রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস ও বর্তমান অবস্থা- বিশ্বের নিগৃহীত দেশহীন একটি জাতি

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে বসবাসরত মুসলিম সম্প্রদায়ই মূলত বিশ্বব্যাপী রোহিঙ্গা নামে পরিচিতি।  মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সংখ্যালঘু মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন বিগত বেশ কয়েক মাস বিশ্ব সংবাদ মাধ্যমগুলোর শিরোনাম হয়ে ছিল ।  বিশ্বের যে কোনো প্রান্তে যখনই কোন মানবতা বিরোধী কোনো ঘটনা সংঘঠিত হয়, সারা বিশ্বের মানবতাবাদী সংগঠনগুলোড় তোরজোড় হয়ে যায় ও  মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে বিশ্ববিবেক এবং নানা সমালোচক বোদ্ধা।  কিন্তু এটি হল একমাত্র ইস্যু, যেখানে বিশ্বের মানবতাবাদী শক্তি ও সমালোচকবোদ্ধাদের সন্তোষজনক কোনো ভূমিকা নেই বললেই চলে।

এই রোহিঙ্গা নির্যাতনের ইতিহাস নতুন না । রোহিঙ্গা নির্যাতনের সূত্রাপাত ঘটে সেই কয়েকশ বছর পূর্বেই ।

রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস

রোহিঙ্গারা পশ্চিম মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যের উত্তরাংশে বসবাসকারী একটি জনগোষ্ঠী। ধর্মের বিশ্বাসে এরা অধিকাংশই মুসলমান। রাখাইন রাজ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অধিবাসী হল রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গারা বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে নিপীড়িত জনগোষ্ঠীগুলোর একটি।

মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। মায়ানমার সরকার ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ রোহিঙ্গারা এই তালিকার অর্ন্তভুক্ত নয়। মায়ানমার সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা হল বাংলাদেশী, যারা বর্তমানে অবৈধভাবে মায়ানমারে বসবাস করছে। যদিও ইতিহাস ভিন্ন কথা বলে। ইতিহাস বলে, রোহিঙ্গারা মায়ামারে কয়েক শতাব্দী ধরে বসবাস করে আসছে।

অন্য দিকে, অষ্টম ও নবম শতাব্দীতে চন্দ্র বংশীয় রাজারা আরাকান শাসন করতো। উজালী ছিলো তখন আরাকানের রাজধানী। বাংলা সাহিত্যে যা বৈশালী নামে খ্যাত। এ বংশের উপাখ্যান রাদ জা’তুয়ে’তে নিম্নরূপ একটি আখ্যান উল্লেখ আছে। কথিত আছে, এ বংশের রাজা মহত ইং চন্দ্রের রাজত্ব কালে (৭৮৮-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ) কয়েকটি বাণিজ্য বহর রামব্রী দ্বীপের তীরে এক সংঘর্ষে ভেঙে পড়ে। সেই বাণিজ্যিক বহর ছিল আরবদের। জনশ্রুতি আছে, আরবীয় মুসলমানেরা ভাসতে ভাসতে কূলে ভিড়লে পর ‘রহম’ ‘রহম’ ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে।  জাহাজের আরবীয় আরোহীরা তীরে এসে ভিড়ে। এরপররাজা তাদের উন্নত আচার-আচরণে সন্তুষ্ট হয়ে আরাকানে বসতি স্থাপনের ব্যবস্থা করেন। আরবীয় মুসলমানগণ স্থানীয় রমণীদের বিয়ে করেন এবং স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

তারা রহম রহম বলে আরাকানে প্রবেশ করায় আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ স্থানীয় লোকজন তাদেরকে রহম গোত্রের লোক মনে করে রহম বলে ডাকতো। ক্রমশ শব্দটি বিকৃত হয়ে রহম রোঁয়াই রোঁয়াই রোঁয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা নামে খ্যাত হয়। সেই হিসেবে রোহিঙ্গাদের আরাকানে অবস্থান হাজার বছরেরও বেশি সময়।

১৪০৪ খ্রিস্টাব্দের দিকে  নরমিখলা নামে জনৈক আরাকান যুবরাজ মাত্র ২৪ বছর বয়সে পিতার সিংহাসনে আরোহণ করেন।  লেম্ব্রো নদীর তীরে লংগ্রেত ছিল তার রাজধানী। নরমিখলা সিংহাসনে আরোহণ করার পরপরই  একজন দেশীয় সামন্ত রাজার ভগ্নিকে অপহরণ করে রাজধানী লংগ্রেতে নিয়ে আসেন। তখন আরাকানের সকল সামন্ত রাজাগণ একত্রিত হয়ে বার্মার রাজা মেঙশো আইকে আরাকান দখলের অনুরোধ করেন।  ১৪০৬ খ্রিষ্টাব্দে বার্মার রাজা ত্রিশ হাজার সৈন্য নিয়ে আরাকান রাজ্য আক্রমণ করে, রাজা নরমিখলা পালিয়ে যান । তিনি তখন তৎকালীন বাংলার রাজধানী গৌড়ে এসে আশ্রয় নেন। সে সময় ইলিয়াস শাহী রাজবংশ গৌড় থেকে বাংলা শাসন করতো।

জনশ্রুতি রয়েছে, নরমিখলা গৌড়ে এসে সুফী হযরত মুহম্মদ জাকির রহমতুল্লাহি আলাইহি নামক একজন বিখ্যাত কামিল ব্যক্তির দরবার শরীফ-এ আশ্রয় নেন। নরমিখলা সুদীর্ঘ ২৪ বছর গৌড়ে অবস্থান করেন এবং ইসলামের ইতিহাস, সভ্যতা ও রাজনীতি অধ্যয়ন করেন।  উল্লেখ্য, নরমিখলা ইতোমধ্যে নিজের বৌদ্ধনাম বদলিয়ে মুহম্মদ সোলায়মান শাহ নাম ধারণ করেন। ফলে বার্মার ইতিহাসে তিনি মুহম্মদ সোলায়মান (মংস মোয়ান) হিসেবে পরিচিত লাভ করেন।

গৌড়ের সুলতান নাসিরউদ্দিন শাহ মতান্তরে জালালুদ্দিন শাহ ২৪ বছর পর ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে বিশ হাজার সৈন্য বাহিনী দিয়ে নরমিখলাকে তার নিজের রাজ্য আরাকান উদ্ধারের জন্যে সাহায্য করেন। ওয়ালী খানের সহায়তায় সহায়তায় নরমিখলা আরাকান রাজ্য পুনরুদ্ধার করেন এবং  ম্রাউক-উ নামক এক রাজবংশের প্রতিষ্ঠান করেন।

নরমিখলা ওরুফে সোলায়মান শাহ  এর হাত ধরে এভাবে আরাকান রাজ্য মুসলিম রাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকে পড়ে। আরাকানী জাতির এক মহাযুগ শুরু হয়। আর এ সাথে শুরু হয় বঙ্গোপসাগরে উপকূলে এক শ্রেষ্ঠ সভ্যতার।

কিন্তু নাসিরউদ্দিন তথা জালালুদ্দিনের সেনাপতি ওয়ালী খানের নেতৃত্বে নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ  ১৪৩০ খ্রিষ্টাব্দে  আরাকান  উদ্ধার করার এক বছরের মধ্যেই সেনাপতি ওয়ালী খান বিদ্রোহ করেন এবং নিজেই আরাকান দখল করে নেয়।  গৌড়ের সুলতান জালালুদ্দিন শাহ পুনরায় সোলায়মান শাহকে (নরমিখলা ) সাহায্যের জন্যে সেনাপতি সিন্ধিখানের নেতৃত্বে আবার ত্রিশ হাজার সৈন্য পাঠান ।

সোলায়মান শাহ সিন্ধিরখানের সহায়তায় পুনরায় আরাকান জয় করেন।  সে সময় গৌড় থেকে আসা সৈন্যরা আরাকানেই বিশেষ রাজকীয় আনুকূল্যে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলে। সিন্ধি খানের সহযোগিতায় সোলায়মান শাহ ১৪৩২ খ্রিষ্টাব্দে পিতার শাসনামলে থাকা রাজধানী লংগ্রেত থেকে রোহং নামক স্থানে রাজধানী স্থানান্তরিত করেন।  যেসব সৈন্য ও কর্মচারী নরমেইখলার সাথে গৌড় থেকে এসেছিলেন, তারা সকলেই থেকে যান এই রোহং শহরে। এদের বংশধররাই হলো রোহিঙ্গা মুসলমান। অর্থাৎ রোহিঙ্গা জাতির পূর্বপুরুষরা ছিলো এই বাংলারই মানুষ।

ছবিঃ UNICEF

১৪৩৩ সালে সুলতান জালালউদ্দিন মুহম্মদ শাহের মৃত্যু হলে সম্রাট নরমিখলার উত্তরাধিকারীরা ১৪৩৭ সালে রামু এবং ১৪৫৯ সালে চট্টগ্রাম দখল করে নেন।

১৫৩১ খ্রিস্টাব্দে গৌড়ের অভ্যন্তরীণ গোলযোগের সুযোগ  নিয়ে সোলায়মান শাহর (নরমিখলা) দ্বাদশতম অধঃস্তন পুরুষ জেবুক শাহ (মিনবিন) ম্রোহং-এর সিংহাসনে আরোহণ করেন এবং পূর্ণ স্বাধীনতা ঘোষণা  করেন। এভাবে জেবুক শাহের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয় ম্রাউক-উ-সাম্রাজ্য। বাংলার সুলতানদের কাছ থেকে স্বাধীনতা অর্জনের পরেও আরাকানের রাজাগণ মুসলিম রীতিনীতি বজায় রেখে চলতেন। বৌদ্ধ রাজাগণ নিজেদেরকে বাংলার সুলতানদের সাথে তুলনা করতেন এবং মুঘলদের মতোই জীবন যাপন করতেন।

১৬৬৬ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম আরাকানের দখলে ছিল। ১৬৬৬ সালে চট্টগ্রামের পতনের পর আরাকান রাজ্য সংকুচিত হয়ে একটি ছোট্ট অঞ্চলে পরিণত হয় এবং রাজনৈতিকভাবে বেশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। ১৭৩১ থেকে ১৭৮৪ সালের মধ্যে আরাকান রাজ্যকে ১৩ জন রাজা শাসন করেন এবং এ রাজাদের গড় শাসনকাল দুই বছরের বেশি ছিল না।

বাংলার প্রতি কৃ্তজ্ঞতা স্বরূপ নারামেখলা আরাকানে বাংলার ইসলামি স্বর্ণমুদ্রা চালু করেছিলেন ।  গৌড়ের মুসলমানদের অনুকরণে মুদ্রা প্রথার প্রবর্তন হয়। মুদ্রার একপিঠে রাজার মুসলিম নাম ও অভিষেক কাল এবং  অপর পিঠে মুসলমানদের কালিমা শরীফ আরবী হরফে লেখা হয়। পরবর্তীতে নারামেখলা নতুন মুদ্রা চালু করেন যার একপাশে ছিল বর্মি বর্ণ এবং অপরপাশে ছিল ফার্সি বর্ণ। তবে, বাংলার প্রতি আরাকানের কৃ্তজ্ঞতা ছিল খুবই অল্প সময়ের জন্য।

আরাকানের রাজারা মুসলিমদেরকে রাজদরবারের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিতেন। ১৭ শতকের দিকে আরাকানে বাঙালি মুসলিমদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। তারা আরাকানের বিভিন্ন কর্ম ক্ষেত্রে কাজ করতো। রাজার সৈন্যবাহিনীতে অফিসার থেকে সৈনিক পর্যন্ত প্রায় সবাইকে মুসলমানদের মধ্য থেকে ভর্তি করানো হতো। মন্ত্রী পরিষদের অধিকাংশই মুসলমান ছিলো। কাজী নিয়োগ করে বিচারকার্য পরিচালিত হতো। কামেইন বা কামান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী যারা মিয়ানমার সরকারের নৃতাত্ত্বিক জাতিসত্ত্বার মর্যাদা পেয়েছে তারা আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীরই একটা অংশ ছিল । মায়ানমার সরকার ১৩৫ টি জাতিগোষ্ঠীকে সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, অথচ রোহিঙ্গারা এই তালিকার অর্ন্তভুক্ত নয়।

এবার রোহিঙ্গারা বড় ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়  এর পরে ১৭৯৯ সালে পঁয়ত্রিশ হাজারেরও বেশি মানু ষ বর্মিদের গ্রেপ্তার এড়াতে এবং আশ্রয়ের নিমিত্তে আরাকান থেকে নিকটবর্তী চট্টগ্রাম অঞ্চলে চলে আসে । বার্মার শাসকেরা আরাকানের হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করে

১৭৮৪ সালে বার্মার রাজা ভোদপায়া আরাকান আক্রমণ করে নিলে কয়েক হাজার আরাকানী পালিয়ে সীমান্তবর্তী পাহাড়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। বোধপায়ার আরাকান দখল ছিল নিঃসন্দেহে নীচ মানষিকতার। তার সৈন্যবাহিনী এত নিষ্টুরতা ও জঘন্য চাতুরী করেছিল যে, পরাজিত আরাকানী সৈন্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এবং সবাইকে অস্ত্র ফেলে সেনানিবাসে এসে আত্মসমর্পন করে  নিরাপদে নিজ নিজ ঘরবাড়িতে থাকার সুযোগ লাভের উপদেশ দেয়। কিন্ত সৈন্যরা সেনানিবাসে এসে আত্মসমর্পন করলে বর্মী সেনারা সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।

আরাকানীরা অস্ত্র শস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অতর্কিত বর্মী বাহিনীর উপর হামলা চালাতে শুরু করে। বিদ্রোহী আরাকানীদের আশ্রয়স্থল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর শাসনাধীন  এলাকায় থাকায়, বার্মার রাজা এদের মূল নেতাদের ধরিয়ে দেওয়ার জন্যে ব্রিটিশ কোম্পানি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করে । তা না হলে কোম্পানির এলাকা বর্মি বাহিনীর দ্বারা আক্রান্ত হবে বলে হুঁশিয়ারি দেয়। এ পর্যায়ে শেয়ালের মত ধূর্ত ব্রিটিশরা ছলছাতুরীর আশ্রয় নিয়ে তিনজন বিদ্রোহী আরাকানী নেতাকে বন্দি করে বার্মা রাজার কাছে প্রেরণ করে। বার্মা সেনারা বন্দিদের চোখ উপড়ে জলন্ত আগুনে নিক্ষেপ করে তাদের মেরে ফেলে !

তখন  একজন বিদ্রোহী নেতার মৃত্যুর পরে তার ছেলে সিনপিয়া যিনি ব্রিটিশদের কাছে কিং অফ বেরিং (king of Bering) নামে পরিচিত তিনি বিদ্রোহীদের আরো সুসংগঠিত করে আরাকানে অবস্থান নেওয়া বর্মি বাহিনীর উপর আক্রমণ চালিয়ে তাদের বিপর্যন্ত করে তুলেন। ধীরে ধীরে বার্মী বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে আরো আরাকানীরা পালিয়ে এসে সিনপিয়ার বাহিনীতে যোগ দিতে থাকে। এক পর্যায়ে সিনপিয়া রাজধানী ম্রোহং ব্যতিত সমগ্র আরাকান দখল করে নেয়। তবে এ সময় সিনপিয়ার বাহিনীতে তীব্র গোলাবারদ ও রসদের অভাব দেখা দিলে তিনি যে কোণ শর্তে ব্রিটিশদের কাছে গোলাবারুদ ও রসদ সরবরাহ করার জন্যে অনুরোধ করে । কিন্ত ধূর্ত ব্রিটিশরা সাহায্য করতে অপারগতা জানায়। পুনরায় নতুন বর্মী বাহিনী চলে আসলে বাঁশের তৈরি বর্শা দিয়ে সিনপিয়া বাহিনী যুদ্ধ চালিয়ে যেতে থাকে । এক সময় অনন্য বীর সিনপিয়া পরাজয় বরণ করেন।

ব্রিটিশরা ১৮২৬ সালের দিকে আরাকান পুরুপুরি দখল করে নেয়। যখন ব্রিটিশরা আরাকান দখল করে তখন যেন এটি ছিল একটি মৃত্যুপুরী। 

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় জাপানিরা ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অধীনস্থ বার্মা আক্রমণ করে। ব্রিটিশ শক্তি জাপানিদের কাছে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যায়। এর ফলে ব্যাপকহারে সেখানে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে বৌদ্ধ রাখাইন এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যকার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছিল উল্লেখযোগ্য। এই সময়ে ব্রিটিশপন্থীদের সাথে বার্মার জাতীয়তাবাদীদেরও সংঘর্ষ হয়। জাপানিদের আক্রমণের সময় উত্তর আরাকানের ব্রিটিশপন্থী অস্ত্রধারী মুসলিমদের দল বাফার জোন সৃষ্টি করেছিল।

রোহিঙ্গারা যুদ্ধের সে সময় মিত্রপক্ষ তথা ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিল এবং জাপানি শক্তির বিরোধিতা করেছিল, পর্যবেক্ষণে সাহায্য করেছিল মিত্রশক্তিকে। এ কারনে জাপানিরা হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে নির্যাতন, ধর্ষণ এবং হত্যা করে। জাপানি এবং বর্মিদের দ্বারা বার বার গণহত্যার শিকার হয়ে প্রায় ৪০,০০০ রোহিঙ্গা স্থায়ীভাবে চট্টগ্রামে চলে আসে।

ছবিঃ change.org

ইতিহাস থেকে দেখা যায় সপ্তম-অষ্টম শতাব্দীতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে । প্রাথমিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যীয় মুসলমান ও স্থানীয় আরাকানীদের সংমিশ্রণে রোহিঙ্গা জাতির উদ্ভব। পরবর্তীতে চাঁটগাইয়া, রাখাইন, আরাকানী, বার্মিজ, বাঙালী, ভারতীয়, মধ্যপ্রাচ্য, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মানুষদের মিশ্রণে উদ্ভুত এই সংকর জাতি এয়োদশ-চর্তুদশ শতাব্দীতে পূর্ণাঙ্গ জাতি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। পঞ্চদশ শতাব্দী হতে অষ্টাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আরাকানে রোহিঙ্গাদের নিজেদের রাজ্য ছিল।

আরাকানের প্রাচীন নাম ব্রহ্ম জনপদ। কালক্রমে এর  নাম হয়ে যায় আরাকান, পরে জান্তা সরকার এসে নাম রাখে রাখাইন। ইতিহাস বলছে, রাখাইন প্রদেশে পূর্ব ভারত হতে খ্রিষ্টপূর্ব প্রায় ১ হাজার ৫০০ বছর আগে অষ্ট্রিক জাতির একটি শাখা ‘কুরুখ’ নৃগোষ্ঠী প্রথম বসতি স্থাপন করে। পরে একে একে বাঙালি হিন্দু পরে ধর্ম বদলে মুসলিম হওয়া, পার্সিয়ান, তুর্কি, মোগল, আরবীয় ও পাঠানরা বঙ্গোপসাগরের উপকূল বরাবর বসতি স্থাপন করে। এ সব নৃগোষ্ঠীর শংকরজাত জনগোষ্ঠী হলো এই রোহিঙ্গা।  রোহিঙ্গারা মূলত মুসলিম যদি কিছু অন্য ধর্মালম্বীও রয়েছে।  রোহিঙ্গারা হলো আরাকানের বা রাখাইনের একমাত্র ভূমিপুত্র জাতি। তাদের কথায় চট্টগ্রামের স্থানীয় উচ্চারণের প্রভাব রয়েছে। উর্দু, হিন্দি, আরবি শব্দও রয়েছে।

মায়ানমার সরকার দাবি করে যে, রোহিঙ্গারা হল ভারতীয়, বাঙালী ও চাঁটগাইয়া সেটলার, যাদেরকে ব্রিটিশরা আরাকানে  নিয়ে এসেছে। অথচ ঐতিহাসিকভাবে এটিই দেখা যায়  যে, ব্রিটিশরা বার্মা দখল করার কয়েক শতাব্দী আগে হতেই রোহিঙ্গারা আরাকানে পূর্ণাজ্ঞ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।

রোহিঙ্গাদের ভাষা

মায়ানমারের রাখাইন (আরাকান) রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর আধুনিক লিখিত ভাষাই হল রোহিঙ্গা ভাষা।  রোহিঙ্গা ভাষা ইন্দো-ইউরোপীয়ান ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত যার সাথে চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার বেশ মিল রয়েছে।

রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় বিশ্বাস

রোহিঙ্গারা মূলত ইসলাম ধর্মের সুন্নি মতবাদ অনুসারী। তবে কেউ কেউ সুফিবাদ মতবাদেও বিশ্বাস করে। মায়ানমার সরকার আইনের মাধ্যমে রোহিজ্ঞাদের শিক্ষা গ্রহণের অধিকারের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে রেখেছে তাই তারা সাধারণ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে না। এ কারনে প্রায় সবাই মোলিক ইসলামী শিক্ষাকেই একমাত্র পড়াশুনা হিসেবে গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছে।  অধিকাংশ গ্রামেই মসজিদ এবং মাদ্রাসা তথা ধর্মীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠান রয়েছে।

রোহিঙ্গা নির্যাতনের ইতিহাস

মায়ানমারের  সম্প্রতি বৌদ্ধ সম্প্রদায় এবং সামরিক বাহিনীর গণহারে হত্যা, ধর্ষণ ও লুন্ঠনের শিকার হয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে লাখ লাখ রোহিঙ্গা। ইতিমধ্যে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে শরণার্থী হয়ে আশ্রয় নিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ এখনও সমুদ্রের বুকে ভেসে বেড়াচ্ছে। নেই খাদ্য, নেই বাসস্থান, নেই শিক্ষা, নেই নিরাপত্তা- আন্তর্জাতিক মহল বরাবরের মতো নিশ্চুপ মানবতার এমন তীব্র দুর্দশার দিনে।  রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতন নতুন কিছু না কয়েক শতাব্দি পুরাতন। জাতিসংঘের তথ্যমতে, রোহিঙ্গারা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত ও রাষ্ট্রবিহীন জনগোষ্ঠী।

ঐতিহাসিক বিবরণ থেকে জানা যায়,  ভারতীয় উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে ক’টি এলাকায় মুসলিম বসতি গড়ে ওঠে, আরাকান তথা বর্তমান রাখাইন প্রদেশ ছিল তাদের মধ্যে অন্যতম। এক সময় আরাকান স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র ছিল। বর্তমান রোহিঙ্গারা সেই আরকানের মুসলমানদের বংশধর। ১৪৩০ সালে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসনামল প্রায় ২০০ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। আরাকানে ১৬৩১ থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত  মারাত্মক দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। আরাকান রাজা সান্দথুধম্মা ১৬৬০ সালে  নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোগল শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে।  এর পর থেকেই মূলত বিরতি দিয়ে দিয়ে চলছে মুসলমানদের ওপর নিপীড়ন ও নির্যাতন।

১৭৮৪ সালে বর্মী রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে নেয়। তিনিও ছিলেন ঘোর সাম্প্রদায়িক ও মুসলিমবিদ্বেষী। বর্মী রাজা ঢালাওভাবে মুসলমানদের মারতে থাকে।  তার সৈন্যবাহিনী এত নিষ্টুরতা ও জঘন্য চাতুরী করেছিল যে, পরাজিত আরাকানী সৈন্যদের সাধারণ ক্ষমা ঘোষণা করে এবং সবাইকে অস্ত্র ফেলে সেনানিবাসে এসে আত্মসমর্পন করে  নিরাপদে নিজ নিজ ঘরবাড়িতে থাকার সুযোগ লাভের উপদেশ দেয়। কিন্ত সৈন্যরা সেনানিবাসে এসে আত্মসমর্পন করলে বর্মী সেনারা সবাইকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে।

১৮২৬ সালে বার্মা ইংরেজ দখলে গেলে অবস্থার কিছুটা পরিবর্তন ঘটে। তবে ১৯৩৭ সালে বার্মার স্বায়ত্তশাসন লাভের পর সাপ্রদায়িক দাঙ্গা ব্যাপক রূপ নেয় এবং অন্তত ৩০ লাখ মুসলমান মারা যায়।

বার্মার খ্রিস্টান রাজা  ১৭৮৪ সালে আরাকান দখল করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে রোহিঙ্গারা সর্বপ্রথম জুলুমের শিকার হয়। এরপর রোহিঙ্গারা বড় ধরনের নির্যাতনের শিকার হয় ১৯৪২ সালে, যখন জাপান বার্মা দখল করে নেয়। ১৯৪২ সালে জাপান বার্মা দখল করার পর স্থানীয় মগরা জাপানি সৈন্যদের সহায়তা নিয়ে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। ইতিহাসে এই গণহত্যাটি ১৯৪২ সালের গণহত্যা নামে খ্যাত। সে সময় লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলমানকে হত্যা করা হয় স্বাধীনতা।  এসব নির্যাতনের সব মাত্রা ছাড়িয়ে রোহিঙ্গাদের ওপর ধারাবাহিক নিপীড়ন-নির্যাতন শুরু হয় ১৯৬২ সালে, সামরিক জান্তার ক্ষমতা দখলের পর থেকে। নিপীড়ন চরম আকার ধারণ করে ১৯৮২ সালে মিয়ানমারের নতুন নাগরিকত্ব আইন প্রণয়নের ফলে। এ আইন কার্যকর হওয়ার পর বাতিল হয়ে যায় রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব। তখন থেকে মানুষ হিসেবে রোহিঙ্গাদের মানবাধিকারও অচল হয়ে পড়ে।

১৯৮২ সালে সে দেশের সরকার যে নাগরিকত্ব আইন করেছে, তাতে তিন ধরনের নাগরিকের কথা বলা হয়েছে। এর কোনোটির মধ্যেই রোহিঙ্গারা নেই। তাদের সাংবিধানিক ও আর্থসামাজিক অধিকার নেই।  তাদেরকে রাষ্ট্রীয় বন্দি বলা যায় কারণ মিয়ানমারের অন্য স্থানে তারা কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া যেতে পারে না। এক সময় যে আরাকান মুসলিমপ্রধান ছিল, এখন সেখানে রাখাইন বসতি বাড়িয়ে তাদের সংখ্যালঘুতে পরিণত করা হয়েছে।

ছবিঃ abc

উত্তর ১৯৪৭ সালের শাসনতান্ত্রিক নির্বাচনে ইংরেজদের দেওয়া ‘সন্দেহভাজন নাগরিক’ অভিধানের কারণে মুসলমানদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। ১৯৪৮ সালে বার্মা স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলিমদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। স্বাধীন দেশের সরকার আজ পর্যন্ত তাদের নাগরিক ও মানবিক অধিকার দেয়নি। অত্যাচার নির্যাতন ও বিতাড়নের মুখে বহু রোহিঙ্গা বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহুদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। এরা বিশ্বের রাষ্ট্রহীন নাগরিক।
স্বাধীনতা লাভের পরপরই ১৯৪৮ সালে বার্মায় আরাকানী বৌদ্ধ এবং মুসলিম রোহিঙ্গাদের মধ্যে উত্তেজনা বাড়তে থাকে। স্বাধীন বার্মায় উ নু-র শাসনামলে রোহিঙ্গাদের উপর দমন পীড়ন শুরু হয়। উ ন নামক শাসক আরাকান থেকে মুসলমানদের বিতাড়নের উদ্দেশ্যে ১৯৪৮ সালে মগ সেনাদের নিয়ে Burma Territorial Force গঠন করে নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। বিদ্রোহ দমনের নামে ১৯৫০ সালে তাদের বিরুদ্ধে প্রথম সামরিক অভিযান পরিচালনা করা হয়। পরিকল্পিতভাবে মুসলিম বুদ্ধিজীবী, গ্রামপ্রধান, আলেম-ওলামা, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে হত্যা করা হয় এবং মুসলমান অধ্যুষিত গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়, আর সেখানে মগদের জন্য বসতি নির্মাণ করা হয়।
দুই বছর পর ১৯৫২ সালে ‘অপারেশন মায়ু’ নামে পুনরায় রোহিজ্ঞাদের উপর সামরিক অভিযান চালানো হয়। অন্যদিকে নিপীড়নের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের মধ্যেও প্রতিবাদ দানা বাঁধতে থাকে। ফলে অনেকেই বিদ্রোহীদের সাথে যোগ দান করে। এর ফলশ্রুতিতে তে মায়ানমার কতৃপক্ষ সামরিক বাহিনীর মাধ্যমে  ১৯৫৪ সালে ‘অপারেশন মনসুন’ নামে  আরো জোরালো অভিযান শুরু করে।
১৯৬১ সালে আরাকানের বিদ্রোহীরা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়। পরের বছর ১৯৬২ সালে বার্মার সেনাবাহিনী রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা দখল করে নেয়। জেনারেল নে-উইন প্রধানমন্ত্রী উ নুকে ক্ষমতাচ্যুত করে এবং সামরিক অফিসারদের নিয়ে বার্মা সোশালিস্ট প্রোগ্রাম পার্টি গঠন করে বার্মাকে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ঘোষণা করেন। ১৯৬২ সালের ২ মার্চ উ নকে হটিয়ে ক্ষমতা দখলের পর নে উইন সংখ্যালঘুদের সব সাংবিধানিক অধিকার বাতিল করে দেন।   শুরু হয় রোহিঙ্গা নিধন পরিকল্পনা। নে উইন বার্মা হচ্ছে বার্মার জন্যে নীতি গ্রহণ করে। নে উইন “ভাগ কর শাসন কর” এই নীতি অবলম্বন করে। রোহিঙ্গারা পুনরায় নিপীড়ন, নির্যাতন ও উচ্ছেদের শিকার হয়।   ১৯৬৪ সালে রোহিঙ্গাদের সব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নিষিদ্ধ করা হয় এবং ১৯৬৫ সালের অক্টোবর থেকে Burma Broadcasting Service থেকে প্রচারিত রোহিঙ্গা ভাষার সব অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া হয়।
আরাকানকে বৌদ্ধ শাসিত অঙ্গরাজ্যের মর্যাদা দেওয়া হয়। জেনারেল নে-উইনের সামপ্রদায়িক নীতির ফলে রোহিঙ্গাসহ আরাকানের অন্যান্য মুসলিম জাতির সঙ্গে বৌদ্ধদের সাম্প্রদায়িক বিভেদ ও দাঙ্গা বৃদ্ধি  বাড়তে থাকে। নে-উইনের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং জাতিগত আন্দোলন দমনে বর্মীকরণ নীতি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সংকটের বিস্তার ঘটায়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বার্মা সরকার ১৯৭৩ সালে উত্তর আরাকানে মেজর অং থান অপারেশন (Major Aung Than operation) ও ১৯৭৪ সালে সাবে অপারেশন (Sabe operation) নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। এ অভিযানের ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে এসে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ নেয়। সে সময় তৎকালীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দৃঢ় অবস্থান ও চরমপত্রের কারণে বার্মা সরকার বিতাড়িতদের ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।
১৯৭৪ সালে আরাকান রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রাখা হয়। জাতিগত আন্দোলন দমনের জন্য জেনারেল নে-উইন আরাকানে ১৯৭৮ সালে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালায়। আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে নির্বিচারে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। সে সময় নাগামিন ড্রাগন অপারেশনের ফলে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা স্বদেশে ফিরে  গেলেও ১৫ হাজার রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে থেকে যায়।
রোহিঙ্গাদের উপর সবচেয়ে বড় কূটনীতিক আঘাত আসে ১৯৮২ সালে। ধূর্ত নে-উইন ১৯৮২ সালে নাগরিকত্ব আইনের মাধ্যমে ১৯৮৩ সালের পর বার্মায় আগত রোহিঙ্গাদের ভাসমান নাগরিক হিসেবে ঘোষণা করে। ফলে বার্মায় রোহিঙ্গাদের সম্পত্তি অর্জন, রাজনৈতিক অধিকার ও অবাধ বিচরণ নিষিদ্ধ হয়ে যায়। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার থেকে বিতাড়নে দীর্ঘ দিনের নীল নকশার অংশ হিসেবেই নাগরিকত্ব হরণ করে তাদেরকে রাষ্ট্রহীন করার ব্যবস্থা করা হয়।এবার রোহিঙ্গাদের উপর নতুন করে নির্যাতনের পথ চালু হয়। নে-উইনের এই চক্রান্তমূলক নীতির ফলেই ১৯৯১ সালে পুনরায় রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু সংকটের সৃষ্টি হয়। রোহিঙ্গা খেদাও  উদ্দেশ্য নিয়ে সামরিক বাহিনী আবারও  শুরু করে ১৯৯১ সালে অপারেশন শুরু করে । ১৯৯১ সালে ‘অপারেশন ক্লিন এন্ড বিউটিফুল’ নামে  দমন নিপীড়ন অভিযানের ফলে তখন প্রায় দুই লাখ রোহিঙ্গা উদ্বস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

ছবিঃ reuters.com

২০১৪ সালে আদমশুমারির সময় রোহিঙ্গাদের আরেক দফা ভাগ্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি পড়তে হয়। মায়ানমার কতৃপক্ষ শুরুতে তাদেরকে রোহিঙ্গা হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত  করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু সরকারের এ সিদ্ধান্তে বাদ সাধে বৌদ্ধ চরমপন্থিরা। তারা এর প্রতিবাদ জানায় এবং শুমারি বর্জনের হুমকি দেয়। হুমকির মুখে জান্তা সরকার সিদ্ধান্ত  বদলে ফেলে। জান্তা সরকার নতুন আদেশ জারি করে, রোহিঙ্গারা ‘বাঙালি’ হিসেবে শুমারিতে অন্তর্ভুক্ত হতে পারবে। বৌদ্ধ চরমপন্থিদের দাবির মুখে পরের বছর ২০১৫ সালে রোহিঙ্গাদের ভোটাধিকার হরণ করা হয়। যদিও জান্তা সরকার আগে ঘোষণা করেছিল যে, যাদের অস্থায়ী পরিচয়পত্র আছে তারা সংবিধান সংক্রান্ত গণভোটে অংশ নিতে পারবে। কিন্তু চরম পন্থী বৌদ্ধদের প্রতিবাদের মুখে সরকার অস্থায়ী পরিচয়পত্র বাতিল করে দেয়।

শতাব্দীকাল ধরে রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর চলা নির্মম নির্যাতনের বিষয়টি এখন গোটা বিশ্বের সামনে পরিষ্কার। এটাও স্পষ্ট যে শুধু মুসলমান হওয়ার কারণেই তাদের ওপর নির্যাতনের স্টিমরোলার চালানো হচ্ছে। জেনারেল নে উইন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সব মিয়ানমার সরকারই রোহিঙ্গাদের মৌলিক মানবাধিকার বন্ধ রেখে রোহিঙ্গা নিধনের পথে হেটে চলছে।  রোহিঙ্গারা পৃথিবীর অন্যতম রাষ্ট্রবিহীন মানুষ। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্রবিহীন ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে করা সব ধরনের অপরাধকে বৈধতা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের কোনো অনুচ্ছেদই সেখানে মানা হচ্ছে না। জাতিসংঘসহ অন্যান্য মানবাধিকার সংস্থা রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে যে রোহিঙ্গারা পৃথিবীর সবচেয়ে নির্যাতিত জনগোষ্ঠী, কিন্তু এ ব্যাপারে তারা যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা থেকে বিরত আছে।  রোহিঙ্গাদের জন্যে মানবাধিকার শব্দটি  মিউজিয়ামে রাখা আছে।

মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের ১৯৮২ সাল থেকে নাগরিক হিসেবে স্বীকার করে না। ফলে রোহিঙ্গারা  সকল প্রকার নাগরিক ও মৌলিক সুবিধা হতে বঞ্চিত । মিয়ানমারে ভ্রমণ, শিক্ষা, চিকিৎসার জন্য পরিচয় পত্র থাকাটা খুব জরুরি একটি বিষয়। কিন্তু মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের পরিচয় পত্র ইস্যু করে না, ফলে কয়েকশ বছর ধরে পিছিয়ে এমনিতেই পিছিয়ে পড়া রোহিঙ্গারা আরো পিছিয়ে পড়ছে।

মিয়ানমার সরকারের ভূমি ও সম্পত্তি আইন অনুসারে কোন বিদেশী সে দেশের কোন সম্পত্তি ও ভূমি মালিকানা পেতে পারে না। আর রোহিঙ্গারা যেহেতু মিয়ানমার সরকারের আইন অনুসারে (১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়) অবৈধ অভিবাসী তথা, বিদেশি। এ কারনে রোহিঙ্গারা কোন ভূমি বা, স্থায়ী সম্পত্তির মালিক হতে পারে না। বর্তমানে যেসকল ভূমিতে রোহিঙ্গারা বসবাস করছে, মিয়ানমার সরকার চাইলে যেকোন মুহূর্তে সেগুলো দখল  নিতে পারবে।

মিয়ানমার সরকার বৈষম্যমূলক আইনের মাধ্যমে  রোহিঙ্গাদের জীবন রীতিমত অসহনীয় করে তুলেছে । রোহিঙ্গা লোকজন সরকারি কোন চাকরি করতে পারে না, সরকারি কোন দপ্তরে রোহিঙ্গা কোন সেবা পায় না, ব্যাংকে লেনদেন করতে পারে না, সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রের সেবা গ্রহণ করতে পারে না, উপযোগ সেবার (বিদ্যুত, পানি, জ্বালানী) জন্য আবেদন করতে পারে না, স্বপরিচয়ে শিক্ষা কেন্দ্রগুলোতে ভর্তি হতে পারে না। প্রায় ৮০% রোহিঙ্গা বাস্তবিক অর্থে অশিক্ষিত। তবে তারা ধর্মীয় মৌলিক শিক্ষা গ্রহণ করে ।

প্রায়ই মিয়ানমার সরকার বা স্থানীয় বৌদ্ধ কর্তৃক রোহিঙ্গা নিপীড়ণের খবর পাওয়া যায়। মধ্যযুগের মত রোহিঙ্গাদের এখন জোরপূর্বক শ্রমিক হিসেবে খাটানো হয়। প্রায়শ স্থানীয় প্রশাসন ও সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের বিভিন্ন লোকালয়ে হানা দেয়। শহরের সৌন্দর্য্য বর্ধন, সরকারি জমি অধিগ্রহণের নামে তাদের অনেকগুলো মসজিদ  ভেঙ্গে ফেলা হয়েছে। সরকার অনেক রোহিঙ্গাদের ব্যবসায়  বাজেয়াপ্ত করেছে আবার অনেকের ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছে।

রোহিঙ্গারা বিয়ে করার জন্যও স্থানীয় প্রশাসনের অনুমতি নেয়া লাগে ! রোহিঙ্গা জনসংখ্যা যাতে বাড়তে না পারে এ কারনে দুটোর বেশি সন্তান নেয়া রোহিঙ্গাদের জন্য শাস্তিযোগ্য অপরাধ !

১৯৪৮ সালের পর থেকে মায়ানমার কর্তপক্ষ রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে যে সব অভিযান চালায় তার একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা হলঃ

১। মিলিটারী অপারেশন (৫তম বার্মা রেজিমেন্ট) – নভেম্বর ১৯৪৮

২।  বার্মা টেরিটোরিয়াল ফোর্স অপারেশন – ১৯৪৯-১৯৫০

৩। মিলিটারি অপারেশন (২য় ইমার্জেন্সী কিন রেজিমেন্ট) – মার্চ ১৯৫১-১৯৫২

৪। মায়ু অপারেশন -অক্টোবর ১৯৫২-১৯৫৩

৫। মন-থন অপারেশন অক্টোবর ১৯৫৪

৬। সম্মিলিত ইমিগ্রেশন ও আর্মি অপারেশন – জানুয়ারি ১৯৫৫

৭। ইউনিয়ন মিলিটারি পুলিশ অপারেশন ১৯৫৫-১৯৫৮

৮। কেপ্টেন হটিন কাও অপারেশন -১৯৫৯

১০। শুয়ে কাই অপারেশন – অক্টোবর ১৯৬৬

১১। এঙ্গাজিংকা অপারেশন – ১৯৬৭-৬৯

১২। মায়াত মন অপারেশন -ফেব্রুয়ারী ১৯৬৯-১৯৭১

১৩। মেজর অং থান অপারেশন -১৯৭৩

১৪। সাবে অপারেশন – ফেব্রুয়ারী ১৯৭৪-১৯৭৮

১৫। নাগা মিন (কিং ড্রাগন) অপারেশন -ফ্রেব্রুয়ারী ১৯৭৮-১৯৭৯ (৩০০০০০ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে উদ্বাস্তু হিসেবে প্রবেশ)

১৬। শয়ি হিন্থা অপারেশন -আগস্ট ১৯৭৮-১৯৮০

১৭। গালন অপারেশন -১৯৭৯

১৮। পাই থায়া অপারেশন -জুলাই ১৯৯১-১৯৯৯২  (২৬৮০০০ রোহিংগার বাংলাদেশে উদ্বাস্তু বাংলাদেশে প্রবেশ )

১৯। নাসাকা অপারেশন -১৯৯২-

২০। ২০১২ সালের জাতিগত দাঙ্গা

২১। ক্লিয়ারেন্স অপারেশন ২০১৭-২০১৮ (৮০০০০০ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে প্রবেশ)

আরাকানী মুসলীম লেখকদের মতে প্রায় ১২ লক্ষের অধিক মুসলিম বিভিন্ন সময় নির্যাতনের ফলে আরাকান থেকে বিতারিত হয়েছে । এর মধ্যে ৫ লক্ষ সৌদি আরবে,পাকিস্থানে ২ লক্ষ ৫০ হাজার, বাংলাদেশে গত রোহিঙ্গা ইস্যুর ছাড়া ৩ লক্ষ ৩০ হাজারে উপরে রোহিঙ্গা পূর্ব থেকেই ছিল, গালফ স্টেট সমূহে ৫৫ হাজার, মালেশিয়া ও থাইল্যান্ডে ৪৩ হাজার ও অন্যান্য দেশে ১০ হাজারের বেশি মুসলিম আরাকান থেকে বিতারিত হয়েছে। এ ছাড়া ১৯৪২ সালে গণহত্যার সময় লক্ষাধিক মুসলমানদের হত্যা করা হয় ও ৫ লক্ষের অধিক বিতাড়িত করা হয়।  (আরাকানের মুসলিমদের ইতিহাসঃ ডাঃ মাহফুজুর রহমান আখন্দ , প্রকাশকালঃ সেপ্টেম্বর ২০১৩ )

তবে ২০১৭ সালের নির্যাতনের পরে এ দেশে প্রবেশ করা রোহিঙ্গার সংখ্যা কত— তা নিয়ে স্থানীয়দের  সাথে জাতিসংঘের  বিশাল ব্যবধান  লক্ষ্য করা যায় । ইউএনএইচসিআরের মতে ২৪ আগস্ট ২০১৭ এর পর আরাকান থেকে বাংলাদেশে ৫ লাখ ৮২ হাজার রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করেছে। কিন্তু স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও এনজিও প্রতিনিধিরা  ধারনা নতুন করে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখ ছাড়িয়েছে।

ছবিঃmaryscullyreports.com

এর পিছনে তাদের যুক্তি হল,  ইউএনএইচসিআর তাঁবু ধরে যে প্রক্রিয়ায় রোহিঙ্গার সংখ্যা নির্ধারণ করছে, বাস্তবতা তার  ভিন্ন। রোহিঙ্গাদের একটি অংশ তাঁবুতে অবস্থান করলেও একটি বড় অংশ বাইরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বিভিন্ন স্থানে গভীর অরণ্যেও নিজেদের মতো করে রোহিঙ্গারা  আবাস গেড়েছে । সে সব স্থানে কোনো জরিপ চালানো হয়নি। এ ছাড়া একটি অংশ কক্সবাজারে আত্মীয়স্বজনদের বাসায়ও উঠেছে। এগুলোও গণনার বাইরে রয়েছে। তাই ধারনা করা হয় সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখের উপরে রোহিংগার অনুপ্রবেশ ঘটেছে এবার।

রোহিঙ্গা জাতির নামকরণের ইতিহাস

৮ম শতাব্দীতে আরাকানে রোহিঙ্গা বসতির স্থাপন শুরু হয় । রোহিঙ্গা নামকরণ কিভাবে হয়েছে এই নিয়ে কয়েকটি জনশ্রুতি দেখা যায়ঃ

মতবাদ এক, আরবের প্রখ্যাত ভূগোল বিশারদ সুলায়মান ৮৫১ সালে রচিত তার ‘সিলসিলাত উত তাওয়ারিখ’ গ্রন্থে বঙ্গোপসাগরের তীরে ‘রুহমী’ নামে দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। () চন্দ্রবংশীয় রাজা মহৎ-ইঙ্গ-চন্দ্রের রাজত্বকাল ছিল  ৭৮৮-৮১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত । সে সময় কয়েকটি আরব মুসলিম বাণিজ্য  জাহাজ বহর রামব্রী দ্বীপের পার্শ্বে বিধ্বস্ত হলে জাহাজের আরোহীরা রহম রহম বলে চিৎকার করে। রহম আরবি শব্দ রহম অর্থ হল দয়া করা। স্থানীয় লোকজন তাদের উদ্ধার করে আরাকান রাজার কাছে নিয়ে যায় । রাজা আরবদের বুদ্ধিমত্তা ও উন্নত আচরণে মুগ্ধ হয়ে আরাকানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপনের অনুমতি প্রদান করেন। স্থানীয় লোকজন আরবি ভাষায় অনভিজ্ঞ ছিল তাই তাদেরকে রহম গোত্রের লোক মনে করে রহম বলে ডাকতো। ক্রমশ শব্দটি বিকৃত হয়ে রহম রোঁয়াই রোঁয়াই রোঁয়াইঙ্গা বা রোহিঙ্গা নাম ধারন করে।

রোহিঙ্গা’ শব্দটির উৎপত্তি সর্ম্পকে এন. এম .হাবিব উল্লাহ লিখেছেন:

‘জনশ্রুতি আছে, আরবীয় মুসলমানেরা ভাসতে ভাসতে কুলে ভিড়লে পর ‘রহম’ ‘রহম’ ধ্বনি দিয়ে স্থানীয় (আরাকানি) জনগণের সাহায্য কামনা করতে থাকে। বলা বাহুল্য, ‘রহম’ একটি আরবী শব্দ, যার অর্থ দয়া করা। কিন্তু, (আরাকানি) জনগন মনে করে এরা রহম জাতীয় লোক। রহম শব্দই বিকৃত হয়ে রোয়াং হয়েছে বলে রোহিঙ্গারা মনে করে থাকেন।’ (রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস। পৃষ্ঠা; ১৭)

নামকরণ মতভেদ দুই, আফগানিস্তানের অন্তর্গত ঘোর প্রদেশের রোহা জেলার অধিবাসীদের বংশধর হল রোহিঙ্গারা । তারা মূলত তুর্কী কিংবা আফগানী বলে ধারনা করা হয়। । কারন ইখতিয়ার উদ্দিন মুহাম্মদ বখতিয়ার খিলজীসহ বাংলার মুসলমান বিজেতা ও শাসকগণ ইসলাম প্রচার ও প্রসারের জন্যে আফগানিস্তানের রোহার অঞ্চলের কিছু ব্যক্তিকে আরাকানে প্রেরণ করে ছিলেন বলে ধারনা করা হয়।  আর এ রোহার অঞ্চলের লোকেরা আরাকানের নামকরণ করেছিলেন রোহাং। এ রোহা বা রোহাং শব্দ থেকেই রোহিঙ্গা নামকরণ হয়েছে বলে অনেকে ধারনা করেন।

নামকরণ মতবাদ তিন, ‘‘রাখাইন’’ শব্দটা যখন চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা কিংবা আরাকানী ভাষায় বলা হয় তখন ‘‘খ’’ এর স্থলে ‘‘হ’’ উচ্চারণ হয়। লক্ষ্য করুন তখন শব্দটা হয়ে রাহাইন। এই রাহাইন শব্দটি  আবার চট্টগ্রাম বা আরাকানী প্রভাবে বিকৃতি লাভ করে। যেমন কারো নাম যদি ‘‘রহিম’’ হয় তাকে ‘‘রইম্যা’’ বলে ডাকার একটা প্রবনতা দেখা যায় । এটা ঠিক ব্যঙ্গ বিদ্রুপ নয়। ফলে ‘‘রাহাইন’’ থেকে ‘‘রাহাইন্যা’’ সেখান থেকে ‘‘রোহিঙ্গা’’ হওয়াটা একটা সম্ভবনা আছে ।

বাংলাদেশ ও রোহিঙ্গা:

ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি মায়ানমার কতৃপক্ষ রোহিঙ্গাদের মায়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি এবং আরাকান সরকারের মতে, রোহিঙ্গারা মূলত বাংলাদেশী। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটি প্রমাণিত সত্য যে, রোহিঙ্গারা মায়ানমারের আরাকানের উত্তরাঞ্চলের স্থায়ী অধিবাসী। অথচ অর্ধশতাব্দী ধরে, মায়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ করেছে। রোহিঙ্গাদের আগমন ঢল নিয়ে ছোট্ট একটা সারসংক্ষেপ করা যেতে পারে।

## দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আরাকানের অধিবাসীরা ব্রিটিশ সরকাররকে সাহায্য করতে আরাকানে একটি বাফার স্টেটের সৃষ্টি করে। কিছু দিন পরে জাপান বার্মা দখল করে নিলে বার্মিজ জাতীয়তাবাদী ও জাপানীরা মিলে রোহিঙ্গাদের গণহত্যা, জাতিগত  সহিংসতা শুরু করে।  ইতিহাসে এই গণহত্যাটি ১৯৪২ সালের গণহত্যা নামে খ্যাত। এসময় প্রায় পঞ্চাশ হাজার রোহিঙ্গা ভারত উপমহাদেশের বিভিন্নি অঞ্চলে পালিয়ে আসে। এর অধিকাংশই বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকাতে ছড়িয়ে পড়ে।

## বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই বার্মা সরকার ১৯৭৩ সালে উত্তর আরাকানে মেজর অং থান অপারেশন (Major Aung Than operation) ও ১৯৭৪ সালে সাবে অপারেশন (Sabe operation) নামে রোহিঙ্গা উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। এ অভিযানের ফলে হাজার হাজার রোহিঙ্গা জীবন বাঁচাতে যুদ্ধবিধ্বস্ত দুর্ভিক্ষপীড়িত বাংলাদেশে এসে নিরাপদ আশ্রয় গ্রহণ নেয়। যদিও বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তার কারনে মায়ানমার পরে বেশ সংখ্যক রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হয়।

## জাতিগত আন্দোলন দমনের জন্য জেনারেল নে-উইন আরাকানে ১৯৭৮ সালে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালায়। আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে নির্বিচারে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। সে সময় নাগামিন ড্রাগন অপারেশনের ফলে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা স্বদেশে ফিরে  গেলেও ১৫ হাজার রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে থেকে যায়।

## জেনারেল নে উইনে ১৯৮২ আদমশুমারির সময় রোহিঙ্গাদের বিদেশী ঘোষণা করে নিপীড়ণ করা শুরু করে। এ সময় প্রায় দুই লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। উদ্বাস্তুরা তখন গণহত্যা, ধর্ষণ, সন্তান চুরিসহ নানান ধরণের জাতিগত ধোলাইয়ের অভিযোগ আনে।

## ১৯৯১-৯২ সালে The State Law and Order Restoration Council (SLORC) এর মাধ্যমে পাই থায়া অপারেশন নামে মায়ানমার সরকার উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দমনের নামে রোহিঙ্গাদের জাতিগত ধোলাই শুরু করে। এসময় মায়ানমারের সৈন্য ও স্থানীয় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, শিশু চুরি, মসজিদ ভেঙে দেয়া, গ্যাটোতে স্থানান্তর, ধর্মপালনে বাধা দেয়া, বাংলাদেশে পুশ ইনসহ সামরিক ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমে বাধ্য করে। এসময় বাংলাদেশে  আড়াই লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে।

## কয়েকজন রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারী দ্বারা এক রাখাইন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে জুন, ২০১২ তে শুরু হয় রাখাইন-রোহিঙ্গা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। এক পর্যায়ে, মায়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাখাইন বৌদ্ধ মৌলবাদীরা মিলে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত ধোলাই শুরু করে। এর ফলশ্রুতিতে হাজার হাজার রোহিঙ্গা গৃহ হারা হয়ে বাংলাদেশ সীমান্তে ছুটে আসে। কিন্ত বাংলাদেশের কঠোর অবস্থানের মুখের সরাসরি প্রবেশে বাধা পেয়ে নানা উপায়ে হাজার হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।

## এছাড়া, আশির দশক হতে এখন পর্যন্ত প্রতিনিয়ত নানাভাবে মায়ানমার সরকার ও স্থানীয়দের নিপীড়ণের শিকার হয়ে অসংখ্য রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

কয়েক শতাব্দি ধরে চলে আসা রোহিঙ্গা নিপীড়নে তাদের বাংলাদেশে অবস্থান  নেওয়া আশির দশক থেকে চরম আকার ধারন করেন। ফলশ্রুতিতে,  জাতিসংঘ ও আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে মায়ানমার সরকার  স্বল্প সংখ্যক রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিলেও তা সংখ্যায় অতি নগণ্য। আবার, মায়ানমার সরকার ফেরত নেয়া এসব রোহিঙ্গাদের আগের মতই নিপীড়ণ করছে । এখনো অসংখ্য রোহিঙ্গা মায়ানমার সরকারের নিপীড়ণের শিকার হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে।

রোহিঙ্গা সংকট যেভাবে শুরু এবং বাংলাদেশের সম্পৃক্ততা

১৯৪২ সালের মধ্য জানুয়ারির দিকে জাপান বার্মা আক্রমণ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রোহিঙ্গাদের অবস্থান ছিল মিত্র বাহিনীর পক্ষে। ব্রিটিশরা যুদ্ধে হেরে বার্মা ছেড়ে যায়।  ১৯৪২ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে শুধুমাত্র বার্মায় জাপানি সেনাদের হাতে অন্তত ১ লাখ ৭০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ প্রাণ হারায়। তখন আরাকানের স্থানীয় বৌদ্ধ মগরাও জাপানীদের সাথে হত্যাযজ্ঞে অংশগ্রহণ করে।  সে সময় প্রায় ৫০ হাজারের মত রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে চট্টগ্রামের নানা এলাকাতে অবস্থান নেয়।

ভারত পাকিস্থান ভাগ হবার প্রাক্কালে ১৯৪৬ সালের মে মাসে রাখাইন প্রদেশের মুসলিম রোহিঙ্গা নেতারা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর সাথে দেখা করেন।  তারা রাখাইন প্রদেশকে পাকিস্তানের সঙ্গে সংযুক্ত করে বুথিডং ও মংদৌ নামে দুটি শহরের একত্রীকরণের প্রস্থাব প্রদান করেন। এর দুই মাস পর রোহিঙ্গা মুসলমানরা আকিয়াবে নর্থ আরাকান মুসলিম লীগ গঠন কর পাকিস্তানের সঙ্গে আলাদা প্রদেশ হিসেবে বার্মা থেকে আলাদা হওয়ার চেষ্টা করে। কিন্ত জিন্নাহ তেমন আগ্রহ প্রকাশ করে নি।

১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি বার্মা ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের এই স্বাধীনতার দাবি ধীরে ধীরে সশস্ত্র সংগ্রামের দিকে যায়। ১৯৬২ সালে বার্মায় সামরিক জান্তা ক্ষমতা দখল করে। এর পরে শুরু হয় চরম পর্যায়ের নিপীড়ন।  জাতিগত আন্দোলন দমনের নামে জেনারেল নে-উইন আরাকানে ১৯৭৮ সালে নাগামিন ড্রাগন অপারেশন চালায়। আরাকান ন্যাশনাল লিবারেশন পার্টির সঙ্গে রোহিঙ্গা মুসলমানদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে নির্বিচারে হাজার হাজার রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয়। সে সময় নাগামিন ড্রাগন অপারেশনের ফলে প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। পরে দু’দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী ১৯৭৯ সালের ৬ অক্টোবর থেকে ২৪ ডিসেম্বরের মধ্যে বেশির ভাগ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুরা স্বদেশে ফিরে  গেলেও ১৫ হাজার রোহিঙ্গা তখন বাংলাদেশে থেকে যায়।

এরপর মায়ানমার সরকার ১৯৯১-৯২ সালে The State Law and Order Restoration Council (SLORC) এর মাধ্যমে পাই থায়া অপারেশন নামে উত্তর রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দমনের জন্যে রোহিঙ্গাদের জাতিগত ধোলাই আরম্ভ করে। এসময় মায়ানমারের সৈন্য ও স্থানীয় রাখাইনরা রোহিঙ্গাদের হত্যা, ধর্ষণ, শিশু চুরি, মসজিদ ভেঙে দেয়া, গ্যাটোতে স্থানান্তর, ধর্মপালনে বাধা দেয়া, বাংলাদেশে পুশ ইনসহ সামরিক ক্যাম্পে বাধ্যতামূলক শ্রমে বাধ্য করে। এসময় বাংলাদেশে  আড়াই লক্ষের অধিক রোহিঙ্গা পালিয়ে আসে।

ছবিঃ blogs.wsj.com

যুগ যুগ ধরে মুসলিম নিধনের ধাবাহিকতায় দুই তিনজন রোহিঙ্গা দুষ্কৃতিকারী এক রাখাইন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যাকে কেন্দ্র করে জুন, ২০১২ তে শুরু হয় রাখাইন-রোহিঙ্গা সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। রোহিঙ্গাদের হাতে বৌদ্ধ মহিলা নির্যাতনের অজুহাতে তারা এ গণহত্যার সূচনা করে। এক পর্যায়ে, মায়ানমারের সামরিক বাহিনী ও রাখাইন বৌদ্ধ মৌলবাদীরা মিলে রোহিঙ্গাদের উপর জাতিগত ধোলাই শুরু করে। এ সম্পর্কিত প্রতিবেদনে এক বার্মিজ নাগরিক বলেছে, রোহিঙ্গা হত্যা একটি ভালো কাজ। এদিকে যাদের বিরুদ্ধে সম্ভ্রমহরণের অভিযোগ আনা হয়েছে তাদের সঙ্গে সঙ্গেই গ্রেফতার করেছে পুলিশ। কিন্তু প্রতিশোধ নেয়ার নেশায় উন্মাতাল হয়ে সংখ্যালঘু রোহিঙ্গাদের উপর হামলা চালায় বৌদ্ধ রাখাইনরা। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ছাড়া নিপীড়িত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশ সরকারের নতুন করে আরো রোহিঙ্গা শরণার্থী গ্রহণের অনিচ্ছার কারণে উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে পারে না। তবে, বাংলাদেশ সরকার বিজিবির মাধ্যমে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যতটুকু সম্ভব মানবিক সাহায্য দিয়েছে। কিন্তু দুর্গম সীমান্ত দিয়ে ঠিকই হাজার হাজার নিপীড়িত রোহিঙ্গা বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করছে। ২০১২ সালের দাঙায় মারা যায় প্রায় শতাধিক রোহিঙ্গা এবং গৃহহীন হয় প্রায় লক্ষাধিক রেহিঙ্গা।

২০১৭ সালে সেনা চৌকিতে হামলার জের ধরে মায়ানমার সরকার ঢালাও ভাবে জাতিগত নিধন শুরু করে। ক্লিয়ারেন্স অপারেশন নামে শুরু হওয়া এ নিধনে গ্রামের পরে গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হয়। হত্যা, ধর্ষণ, উচ্ছেদ হল তাদের টার্গেট। বিশ্ব বিবেক এখানে থমকে আছে।   লাখ লাখ রোহিঙ্গা তখন পালিয়ে বাংলাদেশে চলে আসে। ধারনা করা হয় প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা  এ সময় বাংলাদেশের প্রবেশ করে।

বিগত কয়েক দশক ধরে মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদেরকে বাংলাদেশ সীমান্তে পুশ ইন করছে। রুটিনমাফিক নির্যাতন করে রোহিঙ্গাদের বাধ্য করছে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করতে। বর্তমানে  ৮  লক্ষের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে  আশ্রিত আছে।  যদিও উদ্বাস্তু হিসেবে বাংলাদেশে তালিকাভুক্ত রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আরো কম। রোহিঙ্গাদের প্রতি যা করছে মিয়ানমার সরকার, তা সমগ্র মানবতার বিরুদ্ধেই অপরাধ। এক হাজার বছরের বেশি সময় ধরে আরাকানে বিকশিত হতে থাকা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সুবিধা না দেয়া, গ্যাটো সৃষ্টি করে সেখানে অমানবিক পরিবেশে থাকতে বাধ্য করা, জোরপূর্বক শ্রমে নিয়োগ করা, বিচারবর্হিভূতভাবে গ্রেফতার করা, মালিকানাস্বত্ব, সার্বজনীন শিক্ষা, চিকিৎসা, উপযোগ সেবা ও মৌলিক মানবাধিকার হতে বঞ্চিত করার মাধ্যমে নিমর্মতার শেষ সীমানাটুকু অতিক্রম করেছে মিয়ানমার সরকার।

উল্লেখ্য, ১৯৭৮-৭৯  বা ১৯৯১-৯২ সালে দ্বিপক্ষীয়ভাবে শরণার্থী সমস্যা সমাধান করতে যেয়ে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি হওয়ার পরেও সন্তোষজনক কোন ফলাফল পাওয়া যাইনি। প্রতিবার মায়ানমার চুক্তি পূর্ণ বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ হয়েছে। এ কারনে ২০১৭ সালের ঘটনার পরে বাংলাদেশ রোহিঙ্গা ইস্যুকে আন্তর্জাতিকীকরণের চেষ্টা করছে।  অবস্থা এমন চলছে যে  বাংলাদেশ যদি তার কূটনৈতিক যুদ্ধে জয়লাভ করে বা অন্য কোন ভাবে মিয়ানমারকে বাধ্য করতে পারে তবে রোহিঙ্গা সমস্যার একটা স্থায়ী সমাধান হবে নতুবা বাংলাদেশকে রোহিঙ্গা সমস্যা আজীবন বহন করতে হবে। রোহিঙ্গা সমস্যাটি সাময়িক না কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের ঘাড়ে চেপে বসা একটি সমস্যা তাই।  সে জন্য কূটনৈতিক যুদ্ধের পাশাপাশি অন্যান্য পন্থাগুলো (তা যতই কঠিন কিম্বা অপ্রিয়ই হোক না কেন) নিয়েও বাংলাদেশকে অবশ্যই ভাবতে হবে।

বাংলাদেশকে যেখানে তার নিজের জনসংখ্যা নিয়েই হিমশিম খেতে হচ্ছে সেখানে আবেগের বশবর্তী হয়ে আরো ৮-১০ লাখের মত রোহিঙ্গা স্থান দিয়ে  নিজের ঘাড়ে বিপদ টেনে আনার মানে হয়। তাদের ভরণপোষণ, আবাস স্থল, শিক্ষা, চিকিৎসার সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। দিন দিন তাদের অপরাধ প্রবণতা বাড়তেই আছে, এক সময় তাদের কারনে নিজেদের নিরাপত্তার অভাবে পড়তে হবে। ইতিমধ্যে রোহিঙ্গারা বেশ কয়েকবার স্থানীয় ও পুলিশের সাথে সংঘর্ষে লীপ্ত হয়ে তার প্রমাণ দিয়েছে।

দাদা বলে ডাকা ভারত রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের পাশে নেই । অন্য দিকে বাংলাদেশের আরেক মিত্র চিন বরাবর নিরাপত্তা পরিষদে বাংলাদেশের বিপক্ষে ভ্যাটু দিচ্ছে ! ভারত ও চীনের চোখ আরাকানের বন্দর ও বাণিজ্য। বাংলাদেশকে তাই ভারত ও চিন সম্পর্কেও নতুন নীতি গ্রহণ করতে হবে।

শেষ কথা

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমানগণ বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে ভাগ্যাহত জনগোষ্ঠী। এককালে  তাদের ছিল ছিল স্বাধীন রাষ্ট্র, ক্ষমতা ও প্রভাব প্রতিপত্তি এখন তারাই সন্ত্রাসী বৌদ্ধদের অমানুষিক নির্যাতনের শিকার। মিয়ানমারের মুসলিম জনগোষ্ঠীর ভাগ্য বিড়ম্বনার ইতিহাস যে কাউকে তাড়িত করবে। এই উপমহাদেশ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে কয়টি এলাকায় মুসলিম বসতি স্থাপিত হয়, আরাকান হল তাদের মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানী মুসলমানের বংশধর।  নির্বিচারে চলছে তাদের উপর চলছে অত্যাচারের খড়গ। রোহিঙ্গা ইস্যু আসলে বর্তমানে সুচির নাম না নিলেই নয় ।

 ‘১৯৯১ সালে সুচিকে নোবেল শান্তি পুরস্কারে ভূষিত করার সময় নরওয়ের নোবেল কমিটি ঘোষণা করেছিলো, বিশ্বব্যাপী অসংখ্য মানুষকে গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার আদায়ে এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ক্লান্তিহীন সংগ্রামের জন্য মহান এ নেত্রীকে সম্মানিত করা হচ্ছে। অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রামের প্রতীক হয়ে উঠেছেন অং সান সুচি।’

সেই অং সান সু চি রোহিঙ্গা ইস্যুতে বরাবর নিরব এমন কি তিনি রোহিঙ্গাদের উপর নির্যাতনকে অস্বীকার করেছেন ! সু চি বহু বছর ধরে নির্যাতিত মানুষের প্রতীক হিসেবে ছিলেন । রোহিঙ্গাদের ওপর নির্মম নির্যাতনের কারণে ২০১৬ সালেই সু চির নোবেল শান্তি পুরস্কার ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি ওঠে। ২০১৭ সালের নির্যাতনের পরে এই দাবি আরো জোড়ালো হয়।

তথ্য সূত্রঃ

১।  https://bn.wikipedia.org/wiki/রোহিঙ্গা

২। রোহিঙ্গা জাতির ইতিহাস , লেখক এন এম হাবিব উল্লাহ

৩। https://rohingyasinternational.wordpress.com/history/

৪। নানা অনলাইন ব্লগ ও নিউজ

৫। ছবিঃ news.com.au, cnn.com,

 

ইমেইলে নতুন লেখাগুলো পেতে সাইন আপ করুন 🙂

মানজুরুল হক