবাদী’রা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছিল। নারোদবাদ হচ্ছে মেহনতিদের শ্রমমূল্য প্রতিষ্ঠার জন্য জার পুঁজিপতিদের হত্যা করা। জারের বিরুদ্ধে হলেও লেনিন নারোদবাদীদের বিরুদ্ধে ছিলেন সবসময়।

লেলিন

ছবিঃ bbc

তিনি নারোদবাদীদের এ হত্যাযজ্ঞ এবং সন্ত্রাসকে কিছুতেই মানতে পারেননি।

এ সময় নারোদবাদীরা লেনিনের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মাঠে নামে এবং তার নীতিকে ভিত্তিহীন বলে প্রতিষ্ঠা করার জন্য নানা প্রচারণা ও ব্যাখ্যা চালাতে থাকে। শুধু নারোদবাদীরাই নয়, তথাকথিত ‘বৈধ মার্কসবাদীরা’ও তার বিপক্ষে মাঠে নামে। এই বৈধ মার্কসবাদীরা ছিল বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবী।

তারা সরকার কর্তৃক অনুমোদিত পত্রপত্রিকায় লিখত এবং মার্কসবাদকে বুর্জোয়াদের স্বার্থের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করত। লেনিন এই নারোদবাদী ও বৈধ মার্কসবাদীদের বিরুদ্ধে মেহনতি মানুষকে বোঝাতে থাকেন এবং বড় বড় কল-কারখানার শ্রমিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করে ‘বিপ্লবী মার্কসবাদী পার্টি’ গড়ে তোলার জন্য।

১৮৮৯ সালে তিনি সামারায় যান এবং স্থানীয় মার্কসবাদীদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে তোলেন। ১৮৯১ সালে সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয় নিয়ে পাশ করে বের হন। তখন সামারাতে আইন ব্যবসা শুরু করেন। এরপর তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ চলে যান এবং শিগগিরই সেখানকার মার্কসবাদীদের অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন। জার সরকার ১৮৯৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি লেনিনকে তিন বছরের জন্য সাইবেরিয়ায় নির্বাসিত করে।

বিভিন্ন স্থানে গোপনে রাজনৈতিক কাজ করে প্রায় ১০ বছর পর ১৯১৭ সালের ৩ এপ্রিল রাতে লেনিন রাশিয়ায় পৌঁছেন।  সামনে থেকে বলশেভিক বিপ্লবের নেতৃত্ব দেন। লেনিনের হাত ধরে যাত্রা শুরু হয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র সোভিয়েত ইউনিয়নের। কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সোভিয়েত জনগণ যে বিরাট রূপান্তর সাধন করেছে, তার মধ্যে রয়েছে মার্কস-লেনিনবাদের বিজয়। লেনিন ১৯১৭ থেকে ১৯২৪ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার বলশেভিক পার্টির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের উন্নয়নে স্ট্যালিন

লেনিনের মৃত্যুর  পর ১৯২৪ সালে স্ট্যালিন ক্ষমতায় আসেন।  ১৯২৪ সাল  থেকে শুরু করে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় ছিলেন। ভগ্ন অনুন্নত কৃষি ভিত্তিক রাশিয়াকে স্ট্যালিন একটি শিল্প উন্নত ও সামরিক পরাশক্তি দেশে রূপান্তর করেন। তিনি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার মাধ্যমে সমগ্র সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে ব্যাপক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটান । প্রথমদিকের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাগুলো ছিল কৃষিকে ব্যাপক আধুনিকায়ন করা। পরবর্তীতে তা থেকে সামরিক শক্তি বৃদ্ধির দিকে মনোনিবেশ করেন। এই উন্নয়নের পথে স্ট্যালিন ক্ষমতার ব্যবহার করেন।

স্ট্যালিন

ছবিঃ lalshongbad.wordpress.com

তার গৃহিত নীতির কারনে  ত্রিশের দশকের শুরু দিকে  সোভিয়েত ইউনিয়ন জুড়ে এক খাদ্য সংকটে অনেকে মারা যান। চতুরভাবে এ খবর বাইরে বের হতে দেওয়া হয় নি। স্ট্যালিন তার শাসনামলে ব্যাপক আকারে বিরোধী শক্তিকে নিষ্ক্রিয় করে । ১৯৩৬-৩৮ সালের মধ্যে সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিতরে সমাজতান্ত্রিক বিরোধীতা করেছে এমন প্রায় ৬০,০০০ হাজার নিজ জনগণকে স্ট্যালিনের নির্দেশে হত্যা করা হয় !  আরো হাজার হাজার লোককে লেবার ক্যাম্পে পাঠানো হয়। বিস্ময়করভাবে সোভিয়েত অর্থনীতির বড় একটা অবদান কিন্তু এই লেবার ক্যাম্প থেকেও আসতো। স্ট্যালিন  ১৯২৮ থেকে ১৯৪০ সালের মধ্যে সামগ্রিক অর্থনীতিকে রাষ্ট্রায়ত্ত করে ফেলে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন ও সদস্য দেশসূহঃ

১৯২২ সালে এক চুক্তির মাধ্যমে রাশিয়ান কমিউনিস্ট পার্টির প্রধান ভ্লাদিমির লেনিনি সোভিয়েত ইউনিয়ন গঠন করেন। ১৯২২ সালের ৩০ ডিসেম্বর এই চুক্তি সম্পন্ন হয়। চুক্তিতে প্রথমে সাক্ষর করে রাশিয়া,বেলারুশ, ইউক্রেন ও কাকেশাসীয় অঞ্চলের ইউনিট বর্তমান জর্জিয়া, আর্মেনিয়া ও আজারবাইজান । একই সাথে এ সময় অন্যান্য দেশেরও সোভিয়েত ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্তির জন্য নমনীয় নীতি রাখা হয়। যার ফল শ্রুতিতে  ১৯৪০ সাল দিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সদস্য সংখ্য ১৫ এর কোঠায় গিয়ে পৌঁছায়। সদস্য দেশসমূহ ছিল বর্তমান রাশিয়া, ইউক্রেন, বেলারুশ, আর্মেনিয়া, আজারবাইজান, এস্তনিয়া,জর্জিয়া, কাজাখিস্তান, কিরজিখিস্তান,লটভিয়া,লিথুনিয়া, মালদোভা, তাজিকিস্তান, তুর্কিমিনেস্তান ও উজবেকিস্তান।

ছবিঃ slide share

সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাঙ্গনে পথে

সোভিয়েত ইউনিয়ন যাত্রা শুরু করেছিল বৈষম্যহীন বিশ্ব গড়ার মহৎ যে প্রত্যয় নিয়ে  কিন্ত তা তারা বেশিদিন ধরে রাখতে পারেনি। ষাট ও সত্তরের দশকে ক্রুশ্চেভ ও বেজনেবের সময়ে সরকারি মদদে অনেক বুর্জোয়া তৈরি হয়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষ ব্যাপক অভাব অনটনে পতিত হয়। সে সময় রাশিয়াতে শিল্পকেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থা থাকায় খাদ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যাদির বরাবরই একটা সংকট লেগেই থাকতো। সত্তর ও আশির দশকে রুটিরুজির জন্য প্রতিদিনই দীর্ঘ সিরিয়াল ছিল এক নিত্য দিনকার চিত্র।

জানা যায় সে সময় মৌলিক অধিকারও  সোভিয়েত সরকার বাস্তবায়ন করতে পারতো না। সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্প ভিত্তিক দেশ হলেও সে সময় পোশাক ও জুতোর অভাব লেগেই থাক । সোভিয়েত সমাজ দুইভাগে ভাগ হয়ে যায় । একদল  হল উচ্চ ধনিক বুর্জোয়া শ্রেণি, অন্য দল হল অভাবগ্রস্ত  সাধারণ জনতা। সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি দিন দিন খারাপের দিকেই যাচ্ছিল। চারদিকে জনরোষ ছড়িয়ে জেতে শুরু করে।

অন্যদিকে আমেরিকার আগ্রাসী নীতি ভঙ্গুর  সোভিয়েত ইউনিয়নের  অর্থনীতিকে আরেক ধাপ নীচে ঠেলে দেয়। রোনাল্ড রিগান সোভিয়েত ইউনিয়নকে বিশ্ব থেকে আলাদা করে দেয়। আমেরিকা পাশাপাশি তেলের দাম এমনভাবে কমিয়ে দেয় যা  সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থনীতিকে একদম ভেঙ্গে ফেলে। কেননা সে সময় সোভিয়েত অর্থনীতি মূলত তেল ও গ্যাসের উপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিল।

গর্বাচেভ ১৯৮৫ সালে এক সংকটময় অবস্থায় সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষমতায় আসেন। এ সময় তিনি দুইটি নীতির বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে সোভিয়েত ইউনিয়নের  আবার সেই আগের জৌলুশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালান । এর প্রথমটি হল,  গ্লাসনস্ত যা হল রাজনৈতিক উদারবাদ। পুর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নে যেখানে রাজনৈতিক কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ ছিল  সেখানে এবার খোলাখুলি মতামত ও সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা করার পরিবেশ সৃষ্টি করে দেন।  এত দিন বন্ধ রাখা মিডিয়ার মুখ খুলে দেন। অন্যদিকে পেরেস্ত্রইকার মাধ্যমে অর্থনীতিকে মুক্ত করার চেষ্টা করেন। এর  ফলে অনেকটা চায়নার ধাচের অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা লাভ করে । অনেকটা পুঁজিবাদী ধারার অর্থনীতি গড়ে উঠে এই সময়ে। কিন্তু গরবাচেভের এই সংস্কার সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্য আরো খারাপ অবস্থার সৃষ্টি করে।  সোভিয়েত ইউনিয়নের স্যাটেলাইট দেশগুলো কেন্দ্র থেকে আরো মুক্ত হয়ে পড়ে। যা সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকে তরান্বিত করে।

১৯৮৯ সালে প্যোলান্ডের স্বাধীনতার জন্য বিপ্লব। অন্যদিকে বার্লিল দেয়ালের পতন ছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের আগাম সংকেত। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে  ভাঙ্গন চিহ্ন সুস্পষ্ট হয়ে উঠে ৷ শিল্পে উৎপাদন কমছে, বেকারত্ব বাড়ছে, সেই সঙ্গে আছে লাগামছাড়া মুদ্রাস্ফীতি ৷ জাতিগত বিরোধ বাড়ছে; জর্জিয়া, আজারবাইজানে গুলি চলছে ৷ সোভিয়েত  ইউনিয়নের রাজ্যগুলির মধ্যে লিথুয়ানিয়া প্রথমে স্বাধীনতা ঘোষণা করে ১৯৯০ সালে। লিথুনিয়াকে ফেরাতে ১৯৯১’এর জানুয়ারিতে  মস্কো থেকে লিথুয়ানিয়ার রাজধানী ভিলনিয়াসে গোয়েন্দা পুলিশ কেজিবি’র বিশেষ কম্যান্ডো পাঠানো হয় ৷ সেখানকার টেলিভিশন টাওয়ারে কেজিবি’র অভিযানে ১৪ জন মানুষ প্রাণ হারায় ৷ তা সত্ত্বেও লিথুয়ানিয়াকে সোভিয়েত ইউনিয়নে আর ফেরানো যায়নি৷

গর্বাচেভ চেয়েছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক নতুন, আধুনিকতর সংস্করণ, যা তার অঙ্গ রাজ্যগুলিকে আরো বেশি স্বায়ত্ত্ব শাসন প্রদান করবে। গর্বাচেভ সোভিয়েত ইউনিয়নকে রক্ষার চেষ্টা করেন। ১৯৯১’এর মার্চে এই নিয়ে গণভোটও হয়েছিল।  নতুন এই সোভিয়েত ইউনিয়ন কেমন হবে, তা নিয়ে আলাপ-আলোচনায় কিন্তু বিশেষ সুবিধা হয়নি – ১৫টি রাজ্যের মধ্যে মাত্র ন’টি  রাজ্য তাতে অংশগ্রহণ করে।

গর্বাচেভ এ উদ্দেশ্যে একটি নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যবস্থা করেন ৷ সেই চুক্তি হবার কথা হয় ২০ আগষ্ট। কিন্তু তার আগের দিনই গর্বাচভের বিরুদ্ধে কট্টর সোভিয়েতপন্থিদের অভ্যুত্থান, যাদের মধ্যে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কেজিবি প্রধান ইত্যাদিরা জড়িত ছিল।

গর্বাচভ অসুস্থ বলে তাকে তার ছুটি কাটানোর বাড়িতে সপরিবারে  বন্দি করে রাখা হয়।  তার সাথে বাইরের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়। জরুরি অবস্থা জারি করে মস্কোর রাস্তায় ট্যাঙ্ক নামানো হয় । এই কায়দায় সোভিয়েত ইউনিয়নকে ‘‘বিপর্যয়ের” হাত থেকে রক্ষা করা হবে !

ছবিঃ ThoughtCo

মস্কোয় রাশিয়ার নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট বরিস ইয়েলৎসিন’এর কর্মস্থল  সাদা রঙের বহুতল বাড়িটির সামনে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে শুরু করে, অভ্যুত্থানকারিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে । তিনদিন পরে জরুরি অবস্থা তুলে নেওয়া হলে ক্লান্ত গর্বাচেভ মস্কোয় ফেরেন।  অভ্যুত্থানকারিদের সকলকে গ্রেপ্তার করা হয় আবার তাদের মধ্যে কয়েকজন আত্মহত্যাও করে ।

অগাস্টের সেই টালমাটাল দিনগুলোত এস্টোনিয়া সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়ে ৷  এর পর পরই ইউক্রেন সোভিয়েত ইউনিয়ন ছেড়ে দেয়, পাশাপাশি অন্য রাজ্যগুলো সেই পথে হাটে।  গর্বাচেভ তাঁর নতুন চুক্তি নিয়ে সোভিয়েতকে এক রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যান৷ কিন্তু তিন মাসের মধ্যেই রাশিয়া, ইউক্রেইন এবং বেলারুশ তাদের নিজেদের স্বাধীন জোট সৃষ্টি করে। এভাবে ক্রমান্বয়ে পরিস্থিতি বাইরের চলে যাওয়ার পথে  সরকারিভাবে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেওয়া হয় ১৯৯১ সালের ২৬শে ডিসেম্বর ৷ গর্বাচভ ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পদত্যাগ করেন৷

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙ্গে যে ১৫ টি দেশ হয় সেগুলো হল

  1. আর্মেনিয়া প্রজাতন্ত্র
  2. আজারবাইজান প্রজাতন্ত্র
  3. বেলারুশ প্রজাতন্ত্র
  4. এস্তোনিয়া প্রজাতন্ত্র
  5. জর্জিয়া প্রজাতন্ত্র
  6. কাজাখস্তান প্রজাতন্ত্র
  7. কিরগিজিস্তান প্রজাতন্ত্র
  8. লাটভিয়া প্রজাতন্ত্র
  9. লিথুয়ানিয়া প্রজাতন্ত্র
  10. মলদোভিয়া প্রজাতন্ত্র
  11. রাশিয়া প্রজাতন্ত্র
  12. তাজিকিস্তান প্রজাতন্ত্র
  13. তুর্কমেনিস্তান প্রজাতন্ত্র
  14. ইউক্রেন প্রজাতন্ত্র
  15. উজবেকিস্তান প্রজাতন্ত্র

এভাবে বিশ্বের এক পরাশক্তির সোভিয়েত ইউনিয়ন শেষমেষ মাটিতে মিশে গেল। এর মাধ্যমেই সমাপ্তি ঘটে সোভিয়েত ইউনিয়নের। সৃষ্টি হয় নতুন প্রজাতন্ত্র রাশিয়ার।

 

তথ্য সুত্র

১। https://bn.wikipedia.org/wiki/%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A6%BC%E0%A6%BE

২।  https://www.history.com/topics/history-of-the-soviet-union

৩। http://missinglink.ucsf.edu/lm/russia_guide/historyofrussia.htm

৪। http://itibritto.com

৫। https://roar.media

৬। http://www.bd-pratidin.com

৭। https://en.wikipedia.org/wiki/History_of_Russia

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক